হোম / স্বাস্থ্য / পরিচ্ছনতা ও স্বাস্থ্যবিধি / প্রতিদিন চুরি যাচ্ছে ইতিহাসের বাঁকা নদী
ভাগ করে নিন
ভিউজ্
  • অবস্থা সম্পাদনার জন্য উন্মুক্ত

প্রতিদিন চুরি যাচ্ছে ইতিহাসের বাঁকা নদী

আক্ষরিক অর্থেই সে ছিল সকলের আদরের ছোট নদী৷ আঁকা -বাঁকা পথে খেলত , হেলতে দুলতে চলত৷ জগত্ সংসারে তাকে নিয়ে আহ্লাদের কোনও কমতি ছিল না৷ কিন্ত্ত সুখ কি আর বেশিদিন সয়৷ আদরের বাঁকার উপর শুরু হল নির্বিচার অত্যাচার৷ বাঁকাকে নালাতে পরিণত করে , বুজিয়ে , জমি দখল করে শুরু হল প্রকৃতি নিধন পর্ব৷ এ আজকের কথা নয়৷ বছরের পর বছর ধরে একটু একটু করে আমাদের চোখের সামনে ঘটে চলেছে এই ধ্বংসযজ্ঞ৷ এই মুহূর্তে কেমন আছে বাঁকা ? খোঁজ নিলেন দয়াময় পাল

‘কালো জলে কুচলা তলে ডুবল সনাতনআজ সারানা কাল সারানা পাই যে দরশননদীর ধারে চাষে বঁধু মিছাই করো আশঝিরি ঝিরি বাঁকা নদী বইছে বারো মাস৷ ’গা ন বেঁধেছিলেন ঝুমুর শিল্পী৷ তবে আজ আর ঝিরি ঝিরি বইছে না বর্ধমানের বাঁকা নদী৷ বারো মাস বয়ে চলা তো দূরের কথা বর্ধমান শহরের উপকণ্ঠে তার অস্তিত্ব থাকলেও নদীর তকমা ঘুচেছে সেই কবেই৷ বর্ধমানবাসীর কাছে বাঁকা আজ শুধুই নালা৷ বয়সের ভারে নড়তে চড়তে না পারা বাঁকার উপর আরও বেশি করে চাপছে শহরের আবর্জনা৷ এঁকে বেঁকে চলা এই নদী শ্রী হারিয়ে আবর্জনার দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ করে তুলেছে দু’পাড়ের মানুষদের৷ নদীকে বাঁচাতে উদ্যোগ নেওয়া তো দূরের কথা , নিস্তেজ হয়ে পড়া বাঁকার উপর এখনও সমান তালে চলছে ‘অত্যাচার ’৷ অর্থের বিনিময়ে ক্ষমতার রক্তচক্ষু দেখিয়ে বাঁকাকে ভরাট করে চলছে অবৈধ নির্মাণ৷ সম্প্রতি বর্ধমান ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডিএ ) এবং পুরসভা যৌথ ভাবে বাঁকা সংস্কারে উদ্যোগ নিলেও তা যে স্থায়ী সমাধান নয় তা বিলক্ষণ জানেন নদী বিশেষজ্ঞরা৷

অতীতের বঙ্কেশ্বরী

বর্ধমান জেলারই গলসি থানার রামগোপালপুর গ্রামে কাছে একটি জলাশয় থেকে বাঁকা নদীর উত্পত্তি৷ কারও কারও মতে আগে ওই জায়গাটি ছিল ধান খেত৷ সেখান থেকেই প্রস্রবণের জল বইতে শুরু করে৷ যদিও ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দে রেনেলের মানচিত্রে দেখা যায় বর্ধমান শহরের দক্ষিণ -পশ্চিমের দামোদর থেকে বাঁকা নির্গত হয়েছে৷ কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ মৃত লখিন্দরকে ভেলায় চাপিয়ে বেহুলার যাত্রা বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন, ‘ভাসিয়া ভাসিয়া পাইল বাঁকা দামোদর৷’ বাস্তবে দেখা গিয়েছে গলসি থেকে বয়ে আসার পর বর্ধমান শহরের শুরুতে রথতলায় দামোদরের সঙ্গে বাঁকার যোগস্থাপন করা হয়েছে৷ দামোদরের জল পাস করার সুবিধার্থে ওই জায়গাতেই রয়েছে লকগেট৷ বর্ধমানের বাসিন্দারা বলেন , এই লকগেট তৈরি করে বাঁকার গতিপথ রোধ করার কারণেই এর উপনদীগুলি শুকিয়ে গিয়েছে৷ বাঁকার উত্পত্তি এবং মিলনস্থল দু’টিই বর্ধমান জেলায়৷ প্রবাহপথের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১২৫ কিলোমিটার৷ এর মধ্যে বর্ধমান শহরে রয়েছে ৩৫ কিলোমিটার৷ এরপর মেমারি, মন্তেশ্বর, কালনা হয়ে পূর্বস্থলীতে প্রবেশ করেছে৷ সেখানে সমুদ্রগড়ের উত্তরে জালুইডাঙায় খড়ি নদীতে মিশেছে বাঁকা৷ খড়ি -বাঁকার মিলিত ধারা নন্দাইয়ের কাছে ভাগীরথীতে মিশেছে৷ বাঁকা নদীর গতিপথে রয়েছে অসংখ্য বাঁক৷ বর্ধমান শহরের যে কোনও জায়গা থেকে এই নদীকে দেখলে আনুমানিক ১০০ মিটারের বেশি দেখা যাবে না৷ কারণ সামান্য কিছুটা এগিয়েই বাঁক নিয়ে দু’পাড়ের ঘরবাড়ি বা গাছপালার মধ্যে হারিয়ে গিয়েছে বাঁকা৷ অতিরিক্ত এই বাঁকের জন্যই নদীর নাম বাঁকা বলে বর্ধমানের বাসিন্দাদের একাংশের দাবি৷ যদিও অনেকের মতে, অতীতে এই নদীর নাম ছিল বঙ্কেশ্বরী৷ জনশ্রীতি আছে বঙ্কা নামে কোনও এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এই খালের ধারে সাধনা করেছিলেন৷ তাঁর নাম থেকেই এসেছে বঙ্কেশ্বরী৷ সেই বঙ্কেশ্বরী অপভ্রংশ হয়ে বর্তমানের বাঁকা৷ কিছুটা অবহেলারও৷

বর্তমানের বাঁকানালা

গলসি থেকে ক্ষীণ হয়ে বয়ে আসছে বাঁকা৷ বর্ধমান শহরের আগে পর্যন্ত জল বেশ স্বচ্ছ৷ কিন্ত্ত রথতলা কাঞ্চননগরের পর থেকে শহরের একের পর এক নর্দমা এসে মিশেছে বাঁকাতে৷ ফলে জল হয়েছে ঘোর কৃষ্ণ বর্ণের৷ কোথাও কোথাও আবার কিছুটা সবুজ৷ কোথাও কোথাও দেখা গিয়েছে জলের মধ্যে অসংখ্য পোকা কিলবিল করছে৷ আবার ছোট্ট এই নদীর মাঝেই জেগে উঠেছে চর৷ অবশ্য চর না বলে আবর্জনার স্তূপ বলাই ভালো৷ সেই সঙ্গে নদীর গতিপথকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে আগাছা৷ পচা আবর্জনার দুর্গন্ধ ও মশার দাপটে অতিষ্ঠ দু’পাড়ের বাসিন্দারা৷ এর জন্য অবশ্য দায়ী তাঁরাই৷ বর্ধমানের ঝুরঝুরে পুল এলাকার বাসিন্দা নরেন দাস বলেন, ‘চড়া রোদ হলেই দুর্গন্ধে বাড়িতে টেকা দায় হয়ে ওঠে৷ নোংরা আবর্জনায় ভরা বাঁকা, মশার অ্যাঁতুড়ঘর হয়ে উঠেছে৷ সন্ধ্যা হলেই ঝাঁকে ঝাঁকে মশা আসছে৷’ তাঁর আক্ষেপ, ‘বাঁকার এই দশার জন্য তো আমরাই দায়ী৷ আমরা সবাই মিলে নোংরা ফেলছি৷ একটা নদী আর কত অত্যাচার সহ্য করতে পারে বলতে পারেন ? মিডিয়া দেখলেই সবাই প্রতিবাদী হতে চায়, কিন্ত্ত বাঁকাকে বাঁচাতে কারও কোনও উদ্যোগ নেই৷ সবার আগে আমাদেরই সচেতন হওয়া দরকার৷’ শুধু আবর্জনা আর দুর্গন্ধ নয়, আগে বাঁকার দু’পাড়ের উর্বর মাটিতে প্রচুর চাষও হত৷ এখন জলের অভাবে তার অনেকটাই কমেছে৷ রেনিকোট এলাকার বাসিন্দা আদুরি মুন্ডা বলেন, ‘আমার স্বামী বেঁচে থাকতে বাঁকার জলে চাষ করতেন৷ দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের অভাব হত না৷ এখন ছেলে চাষ করে, কিন্ত্ত জলই তো নেই৷ বর্ষার সময় ভালোই চাষ হয়, অন্য সময় বাঁকার জল মেলে না৷ তাই ছেলেকে বাইরে কাজে যেতে হয়৷ রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে থেকে যখন যা পায় তখন সেই কাজ করে৷ পেট তো মানে না৷’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা পড়াশোনা জানি না, তাই পরিবেশ প্রকৃতি নষ্ট হচ্ছে কিনা বুঝি না৷ তবে একটা নদী হারিয়ে গেলে আমাদের মতো অনেকেরই সমস্যা হবে এটা বুঝতে পারি৷’ বর্ধমানের দেবী সর্বমঙ্গলা মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে বাঁকা নদী৷ আগে সর্বমঙ্গলার ঘট তোলা হত এই বাঁকা নদী থেকেই৷ বর্তমানে নদীর এই অংশটুকুও আর্বজনায় ভরে উঠেছে৷ জঞ্জালের স্তপের মধ্যেই ঘুরে বেড়াচ্ছে শুয়োরের দল৷ নদীর জল অত্যন্ত নোংরা হওয়ায় সর্বমঙ্গলার ঘট নেওয়া বন্ধ হয়েছে৷ এই জায়গা থেকে পেরিয়ে এসেই রয়েছে বীরহাটা৷ এখানে পর দু’টি ব্রিজ বাঁকার উপর রয়েছে৷ এই এলাকার সৌন্দর্য বাড়াতে একটি ঘড়ি স্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে৷ কিন্ত্ত ব্রিজের উপর দিয়ে যেতে গেলে অনেককে নাকে রুমাল চাপা দিতে দেখা যায়৷ বাঁকার পচা জলের দুর্গন্ধে টেকা দায়৷ ব্রিজে দাঁড়িয়ে বাঁকার দিকে চোখ রাখলে দেখা যাবে শুধুই আবর্জনা৷ তাছাড়া নদীর গা ঘেঁষে এবং বলা যায় নদী দখল করে বেশ কিছু বাড়ির তৈরি হয়েছে৷ যা একটা নদীকে ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা৷ এরপর থেকে বর্ধমান শহরের শেষ প্রান্ত ডাম্পিং গ্রাউন্ড পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় নদী দখল করে গড়ে উঠেছে অবৈধ নির্মাণ৷ বাসিন্দাদের অভিযোগ, বামেরা পুরসভায় ক্ষমতায় থাকতে বহু লোকজনকে অবৈধ ভাবে বাঁকার পাড়ে বসিয়েছে৷ এখন ক্ষমতা তৃণমূলের হাতে৷ নদী দখল করে বসবাসে মদত দিচ্ছে তারাও৷ শুধু তাই নয়, মোটা টাকার বিনিময়ে বিক্রি হচ্ছে বাঁকা নদী ভরাট করা জায়গা৷ রায়নগর নতুনপাড়ার উল্টো দিকে এখন নদী ভরাট করে জায়গা দখল চলছে৷ এনিয়ে আন্দোলনে নেমেছিলেন নতুনপাড়ার বাসিন্দারা৷ কিন্ত্ত শাসক দলের ক্ষমতার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেননি সাধারণ আন্দোলনকারীরা৷ এই এলাকার বাসিন্দারা তুলসী দাস, সোমা মণ্ডলরা বলেন , ‘আগে বাঁকার জলে বাসন ধোয়া থেকে স্নান করা সবই হত৷ একটা সময় আমরা এই জলে রান্নাও করেছি৷ কিন্ত্ত শহরের সমস্ত ড্রেন বাঁকার সঙ্গে যোগ করে দেওয়ার পর জল নোংরা হয়ে গিয়েছে৷ এখন একবার জলে নামলেই গায়ে চুলকানি বেরিয়ে যায়৷ ডাম্পিং গ্রাউন্ডের পাশে বাঁকা ভরাট করে ঘর বাড়ি তৈরি হচ্ছে৷ আর নদী এখানেই বাঁক নিয়েছে৷ এখন জল না থাকলেও বর্ষায় এই নদীই ফুঁসে ওঠে৷ অবৈধ নির্মাণের ফলে জল এসে আমাদের পাড়ে ধাক্কা মারবে৷ বর্ষায় ঘর বাড়ি হারানোর আশঙ্কা করেই আমরা অবৈধ নির্মাণে বাধা দিয়েছিলাম৷ কিন্ত্ত ওদের ক্ষমতার সঙ্গে পেরে উঠিনি৷ সামনেই বর্ষা আসছে জানি না কী হবে৷ ’ এদিকে শহরের মধ্যে অবৈধ নির্মাণ ও জঞ্জালের স্তূপ বাঁকার গতিপথ রোধ করায় বর্ষার সময় বাঁকার জল গলসিকে ভাসিয়ে দেয়৷ গত বছর বন্যার সময় গলসির ভুঁড়ি পঞ্চায়েতের বিস্তীর্ণ এলাকা ভাঙনের কবলে পড়েছিল৷ অনেক চাষের জমিও বাঁকার গর্ভে তলিয়ে যায়৷ এই এলাকার চাষি তরুণ মণ্ডল বলেন, ‘গত বছর বর্ষায় ব্যাপক বৃষ্টি হয়েছিল৷ মাঠের জল মূলত বাঁকা দিয়েই পাস হয়৷ সেই সঙ্গে ডিভিসি জল ছাড়লে দামোদরের কিছু জলও বাঁকা দিয়ে পাস করানো হয়৷ কিন্ত্ত বাঁকা মজে গিয়েছে৷ জল ধারণ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় জলের চাপে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়৷ বাঁকার গতিপথে পুরোটা ড্রেজিং করলে তবেই হয়তো এই সমস্যা থেকে রেহায় পাওয়া যাবে৷’

স্মৃতির আঁকে বাঁকে

বাঁকা নিয়ে বর্ধমানের পুরনো দিনের মানুষদের নানা স্মৃতি রয়েছে৷ বর্তমান প্রজন্মের কাছে অবশ্য এটা নালা ছাড়া কিছুই নয়৷ কথা হচ্ছিল রায়না থেকে বর্ধমান রাজ কলেজে পড়তে আসা জীবন পরমাণিকের সঙ্গে৷ বাঁকাকে নদী বলতে শুনেই তিনি বলেন, ‘বাঁকা তো নালা বলেই জানি৷ নদী এই প্রথম শুনলাম৷ কলেজ যাতায়াতের পথে বীরহাটায় বাঁকা পেরোতে হয়৷ সব সময়ই দেখি নোংরা আবর্জনায় ভর্তি৷ এটা নদী হলে সংস্কার করা উচিত৷’ বর্তমান প্রজন্ম বাঁকাকে নালা বলে জানলেও এই নদী নিয়ে অনেক স্মৃতি রয়েছে শহরের প্রবীণদের৷ সর্বমঙ্গলা মন্দিরের পুরোহিত প্রভাতরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, ‘ছোটবেলায় দেখেছি বাঁকায় সুন্দর জল বইছে৷ এই বাঁকা থেকেই মায়ের ঘট নেওয়া হত৷ এটাই ছিল ঐতিহ্য৷ শুধু সর্বমঙ্গলা নয় বড় মায়ের ঘটও বাঁকা থেকেই নেওয়া হয়৷ গত প্রায় এক দশক হল সর্বমঙ্গলার ঘটন নেওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে৷ এখন শোভাযাত্র করে কেষ্টসায়র থেকে ঘট আনলেও কোথাও যেন একটা ঐতিহ্যে ধাক্কা খেয়েছে৷’ শরত্পল্লির বাসিন্দা বাবলু গাইন বলেন, ‘নদীর পাড়েই বড় হয়েছি৷ স্কুলে পড়াকালীন নদীতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঝাঁপিয়েছি৷ মা লাঠি নিয়ে মেরে জল থেকে তুলত৷ ছিপ নিয়ে কত মাছ ধরেছি৷ এখন নদীর দিকে তাকালে সে সব গল্প কথা মনে হয়৷ বাঁকা নালা থেকে ফের নদী হলে খুবই ভালো হয়৷ বর্তমানে কিছু জায়গায় সংস্কার হচ্ছে, পুরো নদীটা এ ভাবে সংস্কার হলে খুবই ভালো হয়৷ ’সর্বমঙ্গলা ঘাটের বাসিন্দা আশা পণ্ডিত বলেন, ‘আগে বাঁকার জল ভালো ছিল৷ ছট পুজোর সময় বাঁকার পাড় উত্সব প্রাঙ্গণের চেহারা নিত৷ এত ভিড় হত যে বাচ্চাদের হাতছাড়া করতে ভয় হত৷ কিন্ত্ত এখন কেউ বাঁকার জলে নামতে চান না৷ সবাই গাড়ি ভাড়া করে সদরঘাটে দামোদরে যান৷ তবে কিছু মানুষ যাঁদের আর্থিক সামর্থ নেই তাঁরা এখনও বাঁকাতেই ছট পুজো সারেন৷ বাঁকা নদী আগের অবস্থায় ফিরে এলে খুবই ভালো হবে৷’

বাঁকা রক্ষায় উদ্যোগ

যুগ যুগ ধরে অবহেলায় আনাদরে পড়ে রয়েছে বাঁকা৷ নদীর দু’পাড়ের বাসিন্দারা বারবার আবেদন জানিয়েছেন নালা থেকে বাঁকাকে ফের নদীতে ফিরিয়ে আনতে৷ বাঁকা ভরাট করে অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলনেও নেমেছেন বাসিন্দারা৷ কিন্ত্ত তেমন কোনও লাভ হয়নি৷ বাসিন্দাদের অভিযোগ বাম আমলেই সরকারি উদাসীনতার জেরে বাঁকা নালায় পরিণত হয়৷ সেই সময়েই বাঁকার দু’পাড়ে অবৈধ ভাবে বসতি স্থাপন শুরু হয়েছিল৷ এখনও সেই ধারা বজায় রয়েছে৷ অবশ্য রাজ্যে পালা বদলের পর বর্ধমানের বিধায়ক রবিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় মন্ত্রী হন৷ বাঁকাকে সংস্কার করে তার দু’পাড় সাজানোর প্রতিশ্রীতি দিয়েছিলেন৷ সেই মতো সম্প্রতি বর্ধমান উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডিএ) বাঁকা সংস্কারে উদ্যোগ নিয়েছে৷ শহরের বেশ কিছুটা জায়গায় বাঁকা থেকে আবর্জনা তুলে দু’পাড় বোল্ডার দিয়ে বাঁধানোর কাজ শুরু হয়েছে৷ এতে কিছুটা খুশি সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দারা৷ ইছলাবাদের বাসিন্দা সাগর দত্ত বলেন, ‘এতদিন কেউ বাঁকার দিকে ফিরেও তাকাননি৷ এখন কিছুটা উদ্যোগ চোখে পড়ছে৷ ছোটবেলার দেখা সেই বাঁকা ফিরিয়ে দিলে তো খুবই ভালো হয়৷’ কিন্ত্ত এই উদ্যোগ যে স্থায়ী সমাধান নয় তা বলছেন শহরের বিশিষ্ট বাসিন্দারা৷ বর্ধমানের ইতিহাসবিদ্ সর্বজিত্ যশ বলেন,‘এখন সরকারি বোর্ডেও বাঁকা নালা লেখা থাকছে৷ এ থেকেই বোঝা যাচ্ছে বাঁকা কতটা অবহেলিত৷ কোনও একটা নদী এ ভাবে হারিয়ে গেলে খুবই খারাপ লাগে৷ নদীর হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশেরও ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে৷ তবে বাঁকাকে বাঁচাতে যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে তাতে খুব একটা কাজ হবে না৷ কারণ কোনও একটি নদীর গতিপথে মাঝের অংশ সংস্কার করে কী লাভ? সামনেই বর্ষা আসছে, মাঝের অংশ খাল হয়ে থাকলে দু’পাশের সমস্ত জল সেখানে জমা হবে৷ এতে বিপরীত পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে৷ তাই বৃহত্তর উদ্যোগ নিয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সংস্কার হলে এই নদীকে বাঁচানো সম্ভব৷ সেই সঙ্গে মানুষের সচেতনারও প্রয়োজন৷’ সেচমন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমরা রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিভিন্ন নদী -নালা সংস্কারে হাত দিয়েছি৷ বাঁকা নদী সংস্কারেও আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে৷ সেই মতো কাজও শুরু হয়েছে৷’ বর্ধমানের জেলাশাসক সৌমিত্র মোহন বলেন, ‘বিডিএ এবং প্রশাসনের তরফে বাঁকাকে নিয়ে নানা ভাবনা আছে৷ ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে৷ আর শুধু শহরের অংশটুকু নয়, সমগ্র বাঁকাকে সংস্কারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে৷’ অবৈধ নির্মাণ প্রসঙ্গে জেলাশাসক বলেন, ‘এমন কোনও অভিযোগ এখনও আমার কাছে আসেনি৷ নির্দিষ্ট অভিযোগ এলে নিশ্চয়ই ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷’

নদী বিশেষজ্ঞ কল্যাণরুদ্র বলেন, ‘যে কোনও নদীর ক্ষেত্রেই মাঝের অংশ সংস্কার করে লাভ নেই৷ আর সংস্কারের আগে শহরের নোংরা জল বাঁকায় ফেলা বন্ধ করতে হবে৷ তা না হলে সংস্কার করেও তেমন লাভ হবে না বলে মনে করি৷’ বিধায়ক রবিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় অবশ্য বলেন, ‘কথামতো আমরা বাঁকা সংস্কার শুরু করেছি৷ বিডিএ -র এলাকার মধ্যে তিন দফায় কাজ হবে৷ প্রথম দফার কাজ শুরু হয়েছে৷ বর্ষার পর বাকি কাজ হবে৷ এর পরেই সৌন্দর্যায়নের জন্য দুই পাড় সাজিয়ে তোলার পরিকল্পনা আছে৷’ বাঁকা ভরাট করে অবৈধ নির্মাণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন , ‘বাম আমলে অনেক ঝুপড়ি বসানো হয়েছিল৷ পালাবদলের পরেও সামান্য কিছু বসেছে৷ তাদের কাউকেই তোলা হবে না৷ তবে আমরা এখন নজর রাখছি নতুন করে কোনও নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না৷

সুত্রঃ এই সময়

2.93258426966
মন্তব্য যোগ করুন

(ওপরের বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন মন্তব্য / পরামর্শ থাকে, তাহলে দয়া করে আমাদের উদ্দেশ্যে পোস্ট করুন).

Enter the word
ন্যাভিগেশন
Back to top