ভাগ করে নিন
ভিউজ্
  • অবস্থা সম্পাদনার জন্য উন্মুক্ত

ভারতে অপ্রথাগত অর্থনীতির ভূমিকাসমূহ

অপ্রথাগত অর্থনীতির আকার ও তাত্পর্যের নিরিখে বিচার করলে বিশ্বে ভারতের স্থান অনন্য। অপ্রথাগত অর্থনীতির ধারণা নিয়ে বিদ্বৎমহলে বিস্তর বিতর্ক ও সমালোচনা রয়েছে।

অপ্রথাগত অর্থনীতির আকার ও তাত্পর্যের নিরিখে বিচার করলে বিশ্বে ভারতের স্থান অনন্য। অপ্রথাগত অর্থনীতির ধারণা নিয়ে বিদ্বৎমহলে বিস্তর বিতর্ক ও সমালোচনা রয়েছে। তবে মোটামুটি ভাবে বলা যায়, এটা এমন কিছু অনথিভুক্ত কাজকর্ম, যা রাষ্ট্র বা তার আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। সাধারণ মানুষের কাছে এগুলি অত্যন্ত পরিচিত এবং সে জন্য এর প্রতি পরিকল্পনাকারীদেরও বিশেষ মনোযোগ রয়েছে। এই নিবন্ধে আমরা সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এর ভূমিকা এবং নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্র এদের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করব।

অপ্রথাগত অর্থনীতির কাঠামো ও সম্পর্ক

প্রথাবহির্ভূত অর্থনীতি এখন স্থায়ী

প্রথমত, প্রথাবহির্ভূত অর্থনীতি প্রকৃতিগত ভাবে সাময়িক নয়। সাতের দশকে পূর্ব ও পশ্চিম এশিয়ায় এমন একটা ধারণা হয়েছিল যে, অনথিভুক্ত কার্যকলাপ খুব দ্রুত প্রথাগত শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও ব্যাংকিং পরিষেবার মাধ্যমে জাতিগঠনের কর্মযঞ্জে বিলীন হয়ে যাবে। কিন্তু ‘উন্নয়নের দশক’ অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও অপ্রথাগত অর্থনীতির অস্তিত্ব এই ধারণার মূলে কুঠারাঘাত করল। দেখা গেল, বহু অর্থনীতিতেই যে অনথিভুক্ত কাজকর্ম রয়ে যাচ্ছে কেবল তাই নয়, নথিভুক্ত কর্মপ্রক্রিয়া থেকে সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে একে শোষণ করা হচ্ছে এবং অনথিভুক্ত কর্মপ্রক্রিয়ায় উত্পাদিত সস্তা পণ্য‌ ও পরিষেবা থেকে নথিভুক্ত কর্মপ্রণালী লাভবানও হচ্ছে। যতই সমালোচনা হোক না কেন, অনথিভুক্ত কাজের পরিসর আরও প্রসারিত হয়েছে অপ্রথাগত শ্রমিকের সর্বব্যাপিতায়। যাঁদের কল্যাণে কোনও প্রকল্প চালু করা হয়, তাঁরা প্রায়শই কেন বঞ্চিত হন, তার কারণ অনুসন্ধানে যে গবেষণা হয়, তার নীতি নির্ধারণ ও রূপায়ণের পরিসরও অপ্রথাগত বলে অনেকের ধারণা। নির্বাচনী ব্যয় বিষয়ক গবেষণাতেও দেখা গেছে অপ্রথাগত অর্থনীতি ও কালো টাকা কী ভাবে ভারতের প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে।

জিডিপি-তে এর ভাগ দুই-তৃতীয়াংশ

দ্বিতীয়ত, ভারতের অপ্রথাগত অর্থনীতি কিন্তু ব্রিকস দেশগোষ্ঠীর অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো মূল অর্থনীতির একটি প্রান্তিক অকিঞ্চিত্কর অংশমাত্র নয়, এটি অনেক ব্যাপ্ত। এ দেশে জীবিকা অর্জনের আনুমানিক ৯২.৫ শতাংশ উত্সই অনিবন্ধিত। মোট অভ্যন্তরীণ উত্পাদন জিডিপি-তে এর ভাগ দুই-তৃতীয়াংশ। তবে যে পরিসংখ্যান পদ্ধতিতে এই তথ্য সংগৃহীত হয়েছে, আর্থিক চাপের কারণে তার অভিমুখ ও মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। আবার বিকল্প পদ্ধতিতে, ছোট ছোট সমীক্ষা ও ঘটনার ভিত্তিতে এই হিসাব করলে তাতেও জ্ঞান সম্পর্কিত ধারাবাহিকতার অভাব থেকে যায়। ‘জানা’-র দুটি ভিন্ন পদ্ধতি আছে। জাতীয় হিসাবের সঙ্গে সব সময়ে তাদের মেলবন্ধন ঘটানো সম্ভব নয়। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, এই অপ্রথাগত অর্থনীতি বিকাশে সাহায্য‌ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে চলেছে। তাই স্বাধীনোত্তর ভারতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও এটি ভারতের তুলনামুলক সুবিধার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত।

এখানেও সম্পদ সৃষ্টি হয়

তৃতীয়ত, অপ্রথাগত অর্থনীতিকে কেবল দারিদ্রের স্বর্গরাজ্য বলে ভাবা ঠিক নয়। এর মধ্যে অবশ্যই দারিদ্র এবং আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠন আইএলও-র পরিভাষায় ‘অসমীচীন কাজ’ (কর্মস্থলে সংগঠিত হওয়ার ও সামাজিক সুরক্ষা পাওয়ার কার্যগত অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া) রয়েছে। তবে শ্রমিকের থেকেও নাগরিক হিসাবে তাঁরা এই সুবিধা পেয়েছেন। অপ্রথাগত অর্থনীতিতে সম্পদ সৃষ্টি এবং তার মজুতও হয়। এখানে সম্পদ ও দারিদ্রের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক, দারিদ্রের কারণ প্রভৃতি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাবে দৃষ্টিগোচর হয়।

অসংগঠিত তবে বিশৃঙ্খল নয়

চতুর্থত, পরিসংখ্যান ও সরকারি নথিপত্রে অপ্রথাগত ক্ষেত্রকে ‘অসংগঠিত’ বলে উল্লেখ করা হলেও একে বিশৃঙ্খল বলা যায় না। অপ্রথাগত বাজারগুলি রাষ্ট্রের দ্বারা না হলেও সমাজের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। হাজার হাজার বণিক সংগঠন ও ব্যবসায়িক সহযোগী, শিক্ষানবিশদের ওপর এক ধরনের সামাজিক কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে, নিয়ন্ত্রিত হয় কাজের সুযোগ। ঘরোয়া ভাবে তারাই দক্ষতার শংসাপত্র দেয়, চুক্তি নিয়ে বিতর্ক মেটায়, দামের ওপর প্রভাব খাটায় এবং বাজারে, বিশেষত শ্রমের বাজারে আধিপত্য ভোগ করে। তারা সম্মিলিত ভাবে বিমার সুবিধা পায়, রাষ্ট্রের হুঁশিয়ারির সামনে নিজেদের স্বার্থরক্ষা করে ভাড়া সৃষ্টি করে সরকারি আধিকারিকদের সঙ্গে তা ভাগ করে নেয়, পুনর্বন্টনযোগ্য সম্পদ একত্রিত করে, প্রযুক্তি ও চাহিদা সংক্রান্ত উদ্ভাবনী নানা তথ্যের সমাবেশ ঘটায়। উন্নয়নবাদী তাত্ত্বিকরা মানতে না চাইলেও এই ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিতে লিঙ্গ, জাতিগোষ্ঠীগত পরিচয়, ধর্ম, এলাকা, ভাষা, বর্ণ প্রভৃতিকে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এগুলির জেরে মূলধন ও শ্রমের সচলতা ক্ষুণ্ণ হয়, আবার একই সঙ্গে এগুলি অর্থনৈতিক বিকাশের অনুকূল। পরিকাঠামো ও সুস্থিতির সহায়ক।

মালিকরাও শ্রমিক

পঞ্চমত, ছোট ছোট অর্থনৈতিক একক থাকলেও প্রথাবহির্ভূত অর্থনীতি তার মধ্যেই আবদ্ধ নয়। ৯৫ শতাংশের বেশি সংস্থাতেই শ্রমিকের সংখ্যা ৫ জনের কম। ১৯৯০-তে সংস্থাপিছু কর্মরত গড় শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ২.৯। ২০০৫ সালে তা কমে ২.৪ হয়েছে। উদারীকরণের জেরে অজস্র ছোট সংস্থা গড়ে উঠেছে। ছোট আকার হওয়ায়, সামাজিক সুরক্ষা সংক্রান্ত বিধিনিয়মের আওতায় না আসা এই সংস্থাগুলির মালিকদেরও শ্রম আইনে শ্রমিক হিসাবে ধরা হয়। মালিকদেরও তাই শ্রমিকদের মতো একই অধিকার থাকে। এই মালিকদের ৯৫ শতাংশই ক্ষুদ্র পণ্যের উত্পাদক এবং পাইকারি ও খুচরো ব্যবসায় যুক্ত। এই ক্ষুদ্র পণ্য উত্পাদন, ভারতীয় অর্থনীতিতে জীবিকা অর্জনের সব থেকে জনপ্রিয় উত্স। প্রথাগত ও অপ্রথাগত দু’টি ক্ষেত্রেই এটি দেখতে পাওয়া যায়। জীবিকার এই উত্সটি ছোট অথচ জটিল। স্বাধীন স্বতঃপ্রণোদিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং পরনির্ভশীল ছদ্মবেশী মজুরিভিত্তিক শ্রমের মধ্যে বহু বিচিত্র আঙ্গিক ও সম্পর্কে এর উপস্থিতি। এই সব ছোট সংস্থা খুব সামান্য‌ মূলধন ও শ্রমিক নিয়ে কাজ করে বলে এদের উত্পাদন পদ্ধতিতে বহুল বৈচিত্র দেখা যায়। মুনাফা সর্বাধিকীকরণের থেকও এরা বেশি জোর দেয় সর্বোচ্চ উত্পাদনের ওপর। পারিবারিক শ্রমকে বাজার দরে না ধরে তারা মূলধন-নিবিড়, বৃহৎ মাত্রার প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকে। এরা বাজার অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। অর্জিত মুনাফা পুনর্নিয়োগ করে ব্যবসায় পরিধি বাড়ানোর প্রয়াস এদের মধ্যে দেখা যায় না বললেই চলে। অপ্রথাগত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সামান্য‌ অঙ্কের উদ্ধৃত্ত, ঋণ করে পাওয়া অর্থ, বিবাহে পাওয়া যৌতুক, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ প্রভৃতি বিনিয়োগ করা হয়। আধুনিক ভারতে ধনতান্ত্রিকতার সব থেকে বড় বৈশিষ্ট্য‌ এটাই।

তবে শুধু ছোট সংস্থাতেই নয়, বৃহৎ উদ্যোগেও প্রথাবহির্ভূত ক্ষেত্রের এই বৈশিষ্ট্যগুলি নজরে পড়ে। কর্পোরেট ক্ষেত্রের ৪০ থেকে ৮০ শতাংশ শ্রমিকই নথিভুক্ত নয়। শ্রমশক্তির একটা সামান্য অংশই ইউনিয়নের দ্বারা সংঘবদ্ধ। শ্রমিকদের অধিকাংশই হয় তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়, অথবা মালিকপক্ষের ভয়ে সংকুচিত। কয়লাক্ষেত্রে সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এখানে নথিভুক্ত শ্রমিকদের পাশাপাশি অবাধে চলছে বেআইনি, প্রথা বহির্ভূত শ্রমের রাজত্ব। এমনকী রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিতেও অনিবন্ধিত ঠিকাদারদের মাধ্যমে ঠিকা শ্রমিক নিয়োগের প্রবণতা স্পষ্ট। বেসরকারি নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগের মতো বিভিন্ন পদক্ষেপে রাষ্ট্রে এই অপ্রথাগত ছবি ফুটে উঠছে, পরিকল্পনা কমিশনের নথিতে যার উল্লেখ মেলে না।

নীতি ও পরিকল্পনা সংক্রান্ত কিছু প্রশ্ন

ভারতের বিকাশশীল কর্পোরেট ক্ষেত্র নিয়ে সংবাদমাধ্যম বেশ মাতামাতি করলেও, ভারতীয় অর্থনীতির সিংহভাগই এখনও অপ্রথাগত ক্ষেত্রের ওপর নির্ভরশীল। ছবিটা এমনই থাকবে, নাকি নীতি ও পরিকল্পনার মাধ্যমে এই ক্ষেত্রকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা সম্ভব -- আসুন, এ বার এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক।

অপ্রথাগত অর্থনীতির ছোট সংস্থাগুলির জন্য‌ ভারতের কোনও সার্বিক অর্থনৈতিক প্রকল্প আছে কি না—এই প্রশ্নটি বহু বিতর্কিত। অনেকেই মনে করেন, এমন কোনও প্রকল্প নেই। তাঁদের বক্তব্যের সমর্থনে তাঁরা কর্মসংস্থানহীন বিকাশের ছবি তুলে ধরেন। ছোট মাত্রার উত্পাদন কী ভাবে পরিকল্পনা ও স্বীকৃতির বৃত্তের বাইরে থেকে যাচ্ছে, তার নিদর্শন দেখান।

অন্য দিকে অপ্রথাগত অর্থনীতিকে যাঁরা ধনতান্ত্রিক বলে মনে করেন না, রাষ্ট্রের কাছ থেকে যাঁরা উচ্ছেদের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করেন, তাঁদের ধারণা, রাষ্ট্রের ‘হয়তো’ এমন কোনও প্রকল্প রয়েছে। সবুজ বিপ্লব, ভূমিসংস্কার, সংরক্ষিত শিল্প এবং সর্বাত্মক উন্নয়নের প্রবক্তারা বলেন বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্পের কথা।

আর একটি মত হল, ভারতে বরাবরই ছোট সংস্থাগুলির নিরাপত্তা, ধ্বংস, সুরক্ষা ও উন্নয়নকে জড়িয়ে বিভন্ন প্রকল্প রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অপ্রথাগত ক্ষেত্রের বহু ছোট সংস্থা শহরের সৌন্দর্যায়ন প্রকল্পে বন্ধ হয়ে যায় বা তাদের উচ্ছেদ করা হয়, এই সংস্থাগুলিই আবার সামাজিক সুরক্ষার সুবিধা ভোগ করে, ক্ষুদ্র ঋণের সুযোগ পায়, স্থানীয় বাজারে ব্যবসা করে। কোনও পরিকল্পনার অঙ্গ হিসাবে এগুলি করা হয় না। কিন্তু দীর্ঘদিনের এই প্রথা অস্বীকার করে এগুলিকে আজ বন্ধ করে দেওয়া বা সুসংগঠিত করে তোলা কোনওটাই সম্ভব নয়।

অপ্রথাগত ক্ষেত্রেও বিধিনিয়ম

একবিংশ শতকে অপ্রথাগত ক্ষেত্রেও বিধিনিয়ম ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রসারিত হচ্ছে। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যেকার লেনদেনে মেনে চলা হচ্ছে কৃষি বাজার নিয়ন্ত্রণ আইন। তবে মজা হল, এই বিধিনিয়মগুলি আবার কর্পোরেট মূল্যবোধ শৃঙ্খলের ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক বলে সমালোচিত। অবশ্য এই নিয়ন্ত্রণ নির্বাচিত কিছু সংস্থার ওপরেই প্রযোজ্য। এই সংস্থাগুলিকে এখন লাইসেন্স নিয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধিত হতে হয়। কিন্তু এর পর এরা যথেচ্ছ ভাবে শ্রম ও পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে, বাণিজ্যিক ও পৌর কর প্রদানে অনিয়মিত হয়। অনেক সময়ে এরা বেআইনি কাঁচামালও ব্যবহার করে এবং সে জন্য সরবরাহকারী, পরিবাহক ও নিরাপত্তা প্রদানকারীদের চাহিদা মতো অর্থ দিতেও পিছপা হয় না।

অনিয়মকে প্রশ্রয়

নির্বাচিত ক্ষেত্রে নীতি প্রয়োগের একটা সাধারণ ধরন আছে। দীর্ঘদিন ধরেই দেখা গেছে, ভারতের সর্বোচ্চ পুঁজিপতি শ্রেণি রাষ্ট্রের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা নিলেও নিয়মনীতি মেনে চলার ক্ষেত্রে বিশেষ আগ্রহী নয়। অপ্রথাগত ক্ষেত্রও এর ব্যতিক্রম নয়। সামাজিক ভাবে নিয়ন্ত্রিত এই অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের নির্মিত পরিকাঠামো উত্পাদনের কাজে ব্যবহার করা হয়। এর সামাজিক সুরক্ষাজাল শ্রমশক্তির নির্বাচিত অংশের অস্তিত্ব রক্ষায় সাহায্য‌ করে। কিন্তু এখানেও অবৈধ ভাড়ার বাজারের অনুপ্রেবশ ঘটে। ব্যক্তিগত স্বার্থরক্ষায় শৃঙ্খলা ভাঙা এবং কর ফাঁকি দেওয়া হয়। এক সমান্তরাল ছায়ারাষ্ট্র এই প্রথাগত অর্থনীতিকে শাসন করে। রাষ্ট্র এবং সমান্তরাল ছায়ারাষ্ট্র দুইয়েরই সহাবস্থান ঘটে। এর জেরে অর্থনীতি এগিয়ে চলে, তবে ক্ষুণ্ণ হয় আইনসংগত জনপরিসর।

রাষ্ট্র চাইলে বেআইনি এই কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে উন্নয়নমূলক, গণতান্ত্রিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারে। কিন্তু তার বদলে ইচ্ছাকৃত ভাবেই এই অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়।

অজানা থেকে যায় সাফল্যের তথ্য

প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে কোনও নীতি রূপায়ণের পর তার ফলাফল, যে উদ্দেশ্যে ওই নীতি প্রণয়ন করা হয়েছিল তার সঙ্গে তুলনা করে দেখা সম্ভব হয় না। ফলে কতটা সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হল, তা-ও অজানা থেকে যায়। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঘটনার সমীক্ষার মাধ্যমেই একমাত্র কিছু তথ্য সামনে আসতে পারে। নীতিনির্ধারকরা হয়তো এই নিদর্শনকে প্রামাণ্য বলে স্বীকার করবেন না, তবুও তথ্য সংগ্রহের এই একটিই পথ। বেঙ্গালুরুতে জমি ব্যবহার সংক্রান্ত এমনই একটি সমীক্ষায় প্রকাশ পায়, কী ভাবে বিভিন্ন ব্যক্তিগত স্বার্থের মিশেলে পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষকে পর্যন্ত হাতের মুঠোয় নিয়ে এসে জমির বে-আইনি ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। নাগরিক সমাজের কোনও আপত্তিতেই কর্ণপাত করা হয়নি।

দারিদ্র দূরীকরণ নীতি ও তার সুফল নির্দিষ্ট মানুষজনের কাছে না পৌঁছানো নিয়ে মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রে আর একটি সমীক্ষা করা হয়েছিল। এতে আমলাতান্ত্রিক রাজনীতির কৌশলগত চলন সামনে উঠে আসে। ব্যক্তি ও বেসরকারি স্বার্থরক্ষা কী ভাবে করা হয়, প্রকাশিত হয় তা-ও।

জমি সংক্রান্ত বিষয়ে জাতপাতের অঙ্ক

কৃষি এবং ফলন-পরবর্তী সরবরাহ শৃঙ্খলা নিয়ে হরিয়ানায় তৃতীয় সমীক্ষাটি করা হয়। দেখা গেছে, জমি সংক্রান্ত বিষয়ে এখনও জমি আইনের পরিবর্তে এখানে জাতপাতের অঙ্কই বেশি মেনে চলা হয়। নিয়ন্ত্রিত বাজার আইন কখনও কখনও কার্যকর হলেও এর লঙ্ঘন করা হলে জরিমানার কোনও ব্যবস্থা নেই। কৃষি প্রক্রিয়াকরণ ক্ষেত্রে একাধিক লাইসেন্স পাওয়ার জন্য ঘুষ দেওয়া, দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধি উপেক্ষা করা, পণ্যের গুণমান বজায় না রাখার মতো ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। পরিবহন ক্ষেত্রে এজেন্টরা ঘুষ দেওয়ার জন্য ‘এক জানলা ব্যবস্থা’ও তৈরি করে ফেলেছে। এমনকী ঘুষের জন্য প্রিপেইড কার্ডের প্রচলনও হয়েছে। বেআইনি ওভারলোডিং-এর মুনাফা মালিক, বুকিং এজেন্ট, কমিশন এজেন্ট, মহাজন, সরকারি আধিকারিক, রাজনীতিবিদ এবং স্থানীয় মোড়লদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিগুলির মধ্যে গড়ে উঠেছে এক দুষ্টুচক্র।

রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক নীতির পরিধি অস্পষ্ট বলে মনে করা হলেও এই সমীক্ষায় দেখা গেল, তা আসলে রাজনৈতিক পরিসরে পরিণত হয়েছে। ক্ষেত্র ও অঞ্চলভেদে এর বিভিন্নতা কতটা, তা জানতে আরও সমীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। নিয়ন্ত্রণমূলক রাজনীতি ভাড়াকে দু’ভাবে কাজে লাগায়। রাষ্ট্রের হাতে থাকে নিয়ন্ত্রণমূলক স্বাধীনতা আর রাষ্ট্রকে হাতে রাখে স্থানীয় পুঁজি।

পরিকল্পনাকারীদের দু’টি পথ

শহর ও অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়নের সময়ে পরিকল্পনাকারীরা যে সব সমস্যায় পড়েন, তার সমাধানে তাঁরা মূলত দু’ভাগে এগোন। একটি পথ হল নমনীয় বিধিনিয়ম এবং অপরটি আরও পুঙ্খনুপুঙ্খ সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু এর কোনওটাই অপ্রথাগত অর্থনীতির ওপর তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি।

নীতি রূপায়ণের এই প্রতিবন্ধকতা, বিধি কার্যকর করার শক্তির অভাব এখন গভীরে শিকড় গেড়ে বসেছে। রাষ্ট্রের নীতি এখন বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের স্বার্থের সঙ্গে সমঝোতা করে পরিশোধিত হয়ে আসে। ভবিষ্যতের কোনও পরিকল্পনা করার সময়ে এই সত্যটি অবশ্যই মাথায় রাখা দরকার।

আনুষ্ঠানিকতা

প্রথাবহির্ভূত অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় আনার কথা মাঝে মাঝেই ওঠে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক পদ্ধতিই মাঝে এখন ক্রমশ আনুষ্ঠানিকতামুক্ত হয়ে উঠছে। নির্বাচিত লাইসেন্সধারীরা ব্যাংক ঋণের সুবিধা পাচ্ছেন। ব্যবসায়িক সংগঠনগুলি দক্ষতার শংসাপত্র দিচ্ছে। এর জেরে শ্রমের সচলতা বাড়ছে। আধারের মাধ্যমে মহাত্মা গান্ধী গ্রামীণ কর্মনিশ্চয়তা প্রকল্পসহ বিভিন্ন সরকারি কাজের টাকা বৈদ্যুতিন ভাবে মিটিয়ে দেওয়ার যে পদ্ধতি শুরু হয়েছে, তা দেশের সর্বত্র সমান ভাবে এখনও চালু না হলেও এর জেরে শ্রম ও নাগরিকত্বের মধ্যে একটা আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপিত হচ্ছে। ক্ষুদ্র ঋণের জন্যও নথিভুক্তির প্রয়োজন হয়, কিন্তু স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে এই ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানের সময়ে বহু ক্ষেত্রেই জাতপাত ও লিঙ্গ পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এনইএফটি-এর মাধ্যমে বাজারের ভৌগোলিক পরিধি প্রসারিত হয়েছে এং ঋণ মজুরির ক্ষেত্রে খামখেয়ালিপনা কমেছে ঠিকই, কিন্তু এখনও মৌখিক চুক্তির পরিসর রয়েছে। রাষ্ট্রের পরিবর্তে বাজারই এখন ত্রুটিপূর্ণ এই পদ্ধতির চালিকাশক্তি।

আপসের পথে রাষ্ট্র

রাষ্ট্র এখন অনেকটাই আপসকামী। বিশেষত স্থানীয় স্তরে মরশুমি আয়ের স্বল্পতায় বহু জায়গাতেই মৌলিক পরিকাঠামো সে ভাবে গড়ে ওঠেনি। এর জেরে অঘোষিত ভাবে সরকারি পরিষেবার বেসরকারিকরণ ঘটে চলেছে। এর ফলে সমাজে বৈষম্য বাড়ছে। ভারতে এমন বিভিন্ন ক্ষেত্র ও অঞ্চল রয়েছে, যেখানে স্থানীয় অর্থনীতি শুধু অপ্রথাগতই নয়, দুর্বৃত্তায়িত হয়ে উঠেছে। সেখানে পদে পদে আইন লঙ্গন করা হচ্ছে, গড়ে উঠছে সমান্তরাল ব্যবস্থা, পাশাপাশি উত্পাদিত হচ্ছে আইনসংগত ও বেআইনি পণ্যসামগ্রী। একে রক্ষা করছে দুর্বৃত্তদের দল। এর সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে রাজনৈতিক দলের তহবিলে অর্থ সংগ্রহের বিষয়। রাজনৈতিক পরিসরের দুর্বৃত্তায়ন ঘটছে। নির্বাচনী ব্যয় সম্পূর্ণ ভাবে রাষ্ট্রের নির্বাহ করার প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলি যে ভাবে ঘোরতর বিরোধিতা করেছে, কর ফাঁকি ও মূলধনি যুদ্ধ যে ভাবে চলছে, তাতে অপ্রথাগত ও কালো টাকার অর্থনীতির এখনই লুপ্ত হওয়ার কোনও ইঙ্গিত মিলছে না।

নতুন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, প্রথা বহির্ভূত অর্থনীতি, পরির্বতনের বিরোধী নয়, ভারতের তুলনামূলক উচ্চ বিকাশ হারের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে এই ক্ষেত্র সব ধরনের উদ্ভাবনকে স্বাগত জানাতে প্রস্তত। প্রযুক্তিগত, পদ্ধতিগত, সাংগঠনিক—যে কোনও উদ্ভাবনকেই অপ্রথাগত অর্থনৈতিক ক্ষেত্র সাদরে গ্রহণ করেছে।

অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সাথে যাঁরা যুক্ত, তাঁদের এই সত্য স্বীকারের এবং এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণের সময় এসেছে।

Email: barbara.harriss-white@qeh.ox.ac.uk

সূত্র : যোজনা, অক্টোবর, ২০১৪।

3.10344827586
মন্তব্য যোগ করুন

(ওপরের বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন মন্তব্য / পরামর্শ থাকে, তাহলে দয়া করে আমাদের উদ্দেশ্যে পোস্ট করুন).

Enter the word
ন্যাভিগেশন
Back to top