হোম / কৃষি / মৎস্য চাষ / মাছ ও মাছ চাষের খুঁটিনাটি / আদর্শ মজুত পুকুরে মাছ চাষ
ভাগ করে নিন
ভিউজ্
  • অবস্থা সম্পাদনার জন্য উন্মুক্ত

আদর্শ মজুত পুকুরে মাছ চাষ

প্রথার তারতম্য অনুসারে মজুত পুকুরে মাছ চাষকে একক, মিশ্র এবং কম্পোজিট মাছ চাষ বলা হয়।

প্রকারভেদ

যে পুকুরে ছোট মাছ, সাধারণত চারা পোনা বা আঙুলে মাছের বাচ্চা, ছেড়ে তাদের স্বাস্থ্যরক্ষা ও বৃদ্ধির জন্য পরিবেশ সৃষ্টি করা ও খাদ্য সরবরাহ করা হয়, তাকেই মজুত পুকুর বা স্টকিং পন্ড বলা হয়। অনেক সময় ধানিপোনা ছেড়েও তাদের বড় করা হয়।

মজুত পুকুরে মাছ চাষের উদ্দেশ্য হল সুস্থ পরিবেশে তাড়াতাড়ি মাছের বাচ্চার বৃদ্ধি ঘটানো। অর্থনৈতিক মাপকাটিতে লাভজনক, সামাজিক চাহিদার উপযুক্ত, পরিবেশ ও কানুনকে মাথায় রেখে বৃদ্ধির পর মাছগুলিকে বাজারজাত করা হয়। বিভিন্ন বয়সের এবং ওজনের প্রয়োজন অনুসারে বাজারজাত করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন প্রকারের মাছও মজুত পুকুরে বড় করা হয়ে থাকে।

প্রথার তারতম্য অনুসারে মজুত পুকুরে মাছ চাষকে একক, মিশ্র এবং কম্পোজিট এই তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যখন কোনও পুকুরে একই জাতীয় মাছ চাষ করা হয় তখন সেই প্রথাকে একক মাছ চাষ বলে। এটি একটি পুরাতন প্রথা। ধরা যাক যে পকুরে কাতলা মাছের চাষ হবে সেখানে আর কোনও জাতের মাছ থাকবে না। মৃগেল, রুই বা গ্রাস কার্প, সিলভার কার্প অথবা তেলাপিয়া বা মাগুর যা-ই হোক না কেন, তার একক চাষ হতে পারে। এই প্রথায় রুই, কাতলা অথবা মৃগেল বিঘায় ৫০০ – ৭০০ বা প্রতি হেক্টরে ৩৭৫০ – ৫২০০টি এবং তেলাপিয়া বা মাগুর ওই সংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ চাষ হয়ে থাকে। তবে এই চাষ খুব বিজ্ঞানসম্মত নয়। কারণ অন্যান্য সকলের মতো মাছেরও নানা প্রজাতির চরিত্র-চাহিদা-অভ্যাস ভিন্ন ভিন্ন, তাই একই প্রকার মাছের চাষে পুকুরের সমস্ত প্রাকৃতিক ও প্রদত্ত সম্পদ যা মাছেদের প্রয়োজন সেগুলির সুষ্ঠু বন্টন বা ব্যবহার হয় না। ফলে জলাশয়ের এক ধরনের খাবার ও অন্যান্য সুবিধা একই জলস্তর থেকে যখন নিঃশেষিত হবে, তখন অন্য দিকে অন্য সুবিধাগুলি অন্য জল স্তরে অব্যবহৃত বা অপব্যবহৃত হবে বা নষ্ট হবে। এই পদ্ধতিতে এক রকম মাছ থাকার ফলে মাছের রোগ-পোকা বৃদ্ধি হয়, মাছের শ্বাসকষ্ট হয় ও বৃদ্ধিও কম দেখা যায়। মূল লক্ষ্য যেটা সেই উৎপাদনও বিঘ্নিত হয়। তাই মাছের মিশ্র চাষ সব দিক থেকেই অনেক ভাল ও উৎপাদনশীল।

মিশ্র মাছ চাষ

জলাশয়ের পারিপার্শ্বিক প্রাকৃতিক যে সকল সুবিধা মাছ চাষে পাওয়া যায় এবং জলের প্রাকৃতিক ও প্রদত্ত সম্পদ যা মাছের খাদ্য ও জীবনের অন্যান্য সুখসুবিধার জন্য প্রয়োজন সেগুলির সুষ্টু বন্টন ও সদ্ব্যবহার হবে যদি বিভিন্ন জাতের মাছ চাষ করা হয়। বিভিন্ন জাতের এই মাছ চাষকে মিশ্র চাষ বলে।

মিশ্র চাষে আমরা সে দিন অবধিও রুই কাতলা ও মৃগেল মাছের চাষ করতাম। কারণ বাজারে এই তিন প্রকার মাছের চাহিদা প্রায় একই রকম। কিন্তু এই তিনটি প্রজাতির খাদ্যাভ্যাস, বসবাস, আচার-আচরণ অনেকটাই ভিন্ন। রুই মাছ পুকুরের মধ্য জলস্তরে বিচরণ করে। ছোট অবস্থায় এরা জুপ্লাঙ্কটন বা প্রাণীকণা খায়। বড় হলে অর্থাৎ চারাপোনার পর থেকে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন বা উদ্ভিদকণা, প্রাণীকণা, জলজ উদ্ভিদের নরম পাতা, পচা গলা উদ্ভিদের অংশ ইত্যাদি খায়। কাতলা মাছ, মৃগেল মাছ পুকুরের উপরের জলস্তরে থাকে। ছোট অবস্থায় প্রাণীকণা খায় কিন্তু বড় হলে উদ্ভিদকণা, প্রাণীকণা, শ্যাওলা, প্রদত্ত খাবার ইত্যাদি খায়। মৃগেল মাছ পুকুরের তলদেশে থাকে। ছোট অবস্থায় প্রাণীকণা খায়। বড় হলে উদ্ভিদকণা, প্রাণীকণা, শ্যাওলা, পচাগলা প্রদত্ত খাবারের সঙ্গে নরম কাদামাটিও খায়। এই ভিন্নতাকে কাজে লাগিয়ে এই প্রথায় মাছ চাষ করে, জলাশয়ের ও মাছের যথাসম্ভব সুযোগসুবিধার ব্যবস্থা করা হত, এখনও হয়। ফলে জলের সমস্ত স্তরের খাবার ও প্রাকৃতিক সুযোগসুবিধা তাদের প্রয়োজনমতো নিতে নিজের প্রজাতির মধ্যে হলেও ভিন্ন প্রজাতির মধ্যে হয় না। এই জন্য একই আয়তনের পুকুরে বা একই ঘনত্বের জলাশয়ে এক প্রজাতির মাছ অধিকতম যে সংখ্যায় করা সম্ভব মিশ্র চাষে সর্বমোট সংখ্যা তার প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে এবং সেই অনুপাতে ফলনও। এই প্রথায় কাতলা : রুই : মৃগেল (৪ : ৩ : ৩ ) হারে বিঘা প্রতি ৯০০ – ১৬০০ বা হেক্টর প্রতি ৬৭৫০ – ১২০০০টি চারা মাছ ছাড়া হয়ে থাকে। আমরা প্রায়শই আমাদের পুকুরে এই ধরনের মাছের সাথে ছোট জাতের অথচ খুব সুস্বাদু মাছ যেমন — বাটা, সরপুঁটি, জাপানি পুঁটি, মৌরালা, চিংড়ি, গলদা চিংড়ি ইত্যাদি মাছের চাষ করে থাকি। সে ক্ষেত্রে আমরা বড় জাতের মাছের অনুপাত বা সংখ্যা একই রকম রেখে অল্প অল্প অন্যান্য ছোট জাতের ছাড়তে পারি --- কখনও বা বড় জাতের মাছের সংখ্যা ঈষৎ কমানো হয়। প্রয়োজনে মাঝে মধ্যে জাল টেনে কিছু কিছু মাছ নিজেদের জন্য বা বাজারজাত করার জন্য ধরা যেতে পারে।

ক্রমান্বয়ে মাছ আহরণ পদ্ধতি

আমাদের অনেক সময় কিছু সামাজিক সমস্যা থাকায় আমরা অনেক ক্ষেত্রে মাছ খুব বড় করতে পারি না। এ ছাড়া বাজারে ছোট জ্যান্ত টাটকা মাছের চাহিদাও আছে খুব। এই সব কথা মাথায় রেখে পর্যায়ক্রমে বারংবার ছোট (১৫০ – ৩০০ গ্রাম ওজনের) মাছ ধরে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী সুবিধামতো বিক্রি করা আজকাল একটা লাভজনক মাছ চাষ পদ্ধতি। এই পদ্ধতি লাভজনক। সেই সাথে চাষির প্রয়োজনমতো ঘন ঘন টাকা উপায়ও হয়ে থাকে। সাধারণ চাষে মাছের চারা ছাড়ার পরে মাছ বড় হলে এক সাথে মাছ ধরে, বাজারে পাঠানো হয়ে থাকে। কিন্তু এই পদ্ধতিতে রুই, কাতলা ও মৃগেল / রুই - গ্রাস কার্প / কাতলা – সিলভার কার্প / মৃগেল – সাইপ্রিনাস কার্প অথবা প্রয়োজনে এদের সাথে অন্য ছোট জাতের মাছও তাদের অনুপাত অনুযায়ী একটু অধিক সংখ্যায় মাছের চারা পুকুরে প্রয়োগ করা হয় (১৫ – ৫০ গ্রাম ওজনের বড় জাতের মাছ )। পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার প্রয়োগ করা হয়, সজাগ দৃষ্টি রাখা হয় যেন কোনও রকম দূষণ না হয়। এর পর জলাশয় থেকে নিজের আর্থিক প্রয়োজনমতো এবং বাজারের চাহিদা অনুযায়ী (১৫০ – ৩০০ গ্রাম ওজনের মাছ থেকে শুরু) মাছ ধরে বাজারজাত করা হয়। প্রতি বার মাছ ধরার সময় সমসংখ্যক চারাপোনা (১৫ – ৫০ গ্রাম ওজনের অন্য জলাশয়ের) জোগাড় করে ছাড়া হয়। এই পদ্ধতি চলতে থাকে।

নিবিড় বা কম্পোজিট মাছ চাষ

রুই, কাতলা, মৃগেল মাছ পুকুরে তার অনুপাত ও যথাসম্ভব সংখ্যা বজায় রেখে তাদের প্রয়োজনীয় খাবার ও পরিবেশের ব্যবস্থা করে বছরে বিঘাপ্রতি ১০০ থেকে ১৪০ কেজি (হেক্টরে ৭৫০ থেকে ১০৫০ কেজি) মাছ বছরে পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমানে রুই, কাতলা, মৃগেলের সাথে গ্রাস কার্প, সিলভার কার্প ও সাইপ্রিনাস কার্প এক সাথে চাষ করে দেখা গেছে এই উৎপাদন আরও কিছু বাড়ানো যায় (শতকরা ১০ – ৩৫ ভাগ ) এই পদ্ধতি কম্পোজিট ফিশ কালচার নামে পরিচিত। এই চাষে জলাশয়ের সমস্ত অংশের খাবার ও প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্টু ব্যবহার হয়। এই চাষের বৈশিষ্ট্য হল ---

  • ১) কাতলা ও সিলভার কার্প উভয়েই জলের উপরের স্তরের মাছ। কিন্তু এদের উভয়ের মধ্যে খাদ্যাভ্যাসে সামান্য পার্থক্য লক্ষ করা গেছে। অনেকগুলো রেকারযুক্ত ফুলকা সিলভার কার্পকে প্রধানত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্ভিদকণা গ্রহণ করতে সাহায্য করে। কাতলা মাছের ফুলকার ভিতরের গঠন প্রাণীকণা গ্রহণে বেশি উপযোগী। তাই এরা (কাতলা ও সিলভার কার্প ) জলের একই স্তরে থাকলেও খাদ্যের জন্য প্রতিযোগিতা কমই হয়। এ ছাড়া পুকুরের উপরি জলস্তরের অতিরিক্ত উদ্ভিদকণা বা প্রাণীকণা যা অনেক সময় সূর্যালোকের প্রবেশে বাধার সৃষ্টি করে তা-ও দূর হয়।
  • ২) রুই মাছ ও গ্রাস কার্প জলের মধ্য স্তরেই বিচরণ করে। রুই মাছ ছোট অবস্থায় প্রাণীকণা ও বড় হলে উদ্ভিদকণা, জলজ উদ্ভিদের নরম অংশ খায়। গ্রাস কার্পের প্রধান খাদ্য ঝাঁঝি, ঘাস, জলজ উদ্ভিদ ইত্যাদি। তাই এদের মধ্যেও খাবারের জন্য কোনও প্রতিযোগিতা নেই।
  • ৩) মৃগেল ও সাই প্রিনার্স কার্প উভয়েই জলাশয়ের নীচের স্তরের মাছ। জলের নীচের তলায় প্রচুর মৎস্য-খাদ্য থাকে। এই দুই প্রকার মাছই পুকুরের নীচের তলার খাবার ও মাটির সাথে লেগে থাকা মৎস-খাদ্য প্রাণীজ খাদ্য ও জৈব খাদ্য খেয়ে থাকে। সাইপ্রিনাস কার্পের অতিরিক্ত খাদ্যাভাসের জন্য এরা সর্বভুক এবং জলের নীচের স্তরের পচা গলা জৈব পদার্থ খায়। এই ভাবে জলের নীচের স্তরের মৎস্য-খাদ্যের পূর্ণ সদ্ব্যবহার হয়ে থাকে। মোট উৎপাদন বাড়ে।

কাজেই এই ছয় প্রকার মাছ একত্রে চাষ করলে পুকুরে খাদ্য যত জায়গায় সঞ্চিত আছে তা সবই সুষ্ঠু ভাবে ব্যবহৃত হয়। তা ছাড়া এই আপাত নতুন প্রকার মাছগুলির (সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প ও সাইপ্রিনাস কার্প) শারীরিক বৃদ্ধির হারও অপেক্ষাকৃত বেশি। সিলভার কার্প কাতলার চেয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ে। গ্রাস কার্পকে জলজ উদ্ভিদ ঠিকমতো খাওয়াতে পারলে এদের বৃদ্ধি আশাতিরিক্ত হয়। এরা পুকুরের জলজ উদ্ভিদ খেয়ে পুকুরের জলকে শ্যাওলামুক্ত করতে পটু। সাইপ্রিনাস কার্প মৃগেলের চেয়ে অনেক তাড়াতাড়ি বাড়ে। ফলে সর্বমোট উৎপাদন বেশ উল্লেখযোগ্য ভাবেই বাড়ে। তবে সমস্যা যে নেই তা নয়। এই মাছগুলির চাহিদা অপেক্ষাকৃত কম।

মজুত পুকুর নির্বাচন

মজুত পুকুরে বৃদ্ধির জন্য মাছ অনেক দিন ধরে রাখা হয়। একক চাষ, মিশ্র, কম্পোজিট, যে প্রথাতেই হোক না কেন, ছোট আঙুলে মাছ বা চারাপোনা (১৫ গ্রাম থেকে ৩৫ গ্রাম ) ছাড়া হয়ে থাকে। বিরল ক্ষেত্রে ধানিপোনাও ছাড়া হয়। প্রয়োজনভিত্তিক বা পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী এগুলিকে বাড়তে দেওয়া হয়। এক সাথে বা ক্রমান্বয়ে যে ভাবেই হোক না কেন, পুকুরে অনেক দিন ধরে রাখতে হয়। তাই মজুত পুকুরের জন্য সারা বছর জল থাকবে এমন জলাশয়ই আবশ্যক।

প্রয়োজনে পুকুর থেকে জল বের করা বা জল প্রয়োগের ব্যবস্থা থাকলে ভালো। যে হেতু পুকুরে এক সাথে নানা প্রকারের মাছ চাষ করা হয়, জলের গভীরতা ১.৫ মিটার থেকে ২ মিটারের (৪ ফুট থেকে ৬ ফুট) মধ্যে হওয়া বাঞ্ছনীয়। পুকুরের পাড় বেশ উঁচু হওয়া দরকার। জলের উপরিতল থেকে অন্তত ১ মিটার (৩ ফুট) উঁচু হওয়া দরকার। যেন কোনও মতেই অতি বৃষ্টিতেও ভেসে না যায়। পুকুরের তলদেশের মাটি দোআঁশ বা এঁটেল-দোআঁশ হওয়া দরকার। পুরোপুরি বালি বা অতিরিক্ত পাঁক মাছ চাষে বিঘ্ন ঘটায়। পুকুর আয়তাকার এবং আয়তনে ১ বিঘা থেকে ১৫ বিঘা হতে (১০০০ বর্গ মিটার থেকে ১০০০০ বর্গ মিটার) হলে ভালো। পুকুরের চার ধার এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা এমন হওয়া দরকার যেন অবাধে সূর্যকিরণ জলে পড়তে পারে। পুকুরের জলের নিকটবর্তী পাড়ের ক্ষয়রোধের জন্য যেন ঘাস থাকে। পাড়ে ছোট ছোট গাছ লাগানো যেতে পাড়ে কিন্তু জলে ছায়া পড়ে এমন গাছ নয়। নারকেল বা তালগাছ লাগানো যেতে পারে উত্তর ও পশ্চিম দিকে। এরা খুব ছায়া করে না কিন্তু এদের শিকড় পুকুর পাড় সংরক্ষণে সাহায্য করে।

চারাপোনা ছাড়ার আগে মজুত পুকুর পরিচর্যা

জলজ উদ্ভিদ বা আগাছা মুক্ত করা

পুকুরে মাছের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ক্ষতি করে, গ্রাস কার্পের খাদ্য নয় এমন সব জলজ উদ্ভিদ ও শ্যাওলা নিধন করা দরকার। এরা মাছের চলাফেরা ও জীবনধারণে নানা ক্ষতি করতে পারে।

ক্ষতিকারক মাছের নিধন

পুকুরে অনেক মাছ জন্মে বা কোনও ভাবে অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রবেশ করে যারা মাছ চাষে ক্ষতি করে। এরা অন্যদের খাবারে ভাগ বসায়, চলাফেরায় অসুবিধা ঘটায়। অনেক রাক্ষুসে মাছ আছে যারা চাষের মাছকে বিভিন্ন বয়সে খেয়ে ফেলে। এদের নিধন করা দরকার। পুকুরে মহুয়া খোল প্রয়োগ করলে এর বিষক্রিয়ার ফলে সমস্ত আমাছা, ছোট বড় জলজ কীট সব মারা যাবে। বিঘা প্রতি সাধারণত ২০০ – ২৫০ কেজি মহুয়া খোল প্রয়োগ করা হয়।

এই খোলের পরিমাণ নির্ভর করে পুকুরে কতটা জল আছে তার উপর। আসল হিসাব ২৫০ পিপিএম হারে মহুয়া খোল প্রয়োগ করা প্রয়োজন। অর্থাৎ প্রতি লিটার জলে ২৫০ মিলিগ্রাম খৈল। এই খৈলে স্যাপোনিন নামক এক প্রকার রাসায়নিক আছে যা আমাছা বা জলজ কীটের মৃত্যু ঘটায়। এই রাসায়নিকের কার্যক্ষমতা ১০ / ১২ দিন অবধি থাকে। দু’ সপ্তাহ পর ওই জলাশয় মাছের বসবাসের উপযুক্ত হয়ে যায়।

মহুয়া খোল মাছ চাষে নানা ভাবে কাজ করে

  • এটা একটা জৈব পদার্থ -- জৈবিক ক্রিয়ার ফলে জলের প্রাকৃতিক পরিবেশ সুন্দর করে।
  • নিজেই মাছের উপাদেয় ও পুষ্টিকর খাবার।
  • পুকুরে উদ্ভিদকণা ও প্রাণীকণা মাছের জীবনধারণে যার বিশেষ প্রয়োজন, সেগুলির জন্ম, বংশবিস্তার ও বৃদ্ধিতে মহুয়া খোলের ভূমিকা আছে।
  • পুকুরের তলদেশের মাটি ও মাটিতে বসবাসকারী জীবাণুর রক্ষা ও বৃদ্ধিতে সহায়ক।

কিন্তু মহুয়া খোল বেশ ব্যয়সাধ্য। এ ছাড়া মহুয়া খোল প্রয়োগের প্রথমাবস্থায় ক্ষুদ্র প্রাণীর দেহে বিষক্রিয়া ঘটায়। তাই মহুয়া খোল প্রয়োগের কিছু নিয়মবিধি মেনে চলা দরকার।

  • প্রয়োগের প্রথম দু’ সপ্তাহের মধ্যে এর স্যাপোনিনের বিষক্রিয়ার কাল শেষ হয়ে যায়। তাই চারা মাছ এই দু’ সপ্তাহের মধ্যে না ছেড়ে পরে ছাড়তে হবে।
  • বেহিসাবি পরিমাণে এই খোল প্রয়োগের পরিবর্তে পরিমাণমতো প্রয়োগ করতে হবে। মোটামুটি ভাবে বিঘা প্রতি ২০০ – ২৫০ কেজি মহুয়া খোল প্রয়োগ করা হয়। পরীক্ষা করে দেখা গেছে ২৫০ পিপিএম হারে মহুয়া খোল পুকুরের জলে প্রয়োগ করলে আমাদের সকল উদ্দেশ্য সফল হতে পারে। এর অর্থ প্রতি লিটার জলে ২৫০ মিলিগ্রাম মহুয়া খোল প্রয়োগ করা অর্থাৎ প্রতি ১০০ লিটার জলে ২৫০ গ্রাম খোল।

পুকুরে চুন প্রয়োগ

মহুয়া খোল প্রয়োগের ৭ দিন পর বিঘা প্রতি ৩০ – ৪০ কেজি চুন প্রয়োগ করতে হবে।

মজুত পুকুরে সার প্রয়োগ

পুকুরে প্রাকৃতিক খাদ্যকণা তৈরিতে সাহায্যের জন্য উপযুক্ত পরিমাণ জৈব ও অজৈব সার প্রয়োগ দরকার।

  • পুকুরে মহুয়া খোল দেওয়ার পরেও যদি যথেষ্ট পরিমাণে জলজ প্রাকৃতিক মৎস্য-খাদ্য উৎপাদন না হয় তবে বিঘা প্রতি ৫০০ কেজি হারে গোবর প্রয়োগ করতে হবে। যদি মহুয়া খোল প্রয়োগের প্রয়োজন বা প্রয়োগ সম্ভব না হয়ে থাকে তবে গোবরের পরিমাণ বিঘা প্রতি ১০০০ কেজি হবে।
  • পুকুরে জলজ উদ্ভিদকণা কম থাকলে বিঘা প্রতি ৪ – ৫ কেজি ইউরিয়া এবং ৫ – ৬ কেজি সিঙ্গল সুপার ফসফেট প্রয়োগ করা দরকার।

লাভজনক প্রজাতির মাছ নির্বাচন

মাছ চাষে প্রজাতি নির্বাচন করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই নির্বাচন নিজের অর্থনৈতিক দিক, পরিবেশ, উদ্দেশ্য ও প্রয়োজনীয়তার উপর নির্ভরশীল হলেও নীচের বৈশিষ্ট্যগুলি গুরুত্বপূর্ণ।

  • উন্নত মানের, পুষ্টিকর ও সুস্বাদু
  • দ্রুত বৃদ্ধির ক্ষমতাসম্পন্ন
  • প্রাকৃতিক ও পরিপূরক খাদ্য যথেষ্ট পরিমাণে গ্রহণ ও তার সদ্ব্যবহারের ক্ষমতাসম্পন্ন
  • একই সাথে বিভিন্ন প্রজাতির সাথে বসবাসযোগ্য
  • বেশি সংখ্যায় স্বল্প জায়গায় থাকার ক্ষমতা।
  • জলের হঠাৎ ভৌত বা রাসায়নিক পরিবর্তন মানিয়ে চলার ক্ষমতা
  • বাজারে ভাল চাহিদাযুক্ত
  • প্রণোদিত প্রজননে সক্ষম
  • সহজে রোগাক্রান্ত না হওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন
  • জলাশয় পরিষ্কার করার প্রবণতাসম্পন্ন

এই সব দিক বিবেচনা করে বলা যায় রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, সাইপ্রিনাস কার্প, মাগুর, শিঙি ইত্যাদি মাছ চাষ খুবই জনপ্রিয়।

মজুত পুকুরে চারা পোনা ছাড়ার সংখ্যা ও অনুপাত

 

বিঘা প্রতি

সংখ্যা

হেক্টর প্রতি সংখ্যা

অনুপাত

রুই, কাতলা বা মৃগেল একক চাষ (অধুনা প্রায় অপ্রচলিত)

৪০০ – ৭০০

৩০০০ – ৫২০০

 

রুই, কাতলা ও মৃগেল একত্রে (বহুল প্রচলিত )

৯০০ – ১৬০০

৬৭৫০ – ১২০০০

: :

রুই- গ্রাস কার্প, কাতলা – সিলভার কার্প ও মৃগেল – সাইপ্রিনাস কার্প

১০০০ – ১৬০০

৭৫০০ – ১২০০০

: : .: : : ১৫

রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, জাপানি পুঁটি, বাটা ইত্যাদি (সাধারণত কয়েকটি তেলাপিয়া ছাড়া কোনও রাক্ষুসে বা মাংসাশী মাছ শূন্য )

১১০০ – ২০০০

৮২৫০ – ১৫০০০

: : .: : : ১৫

বি.দ্র. : স্থান, কাল পরিবেশ, উদ্দেশ্য, পরিস্তিতি ও প্রয়োজনে এই সংখ্যা পরিবর্তনশীল ও গ্রহণ যোগ্য।

চারা মাছের গুণাগুণ

মাছ চাষের লাভ-লোকসান, ক্ষয়ক্ষতি চারা মাছের গুণাগুণের উপর অনেকটাই নির্ভর করে। নীচের গুণগুলো দেখে নেওয়া দরকার।

  • ১) চারা গুলি ঠিক জাতের / প্রজাতির কি না
  • ২) স্বাস্থ্যবান কি না – স্বাস্থ্যবান মানে বেশ চনমনে, ছটফটে হবে, নিস্তেজ হবে না, সাঁতার কাটার সময় শরীরের সামঞ্জস্য থাকবে।
  • ৩) নিরোগ হবে।

মজুত পুকুরে চারা মাছ পরিবহনের দুই পদ্ধতি

মজুত পুকুরে সাধারণত আঙুলে মাছ বা ফিঙ্গারলিং দৈর্ঘ্যের মাছের বাচ্চা ছাড়া হয় বড় করার জন্য। এই উদ্দেশ্যে ধানিপোনা বা ফ্রাই চারাপোনা (২৫ – ৬০ গ্রাম ওজনের) এবং কখনও কখনও বড় মাছও বাজারজাত করার জন্য মজুত রাখা হয়। তবে মুখ্যত আঙুলে মাছ বা ধানিপোনা ছাড়া হয়।

নিজের খামারে প্রস্তুত মাছের চারা ব্যতীত অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাছের চারা অন্য কোথাও থেকে আমদানি করতে হয়। অনেক দূর থেকে আনতে হয়। গতানুগতিক পদ্ধতিতে নদী নালা সমুদ্রকূল থেকে মাছের ডিম, ডিম পোনা (স্পন) সংগ্রহ করা হত। সেখান থেকে কোনও ডিম ফোটানো হাপা বা লালন পুকুরে রাখা হত। এখন এর সাথে নতুন প্রণোদিত প্রজননের থেকে প্রাপ্ত মাছের বাচ্চা যুক্ত হয়েছে। মাছের ডিমপোনা, ধানিপোনা বা আঙুলে মাছের স্থানান্তর বা পরিবহন নিয়মিত পদ্ধতিতে না করলে মাছ চাষ সম্ভব নয়।

মাছের ডিমপোনার প্রাকৃতিক উৎসস্থল হল নদী এবং কৃত্রিম প্রজননের উৎসস্থল হল বাঁধ ও হ্যাচারি। এদের চাহিদা সর্বত্র। তাই মাছের বীজ উৎসস্থল থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় পরিবহন করা মাছ চাষিদের কাছে একটি সমস্যা।

এ ছাড়া প্রণোদিত প্রজনন ক্ষেত্র থেকেও ডিম, ডিমপোনা, ধানিপোনা বা চারাপোনা বহন করতে হয়। সাধারণত ধানিপোনা আর আঙুলে পোনা বা চারাপোনা মজুত পুকুরে বহন করা হয়। এই কাজ ভীষণ কষ্টসাধ্য এবং অনেক সাবধানতার সঙ্গে করা প্রয়োজন। সাধারণত দু’টি পদ্ধতিতে এই কাজ সম্পন্ন করার প্রথা আছে ---

  • অ্যালুমিনিয়াম হাঁড়িতে
  • এটি একটা গতানুগতিক পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে ডিমপোনা বড় অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়িতে মাথায় বা বাঁকে করে হেঁটে, সাইকেল, ভ্যান রিকশা, বাস, লরি এবং ট্রেনে করে বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করা হয়। একটি হাঁড়িতে কত সংখ্যক ডিমপোনা পরিবহন করা যাবে তা নির্ভর করে হাঁড়ির সাইজ এবং তার মধ্যে থাকা জলের পরিমাণের উপর। সাধারণত ৩০ – ৩৫ লিটার জল ধরে এমন হাঁড়িতে প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার ডিমপোনা পরিবহন করা যেতে পারে। যে হাঁড়িতে ডিমপোনা পরিবহন করা হবে সেই হাঁড়িতে ডিমপোনা সংগ্রহের স্থানের জল অর্ধেক বা তার চেয়ে একটু বেশি ভর্তি করে ৫০ – ৬০ গ্রাম লাল মাটি মিশিয়ে দিয়ে ডিমপোনা পরিবহন করা হয়। হাঁড়ির মুখে একটা গামছা থাকে এবং এই গামছার মধ্যে দিয়ে হাত ঢুকিয়ে জল নাড়াতে হয়, যাতে জলের সঙ্গে অক্সিজেন মিশতে পারে। মাঝে মাঝে হাঁড়ির জল ও মাটি পাল্টাতে হয়। কোনও কারণে মরা মাছ ভেসে উঠলে বুঝতে হবে জলে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেছে। তখন খুব তাড়াতাড়ি জল থেকে মরা মাছ ফেলে দিয়ে হাঁড়ির জল পালটাতে হয়। এই ভাবে হাঁড়িতে করে ডিমপোনা পরিবহন পদ্ধতিতে উন্মুক্ত পদ্ধতি বলে। তবে এই পদ্ধতিতে ডিমপোনা পরিবহণের সমস্যাগুলো হল —

    • ১) পরিবহনের সময় জলের অক্সিজেন খুব তাড়াতাড়ি কমে আসে। তাই মাঝে মাঝে জল বদলাতে হয়।
    • ২) জলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং জলের পিএইচ মাত্রা কমে গিয়ে ডিমপোনার অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
    • ৩) হাঁড়ির মধ্যে অত্যাধিক ডিমপোনার সমাবেশের জন্য ডিমপোনা নষ্ট হয়ে অতিরিক্ত অ্যামোনিয়া গ্যাস সৃষ্টি হয়। ফলে জলের মধ্যে জীবাণুর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় যা ডিমপোনার ক্ষতি করে।
    • ৪) পরিবহন কালে হাঁড়ির সঙ্গে ডিমপোনার ঘর্ষণের ফলে ডিমপোনার ক্ষতি হয়। এই সমস্ত অসুবিধাকর রাসায়নিক পরিবর্তনের ফলে ডিমপোনা অল্প সময়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে এবং ২৫ – ৩০ ভাগ ডিমপোনা মারা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
  • অক্সিজেনপূর্ণ পলিথিন ব্যাগে।
  • বর্তমানে ডিমপোনা অর্ধেক জলভর্তি পলিথিন ব্যাগে অক্সিজেন পূর্ণ করে একটা সাধারণ টিনের মধ্যে ভরে নিয়ে বাসে, ট্রেনে এমনকী বিমান পথেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়। এই পদ্ধতিকে বদ্ধ পদ্ধতি বলে। এই পদ্ধতির মাধ্যমে ডিমপোনা এবং ধানিপোনা পরিবহন করা যায়। পদ্ধতিটি হল —

    • ১) একটি বিশেষ ধরনের পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করা হয় (০.০৬ মিমি পুরু এবং ৮২ সে মি দৈর্ঘ্য ও ৬০ সেমি প্রস্থ বিশিষ্ট)। এই ব্যাগটির ১/৩ থেকে ১/২ অংশ পরিষ্কার জলে ভর্তি করা হয়।
    • ২) একটা ১৫ – ১৬ কেজি তরল পদার্থ ধরে এ রকম খালি টিনের মধ্যে জলপূর্ণ পলিথিন ব্যাগটিকে বসানো হয়। টিনের ঘর্ষণে যাতে পলিথিন ব্যাগের ক্ষতি না হয় সে জন্য টিনের ভিতরে কাগজ বসিয়ে তার পরে পলিথিন ব্যাগ রাখা হয়।
    • ৩) সাধারণত প্রতি ব্যাগে ২৫ হাজার মতো ডিমপোনা ভর্তি করা হয়। ধানিপোনার (১৫ – ২০ মিমি দৈর্ঘ্য) ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ১২০০ থেকে ২০০০-এর বেশি হওয়া উচিত নয়।
    • ৪) জলভরা পলিথিন ব্যাগ ও ডিমপোনা কিংবা ধানিপোনা টিনের মধ্যে বসিয়ে হাত দিয়ে পলিথিন ব্যাগে চাপ দেওয়া হয়, যাতে ব্যাগের ভিতরকার বাতাস বের হয়ে যায়।
    • ৫) পলিথিন ব্যাগের চওড়া মুখ একত্রে একটু ফাঁক করে ধরে অক্সিজেন সিলিন্ডারের চাবি খুলে সরু রবার টিউবের মধ্যে দিয়ে ব্যাগে অক্সিজেন ভর্তি করা হয়। ব্যাগের শূন্যস্থান আস্তে আস্তে অক্সিজনের চাপে ফুলে ওঠে। যতটা অক্সিজেন ব্যাগে ভরা সম্ভব তা করার পর রাবার ব্যান্ড দিয়ে ব্যাগের মুখটিকে ভালো ভাবে বেঁধে দেওয়া হয়, যাতে অক্সিজেন মুখ দিয়ে বেরিয়ে না যায়। এ বার টিনের আধারের ঢাকনা বন্ধ করে প্যাকিং শেষ করা হয়।

    এই পদ্ধতিতে ডিমপোনা বা ধানিপোনার মৃত্যুর হার অনেক কম হয় এবং পরিবহন কালে এক বারও জল পালটাতে হয় না। সাধারণত ২৪ ঘণ্টার মতো সময়ে এই ব্যবস্থায় পরিবহনে মাছের পোনার ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম।

পরিবহনে ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক পদার্থ

মাছকে যখন কোনও পাত্রে জলবন্দি করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পরিবহন করা হয় তখন তাদের বিপাকজাত বর্জ্য পদার্থগুলো ওই জলে জমা হতে থাকে। অ্যামোনিয়া, ইউরিয়া, ইউরিক অ্যাসিড, কার্বন ডাই-অক্সাইড ইত্যাদি হল প্রধান বিপাকজাত পদার্থ এবং এর প্রতিটি ক্ষতিকর। লক্ষ করা গেছে যে জলে ১ পিপিএম অ্যামোনিয়ার ঘনত্ব বাড়লে রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে ১/৭ অংশ কমে যায়। শুধু অক্সিজেন নয়, কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্বও শতকরা ১৫ ভাগ বেড়ে যায় যার ফলে মাছের শ্বাস কষ্ট হয়।

তাই মাছ পরিবহনে হিপনোটিক বা ঘুমপাড়ানি ওষুধ (যেমন সোডিয়াম অ্যামাইটাল ইত্যাদি) ব্যবহার করার ফলে মাছের দেহের শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপ ও বিপাক হার কমে যায়। এর ফলে জলপূর্ণ পরিবহণ পাত্রে বিপাকজাত বর্জ্য পদার্থের পরিমাণ কমে যায় এবং মাছের শ্বাসকষ্ট কম হয়।

মৎস্য দফতরের ক্যাপ্টেন ভেড়ি গবেষণা কেন্দ্রে পরীক্ষা করে দেখা গেছে পরিবহনের সময় ৫ পিপিএম হারে ডিয়াজাপাম গ্রুপের ওষুধ, যেমন ভ্যালিয়াম, ব্যবহার করে ভালো ফল পাওয়া যায়।

মাছের চারা ছাড়া ও পরিচর্যা

পছন্দমতো প্রজাতি ও প্রয়োজনমতো সংখ্যার সুস্থ ও সবল মাছের বাচ্চা (ধানি বা আঙুলে) তার উৎসস্থল (প্রাকৃতিক বা প্রণোদিত) থেকে যথাসম্ভব সাবধানতার সঙ্গে বহন করে পুকুর প্রান্তে আনা হয়। এর পর পাত্রের জল পরিবর্তন করা হয়। এই জল সাধারণ উষ্ণতার হয়ে থাকে। অনেক ক্ষণ এই অবস্থায় রাখার পর মাছগুলিকে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট দ্রবণে (প্রতি মিটার সাধারণ জলে ১ মিলি লিটার পটাশিয়াম পার ম্যাঙ্গানেট) ১ মিনিট কাল রাখার পর পুকুরের জলে সরাসরি না ছেড়ে প্রথমে পাত্রসমেত পুকুরের জলের উপর অনেকক্ষণ রাখা হয় যাতে পুকুরের জলের উষ্ণতার ও পরিবেশের সঙ্গে ধাতস্ত হতে পারে। এই সময় মাছেরা আস্তে আস্তে পাত্রের জল ত্যাগ করে পুকুরের জলে মিশে যায়।

পুকুরে চারাপোনা ছাড়ার পর পরিচর্যা

করণীয় কাজগুলো হল —

  • ১) সার প্রয়োগ : সার প্রয়োগের মাত্রা সব পুকুরে এক রকম নয়, সে জন্য সার প্রয়োগের আগে জল ও মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে নিলে ভালো হয়। সেই সঙ্গে পুকুরে উৎপন্ন প্রাকৃতিক খাদ্যের পরিমাণ কতটা, তার উপরও সার প্রয়োগ নির্ভর করে। এর জন্য সেচি ডিস্ক ব্যবহার করে জলের স্বচ্ছতা নির্ণয় করে সার প্রয়োগ করা উচিত। সাধারণত পুকুরে চারাপোনা ছাড়ার পর ১৫ দিন অন্তর অজৈব ও জৈব সার ব্যবহার করা হয়। পুকুরে প্রতি মাসে বিঘা প্রতি ইউরিয়া ৪ – ৫ কেজি ও সিঙ্গল সুপার ফসফেট ৫ – ৬ কেজি এবং গোবর ১০০ কেজি প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। পুকুরে জলের রং যদি ঘন সবুজ বা হলতে বাদামি হয় এবং জলের স্বচ্ছতা যদি ২৫ সেন্টিমিটারের নীচে নেমে আসে তবে অজৈব সার প্রয়োগ না করাই ভাল।
  • কারণ এতে পুকুরে শৈবাল আধিক্য হয়ে পুকুরের পরিবেশ নষ্ট করবে। পুকুরের পরিপূরক খাদ্য ব্যবহার করা হলে এর কিছু অংশ নষ্ট হয়ে পচে পুকুরে সারের কাজ করে। তাই পুকুরে ৫ – ৬ মাস মাছ চাষের পর সার প্রয়োগের মাত্রার উপর নজর দিতে হবে। সারের সুফল ভালো ভাবে পেতে হলে উদ্ভিদকণা ও প্রাণীকণার জীবনচক্রের উপর ভিত্তি করে এবং সেচি ডিস্কের দ্বারা জলের স্বচ্ছতা নির্ণয় করে ৭ – ১০ দিন অন্তর খুব হালকা মাত্রায় সার প্রয়োগ করা উচিত। কিন্তু এটা পুরোপুরি নির্ভর করে চাষির অভিজ্ঞতার উপর।

  • ২) চুন প্রয়োগ : প্রতি সপ্তাহে পুকুরের পিএইচ দেখে চুন প্রয়োগ করা ভালো। সাধারণত মাসে বিঘা প্রতি ৫ – ১০ কেজি হারে চুন ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সার প্রয়োগের ২ – ৩ দিন আগে এক বার চুন প্রয়োগ করে পুকুরের অ্যালকালিনিটির মাত্রা বাড়িয়ে নিলে সারের সুফল তাড়াতাড়ি আসে। চুন প্রয়োগের পর জাল টেনে চুন ঘেঁটে দিলে ভালো হয়।
  • ৩) জাল টানা : ১৫ দিন অন্তর এক বার করে জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে এবং সংগৃহীত মাছকে লবণ জলে কয়েক সেকেন্ড ডুবিয়ে আবার পুকুরে ছেড়ে দিতে হয়। জাল টানার ফলে মাছের ব্যায়ম হয়।

পরিপূরক খাদ্য পরিবেশন

পুকুরে মাছের বৃদ্ধি দ্রুত করার জন্য প্রত্যহ পরিপুরক খাদ্য প্রয়োগ করতে হয়। চালের কুঁড়োর সঙ্গে সরষে, বাদাম, তিলের মধ্যে যে কোনও এক প্রকার খোল সমান পরিমাণে মিশিয়ে মাছের খাদ্য তৈরি করা হয়। সাধারণত সরষের খোল ও চালের কুঁড়ো সমহারে (১ : ১ অনুপাতে ) মিশিয়ে ব্যবহার করা হয়। প্রত্যহ মাছের খাদ্যের পরিমাণ এমন ভাবে নির্দিষ্ট করতে হয় যাতে খাদ্যের পরিমাণের সঙ্গে মাছের বৃদ্ধির একটা সমতা থাকে।

খাদ্য প্রয়োগের পদ্ধতি

  • ১) খাদ্য শুকনো অবস্থায় পুকুরের জলের উপরিভাগে ছড়িয়ে দিলে মাছ তা গ্রহণ করে।
  • ২) সরষের খোল এবং চালের কুঁড়ো সম পরিমাণে সামান্য জলের সঙ্গে মিশিয়ে গোল গোল ঢেলা করে জলের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট গভীরতায় ঝুড়ি বা অন্য কোনও ট্রেতে রেখে পরিবেশন করা যায়। এই ঝুড়ি যাতে জলের মধ্যে স্থানচ্যুত না হয় তার জন্য ঝুড়িকে একটি দড়ির সঙ্গে বেঁধে পুকুর পাড়ের কোনও খুঁটির সঙ্গে আটকে রাখতে হয়। খাদ্য দেওয়ার এক থেকে দু’ ঘণ্টা পরে এই ঝুড়ি তুলে পরিবেশন করা খাদ্য কী পরিমাণ মাছ গ্রহণ করে তা অনুমান করা যায় এবং সেইমতো খাদ্য কমানো বা বাড়ানো যায়। প্রতি দিনের মোট খাদ্যের অর্ধাংশ সকালে এবং বিকালে প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। একটি এক বিঘা পুকুরে এ রকম ৩ – ৪টি ঝুঁড়িতে করে প্রতি সময়ের খাদ্যকে সম পরিমাণে ভাগ করে প্রয়োগ করতে হয়।

খাদ্য প্রয়োগের উদাহরণ

একটি পুকুরে ১০০০টি ২৫ গ্রাম ওজনের চারাপোনা ছাড়লে পুকুরে মোট মাছের ওজন হবে মোট মাছের সংখ্যা x একটি মাছের ওজন

অর্থাৎ ১০০০ x ২৫ = ২৫০০০ গ্রাম = ২৫ কিলো গ্রাম

দেহ ওজনের ৩ শতাংশ হারে খাদ্য দিতে হলে মাছ ছাড়ার প্রথম দিনেই খাদ্যের পরিমাণ হবে

১০০ গ্রাম মাছের জন্য প্রতি দিন ৩ গ্রাম খাদ্য

১ গ্রাম মাছের জন্য প্রতি দিন ৩/১০০ গ্রাম খাদ্য

২৫০০০ গ্রাম মাছের জন্য প্রতি দিন (৩/১০০) x ২৫০০০ গ্রাম খাদ্য

= ৭৫০ গ্রাম খাদ্য প্রত্যহ দিতে হবে

বছরের শেষের দিকে মাছ যখন গড়ে ৭০০ গ্রাম হবে তখন ১০০০টি মাছের জন্য পুকুরে মোট মাছের ওজন হবে

মোট মাছের সংখ্যা x একটি মাছের ওজন

অর্থাৎ ১০০০ x ৭০০ = ৭০০০০০ গ্রাম = ৭০০ কিলো গ্রাম

দেহ ওজনের ১.২ শতাংশ হারে খাদ্য দিতে হলে প্রত্যহ খাদ্যের পরিমাণ হবে

১০০ গ্রাম মাছের জন্য প্রতি দিন ১.২ গ্রাম খাদ্য দিতে হবে

১ গ্রাম মাছের জন্য প্রতি দিন ১.২/১০০ গ্রাম খাদ্য দিতে হবে

৭০০০০০ গ্রাম মাছের জন্য প্রতি দিন (১.২/১০০) x ৭০০০০০ গ্রাম খাদ্য দিতে হবে

= ৮ কেজি ৪০০ গ্রাম খাদ্য প্রত্যহ দিতে হবে

কাজেই দেখা যাচ্ছে মাছ যত বাড়ছে প্রাত্যহিক খাদ্যের শতকরা পরিমাণও তার দেহ ওজনের সঙ্গে কমতে থাকছে, কিন্তু মোট খাদ্যের পরিমাণ বাড়ছে।

পরিপূরক খাদ্যের পরিমাণ নির্ণয়ের পদ্ধতি

পুকুরে দৈনিক কতটা খাদ্য প্রয়োগ করতে হবে তা নির্ভর করে মাছের দৈহিক ওজনের উপর।

সাধারণত মাছের দৈহিক ওজনের ৩ – ১ শতাংশ হারে পরিপূরক খাদ্য প্রয়োগ করলে উৎপাদন ভালো হয়। মাছের দৈহিক ওজন যত বাড়তে থাকবে খাদ্যের শতকরা পরিমাণও তত কমতে থাকবে। সাধারণত একটি ১০০ গ্রাম ওজনের মাছের জন্য প্রত্যহ খাদ্যের শতকরা পরিমাণ ৩ শতাংশ। এই মাছ যত বাড়বে প্রাত্যহিক খাদ্যের শতকরা পরিমাণও তত কমবে। অর্থাৎ একটি ৭০০ গ্রাম ওজনের মাছের জন্য প্রত্যহ খাদ্যের পরিমাণ হবে তার দেহ ওজনের ১.২ শতাংশ।

তথ্যসূত্র : মৎস্য বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার

3.0
মন্তব্য যোগ করুন

(ওপরের বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন মন্তব্য / পরামর্শ থাকে, তাহলে দয়া করে আমাদের উদ্দেশ্যে পোস্ট করুন).

Enter the word
ন্যাভিগেশন
Back to top