ভাগ করে নিন
ভিউজ্
  • অবস্থা সম্পাদনার জন্য উন্মুক্ত

রোগের প্রকোপ অনেকটা কমেছে

আফ্রিকায় মৃত্যুর সংখ্যা কমেছে। আক্রান্ত দেশগুলি চেষ্টা করছে জীবনে ফেরার।

জোনা কিয়ে লাইবেরিয়ার লোফা-মানো ন্যাশনাল পার্কের কাছে তাকপইমা গ্রামে মনিহারি সামগ্রী বিক্রি করতে গিয়েছিলেন। সময়টা ২০১৪’র বসন্ত কাল। গিয়ে শুনলেন, সেখানে নাকি অনেককেই ভূতে ধরছে। প্রথমে লোকেদের জ্বর হচ্ছে, আর তার পরেই তারা মরে যাচ্ছে। শুনেছিলেন বটে, বিশেষ পাত্তা দেননি। কিন্তু দেখতে দেখতে আশেপাশে লোকজন মারা যেতে থাকল। প্রাণ হাতে পালিয়ে এলেন রাজধানী মনরোভিয়ায়, নিজের বাড়িতে। জ্বর তাঁকেও ছাড়ল না। তবে সে যাত্রা রক্ষা পেলেন।

অনেকেই রক্ষা পাননি। প্রায় এক বছরে ইবোলার বলি ন’হাজার ছাড়িয়েছে। ইবোলা আফ্রিকায় নতুন রোগ নয়, তবে আগে কখনও বিশ্ব জুড়ে এতটা আতঙ্ক তৈরি করেনি। সরকারি হিসেবে এ যাত্রায় ইবোলা প্রথমে ছড়িয়েছিল গত বছর মার্চ মাসে। অবশ্য গিনির জঙ্গলে এ রোগের কথা শোনা যায় ২০১৩ ডিসেম্বরেই। প্রথমটায় ভূতপ্রেত আর দুষ্ট আত্মার কারসাজি ভেবে লোকে প্রথমে ছুটল ওঝা বা গুণিন গোছের লোকেদের কাছে, যাঁরা নাকি এ সব ভূত ছাড়াতে ওস্তাদ। নানান শুদ্ধিকরণের পরেও যখন অসুখের বহর কমার লক্ষণ দেখা গেল না, তখন মানুষ সন্দিহান হলেন, ভূতপ্রেত নয়, এটা বোধহয় কোনও অসুখ। তত দিনে ভাইরাস তার প্রতিপত্তি ছড়িয়েছে অনেক জায়গায়। তবে লাইবেরিয়া, গিনি আর সিয়েরা লিওন, তিন দেশেই বিশেষ করে ছড়াতে থাকে অসুখ। লাফিয়ে লাফিয়ে। আজ পাঁচ জন আক্রান্ত হয় তো কাল পাঁচশো।

ছড়াবেই। ডাক্তার, সমাজসেবীরা বলছিলেন, রোগীকে রাখতে হবে একেবারে আলাদা। কিন্তু প্রথম দিকে ঠিক উল্টোটাই হয়েছিল বেশি। তার কারণও ছিল। সে কালে আফ্রিকার যেমন অন্য অনেক অঞ্চলেরও— নানান জনজাতির মানুষেরা খুব বড় দুর্ভিক্ষের সময়েও কারও একটা রুটি জুটলে একশো ভাগ করে তবে খেতেন। এখন হয়তো সে দিন আর নেই, কিন্তু সংহতিবোধ এখনও প্রবল। কেউ আত্মীয়বন্ধুদের বিপদে ফেলে পালায় না বা আলাদা করে দেয় না। এত কালের ঐতিহ্য জলাঞ্জলি দিয়ে ক’টা পাশ দেওয়া ডাক্তার-মোক্তারের কথা শুনতে যাবেন কেন? শোনেননি অনেকেই। আত্মীয়পরিজন, বন্ধুবান্ধব সবাই মিলে রোগীর কাছে থেকেছেন। আর মৃত্যুর পর তো কত রকম প্রথা মেনে স্নান করিয়ে, মন্ত্রঃপূত ওষুধ লাগিয়ে তবে অন্ত্যেষ্টি। এবং তার ফলেই রোগীর সংস্পর্শে এসে আরও অনেকে আক্রান্ত হন। ইবোলা দাবানলের চেয়ে দ্রুত ছড়াতে লাগল।

তবে কিনা বিপদ মানুষকে অনেক কিছু শেখায়। যখন দেখা গেল পুরনো রীতিতে এ রোগ সামলানো যাচ্ছে না, তখন মানুষ ডাক্তারদের কথা, সমাজসেবীদের কথা শুনতে শুরু করলেন। আসলে তখন দায়। নিজে বাঁচার দায়। আমি যদি না-ও বা বাঁচি, আমার পরিবার, আমার দুধের সন্তান যেন বেঁচে থাকে। দায় থেকে এল মরিয়া উদ্যোগ। ইবোলা আটকাও। ইবোলা সম্পর্কে জানো। যার ইবোলা হয়েছে তাকে আলাদা রাখো। হাসপাতালে নিয়ে যাও। স্থানীয় মানুষ নিজেরাই উদ্যোগ করে রোগীদের স্বাস্থ্য কেন্দ্রে, ইবোলা শিবিরে নিয়ে যেতে লাগলেন, তাঁদের আলাদা রাখার ব্যবস্থা করলেন। নিজেরাও সতর্ক হলেন। বাইরের দুনিয়া থেকে সাহায্য এল। অর্থ, ওষুধপত্র, অন্য ত্রাণসামগ্রী, ডাক্তার, সমাজকর্মী। যথেষ্ট এল, তা নয়। তবু, এল। বিশেষ করে আমেরিকা এবং ইউরোপে আফ্রিকা-ফেরত দু’চার জন রোগীর সন্ধান মেলার পরে, তাঁদের কেউ কেউ মারা যাওয়ার পরে পশ্চিম দুনিয়ার তৎপরতা অনেকটা বাড়ল। আস্তে আস্তে অসুখের প্রকোপ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। মৃত্যুর সংখ্যা কমেছে। এরই মধ্যে ঘোষণা হল: নাইজেরিয়া, বোকো হারামের তাণ্ডবে নাজেহাল নাইজেরিয়া, ইবোলা-মুক্ত! আফ্রিকার, বিশেষ করে ওই তিনটি দেশের বিপদ এখনও কাটেনি, নতুন নতুন সংক্রমণ ধরা পড়ছে। তবু এরই মধ্যে আক্রান্ত দেশগুলি চেষ্টা করছে জীবনে ফেরার, লাইবেরিয়ায় বহু দিন পরে স্কুল খুলেছে, বাচ্চারা জীবাণুনাশক জলে হাত ধুয়ে স্কুলে ঢুকছে। জোনা কিয়ে হয়তো আবার যাচ্ছেন তাকপইমা গ্রামে।

এ তো গেল আফ্রিকার ইবোলার কথা। কিন্তু তাতে আমাদের কী? আমাদের কি আদৌ এই অভিজ্ঞতায় মন দেওয়ার প্রয়োজন আছে? আছে বোধ হয়।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

3.05940594059
মন্তব্য যোগ করুন

(ওপরের বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন মন্তব্য / পরামর্শ থাকে, তাহলে দয়া করে আমাদের উদ্দেশ্যে পোস্ট করুন).

Enter the word
ন্যাভিগেশন
Back to top