ভাগ করে নিন
ভিউজ্
  • অবস্থা সম্পাদনার জন্য উন্মুক্ত

মাস ও মুগ কলাইয়ের রোগ নিয়ন্ত্রণ

কোন ধরনের রোগ কী ভাবে ঠেকানো যায় সে সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে এখানে।

হলুদ মোজাইক (Yellow mosaic) রোগ

রোগের কারণ

ইয়েলো মোজাইক ভাইরাস (Yellow mosaic virus)-এর আক্রমনে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার

আর্দ্র আবহাওয়ায় রোগাক্রান্ত বিকল্প পোষক হতে পোকা (সাদা মাছি) ও কৃষি যন্ত্রপাতির মাধ্যমে এ রোগ সুস্থ গাছে বিস্তার লাভ করে।

রোগের লক্ষণ

  • গাছের বৃদ্ধির যে কোন পর্যায়ে এ রোগ হতে পারে।
  • পাতায় হলুদ ও গাঢ় সবুজ রঙের মোজাইকের মত দাগ পড়ে।
  • এ দাগ পরে চতুর্দিকে অগ্রসর হতে থাকে, ফলে সমস্ত পাতা হলুদ হয়ে যায়।
  • দূর থেকে মাঠকে হলদে মনে হয়।
  • আক্রমণের মাত্রা বেশী হলে পাতা, ফুল ও ফল ছোট হয় এবং কুকড়ে যায়।
  • ফলে ফলন অনেক কম হয়।

চিত্র:মাস ও মুগ কলাইয়ের ইয়েলো মোজাইক ভাইরাস রোগের লক্ষণ

রোগের প্রতিকার

  • রোগমুক্ত গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে।
  • রোগ সহনশীল জাত যেমন- বারি মুগ ৫, ৬, ৭ ও ৮ এবং বারিমাস ৩ চাষ করতে হবে।
  • প্রাথমিক অবস্থায় আক্রান্ত গাছ তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
  • টিস্যু কালচার (Tissue culture) এর মাধ্যমে ভাইরাস মুক্ত বীজ উৎপাদন করতে হবে।
  • রোগের বাহক পোকা (সাদা মাছি) দমনের জন্য
    • ক) প্রতি লিটার পানিতে ৫ মিলি নিম তেল ও ৫ মিলি ট্রিক্স মিশিয়ে ৭ দিন পর পর ৩-৫ বার স্প্রে করতে হবে।
    • খ) ইমিডাক্লোপ্রিড (যেমন-অ্যাডমায়ার/ইমিটাফ) প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি অথবা ম্যালাথিয়ন ৫০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ১.৫ মিলি হারে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।

সারকোস্পোরা পাতায় দাগ (Leaf spot) রোগ

রোগের কারণ

সারকোস্পোরা ক্রুয়েন্টা (Cercospora cruenta) নামক ছত্রাকের আক্রমনে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার

গাছের পরিত্যক্ত অংশ হতে রোগের জীবানু বায়ু, পানি প্রভৃতির মাধ্যমে এক জমি হতে অন্য জমি অথবা এক গাছ হতে অন্য গাছে ছড়ায়। ৬০%-এর বেশী আর্দ্রতা ও ২৮ ডিগ্রি সেঃ তাপমাত্রায় এ রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পায়।

রোগের লক্ষণ

  • প্রথমে পাতার উপর পানি ভেজা দাগ পড়ে।
  • পরবর্তীতে দাগটি ধূসর কেন্দ্র বিশিষ্ট হয় এবং কেন্দ্রের চারিদিকে খয়েরী বা লালচে বাদামী রং ধারণ করে।
  • অনেকগুলো দাগ একত্রিত হয়ে পাতার উপর বড় আকারের দাগ সৃষ্টি হয়।
  • পরে আক্রান্ত অংশের কোষ সমূহ শুকিয়ে যায় ও দাগের মাঝখানে ছিদ্র হয়ে যায়।
  • আক্রমনের মাত্রা বেশী হলে সম্পূর্ণ পাতাই ঝলসে যায়।
  • এই প্রকার দাগ ফলেও দেখা যায়।

চিত্র: মাস ও মুগ কলাইয়ের পাতায় দাগ রোগের লক্ষণ

রোগের প্রতিকার

  • রোগ প্রতিরোধী জাত যেমন- বারি মুগ ৫, ৬, ৭ ও ৮ এবং বারিমাস ৩ চাষ করতে হবে।
  • কার্বেন্ডাজিম (যেমন-অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম (যেমন-প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে শোধন করতে হবে।
  • রোগমুক্ত গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে।
  • ফসল সংগ্রহের পর আক্রান্ত গাছের অবশিষ্টাংশ এবং আর্বজনা পুড়ে ফেলতে হবে।
  • রোগের প্রাথমিক অবস্থায় কার্বেন্ডাজিম (যেমন-অটোস্টিন) প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।

সাদা গুড়া বা পাউডারী মিলডিউ (Powdery mildew) রোগ

রোগের কারণ

ইরাইসিফি পলিগণি (Erysiphe polygoni) নামক ছত্রাকের আক্রমনে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার

সাধারনত শীতের শেষের দিকে এ রোগ হয়ে থাকে। আক্রান্ত বীজ, বিকল্প পোষক ও বাতাসের মাধ্যমে এ রোগ বিস্তার লাভ করে থাকে। গাছ ঘন থাকলে ও শুষ্ক আবহাওয়া বা ৫০-৬০% বাতাসের আর্দ্রতায় এ রোগ দ্রুত বৃদ্ধি পায় ।

রোগের লক্ষণ

  • গাছের পাতার পৃষ্ঠীয়দেশে এ রোগের আক্রমন দেখা যায়।
  • পাতায় ছোট ছোট সাদা পাউডারের মত দাগ দেখা যায়।
  • পরে সমস্ত পাতাই সাদা রঙের পাউডার দ্বারা ঢেকে ফেলে। এই সাদা পাউডারগুলোই ছত্রাকের স্পোর।
  • আক্রান্ত পাতা ঝরেও পড়তে পারে।
  • রোগের প্রকোপ বেশী হলে সমস্ত গাছ (শাখা, কান্ড ও ফল) আক্রান্ত হয় এবং মারা যায়।

চিত্র: মাস ও মুগ কলাইয়ের পাউডারী মিলডিউ রোগের লক্ষণ

রোগের প্রতিকার

  • রোগমুক্ত গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে।
  • রোগ সহনশীল জাত যেমন- বারি মুগ ৫, ৬, ৭ ও ৮ এবং বারিমাস ৩ চাষ করতে হবে।
  • ফসল সংগ্রহের পর অবশিষ্টাংশ এবং আর্বজনা পুড়ে ফেলতে হবে।
  • কার্বেন্ডাজিম (যেমন-অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম (যেমন-প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে শোধন করতে হবে।
  • সুষম সার ব্যবহার ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • পানি স্প্রে করলেও রোগের প্রকোপ কমে যায়।
  • রোগ দেখা মাত্রই সালফার জাতীয় ছত্রাকনাশক (যেমন-থিয়োভিট ৮০ ডব্লিউজি বা কুমুলাস ডিএফ) ১ লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে অথবা প্রোপিকোনাজোল (যেমন-টিল্ট ২৫০ ইসি) ১ লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।

পাতা পচাঁ বা হোয়াইট মোল্ড (Leaf rot or White mold) রোগ

রোগের কারণ

স্কেরোটিনিয়া স্কেরোশিওরাম (Sclerotinia sclerotiorum) নামক ছত্রাকের আক্রমনে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার

আক্রান্ত গাছের উপর ছত্রাক ক্লেরোশিয়াম তৈরি করে। ক্লেরোশিয়াম মাটির সাথে মিশে মাটিতে থেকে যায়। উপযুক্ত আবহাওয়ায় ইহা অংকুরিত হয়ে এসকোকার্প তৈরি করে। পরিপক্ক এসকোকার্প বিস্ফোরিত হয়ে এস্কোস্পোর নিক্ষেপ করে যা শস্যকে আক্রমন করে।

রোগের লক্ষণ

  • প্রথমে পাতার উপর পানি ভেজা দাগের সৃষ্টি হয়।
  • উষ্ণ ও মেঘলা আবহাওয়ায় দাগ সম্পূর্ণ পাতায় ছড়িয়ে পরে।
  • পরে পাতা শুকিয়ে বাদামী রঙ ধারণ করে।
  • ফল ও কান্ডেও আক্রমন করে।
  • আক্রান্ত পাতা, ফল ও কান্ডে সাদা মাইসিলিয়াম এবং বিভিনড়ব আকারের স্কেরোশিয়াম দেখা যায়।

চিত্র: মাস ও মুগ কলাইয়ের পাতা পচাঁ বা হোয়াইট মোল্ড রোগের লক্ষণ

রোগের প্রতিকার

  • ফসল সংগ্রহের পর গাছের অবশিষ্টাংশ ও আর্বজনা পুড়ে ফেলতে হবে।
  • শস্য পরিক্রমা অনুসরণ করতে হবে।
  • কার্বেন্ডাজিম (যেমন-অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম (যেমন-প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে শোধন করতে হবে।
  • জৈবিক দমনের ক্ষেত্রে ট্রাইকোডারমা বা রাইজোবিয়াম জীবানু সার দ্বারা বীজ শোধন করতে হবে।
  • অর্ধকাচা মুরগির বিষ্ঠা হেক্টর প্রতি ৫ টন হারে বীজ বপনের ২-৩ সপ্তাহ আগে জমিতে প্রয়োগ করতে হবে।
  • কার্বেন্ডাজিম (যেমন-অটোস্টিন) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর গাছের গোড়াসহ সমস্ত গাছে ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।

ঢলে পড়া/গোড়া ও শিকড় পচাঁ/স্ক্লেরোশিয়াম রট (Wilt/Foot and Root rot/Sclerotium rot) রোগ

রোগের কারণ

ফিউজারিয়াম অক্সিসপোরাম (Fusarium oxysporum), ফিউজারিয়াম ছোলানি (F. solani) এবং স্ক্লেরোশিয়াম রফ্সাই (Sclerotium rolfsii) নামক ছত্রাকের আক্রমনে এ রোগ হয়ে থাকে।

রোগের বিস্তার

ছত্রাক গুলো প্রধানত মাটি বাহিত এবং অন্যান্য শস্যকে আক্রমণ করে। মাটিতে জৈব সার বেশী থাকলে এবং জমিতে ফসলের খড়কুটা থাকলে রোগের বিস্তার বেশী ঘটে। সাধারণত মাটির তাপমাত্রা (২৮ - ৩০ ডিগ্রী সেঃ) বৃদ্ধি পেলে ও যথেষ্ট পরিমাণ আর্দ্রতা থাকলে এ রোগের ব্যাপকতা বৃদ্ধি পায়। পানি সেচের মাধ্যমে আক্রান্ত ফসলের জমি হতে সুস্থ ফসলের মাঠে বিস্তার লাভ করে।

রোগের লক্ষণ

  • সাধারণত চারা গাছ এ রোগে আক্রান্ত হয়, তবে বড় গাছেও হতে পারে।
  • মাটি বরাবর ক্ষতের সৃষ্টি হয় এবং গোড়া সহ শিকড় পচেঁ যায়।
  • গাছের অগ্রভাগের পাতা হলুদ হয়ে যায়, পরে সমস্ত গাছ হলুদ বর্ণ ধারণ করে।
  • হলুদ চারাগুলো শুকিয়ে মারা যায়। স্ক্লেরোশিয়াম রফ্সাই দ্বারা দ্বারা আক্রান্ত গাছের গোড়ায় তুলার মত সাদা মাইসেলিয়া ও ছোট ছোট স্ক্লেরোশিয়াম দেখা যায়।
  • ফিউজারিয়াম-এর ক্ষেত্রে গাছের কান্ড লম্বালম্বিভাবে ফাটালে ভিতরের অংশ কালো দেখায়।

চিত্র: মাস ও মুগ কলাইয়ের ঢলে পড়া/গোড়া ও শিকড় পচাঁ/স্ক্লেরোশিয়াম রট রোগের লক্ষণ

রোগের প্রতিকার

  • কার্বেন্ডাজিম (যেমন-অটোস্টিন) অথবা কার্বোক্সিন + থিরাম (যেমন-প্রোভ্যাক্স ২০০ ডব্লিউপি) প্রতি কেজি বীজে ২.৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে শোধন করতে হবে।
  • জৈবিক দমনের ক্ষেত্রে ট্রাইকোডারমা বা রাইজোবিয়াম জীবানু সার দ্বারা বীজ শোধন করতে হবে।
  • অর্ধকাচা মুরগির বিষ্ঠা হেক্টর প্রতি ৫ টন হারে বীজ বপনের ২-৩ সপ্তাহ আগে জমিতে প্রয়োগ করতে হবে।
  • রোগাক্রান্ত গাছ তুলে এবং ফসল সংগ্রহের পর পরিত্যক্ত অংশ পুড়িয়ে ফেলতে হবে।
  • আক্রান্ত জমিতে কয়েক বৎসরের জন্য শস্য পরিক্রমা অনুসরণ করতে হবে।
  • ফসলের গোড়ার চতুর্দিকের মাটি নেড়ে শুষ্ক করে দিলে এ রোগ অনেকাংশে দমন হয়।
  • রোগ দেখা মাত্র কার্বেন্ডাজিম (যেমন-অটোস্টিন) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ৭-১০ দিন পর পর গাছের গোড়ায় মাটিতে ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।

সূত্র ও লেখকঃ বিজ্ঞানী ড. কে. এম. খালেকুজ্জামান

2.91666666667
মন্তব্য যোগ করুন

(ওপরের বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন মন্তব্য / পরামর্শ থাকে, তাহলে দয়া করে আমাদের উদ্দেশ্যে পোস্ট করুন).

Enter the word
ন্যাভিগেশন
Back to top