হোম / স্বাস্থ্য / আয়ুশ / চিরায়ত চিকিৎসা আধুনিক চিকিৎসাব্য‌বস্থার বন্ধু না শত্রু?
ভাগ করে নিন
ভিউজ্
  • অবস্থা সম্পাদনার জন্য উন্মুক্ত

চিরায়ত চিকিৎসা আধুনিক চিকিৎসাব্য‌বস্থার বন্ধু না শত্রু?

স্বাস্থ্যক্ষেত্রে চিরায়ত চিকিৎসাপদ্ধতিরও যে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে তা এখানে জানানো হয়েছে।

সন্দেহ থাকা সত্ত্বেও ডবলুএইচও আকুপাংচার এবং আয়ুর্বেদকে স্বীকৃতি দিয়েছে। সময় এসেছে এই ধরনের চিকিৎসা ব্য‌বস্থাকে তুলে ধরার।

অরবিন্দ সিং তাঁর পিঠের যন্ত্রণার জন্য‌ মুম্বইয়ের বিজয়নগরে এক আকুপাংচারিস্টের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। পরিবারের তিনি একমাত্র রোজগেরে মানুষ। কিন্তু অস্বাভাবিক পিঠের যন্ত্রণার জন্য‌ তাঁকে সিকিউরিটি গার্ডের কাজ ছেড়ে দিতে হয়েছিল। তাঁর স্ত্রী অনিতার বক্তব্য‌, ‘‘এক্স রে করালাম, সিটি স্ক্য‌ান, রক্ত পরীক্ষা—কিছুই বাদ রইল না। কিন্তু কোনও রোগ ধরা পড়ল না। চিকিৎসকরা একগাদা ব্য‌থা কমানোর ওষুধ দিয়ে বললেন, অস্ত্রোপচার ছাড়া উপায় নেই। অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি আর খরচ প্রচুর।’’ এর পর অরবিন্দ আকুপাংচারিস্টের সন্ধান পান। তিনি ১৫ দিন চিকিৎসা (প্রতি সিটিংয়ের খরচ মাত্র ২০ টাকা) করে তাঁকে সম্পূর্ণ ভালো করে তোলেন। যে সংস্থায় অরবিন্দ আকুপাংচার করিয়েছিলেন তার নাম বেয়ারফুট আকুপাংচারিস্ট।

২০০৮ সালে বেলজিয়ান ওয়াল্টার ফিশার বেয়ারফুট আকুপাংচারিস্ট প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে এই সংস্থার চারটি ক্লিনিক রয়েছে। দু’টি মুম্বইয়ের বস্তি এলাকায় এবং দু’টি তামিলনাড়ুর গ্রামীণ এলাকায়। এদের কাজ নিম্ন আয়ের মানুষজনের মধ্য‌ে প্রায় নিখরচায় চিকিৎসাপরিষেবা পৌঁছে দেওয়া। উন্নয়নশীল এলাকায় কম খরচে চিকিৎসাপরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্য‌ম হিসাবে এখন আয়ুর্বেদ ও আকুপাংচারের মতো চিরায়ত চিকিৎসাব্য‌বস্থাকে মেনে নেওয়া হয়েছে। ভারতে গ্রামাঞ্চলের ৬৫ শতাংশ মানুষ গাছগাছালি থেকে প্রাপ্ত ওষুধকে প্রাথমিক পর্বের চিকিৎসার প্রধান উপাদান হিসাবে ব্য‌বহার করেন। আফ্রিকায় চিরায়ত চিকিৎসা ব্য‌বস্থাকে ব্য‌বহার করা হয় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে। চিনে চিরায়ত পদ্ধতিতে ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসা হয়। ২০০৮ সালে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের ডিরেক্টর জেনারেল মার্গারেট চ্য‌ান বলেছেন, ‘‘বহু লক্ষ মানুষের কাছে, বিশেষত যাঁরা উন্নয়নশীল দেশগুলির গ্রামীণ এলাকায় বাস করেন তাঁদের কাছে চিরায়ত চিকিৎসা ব্য‌বস্থা এবং এই পদ্ধতিতে যাঁরা পরিষেবা দেন সেই সব চিকিৎসকই চিকিৎসাপরিষেবার প্রধান বা একমাত্র মাধ্য‌ম। এই চিকিৎসার ব্য‌য়ভার তাঁরা বহন করতে পারেন এবং বাড়ির কাছেই তা পাওয়া যায়।’’ সম্প্রতি ডবলুএইচও ট্রাডিশনাল মেডিসিন স্ট্র্য‌াটেজি ২০১৪-২০২৩ প্রকল্প হাতে নিয়েছে যার লক্ষ্য‌ হল অ্য‌ালোপ্য‌াথির মতো আধুনিক চিকিৎসাব্য‌বস্থার সঙ্গে চিরায়ত ব্য‌বস্থাকেও ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং চিরায়ত চিকিৎসা পদ্ধতি যাতে আধুনিক বিশ্বের রোগ সারানো, স্বাস্থ্য‌ পরিষেবার সার্বিক অবস্থার গুণগত উন্নতিতে সাহায্য‌ করার উপযুক্ত মানে পৌঁছতে পারে সেই ব্য‌বস্থা করা।

নন কমিউনিকেবল ডিজিজ (এনসিডি) বা ছোঁয়াচে নয় এমন রোগের ক্ষেত্রে চিরায়ত চিকিৎসা ব্য‌বস্থার বিভিন্ন রূপ খুবই কার্যকর। উন্নয়নশীল দেশে এ ধরনের রোগ একটা বিরাট সমস্য‌ার সৃষ্টি করে। নিম্ন ও মধ্য‌ রোজগেরে মানুষদের মধ্য‌ে ৮০ শতাংশ এনএসডি জাতীয় রোগে (যেমন হার্টের রোগ, ক্য‌ান্সার, ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রভৃতি) প্রাণ হারান। উন্নয়নশীল দেশে এই ধরনের রোগে মৃতের সংখ্য‌া প্রতি বছর প্রায় ৩ কোটি ৬০ লক্ষ।

আয়ুর্বেদ চেইন অফ আয়ুর্বেদিক হসপিটালের প্রতিষ্ঠাতা রাজীব বাসুদেবনের মন্তব্য‌, ‘‘আজকের চটপটে সমাজ রোগ সারানোর জন্য‌ চটপটে পিল বা সার্জারির দিকে ঝুঁকছে। চিরায়ত চিকিৎসা ব্য‌বস্থা কিন্তু রোগের একেবারে গোড়ায় গিয়ে রোগ নির্মূল করে। অ্য‌ালোপ্য‌াথিক মেডিসিন কেবলমাত্র সিম্পটম বা রোগের লক্ষ্মণ অনুযায়ী চিকিৎসা করে।’’ উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, অ্য‌ালোপ্য‌াথিক ওষুধ খাইয়ে রক্তচাপকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায় কিন্তু উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার মূল কারণকে দূর করা যায় না। এক জন ব্য‌ক্তির গঠন, তাঁর পারিপার্শ্বিক অবস্থা, খাদ্য‌াভ্য‌াসের বিচার করে তবেই রোগের মূল কারণ নির্ণয় করতে হয়। বাসুদেবনের বক্তব্য‌, ‘‘আয়ুর্বেদ অ্য‌ালোপ্য‌াথির তৎকালীন জরুরি চিকিৎসা ব্য‌বস্থার পাশাপাশি রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।’’ তিনি মনে করেন, নিম্নআয়ের লোকজন এই বিকল্প পদ্ধতির চিকিৎসা নিয়ে সহজেই ভাল থাকতে পারেন। তাঁর মন্তব্য‌, ‘‘কিছু কিছু ক্ষেত্রে আয়ুর্বেদ শল্য‌ চিকিৎসার বিকল্প হতে পারে। শল্য‌চিকিৎসার ক্ষেত্রে অনেক সময় বেশি খরচ, চিকিৎসার একমুখীন প্রয়োগজনিত অসুবিধা এবং প্রাণশক্তির ক্ষয় হয়। আয়ুর্বেদের ক্ষেত্রে এই অসুবিধা নেই। ভঙ্গুর গোষ্ঠীগুলির ক্ষেত্রে আয়ুর্বেদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্য‌বস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’’ চিরায়ত চিকিৎসা ব্য‌বস্থার সাফল্য‌ দেখে ভারত সরকার একে জাতীয় প্রকল্পের অন্তর্গত করে নিয়েছ। আয়ুর্বেদ, যোগ, নেচারোপ্য‌াথি, ইউনানি, সিদ্ধা এবং হোমিওপ্য‌াথি (আয়ুশ) চিকিৎসা ব্য‌বস্থার উন্নতি কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য‌ ও পরিবার কল্য‌াণ মন্ত্রকের কর্মসূচির অন্তর্গত।

সরকার এই চিকিৎসা পদ্ধতিগুলির শিক্ষার মান, গুণগত অবস্থান নিয়ন্ত্রণ, সচেতনতা বৃদ্ধি ও জনপ্রিয় করার লক্ষ্য‌ে কর্মসূচি নিয়েছে। দেশ জুড়ে আয়ুশ ইনিস্টিটিউটের প্রায় ৬২ হাজার হসপিটাল বেড রয়েছে। এবং এদের ৭ লক্ষ ৮৫ হাজার স্বাস্থ্য‌কর্মী কর্মরত।

কেন্দ্রীয় সরকার আয়ুর্বেদ চিকিৎসাকে রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য‌ বিমা যোজনার (আরএসবিওয়াই) অন্তর্গত করেছে। গোটা দেশ জুড়ে এ ব্য‌াপারে জনমত সরকারের কাছে পৌঁছনোর পর সম্প্রতি এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। উত্তরপ্রদেশের আয়ুশ আঞ্চলিক কোঅর্ডিনেটর আনন্দ চৌধুরির বক্তব্য‌, ‘‘অ্য‌ালোপ্য‌াথি মেডিসিনের দাম বৃদ্ধি অল্প সামর্থের মধ্য‌ে ভালো গুণগত চিকিৎসা দেওয়ার অন্তরায়। আয়ুর্বেদ এর একটা বিকল্প হতে পারে। এতে কম পয়সায় সবাইকে ভাল গুণগতমানের চিকিৎসা দেওয়া যায়।’’ ডবলুএইচও-র লক্ষ্য‌মাত্রাকে সামনে রেখে কেন্দ্রীয় সরকার চিরায়ত চিকিৎসার জন্য‌ও এক জন ড্রাগ কন্ট্রোলারকে তালিকাভুক্ত করেছে। নতুন ড্রাগ কন্ট্রোলারের কাজ হল, গুণগতমান ও উন্নত ধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্য‌বস্থা তৈরি করা। বহু গবেষণায় দেখা গিয়েছে কিছু চিরায়ত ওষুধের মধ্য‌ে বিষাক্ত পদার্থ রয়েছে। এক ধরনের আয়ুর্বেদিক ওষুধ থেকে তো লেড পয়জনিং হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। সোসাইটি ফর নিউট্রিশন, এডুকেশন অ্য‌ান্ড হেলথ অ্য‌াকশন নামক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা আর্মিতা ফার্নান্ডেজের বক্তব্য‌, “চিরায়ত চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্য‌ে ভালোর সঙ্গে কিছু খারাপ ব্য‌াপারও রয়েছে।’’ তাঁরা যেমন শিশুদের যক্ষ্মার মতো কিছু কিছু রোগের জন্য‌ অ্য‌ালোপ্য‌াথি চিকিৎসা ব্য‌বস্থার সাহায্য‌ নেন। আবার মায়েদের প্রসব-পরবর্তী অবস্থায় দুধের পরিমাণ বৃদ্ধির করার ক্ষেত্রে চিরায়ত চিকিৎসা ব্য‌বস্থার শরণাপন্ন হন।

চিরায়ত চিকিৎসা ব্য‌বস্থা গোটাটাই ক্ষতিকর বা উপকারী বলা যাবে না। কিন্তু ডবলুএইচও-র লক্ষ্য‌ হল এই ধরনের চিকিৎসার গুণগত মানের উন্নতি ঘটিয়ে গোটা বিশ্বে তা জনপ্রিয় করে তোলা। বিভিন্ন দেশকে এই ধরনের চিকিৎসা ব্য‌বস্থার উপর গুরুত্ব দিতে সাহায্য‌ করা।

বাসুদেবনের বক্তব্য‌, ‘‘ক্রনিক ডিজিজ এবং দারিদ্র দুষ্টচক্রের মতো পরস্পরের হাত ধরে চলে। তারা একে অন্য‌ের পরিপূরক।’’ এই দিক দিয়ে কম খরচের বিকল্প চিরায়ত চিকিৎসার মধ্য‌ে দিয়ে দারিদ্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামকেও এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশে। মনে রাখতে হবে গুণগতমানের চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়াটা সকলের মৌলিক অধিকার। উন্নয়নের হাতিয়ার হিসাবে নতুন কারিগরী বিদ্য‌ার উদ্ভাবন, নতুন আবিষ্কারের পাশাপাশি চিরায়ত প্রাচীন জ্ঞানও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে ডবলুএইচও-র রণকৌশল প্রভাবশালী ও গুরূত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে।

সূত্রঃ http://www.theguardian.com/global-development-professionals-network/2014/sep/17/acupuncture-ayurveda-medicine-health-india

3.07857142857
মন্তব্য যোগ করুন

(ওপরের বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন মন্তব্য / পরামর্শ থাকে, তাহলে দয়া করে আমাদের উদ্দেশ্যে পোস্ট করুন).

Enter the word
ন্যাভিগেশন
Back to top