হোম / স্বাস্থ্য / ওঁরা পথ দেখান / ইবোলা! আমরা আবার কী শিখব ? / শুধু পুলটিস মেরে ক্ষত সামলালে চলবে না
ভাগ করে নিন
ভিউজ্
  • অবস্থা সম্পাদনার জন্য উন্মুক্ত

শুধু পুলটিস মেরে ক্ষত সামলালে চলবে না

যখন কোনও অসুখ কমবে, এমনকী থাকবে না, তখনও মানুষকে সচেতনতা বাড়ানোর কাজে লেগে থাকতে হবে।

প্রথমত, এ দেশেও ঐতিহ্য আর রীতির নাম করে নানান অসুখ সম্পর্কে ভুল ধারণা ছড়িয়ে আছে। তা অনেক সমস্যার সৃষ্টি করে। ক’দিন আগেই এক রিপোর্ট বেরিয়েছে সংবাদপত্রে। তাতে দেখা যাচ্ছে, ডায়ারিয়া এবং নিউমোনিয়ার মতো অসুখ সম্পর্কে স্রেফ না জানা আর ভুল জানার ফলে ভারতে বহু শিশু মারা যায়। আজও। এমন নজির অনেক। কিন্তু ইবোলার কাহিনি দেখিয়ে দেয়, এই বাধা অনতিক্রম্য নয়। যদি মানুষকে বোঝানো যায় যে কিছু ঠিকঠাক ব্যবস্থা নিলে অসুখটাকে বাগে আনা যাবে, তা হলে পুরনো ধারণা ও মানসিক বাধা পেরিয়ে তাঁরা পরামর্শ মেনে চলবেন। যে ধারণা এমনিতে ভাল, বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে সেটাই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। যেমন, যে সংহতিবোধ প্রাচীন সমাজের একটা বড় সম্পদ, সেটাই আবার গোড়ার দিকে ইবোলা রোগীকে আলাদা করতে না দিয়ে, কোয়ারান্টাইন-এ বাধা দিয়ে সমস্যা বাড়িয়ে তুলেছে। কিন্তু সেই সমস্যার সঙ্গে লড়তে গিয়ে সংহতিবোধটাকে ছেড়ে দিলে চলবে না। সমাজকে নিয়ে, তার মানুষগুলোকে সঙ্গে নিয়েই কাজ করতে হবে, বোঝাতে হবে, যাতে তাঁরা সচেতন হয়ে উঠতে পারেন আর নিজেদের লড়াইটা ঠিক ভাবে লড়তে পারেন।

সেই চেতনা আর তাগিদ তৈরি করতে পারলে কী অসাধ্য সাধন করা যায়, তার একটা দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে (জ্)বান্তামা গ্রাম। সিয়েরা লিওন-এর রাজধানী ফ্রিটাউন-এর উত্তরে এই গ্রামটি ইবোলা সামলাতে একটা পুরনো পরিত্যক্ত স্কুলবাড়িতে নিজেরাই তৈরি করে ফেলল স্বাস্থ্য কেন্দ্র, যাতে রোগীদের যতটা সম্ভব আলাদা করে রাখা যায়। শহর থেকে ওষুধ, নার্স যা সাহায্য পাওয়া যায়, তার সাহায্যে ইবোলা আটকাতে উদ্যোগী হলেন গ্রামের মানুষ। ব্যবস্থা করলেন, অন্তত রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত যাতে আর ইবোলা ছড়াতে না পারে। লেগে থাকলে যে সামাজিক বাধা পার হওয়া যায়, তার প্রমাণ আমাদেরও জানা। এ দেশে পোলিয়ো ভ্যাকসিন নিয়ে নানান বাধা ছিল। সে বাধা দূর করতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। কিন্তু তাতে কাজ হয়েছে। কী করে? লেগে থেকে। লাগাতার প্রচার চালিয়ে। সচেতনতা বাড়িয়ে।

ব্যক্তিগত দৃষ্টান্তও কম দামি নয়। ব্রিটিশ স্বাস্থ্যকর্মী উইলিয়ম পুলি সিয়েরা লিওন থেকে ইবোলা নিয়ে দেশে চলে গিয়েছিলেন। মৃত্যুর সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে তিনি জীবনে ফেরেন এবং আবার ফিরে যান সিয়েরা লিওনে। তিনি মনে করেছেন মৃত্যুর চেয়ে ইবোলা-আক্রান্ত মানুষদের তাঁকে অনেক বেশি প্রয়োজন! তাঁর বক্তব্য, তিনি প্রথম বিশ্বের নাগরিক, তৃতীয় বিশ্বের অসহায় মানুষগুলোর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া তাঁর দায়িত্ব। এবং তিনি জানেন যে তাঁর ইবোলা প্রতিরোধের ইমিউনিটি তৈরি হয়ে গিয়েছে আর তাই তিনি একটু কম চিন্তা নিয়ে কাজ করতে পারবেন। তিন, তিনি বোঝাতে পারবেন ইবোলা কী, কেন, আর কী ভাবে আক্রান্ত মানুষদের উপকার করা যায়। এমন এক একটি দৃষ্টান্ত স্থানীয় মানুষকে, স্বাস্থ্যকর্মী ও সমাজসেবীদের কতটা প্রেরণা দেয়, কতটা মনের জোর দেয়!

আর একটা ব্যাপার হল, যখন একটা অসুখ হবে, তখন সেটাকে সামলাব এটা ভাবলে একেবারেই চলবে না। আজ সোয়াইন ফ্লু, উঠেপড়ে সামলাচ্ছি; কাল এনসেফ্যালাইটিস হবে, তার ব্যবস্থা করব নাভিশ্বাস তুলে; পরশু ম্যালেরিয়া, তখন কুইনাইনের সঙ্গে প্রচারও চালাব— হবে না। রোজ, প্রতিটা দিন স্বাস্থ্য পরিষেবার দিকে নজর দিতে হবে। শহরে এবং গ্রামে। একটা বিপদ হল, তখনকার মতো পুলটিস মেরে ক্ষতটাকে সামলে দিলাম, এতে কাজ হবে না। এক ভাবে লেগে থাকতে হবে। যখন অসুখটা কমবে, এমনকী থাকবে না, তখনও মানুষকে সচেতনতা বাড়ানোর কাজে লেগে থাকতে হবে। যখন ম্যালেরিয়া হবে না, তখনও মশারি টাঙিয়ে শুতে হবে, জল জমতে দেওয়া যাবে না। এই অভ্যেসগুলো একেবারে দাঁত মাজার মতোই অভ্যেস করতে হবে। পোলিয়ো কর্মসূচি আরও একটা দামি শিক্ষা দিয়েছে। যখন পোলিয়ো আক্রান্তের সংখ্যা কমে গিয়েছে তখনও কিন্তু কর্মসূচি জারি থেকেছে, নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে কথ্য ভাষায় চেনা সুরের গান বাজিয়ে, বা মাইক নিয়ে অটোয় করে বলে বেড়ানোয়, আর নিরন্তর পরিশ্রম করে গিয়েছেন অসংখ্য ডাক্তার আর স্বাস্থ্যকর্মী। এবং মনে রাখতে হবে, রুটিন প্রতিষেধক দেওয়ার ব্যাপারে আমাদের দেশ এখনও অনেক পিছিয়ে, তাই শুধু পোলিয়ো তাড়ালে হবে না, অন্য ভ্যাকসিনেও জোর দেওয়া চাই।

আসলে চাই একটা সার্বিক সচেতনতা, সব দিক দিয়ে ভাল করার একটা প্রচেষ্টা, তার প্রস্তুতি। ভারতের মতো এমন একটা বিশাল জনসংখ্যার দেশে, যেখানে বহু জায়গাতেই স্বাস্থ্য পরিষেবা অত্যন্ত খারাপ অবস্থায়, সেখানে যে কোনও দিন যে কোনও মহামারী শুরু হতে পারে, এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। বরং হচ্ছে যে না, এতেই আশ্চর্য হতে হয়। কে বলতে পারে, কাল কলকাতায় এক জন ইবোলা-পজিটিভ রোগীর সন্ধান মিলবে না? তখন?

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

2.93137254902
মন্তব্য যোগ করুন

(ওপরের বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন মন্তব্য / পরামর্শ থাকে, তাহলে দয়া করে আমাদের উদ্দেশ্যে পোস্ট করুন).

Enter the word
ন্যাভিগেশন
Back to top