ভাগ করে নিন
ভিউজ্
  • অবস্থা সম্পাদনার জন্য উন্মুক্ত

শিশু শ্রম

শিশু শ্রম (রোধ ও নিয়ন্ত্রণ) আইন ১৯৮৬

ভারতীয় সংবিধানের ২৪ অনুচ্ছেদে পরিষ্কার বলা রয়েছে, “১৪ বছরের নীচে কোনও শিশুকে কোনও কারখানা, খনি বা কোনও বিপজ্জনক কাজে নিযুক্ত করা যাবে না।” ১৯৮৬ সালে শিশু শ্রম (রোধ ও নিয়ন্ত্রন) আইন তৈরি হয়। এই আইন বলে, ১৪ বছর পূর্ণ হয়নি এমন ব্যক্তিদের শিশু বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই আইনের লক্ষ্য শিশুদের কাজের সময় ও কাজের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করা এবং কিছু বিপজ্জনক শিল্পে শিশুদের নিয়োগ নিষিদ্ধ করা।

শিশুদের অবস্থার উন্নতিকল্পে সাংবিধানিক ব্যবস্থা

অনুচ্ছেদ ২১ক: শিক্ষার অধিকার

৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী সকল শিশুর জন্য রাষ্ট্র বিনামূল্যে এবং বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা করবে। এই ব্যবস্থা কী ভাবে করা হবে রাষ্ট্র তা আইনের মাধ্যমে ঠিক করবে।

অনুচ্ছেদ ২৪: কারখানা ইত্যাদিতে শিশুদের নিয়োগ রোধ

১৪ বছরের নীচে কোনও শিশুকে কারখানা, খনি বা কোনও বিপজ্জনক কাজে নিয়োগ করা যাবে না।

অনুচ্ছেদ ৩৯: রাষ্ট্র তার নীতির মাধ্যমে নির্দিষ্ট ভাবে নিশ্চিত করবে

পুরুষ-নারীর স্বাস্থ্য ও শক্তি এবং শিশুদের অপরিণত বয়সের যেন অপব্যবহার করা না হয় এবং দেশের নাগরিকরা যেন আর্থিক কারণে তাঁদের বয়স ও শক্তির পক্ষে অনুপযোগী কোনও কাজে নিযুক্ত হতে বাধ্য না হন।

শিশুদের নিয়োগ রোধ ও নিয়ন্ত্রণে আইনি ব্যবস্থা

শিশু শ্রম (রোধ ও নিয়ন্ত্রণ) আইন ১৯৮৬ অনুযায়ী ১৪ বছর পূর্ণ হয়নি এমন ব্যক্তি মাত্রেই শিশু।

ওই আইনের ক এবং খ তফশিলে তালিকাভুক্ত ১৮ টি পেশা ও ৬৫ রকমের কাজে শিশুদের নিয়োগ আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ (ধারা ৩)।

ওই তফশিলে আরও পেশা ও কাজ তালিকাভুক্ত করা যায় কিনা তা দেখতে ওই আইনবলে একটি টেকনিক্যাল আ্যডভাইসারি কমিটি গঠিত হয়।

এই আইন দ্বারা নিষিদ্ধ নয় এমন অন্যান্য পেশা ও কাজে নিয়োগের শর্তকেও নিয়ন্ত্রণ করে এই আইন (অংশ ৩)।

ওই আইনের ৩ নং ধারা লঙ্ঘন করে কোনও ব্যক্তি কোনও শিশুকে নিয়োগ করলে তার ৩ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত কারাবাস অথবা ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয়ই হতে পারে (ধারা ১৪)।

কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলি তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে এই আইন প্রয়োগ করে।

জাতীয় শিশু শ্রম নীতি

নীতি

১৯৮৭ সালের আগস্ট মাসে প্রণীত শিশু শ্রম সংক্রান্ত জাতীয় নীতিতে শিশু শ্রম সমস্যার মোকাবিলায় একটি অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করা হয়। এতে আছে ---

  • একটি আইনি অ্যাকশন প্ল্যান
  • যেখানে যেখানে সম্ভব, সেখানে সাধারণ ভাবে শিশুদের উন্নতিকল্পে কর্মসূচি গ্রহণ এবং
  • যেখানে বহু শিশু কাজের সঙ্গে যুক্ত, সেখানে শিশুদের জন্য প্রকল্প-ভিত্তিক অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করা এবং সেগুলো রূপায়িত করা

জাতীয় শিশু শ্রম নীতির অনুসারী পদক্ষেপ হিসাবে শিশু শ্রমিকদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ১৯৮৮ সালে শুরু হয় এনসিএলপি পরিকল্পনা । এই পরিকল্পনায় প্রাথমিক ভাবে বিপজ্জনক কাজ ও পেশায় নিযুক্ত শিশুদের পুনর্বাসনে নজর দেওয়া হয়। এই পরিকল্পনা অনুসারে, বিপজ্জনক কাজ ও পেশায় নিযুক্ত শিশুদের ওপর একটি সমীক্ষা করার পর, তাদের সেই সব কাজ ও পেশা থেকে সরিয়ে এনে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থায় যুক্ত করার লক্ষ্যে বিশেষ স্কুলে পুনর্বাসন করার পরিকল্পনা গৃহীত হয়।

বিপজ্জনক কাজে শিশুদের নিয়োগ বন্ধ করা এবং বিপজ্জনক নয় এমন কাজের ক্ষেত্রে শিশু শ্রম আইন অনুযায়ী কাজের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করা সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যে শিশু শ্রম আইন ও অন্যান্য শ্রম আইন দৃঢ় ভাবে প্রয়োগ করার জন্যই আইনি অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করা হয়।

অ্যাকশন প্ল্যান অনুযায়ী সরকার সমস্যার মোকাবিলা করতে আইনি অস্ত্রগুলো ব্যবহার করছে এবং পাশাপাশি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করছে। অ্যাকশন প্ল্যান রূপায়ণের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারগুলোর ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। আইন কোথাও ভাঙা হচ্ছে কি না, তা দেখতে তাদের তরফে নিয়মিত পরিদর্শন ও অভিযান চালানো হচ্ছে। যে হেতু দারিদ্রই সমস্যার মূলে এবং শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ করেই তার সমাধান সম্ভব নয়, তাই সরকার ওই শিশুদের পুনর্বাসন এবং তাদের পরিবারগুলির আর্থিক অবস্থার উন্নতিতে জোর দিচ্ছে।

শিক্ষার অধিকার বিল

‍২০০৯ সালে শিক্ষার অধিকার বিল পাস করেছে ভারত সরকার । এর ফলাফল সুদূরপ্রসারী। শত শত বছর ধরে শিশু শ্রমিকের যে সমস্যায় এ দেশ জেরবার, এই আইন তৃণমূল স্তরে প্রয়োগের মধ্য দিয়েই তার সমাধান সম্ভব।

বিপজ্জনক পেশায় নিযুক্ত শিশুদের পুনর্বাসন

বিপজ্জনক পেশায় যুক্ত শিশুদের পেশা থেকে সরিয়ে আনা ও বিশেষ স্কুলে তাদের পুনর্বাসন করার জন্য ভারত সরকার এক ব্যাপক কর্মসূচি নিয়েছে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য প্রায় ২০ লক্ষ শিশুকে তাদের পেশা থেকে সরিয়ে এনে বিশেষ স্কুলে রাখা, সেখানে তাদের শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, মাসিক স্টাইপেন্ড দেওয়া এবং স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও পুষ্টির ব্যবস্থা করা।

বিপজ্জনক পেশা ও কাজের তালিকা

বিপজ্জনক পেশা

  • ট্রেনে করে যাত্রী, মালপত্র ও চিঠিপত্র নিয়ে যাওয়া
  • রেল লাইনের ধার থেকে কয়লা তোলা, ছাই-এর গাদা পরিষ্কার ও বাড়ি নির্মাণ
  • রেল স্টেশনে ক্যাটারিং প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করা, ভেন্ডর বা প্রতিষ্ঠানের কোনও কর্মীর মালপত্র এক প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্য প্ল্যাটফর্মে নিয়ে যাওয়া, চলন্ত ট্রেনে মাল ওঠানো নামানো
  • রেল স্ট্শন তৈরির কাজে যুক্ত থাকা বা রেললাইনের মাঝখানে বা কাছাকাছি কোনও কাজ করা
  • বন্দরসীমার মধ্যে বন্দরের কাজ করা
  • অল্প দিনের লাইসেন্স নিয়ে দোকানে বাজি বিক্রি
  • কসাইখানায় কাজ
  • গাড়ি তৈরির কারখানা বা গ্যারাজে কাজ
  • ধাতু গলানোর কারখানায় কাজ
  • বিষাক্ত বা দাহ্য, বিস্ফোরক পদার্থ নিয়ে কাজ করা
  • হস্তশিল্প ও তাঁতশিল্পে কাজ
  • খনি (মাটির তলায় বা জলের তলায়) ও কয়লা খনিতে কাজ
  • প্লাস্টিক ও কাচের কারখানায় কাজ
  • গৃহভৃত্যের কাজ
  • ধাবা (রাস্তার ধারে খাওয়ার জায়গা), রেস্তোরাঁ, হোটেল, মোটেল, চা-এর দোকান, রিসর্ট, স্পা প্রভৃতি জায়গায় কাজ
  • জলে ঝাঁপানো
  • হাতির দেখাশোনা
  • সার্কাসে কাজ

বিপজ্জনক কাজ

  • ১. বিড়ি তৈরি
  • ২. কার্পেট বয়ন (প্রস্তুতিপর্ব এবং আনুষঙ্গিক কাজ)
  • ৩. সিমেন্ট তৈরি, সিমেন্ট বস্তায় ভরা
  • ৪. কাপড় ছাপা, রঙ করা ও বয়ন (প্রস্তুতিপর্ব এবং আনুষঙ্গিক কাজ)
  • ৫. দেশলাই, বিস্ফোরক ও বাজি তৈরি
  • ৬. অভ্র কাটা ও ভাগ করা
  • ৭.গালা তৈরি
  • ৮. সাবান তৈরি
  • ৯. চামড়া শুকনো
  • ১০.পশম পরিষ্কার করা
  • ১১. নির্মাণ শিল্পে কাজ (গ্র্যানাইট পাথরকে ব্যবহারের উপযোগী করা ও পালিশ করা সহ)
  • ১২. শ্লেট পেন্সিল তৈরি (প্যাকিং সহ)
  • ১৩. অকীক পাথর থেকে পণ্য তৈরি
  • ১৪. সিসা, পারদ, ম্যাঙ্গানিজ, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়াম, বেঞ্জিন, কীটনাশক, অ্যাসবেসটস-এর মতো বিষাক্ত ধাতু ও পদার্থ থেকে কিছু তৈরির প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকা
  • ১৫. ফ্যাকটরিজ আইন, ১৯৪৮ (১৯৪৮-এর ৬৩)-এর ধারা ২(সিবি)-তে উল্লিখিত ‘বিপজ্জনক প্রক্রিয়া’ এবং সেই আইনের ৮৭ নং ধারা অনুসারে তৈরি বিধি অনুসারে ‘বিপজ্জনক কাজ’
  • ১৬. ফ্যাকটরিজ আইন, ১৯৪৮ (১৯৪৮-এর ৬৩)-এর ধারা ২(কে)(৪) অনুযায়ী ছাপার কাজ
  • ১৭. কাজু ও কাজু বাদাম ভাঙা ও প্রস্তুত করা
  • ১৮. বৈদ্যুতিন শিল্পে ঝালাই-এর কাজ
  • ১৯. ধূপকাঠি তৈরি
  • ২০. গাড়ি সারাই ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং আনুষঙ্গিক কাজ যার মধ্যে রয়েছে, ঝালাই, লেদ মেশিনের কাজ, হাতুড়ি মারা, রঙ করা
  • ২১. ইঁট ভাটা ও টালি তৈরির কাজ
  • ২২. তুলো বীজ ছাড়ানো ও হোসিয়ারি শিল্পে কাজ
  • ২৩. ডিটারজেন্ট তৈরি করা
  • ২৪. ফেব্রিকেশনের কাজ (লোহা বা লোহা নয়, সব ক্ষেত্রই)
  • ২৫. মণিমুক্তো কাটা ও পালিশ করা
  • ২৬. আকরিক অবস্থায় থাকা ক্রোমাইট ও ম্যাঙ্গানিজ নিয়ে কাজ
  • ২৭. পাটের দ্রব্য তৈরি ও ছোবড়া-পণ্য তৈরি
  • ২৮. চুন তৈরি
  • ২৯. তালা তৈরি
  • ৩০. শরীরে সিসা প্রবেশ করতে পারে এমন সব কাজ। যেমন, ধাতু গলানো, ঝালাই, সিসা লাগানো ধাতু কাটা, গ্যালভানাইজড সিঙ্ক সিলিকেট, পলিভিনাইল ক্লোরাইড ঝালাই, হাত দিয়ে কাচ মেশানো, সিসার রঙ তৈরির কাজ, এনামেল করা হয় এমন স্থানে সিসা জ্বালানো, খনি থেকে সিসা তোলা, জলের পাইপ তৈরি, কেব্‌ল তৈরি, ইলেক্ট্রিক ওয়ারিং-এর কাজ, সিসা কাস্টিং, মুদ্রণ শিল্পে টাইপ তৈরি, টাইপ সংরক্ষণ, বিভিন্ন যন্ত্র জুড়ে গাড়ি তৈরি, গুলি তৈরি
  • ৩১. সিমেন্ট পাইপ, সিমেন্টের পণ্য তৈরি ও এ ধরনের অন্যান্য কাজ
  • ৩২. কাচ তৈরি, কাচ দিয়ে বালা, ফলুরোসেন্ট টিউব, বাল্ব ও অন্যান্য কাচের জিনিস তৈরি
  • ৩৩. কলপ করার রঙ ও এ ধরনের অন্যান্য বস্তু তৈরি
  • ৩৪. কীটনাশক তৈরি করা ও তৈরির সঙ্গে যুক্ত থাকা
  • ৩৫. বিষাক্ত ও ক্ষয়কারক পদার্থ তৈরি করা ও এগুলি ব্যবহার করতে হয় এমন কাজ করা। যেমন, ধাতু পরিষ্কার, ফোটো এনগ্রেভিং, বৈদ্যুতিন শিল্পে সোল্ডারিং
  • ৩৬. কয়লাকে জ্বালানি হিসেবে প্রস্তুত করা
  • ৩৭. সিন্থেটিক পদার্থ, রাসায়নিক পদার্থ, চামড়ার সঙ্গে শরীরের সম্পর্ক হতে পারে খেলার জন্য প্রয়োজনীয় এমন সব পণ্য নির্মাণ
  • ৩৮. ফাইবার গ্লাস ও প্লাস্টিকের ছাঁচ তৈরি
  • ৩৯. তৈল শোধনাগারে কাজ
  • ৪০. কাগজ তৈরি
  • ৪১. মৃৎশিল্প ও সেরামিক শিল্পে কাজ
  • ৪২. যে কোনও রকমের পেতলের দ্রব্য নির্মাণ, ঝালাই, ছাঁচ নির্মাণ, কাটার সঙ্গে যুক্ত থাকা
  • ৪৩. ট্র্যাক্টর, মাড়াই ও চাষের যন্ত্র, তুষ কাটার যন্ত্র ব্যবহার হচ্ছে এমন ধরনের কৃষিকাজের জায়গায় যুক্ত থাকা
  • ৪৪. করাতকলে কাজ
  • ৪৫. রেশম শিল্পে কাজ
  • ৪৬. চামড়া তৈরি ও চামড়ার দ্রব্য শুকনো, রঙ করার কাজে যুক্ত থাকা
  • ৪৭. পাথর ভাঙা ও পাথর গুঁড়ো করার কাজ
  • ৪৮. তামাক ও তামাকজাত দ্রব্য তৈরি করা বা তৈরির প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকা
  • ৪৯. চাকা তৈরি, সারাই, কেনাবেচা
  • ৫০. বাসন তৈরি, পালিশ করা, ধাতু মসৃণ করা
  • ৫১. জরি শিল্পে সব রকম কাজ
  • ৫২. ইলেক্ট্রোপ্লেটিং
  • ৫৩. গ্র্যাফাইট পাথর গুঁড়ো করা বা প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া
  • ৫৪. ধাতু গুঁড়ো করা বা উজ্জ্বল করা
  • ৫৫. হিরে কাটা ও পালিশ করা
  • ৫৬. খনি থেকে স্লেট বের করে আনা
  • ৫৭. নোংরা জিনিস কুড়নো ও সাফাইয়ের কাজ
  • ৫৮. অত্যাধিক তাপ বা ঠান্ডার মধ্যে কাজ করা
  • ৫৯. যান্ত্রিক পদ্ধতিতে মাছ ধরা
  • ৬০. খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ
  • ৬১. পানীয় শিল্পে কাজ
  • ৬২. কাঠের কাজ ও কাঠের দ্রব্য তোলা নামানো
  • ৬৩. যান্ত্রিক পদ্ধতিতে গাছ কাটা ও চেরাই
  • ৬৪. গুদামে কাজ করা
  • ৬৫. সিলিকার সংস্পর্শে আসতে হয় এমন কাজ, যেমন, শ্লেট-পেন্সিল শিল্প, পাথর গুঁড়ো করা, খনি থেকে স্লেট পাথর বের করা, অকীক পাথর শিল্প, পাথর খাদানে কাজ করা

শিশুশ্রম: দেশের অবস্থা ও রাজ্যের অবস্থা

ভারতের সামগ্রিক অবস্থা

ছোটু চায় লে আও’! শিশুর অধিকার নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা, অতএব চা চাই, অতএব ছোটু! কোনও কোনও শিশু অধিকারবিদ  অবশ্য প্রতীকী প্রতিবাদে ছোটুদের আনা চা খান না, যদিও তাঁদের অনেকের বাড়িতেই ‘ছুটকি’দের ছাড়া সংসার চলে না। ছোটুদের মতোই দেশে অসংখ্য ছুটকিও শৈশব হারিয়ে রোজগারের পথে নামতে বাধ্য হয়, প্রায় মায়ের কোল-ছাড়া হওয়ার মুহূর্তেই। ২০১১-র জনগণনা আমাদের জানাচ্ছে, সারা দেশে ৪,৩০,৭৮৫ এমন ‘কর্মী’ আছে, যাদের বয়স, চমকে উঠবেন না, মাত্র পাঁচ বছর! এবং মনে রাখা ভাল, জনগণনার সংজ্ঞা অনুযায়ী কর্মী তাঁরাই, যাঁরা অর্থকরী উপার্জনের সঙ্গে পূর্ণ সময় যুক্ত: বছরে ১৮৩ দিন বা তার বেশি কাজ করলে মুখ্য কর্মী, তার কম হলে প্রান্তিক কর্মী।

শিশু অধিকার নিয়ে কত আইন, কত বাগ্বাজি, কুম্ভীরাশ্রুর বন্যা, অথচ সারা দেশে এখনও মোট কর্মীর প্রতি কুড়ি জনের মধ্যে এক জন হচ্ছে ৫-১৭ বছর বয়সি শিশু, সংখ্যাটা প্রায় আড়াই কোটি। এদের মধ্যে প্রায় এক কোটিই হচ্ছে ছুটকিরা। মোট শিশু কর্মীর নিরিখে মেয়েদের সংখ্যাটা কম মনে হচ্ছে বটে, কিন্তু মোট নারী কর্মীর মধ্যে এদের অনুপাত (৬.৩ শতাংশ) পুরুষদের অনুপাত (৪.৩ শতাংশ)-এর চেয়ে বেশি।

এ তো গেল মোটের হিসেব। যতই সামাজিক বিভাজনের সিঁড়ি ধরে নীচে নামা হবে, ততই দেখা যাবে অবস্থাটা ভয়াবহতর: দলিত ও আদিবাসীদের মধ্যে শিশু কর্মীর অনুপাত যেমন বাড়ছে, তেমনই বাড়ছে নারী কর্মীদের মধ্যে শিশুদের অনুপাত। আদিবাসীদের মধ্যে অবস্থাটা কতটা খারাপ, সেটা অন্য একটা অংক থেকে পরিষ্কার। মোট শিশু কর্মীর ১৭ শতাংশই আদিবাসী, যদিও জনসংখ্যায় তারা মাত্র ৯ শতাংশ।

সর্ব শিক্ষা অভিযান এক দশক অতিক্রান্ত, শিক্ষার অধিকার আইনের বয়সও অর্ধ দশক, শিশুরা ইস্কুলে আসছে এমন আনন্দঘন সংবাদে দেশের আহ্লাদ ধরে না। কিন্তু এই কয়েক কোটি শিশুর কী হবে, যারা বাস্তবিক পক্ষে সংসার টানে? বয়সের হিসেবে দেখা যাচ্ছে মোট শিশু কর্মীদের মধ্যে শতকরা ১১ জনেরই প্রাথমিক স্তরে পড়ার কথা, আর ৩২ শতাংশের পড়ার কথা উচ্চ প্রাথমিক স্তরে। এই ৪৩ শতাংশ (সংখ্যায় কোটিখানেক) হচ্ছে শিক্ষার অধিকার আইনের আওতায়। আইনের চোখে সকলে সমান, কিন্তু আইন সবার জন্য কতটা সমান? শিশুশ্রমও তো আইনত নিষিদ্ধ, কিন্তু সে আইনই বা সকল শিশুর জন্য কতটা সমদর্শী?

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৬ মার্চ, ২০১৫

গ্রাফিক্স : আনন্দবাজার পত্রিকা

রাজ্যওয়াড়ি অবস্থা: কিছু তথ্য

শিশু শ্রমিক বলতে সাধারণত ছোটু-ছুটকিদের কথাই লোকে বুঝে থাকে,  কিন্তু বাস্তবত আইন, সুভদ্র সমাজ, উন্নয়নের জয়ধ্বজার অন্তরালে যে শিশুরা ‘দেহশ্রম’ বিক্রি করে চলেছে, তারা ছড়িয়ে আছে নানান ক্ষেত্রে, বেশির ভাগই কৃষিকর্মে: চাষবাসে শতকরা ২৩ ভাগ এবং খেতমজুরিতে ৩৮ ভাগ। শিশুশ্রম বিষয়ক আলোচনায় এই কৃষিক্ষেত্রে নিযুক্তদের কথাটা যে আসেই না, তার কারণ বোধহয় এই শিশুদের সামাজিক অবস্থান, যারা প্রধানত দলিত বা আদিবাসী, উন্নয়নের নানান সূচক অনুযায়ী যে  গোষ্ঠীগুলো সুযোগবঞ্চনার জীবন্ত নমুনা। অথচ পথ যে একেবারেই নেই, তা নয়। আমরা যদি শূন্যকুম্ভ নৈতিকতা এবং শুষ্ক সংবেদনশীলতা থেকে বেরিয়ে সহজ সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান-নির্ভর যুক্তিকে অবলম্বন করি, তা হলে যে পথ একটা পাওয়া যায়, তার ইঙ্গিতও জনগণনার হিসেব থেকে স্পষ্ট। যেখানে সারা দেশে মোট কর্মীর ৫ শতাংশ হচ্ছে শিশু, সেখানে, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাবে, কেরল, তামিলনাড়ু ও ত্রিপুরাতে সংখ্যাটা অনেক কম: যথাক্রমে ০.৯, ২.৪ ও ২.৯ শতাংশ। সাফল্যের কারণটির পিছনে ব্যাখ্যা একটাই: রাজ্যগুলো ইট-সিমেন্ট-কংক্রিট-নির্ভর অর্থনৈতিক বৃদ্ধির দেবতার পদতলে নিজেদের সঁপে না দিয়ে একেবারে গোড়ার কাজটাতে মনোনিবেশ করেছে। এ কাজট হল মানব সক্ষমতার বৃদ্ধির ভিতর দিয়ে সমাজে সকল মানুষের অংশগ্রহণের নিশ্চয়তার একটা ভিত্তি গড়ে তোলা। শিশু পুষ্টি, শিশু স্বাস্থ্য, শিশু শিক্ষার মতো বিষয়গুলিতে এই সব রাজ্য যে প্রাধান্য অর্পণ করেছে, তার সুফল হিসেবেই সেখানে হৃতশৈশব শিশুদের সংখ্যাটাকে কমিয়ে আনা গেছে। বিপরীতে, উন্নয়নের যে গুজরাত মডেল অনুসরণ করে দেশকে বিশ্ব অর্থনীতির মহারথীদের প্রতিদ্বন্দ্বী করে তোলার স্বপ্ন বিক্রি করা হচ্ছে, সেখানে মোট কর্মীর মধ্যে শিশু কর্মীর অনুপাত ৫.২ শতাংশ, সংখ্যায় তেরো লক্ষের বেশি। হিন্দি বলয়ের রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, ঝাড়খণ্ড, সর্বত্র সামাজিক ক্ষেত্রে তাদের ভয়াবহ অনুন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিশু কর্মীর অনুপাত ৬ শতাংশের উপরে।

পশ্চিমবঙ্গ বিষয়ে জানতে কৌতূহল হচ্ছে? তা হলে বলি, অর্থনীতি এবং সমাজের অধিকাংশ বিষয়ে যে মধ্যমান আঁকড়ে ধরে থাকার দূর  প্রতিজ্ঞায় এ রাজ্য অনড় এবং যার ফলে উন্নয়নের প্রায় সব সূচকেই দেশের মধ্যে তার স্থান মোটামুটি মাঝামাঝি, শিশু কর্মীর অনুপাতের দিক দিয়েও সেই অচলায়তনের ব্যত্যয় ঘটেনি: অনুপাতটি ৪.৫%, গুজরাত বা হিন্দি বলয়ের থেকে অবশ্যই ভাল, কিন্তু কেরল, তামিলনাড়ু, ত্রিপুরা থেকে অনেকটাই খারাপ।

শিশু কর্মীদের এই কাহিনিটি কেবল শিশুদের বঞ্চনাতেই শেষ হয়ে যায় না, এই শিশুরাই বড় হয় ঊনমানবের  মতো। তারা যা হতে পারত এবং তা হয়ে ওঠার জন্য যা করতে পারত, সেই সক্ষমতার অভাবটাই প্রভাব ফেলে, শুধু তাদেরই জীবনে নয়, গোটা দেশের উৎপাদনশীলতায়। তার চেয়েও বড় কথা, তাদের প্রতি ওই যে দৃষ্টিভঙ্গি, অবহেলা ও বঞ্চনার উপর নির্ভর করে অনৈতিকতার যে সৌধ নির্মাণ, তা তো আসলে গোটা দেশের নৈতিক ভিতটাকেই দুর্বল করে রাখে। এই খণ্ডিত নৈতিকতার জৌলুস নিয়ে চাঁদ ধরার আস্ফালন চলে, কিন্তু চাঁদ অধরাই থেকে যায়। ছোটু ও ছুটকি-রাও যে ভারতবর্ষেরই অংশবিশেষ, এই তথ্য-বিস্ফোরণ সেই দেশটাকেই ছোট করে। সেই বোধ কবে আসবে?

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৬ মার্চ, ২০১৫

ছবি : আনন্দবাজার পত্রিকা

3.0625
মন্তব্য যোগ করুন

(ওপরের বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন মন্তব্য / পরামর্শ থাকে, তাহলে দয়া করে আমাদের উদ্দেশ্যে পোস্ট করুন).

Enter the word
ন্যাভিগেশন
Back to top