ভাগ করে নিন
ভিউজ্
  • অবস্থা সম্পাদনার জন্য উন্মুক্ত

একাকার

কোনও দিন স্কুলে না যাওয়া, প্রান্তিক মুসলিম মেয়েরাও সীতা আর বড় রানির দুঃখে গান গায়। মুর্শিদাবাদের লোকগানে মেয়েদের অবস্থান নিয়ে আলোচনা করেছেন মৌসুমী বিলকিস।

এক মেয়ে ডুবে যাচ্ছে। কুয়োর মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে তাকে, শুকনো কুয়োর মধ্যে। কিন্তু কী আশ্চর্য বহু বছর ধরে শুকিয়ে থাকা কুয়োতে জল উঠছে। পায়ের আঙুল ছুঁয়েছে জল। কুলকুল করে পায়ের পাতা ডুবিয়ে হাঁটু ডুবিয়ে জঙ্ঘা স্পর্শ করে মেয়েটিকে স্নান করিয়ে দিতে চেয়েছে শীতল জল। তার মখমলের বিষণ্ণ শাড়ি ভেসে উঠছে জলের ওপর। দাবদাহে বিধ্বস্ত শরীর পাচ্ছে প্রত্যাশিত স্পর্শ। জল উঠছে তার স্থূল কোমর স্পর্শ করে, বিগতযৌবনা বুক স্পর্শ করে। মজা হল কুয়োটির চারপাশে দাঁড়িয়ে মেয়েটির ডুবে যাওয়া লাইভ দেখছে রামকানহাই রাজা, রাজসভায় সদ্য আগত এক গণক ঠাকুর, রাজার পারিষদবর্গ। জগতের সব পুরুষ চোখ তাকিয়ে আছে মেয়েটির ভেজা ও বিধ্বস্ত শরীরের দিকে। আর হয়তো চিকের আড়াল থেকে রাজার অন্যান্য রানিরা আর রাজবাড়ির মেয়েরাও দেখতে চেষ্টা করছে ডুবে যাওয়ার দৃশ্য।

কেউ হয়তো ফেলছে দীর্ঘশ্বাস। আসলে ডুবে-যাচ্ছে -মেয়েটি তো রাজার বড় রানি। সে গাইছে একটি গান, ডুবে যেতে যেতে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত বাঁচার আকুতি জানাতে জানাতে। কিন্তু রাজা নির্বিকার। সে গানের সুর কান্নার মতো। গানটি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত শুনলে এক জন মেয়ের ধীরে ধীরে ডুবে যাওয়ার ঘটনাটি নিজের শরীর দিয়ে অনুভব করা যায়। দেখতে পাচ্ছে শ্রোতা অথচ করার কিছু নেই। শুধু ভিজে যায় চোখ। গানটির চরণগুলি প্রায় এক, শুধু প্রত্যেকটি চরণে পাল্টে যায় কিছু শব্দ। অনেক লোকগান, ছড়া বা কাহিনিতে যা খুবই স্বাভাবিক। গানটি শুনেছিলাম এক বৃদ্ধার কাছ থেকে। ২০০৭ সালের এক বিকেলে যখন তাঁকে খুঁজে পেলাম তখন তিনি মেয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন মুর্শিদাবাদ জেলার ডোমকলে, ছেলেদের সংসার থেকে বিতাড়িত হয়ে তাঁর নিজস্ব জীবনটিও ডুবে যাওয়ারই, যে ডুবে যাওয়া হয়তো প্রত্যেকটি মেয়েরই গল্প। বৃদ্ধা জমেলা বেওয়া জানিয়েছিলেন তাঁর বয়স চার কুড়ি, মানে আশির কোঠায়। কয়েক বছর পর তিনি মারা যাবেন। তাঁর অজস্র গান, ছড়া আর কাহিনিগুলোও চলে যাবে তাঁর সঙ্গে গভীর ঘুমের দেশে। রানির গানটা গাওয়ার আগে তিনি একটি ছোট্টো তথ্যসূত্র দিয়েছিলেন। তা হল, রামকানহাই রাজার রাজ্যে বহু বছর ধরে খরা চলছে। নদী, পুকুর সব শুকিয়ে গেছে। মাঠে ফসল নেই। প্রজাদের মধ্যে হাহাকার। দাবদাহে গাছপালায় নেই প্রাণ। রাজবাড়ির বিশাল কুয়োটিও শুকিয়ে বালিময় হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে সঙ্গীন অবস্থা। রাজা তুকতাক, ঝাড়ফুঁক কিছু করতেই বাকি রাখেননি। রাজসভার গণকরাও ব্যর্থ। সবাই যখন হতাশ, রাজসভায় এল এক গণক ঠাকুর। সে তার নানান রকম বিদ্যে প্রয়োগ করে জানাল বড়রানিকে রাজবাড়ির কুয়োতে ফেলে দিলে জল পাওয়া যাবে। খরা থেকে মুক্তি পাবে রাজ্য। গণকের কথা রামকানহাই রাজা পালন করলেন। যে ভাবে প্রজা স্বার্থে বা পরিবারের স্বার্থে বলি হতে দেখা যায় মেয়েদের, পুরাণ থেকে সমকালেও। তার পর সেই কান্নার মতো গান। গানটি মুর্শিদাবাদের ডায়ালেক্টে। তবু বুঝতে সমস্যা হবে বলে মনে হয় না।

লোগ শরিক পানি রাজা ত্যালে শরিক হল রে/এখুনো বুল রাজা বাড়িতে উঠে আসি রে/রামকানহাই রাজা রে। / ত্যালে শরিক পানি রাজা গিরে শরিক হল রে/এখুনো বুল রাজা বাড়িতে উঠে আসি রে/রামকানহাই রাজা রে।/গিরে শরিক পানি রাজা লল্হা শরিক হল রে/এখুনো বুল রাজা বাড়িতে উঠে আসি রে/রামকানহাই রাজা রে/ লল্হা শরিক পানি রাজা হাঁটু শরিক হল রে/এখুনো বুল রাজা বাড়িতে উঠে আসি রে/রামকানহাই রাজা রে।/হাঁটু শরিক পানি রাজা দাপ্না শরিক হল রে/এখুনো বুল রাজা বাড়িতে উঠে আসি রে/রামকানহাই রাজা রে।/ দাপ্না শরিক পানি রাজা মান্জা শরিক হল রে/এখুনো বুল রাজা বাড়িতে উঠে আসি রে/রামকানহাই রাজা রে।/মান্জা শরিক পানি রাজা প্যাট শরিক হল রে/ এখুনো বুল রাজা বাড়িতে উঠে আসি রে/রামকানহাই রাজা রে।/প্যাট শরিক নি রাজা বুক শরিক হল রে/এখুনো বুল রাজা বাড়িতে উঠে আসি রে/রামকানহাই রাজা রে।/বুক শরিক পানি রাজা গলা শরিক হল রে/এখুনো বুল রাজা বাড়িতে উঠে আসি রে/ রামকানহাই রাজা রে।/গলা শরিক পানি রাজা থুতনি শরিক হল রে/এখুনো বুল রাজা বাড়িতে উঠে আসি রে/রামকানহাই রাজা রে।/থুতনি শরিক পানি রাজা লাক্শরিক হল রে/ এখুনো বুল রাজা বাড়িতে উঠে আসি রে/রামকানহাই রাজা রে৷/ লাক্শরিক পানি রাজা কপাল শরিক হল রে/এখুনো বুল রাজা বাড়িতে উঠে আসি রে/রামকানহাই রাজা রে।/ কপাল শরিক পানি রাজা চান্দি শরিক হল রে/এখুনো বুল রাজা বাড়িতে উঠে আসি রে/রামকানহাই রাজা রে।/চান্দি শরিক পানি রাজা মাথা শরিক হল রে/এখুনো বুল রাজা বাড়িতে উঠে আসি রে/রামকানহাই রাজা রে।/মাথা শরিক পানি রাজা লিতল হনু রে/এখুনো বুল রাজা বাড়িতে উঠে আসি রে/রামকানহাই রাজা রে।

(লোগ-আঙুল; শরিক-সমান; ত্যালে-তালু; বুল-বল; গিরে-গিঁট; লল্হা-নলের মতো বলে পায়ের নীচের অংশ; দাপ্না-জঙ্ঘা; মান্জা-মাজা বা কোমর; প্যাট- পেট; লাক্-নাক; চান্দি-চাঁদি; লিতল-তল নাই যার, সম্পূর্ণ ডুবে যাওয়া)

আর কারও কাছে এই গান শুনিনি। এমনকী ছোটবেলার কথকতার আসরেও কোনও কথক রামকানহাই রাজা বা রানির প্রসঙ্গে একটি কথাও বলেননি। তা থেকে মনে হয় বোধ হয় মহিলারাই রামকানহাই রাজার সমালোচনা করে গানটি বেঁধেছিলেন এবং গানটি কোনও কাহানি’র (কথকতা, মুর্শিদাবাদ) অংশও হতে পারে। যেমন মুসলিম মেয়েরা তাঁদের বিয়ের গানে সীতাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য রামের সমালোচনা করতে ছাড়েননি।

‘না দিব না দিব গো সাদি দশরথের ছেলে/সোনার পুত্লি পুড়াই মারবে আগুনে ফেলে’ (মুসলিম বিয়ের গানে বাঙালি মুসলিম সমাজ - মনোয়ারা খাতুন)৷ বিয়ের গান একান্তই মেয়েদের। তাদের যাবতীয় আলোচনা, সমালোচনা, কামনা, বাসনা ধরা পড়ে বিয়ের গানে। আর অদ্ভুত ভাবে একটি বিয়ের গানে রামকানহাই রাজা ও তাঁর বড় রানির উল্লেখ পাচ্ছি। গানটি সংগ্রহ করেছিলাম মুর্শিদাবাদ জেলার জোতপরমানন্দ গ্রাম থেকে (শুনিয়েছিলেন যাঁরা : খুশিনা বিবি, লতিফা বিবি, আমেজান বিবি, নছিয়া বিবি, বেগম বিবি, বেলেজান বেওয়া)। এই গানটিকে বলা যায় প্রথম গানটির পূর্বসূত্র। অর্থাৎ রানিকে কুয়োতে ফেলে দেওয়ার আগেই নিজের জীবন থেকে তাঁকে বিসর্জন দিয়েছেন রাজা। এখানে রাজার দ্বিতীয় স্ত্রী আসার পর বড় রানির সঙ্গে তাঁর কথোপকথন ধরা আছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তবক তুলে দিলাম -- এটু জাগা দ্যাও রে রাজা, শুব তুমার পাশে/এখানে জাগা হবে না রে ফুলবতী কন্যে রে।/সিতানে জাগা দ্যাও রে রাজা, শুব তুমার সিতানে।/সিতানে জাগা হবে না রে, ফুলবতী কন্যে রে।/সিতানে আমার গাড়ু থাকবে রে, ফুলবতী কন্যে রে।/ পোথেনে জাগা দ্যাও রে রাজা, শুব তুমার পোথেনে/রামকানহাই রাজা রে।/ পোথেনে জাগা হবে না রে, ফুলবতী কন্যে রে।/পোথেনে আমার কুত্তা শুয়ে থাকবে রে।/এটু জাগা দ্যাও রে রাজা, শুব তুমার পাশে।/ও রামকানহাই রাজা রে। (এটু-একটু; তুমার-তোমার; সিতানে-শিয়রে; পোথেনে-পায়ের দিকে)।

লোকগল্পে, রূপকথায় বড় রানিদের জার্নি অশেষ দুঃখ কষ্টের মধ্য দিয়ে। দিব্যজ্যোতি মজুমদার লোকগল্পের রূপতত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখিয়েছেন দেশি বিদেশি অনেক লোকগল্পের মূলটা এক। বড় রানির ডুবে যাওয়ার গানটাও সীতার জীবন অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে এই গানের জনপ্রিয়তা নির্ণয় করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু এক বৃদ্ধা যখন গানটি মনে রেখেছেন তখন অনুমান করা যায় বহু শ্রীতিবাহিত হয়ে গানটি তাঁর কাছে পৌঁছেছিল। বলিপ্রদত্ত একটি জীবনের কথা মুসলমান সমাজে নতুন নয়। মুসলিম ধর্মে নবি ইসমাইলের আত্মবলিদানের প্রসঙ্গটি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় কোরবানি ঈদের মাধ্যমে। কিন্তু সে গল্পে বলা হয় স্বয়ং নবি ইসমাইল স্বেচ্ছায় তাঁর গলা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আর সীতা শুধু এক ধর্মীয় গ্রন্থের চরিত্র নয়, সে শ্রুতিবাহিত লোকগল্পেরও চরিত্র। আর রামায়ণের গল্প বাঙালি মুসলিমদের মধ্যেও সমান জনপ্রিয়। মেয়েরা সীতাকে দেখে নিজেদেরই এক দোসর হিসেবে। তাই তাঁর পক্ষ নিয়ে গান বাঁধে তারা। ডুবে যাওয়ার গানটিও কী সেই সহমর্মিতা থেকেই তৈরি হয়ে যায়? এখানে বড় রানিও বলি হচ্ছে প্রজাদের ও রাজ্যের মঙ্গলের জন্য। স্যালি জে সাদারল্যান্ড তাঁর সীতা ও দ্রৌপদী বিষয়ক গবেষণাপত্রে (ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭৯) জানিয়েছিলেন উত্তরপ্রদেশের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে সীতা আইডিয়াল নারী চরিত্রের রোল মডেল হিসেবে গৃহীত (এক হাজার জনের মতামতের ভিত্তিতে)৷ এই মত বোধ হয় এখনও রামায়ণ-প্রচলিত ভূখণ্ডে সবখানেই সত্যি। তাই কোনও দিন স্কুলে না যাওয়া, প্রান্তিক মুসলিম মেয়েরাও সীতা আর বড় রানির দুঃখে গান গায়। কোথাও এই চরিত্রগুলির সঙ্গে নিজেদের জীবনটিও একাকার হয়ে যায়। শ্রুতি-স্মৃতি বাহিত তাঁদের প্রতিবাদ ধারালো ফলায় আলোর ঝলকানি যা কেবল মর্মে এসেই বিঁধতে পারে, ঘটাতে পারে রক্তপাত।

সূত্র: এই সময়, রবিবারোয়ারি, ৮ মার্চ, ২০১৫,

3.10256410256
মন্তব্য যোগ করুন

(ওপরের বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন মন্তব্য / পরামর্শ থাকে, তাহলে দয়া করে আমাদের উদ্দেশ্যে পোস্ট করুন).

Enter the word
ন্যাভিগেশন
Back to top