হোম / শিক্ষা / পশ্চিমবঙ্গের পরিচিতি / পশ্চিমবঙ্গের পরিচিতি
ভাগ করে নিন
ভিউজ্
  • অবস্থা সম্পাদনার জন্য উন্মুক্ত

পশ্চিমবঙ্গের পরিচিতি

পশ্চিমবঙ্গ সম্পর্কে

এক নজরে পশ্চিমবঙ্গ

১৯৪৭ সালে অবিভক্ত বাংলার রাজনৈতিক বিভাজন প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য আত্মপ্রকাশ করে। ব্রিটিশ শাসনকালের সময় থেকেই এটি পূর্ব ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে উন্নতিলাভ করে। আধুনিক ভারতের সংস্কৃতি ও সভ্যতার ক্ষেত্রে এই রাজ্যের সমাজসংস্কারক ও বুদ্ধিজীবিরা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও শিক্ষাক্ষেত্রে সংস্কাএরের মাধ্যমে নবজাগরণের উদ্ভভে অবিভক্ত বাংলাই সর্বপ্রধান ভূমিকা পালন করে। ভারতের প্রথম আধুনিক মানুষ রাজা রামমোহন রায় ছিলেন এই আন্দোলনের পথিকৃৎ। বাংলা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনেও নেতৃত্ব দিয়েছিল। সেই কঠিন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ন্যায় মহান বঙ্গসন্তানরা মাতৃভূমির প্রতি তাদের অসাধারণ নিষ্ঠা ও দায়বদ্ধতার মধ্যে দিয়ে আমাদের ইতিহাসকে সমৃদ্ধশালী করে তোলেন। ঔপনিবেশিক সময়কালে ব্রিটিশরা তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুনাফার স্বার্থে এই রাজ্যের রাজধানী ক্যালকাটা (বর্তমানে কলকাতা) প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে এই শহর পূর্ব ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্প- বাণিজ্য – শিক্ষা – সংস্কৃতি কেন্দ্র হিসাবে পরিগণিত। কলকাতা ভারতের অন্যতম প্রধান শহর। এই শহর ‘প্রাসাদনগরী' ও ‘আনন্দনগরী' হিসাবে পরিচিত।বঙ্গপসাগরে প্রবাহিত হুগলী নদীর মাধ্যমে এই শহরের সঙ্গে বহিঃবিশ্বের যোগাযোগের প্রেক্ষিতে একে ‘বন্দরনগরী'  ও বলা যেতে পারে। উত্তরে উচ্চতম হিমালয় পর্বতমালা থেকে দক্ষিণে বঙ্গপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হলেও ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই রাজ্যকে সমতলভূমিপ্রধান মনে করা হয়। এর পশ্চিমদিকে রয়েছে ছোটোনাগপুর মালভূমি ও পূর্বদিকে রয়েছে বাংলাদেশ তথা পূর্বতন পূর্ব পাকিস্তানের সীমানা। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রের সীমারেখায় রয়েছে তিনটি প্রতিবেশী দেশ ও পাঁচটি অন্যান্য ভারতীয় রাজ্য।প্রতিবেশী দেশগুলি হল বাংলাদেশ, নেপাল, ভূটান ও অন্যান্য রাজ্যগুলি হল ওড়িষা, ঝাড়খন্ড, বিহার, সিকিম ও আসাম।

উত্তরাঞ্চলের প্রধান অংশ হল পূর্ব হিমালয়ের পার্বত্য এলাকা। শিলিগুড়ি মহকুমা ছাড়াও দার্জিলিং জেলার অন্যান্য জায়গাও পার্বত্য এলাকা। তরঙ্গায়িত পর্বতমালার উপকণ্ঠে দার্জিলিং এর স্তুতিময় কাঞ্চনজঙ্ঘা যার ভালোবাসার নাম ‘পাহাড়ের রানী' সেই হল প্রকৃতি প্রেমিক মানুষের সঠিক প্রবেশপথ। এখানেই আছে ‘দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে' যেখানে পৃথিবী বিখ্যাত টয়ট্রেন চালু রয়েছে। এই অঞ্চলের নৈসর্গিক সৌন্দর্য সারা বছরই পৃথিবীর হাজার হাজার মানুষকে আকর্ষণ করে।

প্রায় অর্ধেক বছর জুড়ে এই রাজ্যের ভুমি প্রচুর পরিমাণেবৃষ্টির জল পায় এবং এর মাধ্যমে আমাদের নদীগুলি পলিমাটি সমূহ জলে পরিপুর্ন থাকে। মৎস্যচাষ ও বৃষ্টির বিকাশে এটি অত্যন্ত সহায়ক ভুমিকা পালন করে। এখানকার উর্বর জমির মৃত্তিকা প্রাকৃতিকভাবেই এত সমৃদ্ধশালী যে জনসংখ্যার অধিকাংশই কৃষিকার্যে নিয়োজিত। উন্নত সেচ ব্যবস্থা ও কৃষি-উপযোগী অনুকূল জলবায়ুর জন্য এখানে কৃষিকাজ সহজতর। ধান হল প্রধান শস্য। এর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে পাট,ডাল,সবজি বিভিন্ন ধরনের তৈলবীজ প্রভৃতির চাষ হয়। পাহাড় ও ডুয়ার্স অঞ্চলের প্রধান কৃষিজাত পণ্য হল চা ও কমলালেবু।

সমুদ্রতীরবর্তী এলাকা গুলোতে প্রচুর পরিমাণেনারকেল ও কাজুবাদাম গাছ পাওয়া যায়। কৃষিকাজ ও মৎস্যপালন ছাড়াও প্রচুর মানুষ প্রাণীপালনের কাজে যুক্ত।

সুন্দরবনের সমুদ্রতীরবর্তী ম্যানগ্রোভ অরণ্যবেষ্টিত বাস্তু-অঞ্চল পৃথিবীর বৃহত্তম বাস্তুতন্ত্র এবং এটি ব-দ্বীপের সমুদ্রমুখী সীমানা গঠন করেছে। প্রাধান ম্যানগ্রোভ প্রজাতিগুলির মধ্যে রয়েছে সুন্দরী,গরান প্রভৃতি। মৃত্তিকা লবনাক্ত ও কৃষির অনুপযোগী। এখানে বিভিন্ন ধরনের বন্য প্রাণী যেমন – রয়েল বেঙ্গল টাইগার, চিতা, হরিণ, রেসাস বানর। বিভিন্ন ধরনের মাছ, রেড ফিডলার কাঁকড়া, কুমীর, রিডলে সমুদ্র কচ্ছপ এবং বিভিন্ন বিভিন্ন ধরনের সরীসৃপ(কাল কেউটে, পাহাড়ী অজগর ও জলজ গিরগিটি) পাওয়া যায়।

পূর্ব মেদিনীপুরে বেশ কয়েকটি আকর্ষণীয় সমুদ্রতট – দীঘা, মান্দারমনি, শঙ্করপুর ও তেজপুর বর্তমান। এগুলি প্রসিদ্ধ পর্যটন কেন্দ্র বটে।

শিল্পের ক্ষেত্রে এই সরকার যন্ত্রাংশ নির্মাণ, রসায়ন, চর্ম, কাগজ, পাট ও বস্ত্রশিল্পের বিকাশে এগিয়ে চলেছে। বাঁশজ হস্তশিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, পোলট্রি, দুগ্ধজাত পন্য প্রভৃতি ক্ষুদ্রশিল্পের ক্ষেত্রে রাজ্যের পৃষ্টপোষকতা রয়েছে।

বহু ভাষাভাষি ও বিভিন্ন জাতির সংস্কৃতির ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন বরন ও সম্প্রদায়ের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সূত্রে এই রাজ্যকে আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী বলা যেতে পারে। এখানে প্রধান ধর্মীয় উৎসব হিসেবে দুর্গাপূজা, ইদ-উল-ফিতর, এক্সমাস প্রভৃতি অত্যন্ত জনপ্রিয়। এছাড়াও সারা বছরই এ রাজ্যে নানাবিধ সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজিত হয়।

সাহিত্যক্ষেত্রে প্রধান ভাষা বাংলা বিভিন্ন সময়ে বহু বিদগ্ধ প্রতিভাবান ব্যক্তির অবদানে সমৃদ্ধ হয়েছে। এই ভাষা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ ব্যক্তিদের কাছে ভীষণভাবে ঋণী।

পশ্চিমবঙ্গ মাদার টেরেসা, সত্যজিৎ রায়, পণ্ডিত রবিশঙ্কর, উদয়শঙ্কর, অমর্ত্য সেন, ডঃ বি সি রায়,ডঃ সুভাষ মুখোপাধ্যায় এবং এমন আর অনেক প্রতিভাশালী ব্যক্তিত্বের গৌরবে গৌরবান্বিত। এই রাজ্য সর্বদাই মেধা ও সমাজের উৎকৃষ্ট উৎস হিসেবে বিবেচ্য। আমাদের জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় স্তোত্র সমগ্র জাতির প্রতি বাংলার অবদান।

হিমালয় পর্বতমালার তুষারাবৃত শৃঙ্গ থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত জীবনের উদ্দীপনা ও প্রানবন্ততা বর্ধিষ্ণু। সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি, উৎসব, প্রথা ও রীতি আচার, কলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে জীবনের

এই স্পন্দন খুঁজে পাওয়া যায়। প্রাচীনকালের অবিভক্ত বাংলা থেকে বর্তমান সময়ের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই অগ্রগতির বার্তা বহন করে চলেছে।

পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস

ব্যাপকতর অর্থে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসকে কোনওভাবেই ভারতের মতো সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের অন্তর্গত একটি ছোট অঙ্গরাজ্যের ইতিহাস বলা যায় না। এটি বিশ্ব ইতিহাসের একটি উল্লেখনীয় অংশ।

প্রাচিন যুগে এই অঞ্চলটিকে (বর্তমান বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ)- বলা হত গঙ্গারিদৈ। গ্রীক পর্যটক মেগাস্থিনিসের ইন্ডিকা গ্রন্থে এই গঙ্গারিদৈ রাজত্বের বিবরন পাওয়া যায়। গঙ্গারিদৈ শব্দের অর্থ গঙ্গার সম্পদ। সংস্কৃত ভাষায় একে বলা হয় গঙ্গারাষ্ট্র যার অর্থ হল গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চল। খ্রীষ্টীয় ৪র্থ শতকে এই রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

কোনও কোনও গ্রীক ও লাতিন ঐতিহাসিকের মতে গঙ্গারিদৈ ও প্রাচী অর্থাৎ প্রাচ্য (নন্দ) সাম্রাজ্যের প্রবল যৌথ প্রতিরোধের আশঙ্কায় মহামতি আলেকজান্ডার ভারত থেকে তাঁর সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।

অনেক ঐতিহাসিকের মতে ওডিশার গঙ্গা সাম্রাজ্য ও কর্ণাটকের গঙ্গা সাম্রাজ্য উভয়ই গঙ্গারিদৈ জনোগোষ্ঠীর বংশোদ্ভত যারা দক্ষিণবঙ্গের তমলুক (মেদিনীপুর) থেকে দক্ষিণ ভারতে অভিবাসিত হয়েছিলেন। গঙ্গা নগরীর অবস্থান সঠিকভাবে চিহ্নিত করা যায়নি। দেগঙ্গার চন্দ্রকেতুগড়ে খননকার্যের ফলে পাওয়া প্রমাণাদি থেকে এই অঞ্চল গঙ্গা নগরীর জোরালো দাবিদার হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। সম্ভবত গঙ্গা নগরী ছিল চন্দ্রকেতুগড়ের বন্দর শহর।

প্রাক- ঐতিহাসিক বাংলা

এই রাজ্যে খননকার্যের ফলে ২০০০০ বছরের প্রাচীন প্রস্তর যুগের যন্ত্রপাতির সন্ধান পাওয়া গেছে। এই অঞ্চলে ৪০০০ বছরের প্রাচীন তাম্রযুগের ধ্বংসাবশেষও আবিষ্কৃত হয়েছে। এই অঞ্চলের আদি অধিবাসীরা অনার্য ভাষায় বাক্যালাপ করতেন। খ্রিষ্টীয় ৭ম শতাব্দীতে মগধ সাম্রাজ্যের অঙ্গিভুতঝ বাংলা ইন্দো- আর্থ সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত হয়।নন্দ বংশ প্রথম ঐতিহাসিক সাম্রাজ্য যা বাংলার সমস্ত অংশকে ইন্দো- আর্থ সভ্যতার অধীনে নিয়ে আসে।

মধ্য যুগের প্রথমাবস্থা

সমুদ্রগুপ্তের বিজয়ের আগে অর্থাৎ গুপ্ত- পূর্ব যুগে বাংলা দুটি রাজ্যে বিভক্ত ছিল – পুষ্করনা ও সমতট। বঙ্গ রাজাদের একটি জোট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের কাছে পরাজয় স্বীকার করে এবং এইভাবে বাংলা ক্রমে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অঙ্গীভূত হতে থাকে। গুপ্ত শাসনে বাংলার অর্থনীতি বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে থাকে। ৬ ষ্ট শতাব্দীতে বঙ্গ, সমতট ও হরিকেলা রাজত্বের মধ্যে ভাগ হয়ে যায় যখন সমগ্র উত্তর ভারতে গুপ্ত বংশের প্রাধান্য লীন হয়ে আসছে। কর্ণসুবর্ণ (বর্তমানে মুর্শিদাবাদের কাছে একটি স্থান) কে রাজধানী করে গৌড় রাজারা শক্তি সঞ্চয় করে। গুপ্ত সম্রাটের সামন্ত শশাঙ্ক বাংলার ছোট ছোট রাজন্যবর্গকে একত্রিত করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শশাঙ্কের শাসনের পরবর্তী পর্যায়ে বাংলায় চরম অশান্তির প্রাদুর্ভাব ঘটে। একেই মাৎস্যন্যায় বলে। এরপর গোপাল (৭৫০-৭৭০)কে বাংলার মানুষ রাজা নির্বাচিত করে।

পাল বংশ (৭৫০- ১১২০) বাংলার প্রথম স্বাধীন বৌদ্ধ রাজবংশ। তাদেরই হাত ধরে বাংলা স্থায়িত্ব ও উন্নতির পথে ফেরে। পালেদের শাসনকালই বাংলার স্বর্ণযুগ। তারাই তিব্বত-ভুটান ও বার্মাদেশে মহাযান বৌদ্ধধর্মের প্রচলন করেন। তৎকালীন যুগে বাংলাই বৌদ্ধধর্মের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো। নালন্দা, বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সোমপুর মহাবিহার স্থাপন পালেদের কীর্তি। বাংলার অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর হলেও দক্ষিণ- পূর্ব এশিয়ায় পাল রাজাদের ব্যবসা- বাণিজ্য প্রসারিত হয়েছিল। দক্ষিণের চোলা আক্রমণে পাল রাজত্ব বিধ্বস্ত হয়ে যায়। ১০২১ ও ১০২৩ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝি প্রথম রাজেন্দ্র চোলা বাংলায় সামরিক অভিযান চালান। চালুক্যরাজ প্রথম সোমেশ্বর-এর আমলেও তাঁর পুত্র ৬ ষ্ঠ বিক্রামাদিত্যের নেতৃত্বে দক্ষিণ দিক থেকে আক্রমন সংগঠিত হয় ও সেই আক্রমনে গৌড় ও কামরূপ – রাজ পরাস্ত হন। চালুক্যরাজ কর্ণাটক থেকে কিছু লোক বাংলায় এনেছিলেন। কোনও কোনও ঐতিহাসিকের মতে এর ফলে পরবর্তীকালের সেন বংশের দক্ষিনী উৎস সম্পর্কে কিছু অনুমান করতে পারি। তারা বিক্রমপুর (অধুনা মুন্সিগঞ্জ)-এ তাঁদের রাজধানী স্থাপন করে। সামরিক দিক দিয়ে অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ায় তারা সহজেই পাল রাজাদের উত্তর-পশ্চিমের দিকে পাঠিয়ে দিতে সমর্থ হন।

সেইযুগে পূর্ববঙ্গ (সুপ্রাচীন হরিকেলা, ভঙ্গ ও সমতট অঞ্চল নিয়ে গঠিত)- এ হরিকেলা রাজত্বে চন্দ্র বংশের শাসন দশম শতাব্দীর শুরু থেকে প্রায় দেড় শতাব্দী যাবৎ জারি ছিল। চন্দ্র বংশের শেষ রাজা গোবিন্দচন্দ্রকে প্রথম রাজেন্দ্র চোলা পরাজিত করেন।

সেন বংশ

শেষ পাল সম্রাট মদনপালকে পরাজিত করে সেন বংশের দ্বিতীয় শাসক বিজয় সেন সাম্রাজ্য বিস্তার করেন। সেন বংশই দ্বাদশ শতাব্দীতে সমগ্র বাংলাকে এক শাসনের অধীনে নিয়ে আসে। এই বংশের তৃতীয় রাজা বল্লাল সেন নবদ্বীপে তাঁর রাজধানী স্থাপন করেন। ঐ বংশের চতুর্থ রাজা লক্ষণ সেন বাংলার বাইরে বিহার, আসাম, ওডিশা ও সম্ভবত বারানসী পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তার করেন। হিন্দু ধর্মকে পুনরুজ্জীবিত করে সংস্কৃত সাহিত্যের চর্চাকে জনপ্ত্রিয় করে সেন বংশ বাংলায় একটি গৌরবময় অধ্যায়ের সুচনা করেন।

মুসলমান শাসক বক্তিয়ার খিলজির আক্রমনে লক্ষণ সেন পরাজিত হন ও তিনি পুর্ববঙ্গে আশ্রয় নেন। পরবর্তীকালে সেখানে তিনি তাঁর শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন।

মধ্যযুগের বাংলা

দ্বাদশ শতাব্দীতে সুফি সন্তরা বাংলায় পৌঁছন। এইভাবেই এখানে ইসলাম ধর্মের আগমন ঘটে। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে দিল্লী সুলতানির এক সামরিক শাসক বিহার, বাংলা থেকে শুরু করে পূর্বে রংপুর, বোগরা ও ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত তার অভিযান চালান। বাংলাকে তিনি তার বশবর্তী করতে পারেন নি। তার দুই ছেলে বিক্রমপুরে আসেন। সেখানে ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত তাদের ক্ষয়িষ্ণু রাজ্যপাট টিকে ছিল। চতুর্দশ শতাব্দী থেকে পূর্বোল্লিখিত রাজ্য বিভিন্ন পর্যায়ে দিল্লীর সুলতানি- জমিদার- বারো ভুইঞাদের সঙ্গে বাংলার সুলতানি নামে অভিহিত হতে থাকে।

দেব বংশ

সেনা বংশের পতনের পর পূর্ববঙ্গে দেব নামে একটি হিন্দু রাজবংশ আধিপত্য বিস্তার করে। তাদেরও রাজধানী হয় বিক্রমপুর। বর্তমানের কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম পর্যন্ত এই রাজত্ব বিস্তারলাভ করেছিল। এই বংশের রাজা দনুজ মাধব দশরথ দেব পূর্ববঙ্গের বেশ বড় একটি অঞ্চলের ওপর তার আধিপত্য বিস্তার করেন।

বাংলার সুলতানি আমল

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

১২০৪ থেকে ১২২৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলায় খিলজি বংশ রাজত্ব করেছিল। ১২২৭ থেকে ১২৮১ পর্যন্ত দিল্লীতে মামলুক সুলতানির অধীনে ১৫ জন প্রদেশ শাসক প্রশাসনের ভার নেয়। এরপর ১৩২৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বলবন শাসন চলে। কিছু বছর পর তারা স্বাধীন ভাবে বাংলাকে শাসন করতে থাকে। তুঘলক বংশের শাসনকালে ১৩২৪ থেকে ১৩৩৯ পর্যন্ত তিনজন প্রাদেশিক শাসনকর্তা সোনারগাঁও, সাতগাঁও এবং লখনভাটিতে শাষক নিযুক্ত হয়েছিলেন। পরে এদের মধ্যে ইলিয়াস শাহ এই সমস্ত অঞ্চলে তার আধিপত্য বিস্তার করেন এবং অঞ্চলগুলি ইলিয়াস শাহী বংশের স্বাধীন শাসনের অধিনস্ত হয়। ১৪৮৭ পর্যন্ত ইলিয়াস শাহী বংশ বাংলায় রাজত্ব করে যদিও ১৪১৪ থেকে ১৪৩৫ পর্যন্ত হিন্দু রাজা গণেশ ও তার পুত্র যদু (জালালুদ্দিন)বারবার ধর্মান্তরিত হয়ে হিন্দু বা মুসলমান ধর্ম গ্রহন করে বাংলার শাসনভার নিজেদের হাতে রাখে। ১৪৯৪ তে হুসেন শাহ বাংলার মসনদে বসেন। তার আগে অবশ্য কিছুদিন হাবসী (আবিসিনীয়)দের অধীনে (১৪৬৭- ১৪৯৪) বাংলাকে থাকতে হয়।

এই সময় বাংলার রাজনৈতিক পটভূমি অশান্ত।হুসেন শাহ, যাকে বাংলার সুলতানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করা হয়, জন্মেছিলেন আরবদেশে। সাংস্কৄতিক পুনরুজীবনের জন্য তার শাসনকাল বিখ্যাত। ১৫৩৮ পর্যন্ত হুসেন শাহের বংশধরেরা বাংলা শাসন করেন। এরপর ১৫৫৪ থেকে শের শাহ্‌ সুরী আমলে বাংলার শাসনভার সামলান প্রাদেশিক শাসনকর্তারা। মহম্মদ শাহ (১৫৫৪-১৫৬৪) এবং কারানি আমল অতিবাহিত হওয়ার পর মোগল সাম্রাজ্যের অধীনে সুবেদাররা বাংলা শাসন করতে থাকে।

১৫৭৪ এ মোগল সম্রাট আকবর বাংলা অধিকার করেন ও সুবেদার নিয়োগ করেন। আকবর (১৫৭৪-১৬০৬), জাহাঙ্গীর (১৬০৬-১৬২৮),শাহ্‌জাহান (১৬২৮-১৬৬০) ও ঔরঙ্গজেব (১৬৬০-১৭১২) এর আমলে মোট ২৯ জন সুবাদার বাংলা শাসন করেন।ঔরঙ্গজেব এর পর মুর্শিদকুলি খাঁ বাংলায় স্বাধীন নবাবির পত্তন করেন ১৭১৭ খ্রিষ্টাব্দে এবং পরবর্তী দশ বছর তিনি ঐ দায়িত্ব সামলেছেন।আলিবদ্দী খাঁ (১৭৪০-১৭৫৬) এর পর সিরাজ উদ্-দৌলা বাংলার মসনদে বসেন (১৭৫৭) এবং ঐ বছরেই পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্রে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে তিনি পরাজিত হন। ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৫ পর্যন্ত মীরজাফর ও মিরকাশিম এর নেতৄত্বে নবাবি শাসন চললেও এই সময়ের মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ধীরে ধীরে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হচ্ছিল।

বক্সার যুদ্ধ (১৭৬৪) বাংলার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। এ যুদ্ধে বাংলার নবাব মিরকাশিম, অযোধ্যার নবাব সুজা উদ্-দৌলা এবং মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ্‌ আলাম একযোগে কোম্পানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং পরাজয় বরণ করেন। এই যুদ্ধের ফলস্বরুপ বাংলা থেকে দিল্লী পর্যন্ত কোম্পানির  সবিশেষ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

বাংলার হিন্দু রাজন্য বর্গ

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মোগল আমলে বাংলায় বেশ কিছু হিন্দু রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বাংলার আর্থিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নসাধনে এই হিন্দু রাজাদের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। মহারাজা রুদ্রনারায়ান এর আমলে ভুরশুত রাজবংশের শাসনকালকে এদের মধ্যে সবচেয়ে পরাক্রমশালী আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। অধুনা হাওড়া ও হুগলী পর্যন্ত ভুরশুত রাজত্ব বিস্তার লাভ করেছিল। বর্ধমান রাজত্ব ছিল জমিদারী এস্টেট। ১৬৫৭ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত মোগল ও ব্রিটিশ শাসনাধীনে বর্ধমান রাজত্ব সপ্রভাব বিদ্যমান ছিল। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে উত্তরবঙ্গের কোচবিহার রাজত্ব বিকাশ লাভ করে। ব্রিটিশদের আগমন পর্যন্ত এই রাজবংশ টিকে ছিল। বাংলার বারো ভুঁইঞাদের মধ্যে সবচেয়ে ভাস্বর যশোরের হিন্দু কায়স্থ রাজা মহারাজা প্রতাপাদিত্য (১৫৬১-১৬১১) এর নাম। তিনি মোগল কতৃত্ব অস্বীকার করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং বাংলায় একটি হিন্দু রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগণা, দক্ষিণ ২৪ পরগণা, খুলনা, বরিশাল, সুন্দরবন তার রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তার বাবা শ্রীহরি বাংলার কারানি সুলতানির একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা হয়েও ১৫৭৬ এ সুলতানির অধীনতাপাশ থেকে নিজেকে মুক্ত করেন, নিজেকে স্বাধীন ঘোষণা করেন ও মহারাজা উপাধি নেন। তিনি তার রাজ্যকে দুই ভাগে ভাগ করে দুই পুত্র প্রতাপাদিত্য ও বসন্ত রায় কে তার শাসনভার অর্পণ করেন। যশোরের যুবরাজ তার রাজত্ব ও প্রজাদের রক্ষাকল্পে পর্তুগীজ ও মগ জলদস্যুদের বীরুদ্ধে বহু যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। এই দেশপ্রেমিক হিন্দু রাজা মোগল সাম্রাজ্যবাদের বীরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধ বাংলার রাজা প্রতাপাদিত্যের নামকে বাংলার হিন্দু জনমানসে অবিস্মরনীয় করে রেখেছে।

আধুনিক বাংলা (ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি)

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

দিল্লী সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে বাংলার সুবাদার ইব্রাহিম খাঁ (১৬১৭৭-১৬২৪) এর সময়ে বাংলা, বিহার ও ওড়িশায় বাণিজ্যের জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি এখানে প্রথম আসেন। মোগল সম্রাট শাহজাহানের কাছ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একটি ফরমান (রাজ ডিক্রি) লাভকরে ১৬৩৪-এ। এই ফরমান বলে তাঁরা বাংলায় একটি কারখানা স্থাপনের অনুমতি পেয়েছিল। ১৬৮২ তে সম্রাট ঔরংজেব তার প্রশাসক শায়েস্তা খাঁ এর মাধ্যমে এই মর্মে একটি বিশেষ ফরমান জারি করেন যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পাকাপাকিভাবে বাংলায় ব্যবসা করতে পারে। কোম্পানি তাদের হুগলীস্থিত কারখানায় ৩০০ বার তোপধ্বনির দ্বারা তাদের এই সাফ্যলকে উদযাপিত করেছিল। ক্রমে বাংলার বিনিয়োগ বাড়ল এবং মাদ্রাজ রেসিডেন্সি থেকে বাংলাকে আলাদা করা হল। বাংলার বাণিজ্যের কাজ তদারকির জন্য মিঃ হজ মুখ্য আধিকারিক নিযুক্ত হলেন।

১৬৯০-এ তিনটি গ্রাম- কলকাতা,গোবিন্দপুর ও সুতানুটি- ক্রয়ের মাধ্যমে কলকাতার পত্তন হল। ১৭০১-এ কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম স্থাপিত হল। ১৭৫৭-তে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ--উদ্-দৌল্লা ফোর্ট উইলিয়াম আক্রমন করলেন। এই আক্রমণই ছিল পরাধীনতার প্রথম সোপান। বার্ষিক ২৬০০০০০ টাকা কর দেওয়ার শর্তে ১২ অগাস্ট ১৭৬৫ কোম্পানি বাংলা, বিহার ও ওড়িষার দেওয়ানি লাভ করে। বাংলার নবাবদের পাশাপাশি তারাও প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হয়ে এই বিদেশী বাণিজ্য কোম্পানি নবাব এবং রাজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। রেজা খান ও সেতাব রায় কোম্পানি কর্তৃক নায়েবসুবা হিসাবে নিযুক্ত হন। বাংলার নবাব আর্থিক ক্ষমতা হারান। এটিকেই বলা হত দ্বৈত শাসন। এই ঘটনা বাংলা ও ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো বদলে দেয়। ১৭৭৯ সালে কোম্পানি দেওয়ানির দায়িত্বভার গ্রহন করে।এইভাবে দ্বৈত শাসনব্যবস্থার পরিসমাপ্তি ঘটে। (ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ‘দা রেগুলেটিং অ্যাক্ট ১৭৭৩' পাশ হয়। এইভাবে একটি ঔপনিবেশিক কাঠামোর উদ্ভব হয়। বাংলা, বিহার ও ওড়িষার ৩৫ টি জেলার প্রত্যেকটির জন্যে একজন জেলাশাসক ও একজন রাজস্ব সংগ্রাহক নিয়োগ করা হয়। ওয়ারেন হেস্টিংস গর্ভনর থেকে গর্ভনর জেনারেল হন।

ব্রিটিশদের সামাজিক ও সংস্কৃতির নীতিসমূহ এবং ইংরাজি শিক্ষার প্রসার বাংলার মানুষের মনে বিশেষত শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনয়ন করে। সমাজের বিভিন্ন অংশে একের পর এক ছোটোখাটো বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। ১৮৫৭ সালে প্রথম বড় আকারের সিপাহী বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এটি শুরু হয়েছিল বাংলায়, প্রথমে বহরমপুরে ও অতঃপর ব্যারাকপুরে। মুঘল সম্রাট ২য় বাহাদুর শাহ্‌ ও এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেন। এই মহাবিদ্রোহের পরে কোম্পানির শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং ব্রিটিশ সরকার ভারতবর্ষের শাসনভার নিজেদের হাতে তুলে নেয় এবং এই দায়িত্বে একজন ভাইসরয় নিযুক্ত করে যিনি হন প্রকৃতপক্ষে রানি ভিক্টোরিয়ার প্রতিনিধি।

উনিশ শতকের বাংলায় এক সামাজিক সাংস্কৃতিক জাগরণের ঘটনা ঘটে। রাজা রামমোহন রায়, দ্বারকানাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কেশবচন্দ্র সেন, রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দ, সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম,গিরীশ ঘোষ, জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সতেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাধ সাহা, সুরেন্দ্রনাথ ব্যার্নাজী, আনন্দমোহন বসু, শিবনাথ শাস্ত্রী, উমেশচন্দ্র বন্ধ্যোপাধ্যায় প্রমুখ প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বরা নতুন ইতিহাস রচনা করেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা বাংলা তথা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে এক নতুন উদ্যম সংযোজন করে। সেই সময় বাংলাই ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কেন্দ্রস্থল। ব্রিটিশ সরকার বাংলা ও বাঙ্গালীকে বিভক্ত করে তাকে দুর্বল করতে প্রয়াসী হয়। তারা সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরিতে সচেষ্ট হন। মিলিত পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের থেকে বিহার, ওড়িষা ও আসাম পৃথক হয়ে যায়। ১৯১১ সালে ভারতবর্ষের রাজধানী ক্যালকাটা (বর্তমানে কলকাতা) র থেকে দিল্লীতে স্থানান্তরিত হয় এবং কলকাতা হয় বাংলার রাজধানী। সেইসময় বাংলা ছিল একটি বড় রাজ্য। পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ঘটনা ও এর বিরুদ্ধে আন্দোলন এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তখন এটি প্রতিরোধ করা গেলেও শেষপর্যন্ত ১৯৪৭ সালে এই বিভাজন কার্যকর হয়।

১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ চরমপন্থি ও নরমপন্থি – এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। অরবিন্দ ঘোষ, বিপিনচন্দ্র পাল, চিত্তরঞ্জন দাস, সুভাষচন্দ্র বোস সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির পক্ষপাতী ছিলেন। উগ্র জাতিয়তাবোধের জন্ম হয়। ১৯০২ সালে বাংলায় অনুশীলন সমিতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবের সূচনা হয়। তারপর ১৯০৬ সালে যুগান্তর দল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯০৯ সালে এই সব দল গুলি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। এগুলি ছাড়াও সাধনা সমিতি, সুহৃদ সমিতি, ব্রতী সমিতি, মুক্ত সংঘ, হিন্দুস্তান সোশালিস্ট রিপাবলিকান আ্যসোসিয়েশন, বেঙ্গল ভলেন্টিয়ারস প্রভৃতি সমিতিগুলি বৈপ্লবিক আদর্শবাদ প্রচারের কাজে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।

বাংলা ও ভারতবর্ষের সংগ্রাম আন্দোলনে বৈপ্লবিক উগ্রপন্থা এক চালিকাশক্তির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। যদিও ১৯০৯ সালে এই গুলি নিষিদ্ধ করা হয় কিন্তু ১৯৩০ সালে পুনরায় বাংলার বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের দ্বিতীয় পর্যায়ের সূচনা হয়। সন্দেহ নেই ১৯৩০ সালে মাষ্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই ব্রিটিশ শাসনের ভিত নাড়িয়ে দেয়। বৈপ্লবিক চিন্তাভাবনা ও কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে বাংলা থেকে সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৭ সালে যখন ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে তখন বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয়। পশ্চিম অংশটি ভারতবর্ষের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং এই অংশের নাম হয় পশ্চিমবঙ্গ। পূর্ব অংশটি একটি প্রদেশ হিসাবে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হয়। এই প্রদেশটি ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ-এ পরিণত হয়।

কেন গন্তব্য পশ্চিমবঙ্গ

বিস্ময়ে ভরা এই রাজ্যটিতে এসে কিছুটা সময় কাটিয়ে গেলেই এই প্রশ্নটির যথোপযুক্ত উত্তর পাওয়া সম্ভব। ইতিহাস ও ঐতিহ্যে জড়িত রাজ্যের অধিবাসীরা কিছু সাংস্কৃতিক মূল্যমানকে আত্মস্থ করে নিয়েছে যার সহায়তায় তারা কেবলমাত্র অপেক্ষাকৃত ভাল মানুষই নয় বরং ভারতে সর্বোত্তম শ্রমশক্তিতে পরিণত হতে পেরেছে। এরই সঙ্গে যদি সেই বিপুল সুযোগ সুবিধার সম্ভার, যা পশ্চিমবঙ্গে আগত সকলকেই দেওয়া হয়, তাকে যুক্ত করা যায়, তাহলে পর্যটক বা লগ্নিকারি যেই হন না কেন- পশ্চিমবঙ্গ তাঁর কাছে প্রকৃত অর্থেই একটি নিরুপদ্রব ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল। তাই আসুন, আর নিজেই দেখুন আর বিস্ময়াবিষ্ট হতে থাকুন।

পশ্চিমবঙ্গের শিল্পকলা ও সংস্কৃতি

পশ্চিমবঙ্গের কোনও প্রত্যন্ত প্রান্তে পর্যবেক্ষন করলে দেখতে পাওয়া যাবে যে প্রতি ঘরে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা কোনও বা কোন পাঠ্যতালিকা বহির্ভূত কার্যকলাপে যথা সাহিত্য, সঙ্গীত, নৃত্যকলা ও চলচ্চিত্র বিষয়ে মনোনিবেশ করেছে। এমন বাড়ি খুঁজে পাওয়া খুবই দুষ্কর যেখানে পরিবারের সদস্যরা খেলাধুলা বিষয়ে কুশলতা অর্জন করেনি। পরিবারের কন্যা সদস্যা বা মহিলা সদস্যা হলে নিশ্চিত ভাবে বলা যায় যে তারা অন্তত দুধরনের নৃত্য শৈলীতে পারদর্শী হবেন। এর কারন হল পশ্চিমবঙ্গকে প্রায়শই সকল প্রকার সাংস্কৃতিক বৈশিষ্টের কেন্দ্রভুমি হিসেবে অবিহিত করা হয়। রাজ্যের রাজধানীকে বলা হয় দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী।

পশ্চিমবঙ্গ কেন এই শিরপা অর্জন করেছে তাঁর পেছনে অনেকগুলো কারন আছে। ইতিহাস ও কালানুক্রমিক ঘটনাপ্রবাহের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় যে, প্রতিটি বহিরাক্রমন ও বৈদেশিক অনুপ্রবেশের ফলে সংস্কৃতির ভান্ডারে নতুন নতুন উপাদান সন্নিবিষ্ট হয়েছে এবং ধীরে ধীরে স্বতঃই জনসাধারণের  পালনীয় ও আচরনিয় বহুবিধ রীতিনীতি ও অভ্যাস নিয়ে গড়ে ওঠা একটি ব্যবস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। একটি বিষয় এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার। পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক উত্তারাধিকারের ব্যাপক সাদৃশ্য রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে। দার্জিলিং – এর পাহাড়ি অঞ্চল ও হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলের দিকে যত অগ্রসর হওয়া যাবে মানুষের সাংস্কৃতিক রীতিনীতির মধ্যেই ততই তীব্র পরির্বতন লক্ষ্য করা যাবে।

কলকাতার নিজস্ব সামাজিক কাঠামোটি অভিনব, যা জনসাধারণের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিকাশের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। কলকাতার প্রতিটি এলাকা বা পাড়ায় একটি করে ক্লাব আছে। ক্লাবের লাগোয়া খেলার মাঠ। এই সমস্ত ক্লাবগুলিতে নৃত্য, শিল্পকলা, সঙ্গীত- শিক্ষা ক্লাসের আয়োজন করা হয়ে থাকে। ক্লাবগুলি আবার বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সংগঠিত করে, যেখানে পাড়া প্রতিবেশীর সামনে মানুষ তাদের শৈল্পিক সামর্থের প্রদর্শন করতে সমর্থ হয়। ক্লাব সংস্কৃতির আরও একটি বড় দিক হল এই যে, দিনের শেষে পাড়ার বয়োজ্যেষ্ঠরা এসে এখানে পরস্পরের সাথে মিলিত হন, এবং নানা ধরনের চলতি ঘটনা – রাজনীতি থেকে খেলাধুলা, দর্শন বা বলা যেতে পারে এই পৃথিবীর অভ্যন্তরের যে কোনও বিষয় নিয়ে চায়ের পেয়ালায় তুফান তুলে দিতে পারেন।

এই অভিনব আচার-রীতি নতুন নতুন ভাবনার জন্ম দেয়, সামাজিক প্রেক্ষাপটের মূল্যায়ন করে এবং বৈচিত্রময় বিষয়াবলির উপর জীবনবীক্ষা গড়ে তোলে। আর এসব কিছুরই মিলিত অবদানে পুষ্ট পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক আধারস্থল অতঃপর সঞ্চারিত হয়েছে ভারতীয় সংস্কৃতিতে। বিগত কয়েক শতাব্দী জুড়ে এই বিনম্র রাজ্যের মধ্যে থেকেই উঠে এসেছে অনেক বড় লেখক, কবি, নৃত্যশিল্পী, চিত্রকর, ভাস্কর, চলচ্চিত্রনির্মাতা ও গায়কেরা।

সাহিত্য

বাংলা পশ্চিমবঙ্গের প্রধান ভাষা। এক গভীর ঐতিহ্যের উত্তারাধিকার মন্ডিত এই ভাষা এযাবৎ সৃষ্ট সমস্ত ভাষাগুলির মধ্যে অন্যতম গভীর ও জটিল। এই ভাষায় যথার্থ বুৎপত্তি অর্জন করতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। তারপরেও ভাষা শিক্ষা যখন শেষ হয় তখন মনে হয় সেটা বিশাল মহাসমুদ্রের কয়েক বিন্দু জলকণার মত। এই হল বাংলা ভাষা! শৈশব থেকে বাঙালিরা চর্যাপদ থেকে শুরু করে মঙ্গল কাব্য, ঠাকুরমার ঝুলি ও আরও অনেক মহত্তম সাহিত্যকর্মের সঙ্গে পরিচিত হয়।

অতি শৈশবেই সূত্রপাত ঘটে ভাষার সঙ্গে প্রনয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ অসামান্য সাহিত্যস্রষ্টার জন্মস্থান হল এই পশ্চিমবঙ্গ। ঔপনিবেশিকতার যুগ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বাংলার সাহিত্য কীর্তির মধ্য দিয়ে সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দ ও রাজা রামমোহন রায় – এর রচনা এক্ষেত্রে প্রকৃষ্ঠ দৃষ্টান্ত। বাংলার নবজাগরণের পুরোধা ব্যক্তি বর্গের মধ্যে এঁরা অগ্রগণ্য। বিংশ শতাব্দীর উত্তরপর্বে বাংলা সাহিত্যের জগতে উত্তর-আধুনিক ভাবনার বিচ্ছুরণ ঘটে যেসব লেখকের রচনার হাত ধরে তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মানিক বন্দোপাধ্যায়, মহাশ্বেতা দেবী, সমরেশ মজুমদার প্রমুখ।

থিয়েটার ও চলচ্চিত্র

চলচ্চিত্রের প্রতি পশ্চিমবঙ্গের ভালবাসা দীর্ঘদিনের। অনেক বরেণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতার উত্থান এখানে দেখা গিয়েছে। বহু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র সৃষ্টির জন্যে আ্যকাডেমি পুরষ্কারে ভূষিত সত্যজিত রায় এবং তপন সিংহ, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের মত নির্দেশক বাংলার চলচ্চিত্র জগতকে আলোকিত করেছে। কলকাতার টালিগঞ্জ ক্ষেত্র যা টলিউড নামে খ্যাত, সেখানে প্রধান প্রধান ফিল্ম স্টুডিয়ো গুলি অবস্থিত। একে অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্য কেন্দ্র বলা হয়। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, অপর্ণা সেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ প্রমুখ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সৃষ্টি সারা বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়।

সংগীত ও নৃত্য

সঙ্গীত প্রসঙ্গে বলা যায় যে পশ্চিমবঙ্গ রবীন্দ্রসঙ্গীতের জন্মভূমি। সঙ্গীতের এই ধারাটিকে জনপ্রিয় করেছেন স্বয়ং কবি ও গীতিকার- রবীন্দ্রনাথ। সাহিত্যের জগতে তাঁর সুবিশাল অবদানের জন্যে তিনি নোবেল প্রাইজ লাভ করেন। কিন্তু অন্য স্থানের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের স্বকীয়তা এইখানেই যে, অজস্র লোক সঙ্গীত ও লোক নৃত্য শৈলীর উপস্থিতি। উদাহরণ হিসেবে বীরভূম জেলার বিভিন্ন প্রান্তে বাউল গানের সংস্কৃতির উল্লেখ করা যায়; বাউল- ফকিররা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে যৎসামান্য বাদ্য যন্ত্রের অনুষঙ্গে প্রকৃতি ও অন্যান্য বিষয় অবলম্বন করে গান করে বেড়ায়। এছাড়া আছে কীর্তন কিংবা গাজনের গানের ধারা। নৃত্যের কথা বলতে গেলে পুরুলিয়ার ছৌ- নৃত্যের কথা বলতে হবে যা সকলের ক্ষেত্রেই অবশ্য দর্শনীয় তালিকায় পড়বে।ছৌ- শিল্পীরা বর্ণময় মুখোশে আবৃত হয়ে নানাবিধ সাবেকী ঐতিহ্য মেনে নৃত্য পরিবেশন করেন। কিন্তু জনসাধারণের  রুচির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশি প্রভাব পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতিতে অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে। বিশেষ বিশেষ শহরের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে রক ও পপ সঙ্গীতের অনুষ্ঠান জনপ্রিয় হয়েছে।

শিল্পকলা

শিল্পকলার কথায় আসা যাক। বাংলার নিজস্ব একটি চিত্রশিল্প ও ভাস্কর্যশিল্পের ধারা আছে। ঔপনিবেশিক শাসনাধীন থাকার সময় এর উৎপত্তি। কলকাতা ও শান্তিনিকেতনে এর উৎপত্তির শিকড় নিহিত আছে। শিল্পের এই ধারা বা আন্দোলন, যে নামেই একে অভিহিত করা হোক না কেন, তা ছিল স্বদেশী আন্দোলনের ফলশ্রুতি। এর পথিকৃৎ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পরবর্তীকালে অনেক শিল্পীর আগমন ও নির্গমন ঘটেছে। প্রত্যেকেই তাঁর নিজস্ব শিল্পধারাটিকে বাংলার সুবিশাল শিল্পকলা ও ভাস্কর্যের ভান্ডারে যুক্ত করেছেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কালিপদ ঘোষাল, নন্দলাল বসু, যামিনী রায়, রামকিঙ্কর বেজ প্রমুখ উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক।

উৎসব

বাংলার ইতিহাস জানতে হলে দুর্গাপূজার উল্লেখ অবশ্যই করতে হবে। এটি বাংলার বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব এবং পালিত হয় সপ্তাহ জুড়ে। এই উৎসবটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ এবং সকলে এর দিকে এতটাই ঔৎসুক্য নিয়ে তাকিয়ে থাকে যে, বছরের দুর্গাপূজার সময়তাটে গোটা রাজ্যই ছুটির আবহে ঢেকে থাকে। কিন্তু দুর্গা পূজা ছাড়াও পৌষ মেলা ঈদ, দোলযাত্রা ইত্যাদি উৎসব, নবান্ন, বুদ্ধ পূর্ণিমা এবং বাঙ্গালির নববর্ষ পয়লা বৈশাখ—এর মতো অন্যান্য অনেক উৎসব এখানে পালন করা হয়।

পর্যটন

প্রাক-ঔপনিবেশিক কাল থেকেই, পশ্চিমবঙ্গ বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক পীঠস্থান।স্মরণাতিত কাল থেকেই এখানে বহু মহৎ কীর্তি জন্মলাভ করেছে- তা সে গীতিকাব্য, গদ্য, কবিতা, শিল্পকলা যাই হোক না কেন।আর এই সাংস্কৃতিক সাফল্যের পেছনে থাকা কারণ গুলির মধ্যে একটা কারণ হল এই রাজ্যের ভূসংস্থান (টোপোগ্রাফি)।সবকিছুই আছে এখানে- সাগর, নদী, অরণ্য, পাহাড়, পর্বত-সবকিছু। এত প্রেরনার উৎস পশ্চিমবঙ্গ-কে তো পরম প্রেরনাদাতা বলাই যায়- কত কাব্যেরই না জন্ম দিয়েছে সে।

ইতিহাসের পথ ধরে

যদিও ১৯০৫ সালের দেশভাগের মধ্য দিয়েই মূলত এই রাজ্যের গঠন সম্পূর্ণ হয়েছে তথাপি সেই প্রথম থেকেই পশ্চিমবঙ্গ ঐতিহ্য ও পরম্পরায় সিঞ্চিত হয়ে আছে।সারা রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে স্মৃতিসৌধ- যা স্থাপত্যবিদ্যার চমৎকার নিদর্শন।পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতাকে- তো এখনও ‘সিটি অব প্যালেসেস' বলা হয়। এইরকম বলার কারণ এটাই যে এখনও বর্তমানের কলকাতার কংক্রিটের জঙ্গলের মধ্যে বহু প্রজন্মের পুরনো চমৎকার স্থাপত্যশৈলীর সন্ধান পাওয়া যায়- তা সে মন্দির, অট্টালিকা, উত্তর কলকাতার প্রাচীন বনেদি বাড়ি বা সেই কোন কালে ব্রিটিশদের করা অজস্র ঔপনিবেশিক স্থাপত্যকীর্তির ধংস্বস্তুপ যাই হোক না কেন। সেইসময় থেকে কলকাতা বা তখনকার ‘ক্যালকাটা'- ‘সিটি অব প্যালেসেস' । একসময় এই শহর সারা ভারতের রাজধানী ছিল।

আর মন্দির আর প্রাসাদের কথায় বলা যায় যে আপনি বিষ্ণুপুরে গেলে অজস্র পোড়ামাটির মন্দির দেখতে পাবেন। আর ১৮২৪-১৮৩৮ এর মধ্যে মুর্শিদাবাদে গড়ে ওঠা হাজারদুয়ারী অন্যতম সেরা শিল্পকর্ম।এটি স্থপতি ডানকান ম্যাকলিয়ড নবাব নাজিম হুমায়ুন ঝাঁ-র জন্য বানিয়ে দিয়েছিলেন।নামেতেই বোঝা যাচ্ছে এই প্রাসাদে হাজারখানেক দরজা আছে। আর তার সাথে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ঝাড়বাতি। এই রাজ্যের অন্যতম সেরা বিস্ময়কর স্থাপত্য কীর্তি মধ্যে রয়েছে ১৮৮৭ সালে তৈরি হওয়া কুচবিহার প্রাসাদ, সেন্ট পলিস ক্যাথিড্রাল, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, দক্ষিণেশ্বরের মন্দির, রবীন্দ্র সেতু বা হাওড়া ব্রিজ। কিন্তু এইসব বি-গতকালের জৌলুশের কথা বাদ দিলেও পশ্চিমবঙ্গের প্রকৃত উৎকর্ষতা রয়েছে তার ভৌগলিক বৈচিত্রতার মধ্যে। পশ্চিমবঙ্গের বুক চিরে যাওয়া স্রোতস্বিনী গঙ্গা নদীতে নৌকাবিহার করলে দুপারের দৃশ্যাবলী আপনাকে মনে করিয়ে দেবে সেই যাত্রাপথের কথা – যে পথ ধরে গঙ্গাপারের ক্ষুদ্র সামান্য বসতি বর্তমানের সমৃদ্ধশালী পশ্চিমবঙ্গে পরিণত হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ দক্ষিণে, গাঙ্গেয় সমতলভূমি থেকে উত্তরে সেই হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চল অব্ধি বিস্তৃত হওয়ার কারণে এর বহু-সং-স্থানগত বৈচিত্র্যের মধ্যে ম্যানগ্রোভ অরণ্য ও বঙ্গোপসাগর রয়েছে।

গিরি

পশ্চিমবঙ্গ হিমালয় পর্বতসারির কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ার কারণে, এর মধ্যে রয়েছে বহূ উল্লেখযোগ্য ছোটো ছোটো পাহাড় ও উঁচু পর্বতচূড়ো যার মধ্যে অনেকগুলী পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে জনপ্রিয়। দার্জিলিং, কালিম্পং, কার্শিয়াং ও মিরিক-এরকমই কিছু জায়গা যা বছরের যে কোনো সময়ে গেলেই পাহাড়ী নিস্তরঙ্গ শান্তির মধ্যে আপনি ঢুকে পড়তে পারবেন। পৌঁছাতে পারবেন প্রকৃতির কাছাকাছি। দুঃসাহসিক মনোভাবাপন্নেরা সান্দাকফু যেতে পারেন। সেখানে সংগঠিত ভাবে পাহাড়ে চড়ার অভিযান চালাতে পারেন।সান্দাকফু ৩৬৩৬ মিটার উঁচু ও পশ্চিমবঙ্গের উচ্চতম চুড়া। এ রাজ্যের বহু অংশেই শীতকালে ভারী তুষারপাত হয়।ফলে শীতকালে এইসব পার্বত্য এলাকায় ঘুরতে গেলে বেশ আনন্দেই কাটানো যাওয়া যায়।

ম্যানগ্রোভ অরণ্য

সুন্দরবন এলাকা বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ অরণ্য এবং রাজকীয় অথচ বিপন্ন রয়াল বেঙ্গল টাইগারের জন্য বিখ্যাত। এই এলাকা মূলত জলা-প্রকৃতির। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য অসাধারন। আর ভাগ্য সহায় হলে তো রয়াল বেঙ্গল টাইগারের দূর্লভ দর্শনও মিলে যেতেও পারে।সপ্তাহের শেষটা কাটাতে  দলে দলে পর্যটক এই এলাকায় বেড়াতে আসেন এখানকার গাছপালা ও জীববৈচিত্র উপভোগ করতে।এখানে আপনি নৌকাবিহার করতে পারেন বা পূর্বনির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত সূচী অনুযায়ী দর্শনীয় স্থান দেখে বেড়াতে পারেন।

ডুয়ার্স

পূর্ব হিমালয়ে ছড়িয়ে থাকা অজস্র বানভাসী সমলভূমি ও কিছু টিলায় বহূ বনাঞ্চল ছড়িয়ে আছে।পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে এগুলিও চমৎকার।এখানকার অধিকাংশ স্থানীয়রাও মঙ্গোলীয় ধারার উত্তরসুরী। আর যে ব্যাপারটা সবচাইতে কৌতুহল জাগায় তা হল এখানকার টিলাগুলির যেদিকে সম্ভব সেদিকেই বিশাল বিশাল চা বাগান ছড়িয়ে আছে।আর আপনি যদি বন্যপ্রানীতে আগ্রহী হন তা হলে তো জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যান, গরুমারা জাতীয় উদ্যান ও বক্সার জাতীয় উদ্যান- এ যেতে পারেন। এদের প্রতেকেরই নিজস্ব অদ্বিতীয় অরন্যকুল ও জীবকুল রয়েছে। এরা নানারকম কার্যক্রম ও পর্যটনের ব্যবস্থা করে থাকে যার মাধ্যমে আপনি সারাদিন ধরে এইসব অভয়ারণ্যর মধ্যে ঘুড়ে বেড়াতে পারেন।

সাগর থেকে তীরে

পশ্চিমবঙ্গ বঙ্গোপসাগর অবধি বিস্তৃত থাকার কারণে সমুদ্রপ্রান্ত বরাবর অজস্র্র সমুদ্রসৈকত ছড়িয়ে আছে যা উডিশার সীমা অবধি পৌঁছে গেছে।শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে মুক্তির স্থান হিসাবে এইসব জনপ্রিয় সৈকতগুলী একেবারে আদর্শ।এদেরমধ্যে কয়েকটি হল দীঘা, শংকরপুর, বকখালী, তাজপুর ও মন্দারমণি।এইসব জায়গায় বিভিন্ন ধরনের থাকার বাসস্থান পাওয়া যায়। কাজেই বাজেট যাই হোক না কেন, আপনার পরিবার ও বন্ধুবান্ধব সমেত থাকবার আদর্শ জায়গা সপ্তাহ শেষে আপনি ঠিকই পেয়ে যাবেন।এখনে প্রচুর স্থানীয় রেস্তোঁরা ও খাওয়ার দোকান পাবেন যেখানে পছন্দমতো সেরা সামুদ্রিক খাবার পাওয়া যায়।এখানে নানা সস্তা জিনিসের বাজার আছে যেখানে অনেক স্থানীয় কুটিরশিল্প জাত জিনিসপত্র পাওয়া যায়।

শান্তিনিকেতন

নোবেলজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরর অসংখ্য কীর্তির মাধ্যমে বীরভূম জেলার এই ছোট্ট শহরটি বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। সাধারণত শান্ত এই শহরটি পৌষমেলার সময় জেগে ওঠে। চারিদিক থেকে দলে দলে লোক সময় কাটানোর উদ্দেশ্যে এখানে আসে।এই উপলক্ষ্যে বহু জায়গা থেকেই মানুষের আগমন ঘটে এখানে- একসাথে জড়ো হন লোকগীতি-গায়ক, নৃত্যশিল্পী, শিল্পী, কবি ও লেখকেরাও।এই ছোট্ট শহরটিতে বিশ্বভারতীর মত বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গনও রয়েছে যেখান থেকে আপনার পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি ও ইতিহাস সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি লাভ করা সম্ভব।

তবে শান্তিনিকেতনের সবচাইতে উল্লেখযোগ্য বিষয়টা হল এটাই যে এখানে আপনি প্রাণ ভরে বাউল সুর উপভোগ করতে পারেন। বাউল একধরনের লোক-গীতিমূলক সুর।এই সুর বাউল ফকির ও সাধু-সন্ন্যাসীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। যে কেউই এই সুরে সুর মেলাতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গের শিল্পকলা ও সংস্কৃতি

পশ্চিমবঙ্গের কোনও প্রত্যন্ত প্রান্তে পর্যবেক্ষন করলে দেখতে পাওয়া যাবে যে প্রতি ঘরে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা কোনও বা কোন পাঠ্যতালিকা বহির্ভূত কার্যকলাপে যথা সাহিত্য, সঙ্গীত, নৃত্যকলা ও চলচ্চিত্র বিষয়ে মনোনিবেশ করেছে। এমন বাড়ি খুঁজে পাওয়া খুবই দুষ্কর যেখানে পরিবারের সদস্যরা খেলাধুলা বিষয়ে কুশলতা অর্জন করেনি। পরিবারের কন্যা সদস্যা বা মহিলা সদস্যা হলে নিশ্চিত ভাবে বলা যায় যে তারা অন্তত দুধরনের নৃত্য শৈলীতে পারদর্শী হবেন। এর কারন হল পশ্চিমবঙ্গকে প্রায়শই সকল প্রকার সাংস্কৃতিক বৈশিষ্টের কেন্দ্রভুমি হিসেবে অবিহিত করা হয়। রাজ্যের রাজধানীকে বলা হয় দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী।

পশ্চিমবঙ্গ কেন এই শিরপা অর্জন করেছে তাঁর পেছনে অনেকগুলো কারন আছে। ইতিহাস ও কালানুক্রমিক ঘটনাপ্রবাহের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় যে, প্রতিটি বহিরাক্রমন ও বৈদেশিক অনুপ্রবেশের ফলে সংস্কৃতির ভান্ডারে নতুন নতুন উপাদান সন্নিবিষ্ট হয়েছে এবং ধীরে ধীরে স্বতঃই জনসাধারণের  পালনীয় ও আচরনিয় বহুবিধ রীতিনীতি ও অভ্যাস নিয়ে গড়ে ওঠা একটি ব্যবস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। একটি বিষয় এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার। পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক উত্তারাধিকারের ব্যাপক সাদৃশ্য রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে। দার্জিলিং – এর পাহাড়ি অঞ্চল ও হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলের দিকে যত অগ্রসর হওয়া যাবে মানুষের সাংস্কৃতিক রীতিনীতির মধ্যেই ততই তীব্র পরির্বতন লক্ষ্য করা যাবে।

কলকাতার নিজস্ব সামাজিক কাঠামোটি অভিনব, যা জনসাধারণের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিকাশের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। কলকাতার প্রতিটি এলাকা বা পাড়ায় একটি করে ক্লাব আছে। ক্লাবের লাগোয়া খেলার মাঠ। এই সমস্ত ক্লাবগুলিতে নৃত্য, শিল্পকলা, সঙ্গীত- শিক্ষা ক্লাসের আয়োজন করা হয়ে থাকে। ক্লাবগুলি আবার বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সংগঠিত করে, যেখানে পাড়া প্রতিবেশীর সামনে মানুষ তাদের শৈল্পিক সামর্থের প্রদর্শন করতে সমর্থ হয়। ক্লাব সংস্কৃতির আরও একটি বড় দিক হল এই যে, দিনের শেষে পাড়ার বয়োজ্যেষ্ঠরা এসে এখানে পরস্পরের সাথে মিলিত হন, এবং নানা ধরনের চলতি ঘটনা – রাজনীতি থেকে খেলাধুলা, দর্শন বা বলা যেতে পারে এই পৃথিবীর অভ্যন্তরের যে কোনও বিষয় নিয়ে চায়ের পেয়ালায় তুফান তুলে দিতে পারেন।

এই অভিনব আচার-রীতি নতুন নতুন ভাবনার জন্ম দেয়, সামাজিক প্রেক্ষাপটের মূল্যায়ন করে এবং বৈচিত্রময় বিষয়াবলির উপর জীবনবীক্ষা গড়ে তোলে। আর এসব কিছুরই মিলিত অবদানে পুষ্ট পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক আধারস্থল অতঃপর সঞ্চারিত হয়েছে ভারতীয় সংস্কৃতিতে। বিগত কয়েক শতাব্দী জুড়ে এই বিনম্র রাজ্যের মধ্যে থেকেই উঠে এসেছে অনেক বড় লেখক, কবি, নৃত্যশিল্পী, চিত্রকর, ভাস্কর, চলচ্চিত্রনির্মাতা ও গায়কেরা।

সাহিত্য

বাংলা পশ্চিমবঙ্গের প্রধান ভাষা। এক গভীর ঐতিহ্যের উত্তারাধিকার মন্ডিত এই ভাষা এযাবৎ সৃষ্ট সমস্ত ভাষাগুলির মধ্যে অন্যতম গভীর ও জটিল। এই ভাষায় যথার্থ বুৎপত্তি অর্জন করতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। তারপরেও ভাষা শিক্ষা যখন শেষ হয় তখন মনে হয় সেটা বিশাল মহাসমুদ্রের কয়েক বিন্দু জলকণার মত। এই হল বাংলা ভাষা! শৈশব থেকে বাঙালিরা চর্যাপদ থেকে শুরু করে মঙ্গল কাব্য, ঠাকুরমার ঝুলি ও আরও অনেক মহত্তম সাহিত্যকর্মের সঙ্গে পরিচিত হয়।

অতি শৈশবেই সূত্রপাত ঘটে ভাষার সঙ্গে প্রনয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ অসামান্য সাহিত্যস্রষ্টার জন্মস্থান হল এই পশ্চিমবঙ্গ। ঔপনিবেশিকতার যুগ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বাংলার সাহিত্য কীর্তির মধ্য দিয়ে সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দ ও রাজা রামমোহন রায় – এর রচনা এক্ষেত্রে প্রকৃষ্ঠ দৃষ্টান্ত। বাংলার নবজাগরণের পুরোধা ব্যক্তি বর্গের মধ্যে এঁরা অগ্রগণ্য। বিংশ শতাব্দীর উত্তরপর্বে বাংলা সাহিত্যের জগতে উত্তর-আধুনিক ভাবনার বিচ্ছুরণ ঘটে যেসব লেখকের রচনার হাত ধরে তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মানিক বন্দোপাধ্যায়, মহাশ্বেতা দেবী, সমরেশ মজুমদার প্রমুখ।

থিয়েটার ও চলচ্চিত্র

চলচ্চিত্রের প্রতি পশ্চিমবঙ্গের ভালবাসা দীর্ঘদিনের। অনেক বরেণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতার উত্থান এখানে দেখা গিয়েছে। বহু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র সৃষ্টির জন্যে আ্যকাডেমি পুরষ্কারে ভূষিত সত্যজিত রায় এবং তপন সিংহ, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের মত নির্দেশক বাংলার চলচ্চিত্র জগতকে আলোকিত করেছে। কলকাতার টালিগঞ্জ ক্ষেত্র যা টলিউড নামে খ্যাত, সেখানে প্রধান প্রধান ফিল্ম স্টুডিয়ো গুলি অবস্থিত। একে অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্য কেন্দ্র বলা হয়। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, অপর্ণা সেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ প্রমুখ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সৃষ্টি সারা বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়।

সংগীত ও নৃত্য

সঙ্গীত প্রসঙ্গে বলা যায় যে পশ্চিমবঙ্গ রবীন্দ্রসঙ্গীতের জন্মভূমি। সঙ্গীতের এই ধারাটিকে জনপ্রিয় করেছেন স্বয়ং কবি ও গীতিকার- রবীন্দ্রনাথ। সাহিত্যের জগতে তাঁর সুবিশাল অবদানের জন্যে তিনি নোবেল প্রাইজ লাভ করেন। কিন্তু অন্য স্থানের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের স্বকীয়তা এইখানেই যে, অজস্র লোক সঙ্গীত ও লোক নৃত্য শৈলীর উপস্থিতি। উদাহরণ হিসেবে বীরভূম জেলার বিভিন্ন প্রান্তে বাউল গানের সংস্কৃতির উল্লেখ করা যায়; বাউল- ফকিররা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে যৎসামান্য বাদ্য যন্ত্রের অনুষঙ্গে প্রকৃতি ও অন্যান্য বিষয় অবলম্বন করে গান করে বেড়ায়। এছাড়া আছে কীর্তন কিংবা গাজনের গানের ধারা। নৃত্যের কথা বলতে গেলে পুরুলিয়ার ছৌ- নৃত্যের কথা বলতে হবে যা সকলের ক্ষেত্রেই অবশ্য দর্শনীয় তালিকায় পড়বে।ছৌ- শিল্পীরা বর্ণময় মুখোশে আবৃত হয়ে নানাবিধ সাবেকী ঐতিহ্য মেনে নৃত্য পরিবেশন করেন। কিন্তু জনসাধারণের  রুচির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশি প্রভাব পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতিতে অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে। বিশেষ বিশেষ শহরের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে রক ও পপ সঙ্গীতের অনুষ্ঠান জনপ্রিয় হয়েছে।

শিল্পকলা

শিল্পকলার কথায় আসা যাক। বাংলার নিজস্ব একটি চিত্রশিল্প ও ভাস্কর্যশিল্পের ধারা আছে। ঔপনিবেশিক শাসনাধীন থাকার সময় এর উৎপত্তি। কলকাতা ও শান্তিনিকেতনে এর উৎপত্তির শিকড় নিহিত আছে। শিল্পের এই ধারা বা আন্দোলন, যে নামেই একে অভিহিত করা হোক না কেন, তা ছিল স্বদেশী আন্দোলনের ফলশ্রুতি। এর পথিকৃৎ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পরবর্তীকালে অনেক শিল্পীর আগমন ও নির্গমন ঘটেছে। প্রত্যেকেই তাঁর নিজস্ব শিল্পধারাটিকে বাংলার সুবিশাল শিল্পকলা ও ভাস্কর্যের ভান্ডারে যুক্ত করেছেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কালিপদ ঘোষাল, নন্দলাল বসু, যামিনী রায়, রামকিঙ্কর বেজ প্রমুখ উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক।

উৎসব

বাংলার ইতিহাস জানতে হলে দুর্গাপূজার উল্লেখ অবশ্যই করতে হবে। এটি বাংলার বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব এবং পালিত হয় সপ্তাহ জুড়ে। এই উৎসবটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ এবং সকলে এর দিকে এতটাই ঔৎসুক্য নিয়ে তাকিয়ে থাকে যে, বছরের দুর্গাপূজার সময়তাটে গোটা রাজ্যই ছুটির আবহে ঢেকে থাকে। কিন্তু দুর্গা পূজা ছাড়াও পৌষ মেলা ঈদ, দোলযাত্রা ইত্যাদি উৎসব, নবান্ন, বুদ্ধ পূর্ণিমা এবং বাঙ্গালির নববর্ষ পয়লা বৈশাখ—এর মতো অন্যান্য অনেক উৎসব এখানে পালন করা হয়।

2.95652173913
মন্তব্য যোগ করুন

(ওপরের বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন মন্তব্য / পরামর্শ থাকে, তাহলে দয়া করে আমাদের উদ্দেশ্যে পোস্ট করুন).

Enter the word
ন্যাভিগেশন
Back to top