ভাগ করে নিন
ভিউজ্
  • অবস্থা সম্পাদনার জন্য উন্মুক্ত

তুঁত চাষ

তুঁত চাষের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এখানে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে এখানে।

উপযুক্ত জমি ও মাটি

রেশম শিল্পে পলু পোকার খাদ্যই হল তুঁত পাতা। তুঁত চাষ পাহাড়ি, সমতল সব জমিতেই করা সম্ভব। তবে এই চাষে ভালো ফলন পেতে গেলে জমির নিম্নলিখিত গুণাবলি থাকা অত্যন্ত জরুরি। যেমন, উঁচু জমি (যেখানে জল দাঁড়ায় না); পিএইচ ৬.৫ – ৭.২ এর মধ্যে; বেলে বা বেলে দোঁয়াশ মাটি; সেচযুক্ত ছায়াহীন জমি। যদি মাটি পরীক্ষা করে দেখা যায় জমির মাটি অম্লধর্মী বা ক্ষারধর্মী তা হলে মাটি সংশোধন অবশ্যই করতে হবে। আবার বেশি লবণাক্ত হলেও তার সংশোধন করতে হবে।

  • ক) মাটির অম্লতা দূরীকরণ : মাটির অম্লতা ৬.৫-এর অধিক হলে কলিচুন, ডলোমাইট বা বেসিক স্লাগ ব্যবহার করে তা কমাতে হবে।
  • খ) মাটির ক্ষারতা দূরীকরণ : ক্ষারতা ৭.২-এর অধিক হলে ২৫০ – ৫০০ কেজি/বিঘা জিপসাম ছড়াতে হবে। জমির উপরের স্তর কেটে ফেলে দিলে ক্ষার অপসারিত হয়। নিয়মিত অ্যামোনিয়াম, সালফেট ব্যবহার করলে সুফল পাওয়া যায়। বিঘা প্রতি ২.৫ – ৫ টন পাঁক ও তার সাথে কম্পোস্ট দিলে ক্ষার দূরীভূত হয়। জমির চার পাশে আল বেঁধে দিয়ে কিছু দিন জল ধরে রেখে পরে জল বের করে দিলেও কিছুটা ক্ষারের প্রকোপ কমে।
  • গ) লবণাক্ততা দূরীকরণ : নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলি প্রয়োগ করলে মাটির লবণাক্ত ভাব কিছুটা অন্তত দূর করা সম্ভব। যেমন
    • (ক) জমির উপরের স্তর কেটে তুলে ফেলে দিতে হবে (যতটা সম্ভব)।
    • (খ) অধিক মাত্রায় কম্পোস্ট ও জৈবসার প্রয়োগ করতে হবে।
    • (গ) বার বার মিষ্টি জলের সেচ দিতে হবে।
    • (ঘ) নিকাশি ব্যবস্থা ভালো রাখতে হবে, যাতে জমির লবণ-ধোয়া জল নিকাশি নালা বেয়ে সহজেই বেরিয়ে যেতে পারে।
    • (ঙ) বর্ষায় বৃষ্টির জলকে কাজে লাগিয়ে জমি মাটির লবণ ধোয়ার কাজ যতটা সম্ভব জোরদার করতে হবে।

এই ভাবে শোধন করা মাটি তথা জমিতে জমির অবস্থান ভেদে বিভিন্ন প্রকার উন্নত জাতের তুঁত গাছ চাষ করে অধিক মাত্রায় ফলন পাওয়া সম্ভব।

বিভিন্ন জাত ও লাগানোর পদ্ধতি

ভালো ফলন পেতে গেলে বিভিন্ন অঞ্চল উপযোগী উন্নত প্রজাতির তুঁত গাছের চাষ করতে হবে। বিভিন্ন অঞ্চল উপযোগী উন্নত জাতগুলি হল

অঞ্চল

তুঁত গাছের জাত

ক) গাঙ্গেয় উপত্যকা (দোঁয়াশ) অঞ্চল

এস – ১ (মান্দালয়), এস ১৬৩৫

খ) লাল কাঁকুরে (মোরাম) অঞ্চল

সি ১৭৩০, সি-৭৬৩

গ) পার্বত্য অঞ্চল

বি সি ২৫৯ টি আর ১০, কোসেন এস ১৪৬

ঘ) সেচ এলাকা (সমতলভূমি)

এস-১, এস ১৬৩৫

ঙ) সেচবিহীন (সমতল ভূমি)

এস – ১, এস ৩৪, সি ১৭৩০

জমির অবস্থান অনুযায়ী জাত নির্বাচন করে, প্রয়োজনীয় তুঁতকাটি (যা কাটিং-এর মাধ্যমে বিস্তার করা হয়েছে) ৪৫০ কোণে মাটিতে পুঁতে দেওয়া হয় নিম্নলিখিত রোপন পদ্ধতিতে :

  • ক) সেচযুক্ত সমতলভূমিতে ২ ইঞ্চি x ২ ইঞ্চি দূরত্বে সারি করে লাগানো হয়।
  • খ) সেচবিহীন এলাকায় ৩ ফুট x ৩ ফুট দূরত্বে সারি করে ১.৫ ফুট x ১.৫ ফুট x ১.৫ ফুট মাপের গর্ত করে তাতে লাগানো হয়। মোরাম সমতলভূমিতেও তুঁত চারা এই ভাবে লাগানো হয়।
  • গ) সেচবিহীন পাহাড়ি এলাকায় উপরের
  • (খ) পদ্ধতি অনুযায়ী কাটিং-এর বদলে চারা লাগানো হয়।

কাটিং লাগানোর সময় বিশেষ সতর্কতা

কাটিং মাঝারি আর্দ্রতা (স্যাঁতসেঁতে) এবং আচ্ছাদিত অবস্থায় রাখতে হবে। বিশেষ করে পরিবহনের সময় আঁটেসাটো আচ্ছাদন দিয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। আগেই বলা হয়েছে কাটিং ৪৫০ কোণ করে মাটিতে পুঁততে হবে। লাগানোর পর মাঝেমাঝে ক্ষেত পরিদর্শন করতে হবে। প্রয়োজনীয় সেচ, নিড়ানি, মরে যাওয়া কাটিং বদল, রোগ প্রতিষেধক প্রয়োগ ইত্যাদি নানান কৃষি ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। তা ছাড়া পাতার অধিক ফলন ও তার গুণগত মান কেবল মাত্র প্রজাতির উপর নির্ভর করে না। এর জন্য তুঁত চাষের সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করা খুবই জরুরি।

চাষ সংক্রান্ত জরুরি বিষয়

তুঁত চাষ করতে গেলে কতক গুলি জরুরি বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে।

  • ১) সেচ : নির্ধারিত সেচ প্রয়োগ গাছ ও পাতার ফলন বৃদ্ধির সহায়ক। সাধারণত ১ থেকে ১.৮ একর ইঞ্চি সেচ ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত প্রতি ১৫ দিনে এক বার দেওয়া উচিত।
  • ২) আবৃত পদ্ধতি (মালচিং) : কোয়াগুটির জন্য নির্ধারিত তুঁত জমিতে ভাদুড়ী বন্দের পর ও সঞ্ঝের জন্য আশ্বিনা বন্দের পর জমির আগাছা পরিষ্কার করে তুঁত গাছ ভূমি বরাবর ছেঁটে দিতে হবে। এর পর জমিতে খোঁড়, জৈব সার বা কেঁচো সার ও জল দিয়ে কালো পলিথিন বা খড় বা শুকনো উলুঘাস বা কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। এর ফলে মাটির আর্দ্রতা ৩% - ৬% ধরে রাখা, জমির উত্তাপ ১-৩০ সেলসিয়াস বাড়ানো, পাতার ফলন ৪৮% বৃদ্ধি করা এবং পাতাতে ২.৫% আর্দ্রতা ধরে রাখা সম্ভব হয়।
  • ৩) পাতা তোলা ও গাছ বা ডাল ছাঁটাই : পলু পালনের সময়ানুসারে বছরে একই জমি থেকে ৫ বার পাতা তোলা যেতে পারে। প্রতি বার পাতা তোলার পর গাছ বা ডাল ছাঁটা যেতে পারে। ফাঁক ফাঁক করে লাগানো তুঁত গাছ মাটি থেকে ১০ ফুট -১২ ফুট উপরে ছাঁটা দরকার।
  • ৪) বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক স্প্রে : গাছ ছাঁটাই-এর পর ফাইটোনাল জি আর (প্রতি ১০ লিটার জলে ২ মিলি) গাছের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রধান কাণ্ডে স্প্রে করলে সুপ্ত অবস্থায় বা অপরিণত অবস্থায় থাকা পত্র মুকুলগুলি প্রকাশিত হয় ও গাছের বৃদ্ধিও পরিলক্ষিত হয়। গাছের পাতায় স্প্রে করলে গাছ খুব তাড়াতাড়ি শোষণ করতে পারে। গাছে পাতার আকার ও পুষ্টিগুণ বৃদ্ধি পায়।
    • প্রতি এক একর জমির জন্য ২০০ লিটার রাসায়নিক মিশ্রণ দরকার।
    • গাছে ফুলের কুঁড়ি আসার সময় বা ফুল ফোটার সময় স্প্রে করা যাবে না।
    • এই মিশ্রণ স্প্রে করলে ১% ইউরিয়া দ্রবণ স্প্রে করার দরকার নেই।
    • ১০ মিলি, ৫০ মিলি, ১০০ মিলি, ২০০ মিলি প্যাক বাজারে পাওয়া যায়।
    • এই বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক পেতে গেলে সরকারি সম্প্রসারণ আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
  • ৫) আগাছা নিড়ানো : প্রদত্ত সার যাতে আগাছা না খেয়ে ফেলে তার জন্য নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করতে হবে।
  • ৬) মরা গাছ পূরণ (গ্যাপ ফিলিং) : জমির কোনও জায়গায় চারা মরে গেলে ফাঁকা জায়গায় শীঘ্রই নতুন চারা লাগাতে হবে।
  • ৭) গাছের অগ্রভাগ ছাঁটা : ডিম ফোটার সঙ্গে সমতা রেখে তুঁত গাছের অগ্রভাগ (আপিক্যাল বাড) ছেঁটে দিলে তা উপযুক্ত পরিণত পাতা দেয়, যা পলুর উৎকৃষ্ট খাবার ও রসা রোগের প্রতিষেধক।

রোগ ও তার প্রতিকার

পাউডারি মিলিডিউ (ফাইল্যাকটিনিয়া করিলিয়া )

রোগ লক্ষণ

বর্ষার অব্যহিত পরে ও শীতকালে পাতার নীচে প্রথমে গুঁড়ো সাদা আস্তরণ, পরে হলুদ থেকে কালচে আস্তরণ পড়ে ও তা সমস্ত পাতায় ছড়িয়ে যায় ও হলুদ হয়ে শুকিয়ে যায় ও ঝরে পড়ে।

প্রতিকার

বিঘা পিছু ১৬৭ গ্রাম সালফেক্স ৮৩.৫ লিটার জলে বা ১৩৩ গ্রাম ব্যাভিস্টিন ১৩৩ লিটার জলে গুলে ১৫ দিন অন্তর দু’ বার পাতার নীচে স্প্রে করতে হবে।

লিফ স্পট (সারকোস্পোরা মরিকোলা )

লক্ষণ

বর্ষাকালে পাতার উপর অসংখ্য বৃত্তাকার ও অনিয়মিত কালচে বাদামি দাগ পড়ে ও ক্রমে বেড়ে গিয়ে পাতাকে ব্যবহারের অনুপযোগী করে তোলে। পরে পাতা হলুদ হয়ে অকালে ঝরে পড়ে।

প্রতিকার

০.১% কার্বান্ডাজিম বা ০.২% ডাইফোলাটান বা ০.২% ব্যাভিস্টিন বা ০.০৫% বেনলেট দ্রবণ (বিঘা পিছু ৬৭ – ৮৩ লিটার) ১০ দিন অন্তর ২ বার স্প্রে করতে হবে।

মালবেরি রাস্ট (পেরিডিওপসোরা মোরি )

লক্ষণ

পাতার তলায় আলপিনের মাথার আকারের ব্রণ বা ফুসকুড়ির মতো বাদামি রঙের ক্ষত দেখা যায়, কাণ্ড মোটা ও বিকৃত হয়। পরে পাতা হলুদ হয়ে ঝরে পড়ে।

প্রতিকার

বিঘা প্রতি ২৬৭ গ্রাম ব্লাইটক্স (৬৭ লিটার জল) বা ব্যাভিস্টিন ০.২% দ্রবণ ১০ দিন অন্তর তিন বার পাতা ও কাণ্ডে স্প্রে করতে হবে।

শিকড়ে গাঁট পড়া (মেলাইডোজিনি ইনকোগনিটা) নিমাটোড

লক্ষণ

শিকড়ে ছোট ছোট গাঁট দেখা যায়। গাছের পাতা হলদে হয়। গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।

প্রতিকার

গ্রীষ্মকালে গভীর চাষ ও বিঘা পিছু ৩৩ কেজি নিম খোল বা ১.৭৫০ কেজি ফিউরাডান ৩ জি চার বছরে প্রয়োগ করতে হবে।

টুকরা রোগ : মিলি বাগ (ম্যাকেনেলি কক্কাস হিরসুটাস)

লক্ষণ

গাছের বাড় কমে যায় ও ডগার পাতাগুলো কুঁকড়ে গিয়ে ঝুপির মতো দেখতে হয়। গাছের পাতা কালচে সবুজ রঙের হয়। পাতার আক্রান্ত স্থানে তুলোর আঁশের মতো দেখা যায়। সেখানে মিলিবাগের ডিম বা তাদের বাচ্চা দেখা যায়।

প্রতিকার

আক্রান্ত স্থানের অংশগুলো ভেঙে পলিথিন ব্যাগে ভরে কোথাও পুঁতে ফেলা বা পুড়িয়ে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে। ০.২% ডি ডি ডি পি ১০ – ১২ দিন অন্তর বারদুয়েক স্প্রে করতে হবে।

গাছের কীট শত্রু ও তার নিয়ন্ত্রণ

তুঁত গাছের কীটশত্রুর মধ্যে য গুলি সচরাচর দেখতে পাওয়া যায় থ্রিপস, উইপোকা ও সাদা মাছি তাদের মধ্যে অন্যতম।

থ্রিপস (সিউডো ডেনড্রোথ্রিপস মোরি)

এটি তুঁত গাছের রস শোষণ করে তার ক্ষতি সাধন করে।

লক্ষণ

বর্ষার আগে পাতা বাদামি, হলুদ রঙ ধারণ করে ও ক্ষণভঙ্গুর হয়। অপরিণত অবস্থায় পাতা শুকিয়ে ঝরে পড়তে শুরু করে। আক্রান্ত পাতাকে নৌকোর মতো দেখায়। গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।

নিয়ন্ত্রণ

০.১% ডাইমিথায়েট দ্রবণ ১৫ দিন অন্তর দু’ বার পাতায় স্প্রে করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

উইপোকা

উইপোকা তুঁত গাছের এক প্রধান শত্রু। সাধারণত মোরাম মাটি এলাকায় এর প্রকোপ বেশি দেখা যায়।

লক্ষণ

এরা গাছের মূল ও কাণ্ডের প্রভূত ক্ষতি করে।

প্রতিকার
  • উইয়ের ঢিবি ভেঙে ফেলে রানি উইপোকাকে মেরে ফেলতে হবে।
  • আক্রান্ত ডাল পুড়িয়ে ফলে ঘন ঘন সেচ দিতে হবে।
  • প্রতিটি ঢিবিতে ২টি করে অ্যালুমিনিয়াম ফসফাইড বড়ি বা ৫০ গ্রাম ফোরেট ১০ জি বা ৫০ মিলি ক্লোরডেন ১৫ লিটার জলে গুলে প্রয়োগ করতে হবে।

সাদা মাছি (অ্যালোউরোডিকাস ডিসপারসাস)

লক্ষণ

শ্রাবণী ও ভাদুড়ী বা অগ্রহায়নি বন্দে (ক্রপ) বেশি প্রাদুর্ভাব ঘটে; তুঁতপাতার তলায় পূর্ণাঙ্গ বা নিম্ফগুলিকে জোট বেঁধে একত্রে থাকতে দেখা যায়; পাতার উপর হলদে ছাপ পড়ে ও পাতা ঝরে যায়। উপরের সমস্ত কচি পাতা কুঁকড়ে গিয়ে শুকিয়ে যায়। গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। যে পাতার তলার দিকে এরা থাকে সেই পাতার উপরে এদের রেচন পদার্থ হিসেবে এক প্রকার রস (হানি ডিউ) পড়তে দেখা যায়। পাতার নীচে নিম্ফগুলি থাকায় পাতার উপরি ভাগ কালো রঙ ধারণ করে।

নিয়ন্ত্রণ

পরিচ্ছন্ন চাষ; নিয়মিত পর্যবেক্ষণ। ৭০ লিটার জলে ৩০ – ৪০ মিলিলিটার মনোক্রোটোফস মিশিয়ে মুড়া কাটার ১৫ দিন আগে এক বার, ১৫ দিন পর আরও একবার স্প্রে কাগজে আঠা লাগিয়ে সকালের দিকে ডালে আটকে দেওয়া; পূর্ণাঙ্গ পোকা আঠায় আটকে গেলে কাগজ শুধু পোকাকে পুড়িয়ে ফেলা। প্রতি লিটার জলে ৫ মিলি হিসেবে নিমতেল মিশিয়ে তুঁত জমিতে স্প্রে করা।

চাষে সার প্রয়োগ

অন্যান্য কৃষি ফসলের মতো তুঁত চাষেও জৈব সার, রাসায়নিক সার এমনকী জীবাণু-সারও প্রয়োগ করতে হয়। তবেই প্রচুর ফলন ও উন্নত মানের রসাল পলুর খাবার তথা তুঁত পাতা উত্পাদন করা সম্ভব।

জৈব সার

  • সেচযুক্ত সমতলভূমিতে বিঘা পিছু ২.৫ টন গোবর সার বর্ষার আগে প্রয়োগ করতে হবে।
  • সেচবিহীন মোরাম এলাকায় বিঘায় ১৩ কুইন্টাল গোবর সার দেওয়া হয়।
  • পাহাড়ি এলাকায় প্রতি গর্তে ২ কেজি গোবর সার দেওয়া হয় ও ধৈঞ্চা চাষ করে ৪৫ দিনের মাথায় মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়।
  • পলু পালনের বর্জ্য পদার্থের সঙ্গে গোবর বা বায়োগ্যাস তৈরির অবশিষ্টাংশ মিশিয়ে সাধারণ কম্পোস্ট তৈরি করে প্রয়োগ করা যেতে পারে।
  • ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার তৈরি করে প্রয়োগ করা যেতে পারে।

রাসায়নিক সার

মাটি পরীক্ষার সুপারিশ অনুযায়ী সার প্রয়োগ করা বাঞ্ছনীয়। মালদা, বহরমপুরে মাটি পরীক্ষার কেন্দ্র রেয়েছে। তা সম্ভব না হলে

  • বিঘা পিছু বছরে ৮৭ কেজি ইউরিয়া, ১৫০ কেজি সিঙ্গল সুপার ফসফেট ও ২৫ কেজি মিউরিয়েট অব পটাশ গাছ ছাঁটার বা পাতা তোলার ২৫ দিন পরে প্রয়োগ করতে হবে।
  • সেচবিহীন মোরাম অঞ্চলে এই সারগুলি বিঘা পিছু ২৯:২৪:১১ কেজি (মুল সার) হারে দু’ ভাগে জুলাই ও অক্টোবর মাসে দিতে হবে। ইউরিয়াকে চার ভাগে দিলে ভাল হয়।
  • পাহাড়ি এলাকায় এই হার প্রতি বিঘায় ৪৩.৫ – ২৪ – ১১ কেজি বা ১২.৫-২.৪ -৪.২ গ্রাম প্রতি গর্তে।

জীবাণু সার

ফসফরাস ও পটাশ অপরিবর্তিত রেখে অর্ধেক ইউরিয়া, তার সঙ্গে ৩ কেজি অ্যাজোটোব্যকটর বিঘা পিছু প্রয়োগ করতে হবে। তবে নাইট্রোজেন ও জীবাণু সার সঠিক ভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

  • রাসায়নিক সার দেওয়ার অন্তত ১৫ দিন বাদে জীবাণু সার দিতে হবে।
  • ৪ কেজি জীবাণু সারের সঙ্গে ২০০ কেজি জৈব সার জমিতে দিতে হবে।
  • দুই সারির মাঝ বরাবর সরু নালা তৈরি করে গর্তে জীবাণু ও জৈব সারের মিশ্রণ ছড়িয়ে নালা বন্ধ করতে হবে ও সেচ দিতে হবে।

ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার

উত্তম পলু পালন করতে গেলে উত্কৃষ্ট মানের তুঁত পাতা উত্পাদন ও তা পলুকে সরবরাহ করা জরুরি। আর উত্তম তুঁতপাতা পেতে গেলে সাধারণ কম্পোস্টের (এফওয়াইএম) পরিবর্তে ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার তুঁত জমিতে প্রয়োগ করা আবশ্যক। উন্নত মানের এক ধরনের বিশেষ কেঁচোর সাহায্যে মাত্র ৫০ – ৬০ দিনের মধ্যে সাধারণ কম্পোস্ট সার তৈরির একই উপাদান দিয়ে এই সার তৈরি করা যায়। অথচ গতানুগতিক পদ্ধতিতে সাধারণ কম্পোস্ট সার তৈরি করতে ৪ – ৫ মাস সময় লেগে যায়। তা ছাড়া কেঁচো সারের সাহায্যে জমির উর্বরতা শক্তি সাধারণ কম্পোস্ট সারের তুলনায় অনেকগুণ বেশি। এই সার বছরে বিঘা পিছু ১৩ কুইন্টাল করে দিতে হবে। এই পরিমাণ সার তৈরির জন্য ১০ ফুট x ৬ ফুট x ২.৫ ফুট সাইজের ও ৯ ইঞ্চি পুরু সিমেন্টের দেওয়ালবিশিষ্ট ট্যাঙ্ক খুঁড়তে হবে। এর তলদেশ ও দেওয়াল সিমেন্ট বা পলিথিনের চাদর দিয়ে মুড়ে দিতে হবে। অথবা সিমেন্টের বাঁধানো চাতাল বা কাঁচা চাতালের উপর পলিথিন বিছিয়ে ১০ ফুট x ৬ ফুট জায়গার উপর ২.৫ ফুট উঁচু করে মাটি, আবর্জনা পচা, কচুরিপানা পচা বা খড় পচা দিয়ে কেঁচো ছাড়তে হবে। মাঝেমাঝে হাল্কা ভাবে জল দিতে হবে। গোবরের সঙ্গে দিলে আরও ভালো হয়। এর উপর মাটির সামান্য উঁচুতে খড়ের চালা তৈরি করতে হবে, যাতে রৌদ্র বা বৃষ্টি না লাগতে পারে। কেঁচো এই উদ্ভিজ্জ উপাদানগুলি গ্রহণ করে বেঁচে থাকে ও মলত্যাগ করে। কেঁচোর এই মল হল কেঁচো সার যা উদ্ভিদের সুষম আহার। সার-গর্তের বা সারস্তূপের প্রায় সব অংশ যখন কেঁচোর মলে পূর্ণ হয়ে যাবে তখন বুঝতে হবে সার আহরণের সময় এসেছে। তখন সারগাদা বা সার-গর্ত থেকে সার তুলে চালুনিতে চেলে কেঁচো সার আলাদা করে গুদামজাত করতে হবে। কেঁচো ছাড়ার ৫০ – ৬০ দিনের মধ্যেই এক বার সার সংগ্রহ করা যায়। এর পর পরবর্তী পর্যায়ে অনুরূপ ভাবে সারগাদা বা সার-গর্ত তৈরি করে উক্ত কেঁচো ছাড়তে হবে।

তথ্যসূত্র : রেশম শিল্প অধিকার, পশ্চিমবঙ্গ সরকার

3.24
মন্তব্য যোগ করুন

(ওপরের বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন মন্তব্য / পরামর্শ থাকে, তাহলে দয়া করে আমাদের উদ্দেশ্যে পোস্ট করুন).

Enter the word
Back to top