ভাগ করে নিন
ভিউজ্
  • অবস্থা সম্পাদনার জন্য উন্মুক্ত

ভারতের শহরে অপ্রথাগত ক্ষেত্র

জীবিকা অর্জনের উত্স হিসাবে শহরের অপ্রথাগত ক্ষেত্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গ্রাম থেকে আসা মানুষজন এবং শহরের বস্তিতে থাকা বহু দরিদ্র পরিবারের কাছে এর গুরুত্ব অপরিসীম।

সূচনা

জীবিকা অর্জনের উত্স হিসাবে শহরের অপ্রথাগত ক্ষেত্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গ্রাম থেকে আসা মানুষজন এবং শহরের বস্তিতে থাকা বহু দরিদ্র পরিবারের কাছে এর গুরুত্ব অপরিসীম। এই নিবন্ধে অপ্রথাগত ক্ষেত্রের আকার এবং উপাদানগুলি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। চুক্তিভিত্তিক ও অনুসারী ক্ষেত্রগত সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলি এর কার্য সম্পাদন এবং ফলাফলের উপর কতটা প্রভাব ফেলেছ, তারও অনুসন্ধান রয়েছে এই লেখায়।

ভারতীয় প্রেক্ষাপটে অপ্রথাগত ক্ষেত্রের পরিস্থিতি নিয়ে গত দু’-তিন দশকে বেশ কিছু সমীক্ষা করা হয়েছে। এর সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাওয়া যাবে দাস (২০১১) ও মিত্র-র (২০১৩) বইতে। কৃষি উত্পাদনশীলতা কমে আসায় যে উদ্বৃত্ত শ্রমিকের সৃষ্টি হল তাঁরা গ্রামের অকৃষিক্ষেত্রে কাজ পেলেন না। শহরের উচ্চ উত্পাদনশীল ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রেও জায়গা না হওয়ায় শেষমেশ তাঁদের ঠাঁই হল শহরের অপ্রথাগত ক্ষেত্রে (মিত্র ১৯৯৪)।

একই সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির উচ্চ হার শহরের শ্রমিক সংখ্যা আরও বাড়িয়ে তুলল। এই শ্রমশক্তির একটা বৃহৎ অংশই অদক্ষ অথবা সামান্য দক্ষ। অন্য দিকে আবার উন্নয়ন প্রক্রিয়া ক্রমশই আরও বেশি করে মূলধন ও দক্ষতা নির্ভর হয়ে ওঠায় বহু শ্রমিক জীবিকা অর্জনের তাগিদে অপ্রথাগত ক্ষেত্রের আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে নানা ধরনের দারিদ্র।

তূলনামূলক আকার

অপ্রথাগত ক্ষেত্রে দেশের মোট শ্রমশক্তির একটা বড় অংশ নিয়োজিত। কৃষিকাজ ছাড়াও আরও নানা ধরনের কাজ এর আওতায় পড়ে। অপ্রথাগত ক্ষেত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল কম উত্পাদনশীলতা, কাজের মাত্রার ক্ষুদ্রতা, দুর্বল প্রযুক্তি, কম মূলধন-শ্রম অনুপাত, উপাদান ও পণ্যের অরক্ষিত বাজার প্রভৃতি। একটি সংস্থা প্রথাগত না অপ্রথাগত — কোন ক্ষেত্রে থাকবে, তা নির্ভর করে তার আয়ত্তে থাকা দক্ষতা ও শিক্ষার মানের উপর। অদক্ষ শ্রমিককে কাজের জন্য এক মালিকানাধীন কারবার ও অন্যান্য ছোট সংস্থার উপার্জন আর বাড়ে না। তাঁদের মধ্যে অনেকে একই ক্ষেত্রেই থেকে যান। তাঁদের উপার্জন আর বাড়ে না। শিক্ষার মানোন্নয়ন, বাজার সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, ঋণের সুবিধা, উন্নত প্রযুক্তি, সার্বিক অর্থনৈতিক চিত্র ও নীতি পরিবর্তনের জেরে কাজের পরিধি ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়। এই ভাবেই কোনও সংস্থা ধীরে ধীরে অপ্রথাগত থেকে প্রথাগত ক্ষেত্রে উন্নীত হয়।

এর সঙ্গে অবশ্য এ বাবদ খরচের অঙ্কটাও মাথায় রাখতে হবে। যেমন ধরুন, প্রথাগত ক্ষেত্রে যদি নিবন্ধীকরণ পদ্ধতি এবং শ্রম আইন খুব কড়া হয়, সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থা স্বেচ্ছায় অপ্রথাগত ক্ষেত্রেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে (মাইতি ও মিত্র ২০১০)। আবার অপ্রথাগত ক্ষেত্রে শ্রমের বাজারে যে নমনীয়তার সুযোগ পাওয়া যায়, তার সুবিধা নিতেও কোও সংস্থা নিজেদের ছোট আকারেই রাখতে চাইতে পারে। এই ধরনের সংস্থা গুলি কিন্তু প্রকৃতিগত ভাবে অনুত্পাদনশীল নয়, বরং কারিগরি দিক থেকে দক্ষ প্রতিযোগিতায় সক্ষম।

অপ্রথাগত ক্ষেত্রে মহিলা শ্রমশক্তি

গ্রাম এবং শহর—দুই জায়গাতেই মোট কর্মসংস্থানের নিরিখে অপ্রথাগত ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের হার বেশ উঁচু। কৃষি কাজে অপ্রথাগত ক্ষেত্রের প্রধান্য যে বেশি হবে, তা জানা কথা। কিন্তু অকৃষিক্ষেত্রেও যে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক অপ্রথাগত ক্ষেত্রের আওতায় থেকে জীবিকা অর্জন করেন, তা আমাদের বিস্মিত করে। আর একটি আশ্চর্যের বিষয় হল, মোট মহিলা শ্রমশক্তির তুলনায় অপ্রথাগত ক্ষেত্রে নিযুক্ত মহিলা শ্রমিকের হার পুরুষদের হারের তূলনায় কম। এর বিপরীতটাই প্রত্যাশিত ছিল।

তবে এই হিসেব বাস্তবের প্রতিফলন নয়। জাতীয় নমুনা সমীক্ষা (২০০৯-১০)-এর দেওয়া সংজ্ঞায় এক মালিকী ও অংশীদারি কারবারকে অপ্রথাগত ক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত করা হলেও বাদ দেওয়া হয়েছে গৃহস্থলিকে। তাই গৃহস্থালির কাজে নিযুক্তদের হিসেবের মধ্যে ধরা হয়নি। এই সংখ্যা কিন্তু বিপুল। এর ফলে সারণি-১ অপ্রথাগত ক্ষেত্রে কর্মীসংস্থানের যে তূলনামূলক পরিসংখ্যান দেওয়া হেয়েছ, তা বাস্তবের থেকে অনেকটাই কম। আর একটি লক্ষণীয় বিষয় হল, অপ্রথাগত ক্ষেত্রের কর্মসংস্থানের হিসাবে প্রথাগত ক্ষেত্রের চুক্তিবদ্ধ ও অনিয়মিত শ্রমিকদের ধরা হয়েছে। এই সীমাবদ্ধতাগুলি সত্ত্বেও দেখা যাচ্ছে, ভারতীয় প্রেক্ষাপটে প্রথামুক্ত ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের হার অস্বাভাবিক বেশি, বিশেষত অকৃষি ক্ষেত্রে।

সারণি-

অসংগঠিত ক্ষেত্রের তুলনামূলক আকারঃ সর্বভারতীয় (২০০৯-১০)

ক্ষেত্র

কৃষি

অকৃষি

 

পুরুষ

মহিলা

ব্যক্তি

পুরুষ

মহিলা

ব্যক্তি

গ্রামীণ

৯০.

৯৫

৯৩.

৭৩

৬৪.

৭১.

শহর

৮৮.

৯৭.

৯২.

৬৮.

৬০.

৬৬.

সূত্রঃ NSS Employment-Unemployment Date, 2009-10

নতুন প্রবণতা

কর্মসংস্থান ও উত্পাদনের হার বৃদ্ধি, ফলাফল মূল্যায়নের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। অপ্রথাগত উত্পাদন ক্ষেত্রের বেশ কিছু শিল্পে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ঋণাত্মক। তবে বস্ত্র, চর্ম, অধাতব খনিজ, মৌলিক ধাতুর মতো কিছু শিল্পে ইতিবাচক বিকাশ হারও দেখা গেছে।

এই তথ্যের প্রেক্ষাপটে ২০০৯-১০ সালে দিল্লিতে আমরা একটি গুণগত সমীক্ষা করি। বিশেষ করে বস্ত্রশিল্পের ভাল ফলাফলের দিকে লক্ষ রেখে এই ক্ষেত্রের শ্রমিকদের পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করা হয়। দিল্লির সুন্দরনগরী এলাকায় করা সমীক্ষায় দেখা যায়, এই ক্ষেত্রের শ্রমিকরা মূলত তিন ধরনের কাজে নিযুক্ত। দর্জির কাজ ও এমব্রয়ডারি, অলংকার এবং মোড়কজাত করণ। শ্রমিকরা ঠিকাদারদের কাছ থেকে কাজের বরাত পান।

সারণি-

অসংগঠিত উত্পাদন ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান ও GVA-র বিকাশ

(২০০৫-০৬ থেকে ২০১০-১১)

 

OAME

ESTABLISHMENT

ALL

শিল্প

শ্রমিক

GVA

শ্রমিক

GVA

শ্রমিক

GVA

খাদ্যদ্রব্য পানীয় ও তামাক

-.৭৭

.১২

-.৩৯

-.২৯

-.৯৪

.৩৫

বস্ত্র ও চর্ম

.৪৮

১৫.১৪

.৪৬

.৮৪

.৭৯

১২.০৭

কাগজ

-১৩.৩৫

-.০৪

১৫.৩৩

২৩.৪৫

-.৬৪

১৭.২৯

রাসায়নিক

-১৭.৩৬

-.০৭

-.০৪

.৫৯

-১০.৯৯

.৯৫

অধাতব খনিজ

-.৯১

.০১

১১.২৭

.০৩

.৯৭

.৬৭

মৌলিক ধাতু

১৩.৩৪

১৯.০৬

-.৩০

-১২.৯২

.৫২

-.১০

ধাতু

-.৬৯

.৬৫

.৭৭

.৪৭

.৮২

.৫৪

যন্ত্রপাতি

২৬.১৯

-১৪.৪৪

-.৬৫

-.৭০

-১২.৬৪

-.৬০

পরিবহণ যন্ত্রাংশ

-.৬৪

১৫.৬৩

-.৭০

.২০

-.৫২

.৭০

কাঠ সহ অন্যান্য উত্পাদন

-.৩২

১২.৭৯

.৪৩

.৭৭

.৮৯

.৪৭

সব শিল্প

-.৪৫

.৫৮

.৮৫

.২৫

-.৮৬

.৭২

সূত্রঃ NSS, GVA কোটি টাকায়, ২০০৪-০৫ এর মূল্যমানে।

 

উত্পাদিত দ্রব্য তাঁদেরকেই দেন। এর পর ঠিকাদাররা তা বিভিন্ন দোকানে বিক্রি করেন।

অত্যন্ত কম মজুরি

কিছু পণ্যে নির্দিষ্ট সংস্থার ছাপ থাকলেও বহু পণ্য, উত্পাদক সংস্থার পরিচয় ছাড়াই বিক্রি হয়। ঠিকাদাররাই শ্রমিকদের কাঁচামাল কিনে দেন এবং তাঁদের কাছ থেকে উত্পাদিত পণ্য সংগ্রহ করেন। কাজের অভাব না থাকলেও শ্রমিকদের যে মজুরি দেওয়া হয়, তা অত্যন্ত কম। এমনকী, খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, তাঁদের প্রকৃত মজুরি ক্রমশ কমেছে। তবে প্রচুর কাজ থাকায় এই অবনমনের প্রভাব তাঁদের জীবনযাত্রার মানের উপর পড়েনি। কিন্তু একই পরিমাণ প্রকৃত মজুরি উপার্জন করতে শ্রমিককে এখন অনেক বেশি খাটতে হচ্ছে।

শ্রমিকরা তাঁদের উত্পাদিত সামগ্রী সরাসরি দোকানে বিক্রির ব্যবস্থা করে উঠতে না পারায় সেই সুযোগে মুনাফা লুঠছে মধ্যস্বত্বভোগীরা। শ্রমিকরা যাতে উত্পাদিত পণ্য সরাসরি দোকানে বিক্রি করতে পারেন, সে জন্য সরকার ও নাগরিক সমাজের এগিয়ে আসা উচিত।

‘নাও, অথবা ছেড়ে দাও’

উত্পাদক সংস্থার পরিচয়সহ যে সব পণ্য বিক্রি হয়, তাদের মধ্যে যে সংস্থাগুলি উন্নত গুণমান বজায় রাখতে পারে, তাদের কাজের অভাব হয় না। কিন্তু তাতেও কম মজুরির সমস্যার সমাধান হয়নি। আসলে এটা সম্পূর্ণ ভাবেই ক্রেতা নিয়ন্ত্রিত বাজার। ঠিকাদাররাই পণ্যের দাম ঠিক করে। এ নিয়ে কোনও দরাদরি চলে না। এখানকার মূলমন্ত্র হল, ‘নাও, অথবা ছেড়ে দাও’। এ ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিছু সংগঠন ঠিকাদারদের তূলনায় অনেক বেশি মজুরি শ্রমিকদের দেয়। কিন্তু ঠিকাদাররা এদের থেকে ঢের বেশি কাজের বরাত দেওয়ায় শ্রমিকরা বাধ্য হয় ঠিকাদারদের কাজই করতে।

শ্রমিকদের কোনও রকম ঘরোয়া বা আনুষ্ঠানিক সংগঠন না থাকায় দর কষাকষির ক্ষমতা তাঁদের নেই। তাই মজুরি বৃদ্ধির সংগঠিত কোনও দাবি পেশ করাও তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। অন্য দিকে ঠিকাদারদের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয় অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ায় তারা কিছুতেই মজুরি বাড়াতে চায় না। কাঁচামালের সরবরাহ একচেটিয়া ভাবে ঠিকাদারদের হাতে থাকায়, ঋণ বা বিপণনে সহায়তা নিয়ে স্বাধীন ব্যবসা করার কথাও ভাবতে পারেন না শ্রমিকরা।

কাজের নিশ্চয়তা একমাত্র সুবিধা

বাজারে সুনাম আছে, এমন কিছু সংস্থা প্রায়ই রপ্তানির বরাত পায়। তখন তারা শ্রমিকদের দিয়ে সেই পণ্য তৈরি করায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও মধ্যস্বত্বভোগীদের উপস্থিতি এবং শ্রমের অতিরিক্ত জোগানের ফলে শ্রমিকদের কাছে এর সুফল পৌঁছোয় না। এই সব ক্ষেত্রে পণ্যের গুণমানের উপর কঠোর দৃষ্টি থাকায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি একই শ্রমিকদের দীর্ঘকালীন ভিত্তিতে রেখে দিতে চায়। অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী, এই পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের বেশি মজুরি পাওয়া উচিত। কিন্তু অপ্রথাগত ক্ষেত্রে এমন নিদর্শন প্রায় মেলে না বললেই চলে। একমাত্র যে সুবিধা শ্রমিকদের কাছে পৌঁছোয়, তা হল কাজের নিশ্চয়তা। কাজের অনিশ্চয়তার জন্য কুখ্যাত অপ্রথাগত ক্ষেত্রের কিছু অংশে এই নিয়মিত কাজের সুযোগ পাওয়াটাই শ্রমিকদের লাভ। দীর্ঘকালীন মেয়াদে এর একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা যায়। নিয়মিত কাজের সুযোগে শ্রমিকরা বাজারের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে পারবেন। তাঁদের দক্ষতা বাড়বে, ধীরে ধীরে বিকশিত হবে নিজস্ব উদ্যোগ স্থাপনের সক্ষমতা এবং সার্বিক ভাবে প্রথামুক্ত ক্ষেত্রের উত্পাদনশীলতা বাড়বে।

তবে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের কিছুটা স্তিমিত হয়ে যেতে পারে প্রথাগত ক্ষেত্রের ঘরোয়াকরণ প্রক্রিয়ার জন্য। ঘটনাচক্রে এখন প্রথাগত ক্ষেত্রের বিভিন্ন স্তরে বিশেষত নিচু তলায় (শিল্পক্ষেত্রে শ্রমিক, বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি অফিসগুলিতে চতুর্থ শ্রণির কর্মী) এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক পরিবর্তন

অপ্রথাগত উত্পাদন ক্ষেত্রের যে সাম্প্রতিক পরিবর্তন নজের আসছে তা বেশ উল্লেখযোগ্য। এই ক্ষেত্রের অনেক ছোট ছোট সংস্থা (বিশেষত পোশাক, চর্ম ও অলংকার শিল্পের সঙ্গে যুক্ত সংস্থা) এখন প্রথাগত ক্ষেত্রের বৃহৎ কোনও সংস্থার সঙ্গে সংযুক্ত। এই বৃহৎ সংস্থাগুলিই কাঁচামাল প্রভৃতির জোগান দেয়। অনেকই মনে করছেন, এই সংযুক্তিসাধনের ফলে ছোট সংস্থাগুলির ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা অনেকটা কমবে। ঋণ সহায়তা বা বিপণন নিয়ে তাদের আর ভাবতে হচ্ছে না। বরং কাঁচামাল এবং কাজের বরাত দোরগোড়ায় এসে পৌঁছোচ্ছে।

আশা করা যায়, বিকাশের সুফল এই ভাবে বৃহৎ সংস্থাগুলির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়ে ছোট সংস্থাগুলির কাছে এসে পৌঁছবে। প্রকাশিত হবে বিশ্বায়নের দরিদ্রবান্ধব চেহারা। তবে, আমাদের সুন্দরনগরী এলাকার সমীক্ষা কিন্তু সাধারণ এই আশার বিপরীত ফলাফলই তুলে ধরেছে।

উপসংহার

গ্রাম এবং শহর — দু’ জায়গাতেই শ্রমিকদের একটা বড় অংশ অপ্রথাগত ক্ষেত্রে কর্মরত। তবে আশার কথা হল, শহরের আকার বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিবর্তনের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে প্রথামুক্ত ক্ষেত্রের চরিত্রও বদলাচ্ছে। যে সব শহরের বিকাশ সম্ভাবনা বেশি, সেখানে এই বদলটা বিশেষ ভাবে চোখে পড়ে। এমন শহরে এক জন ব্যক্তির প্রকৃত আয় বেশি হয়। অর্থাৎ অপ্রথাগত ক্ষেত্রও এখন আর স্থবির নয়। অর্থনৈতিক বিকাশের বিস্তৃত পরিসরে উন্নত জীবিকা অর্জনের উত্স হয়ে ওঠার সম্ভাবনা এই ক্ষেত্রেও দেখা দিচ্ছে।

অপ্রথাগত ক্ষেত্রের সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলি বোঝাতে আমাদের সমীক্ষার কিছু পর্যবেক্ষণ উদ্ধৃত করা হয়েছে। উদাহরণ হিসাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উল্লেখ করা যায়। চুক্তি প্রথা এবং অনুসারীকরণ প্রক্রিয়া এখন অপ্রথাগত ক্ষেত্রের কাজ ও ফলাফলের উপর ইতিবাচক প্রভাব যেমন ফেলছে, তেমনি ক্ষতি হচ্ছে কল্যাণমূলক দিকটির।

অপ্রথাগত উত্পাদন ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ২০০৫-০৬ থেকে ২০১০-১১ সময়কালের মধ্যে ঋণাত্মক, সম্ভবত প্রতিযোগিতায় এঁটে উঠতে না পেরে খরচ কমানোর লক্ষ্যে এই ক্ষেত্রে ব্যাপক শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। ভারতীয় উত্পাদন সংস্থাগুলি রপ্তানির বাজারে এখনও তেমন সুবিধা করে উঠতে পারেনি। পণ্যের উপযুক্ত গুণমান না থাকায় অপ্রথাগত ক্ষেত্রেরও একই দশা। বিশ্বায়নের যে সুবিধা চিনা সংস্থাগুলি ভোগ করছে, ভারতের কাছে তা এখও স্বপ্ন। আধুনিকীকরণের অভাবে পণ্য বৈচিত্র আসেনি, উচ্চমূল্যের পণ্য উত্পাদনেও এখনও ভারত অগ্রণী ভূমিকা নিতে ব্যর্থ।

চাই সার্বিক নীতি

বিকাশের চালিকাশক্তি হিসাবে শিল্প পুনরুজ্জীবনের যে প্রয়াস কেন্দ্রীয় সরকার সম্প্রতি শুরু করেছে, অপ্রথাগত উত্পাদন ক্ষেত্রের শুরু করেছে, অপ্রথাগত উপাদান ক্ষেত্রের বিকাশ না হলে এবং কর্মসংস্থান না বাড়লে, তা সফল হবে না। অপ্রথাগত ক্ষেত্রের অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা হল মূলধনের অভাব। এর ফলে শ্রম উত্পাদনশীলতার বিকাশ এবং আয় দুই-ই ব্যাহত হয়। এমনকী পণ্য বিপণনের জন্যও প্রথামুক্ত ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের উপর নির্ভশীল। এর ফলে শ্রমিকদের আয় ব্যাপক ভাবে কমে যায়। তাই বর্তমানে অপ্রথাগত ক্ষেত্র সংক্রান্ত একটি সার্বিক নীতি প্রণয়ন করা একান্ত আবশ্যক হয়ে উঠেছে। এতে নিম্নস্তরে কর্মরত শ্রমিকরা বিশেষ উপকৃত হবেন।

লেখক : দিল্লির ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক গ্রোথ-এ অর্থনীতির অধ্যাপক।

email:arup@iegindia

সূত্র : যোজনা, অক্টোবর, ২০১৪।

2.87234042553
মন্তব্য যোগ করুন

(ওপরের বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন মন্তব্য / পরামর্শ থাকে, তাহলে দয়া করে আমাদের উদ্দেশ্যে পোস্ট করুন).

Enter the word
ন্যাভিগেশন
Back to top