দারুণ অগ্নিবাণে ত্রাহি-রব পড়ে গিয়েছে বাংলায়। এই পরিস্থিতিতে বৃষ্টি অভয় না-দিক, কিঞ্চিৎ আশ্বাস দিচ্ছেন বিদ্যুৎকর্তারা। তাঁরা বলছেন, গরমে বিদ্যুৎ পরিষেবা ব্যাহত হলে শহরাঞ্চলে দু’ঘণ্টার মধ্যে মেরামতি সেরে ফেলা হবে। গ্রামাঞ্চলে খুব বেশি হলে তিন ঘণ্টায়। শুধু গ্রীষ্মে নয়, এই সুরাহা মিলবে বর্ষাতেও।

কিন্তু এই বৈদ্যুতিক আশ্বাসে স্বস্তির চেয়ে ‘শক’ বেশি লাগছে গ্রাহকদের। সুইচ গড়বড় করলে বা ‘লুজ কানেকশন’ হলে বিদ্যুতের ‘শক’ কেমন হয়, অনেকেরই সেই অভিজ্ঞতা আছে। বিদ্যুৎ দফতরের এই আশ্বাসে তার থেকেও বেশি চমকে গিয়েছেন অনেকে। বিশেষ করে শহরতলি ও গ্রামগঞ্জের বাসিন্দাদের পক্ষে সেই চমকটা হজম করতে খুব খানিকটা অসুবিধা হচ্ছে।

ভুক্তভোগীরা এই ঘোষণায় প্রায় বিদ্যুতের মতোই শক খেয়েছেন, খাচ্ছেন। কারণ, চৈত্র-বৈশাখের বিকেলে আকাশে মেঘ জমলেই শহরতলি আর জেলার বাসিন্দাদের বুক ঢিপঢিপ করে। তাঁরা জানেন, ঝড়বৃষ্টিতে বিদ্যুৎ পরিষেবা বিঘ্নিত হবেই। এবং কত ক্ষণে তা ফের স্বাভাবিক হবে, সেটা বলতে পারেন না বিদ্যুৎকর্মীরাও। গ্রাহকদের প্রশ্ন, কোন জাদুতে পত্রপাঠ মেরামতি সেরে বিদ্যুৎ ফিরিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন কর্তারা? রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থার এলাকায় পরিষেবার বেহাল দশার কথা তো নতুন নয়। বিদ্যুৎকর্তাদের যদি জাদুবিদ্যা জানা থেকে থাকে, আগে তাঁরা সেটা দেখাননি কেন? গ্রাহকদের ভোগান্তি নিরসনে ভোজবাজি দেখানো যে দরকার, সেই ব্যাপারে কেন এত দিন টনক নড়েনি বিদ্যুৎ দফতরের?

জবাব মিলছে না। তবে ভোটই এই আকস্মিক উদারতার কারণ বলে মনে করছেন বিদ্যুৎকর্তাদের অনেকে। এপ্রিল-মে মাসে ভোট। সেই সময় ভোটারদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্ধকারে গরমে নাকাল হতে হলে তার প্রতিফলন যে ইভিএম বা বৈদ্যুতিন ভোটযন্ত্রে পড়বে, সেটা ভালই জানেন সরকারি কর্তারা। তাই উন্নত পরিষেবার এমন আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে বলে বিদ্যুৎ দফতরের কর্তাদের একাংশের দাবি। এই প্রসঙ্গেই উঠে আসছে অন্য একটি নির্দেশের কথাও। দফতর সূত্রের খবর, এত দিন আকাশে মেঘ জমলেই ফিডারের সুইচ বন্ধ করে দেওয়া হতো। কারণ, ঝড়ে আচমকা তার ছিঁড়ে পড়লে বিপদ ঘটতে পারে। কিন্তু সম্প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ঝড় উঠতে পারে, এমন আভাস পেলে বা হাল্কা ঝোড়ো হাওয়া দিলেই ফিডারের সুইচ বন্ধ করা যাবে না।

যদিও বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থার শীর্ষ কর্তাদের দাবি, এ ভাবে পরিষেবা উন্নত করার সদিচ্ছার সঙ্গে ভোটের কোনও সম্পর্ক নেই। পাঁচ বছরে এ রাজ্যে বড় শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি। ফলে বিদ্যুতের চাহিদা নেই। বরং অনেক সময় বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত হয়ে যায়। শিল্প-কারখানার অভাবে বিদ্যুতের চাহিদা না-বাড়ায় লোডশেডিংও আর তেমন হয় না। ‘‘এই অবস্থায় পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ থাকা সত্ত্বেও গ্রাহকদের ভুগতে হবে কেন, সেই প্রশ্নটাই এই ধরনের ইতিবাচক পদক্ষেপের কথা ভাবতে বাধ্য করিয়েছে। এটা বড় চ্যালেঞ্জও,” বলছেন বিদ্যুৎ দফতরের এক কর্তা।

গ্রাহকদের একাংশের প্রশ্ন, দিনের বেলাতেই তো বিদ্যুৎ-বিভ্রাট হলে সারাইকর্মীদের দেখা মেলে না। সন্ধ্যায় বা রাতে তার ছিঁড়ে গেলে বা খুঁটি ভেঙে গেলে দু’তিন ঘণ্টায় কী ভাবে তা সারিয়ে তোলা হবে?

প্রশ্ন বা কটাক্ষে বিদ্যুৎ সংস্থা যে বেজায় বিচলিত, তা নয়। প্রত্যন্ত গ্রামে ঝড়ে খুঁটি ভেঙে গেলে তিন ঘণ্টার মধ্যে তা সারানো প্রায় অসম্ভব, এটা মেনে নিয়েও নিজেদের ক্ষমতার উপরে আস্থা রাখছে তারা। বলছে, এমন ক্ষেত্র ছাড়া অন্যত্র দ্রুত পরিষেবা স্বাভাবিক করার মতো পরিকাঠামো আছে তাদের। পর্যাপ্ত কর্মীও আছে। এলাকা-ভিত্তিক পরিষেবা কেন্দ্র রয়েছে। প্রয়োজনে আশপাশের এলাকা থেকেও কর্মীদের নিয়ে আসা হতে পারে। প্রত্যন্ত এলাকায় যাওয়ার জন্য মোবাইল ভ্যান রয়েছে। এখন সাধারণ ভাবে রাত ১০টা পর্যন্ত সেগুলি সদা-প্রস্তুত থাকে। প্রয়োজনে বেশি রাত পর্যন্ত কাজ করবে ভ্যানগুলি।

প্রশাসনিক তৎপরতাও জোরদার হয়েছে বলে কর্তাদের দাবি। বিদ্যুৎ দফতরের খবর, ন’দফা নির্দেশ সংবলিত চিঠি পাঠানো হয়েছে বণ্টন সংস্থার প্রতিটি আঞ্চলিক দফতরে। তাতে বলা হয়েছে, চার ঘণ্টা অন্তর রাজ্যের সার্বিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কথা জানাতে হবে সদরকে। সংস্থার আঞ্চলিক অফিসে সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কন্ট্রোল রুম খোলা থাকবে। সেখানকার টেকনিক্যাল অফিসার নিয়মিত যোগাযোগ রাখবেন অন্য কর্তাদের সঙ্গে। বিদ্যুতের লাইনের দুর্বল জায়গাগুলি সারানোর ব্যবস্থা হচ্ছে। অর্থাৎ পরিষেবার হাল ফেরাতে তাঁরা যে কোমর বেঁধে নামছেন, নির্দেশের বহরে ও কর্তাদের বক্তব্যে সেটা স্পষ্ট।

এটা সদিচ্ছা, নাকি নিছক ঢক্কানিনাদ— গ্রীষ্ম আর বর্ষায় তার পরীক্ষা নিতে চাইছেন গ্রাহকেরা।

সুত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা