হোম / কৃষি / পোল্ট্রি চাষ / ব্রোওলার মুরগি / যখন গড়বেন মুরগির খামার
ভাগ করে নিন
ভিউজ্
  • অবস্থা সম্পাদনার জন্য উন্মুক্ত

যখন গড়বেন মুরগির খামার

দেশে উন্নত জাতের মুরগি পালনে জনগণের উত্সাহ দিন দিন বেড়ে চলেছে। আর মুরগি পালনের জন্য আবহাওয়াও বেশ উপযোগী।

মুরগি খামার গড়তে যা যা প্রয়োজন

দেশে উন্নত জাতের মুরগি পালনে জনগণের উত্সাহ দিন দিন বেড়ে চলেছে। আর মুরগি পালনের জন্য  আবহাওয়াও বেশ উপযোগী। কেননা, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে আমিষ জাতীয় খাদ্যের ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পুষ্টির অভাবে মানসিক বিকাশ বিঘ্নিত হচ্ছে দেশের অগণিত শিশুর। উন্নত জাতের একটি মুরগি ছয় মাস বয়সে ডিমপাড়া শুরু করে এবং বছরে ২০০ থেকে ২৫০ ডিম দেয়। অন্যদিকে ব্রয়লার (মাংস উত্পাদক মুরগি) মুরগি দুই মাসেই দেড় থেকে দুই কেজি মাংস দেয়। বসতবাড়িতে অল্প শ্রম ও কম খরচে মুরগি পুষে পরিবারের প্রোটিন জাতীয় খাদ্যের ঘাটতি সহজেই মেটানো যায়। পারিবারিকভাবে মুরগি পালনের ফলে পরিবারের অল্প বয়স্ক ছেলে-মেয়ে, যুবক-যুবতী এমনকি বুড়ো-বুড়িরাও তাদের অবসর সময়ে কিছু না কিছু কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারেন। আর এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে আপনিও একটি মুরগি নিয়ে এক মোরগের সংসার গড়তে পারেন। এতে আপনি লাভবান হবেন। মাংস ও ডিমের চাহিদা পূরণ হবে। একটি মোরগের সংসার গড়ার আগে অবশ্যই আপনাকে জানতে হবে উন্নত মুরগি চাষের আধুনিক কলা-কৌশল।

থাকার ঘর

একটি মোরগের সংসার গড়তে প্রথমে প্রয়োজন হবে মুরগির ঘর ঠিক করা। মুরগির থাকার ঘর উচ্চতায় চার ফুট, প্রস্থে সাড়ে ৪ ফুট এবং দৈর্ঘ্য ৬ ফুট করুন। এর ভেতরে ডিম পাড়ার খাঁচি, খাবার পাত্র ও জলর পাত্র রাখুন। আরও খেয়াল রাখবেন

  • (১) ঘর সব সময় শুকনো ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
  • (২) খোলামেলা স্থানে ঘর বানাবেন
  • (৩) ঘরের মেঝে তিন ইঞ্চি পুরু হয় এ পরিমাণ তুস, কাঠের গুঁড়া বা বালির সঙ্গে আধা কেজি গুঁড়া চূর্ণ ভালোভাবে মিশিয়ে সমানভাবে বিছিয়ে দিন।
  • (৪) মেঝের কাঠের গুঁড়া বা তুস ৭ দিন পরপর ওলট-পালট করে দেবেন। স্যাঁতসঁতে হলে বা জমাট বেধে গেলে তা পরিবর্তন করে দেবেন। ঘরে আটকে না রেখে বাইরেও মুরগি পালন করতে পারেন।

খাদ্য

অধিক ডিম পেতে হলে মুরগিকে দৈনিক সুষম খাবার খেতে দেবেন, প্রত্যহ প্রতিটি মুরগিকে ১১৫ গ্রাম সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধ জল ও ২৫ গ্রাম সবুজ শাক-সবজি বা কচি ঘাস কুচি কুচি করে কেটে খেতে দিন।

আপনি নিজেই সুষম খাদ্য তৈরি করতে পারেন। সুষম খাদ্যের উপাদানগুলো নিম্নরূপ :

খাদ্য উত্পাদন-গম/ভুট্টা ভাঙা বা চালের খুদ ৪০০ গ্রাম। গমের ভুসি ৫০ গ্রাম। চালের কুঁড়া (তুষ ছাড়া) ২৫০ গ্রাম। তিলের খৈল ১২০ গ্রাম। শুঁটকি মাছের গুঁড়া ১০০ গ্রাম। ঝিনুকের গুঁড়া ৭৫ গ্রাম। সুষম খাদ্য মোট ১,০০০ গ্রাম বা ১ কেজি।

রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা

আপনার মুরগিকে সুস্থ রাখতে নিয়মিত টিকা দেয়ার ব্যবস্থা নেবেন। পশুসম্পদ বিভাগ থেকে বিনামূল্যে রানীক্ষেত, কলেরা, বসন্ত রোগের প্রতিষেধক টিকা সংগ্রহ করতে পারেন। আরেকটু খেয়াল রাখবেন, আপনার মুরগি অসুস্থ হলে সঙ্গে সঙ্গে পশু চিকিত্সালয়ের পরামর্শ নেবেন। অসুস্থ মুরগিকে চিহ্নিত করে তত্ক্ষণাত্ আলাদা করে রাখুন। তা ছাড়া রোগাক্রান্ত মুরগির বিষ্ঠা ও লালা সতর্কতার সঙ্গে সংগ্রহ করে তা মাটিতে পুঁতে রাখার ব্যবস্থা নেবেন।

আয়-ব্যয়

এক মোরগের সংসারের জন্য একটি ঘর (খাবার পাত্রসহ) তৈরি কর বাবদ প্রায় ২ হাজার টাকা খরচ হবে এবং ঘর কয়েক বছর ব্যবহার করা যাবে। ছয় মাস বয়সের ৯টি মুরগি এবং ১টি মোরগের ক্রয়মূল্য ২ হাজার টাকা। ১ বছর পর এ ১০টি মুরগিকে প্রায় একই দামে বিক্রি করা যাবে। ডিম কিনলে ১টির দাম পড়বে ৮ টাকা। মুরগির বাচ্চা কিনলে ১টির দাম পড়বে ৩০ টাকা। ৯টির দাম হবে ২৭০ টাকা। প্রতি মাসে মুরগির খাবার ক্রয় বাবদ প্রায় ৮০০ টাকা ব্যয় হবে। যদি আপনি নিজেই মুরগির সুষম খাবার তৈরি করেন তাহলে খরচ আরও কম হবে।

৯টি মুরগি থেকে প্রতিদিন গড়ে ৬টি ডিম পাওয়া যাবে। ডিম বিক্রি করে প্রতি মাসে গড়ে ১৪৪০ টাকা আয় করতে পারেন। উত্পাদিত ডিম, খাবার এবং বাচ্চা ফুটানোর ডিম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।

পোলট্রি খামারে জৈব নিরাপত্তা

ভারতের পাঞ্জাব, মুর্শিদাবাদসহ কয়েকটি প্রদেশে বার্ড ফ্লু সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়। শীতের শেষ দিকে বার্ড ফ্লুর ভাইরাস সক্রিয় হয় বেশি। যাতে বার্ড ফ্লুর ভাইরাস দেশের অন্যান্য এলাকার হাঁস-মুরগির খামারে সংক্রমণ না ঘটাতে পারে সে জন্য প্রতিরোধমূলক জৈব নিরাপত্তাব্যবস্খা এখনই জোড়দার করা উচিত। কোনোভাবেই যাতে জীবাণু খামারের ভেতর প্রবেশ না করে এ জন্য জৈব নিরাপত্তাব্যবস্খা নিশ্চিত করার জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

  • ১. খামারের প্রধান গেট তালা দিয়ে রাখতে হবে। ‘ জৈব নিরাপত্তা চালু আছে, প্রবেশ নিষেধ’ লেখা সাইনবোর্ড লাগাতে হবে।
  • ২. খামারের চার পাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
  • ৩. খামারের শেডের পাশে খাদ্যদ্রব্য ফেলা যাবে না, এতে বন্যপাখি আসবে। বন্যপাখি বার্ড ফ্লুর ভাইরাস বহন করে।
  • ৪. দর্শনার্থীদের এবং অন্য খামারের কর্মীদের প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না।
  • ৫. খামারের ভেতরে নিয়োজিত কর্মীদের খামার কর্র্তৃক প্রদত্ত জীবাণুমুক্ত পোশাক, জুতা, টুপি ইত্যাদি ব্যবহার করতে হবে।
  • ৬. খামারের ভেতর প্রবেশের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, গাড়িসহ সবকিছু জীবাণুমুক্ত করে প্রবেশ করাতে হবে। এসব কিছুতে জীবাণুনাশক পদার্থ স্প্রে করে জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
  • ৭. খামারের ভেতর যারা থাকবে বা প্রবেশ করবে তাদের পরিধেয় সবকিছু জীবাণুমুক্ত হতে হবে।
  • ৮. মুরগির ঘরের দরজ বìধ রাখতে হবে; যাতে বিড়াল, কুকুর, ইঁদুর, সাপ, বেজি ইত্যাদি প্রবেশ করতে না পারে।
  • ৯. এক খামারের লোক অন্য খামারে গোসল করতে জীবাণুমুক্ত হয়ে প্রবেশ করতে হবে। জীবাণু এক খামার থেকে অন্য খামারে প্রবেশ প্রতিরোধ করতে হবে।
  • ১০. খামারের কর্মীদের বন্যপাখির দোকানে খাওয়া যাবে না।
  • ১১. খামার পরিত্যাগের সময় খামারের বস্ত্রাদি পরিবর্তন করে হাত-পা ভালোভাবে ধুতে হবে।
  • ১২. প্রতিটি শেডের সামনে পা ধোয়ার জীবাণুমুক্তকরণ তরল পদার্থ রাখতে হবে। শেডে প্রবেশের সময় পা জীবাণুমুক্ত করে প্রবেশ করতে হবে।
  • ১৩. পশুসম্পদ অধিদফতরের অনুমতি ছাড়া বিদেশ থেকে মুরগির বাচ্চা, ডিম, খাদ্য ও সরঞ্জামাদি আমদানি নিষেধ।
  • ১৪. দেশের ভেতর থেকে বাচ্চা সংগ্রহের আগে নিশ্চিত হতে হবে, ওই খামারের গত এক বছরে কোনো রোগ দেখা দিয়েছে কি না।
  • ১৫. অতিথি পাখি খামারের আশপাশে বা ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না। খামারের কর্মীদেরও অতিথি পাখির কাছে যাওয়া যাবে না। কারণ শীতকালে বিভিন্ন দেশে থেকে এ দেশে অতিথি পাখি আসে। পাখিগুলো বিভিন্ন রোগের জীবাণু বহন করতে পারে।
  • ১৬. কোনো হাঁস-মুরগি অসুস্খ হলে বা মারা গেলে সাথে সাথে জেলা বা উপজেলা পশু চিকিৎসা কেন্দ্রে জানাতে হবে।
  • ১৭. মৃত মুরগি মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে।
  • ১৮. খামারে প্রবেশ ও বাইরে যাওয়ার জন্য একটিমাত্র পথ চালু থাকবে।
  • ১৯. মুরগি ও ডিম বিক্রি করে খাঁচা, সরঞ্জামাদি ও যানবাহন পরিষ্কার করে জীবাণুমুক্ত করে খামারে প্রবেশ করতে হবে। কারণ যেখানে মুরগি ও ডিম বিক্রি করা হবে, সেখানে অন্য মুরগি থেকে জীবাণু আসতে পারে।
  • ২০. অবিক্রীত মুরগি ও ডিম খামারের ভেতর নেয়া যাবে না।
  • ২১. হাঁস-মুরগিকে সময়মতো সব রোগের টিকা দিতে হবে।
  • ২২. মুরগি, হাঁস, পায় ও অন্যান্য পাখি একত্রে পালন করা যাবে না।
  • ২৩. অতিথি পাখি শিকার বìধ করা, বিক্রি বìধ করা এবং অতিথি পাখির কাছে যাওয়া নিষেধ।
  • ২৪. বাড়িতে পালার জন্য বাজার থেকে কেনা মুরগি অন্তত ১৫ দিন আলাদা রেখে তারপর বাড়িতে মুরগির সাথে রাখতে হবে।
  • ২৫. খামারের ভেতরে প্রবেশের সময় জীবাণুমুক্ত গ্লাভস, গামবুট, মাস্ক, টুপি ও এপ্রোন ব্যবহার করতে হবে।
  • ২৬. এক শেডের যন্ত্রপাতি বা ব্যবহার্য জিনিসপত্র অন্য শেডে ব্যবহার করা যাবে না।
  • ২৭. রোগাক্রান্ত হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা, ময়লা, বর্জ্য মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে।
  • ২৮. শেডের লিটার ঘন ঘন পরিবর্তন করতে হবে এবং শুকনা রাখার ব্যবস্খা করতে হবে।
  • ২৯. মুরগির ঘরে কাজ করার সময় ভেতর থেকে দরজা বìধ রাখতে হবে।
  • ৩০. মুরগির মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ দেখা দিলে পশু হাসপাতালে জানাতে হবে। অস্বাভাবিক আচরণের মধ্যে রয়েছে মুরগি পরপর দু’দিন ২০ শতাংশ হারে জল ও খাদ্য কম খেলে এবং ডিম উৎপাদন পর পর দু’দিন ২০ শতাংশ হারে কমলে।
  • ৩১. লেয়ার মুরগির বিষ্ঠা প্রতিদিন পরিষ্কার করতে হবে।
  • ৩২. প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে সুষম ও টাটকা খাদ্য সরবরাহ করতে হবে।
  • ৩৩. জীবাণুনাশক হিসেবে সাবান, ডিটারজেন্ট, ভিরকন, ফার্ম ফ্লুইড ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে।

সুত্র: বিকাশপিডিয়া পোর্টাল টিম, পশ্চিমবঙ্গ

3.01219512195
মন্তব্য যোগ করুন

(ওপরের বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন মন্তব্য / পরামর্শ থাকে, তাহলে দয়া করে আমাদের উদ্দেশ্যে পোস্ট করুন).

Enter the word
Back to top