ভাগ করে নিন
ভিউজ্
  • অবস্থা সম্পাদনার জন্য উন্মুক্ত

নানা খবর

দেশ ও বিদেশ এর নানা খবর তা আছে এখানে।

দুই রাজ্যের টানাপড়েনে বিপন্ন নাবালিকার ঠিকানা

বিহারের দাবিতে ষড়যন্ত্র দেখছে পশ্চিমবঙ্গ

গঙ্গাকুমারী। বছর তেরোর এই কিশোরীকে নিয়েই সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার সরকারের মধ্যে টানাপোড়েন তুঙ্গে উঠেছে।

গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে এই মেয়েটিকে পশ্চিমবঙ্গের একটি হোমে পাঠিয়েছিল বিহার সরকার। এখন তারাই ফের ওই নাবালিকাকে ফেরত চাওয়ায় বেঁকে বসেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। রাজ্যের অভিযোগ, এর পিছনে কোনও ষড়যন্ত্র রয়েছে। বিহারে ফিরে গেলে মেয়েটি আদৌ সুরক্ষিত থাকবে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন রাজ্যের কর্তারা।

অন্য দিকে, বাঁকুড়ার যে হোমে মেয়েটি ছিল, তার সম্পর্কে বিস্তর অভিযোগ তুলেছে গঙ্গাকুমারী নিজে ও বিহার সরকার। সব মিলিয়ে গত আড়াই মাস ধরে দু’পক্ষের বাকযুদ্ধ চলছেই। কিন্তু গঙ্গাকুমারী রয়ে গিয়েছে বাঁকুড়াতেই।

কোন পথে বাঁকুড়ায় এসে পৌঁছল এই নাবালিকা?

রাজ্য সমাজকল্যাণ দফতর সূত্রে খবর, বছর ছ’য়েক আগে কাজের খোঁজে দিল্লিতে যান পেশায় রাজমিস্ত্রি রাজকুমার। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী রীণাদেবী ও মেয়ে গঙ্গাকুমারী। সেখানেই হারিয়ে যায় মেয়েটি। তার পর কারও সাহায্যে পৌঁছয় পটনায়। সেখানে এক মহিলা তাকে গায়ঘাট এলাকার নিশান্ত হোমে রেখে আসেন। পাঁচ বছর সেখানেই ছিল গঙ্গা। সে সময় বিহারের সমাজকল্যাণ দফতরের আধিকারিকদের কাছে বাবা ও মায়ের নাম জানিয়ে মেয়েটি বলেছিল, তাদের বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের মালদহে। তা শুনে গত সেপ্টেম্বরে পটনার শিশুকল্যাণ সমিতি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাহায্যে গঙ্গাকে লিলুয়া হোমে পাঠায়। তার পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে তাকে পাঠানো হয় সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা পরিচালিত বাঁকুড়ার একটি হোম, নবদিগন্তে। টানাপড়েনের শুরু সেখান থেকেই।

সরকারি সূত্রের খবর, গত ৬ মার্চ বিহারের সমাজকল্যাণ সচিব রাজিল পুনহারি পশ্চিমবঙ্গের সমাজকল্যাণ সচিব রোশনী সেনকে চিঠি লিখে জানান, বিহারের রাজ্য সড়ক উন্নয়ন নিগমের ম্যানেজিং ডিরেক্টর অমৃত প্রত্যয়কে ফোন করে পটনার হোমে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে গঙ্গা। সে জানিয়েছে, বাঁকুড়ায় ওই হোমের পরিবেশ ভালো নয়।’ এই অবস্থায় বিহার সরকার গঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে চায় বলে জানান পুনহারি।

অমৃত প্রত্যয় এ বিষয়ে জানান, বিহারের বিভিন্ন হোম থেকে প্রতি বছর কিছু শিশুকে ‘দত্তক’ নিয়ে তাদের পড়াশোনা, বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও চাকরির দায়িত্ব নেয় তাঁদের নিগম। গঙ্গাও তাদেরই এক জন। তাঁর দাবি, গঙ্গা টেলিফোনে বলেছে, “নবদিগন্ত খুব খারাপ ছিল। ওখানে মেয়েদের লেখাপড়া শেখাত না। শুধু নোংরা-নোংরা কাজ করাত, জোর করে কলকাতায় নিয়ে যেত। আমি রাজি হইনি বলে ওরা মারত।” সে আরও বলে, “আমার এখানে ভালো লাগে না। আমি পটনায় ফিরতে চাই। ওখানে পড়াশোনা শিখে চাকরি করব।”

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৬ জুন ২০১৪

হোম নিয়ে অভিযোগ প্রমাণিত

বিহার সরকারের চিঠি পেয়েও গঙ্গাকে ছাড়তে রাজি হননি এ রাজ্যের সমাজকল্যাণ সচিব রোশনী সেন। কিন্তু সেই সঙ্গেই নানা রকম সন্দেহ আর প্রশ্ন উঠে আসে গঙ্গাকে নিয়ে। রাজ্যের মহিলা ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী শশী পাঁজার বক্তব্য, “গঙ্গার বাড়ি বাংলায় বলে বিহার ওকে এখানে পাঠাল। আবার বছর না পেরোতেই ওকে ফেরত চাইছে। এই ব্যাপারটাই সন্দেহজনক।” গঙ্গাকে পাঠালেও সে ওখানে নিরাপদ থাকবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি। তাঁর কথায়, “এই ঝুঁকি নেব না।” তিনি জানান, মালদহে মেয়েটির পরিবারের খোঁজ চলছে।

রাজ্যের শিশু অধিকার রক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান অশোকেন্দু সেনগুপ্তের দাবি, “কিছু গোলমাল পেয়েছি। সে সব অনেক কথা। অত ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়।” বাঁকুড়ার শিশু নিরাপত্তা কমিটির চেয়ারম্যান শেখ মুরশালিনের বক্তব্য, “মেয়েটিকে ফেরাতে বিহারের অতিসক্রিয়তা সন্দেহজনক। তদন্তে অনুমান, গঙ্গা পটনাতে প্রেমঘটিত ব্যাপারে জড়িয়ে পড়েছিল। সেই সূত্রেই তাকে ফেরানোর মরিয়া চেষ্টা চলছে। কিন্তু ফিরলে ওর ক্ষতি হতে পারে।” এর পিছনে বিহার সরকারের ষড়যন্ত্রটা ঠিক কী, কেনই বা মেয়েটির নিরাপত্তার প্রশ্ন তোলা হচ্ছে তার অবশ্য স্পষ্ট জবাব দেয়নি রাজ্য।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই মনোভাবে বিস্মিত বিহার সরকারের কর্তারা। রাজিল পুনহারির অভিযোগ, মেয়েটির কথা শুনে বিহার সরকারের তরফে একটি প্রতিনিধি দল বাঁকুড়ার ওই হোমে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু কারও সঙ্গে গঙ্গাকে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। এতেই বোঝা যায় ওই হোমে কোনও গোলমাল রয়েছে।” তাঁর স্পষ্ট কথা, “ওই মেয়েটিকে ফেরত দিতেই হবে।”

গঙ্গাকে না ফেরানোর পণ করলেও বাঁকুড়ার ওই হোম নিয়ে অভিযোগ পেয়ে তদন্ত চালিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের শিশুকল্যাণ কমিটি। তারা গুরুতর কিছু অনিয়ম পেয়েছে। ফলে নবদিগন্ত বন্ধ করে সেখানকার মেয়েদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে অন্য হোমে। গঙ্গাকে পাঠানো হয় বাঁকুড়ারই ‘নেতাজি স্কুল ক্লাব ও পাঠাগার’ নামে একটি হোমে। মন্ত্রী বলেন, “পরে ওকে লিলুয়া হোমে ফেরানো হয়েছে। সেখানে কোনও অভিযোগ নেই।”

প্রশ্ন উঠেছে, মেয়েটির অভিযোগ সরকারি তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। আগেও রাজ্যের একাধিক হোম নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তা হলে কোন ভরসায় গঙ্গাকে এই রাজ্যেরই কোনও হোমে রেখে দেওয়াকে ‘নিরাপদ’ মনে করছেন সরকারি কর্তারা? এর কোনও স্পষ্ট জবাব মেলেনি। বিহারের সমাজকল্যাণ দফতরের পাল্টা অভিযোগ, গঙ্গার সূত্রে নবদিগন্ত হোমের অনৈতিক কাজকর্ম সামনে চলে আসায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার অস্বস্তিতে পড়েছে। তাই বিষয়টি ধামাচাপা দিতে গঙ্গাকুমারীকে বিহারে ফেরত পাঠাতে চাইছে না পশ্চিমবঙ্গ।

কিন্তু বাঁকুড়ার নবদিগন্ত হোমে তদন্ত করে যে ছবিটা উঠে এসেছে তা কম ভয়াবহ নয়।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৬ জুন ২০১৪

কেঁচো খুড়তে সাপ

গঙ্গাকুমারীকে বিহারে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে প্রথমে রাজি ছিলেন রাজ্যের সমাজকল্যাণ সচিব রোশনী সেন। তিনি সেইমতো চিঠিপত্র তৈরিও করে ফেলেছিলেন। সমাজকল্যাণ দফতর সূত্রের খবর, দফতরের কর্তাদের একাংশ তাতে আপত্তি তোলেন। কারণ তাঁরা বুঝেছিলেন ওই কিশোরী বিহারে ফিরে হোমের অবস্থার কথা জানালে, অন্য রাজ্যের সামনে পশ্চিমবঙ্গের মাথা হেঁট হবে। তাঁদের আপত্তিতে রোশনী সেন পিছিয়ে আসেন। গঙ্গা যে হোমে ছিল বাঁকুড়ার সেই নবদিগন্ত কটেজ হোম নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠছিল বহু দিনই। গঙ্গার ফেরত যাওয়া আটকানোর পর সমাজকল্যাণ দফতর ওই হোমে তদন্তের নির্দেশ দেয়। তাতেই কেঁচো খুড়তে সাপ বেরোয়।

বাঁকুড়া শিশুকল্যাণ কমিটির চেয়ারম্যান শেখ মুরশালিন জানিয়েছেন, ওই হোমে আশ্রয় পাওয়া অনেক নাবালিকাকে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে দেহব্যবসার কাজ করানো হত বলে তদন্তে জানা গিয়েছে। এর পরেই গত ২৫ এপ্রিল হোমটি বন্ধ করার সরকারি নির্দেশ দেন রাজ্যের সমাজকল্যাণ সচিব। হোমের প্রধান শচীদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়কে গ্রেফতার করা হয়। গঙ্গাকুমারী-সহ অন্য আবাসিকাদের বিভিন্ন হোমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

জানুয়ারি মাসে হাওড়ার লিলুয়া হোম থেকে নবদিগন্ত হোমে পাঠানো হয়েছিল গঙ্গাকুমারীকে। একই দিনে অন্য দু’টি হোম থেকে আরও ২৬ জন নাবালিকাকে নবদিগন্তে পাঠানো হয়। এর কিছু দিন পরেই বিহারে ফোন করে গঙ্গা জানিয়েছিল, ফিরে যেতে চায় সে। ৪ এপ্রিল বাঁকুড়া শহর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে হরিয়ালগাড়ায় প্রায় জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত নবদিগন্তে যান বাঁকুড়া শিশুকল্যাণ কমিটি ও বাঁকুড়ার জেলাশাসকের অফিসের প্রতিনিধিরা। সেখানকার অবস্থা দেখে ও শুনে তাঁদের চোখ কপালে!

ঠিক কী রকম সেই অভিজ্ঞতা? তদন্তকারীরা রিপোর্ট দিয়ে জানিয়েছেন, হোমের লাইসেন্স থাকলেও বাঁকুড়া শিশুকল্যাণ কমিটির খাতায় নথিভুক্ত নয় নবদিগন্ত! এক হোম থেকে অন্য হোমে আবাসিকদের বদলি করলে সংশ্লিষ্ট শিশুকল্যাণ কমিটির অনুমতি নেওয়া দরকার। গঙ্গা-সহ ২৭টি মেয়েকে নবদিগন্তে পাঠানো হলেও অনুমতি নেওয়া হয়নি। বাঁকুড়া শিশুকল্যাণ কমিটির চেয়ারম্যান শেখ মুরশালিনের কথায়, “জঙ্গলে মেয়েদের হোম অথচ তাতে কোনও নিরাপত্তাকর্মী নেই! ১৪-১৫ বছরের মেয়েরা শতছিদ্র জামায় কোনও রকমে লজ্জা নিবারণ করছিল। তারাই যৌন হেনস্থার কথা জানিয়েছে।”

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৭ জুন ২০১৪

বাঁকুড়ার হোমে গোলমাল প্রচুর

রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় খাবার, ওষুধ কিছুই দেওয়া হত না মেয়েদের। দু’জন নাবালিকা যক্ষ্মায় ভুগে ভুগে শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। তা ছাড়া নবদিগন্তে পাঠানো ২৭ জন মেয়ের যে তালিকা ছিল, তার মধ্যে ৭ জনকে তাঁরা দেখতেই পাননি। পরের দিন তিন জনকে হাজির করে হোম কর্তৃপক্ষ বলেন, কলকাতায় চিকিৎসার জন্য তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

মুরশালিন বলেন, “জেরায় জানা গিয়েছে, ওই নাবালিকাদের যৌন পেশায় নামানোর জন্যই কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হত।” নিখোঁজ বাকি চার জনের ব্যাপারে হোম কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা পালিয়ে গিয়েছে। যদিও তা নিয়ে থানায় কোনও অভিযাগ দায়ের করেনি হোম-কর্তৃপক্ষ। পরে একটি মেয়েকে উদ্ধার করা হয়। বাকি ৩ জন এখনও নিখোঁজ।

মহিলা ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী শশী পাঁজাও জানিয়েছেন, নবদিগন্তে গোলমালের খবর আগে থেকেই ছিল। এত দিনে তা সত্যি প্রমাণিত হল। তাঁর কথায়, “বহু বছরের অবহেলায় পরিকাঠামো ভেঙে পড়েছে। জেলায়-জেলায় নজরদারি কমিটিগুলিও কাজ করছে না। তবে আমরা চেষ্টা করছি।”

সব কিছুর পরেও কিছু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। হোম পরিচালনায় নিজেদের গাফিলতি ভিন্ রাজ্যের কাছ থেকে আড়াল করতেই কি গঙ্গাকুমারীকে পটনায় ফেরত পাঠাতে আপত্তি পশ্চিমবঙ্গের, নাকি গঙ্গার নিরাপত্তা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের চিন্তার সত্যিই কোনও কারণ রয়েছে? বিহারের কেউ বা কারা কি কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যে গঙ্গাকুমারীকে ফেরত পেতে চাইছে? প্রকৃত তদন্ত ছাড়া এর উত্তর মেলা দুষ্কর। এ সব প্রশ্নের কোনও স্পষ্ট উত্তর আপাতত নেই সরকারের কাছে।

গঙ্গাকুমারীর দৃষ্টান্ত পশ্চিমবঙ্গে অনন্য‌ এমনটা ভাবার কারণ নেই। রাজ্য‌ের সবক’টি হোমেই এ ধরনের কিছু গণ্ডগোল রয়েছে। বয়স্কদের সমস্য‌ার সঙ্গে অসহায়দের সমস্য‌ার কিছু মিল থাকলেও সবটা মিল রয়েছে এমনটা নয়। মহিলাদের ক্ষেত্রে সমস্য‌ার একটি অনন্য‌ মাত্রা রয়েছে। তাদের ক্ষেত্রে সংযোগ স্থাপনের সমস্য‌াটিকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা উচিত। কিন্তু সেদিক থেকে সমস্য‌াটি এখনও তেমনভাবে ভাবা হয়নি। এই দিক থেকে ভাবলে সমস্য‌ার মূলে কিছুটা পৌঁছনো যাবে বলে অনুমান।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৭ জুন ২০১৪

পড়ানোর নামে পশ্চিমবঙ্গ থেকে কেরলে শিশু পাচার

পালাক্কাড় স্টেশনে ৫০০ শিশু উদ্ধার

কেরল থেকে মালদার ৫৮ জন শিশুকে উদ্ধার করে নিয়ে এল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সমাজকল্যাণ দফতর৷‌ দু’ বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে এই শিশুদের কেরলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল৷‌ মাদ্রাসায় শিক্ষা দেওয়ার নাম করে পাচার করাই উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে করছে পুলিস৷‌ গত ৬ জুন কেরলের পালাক্কাড় স্টেশনে ৫০০ শিশুকে উদ্ধার করে রেল পুলিস৷‌ উদ্ধার হওয়া শিশুদের তুলে দেওয়া হয় কেরলের মালাপুরম চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির হাতে৷‌ শিশুদের হাতে পাওয়ার পর তাদের ভাষা শুনে কেরলের এই চাইল্ড ওয়েলফয়ার কমিটির কর্তারা জানতে পারেন এরা বিহার, ঝাড়খণ্ড এবং পশ্চিমবঙ্গের৷‌ মঙ্গলবার রাজ্যের নারী, শিশু ও সমাজকল্যাণ দফতরের মন্ত্রী ডঃ শশী পাঁজা জানিয়েছেন, মালদা থেকে দু’ বছর ধরে ১২৩ জন শিশুকে কেরলে নিয়ে গিয়েছিল একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্হা৷‌ এই শিশুদের বাড়ি মালদা জেলার হরিশ্চন্দ্রপুর, চাঁচল, রতুয়া এবং মানিকচক ব্লকে৷‌ পরিবারের লোকেদের ভুল বুঝিয়ে শিশুদের কেরলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল৷‌ নিয়ে যাওয়ার পেছনে কী উদ্দেশ্য রয়েছে তা এখনও জানা যায়নি৷‌ রাজ্যের সমাজকল্যাণ দফতর এই বিষয়টি নিয়ে খোঁজখবর শুরু করেছে৷‌ আপাতত ৫৮টি শিশুকে কেরল থেকে উদ্ধার করে মালদায় পাঠানো হয়েছে৷‌ বাকি ৬৫টি শিশু কোথায় আছে সেই খোঁজখবর নিয়ে তাদেরও মালদায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে৷‌ সমাজকল্যাণ দফতরের অফিসার এবং রাজ্য পুলিসের একটি দলকে গত ১৩ জুন কেরলে পাঠানো হয়েছিল শিশুদের উদ্ধারের জন্য৷‌ উদ্ধার-হওয়া শিশুদের বয়স ৮ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে৷‌ এই শিশুদের বাড়ির লোকেদের সঙ্গে কথা বলে জানার চেষ্টা করছেন অফিসারেরা৷‌ কেন এবং কীসের লোভে বাড়ি থেকে ছোট ছোট শিশুদের কেরলে পাঠিয়েছিলেন তাঁদের বাবা-মায়েরা৷‌ মঙ্গলবার গভীর রাতে চেন্নাই-গুয়াহাটি এক্সপ্রেস ট্রেনে করে ৫৮টি শিশুকে মালদা টাউন স্টেশনে নামানো হয়৷‌ সেখান থেকে বাসে করে মালদা শহরের সত্যচৌধুরি ইনডোর স্টেডিয়ামে রাখার ব্যবস্হা করে মালদা জেলা সমাজকল্যাণ দফতর৷‌ মঙ্গলবার সকাল থেকে শিশুদের পরিবারের লোকেদের হাতে উদ্ধার হওয়া শিশুদের তুলে দেওয়া হয়েছে৷‌

সূত্র : আজকাল ১৮ জুন,২০১৪

বাবা-মায়েদের ভুল বোঝায় স্থানীয় কিছু লোক

ইনডোর স্টেডিয়ামে এক শিশুর বাবা সাফিকুল আলম বলেন, ভালো শিক্ষা পাবে বলেই আমার দুই ছেলেকে কেরলে পাঠিয়েছিলাম৷‌ কিন্তু যা শুনছি তা তো ভয়ানক! ওদের ঠিকমতো খাবার দেওয়া হত না৷‌ ছেলেদের আর কেরলে পাঠাব না৷‌ হরিশ্চন্দ্রপুর থানার তুলসীহাট্টা গ্রামের বাসিন্দা উদ্ধার হওয়া-শিশুর মা করিনা বিবি বলেন, আমার তিন ছেলে দুই মেয়ে৷‌ গ্রামের এক জন দুই ছেলেকে কেরলে দেওয়ার কথা বলেছিলেন৷‌ তার জন্য ২ হাজার টাকা করে নিয়েও ছিলেন৷‌ ধারদেনা করে চার হাজার টাকা দিয়েছিলাম৷‌ ছেলে ভালো পড়াশোনা করবে এবং ভালো খাবার পাবে এই ভেবে৷‌ কিন্তু দুই ছেলে আমাকে বলেছে ওখানে খাওয়াদাওয়া ভালমতো পেত না৷‌ পড়াশোনাও ঠিকমতো হত না৷‌ করিনা বিবির মতো বেশ কয়েক জন অভিভাবক মহম্মদ ইশা, করিম শেখ এঁরাও ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন৷‌ কেউ এক আবার কেউ দুই ছেলেকে কেরলের মল্লিকাপুরম জেলার আনারুলহোদা কমপ্লেক্সের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়েছিলেন৷‌ সেখান তাদের ইংরেজি শিক্ষা দেওয়া হবে এবং ভালো শিক্ষা দিয়ে মানুষ করবে বলেই ওই সংস্হাটি মালদা থেকে শিশুদের নিয়ে গিয়েছিল৷‌ এ দিকে যে লোকেরা এই শিশুদের কেরলে পাঠিয়েছিল তাদের খোঁজ শুরু করেছে জেলা সমাজকল্যাণ দফতর৷‌ সমাজকল্যাণ দফতরের অধীনস্থ চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির চেয়ারম্যান হাসান আলি শাহ বলেন, কেরলের পাল্লাকাড় স্টেশনে ৫০০ শিশু ধরা না পড়লে আমরা জানতেই পারতাম না শিশুদের ভালো শিক্ষা দেওয়ার নাম করে নিয়ে যাওয়া হত৷‌ তার পর এই শিশুদের বিভিন্ন রাজ্যে এবং দেশের বাইরে পাচার করে দেওয়া হত বলে মনে করছেন তিনি৷‌ যারা এই শিশুদের নিয়ে এই সব কাজ করছে তাদের উদ্দেশ্য মহৎ ছিল না বলে জানিয়েছেন তিনি৷‌ বাবা-মায়েদের ভুল বুঝিয়েছিল স্হানীয় কিছু লোক৷‌ আমরা তাদের চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি৷‌ বাকি ৬৫ জন শিশুকেও কেরল থেকে উদ্ধার করে আনা হবে৷‌ রাজ্য সরকারের অনেক ভালো কর্মসূচি চালু হয়েছে৷‌ সেই কর্মসূচির আওতায় এই শিশুদের আনা হচ্ছে৷‌

সূত্র : আজকাল ১৮ জুন,২০১৪

অসহায় বৃদ্ধা যৌনকর্মীদের জন্য পুনর্বাসনে পশ্চিমবঙ্গ

‘মুক্তির আলো’ প্রকল্প

এক দিন ছিল, যখন ল্যাম্পপোস্টের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা সন্ধ্যা-রেখাদের চোখের ইশারায় কুঠুরিতে ঢুকে পড়তেন অচেনা বাবু। এ ভাবে কেটেছে রাতের পর রাত। আঁধার ঘনালেই সস্তার ঝলমলে শাড়ি আর রুজ-লিপস্টিক মেখে‘খদ্দের’ধরতে রাস্তায় নেমে পড়া। শরীর বেচে রোজগারের অর্থে দিন কাটানো।

সেই শরীর আর নেই। তাই বাবুরাও নেই। কিন্তু যত দিন প্রাণ আছে, তত দিন খেয়ে-পরে বাঁচতে হবে তো!

পতিতালয়ে সন্ধ্যা-রেখারা সে চেষ্টা চালিয়েও পেরে উঠছেন না জেনে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার ওদের দিকে ভরসার হাত বাড়িয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, সহায়সম্বলহীন বৃদ্ধা যৌনকর্মীদের পুনর্বাসনের কাজে নেমে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসন। টালিগঞ্জে চারু মার্কেটের কাছে আবাসন দফতরের একটি পুরনো দোতলা বাড়ি সংস্কার করে তাদের জন্য ‘হোম’ তৈরি হচ্ছে।

প্রকল্পের নাম দিয়েছেন মমতা ‘মুক্তির আলো’। ১০০ জন বৃ্দ্ধা যৌনকর্মীকে নিয়ে পথ চলা শুরু করবে ‘মুক্তির আলো’।

কলকাতার উত্তর-দক্ষিণে একাধিক যৌনপল্লিতে সমীক্ষা চালিয়ে ইতিমধ্যে ৭৮৯ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা বৃদ্ধা, দুর্বল, প্রায় কপর্দকহীন, এবং হোমে থাকতে ইচ্ছুক। ওই বৃদ্ধাদের আজীবন দেখাশোনার দায়িত্ব সরকারই নেবে।

পশ্চিমবঙ্গের সমাজকল্যাণ-সচিব রোশনী সেন জানিয়েছেন, এই প্রকল্পে এক বছরের জন্য ৫০ লাখ টাকা মঞ্জুর করেছে অর্থ দফতর। কলকাতায় যৌনকর্মীর সংখ্যা বেশি বলে উদ্যোগটি শুরু হচ্ছে এখানে। পরে একে সারা রাজ্যে ছড়িয়ে দেওয়া আমাদের লক্ষ্য। ক্রমে হোমের সংখ্যা বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে সকলের থাকার ব্যবস্থা করা হবে বলেও সচিব জানিয়েছেন।

প্রথম পর্যায়ে চিহ্নিত ৭৮৯ জনের মধ্যে যাঁদের আর্থিক ও শারীরিক অবস্থা বেশি খারাপ, প্রথমে তেমন একশো জনকে এই সুযোগ দেওয়া হবে। প্রাথমিক ভাবে এমনটাই ভাবা হয়েছে। তবে অনেকে লটারির মাধ্যমে বাছাইয়ের পক্ষেও মত দিয়েছেন।

অসহায় বৃদ্ধা যৌনকর্মীদের বাংলা সহিত্য‌ে খানিকটা দৃষ্টিকটূভাবে তুলে ধরার নজির রয়েছে। কিন্তু বাস্তব অবস্থাটা একেবারেই সে রকম নয়।

সূত্র : এবিপি আনন্দ ওয়েবসাইট, ১১ নভেম্বর ২০১৩

বিকল্প উপার্জন ও সন্তানদের দেখভাল

প্রকল্পটিতে আরও দু’টি বিষয় যুক্ত হবে। কেউ যৌনপেশা ছাড়তে চাইলে তার জন্য বিকল্প উপার্জনের সংস্থান, পাশাপাশি তাঁদের সন্তানদের জন্য হোমের ব্যবস্থা করা।

আশি পেরোনো সন্ধ্যার এই মুহূর্তে ঠিকানা বৌবাজারের হাড়কাটা গলির রোয়াক। বয়সের ভারে, রোগেভোগে কুঁজো হয়ে গিয়েছেন। লাঠিতে ভর দিয়ে চলাফেরা। সম্বল বলতে একটা পুঁটলি, কয়েকটা ছেঁড়া শাড়ি। ষোল বছর বয়সে বিয়ে হওয়ার পরে স্বামীর হাত ধরে ঢাকার মিরপুর থেকে চলে এসেছিলেন কলকাতার পার্ক সার্কাসে। সময়টা দেশ ভাগের কিছু আগে।“তার পরে কলকাতায় মারামারি-কাটাকাটি শুরু হল। স্বামী ট্রাম কোম্পানিতে কাজ করত। এক দিন বেরিয়ে আর ফিরল না!” স্মৃতিচারণ করেন বৃদ্ধা। অসহায় যুবতীকে ‘কাজ’দেওয়ার নামে সেই যে যৌনপল্লিতে বেচে দিল এক পড়শি, তখন থেকে ওটাই স্বর্গ-নরক সব কিছু। বলেন, “গোড়ায় মানতে পারিনি। পরে ভালোই খদ্দের জুটত।”

মমতার ‘মুক্তির আলো’ প্রকল্পের কথা শুনে সন্ধ্যা এক গাল হেসে বললেন, “মমতা নিজে তো মেয়ে। তাই আমাদের যন্ত্রণা বুঝতে পারল। ওকে আশীর্বাদ করছি।”

টানা ছেষট্টি বছর নিষিদ্ধপল্লির অলি-গলিতে কাটানো সন্ধ্যা এখন ভগ্নস্বাস্থ্য, কপর্দকহীন। রাস্তার ভিখিরি। বছর পঁচাত্তরের রেখার অবস্থাও একই। সোনাগাছির গলিতে মাথা গোঁজার একটা ঘর থাকলেও জানেন না, ক’ দিন ভাড়া জোটাতে পারবেন। ষাট বছর আগে হাবড়ার কিশোরীকে পাড়ারই এক কাকি বেচে দিয়েছিলেন সোনাগাছির মাসির কাছে। সেই থেকে টানা জীবন-যুদ্ধ। গ্রামের বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে তিন ভাইকে বড় করেছেন। ভাইরা অবশ্য বোনের খোঁজ রাখেন না। অসুস্থ বৃদ্ধার দিনের বেশিটা কাটে বিছানায় শুয়ে। পাড়ার দোকান থেকে দু’টো রুটি বা একটা ওষুধ কিনে আনার লোকও সব সময় পান না।

সন্তান প্রতিপালনের জন্য‌ যৌনকর্মীরা যথাসর্বস্ব দিতে প্রস্তুত থাকে। অনেক সময় সাধের সঙ্গে সাধ্য‌ের ফারাক থেকে যায়। এই পারাক ঘোচানো এবং অসহায় প্রান্তিক, প্রাতিস্বিক মানুষগুলির জন্য‌ কিছু কা যায় কিনা তা নতুন করে ভেবে দেখা দরকার। তবে বিষয়টি নিছক দয়া দাক্ষিণ্য‌ের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ হয়ে গেলে মুশকিল।

সূত্র : এবিপি আনন্দ ওয়েবসাইট, ১১ নভেম্বর ২০১৩

নকল বৃহন্নলার দাপটে অস্তিত্ব সংকটে আসলরা

নকলের ভিড়ে অস্তিত্ব সংকট আসলদের। নকল বৃহন্নলায় ভরে গিয়েছে বীরভূম। তাই আসল বৃহন্নলা চিনতে হলমার্ক হিসাবে গুরুমা'র ফোন নম্বর বিলি করল বৃহন্নলারা। বুধবার সিউড়ি থানায় রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের বৃহন্নলারা এসে প্রতিবাদ করে গেল নকল বৃহন্নলাদের বিরু‌দ্ধে। পুলিশকে দাবি নকল বৃহন্নলাদের নিয়ে সমস্যা হলে তা দেখতে হবে পুলিশকেই।

আসল নকলের দ্বন্দ্ব শুরু দিন পনেরো আগে। ছোট গাড়িতে চেপে বর্ধমানের একদল বৃহন্নলার সিউড়ির বিভিন্ন পাড়ায় তাদের নিজস্ব কায়দায় নাচগান ও টাকা আদায় করাকে ঘিরে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বৃহন্নলাদের দাবি, তাদের এক এলাকার বৃহন্নলা অন্য এলাকায় ঢোকে না। এটা অলিখিত নিয়ম। তা ছাড়া এলাকায় ঢুকতে পরম্পরা মেনে গুরুমায়ের অনুমতি নিতে হয়। অভিযুক্ত বৃহন্নলারা তা মানেনি। বীরভূমে বৃহন্নলাদের গুরুমা আনারকলি গুলশন। তিনি দাবি করেন, পঞ্চাশ বছর ধরে সিউড়ি, রামপুরহাট, সাঁইথিয়া সহ বীরভূমের দায়িত্বে তিনি। সারা জেলা জুড়ে তাঁর দলের ২০ জন টাকা আদায় করে। অন্ডাল থেকে আসা বৃহন্নলার দল সিউড়ির বেশ কিছু বাড়িতে ঢুকে ভয় দেখিয়ে বহু টাকা আদায় করে বলে বৃহন্নলাদের অভিযোগ। সিউড়ির সাজানোপল্লির একটি বাড়িতে অন্ডাল থেকে আসা হিজরাদের নাচগানের সময় বীরভূমের বৃহন্নলার দল সেখানে হাজির হয়। তাদের দাবি, ভয়ে নকল বৃহন্নলারা ওই বাড়ির ছাদে চেপে প্রাণে বাঁচে। সেখানেই তারা বুধবার সিউড়ি থানায় এসে আলোচনার প্রস্তাব দেয়। আনারকলি হিজরা অভিযোগ করেন, অন্ডালের বিট্টন হিজরা নকল হিজরা পাঠিয়ে এলাকা দখলের মতলব করছে। তা তাঁরা হতে দেবেন না। তাঁদের অভিযোগ, ওই বৃহন্নলাদের সঙ্গে বন্দুক থেকে আগ্নেয়াস্ত্রও থাকছে। সম্প্রতি বড়বাগানে এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের বাড়িতে ঢুকে এগারো হাজার টাকা সহ দানসামগ্রী দাবি করে অন্ডালের বৃহন্নলারা। যদিও বিষয়টি জানতে পেরে বীরভূমের দল সেই বাড়িতে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে আসে। রায়গঞ্জ থেকে আসা অলিভিয়া বৃহন্নলা সোনাদেবী বলেন, আমাদের কোনও সংগঠন নেই। তবে পরম্পরা মেনে রীতি আছে। আমরা সবাই তা মানি। এলাকায় ঢুকে দাদাগিরি দিদিগিরি চলে না। যারা অন্ডাল থেকে বীরভূমে ঢুকছে তারা নকল বলে তাঁর দাবি। যদিও বুধবার একপক্ষ এলেও অন্ডাল পক্ষ আসেনি। তবে বীরভূমে বৃহন্নলাদের এই সমস্যা সমাধানে জেলা পরিষদের সভাধিপতি ও সিউড়ি পুরপ্রধানের সঙ্গে তাঁরা দেখা করেন। সভাধিপতি বিকাশ রায়চৌধুরি জানান, এলাকায় শান্তি বজায় রাখার কথা বলা হয়েছে তাদের। এ দিকে বুধবার সকাল থেকে দীর্ঘক্ষণ সমাধানের আশায় বসে থেকে ফিরে যায় রাজ্য বৃহন্নলাদের প্রতিনিধিদল। তবে নানা ভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করেও অন্ডালের বিট্টন হিজরার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।

সূত্র : সংবাদ প্রতিদিন ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৪

বৃহন্নলাদের জন্যও সংরক্ষণের রায়

বৃহন্নলা সম্প্রদায়ের সব মানুষ তৃতীয় লিঙ্গ

কখনও নামের পাশে অপরাধীর তকমা জুড়ে দেওয়া। কখনও বা সমাজ থেকেই একেবারে ব্রাত্য করে রাখা। দীর্ঘদিন ধরে বৃহন্নলা বা হিজড়ে সম্প্রদায়ের মানুষ বঞ্চনা বৈষম্যের এই অভিজ্ঞতার সঙ্গেই অভ্যস্ত।

আজ সেই অভ্যাসেই ছেদ টানতে সক্রিয় হল সুপ্রিম কোর্ট। ঐতিহাসিক এক রায়ে শীর্ষ আদালত জানিয়ে দিল, সামাজিক এবং শিক্ষাগত দিক থেকে অনগ্রসর শ্রেণি হিসেবে বৃহন্নলা সম্প্রদায়কে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং চাকরির ক্ষেত্রে তাঁদের জন্য সংরক্ষণ সুনিশ্চিত করতে হবে। রায়ে বলা হয়েছে, বৃহন্নলা বা হিজড়ে সম্প্রদায়ের সব মানুষকে তৃতীয় লিঙ্গ (ট্রান্সজেন্ডার) বলে গণ্য হবেন।

কোর্ট জানিয়েছে, এ দেশে বৃহন্নলাদের ধারাবাহিক ভাবে লাঞ্ছনা এবং বঞ্চনার এক তিক্ত অভিজ্ঞতার শরিক হতে হয়েছে। তা কোনও ভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। তাঁদের মানবাধিকার রক্ষা করা সমাজের কর্তব্য। তাই হিজড়ে সম্প্রদায়ের মানুষকে সমাজের মূলস্রোতে অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি শীর্ষ আদালত চায়, সব ধরনের সামাজিক কলঙ্ক থেকে তাঁদের মুক্তি দেওয়া হোক। যাতে তাঁদের আর ভয়, লজ্জা, হতাশা বা অন্য কোনও সামাজিক চাপের শিকার না হতে হয়।

বিচারপতি কে এস রাধাকৃষ্ণন এবং বিচারপতি এ কে সিক্রির বেঞ্চ আজ বলেছে, “বৃহন্নলারাও এই দেশের নাগরিক। আর পাঁচ জন নারী বা পুরুষের মতো তাঁরাও সব সাংবিধানিক অধিকার ভোগ করবেন।” শিক্ষা এবং চাকরির সংরক্ষণের পাশাপাশি কোর্ট তাঁদের জন্য পৃথক শৌচাগারের ব্যবস্থা রাখারও নির্দেশ দিয়েছে। লিঙ্গের স্ত্রী পুরুষ দ্বিভাজনের বাইরে গিয়ে তৃতীয় লিঙ্গের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে তাঁদের।

তৃতীয় লিঙ্গের প্রতি সমাজের মানসিকতা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছে শীর্ষ আদালতের বেঞ্চ। আদালতের পর্যবেক্ষণ রেল স্টেশন, স্কুলকলেজ, অফিস, থিয়েটার, শপিং মোল, এমনকী হাসপাতাল, যে কোনও প্রকাশ্য জায়গায় তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ কোণঠাসা। সমাজের কাছে তাঁরা যেন অস্পৃশ্য। তাঁদের মূলস্রোতে ফেরাতে সামাজিক অনিচ্ছাও প্রকট।

বিচারপতিদের মতে, “এই সম্প্রদায়ের মানুষকে কী অসম্ভব যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়, আমাদের সমাজ খুব কম ক্ষেত্রেই সেটা বোঝে। তাঁদের মনের গভীরে কী টানাপড়েন চলে, সেটা অনুধাবন করার মানসিকতাও আমাদের নেই। সব চেয়ে বেশি যন্ত্রণা তাঁদেরই, যাঁরা প্রাকৃতিক ভাবে যে লিঙ্গ নিয়ে জন্মেছেন, তার সঙ্গে তাঁদের মানসিক গঠন সাযুজ্যপূর্ণ নয়। আমাদের সমাজ তাঁদের নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করে। পদে পদে অসম্মান করা হয় তাঁদের।”

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা ১৬ এপ্রিল ২০১৪

বৃহন্নলারা ধারাবাহিক ভাবে বৈষম্যের শিকার

এই মানসিকতা পরিবর্তনের প্রশ্ন নিয়েই উদ্বিগ্ন বৃহন্নলাদের কেউ কেউ। সুপ্রিম কোর্টে রায়ে খুশি হওয়ার পরেও এইখানেই থেকে যাচ্ছে কাঁটা। বৃহন্নলাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার তরফে সন্তোষ গিরি জানালেন, “সুপ্রিম কোর্টের রায় খুবই ইতিবাচক, সন্দেহ নেই। কিন্তু রায় দিলেই তো সব হয়ে যায় না। এখন দেখতে হবে সরকার এই গোটা বিষয়টা কী ভাবে বলবৎ করে।” মেট্রোয় উঠে কোন আসনে বসবেন, শুধু তার জন্যই এখনও প্রতি দিন সন্তোষকে নিজের সঙ্গে লড়াই করতে হয়। বসতে হয় মহিলা আসনে। যেটা তাঁর পছন্দ নয়। সুপ্রিম কোর্ট আজ সংরক্ষণের কথা তো সেই জন্যই বলেছে? সন্তোষ উল্টে প্রশ্ন তুলছেন, “শিক্ষা ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ভালো কথা। কোন বাবা মা ছোটবেলায় বা কৈশোরে মেয়েলি ছেলেকে বা পুরুষালি মেয়েকে সংরক্ষণের আওতায় আনবেন ?”

বৃহন্নলাদের দাবিদাওয়া নিয়ে কাজ করেন পবন ঢাল। রায়কে স্বাগত জানালেও তা বলবৎ কী ভাবে হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনিও। নীতিগত ভাবে সংরক্ষণের বিরোধী পবন বলছেন, “পুরুষ নারীর মতোই সমান অধিকার চাই আমরা। সংরক্ষণে সবাই সুবিধা পায় না।” তবে এই রায়ের পর থেকে মেডিক্যাল সার্টিফিকেট দেখিয়ে নিজেদের পরিচয় বোঝাতে হবে না, এতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন পবন। তাঁর কথায়, “যে কেউ সহজেই নিজের পরিচয় দিতে পারবে।”

বৃহন্নলাদের তৃতীয় লিঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টে। সেই সূত্রেই আজ আদালতের এই রায়। এই সূত্রে বেশ কয়েকটি ধর্মগ্রন্থের কথা উল্লেখ করে কোর্ট বলেছে, ইতিহাসের দিক থেকে দেখলে সমাজে বৃহন্নলাদের যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। কিন্তু চিত্রটা পুরোপুরি পাল্টে যায় ঔপনিবেশিক শাসনের সময় থেকে। ব্রিটিশরা এই সব মানুষের গায়ে সরাসরি অপরাধীর তকমা সেঁটে দেয়। কোর্টের মতে, “সেই মানসিকতাই আমরা বয়ে চলেছি। বৃহন্নলাদের অধিকার রক্ষার জন্য আমাদের দেশে কোনও আইনই তৈরি হয়নি। আর সেই জন্যই এই সম্প্রদায়ের মানুষ ধারাবাহিক ভাবে বৈষম্যের শিকার হয়ে এসেছেন।”

আইন না থাকায় এই সব মানুষ সাধারণ হয়রানির পাশাপাশি যৌন হিংসারও শিকার হন। প্রকাশ্য স্থানে, বাড়িতে, জেলখানায় এমনকী পুলিশের হাত থেকেও ছাড় পান না তাঁরা। পাকিস্তান বা নেপাল সহ বেশ কিছু প্রতিবেশী দেশেই বৃহন্নলাদের অধিকার রক্ষায় সক্রিয় হয়েছে প্রশাসন। সুপ্রিম কোর্ট সেই নজিরও তুলে ধরেছে। বৃহন্নলাদের মধ্যে যাঁরা রূপান্তরকামী, তাঁরা পুরুষ বা নারী, যাই হতে চান না কেন, অস্ত্রোপচারের পরে তাঁদের সেই লিঙ্গ পরিচয় দেওয়ার অধিকারও আছে বলে জানিয়েছে আদালত। এ প্রসঙ্গে কোর্ট পঞ্জাবের উদাহরণ দিয়েছে। সে রাজ্যে বৃহন্নলাদের প্রত্যেককেই ‘পুরুষ’ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। যা একেবারেই সমর্থনযোগ্য নয়।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা ১৬ এপ্রিল ২০১৪

স্বামীকেই তো খেয়েছে‚ আবার আমিষভক্ষণের কী দরকার !

বাংলা ভাষায় লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য বিশেষ নেই | নারী-পুরুষ নির্বিশেষে 'তিনি' অথবা 'সে' | কিন্তু যদি থাকত‚ তাহলে হয়তো স্বামী হারানোর সঙ্গে সঙ্গে একটা মেয়ে স্ত্রীলিঙ্গ থেকে পরিণত হত ক্লীবে | ইংরেজিতে 'শি' থেকে 'ইট' | বৈধব্য কোনও অবস্থা নয় | বৈধব্য ভারতীয়‚ বিশেষত হিন্দু সমাজে অভিশাপ |

অথচ‚ স্বামী চলে যাওয়ার পরে নারীত্ব তো চলে যাওয়ার নয় | যদি তা-ই হত‚ ঈশ্বর যদি বৈধব্যের সঙ্গে নারীত্বটাও নিয়ে নিতেন‚ হাঁফ ছেড়ে বাঁচত মেয়েগুলো | কিন্তু তা যখন হল না | ঈশ্বরের ব্যর্থতার দায় নিয়ে এগিয়ে এলেন তাঁর সেরা সৃষ্টি পুরুষমানুষ | তৈরি হল বিধান‚ যাতে স্বামীহীনার জীবন থেকে ছিনিয়ে নেওয়া যায় শখ আহ্লাদ তো বটেই | সেইসঙ্গে ভুলিয়ে দেওয়া যায়‚ সেও একটা মানুষ | টুঁটি চিপে মেরে ফেলা যায় জৈবিক এবং মানসিক চাহিদা |

বলা হল‚ এইসব বিধান আসলে বিধবাদের ভালর জন্যেই | সত্যি তো‚ অভাগী 'স্বামীখাকী'-দের কথা সমাজপতিরা না ভাববে তো আর কে ভাববে ! আর‚ এ তো সবাই জানে‚ স্বামী চলে যাওয়া মানে স্ত্রীর অপরাধ | তার জন্যেই চলে গেছে তার ধব | তাই‚ ধব বিগত হয়ে সে হয়েছে বিধবা |

এবং আপনা মাংসে হরিণা বৈরী কথাটা মনে রেখে বিধবাকে থাকতে হবে কুচ্ছিৎ হয়ে | পালন করতে হবে কৃচ্ছ্রসাধন | নিজেদের লিবিডো বশে রাখতে পুরুষের কাঁচকলা | তারা শুধু মনে রাখবে‚ অভাগার গরু মরে আর ভাগ্যবানের বৌ মরে | যে সমাজে গরু আর স্ত্রী সৌভাগ্য মাপার মাপকাঠি‚ সেই সমাজে বিধবাদের দুর্দশা নিয়ে ভেবেই বোধহয় বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছিলেন বিদ্যাসাগরমশাই |

হিঁদুয়ানিতে অবশ্য বীরসিংহের ভূমিপুত্রের থেকে বেশি জনপ্রিয় দু হাজার বছর আগে লেখা বই মণুস্মৃতি | সেখানে বলা আছে‚ স্বামী চলে যাওয়ার পরে যে স্ত্রী আজীবন পবিত্র এবং শোকবিহ্বল হয়ে কাটাবেন‚ তিনি স্বর্গলাভ করবেন মৃত্যুর পরে|

ব্যাটাছেলেরা তো একটু আধটু দুষ্টুমি করবেই | তাই‚ পাঞ্জাবে বিধবাদের বলাই হয় 'রান্ডি' |সেখানে স্বামী চলে গেলে স্ত্রীদের দেওরের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার রীতি আছে | নইলে‚ বিধবাদের কপালে জোটে ধর্ষিতা হওয়ার বিষাক্ত স্মৃতি |

একজন 'অর্বাচীন' বাঙালি উদ্যোগী হয়ে বন্ধ করে দিল সতীদাহ প্রথা ! অসীম পুণ্যলাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হল ললনারা | তাই‚ আর যাতে পুণ্যভাণ্ডারে টান না পড়ে‚ এগিয়ে এলেন টিকিধারীরা | বিধিনিষেধের কাঁটাতারে ঢেকে দিলেন বিধবাদের জীবন | পোশাকি নাম হল‚ 'ধার্মিক জীবন' | সেটা দিয়েই ঢাকা হল আসল উদ্দেশ্য | মানসিক এবং শারীরিকভাবে মরার আগেই শেষ করে দেওয়া বিধবাদের | যাতে পুরুষের সামনে তারা হয়ে থাকে জ্যান্ত মড়া | আর মড়ার তো দেহে পুষ্টির প্রয়োজন নেই | তাই বাদ আমিষ ভক্ষণ | তবে অন্যদের রসনাতৃপ্তির জন্য আমিষ রান্না করতে বাধা নেই | দুই ভ্রূ-য়ের মাঝ থেকে বিদায় নিল লাল রং | কারণ সেটা যে 'সেক্সুয়াল এনার্জি'-র প্রতীক |

এত নিয়ে নেওয়ার বদলে বিধবাদেরও দেওয়া হল | ভালবেসে বিধবাদের জন্য ওল্ড এজ হোম হিসেবে দেওয়া হল আস্ত আস্ত শহর | পূর্বে কাশী আর উত্তর পশ্চিমে বৃন্দাবন শহরের নামই হয়ে গেল 'সিটি অফ উইডোজ' | সেখানে ঈশ্বর-সেবা করেই কেটে যাবে জীবনের বাকি দিনগুলো | যদিও আসল তথ্যটা হল এই দুই শহরে যৌনব্যবসাই হল বৈধব্যের সঙ্গী | অভিযোগ‚ বাড়তি অর্থের জন্য অনেক সময় বিভিন্ন আশ্রম থেকেই বিধবাদের বলা হয় দেহব্যবসায়ী হতে | তার জেরে যদি সন্তান আসে‚ তাহলে ? সমাধান আছে‚ যন্ত্রণাদায়ী গর্ভপাত | সেটাও ফস্কে গেলে ক্ষতি নেই | বরং ভিক্ষের জন্য বাড়বে আরও একজোড়া কচি হাত | বাড়বে করুণার পারদ | বেশি করে ভরবে ভিক্ষার কলাই-থালা |

রামমোহন-বিদ্যাসাগরের সময় এখন ইতিহাসের সিলেবাস | আমরা অনেক এগিয়ে গিয়েছি| লুকিয়ে চুড়িয়ে নয় | প্রকাশ্যেই রবিবারের সংবাদপত্রে থাকে বিধবা-বিবাহের বিজ্ঞাপন | কিন্তু তলিয়ে ভাবলে দেখা যাবে‚ স্মার্ট ফোন-সোশ্যাল মিডিয়ার যুগেও সামাজিক শুভ আচারে এখনও ব্রাত্য স্বামীহীনারা | হিন্দু সমাজে বৈধব্যকে এখনও পাপ |

সুত্রঃ banglalive.com

জেলবন্দিদেরও যৌনজীবন উপভোগ করার অধিকার আছে

জেলবন্দিদের নানা ধরনের অধিকার দেওয়ার প্রশ্নে সোশাল অ্য‌াক্টিভিস্টরা খুবই গুরূত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জেলবন্দিরা যে সমাজের বাইরের কেউ নয়, বরং অবস্থার ফেরে যে তাঁদের এই জীবনযাপন করতে হচ্ছে তা একাধিক গবেষণায় ইতিমধ্য‌েই পরিস্ফুট হয়েছে। এ প্রসঙ্গে প্রখ্য‌াত সাহিত্য‌িক জরাসন্ধের নাম করতে হয়। তাঁর একাধিক গল্প উপন্য‌াসে দেখা গিয়েছে, বন্দি আসলে পরিপূর্ণ সচেতন একজন সামাজিক মানুষ। অপরাধ করাটা তার পেশা নয়। সুতরাং সমাজের কাছেও সে সহানুভূতি আশা করে। কোনওদিন সমাজ তাকে একজন স্বাভাবিক মানুষ হিসাবে ফিরিয়ে নেবে এইটুকু আশা মনের মধ্য‌ে জিইয়ে রেখে সে জীবনযাপন করছে। সেই কারণেই বর্তমানে পৃথিবীর নানা দেশে মুক্ত কারাগার প্রথা চালু হয়েছে। এই ধরনের কারাগারে বন্দি তার সবটুকু অধিকার ভোগ করতে পারবেন। এমনকী তার পরিবারের সঙ্গেও সময় কাটাতে পারবেন। পশ্চিমবঙ্গে লালাগোলায় এ ধরনের একটি প্রচেষ্টা শুরু করা হয়। তা ছাড়া বিভিন্ন কারাগারে বন্দিদের নানা ধরনের সামাজিক সুযোগসুবিধা দেওয়ার ব্য‌াপারে নানা ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা হয়েছে। স্বামী দিব্য‌ানন্দ এই নিয়ে কিছু গুরূত্বপূর্ণ কাজ করেছেন যা আজ সারা দেশের কাছেই মডেল হিসাবে পরিচিত।

জেল-বন্দিদেরও পূর্ণ অধিকার আছে যৌন জীবন উপভোগ করার | এক ঐতিহাসিক রায়ে এ কথা জানাল পাঞ্জাব-হরিয়ানা হাইকোর্ট | নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে জেলবন্দিরা তাঁদের স্ত্রী বা স্বামীর সঙ্গে কাটাতে পারেন যৌন জীবন | সন্তানলাভের স্বার্থে |

হাইকোর্টের বিচারক বলেন‚ এখন সময় পাল্টেছে | রূপান্তরকামীদের এখন তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে | তাই ‚ দেরি হয়ে যাওয়ার আগে এখনই সময়‚ জেলবন্দিদের যৌনতার অধিকার দেওয়ার |

এই মর্মে হাইকোর্টে আবেদন করেন পাতিয়ালা জেলে বন্দি যশবীর সিং এবং সোনিয়া কাউর | এক কিশোরকে অপহরণ এবং খুনের দায়ে দুজনেই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামী | সন্তানলাভের আশায় তারা বিচারকের কাছে যৌনজীবন যাপনের অধিকারলাভের আবেদন করেন | কিন্তু তাদের জঘন্য অপরাধের কথা মাথায় রেখে খারিজ হয়ে যায় আবেদন |

তবে সাধারণভাবে‚বিচারাধীন এবং সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদের ক্ষেত্রে সন্তানলাভের উদ্দেশে শর্তসাপেক্ষে যৌনজীবনের অনুমতি দিয়েছে পাঞ্জাব হরিয়ানা হাইকোর্ট |

সুত্রঃ banglalive.com

মানুষের চামড়ায় তৈরী হাই হিল যখন ফ্যাশন স্টেটমেন্ট

Zhu Tian –এর জন্ম চীন হলেও বর্তমান কর্মস্থল লন্ডন | পেশা বা নেশা যাই বলুন, তিনি একজন ফ্যাশন আর্টিস্ট এবং হাই হিল জুতোর ওপর কাজ করে তিনি কিঞ্চিত নামও করেছেন | তা এ হেন Zhu Tianই ঘটিয়ে ফেলেছেন এক অবাক কান্ড | লেদার, প্লাস্টিক, সয়েড ছেড়ে একবারে মানুষের চামড়ার আদলে তৈরী করে ফেলেছেন ষ্টিলেটো মানে মেয়েদের হাই হিল জুতো |

কিছুটা আশ্বস্ত হতে পারেন শুনে, পুরোটাই মানুষের চামড়ার তৈরী নয়, মূল বস্তুটি রাবারের তৈরী | তবে তার ওপরে যে লোমের মতো বস্তুটি তা কিন্তু একেবারে অরিজিনাল মানুষের চুল / লোম | তা হঠাত এ হেন আইডিয়ার কারণটি কী ?শুধুই কি স্টান্টবাজি? Zhu বলছেন, মোটেই নয় | বিখ্যাত সংস্থা ELLE Chinaর ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ প্রজেক্টের অংশ এই কাজ |

আসলে Zhuর মতে ষ্টিলেটোকে সাধারণতঃ সেক্স সিম্বল হিসেবে দেখা হলেও আজকের পৃথিবীতে তার যৌক্তিকতা কতোটা তা নিয়ে তাঁর যথেষ্ট সংশয় রয়েছে | আর তাঁর কাজের মাধ্যমে সেই প্রশ্নই তুলতে চেয়েছেন তিনি | ষ্টিলেটোর মাধ্যমে মেয়েদের উন্নত নিতম্ব ও লম্বা পা-এর অধিকারী করে তোলার যে উদ্দেশ্য, সে বিষয়েও প্রশ্ন তুলতে চেয়েছেন Zhu | আর তাই তাঁর সৃষ্টিকে দড়ি বা চেনের মাধ্যমে ঝুলিয়ে, বেঁধে প্রেজেন্ট করেছেন তিনি | BDSM নামক যৌনক্রিয়া এবং ক্রেতার অন্তহীন চাহিদার দিকে নির্দেশ করাই তাঁর উদ্দেশ্য | এভাবেই তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে হাই হিল জুতোর অন্তর্লীন Erotic Play Expoitation-এর সুক্ষ্ম পর্দাটাকে টেনে ছুঁড়ে ফেলে দিতে চান Zhu |

ফ্য‌াশনের সঙ্গে নৈতিকতার সম্পর্ক নিয়ে সারা পৃথিবী বরাবরই খুবই আলোড়িত। আগে ফারের কোট নামক এক ধরনের শীত পোশাক ইউরোপে খুবই জনপ্রিয় ছিল।

যেভাবে পশু হত্য‌া করে তার চামড়া ছাড়িয়ে এ ধরনের কোট বানানো হত তা নিতান্ত অমানবিক। শুধু তাই নয়, পশুর অন্য‌ান্য‌ দেহ উপাদান থেকেও নির্বিচারে এমন সব পোশাক বানো হত যা দেখে তাজ্জব হয়ে যেতে হয়। হাতির দাঁতের প্রচলিত গহনার কথা তো সবাই জানেন। সেই কারণে বহু স্বেচ্ছসেবী সংস্থা শুধুমাত্র এই বিষয়টি নিয়ে গোটা পৃথিবী জুড়ে আন্দোলন করছে।

সুত্রঃ banglalive.com

কিশোরের ফাঁসির ১৮ বছর পরে জানা গেল‚ সে নির্দোষ

উপসংহার

কথায় আছে জাস্টিস ডিলেড ইজ জাস্টিস ডিনায়েড।তাবলে তড়িঘড়ি বিচারের নামে প্রহসনেরও যুক্তি নেই। বিশেষ করে যে সব দেশে মৃত্য‌ুদণ্ড প্রচলিত আছে সেখানে চরম শাস্তি ঘোষণা করার আগে বিচারপতিকে আগুপিছু সব দিক ভাল করে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তা যদি না হয় তাহলে হিতে বিপরীত হওআর সম্ভবনাই বেশি। ঠিক এই ধরনের একটি ঘটনা পাঠকের দরবারে তুলে ধরতে চাই।

এখানে অন্য‌ একটি প্রশ্নও সমান জরুরি। তাহল, আদৌ মৃত্য‌ুদণ্ডের কোনও প্রয়োজন আছে কি? পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশ থেকে মৃত্য‌ুদণ্ড প্রথা উঠে যাচ্ছে। আমাদের দেশেও এই বিতর্ক অত্য‌ন্ত সংবেদনশীল জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে।

চিনা কিশোরের ফাঁসি হয়েছিল ১৯৯৬ সালে | ধর্ষণ এবং খুনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয় সে | মৃত্যুর ১৮ বছর পরে জানা গেল‚ সে আসলে নির্দোষ | অপরাধী অন্য কেউ |
এক কারখানার টয়লেটে এক যুবতীকে ধর্ষণ করে খুন করার অভিযোগ ওঠে চিনা কিশোর হুগজিলতুর বিরুদ্ধে | পুলিশের দাবি‚ ৪৮ ঘণ্টা জেরার পরে অপরাধ স্বীকার করে এই কিশোর | অপরাধের ৬১ দিন পরে ফাঁসি হয় হুগজিলতুর |

এদিকে অন্য মোচড় | ২০০৫ সালে অন্য একজন স্বীকার করে‚ সে-ই আসলে ধর্ষণ করে খুন করে ওই যুবতীকে | এরপর থেকেই হুগজিলতুকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তার পরিবার | গত নভেম্বরে 'রিট্রায়াল'-এর নির্দেশ দেয় Higher People's Court |

এখন জানা যাচ্ছে‚ অটোপ্সি রিপোর্ট‚ ডিএনএ এবং অন্য প্রমাণ বলছে‚ হুগজিলতু অপরাধী নয় | আদালত ক্ষমা চেয়েছে মৃত কিশোরের বাবা-মায়ের কাছে | স্থির হয়েছে তাদের ৩০ হাজার ইয়ুন বা ৪ হাজার ৮৫০ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার |

বাঁকা পথে স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগ চিনে নতুন নয় | দীর্ঘ কমিউনিস্ট শাসনে এই বদনাম ঘোচাতে পারেনি চিন | কিন্তু প্রশ্ন হল‚ ক্ষতিপূরণের অর্থে কি স্বজন হারানোর ক্ষত প্রশমিত হয় ?

সুত্রঃ banglalive.com

'ভারতীয় পিতা'র সঙ্গে নোবেল শান্তি সম্মানে ভূষিত 'পাকিস্তানি বেটি'

১৯০১-এ এই দিনেই সুইডেনের স্টকহোমে দেওয়া হয়েছিল প্রথম নোবেল পুরস্কার | মাঝে পেরিয়ে গেছে শতাধিক বছর | সেই দিন‚ ১০ ডিসেম্বর‚ নতুন করে মাইলফলক হয়ে থাকল নোবেল সম্মানের ইতিহাসে | কারণ‚ বিশ্বের ইতিহাসে এই প্রথমবার পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ ভাবে নোবেল পেল ভারত | মঙ্গলবার‚ নরওয়ের রাজধানী অসলোয় যৌথভাবে নোবেল শান্তি সম্মানে সম্মানিত হলেন কৈলাস সত্যার্থী এবং মালালা ইউসুফজাই | যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার এল ওয়াঘার দুপারে সীমান্ত-হিংসায় ক্ষত বিক্ষত হতে থাকা তৃতীয় বিশ্বের দুটি দেশে |

৬০ বছরের কৈলাস এবং ১৭ বছরের মালালাকে পদক এবং শংসাপত্র দিয়ে ভূষিত করা হয় | শিশু শ্রম বন্ধ করতে কয়েক দশকের লড়াইয়ের স্বীকৃতি স্বরূপ এই সম্মান পেলেন কৈলাস | মালালাকে সম্মানিত করা হল তালিবানি শাসনের বিরুদ্ধে মেয়েদের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার যুদ্ধে অগ্রণী ভূমিকা পালনের জন্য |

'বচপন বঁচাও' সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা কৈলাস পুরস্কার গ্রহণ করে নিজের বক্তব্য শুরুতেই রাখেন সংস্কৃত স্তোত্র | এরপর তিনি বলেন‚ তিনি ওই মঞ্চে গেছেন নৈঃশব্দ্যের শব্দ শোনাতে | এবং তিনি প্রতিটি শিশুর হাসিতে ঈশ্বরকে খুঁজে পান | তবে তাঁর বক্তব্য অন্য মাত্রা পায় যখন তিনি মালালাকে নিজের কন্যা বলে সম্বোধন করেন | বক্তব্যের মাঝে তাঁর বক্তব্য লেখা পৃষ্ঠা উড়ে গেলেও সহজাত দক্ষতায় পরিস্থিতি সামাল দেন কৈলাস |

অনুষ্ঠানকে ছন্দোময় করে তোলে সপুত্র আমজাদ আলি খানের সরোদ এবং তার আগে রাহত ফতে আলি খানের গান | এরকম এক সঙ্গীতময় সন্ধ্যায় যৌথভাবে নোবেল শান্তি সম্মানে ভূষিত হলেন কৈলাস সত্যার্থী এবং তাঁর কথায় 'তাঁর মেয়ে' মালালা ইউসুফজাই | রক্ত মাখা সীমান্ত কাঁটাতারের কাছে যে ছবিটা কার্যত ইউটোপিয়ার নামান্তর | কিন্তু‚ অসম বয়সী এই দুই শান্তিযোদ্ধার প্রয়াস কি কোনওদিন পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হবে ?

সুত্রঃ banglalive.com

শুধু চায়ের দোকান চালিয়ে বিশ্বের ১৬ দেশে ভ্রমণ দম্পতির

গ্রেট ব্রিটেন‚ ফ্রান্স‚ অস্ট্রিয়া‚ ইজিপ্ট‚ সংযুক্ত আরব আমিরশাহী‚ সুইৎজারল্যান্ড‚ ইজরায়েল... তালিকা চলতেই থাকে | এই দেশগুলো সমেত বিশ্বের মোট ১৬ টা দেশ ঘুরে ফেলেছেন কেরলের কোচির বাসিন্দা বিজয়ন | ভাবছেন‚ এতে এত বলার কী আছে ? আছে | কারণ ৬৫ বছর বয়সী এই প্রৌঢ়ের আয়ের একমাত্র উৎস তাঁর ছোট্ট চায়ের দোকান |

যাঁরা বলেন টাকার জন্য বেড়াতে যাওয়া হয় না‚ তাঁদের জন্য যোগ্য জবাব বিজয়ন আর তাঁর স্ত্রী মোহনা | দুজনের সংসার চালানোর একমাত্র উপায় 'শ্রী বালাজি কফি হাউজ' | এখানে চা-কফি বেচেই গত ৪০ বছর ধরে সংসার চালিয়ে আসছেন বিজয়ন |

তবে তাতে দেশ দেখার স্বপ্নে ছেদ পড়েনি | বিজয়নের একটা স্পষ্ট পরিকল্পনা আছে | তিনি ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নেন | তারপর বেড়াতে চলে যান | একবার বেড়িয়ে এসে তিন বছর ধরে ধার শোধ করেন | ধার-কর্জ মুক্ত হয়ে ফের শুরু আরেক বার বিদেশ যাত্রার প্রস্তুতি |

দেশ দেখার নেশা বিজয়ন পেয়েছিলেন তাঁর বাবার কাছ থেকে | তবে তখন তাঁদের ভ্রমণ ছিল ভারতের নিত্যনতুন রাজ্য দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ |পিতৃবিয়োগের পরে ভ্রমণে ছেদ পড়ে সাময়িক | কারণ তখন সংসারের হাল ধরতে হয় বিজয়নকে |

ফের দেশ ভ্রমণ শুরু হয় ১৯৮৮-তে | একজনের রাঁধুনি হিসেবে হিমালয়ে গিয়েছিলেন বিজয়ন | এরপর ধীরে ধীরে চায়ের দোকানটাকে দাঁড় করিয়ে দেশভ্রমণ শুরু করেন বিজয়ন | সঙ্গী‚ জীবনসঙ্গিনী মোহনা |

দুজনে মিলে রোজ ৩০০ টাকা করে জমান | বেড়াতে গিয়ে খাওয়াদাওয়া খুব শর্টকাটে সারেন | যেটুকু না করলেই নয়‚ সেটুকুই |আর কেনাকাটাও করেন নামমাত্র | এভাবেই দেখা হয়ে গেছে সুইৎজারল্যান্ডের বরফঘেরা আল্পস থেকে মিশরের পিরামিড‚ অথবা ইজরায়েলে করুণাঘন যিশুমূর্তি |

সুদূরের পিয়াসী এই দম্পতি শেষবার বেড়াতে গিয়েছিলেন ২০১২-তে‚ ইউরোপে | এবার তাঁদের একটাই সাধ‚ একবার আমেরিকায় যাওয়া | তার জন্য টাকা জোগাড় করছেন | কিন্তু এই বয়সে ব্যাঙ্ক লোন পেতে সমস্যা হচ্ছে | তাঁদের কথা জেনে অনেক সংগঠনই ময়দানে নেমেছেন অর্থ জোগাড় করতে | এমনকী‚ ভ্রমণপিপাসু বিজয়ন আর মোহনার কথা জেনে অভিভূত স্বয়ং অমিতাভ বচ্চনও |

সুত্রঃ banglalive.com

মন্ত্রীর মেয়ের বিয়ে হল গণবিবাহের আসরে

সামাজিক কাজে মন্ত্রী বা জনপ্রতিনিধিরা যতই এগিয়ে আসেন ততই নতুন দৃষ্টান্তের সৃষ্টি হয়। কথায় আছে চ্য‌ারিটি বিগিনস অ্য‌াট হোম। অর্থাৎ কোনও সামাজিক প্রথা নিয়ে কিছু বলতে গেলে নিজের জীবনে তা প্রয়োগ করে দৃষ্টান্ত তুলে ধরা দরকার। এ ব্য‌াপারে মহাত্মা গান্ধী নিজেই দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় টলস্টয় ফার্মে থাকার সময় তিনি নিজের হাতে শৌচালয় পরিষ্কার করতেন। এই দৃষ্টান্ত সবরমতীর আশ্রমেও প্রতিফলিত হত। গান্ধীজির সবরমতী আশ্রমের বালক-বালিকারা একটি পর্যায়ে শান্তিনিকেতনে এলে এ ধরনের কাজ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। রবীন্দ্রনাথ সে ব্য‌াপারে গান্ধীজির কাছে ব্য‌াখ্য‌া চান। গান্ধীজি বলেন, কোনও কাজকে তিনি ছোট বলে মনে করেন না। সেই জন্য‌ সব কাজ নিজের হাতে করার নিদান দেন।

মন্ত্রীর মেয়ের বিয়ে বলে কথা | বিয়ের স্থান নির্বাচন করতে পাঁচ তারা হোটেল চষে ফেললেন মন্ত্রী নিজে | কিন্তু শেষে এমন জায়গায় মেয়ের বিয়ে দিলেন যেখানে নতুন জীবন শুরু করল আরও ৯৬ টি জুটি | গণবিবাহের আসরে মেয়ের বিয়ে দিয়ে নজির স্থাপন করলেন কর্নাটকের সমাজকল্যাণ মন্ত্রী এইচ অঞ্জানেয়ুলু |

বাবার সিদ্ধান্তে বিন্দুমাত্র অখুশি নন মন্ত্রীর মেয়ে অনুপমা | তিনি নিজেও বহু জায়গায় গিয়েছিলেন | কিন্তু শেষ অবধি বেছে নেন নিজের শহর চিত্রদূর্গে আয়োজিত হওয়া গণ বিবাহের আসরকেই | বাবা-মায়ের কাছ থেকে কোনও উপহার বা গয়নাও নেননি অনুপমা | বিয়ের জন্য কিনেছেন শুধু একটা নতুন শাড়ি | বিয়ের ভোজও ছিল খুব সাধারণ | ভাত সম্বর আর পায়েস |

মেয়ের বিয়ে এই ভাবে দেওয়ায় আত্মীয় পরিজনদের কাছে থেকে উড়ে এসেছে অজস্র টিপ্পনি | কিন্তু আমল দেননি অঞ্জানেয়ুলু | বলেছেনযখন কর্নাটকে ব্যয়বহুল বিয়েতে কর চাপানো হয়েছেতখন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী হয়ে গণ বিবাহের মঞ্চে মেয়ের বিয়ে দেওয়াই শ্রেয় | তিনি জানিয়েছেনগণ বিবাহে অন্যদের সঙ্গে বিয়ে করায় সম্মত ছিলেন তাঁর জামাইও | সমাজকল্যাণ মন্ত্রীর একটাই জীবনদর্শনসিম্পল থাকো সিম্পল ভাবে বাঁচো |

সুত্রঃ banglalive.com

বৃন্দাবনের স্বামীহারাদের হাতে শৌচাগারের মডেল

ভূমিকা

বৃন্দাবনের বিধবারা বরাবরই সামাজিক দিক দিয়ে অত্য‌ন্ত কলঙ্কজনক অধ্য‌ায়ের স্বাক্ষরয় এঁরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবার কর্তৃক্ত পরিত্য‌ক্ত হয়ে একান্তে জীবন যাপন করতে বাধ্য‌ হন।স্বজনরা তাঁদের দিকে ফিরেও তাকান না। সম্প্রতি ভারত সরকার এঁদের নিয়ে একটি সমীক্ষা করেছে।তাতে দেখা গিয়েছে জীবনধারনের জন্য‌ মূলত ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করা ছাড়া অন্য‌ কোনও পথ খোলা নেই। অনেক সময় বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এঁদের জন্য‌ নানা ধরনের কর্মসূচি নেয়, কিন্তু তাতে প্রকৃতই কোনও উপকার হয় কি না সন্দেহ।

বৃন্দাবনের বিধবারা অধিকাংশই পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা। রাজ্য‌ সরকার এঁদের ফিরিয়ে আনার ব্য‌াপারে এখনও তেমন কোনও উদ্য‌োগ গ্রহণ করেনি। তবে এ রাজ্য‌ থেকে প্রতিনিধিদল গিয়ে মাঝে মাঝে খোঁজখবর নিয়ে থাকে। যে পরিস্থিতির মধ্য‌ে এঁদের জীবন কাটাতে হয় তা অবর্ণনীয়। স্বাস্থ্য‌ পরিষেবার বিন্দুমাত্র সুযোগ এঁরা পান না।অসহায় অবস্থায় এঁদের মৃত্য‌ু হয়।

প্রকাশ্যে বর্জ্য ত্যাগ করা রোধে সচেতনতা প্রসার | এই উদ্যোগে গৃহীত কর্মসূচির মধ্যে অনুষ্ঠিত হল আন্তর্জাতিক শৌচাগার উৎসব | বিশ্ব শৌচাগার দিবস উপলক্ষে তিনদিন ধরে এই উৎসব পালিত হল দিল্লির বুকে | উৎসবে অংশ নিয়েছিল দিল্লির ৯ টি স্কুলের ৯০০ ছাত্রছাত্রী | পুরো উৎসবের মূল থিম ছিল দেশ জুড়ে সুলভ শৌচাগার মডেল জনপ্রিয় করা | উৎসবে অংশ নেন বৃন্দাবন থেকে আগতে বিধবা মহিলারাও |

নরেন্দ্র মোদীর 'স্বচ্ছ ভারত' উদ্যোগের অন্যতম দেশ জুড়ে‚ বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে শৌচাগারের প্রসার | ২০১৯-এর মধ্যে ভারতের প্রতি বাড়িতে শৌচাগার থাকাই লক্ষ্য | যাতে মানুষের হাতে করে বর্জ্য সাফাই করার মতো অমানবিক প্রথা বন্ধ হয় |

২০১১-র জনগণনা অনুযায়ী এখনও ভারতের ৬৭% বাড়িতে আধুনিক শৌচাগার নেই | ফলে প্রকাশ্যে বর্জ্য ত্যাগ চলছে | সেইসঙ্গে বহাল তবিয়তে আছে 'ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জারস' | অর্থাৎ যাঁরা খাটা শৌচাগার থেকে মাথায় বালতি চাপিয়ে বয়ে নিয়ে যান মানুষের বর্জ্য |

সুত্রঃ banglalive.com

প্রতি বছর মহরম পালন করে এই ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়

ভূমিকা

ভারতে হিন্দু মুসলমান ঐক্য‌ের ঐতিহ্য‌ দীর্ঘদিনের।দুর্ভাগ্য‌ের বিষয় এক শ্রেণির মানুষ এই ঐতিহ্য‌কে মানতে চান না। দেশভাগের সময় মুসলিম লিগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, হিন্দু ও মুসলমান দুটি আলাদা জাতি—ধর্ম,সংস্কার, সংস্কৃতি সহ কোনও ব্য‌াপারেই পরস্পরের সঙ্গে মিল নেই। ব্রিটিশ সরকার তা মেনে নিয়ে দেশভাগে ব্রতী হলেও এ কথা যে অসত্য‌ তা পরবর্তীকালে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। ভারতীয়রা মিলেমিশে দীর্ঘদিন জীবন যাপন করেছে। শুধু তাই নয়, এক সম্প্রদায় অন্য‌ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে আনন্দ করতে কার্পন্য‌ করেনি।

তাঁরা ব্রাহ্মণ | কিন্তু প্রতি বছর নিয়ম করে মহরম পালন করেন তাঁরা | শতকের পর শতক ধরে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্ম পালন করে আসছে এই রীতি | তাঁদের বলা হয় 'হুসেইনি ব্রাহ্মণ' | এঁদের বাস নয়া দিল্লির কল্যাণপুরী এলাকায় |

এই সম্প্রদায় দাবি করে‚ তাঁদের পূর্বপুরুষ‚ রহিব দত কারবালার যুদ্ধে ইমাম হুসেনের পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন | সেই থেকে তাঁদের নাম 'হুসেইনি ব্রাহ্মণ' | ইতিহাস বলছে‚ এই সম্প্রদায়ের একদা বাস ছিল পাঞ্জাবে | ক্রমে তারা পুজো পাঠ ছেড়ে শুরু করে যুদ্ধ | যোগ দেয় সেনাদলে এবং সরকারি কাজে |

পাঞ্জাব ছেড়ে অন্য অংশে বসবাস শুরু করলেও রীতি বজায় রেখেছে এই সম্প্রদায় | এদের 'মুহিয়াল'ও বলা হয় | এঁরা সাঁই বাবার ভক্ত হলেও প্রতি বছর মহরমে তাজিয়া বের করে | পূর্বপুরুষ রহিবকে শ্রদ্ধা জানাতে |

তবে মুসলিম সম্প্রদায়ের শোভাযাত্রা থেকে কিছুটা পার্থক্য আছে | হুসেইনি ব্রাহ্মণরা শোভাযাত্রায় কোনও অস্ত্র নেন না | বজায় রাখেন শোক-বিলাপের ধারা | এবং শোভাযাত্রায় যোগ দেন মহিলারা | তাঁরা উপবাসও করেন | মূলত সন্তান কামনায় নব বিবাহিতারা যোগ দেন শোভাযাত্রায় | সন্তান লাভ হলে পুজো দিয়ে আসেন সিরডি সাঁইবাবার কাছে |

অতীতের কারবালা এখন ইরাকে | ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে এই প্রান্তরে যুদ্ধ হয়েছিল হজরত মহম্মদের নাতি হুসেইন আলি আর অন্যদিকে বিপক্ষ উমায়াদ কালিফের মধ্যে | সেই হুসেইন আলির পক্ষেই তাঁদের পূর্বপুরুষ লড়াই করেছিলেন এবং নিজের ছেলেদের উৎসর্গ করেছিলেন বলে 'হুসেইনি ব্রাহ্মণ'দের বিশ্বাস |

সুত্রঃ banglalive.com

পুরুষশাসিত খেলার মাথায় এক তরুণী

ভূমিকা

নারী-পুরুষ ভেদাভেদ সমাজের সব ক্ষেত্র থেকেই উঠে যাচ্ছে। ক্রীড়াক্ষেত্রও তার ব্য‌তিক্রম নয়। আগে ফুটবল,ক্রিকেটের মতো খেলাগুলিতে পুরুষের একচেটিয়া প্রাধান্য‌ ছিল। কিন্তু এখন লিঙ্গ নির্বিশেষে এই খেলায় অংশগ্রহণ করে এবং তা বাণিজ্য‌িক দিক দিয়েও যথেষ্ট প্রসার লাভ করে। এমনকী যে সব দেশে তালিবানি শাসন ছিল সেখানেও ফতোয়া উপেক্ষা করে নারীসমাজ খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করছে। আফগানিস্তানে মেয়েরা সারা অঙ্গ ঢ়েকে রেখেও ফুটবল বা ক্রিকে খেলছে। তাঁরা জানেন,শুধুমাত্র এই খেলার জন্য‌ প্রণসংশয় হতে পারে তবু তাঁদের দমিয়ে রাখা যায়নি। সম্প্রতি বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় আফগানিস্তান টিম ভালই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করল। দেখা গিয়েছে, কাবুল বা কান্দাহারের রাস্তায় দলের সমর্থনে এক জায়গায় জড়ো হয়ে মহিলারা গলা ফাটাচ্ছেন। এতে প্রমাণিত হয়,একটা সমাজ প্রগতির পথে অগ্রসর হলে তাকে জোর করে পিছনের দিকে টেনে রাখা যায় না। ইরানের মহিলাদের টিম বিভিন্ন খেলায় অলিম্পিক্সে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।‘শাহ’ জমানায় ইরানে খানিকটা খোলা হাওয়া বইলেও পরে রক্ষণশীলতা ফিরে আসে।কিন্তু রক্ষণশীলতা শেষ কথা বলেনি। তারও ফাঁক দিয়ে মহিলারা নানা সামাজিক কাজে অংশ নিয়েছে।

ইতিহাসের পথে মাইলফলক স্থাপন করল নেপাল ক্রিকেট বোর্ড | CEO পদের দায়িত্ব দিল এক মহিলাকে | তরুণীর নাম ভাবনা ঘিমিরে | ICC অন্তর্ভূক্ত দেশের মধ্যে সম্ভবত প্রথম এত বড় পদের দায়িত্ব পেলেন কোনও মহিলা |

ভাবনা ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে MBA পাশ করেছেন | লন্ডনে চাকরিও করেছেন | কলেজ স্তরে ক্রিকেট খেলা এই তরুণী ইতিমধ্যেই দায়িত্ব সামলিয়েছেন বড় বড় টুর্নামেন্টের | তার মধ্যে আছে ফর্মুলা ওয়ান, EPL, লা লিগা-র মতো নামজাদা টুর্নামেট | স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট-এর কৃতী ছাত্রীর মুকুটে এ বার নতুন পালক | সামলাতে হবে নেপাল ক্রিকেট বোর্ডের CEO পদ |

ক্রিকেটে নেপালের সর্বোচ্চ কৃতিত্ব ২০১৪-ICC T-20 প্রতিযোগিতা খেলা | হিমালয়ের কোলে ছড়ানো এই ছোট্ট দেশটা ভাবনার হাত ধরে ক্রিকেটে নতুন সরণিতে পা রাখতে চাইছে |

সুত্রঃ banglalive.com

২৫ বছর বয়সের আগে বিয়ে করবেন না

উপসংহার

দেশের জননেতারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে যত তাড়াতাড়ি সামাজিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেন তত ভালভাবে সাধারণ মানুষকে নানা ধরনের সামাজিক কূফল সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়। সম্প্রতি লালুপ্রসাদ যাদবের মতো বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদও খোলাখুলি একটি সামাজিক কূফলের ব্য‌াপারে মতপ্রকাশ করেছেন। পরীক্ষার সময় টোকাটুকি প্রথার জন্য‌ অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনকে সমালোচনা শুনতে হয়। লালুপ্রসাদ বলেছেন, প্রয়োজনে যারা এই অপকীর্তি করছে তাদের বই হাতে ধরিয়ে দেওয়া উচিত।যদি তারা সত্য‌িই পড়াশুনা করে থাকে তাহলে প্রয়োজনীয় অংশটা বই থেকে ঠিকই খুঁজে পাবে। কিন্তু পড়াশোনা না করা থাকলে তাদের পক্ষে খোলা বই থেকেও কিছু লেখা সম্ভব নয়।

অপুষ্টি-সহ মহিলা ও শিশুদের নানা শারীরিক সমস্যা | সব কিছুর জন্য নাকি দায়ী অল্প বয়সে বিয়ে | মনে করছেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী জিতন রাম মানঝি | তাই তিনি চান ভারতে ছেলে মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রে বিয়ের সরকারি বয়স বাড়িয়ে ২৫ বছর করা হোক | এভাবেই ফিরিয়ে আনা হোক প্রাচীন আশ্রম ব্যবস্থা |

জিতনের কথায়, বৈদিক যুগের প্রথম ভাগে যে আশ্রম রীতি প্রচলিত ছিল সমাজে, সেটাই আদর্শ | সেই রীতিতে ২৪ বছর বয়স অবধি পালন করতে হত ব্রহ্মচর্য | তারপর ৪৮ অবধি সংসার ধর্ম, ৭২ বছর বয়স অবধি বানপ্রস্থ এবং ৭২ থেকে আমৃত্যু সন্ন্যাস পালন করা উচিত |

জিতন রাম মনে করেন অল্প বয়সে বিয়ের জন্যই মানুষের গড় আয়ু কমে ৭ ফিট থেকে দাঁড়িয়েছে ৫ ফিটে | নিজের উদাহরণ দিয়ে জিতনের দাবি, তিনি ২৫ বছর বয়সের পরে বিয়ে করেছেন | সেটা তাঁর সুস্থতার কারণ | কিন্তু ৭২ বছর বয়সে তিনি যে এখনও মুখ্যমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন? আশ্রম রীতিতে হিসেব মতো তাঁর এ সময় সন্ন্যাস নেওয়ার কথা | সে বিষয়ে কি কিছু ভেবে দেখেছেন মন্ত্রীমশাই ?

সুত্রঃ banglalive.com

বন্ধ হচ্ছে ১৫০ বছরের পুরনো প্রকাশ্যে উট কুরবানির প্রথা

ভূমিকা

বলিদান প্রথার বিরুদ্ধে বিরুদ্ধ মত প্রকাশ হওয়াটা নতুন কিছু নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিসর্জন নাটকে বলিদান প্রথার বিরুদ্ধে অত্য‌ন্ত বলিষ্ঠতার সঙ্গে নিজের মতপ্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, এই প্রথা মানবতা বিরোধী। আধুনিক সভ্য‌ সমাজে এই প্রথার বিরুদ্ধে ধর্মীয় মানুষরাই নিজেদের অবস্থান নিন। তাঁর মতামত অবশ্য‌ হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্য‌েই সীমাবদ্ধ ছিল।

উনবিংশ শতাব্দীতে এ ব্য‌াপারে সমাজের অন্য‌তম মাথা রাধাকান্ত দেবও বলিষ্ঠ অবস্থান নেন। কলকাতার রক্ষণশীল সমাজপতিদের তিনি ছিলেন মাথা। অর্থাৎ তাঁর মতামত ব্য‌তীত কোনও সামাজিক বিষয় সম্পর্কে কলকাতার মধ্য‌বিত্ত ও উচ্চবিত্ত সমাজ কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারত না। এ হেন রাধাকান্ত নিজের বাড়িতে দুর্গাপুজোয় বলিদান প্রথা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

উটকে 'স্টেট অ্যানিমাল' হিসেবে গ্রহণ করার আবেদন জানিয়েছে রাজস্থান সরকার | সেই আবেদনে সাড়া দিল অঞ্জুমান সোসাইটি অফ খানদান--আমিরিয়া | ফলে রাজস্থানের টঙ্ক জেলায় বন্ধ হচ্ছে ইদ উল জুহায় উট কুরবানি | গত ১৫০ বছর ধরে পালিত হয়ে আসছিল এই প্রথা |

সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে তাদের উপর কোনও সামাজিক বা রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়নি | সরকারের আবেদনে সাড়া দিতেই এই সিদ্ধান্ত | এই সংগঠনের অন্তর্ভূক্ত রয়েছে প্রায় সাত হাজার থেকে আট হাজার পরিবার |

টঙ্ক জেলায় ১৮৬৪ সালে শুরু হয় ইদের দিন প্রকাশ্যে উট কুরবানি প্রথা | শুরু করেন তৎকালীন নবাব চতুর্থ ইব্রাহিম আলি খান | দরিদ্রদের মধ্যে মাংস বিলির জন্য বলি দেওয়া হত দুটি উট | পরে তা কমে দাঁড়ায় একটি উটে |

এ বারেও নবাবের হাভেলিতে কুরবানি দেওয়া হবে | তবে উটের বদলে পাঁঠা | অঞ্জুমান সোসাইটি অফ খানদান--আমিরিয়া বা ASKea-এর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে PFA | তারা দীর্ঘদিন ধরে জনসমক্ষে উট কুরবানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছে | তাদের বক্তব্য ছিল, উটের মতো উপকারী পশুকে কুরবানি দেওয়া বন্ধ করা উচিত | অবশেষে বন্ধ হল ১৫০ বছরের পুরনো সেই রীতি |

সুত্রঃ banglalive.com

অঙ্গনওয়ারি খাবারের মান বেড়েছেঃপ্রতীচী রিপোর্ট

নিজস্ব সংবাদদাতাঃ বৈষ্ণব পরিবারের শিশুটির অঙ্গনওয়াড়িতে খাওয়া নিষেধ।সেখানে পেঁয়াজ রসুন দিয়ে রান্না হয় যে। দক্ষিণ দিনাজপুরের নন্দনপুর গ্রামের খুদে পড়ুয়াটির বন্ধুদের সঙ্গে পাত পেড়ে বসে খাওয়া হয় না। তাই মামার বাড়ি গেলেই ছুট লাগায় সেখানকার অঙ্গনওয়াড়িতে।দিব্বি চেটেপুটে খায় খিচুড়ি তরকারি,আধখানা ডিম।

জলপাইগুড়ির নেপাল লাইনে হাতির হানার ভয়ে কাঠের খুঁটির উপর তৈরি হয় বাড়ি।তেমনই এক বাড়ির নীচে ঠাঁই হয়েছে এলাকার অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের।শিশুরা সেখানে ঢুকতে পারলেও,দিদিমনির খাড়া হয়ে দাঁড়ানো অসম্ভব।সেই অবস্থাতেই তিনি এ-বি-সি-ডি,ওয়ান-টু-থ্রি শেখাচ্ছেন পড়ুয়াদের। বইও জোগাড় করেছেন নিজেই।দেখা গেল পড়ুয়ারাও ইংরেজিতে অল্প কিছু কথা বলতে পারছে।

সরকারি প্রকল্প বিচার হয় ব্য‌র্থতা দিয়ে।কী লক্ষ্য‌ ছিল, কতটুকু হল,তার হিসাব কষাই দস্তুর।কিন্তু তাতে প্রকল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জীবনের গল্পগুলো বাদ পড়ে যায়। প্রতীটীর দ্বিতীয় চাইল্ড রিপোর্ট ওই বাড়তি মাত্রাকে ধরতে চেয়েছ। তাই তথ্য‌ পরিসংখ্য‌ানের পাশাপাশি সমীক্ষকের চোখে ধরা পড়া দৃশ্য‌,কানে শোনা কথাও আছে রিপোর্টে।আজ,সোমবার,পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে অঙ্গনওয়াড়ি প্রকল্পর উপর প্রতীচীর রিপোর্ট উদ্বোধন করবেন অমর্ত্য‌ সেন।

প্রাক-কথনে অমর্ত্য‌ সেন লিখছেন, বিশ্বের সর্বত্র এই বোধ বাড়ছে যে,শিশুদের পুষ্টি, স্বাস্থ্য‌,শিক্ষার নিরিখে দেশের সাফল্য‌ের বিচার করা দরকারা। অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলির পরিষেবায় যে অনেক ফাঁকফোকর থেকে যাচ্ছে,তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।তবে কেন্দ্রের সংখ্য‌া যে অনেক বেড়েছে,তাকেও গুরূত্ব দিয়েছেন।

২০০৮ সালে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র নিয়ে প্রথম রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল প্রতীটী।এবার একই কাজ করতে গিয়ে কী পরিবর্তন চোখে পড়ল? এক গবেষকের অনুভব,অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র এর মধ্য‌ে বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।কেন্দ্রগুলির কাজের ভালরমন্দ তুলনা করতে পারছেন বাসিন্দারা। তাই তাঁদের চাহিদার চাপ বাড়ছে। ফলে থাবার সরবরাহ,আর খাবারের মান,দুয়েরই আগের চাইতে উন্নতি হয়েছে। অধিকাংশ মা বলেছেন,খাবারের মান ও পরিমাণে তাঁরা সন্তুষ্ট। কেন্দ্রে পড়াশোনা হয় না,মায়েদের সেই নালিশও এবার অনেকটা কমেছে।

তবু কেন্দ্রগুলিতে গিয়ে না দাঁড়ালে বোঝা যায় না,ফাঁক কোথায়, ফোকর কত বড়। বর্ধমানের মন্তেশ্বরের একটি গ্রাম জয়রামপুর।সেখানে ছোটদাসপাড়ার কেন্দ্রটি বড় রাস্তার পাশে।দুপাশে দুটো বড় পুকুর,কেন্দ্রের গা ঘেঁষে বিদ্য‌ুতের ট্রান্সফরমার।কতটা অরক্ষিত এই কেন্দ্রের খুদে পড়ুয়ারা,তা কি বোঝা যেত পাঁচিলহীন স্কুলের সংখ্য‌া থেকে? শিশুর নিরাপত্তার অধিকারও শিক্ষার অধিকারে্র মধ্য‌ে পড়ে ,চিন্তাটা উস্কে দিচ্ছে প্রতীটী রিপোর্ট।

সূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

পরমাণু চুল্লীতে দুর্ঘটনার দায় নেই সরবরাহকারীর

ভারতের পরমাণু চুল্লীর কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষতিগ্রস্তরা সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী সংস্থার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিল বিদেশ মন্ত্রক।সেই অধিকার থাকবে শুধুমাত্র পরমাণু চুল্লী ব্য‌বহারকারী সংস্থার(এ ক্ষেত্রে যে সংস্থা হল ভারতীয় পরমাণু বিদ্য‌ুৎ করপোরেশন বা এনপিসিআইএল)।অর্থাৎ ভারতের সঙ্গে পরমাণু চুক্তির ক্ষেত্রে মার্কিন সংস্থাগুলির সীমাহীন দায়বদ্ধতার আশঙ্কা যে নেই,সে কথাই আজ স্পষ্ট করল দিল্লি।

মনমোহন সিংয়ের জমানার সূচনার পরেই হিমঘরে চলে যাওয়া ভারত-মার্কিণ পরমাণু চুক্তির বিভিন্ন জট কাটিয়ে গতমাসে সেটিকে কার্যত নবজন্ম দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী ও বারাক ওবামা।সেই সমঝোতা সংক্রান্ত কিছু তথ্য‌ই আজ নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রশ্নোত্তর আকারে প্রকাশ করেছে বিদেশ মন্ত্রক। যাতে বলা হয়েছে, ভারতে পরমাণু দায়বদ্ধতা আইনে কোনও সংশোধন করা হচ্ছে না। আর এখানেই ভারতীয় পরমাণু দায়বদ্ধতা আইনের ৪৬ নম্বর ধারার কথা উল্লেখ করে বিদেশ মন্ত্রক স্পষ্ট করে দিয়েছে, পরমাণু জ্বালানি এবং যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী সংস্থাগুলির দায়বদ্ধতা শুধু ব্য‌বহারকারী সংস্থাগুলির কাছেই। এমনকি ক্ষতিগ্রস্তরা বিদেশের আদালতেও যেতে পারবেন না। এ ব্য‌াপারে গতকাল আমেরিকাকে লিখিতভাবে আশ্বস্ত করেছে দিল্লি।

২০১৪-র সেপ্টেম্বরে ভারত-মার্কিন পরমাণু সহযোগিতা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য‌ে একটি কন্ট্য‌াক্ট গ্রুপ গঠন করা হয়। আজ বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, পরমাণু চুক্তির জট ছাড়াতে তিন দফা বৈঠক করেছিল সেই গ্রুপ। শেষ বৈঠকটি হয় লন্ডনে,ওবামার ভারত সফরের তিনদিন আগে। সেই বৈঠকে ভর করেই পরমাণু সহযোগিতা নিয়ে বকেয়া দুটি বিষয়ে শেষপর্যন্ত ঐকমত্য‌ হয়।গত ২৫ জানুয়ারি তাতেই সিলমোহর দেন মোদী য-ওবামা।

প্রথমে আমেরিকা চাইছিল ভারতে পরমাণু চুল্লীতে ব্য‌বহৃত তেজস্ক্রিয় পদার্থগুলিকে তাদের পর্যবেক্ষণে রাখতে।এতে আপত্তি ছিল ভারতের। তবে ওবামা মোদীকে জানান, তাঁরা এই পর্যবেক্ষণ চান না। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র সৈয়দ আকবারুদ্দিন বলেন,‘আমরা শুধু আইএইএ(আন্তজার্তিক পরমাণু শক্তি সংস্থা(-র রক্ষাকবচ মেনে চলব। এর মধ্য‌ে দ্বিপাক্ষিক কোনও রক্ষাকবচ নেই।’

সূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, ৯ ফে্রুয়ারি ২০১৫(সংবাদ সংস্থা সূত্রে রিপোর্ট)

গ্রাম ও শহরের সেতুবন্ধনই বিকল্প

ভূমিকা

পৃথিবী জুড়ে আজ শিল্প ও নগরোন্নয়নের জন্য‌ চাষের জমি দখলের যুদ্ধটা উন্নয়ন নাটিকার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। অবশ্য‌ উন্নত পাশ্চাত্য‌দেশ এবং উন্নতিশীল দেশের এই ব্য‌াপারে উপলব্ধিতে আকাশ পাতাল ফারাক আছে। যেহেতু উন্নত দেশের ক্ষেত্রে মাথাপিছু জমির পরিমাণ বেশি,তাই তাদের স্বার্থ খাদ্য‌শস্য‌ নিয়ে ব্য‌বসা বাণিজ্য‌ের প্রশ্নে জড়িয়ে আছে।উন্নয়নশীল দেশের অবস্থা ঠিক বিপরীত—জমির তুলনায় জনসংখ্য‌া অনেক বেশি। তাই জমিটুকু ছাড়তে নারাজ গ্রামবাসীরা।ভরাতবর্ষের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ মানুষ সম্পূর্ণ কৃষি নির্ভর—তাদের একমাত্র জীবিকা নির্বাহের সম্বল চাষযোগ্য‌ জমি। তাই এ ধরনের জমি রক্ষা করা তাদের কাছে মরণ বাঁচন সমস্য‌া।

এই আলোচনার প্রেক্ষাপট হিসাবে পশ্চিমবঙ্গকেই বেছে নেওয়া যাক।পশ্চিমবাংলার ভৌগলিক ও আর্থসামাজিক পরিপ্রেক্ষিতেই সমস্য‌াটা বোঝানো প্রাঞ্জল হবে। এই রাজ্য‌ে বৃহৎশিল্প স্থাপনের জন্য‌ পুঁজি বিনিয়োগ করার আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।রাজ্য‌ সরকারের তরফে সুবিশাল বেসরকারি দেশি এবং বিদেশি সংস্থাকে সরকারি খাত থেকে নামমাত্র দাম ও অনেক সুযোগ সুবিধা দিয়ে কৃষিজমি পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর প্রতিবাদে বাম আমলে গ্রামের মানুষ বনাম রাজ্য‌ সরকারের সামংআজিক সঙ্ঘর্ষ হয়েছিল। এর প্রভাবে শহর কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী,বৈজ্ঞানিক শিল্পী এবং স্কুল,কলেজ বিশ্ববিদ্য‌ালয় স্তরের শিক্ষকরা দলবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করেছেন। সাধারণত বুদ্ধিজীবীরা কোনও বিতর্কিত বিষয়ে প্রতিবাদ সমর্থন করলেও কখনও তা জনসমক্ষে তেমনভাবে প্রকাশ করেন না ঝুট ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ার ভয়ে। অনেক বৈজ্ঞানিকও যুক্তি তক্কো ভুলে গিয়ে নীরব থাকেন। তবে বেশ বড় অংশের ছাত্র-ছাত্রীর দল প্রথম থেকেই কিন্তু আন্দোলনের সমর্থনে সরব হয়েছে। যেহেতু বিকেন্দ্রীকৃত গণতান্ত্রিক কাঠামো এই রাজ্য‌ে রয়েছে,তাই এটা অবশ্য‌ম্ভাবী যে সরকারের অনেক শরিক অথবা বিরোধীপক্ষের রাজনৈতিক দল এর মোকাবিলায় জড়িয়ে পড়েছেপ্রায় সমস্ত শহরবাসীর কাছে খাদ্য‌ যোগানের বিষয়টি নিশ্চিত বা প্রশ্নাতীত সেই খাদ্য‌ের মান নির্ভর করে তাদের আর্থিক অবস্থার উপর।

সূত্রঃ একক মাত্রা, সপ্তম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্য‌া, সুব্রত সিংহ

কারা প্রতিরোধী

উদায়স্ত খেটে খাদ্য‌ের যোগানদার মহিলা পুরুষের বিষয় কৌতুহলের অভাব লক্ষ্য‌নীয়।তাই আজকের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক প্রাপ্তি,শহরের বাসিন্দাদের কৃষিজমির সর্বাধিক গুরূত্ব সম্বন্ধে সামুহিক উপলব্ধি।

সিঙ্গুরের প্রতিরোধ আন্দোলনের সঙ্গে নন্দীগ্রামের ঘটনার পর পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত স্তরের মানুষের পুঞ্জীভূত ক্রোধ সে সময় বিদ্রোহের মাত্রা নেয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে কৃষি ও শিল্পের মধ্য‌ে একটা ভারসাম্য‌ প্রশ্ন উঠেছে। শুধু তাই নয়, শিল্পের আকৃতি ও প্রকৃতি নির্ধারণ করার গুরূত্ব সারা সমাজ বুঝতে পারছে। সে সব দিক ভেবেই আলোচনাতে কয়েকটি বুনিয়াদি দৃষ্টিকোণ তুলে ধরা হয়েছে। বেশ কয়েকমাস আগেই সরকার রাজ্য‌ের সমস্ত জমির বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্য‌বহার যোগ্য‌তার একটি সমীক্ষা করাবে বলে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল। অনেক সরকারি বিজ্ঞপ্তির মতো সেটিও নিশ্চয় ধামাচাপা অথবা ফাইল চাপা হয়ে গিয়েছে।

এবারে মূল বক্তব্য‌ে আসা যাক, সেই সময় একটি টিভি চ্য‌ানেলে বক্তব্য‌ রাখতে গিয়ে বিখ্য‌াত সাহিত্য‌িক(অধুনা প্রয়াত) সুনীল গঙ্গোপাধ্য‌ায় বলেছিলেন যে,‘শিল্পের সঙ্গে কৃষির’ প্রয়োজন আছে। কৃষি বিকাশের একটা স্তরের পর গ্রামের মানুষরা জীবনধারনের মান সমষ্টিগতভাবে উন্নত করতে শিল্পের আবশ্য‌িকতা অনিবার্য। এই শিল্পায়ন উচ্চবিত্ত বা মধ্য‌বিত্ত এক শ্রেণির শহুরে মানুষের ধনসম্পদ বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসাবে নয়।

খেয়াল রাখত হবে,মার্কিন সরকার প্ররোচিত বিশ্বায়নের তথাকথিত শিল্পায়নের স্রোতে বহু দেশ ভেসে গিয়েছে। আমাদের দেশও এখন সেই সূত্রে বাঁধা পড়েছে। এই জরুরি বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের সরকারও কেন্দ্রের সমাদর লাভ করেছিল(বাম সরকার)।আবার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলি(এসইজেড) সৃষ্টি করা হয়েছিল যাতে অনেক অর্থনৈতিক সংগঠন নানা রকম ছাড় নিয়ে ব্য‌বসা বাণিজ্য‌ করার সুযোগ পায়। দেশে প্রযোজ্য‌ কোনও রকম শুল্কই দিতে হয়না এসব বিশেষভাবে চিহ্নিত অঞ্চলে। এই রাজ্য‌েও অনেক কৃষিজমি সেই জন্য‌ অধিকার করা হচ্ছে। কুলপি,নন্দীগ্রামে একসময় এ রকম পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

যারা অন্য‌ায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় তাঁরা প্রতিবাদী। এই মুখগুলিই ধীরে ধীরে প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। তাঁরাই সক্রিয়ভাবে অন্য‌ায়ের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে করীয় কর্তব্য‌ সম্পাদন করেন।

সূত্রঃ একক মাত্রা, সপ্তম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্য‌া, সুব্রত সিংহ

জমির গুণমান

প্রথমেই বলে রাখা দরকার যে, রাজ্য‌ের গঙ্গা-হুগলি উপত্য‌কা জমির গুণমান বিচারের বৈজ্ঞানিক মাপকাঠিতে সুজলা সুফলা অঞ্চলের মধ্য‌ে শ্রেষ্ঠতম, কিন্তু মাথা পিছু জমির পরিমাণ আছে সামান্য‌তম। ভআগ্য‌িস বৃটিশ আমলের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত জমিদারী প্রথার বিলোপ হওয়াতে অন্য‌ান্য‌ রাজ্য‌ের তুলনায় জোতদারি সমস্য‌া কম ছিল। প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের সক্রিয় পদক্ষেপে ভূমি সংস্কার করা হয়। তার ফলে জমির মালিক কেন, ভাগচাষী এবং কৃষি মজুররাও ফসলের ভাগ পান। তাদের পারিবারিক খাদ্য‌সংস্থান হয়ে যায়। ভূমি সংস্কার পুরোপুরি সম্পন্ন না হলেও,যোটুকু হয়েছে তাতেই এখানকার গ্রামে গঞ্জে,দেশের অন্য‌ান্য‌ রাজ্য‌ের তুলনায় অর্থনৈতিক বৈষম্য‌ কিছুটা কমেছিল। সমাজ চেতনাও এর ফলে বেড়েছিল।এ সব কারণেই এখানকার গ্রামের মানুষ প্রাণ দিয়ে জমি রক্ষা করতে চায়।

জল-বায়ু-মাটি মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন। আজ শিল্পায়নের সঙ্গে নগরায়নের অগ্রাসী নেশা,অপব্য‌বহারের ফলে এই সুসংবদ্ধ ব্য‌বস্থা ভেঙে পড়েছে। জমির চরিত্র বিচার না করেই তার ব্য‌বহার এই পরিস্থিতির জন্য‌ বহুলাংশে দায়ী।এটা ধরউবসত্য‌ যে সব জমি সব রকম ব্য‌বহারের উপযোগী নয়। আবার ভূপৃষ্ঠের কোনও ভুখন্ডই অকেজো নয়। প্রাকৃতিক ইন্য‌াসে তার নিজস্ব ভূমিকা থাকে।জমির গুণমান অনুযায়ী সেটা কাজে লাগানো উচিত। জমির অন্তর্নিহিত চরিত্রই যে কোনও ভূমিখন্ডের সঠিক ব্য‌বহারের পথ নির্দেশক। চরিত্প নির্ধারণের মূলগত নির্ণায়কের মধ্য‌ে মাইর ঢাল,ভূতাত্ত্বিক কাঠামো এবং আবহাওয়া(উষ্ণতা,আর্দ্রতা ও বৃষ্টিপাত) সবচেয়ে গুরূত্বপূর্ণ। যেহেতু বিশ্বজুড়ে চাষবাসই হল জমি ব্য‌বহারের প্রধান ক্ষেত্র,এসব নির্ণায়েকর মাপকাঠিতেই বিভিন্ন কৃষি প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা উচিত। সারা বিশ্বে জমির যোগ্য‌তা এবং সেচ গ্রহণ ক্ষমতার একটি স্বীকৃত শ্রেণি বিভাগ আছে। কৃষি এবং সেচ গ্রহণ যোগ্য‌তার বিচারে এর আটটি শ্রেণি ক্রমবর্ধিত নিম্নমানের।

আবার নদী উপত্য‌কার সমতল অঞ্চলের প্রথম শ্রেণির কৃষিজমির উর্বরতা,বৃষইপাত এবং মাটির জলধারণ ক্ষমতার মধ্য‌ে এক আশ্চর্যজনক প্রাকৃতিক আন্তঃসম্পর্ক পাওয়া যায়। এটাও বুঝতে হবে যে ক্ষুদ্রতম ভূমিকেন্দ্রের স্তরেও প্রচুর বৈচিত্র্য‌ রয়েছে। মাটির মূল প্রকৃতির (এঁটেল দোআশলা না বেলে) তার উপর নির্ভর করে বৃষ্টির জল মাটির নীচে সরাসরি চুঁইয়ে যায় কিনা।

সূত্রঃ একক মাত্রা, সপ্তম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্য‌া, সুব্রত সিংহ

ভৌগলিক বৈচিত্র্য‌

বেলে ও দোআশলা মাটির ক্ষেত্রে নানা রকমের বর্জ্য‌ পদার্থ অনুস্রুত হয়ে ভূগর্ভস্থ জল সম্পদকে দূষিত করতে পারে। এঁটেল মাটির ক্ষেত্রে কিন্তু এই সমস্য‌া অপেক্ষাকৃত কম।

ভরাতবর্ষের অভাবনীয় ভৌগলিক বৈচিত্রময় এক ভূখণ্ড,যাতে বেশ কয়েকটি প্রাকৃতিক অঞ্চল রয়েছে যা অনেক বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানও লিপিবদ্ধ করেছে। এর অঞ্চলের ভিত্তিতেই জমি ব্য‌বহার করা উচিত। পশ্চিমবঙ্গেও এই ভৌগলিক বৈচিত্র্য‌ কম নয়,কারণ পৃথিবীর অনেক দেশের চেয়ে এর আয়তন বেশি। এই রাজ্য‌ের প্রাকৃতিক অঞ্চল হল-)হিমালয় পর্বতমালা ২) তার পাদদেশে নদনদীর লীলাক্ষেত্র ডুয়ার্স ৩) গঙ্গার দক্ষিণে গঙ্গা-হুগলির বিশাল পাললিক উপত্য‌কা৪) পশ্চিমে ছোটনাগপুরের মালভূমি ও পাহাড়ি অঞ্চলের পূর্বাংশ ৫) তার সংলগ্ন দামোদর কংসাবতী-সুবর্ণরেখা-রূপনারায়ণের শাখাপর্শাখা অধু্য‌ষিত পাললিক উপত্য‌কা অঞ্চল ৬)সবচেয়ে দক্ষিণে সমুদ্র ঘেঁশা সুন্দরবন ব-দ্বীপ ৭)হাওড়া –মেদিনীপুর তটভূমি। ভাবলে আশ্চর্য লাগে যে দেশের সমস্ত রাজ্য‌ের মধ্য‌ে একতমাত্র পশ্চিমবাংলাকেই ‘আসমুদ্র হিমাচল’ আখ্য‌া দেওয়া যায়।অথচ বৃষ্টিপাতের মাপকাঠিতে,কিছু হেরফের থাকলেও,পশ্চিমবাংলা একটিমাত্র প্রাকৃতিক অঞ্চলভুক্ত। দু-তিন মাস প্রচুর বৃষ্টির সঙ্গে সারা বছরের শুষ্কতার ফলে বহু সমস্য‌ার সৃষ্টি হয়। ভূমির ঢালের বিচারে কিন্তু বেশ কিছু তফাৎ আছে হিমালয় ও ছোট নাগপুরে সংলগ্ন অন্য‌ান্য‌ অঞ্চলের। আবার ভূতাত্ত্বিক গঠনে হিমালয় তো বটেই,ছোটনাগপুর অঞ্চলের সঙ্গে বাকি উপত্য‌কা অঞ্চলের ধরনধারন অনেক ভিন্ন।

গঙ্গা-হুগলি উপত্য‌কা অঞ্চলের পলি তো পৃথিবীর সৃষিট ও বিবর্তনের ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে নবীনতম। তবে সেই হিমালয় অঞ্চল থেকে নদী পথে এবং বর্ষাকালে মাটির উপর ঢাল দিয়ে তা প্রবাহিত হয়েছে অনেক দূর থেকে। তাই পলি খুবই সুক্ষ্ম মাপের,কিন্তু দামোদর অঞ্চলের পলি এসেছে নিকটবর্তী ছোট নাগপুরের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে।তাই পলি মাপে অনেক স্থুল এবং তাতে পাথরের টুকরো মেশানো আছে। এই অঞ্চলের প্রধান পলিসমগ্র অপেক্ষাকৃত পুরনো।প্রায় উত্তর-দক্ষিণ বরাবর হুগলি এবং দামোদর উপত্য‌কার মাটির রূপ পরিবর্তের লক্ষ্ণণ রেখা সিঙ্গুরের খানিকটা পশ্চিমে।

সূত্রঃ একক মাত্রা, সপ্তম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্য‌া, সুব্রত সিংহ

ভূ-জল ভাণ্ডার

এবারে ভূ-জল-ভাণ্ডার নিয়ে চর্চা করা যাক। উত্তরবঙ্গ এবং হুগলি উপত্য‌কার প্রধান অংশে মাটির আস্তরণ এমন যে বৃষ্টির জল সহজে অনুস্রুত হয়ে যায়।বৈজ্ঞানিক ভাষায় নীচের ভূ জল ভাণ্ডারকে খোলাড়মুক্ত বলে আখ্য‌া দেওয়া হয়। রাজ্য‌ের উত্তরবঙ্গ এবং কলকাতার উত্তরে দমদম,রাজারহাট অ}্চল পর্যন্ত ঠিক এ রকম খোলা ভূ-জল ভাণ্ডার রয়েছে। দক্ষিণ দিকে অবশ্য‌,মোটা এঁটেল মাটির স্তর ক্রমশ বেড়ে অনেক গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। তার নীচে যে ভূ-জল ভাণ্ডারের স্তর আছে,তাকে সীমাবদ্ধ বলা হয়। সে ধরনের জলস্তরে বৃষ্টির জল অনুস্রুত হতে অনক্ষণ সময় লাগে। তবে কলকাতা অঞ্চলের ভূ-জল অনেক খরও—যেহেতু এক বিশাল অববাহিকার এক নীচের অংশে অবশিষ্ কেননা এতে জোয়ারের সময় নোনা জল ঢোকে কিছুটা।

সবদিক মিলিয়ে নিলে দেখা যায় যে ভুতাত্ত্বিক,ভৌগলিক কাঠামোর সঙ্গে জলসম্পদের আশ্চর্য সঙ্গতি রয়েছে। সেই সুবাদে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চল ও হুগলি উপত্য‌কায় ভু-জলের অফুরন্ত ভাণ্ডার রয়েছে,তার সঙ্গে তা অসংখ্য‌ নদী-নালার লীলাক্ষেত্র। সেই জন্য‌ এই অঞ্চল সারা বিশ্বে প্রকৃষ্টতম কৃষি অঞ্চল। কোনও রকম শিল্পায়ন বা নগরায়নের জন্য‌ে প্রথম শ্রেণির এই উর্বরা জমি থেকে উৎপন্ন খাদ্য‌ সম্ভারে যেন হাত না পড়ে। বহু শতাব্দী ধরে,বিশেষত, ব্রিটিশ আমলে রাজ্য‌ের উর্বরা জমি এবং জলাভূমি অঞ্চলেই বসতি তৈরি হয়েছে। তবে স্বাধীনতার পর তা চক্রবৃদ্ধির হারে বৃদ্ধি পেয়েছ।

অবশ্য‌ এটাও মনে রাখার দরকার যে প্রায় কোনও ভুখণ্ডই পতিত নয়। যোগ্য‌তার মানে প্রথম শ্রেণির না হলেও,বন জঙ্গল,ফল-ফলারি এবং পশুচারণের জন্য‌ এগুলি প্রকৃষ্টতম। পৃথিবীর বহু দেশে এ ধরনের জমি তো যথাযথ চাষবাস করে অর্থনৈতিক সজীবতা আনতে পারছে।আমাদের রাজ্য‌ের পশ্চিমভাগের তথাকথিত অনুন্নত অঞ্চল সমৃদ্ধও হতে পারত। গুণাগুণে কিছু তারতম্য‌ থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সবটাই চাষযোগ্য‌ জমি। নেহাৎ পুরোপুরি পাথুরে পাহাড় বা সে সব পাহাড় সংলগ্ন পাদদেশের মালভূমি চাষযোগ্য‌তার তালিকা থেকে বাদ পড়ে।

সূত্রঃ একক মাত্রা, সপ্তম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্য‌া, সুব্রত সিংহ

ভূপৃষ্ঠের গঠন ও চাষবাস

এটা ভালভাবে বোঝা প্রয়োজন যে জলের সুবিধা, মৃত্তিকার গুণাগুণ,ভূপৃষ্ঠের গঠন এবং ভূমির ঢাল হচ্ছে বাঞ্ছনীয় ও সুষম চাষের নির্ণায়ক। এ সবের মধ্য‌ে একটা মেলবন্ধন রক্ষা অত্য‌াবশ্য‌ক। ভাবলে আশ্চর্য লাগে যে স্থানীয় গ্রামের লোক তাদের প্রত্য‌েক টুকরো জমির গুণাগুণ সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত। বহু প্রজন্মের সঞচিত অভিজ্ঞতা এবং বিদ্য‌া থেকেই প্রাকৃতিক নিয়ম ও রীতিনীতি অনুযায়ী জমি ব্য‌বহারের প্রভূত সক্ষমতা। সে জন্য‌ চাষবাসের স্থানীয় পরিকল্পনা রচনা এবং তা সম্পাদন করার ভার এদের হাতেই থাকা উচিত। এরাই সব দিক থেকে কৃষিজমির রক্ষক।

অন্য‌দিকে জমির ভক্ষক হলেন উচ্চশিক্ষিত একটি কৃষি পণ্ডিত সম্প্রদায়। এরা বহুজাতীয় কৃষি বাণিজ্য‌ সংস্থাগুলির কাছে বুদ্ধিসুদ্ধি বন্ধক রেখেছন। এদের চাপ এবং নানা রকম সুবিধার(ভরতুকি,বীজ,সার ইত্য‌াদি) প্রলোভনে গ্রামের কৃষিজীবীরা আত্মবিস্মৃত হয়ে বিপথে চালিত হয়ে যান। সরকারি স্তরে কৃষিতে দুর্নীতির এটি লজ্জাজনক দৃষ্টান্ত। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ, পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বোরো চাষ চালিয়ে যাওয়া। চাষবাসের এই পদ্ধতি ধীরে ধীরে জমির উর্বরতা ধব্ংস করে দিচ্ছে।এর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাএ জড়িত অত্য‌ধিক সেচের কূপ্রভাব। এ ছাড়া উপায় নেই কারণ বরো ধানের মতো বিজাতীয় শস্য‌ বেশি জল এবং কৃষি রাসায়নিক পাযদার্থ ও কীটনাশক ছাড়া টিকতেই পারবে না।এসবের ক্রম পুঞ্জিত ফলেই পশ্চিমবঙ্গ সমেত সারা দেশের উৎকৃষ্ট কৃষিজমির দুই-তৃতীয়াংশ অবক্ষয় কবলিত হয়ে প্রায় বন্ধ্য‌াত্বের স্তরে চলে গিয়েছে। অথচ বর্তমানে কিছুতেই বোরো চাষ থেকে কৃষককে নিবৃত্ত রাখা সম্ভব হচ্ছে না। অধিক উৎপাদনের জন্য‌ তারা গরমকালে ওরো চাষ করছেন। রাজ্য‌নিতক ও রাষ্ট্রনৈতিকভাবে তাদের বাধা দান করা সম্ভবপর হচ্ছে না তার কারণ এর মধ্য‌ে জনপ্রিয় রাজনীতিরও সংশ্রব রয়েছে। লোকপ্রিয়তা হারানোর ভয়ে ্নেকেই বিষয়টি বুঝেও না বোঝার ভান করেন।

চাষবাসের ক্ষেত্রে ভূপৃষ্ঠের গঠন অত্য‌ন্ত গুরূত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। চাষবাসের প্রাচীন কারিগরী ভূপৃষ্ঠের গঠনের উপর অনেকটা নির্ভর করত। যেমন ঝুম চাষ। পাহাড়ি এলাকায় এই চাষ ছাড়া উপায় নেই।

সূত্রঃ একক মাত্রা, সপ্তম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্য‌া, সুব্রত সিংহ

জমির সুস্থায়ী চাষের আরও কয়েকটি দিক মনে রাখতে হবে—

) জমি থেকে বারবার এক ধরনের ফসল নিলে জমিটি ক্রমশ বিশেষ ধরনের পুষ্টিকর খাদ্য‌ সামগ্রী টেনে নিতে থাকে। তাই সারা বছরে জমিটি থেকে নানান ধরনের ফসল তোলা উচিত।

)আবার মাটি যাতে নাইট্রোজেন অভাব জনিত রোগে (অনেকটা রক্তাল্পতা বা অ্য‌ানিমিয়ার মতে) না ভোগে,তাই আগেকার প্রচলিত প্রত্য‌েক ফসল তোলার পরে ধঞ্চে শাক লাগানোর প্রথা আবার চালু করা উচিত।

) মুসুর বা অন্য‌ান্য‌ শিল্পগোত্রীয়(লেগুমিনাস) ডালতালের ফসল বছরে অন্তত একবার তুললে সমস্য‌াও মিটবে কেননা এই ধরনের ফসল তুলতে জল খুব কম লাগে,আর তিল লাগালে তো কথাই নেই ছড়িয়ে দিলেই হয়ে যায়।

)সাম্প্রতিক কালে একই জমি থেকে পাঁচমেশালি খাদ্য‌সামগ্রী তোলার প্রাচীন পদ্ধতি আবার চালু করা হয়েছে।

)ঠিক সেভাবেই খাদ্য‌যোগ্য‌ ফসলের সঙ্গে কিছু জ্বালানির ছোট ছোট গাছও লাগানো যায়।এটি সামাজিক বনসৃজনের অন্তর্গত।

এ ধরনের অনেক সুস্থায়ী চাষপ্ণালী লিপিবদ্ধ আছে গ্রামের মানুষের শব্দকোষে।কৃষির পরিকল্পনা ও রূপায়ন যদি স্থানীয় গ্রামবাসীদের হাতেই ছেড়ে দেওয়া হয়,তাহলে জমি তো তো উর্বরা থেকে যাবেই রাজ্য‌ের গ্রামাঞ্চলও উৎকর্ষতার এক নবদিগন্তে পৌঁছে যাবে।

কিছুটা নিম্নমানের কৃষিজমি কিন্তু পুরুলিয়া,বাঁকুড়ার মতো আরও অনেক অঞ্চলে রয়েছে। প্রাকৃতিক কারণে এসব জায়গায় বৃষ্টির জল ধরে রাখা যায় না,আবার ভূগর্ভস্থ জলের স্বল্পতাও রয়েছে। সেখানে স্বল্প জল দিয়ে শুষ্ক চাষ স্বচ্ছন্দে করা যায়। সেই সেচের জন্য‌ নানা পদ্ধতি স্থানীয় লেকসঙ্গীতে উদ্ধৃত আছে। আরও ভাল হয় যদি দুধ মাংস উৎপাদনের জন্য‌ ঘাস জাতীয় পশুখাদ্য‌ উৎপাদন করা যায়। এতে অববাহিকা অঞ্চল ভূমিক্ষয় থেকে রক্ষা পাবে। এই অঞ্চলে খুব সহজেই দুগ্ধজাত দ্রব্য‌ ও মাংস উৎপাদনের শিল্প গড়ে উঠবে।

এবার শিল্পের কথায় আসা যাক। সর্বাগ্রে সাবধান করা দরকার যে পশ্চিমবংলা এবং বাংলাদেশের মতো সমুদ্রপাড়ের নিম্নভূমি অঞ্চলের সামনে বিপদ আরও ভয়ঙ্কর। এটা প্রমাণিত যে সুন্দরবনের কিছু দ্বীপ শীতের মরশুমেই সমুদ্রতলে বিলীন হয়েছে।

সূত্রঃ একক মাত্রা, সপ্তম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্য‌া, সুব্রত সিংহ

 

 

পশ্চিমবঙ্গে বৃহৎ শিল্প সম্পর্কে কিছু কথা

বৃহৎ শিল্প করতে হলে,তাতে রাজ্য‌ের ভূমন্ডলীয় উষ্ণতা বৃদ্ধির হার যেন না বাড়ে। যেহেতু যানবাহন থেকে উদগিরিত ধোঁয়া এর প্রধান কারণ তাই এ ধরনের কারখানা নিষিদ্ধ না করলে বিপদ আরও ঘণীভূত হবে। তবে বিকল্প শিল্পের সমাধান আমাদের রাজ্য‌ের প্রথম কয়েক বছরের বামফ্রন্ট সরকারের সাফল্য‌ে পাওয়া যাবে।অনেকের হয়তো মনে আছে, তাদের উদ্য‌োগেই ক্ষুদ্র শিল্পের(অনেকটা খাদি গ্রামোদ্য‌োগ ধরনের) সুবাদে, পশ্চিমবাংলা এই ধরনের শিল্পায়নের দেশের মধ্য‌ে অগ্রভাগে ছিল। তন্তুজ,মঞ্জুষার মতো কিছু নিদর্শন এখনও কোনও রকমে টিঁকে আছে। এই ধরনের শিল্প বিকেন্দ্রীত স্তরে পুনরায় শুরু করা যায়। বহু সরকারি অথবা বেসরকারি অনুদানকারী সংস্থার সহায়তায় পশ্চিমবাংলা জুড়ে লক্ষ লক্ষ স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। এদের মাধ্য‌মে কৃষিজাত পণ্য‌ের ভিত্তিতে গ্রামীণ শিল্প গড়ে তোলা যায়,কৃষিকর্মে বিঘ্নিত না করে।

অনেকেই জানেন কলকাতাতেও এর প্রচুর চাহিদা আছে। উদাহরণস্বরূপ,পেয়ারার জেলি,কাসুন্দি,নানা রকমের ফলের রস, টমেটো সস, আলুর চিপস এসবের উল্লেখ করতে হয়। এছাড়া মশলাপাতির দরকার তো আছেই।মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীদের এ ধরনের উদ্য‌োগে লাগানো যায়। অনেক কম দামে গ্রামের শিক্ষিত বেকার যুবকদের স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে সংগঠিত করে,এ সব সামগ্রী বাজারহাটে বা বাড়ি বাড়ি বিক্রি করার কাজে লাগানো যায়। কৃষি প্রধান রাজ্য‌ে এ ধরনের ফুড প্রসেসিং করে তার মূল্য‌বৃদ্ধি করার কাজে শুধুমাত্র সামান্য‌ কিছু সরকারি পুঁজি নিয়োগ করলেই চলবে।দেশি বা বিদেশি দালালের প্রয়োজন থাকবে না।

এককালে হাওড়া ক্ষুদ্রশিল্পের কারিগরদের বিশবজোড়া নাম ছিল,আজ তারা লুপ্তপ্রায়। স্বচ্ছন্দে তাদের জন্য‌ কৃষির জন্য‌ প্রয়োজনীয় কাস্তে, লাঙ্গলের মুখের মতো নানা রকম সামগ্রী তৈরি করানো যায়। তাছাড়া গৃহস্থলির প্রয়োজনীয় বঁটি, দা ,হাতার মতো খুঁটিনাটি জিনিস গ্রাম ও শহরের সত্য‌িকারের মধ্য‌বিত্তের চাহিদা তালিকায় আছে। রাজ্য‌ের বাস্তবাতার ভিত্তিতেই এই বিকল্প শিল্পায়নের সম্ভাবনা তুলে ধরা হল। এটা নিজেদের রাজ্য‌ের প্রয়োজনেই বাজার তৈরি করে দেবে।এই কৃষি প্রধান রাজ্য‌ের জমিতে সুস্থায়ী চাষ এবং তা ঘিরেই শিল্পায়নের একটা রূপরেখা রাখা হল। তবে তা কতরানোর জন্য‌ সততা ও মানসিকতার প্রয়োজন।

সূত্রঃ একক মাত্রা, সপ্তম বর্ষ, ষষ্ঠ সংখ্য‌া, সুব্রত সিংহ

কেন্দ্রীয় বাজেট ২০১৫

সংস্কার নয়, আমজনতাই লক্ষ্য

নরেন্দ্র মোদি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট আমূল সংস্কারের মাধ্য‌মে আর্থিক বৃদ্ধির দিশা দেখাবে এমনটাই মনে করা হয়েছিল। কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল সংস্কারের চেয়েও প্রাধান্য‌ পেয়েছে আমজনতার জন্য‌ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। অর্থাৎ সমাজকল্য‌াণের লক্ষ্য‌ নিয়েই অরুণ জেটলি বাজেট তৈরি করেছেন।

রানওয়েতেই দাঁড়িয়ে রইল নরেন্দ্র মোদী-অরুণ জেটলির বিমান। অর্থনীতির উড়ানের জন্য দরকার ছিল সাহসী ‘টেক-অফ’। অরুণ জেটলির আজকের বাজেটে সেই সাহসী সংস্কারেরই দেখা মিলল না। বরং এত দিন আউড়ে আসা অর্থনৈতিক দর্শন ভুলে ইউপিএ জমানার উল্টো রথেই সওয়ার হল নরেন্দ্র মোদীর সরকার।

কিন্তু সেটা করতে গিয়ে কারওরই মন পাননি অর্থমন্ত্রী। তাঁর ভীরু বাজেট না খুশি করেছে শিল্পমহলকে, না মধ্যবিত্তকে। বরং হতাশা ছড়িয়েছে সর্বত্র। আয়করে মধ্যবিত্তকে সুরাহা দেননি জেটলি। কর্পোরেট সংস্থাগুলির করের হার ৩০ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করেছেন বটে, কিন্তু সেটা ঘটবে দীর্ঘ চার বছর ধরে। এবং তার পাশাপাশি নানা রকম ছাড় তুলে নেওয়ার কথাও বলেছেন। এর ফলে আখেরে শিল্পসংস্থাগুলির উপরে করের বোঝা যে বিশেষ কমবে, তা নয়।

শিল্পমহলের উষ্মার আরও একটা কারণ, এক কোটি টাকার বেশি আয়ের ব্যক্তিদের আয়করের উপর ২ শতাংশ হারে সারচার্জ বসানো। বাজেটে কর আদায়ের নতুন কোনও রাস্তা দেখাননি জেটলি। বাড়তি যা আয় করবেন আশা করেছেন, তার অধিকাংশটাই আসবে এই পথে। শিল্পমহলের মতে, কোনও রকম উদ্ভাবনী শক্তি দেখাতে ব্যর্থ জেটলির বাজেট দিনের শেষে হিসেব-নিকেশের খাতা হয়েই থেকে গিয়েছে।

বাজেট বক্তৃতার শুরুতে জেটলি নিজেই বলেছিলেন, “গোটা বিশ্ব ভবিষ্যদ্বাণী করছে, এ বার ভারতের সামনে ওড়ার সুযোগ।” রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক, দুই মঞ্চই তৈরি ছিল। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা। নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান তৈরির জন্যই মানুষ, বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম তাঁকে ভোট দিয়েছিল। অন্য দিকে অশোধিত তেলের দামে কমতি, নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আসা মূল্যবৃদ্ধি, আমদানির খরচ কমে গিয়ে বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার ফুলেফেঁপে ওঠা, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সুদের হার কমাতে শুরু করার মতো অনুকূল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি ছিল।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

বেসরকারি লগ্নিতে বিশেষ কর ছাড় নয়

ভূমিকা

নতুন কেন্দ্রীয় সরকার সংস্কারমুখী অর্থনৈতিক কার্যক্রম গ্রহণ করে বেসরকারি ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দেবে এমনটাই মনে করা হয়েছিল। একটি মহল থেকে প্রচার করা হয়েছিল এবার করপোরেট যুগ অর্থাৎ পুঁজিবাদীদের অবাধ স্বাধীনতার যুগ শুরু হল। বাড়বে আর্থিক শৃঙ্খলা,কমবে সামাজিক দায়, আর ছাড় দেওয়া হবে করপোরেটকে। কিন্তু বাজেট সে কথা বলছে না।

এই মুহূর্তে অর্থনীতিকে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দরকার ছিল বেসরকারি লগ্নির ‘ইঞ্জিন’। বেসরকারি লগ্নি টেনে আনার জন্য বাজেটে নতুন লগ্নিতে যথেষ্ট পরিমাণে কর ছাড়ের মতো উৎসাহবর্ধক দাওয়াই ঘোষণা করতে পারতেন জেটলি। বাজারদর নিয়ন্ত্রণে আছে, এই সুযোগে রাজকোষ ঘাটতি বেশি রেখেছেন তিনি। কিন্তু সেই বাবদ হাতে থাকা টাকাটা শিল্পে কর ছাড় বা উৎসাহ ভাতা খাতে খরচ করেননি তিনি। এই পথে হাঁটলে আখেরে অর্থনীতিরই লাভ হতো। কারণ নতুন শিল্পে বিনিয়োগ এবং উৎপাদনের টানে বৃদ্ধির হার বাড়ত। জেটলির সামনে সেই সুযোগ থাকলেও তিনি তা হারালেন। তিনি টাকা ঢাললেন সামাজিক প্রকল্প খাতে। যেখান থেকে অর্থনীতির স্থায়ী উন্নতির সম্ভাবনা নেই। নরেন্দ্র মোদী সরকারের এটাই প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। গত বছর মে মাসে ক্ষমতায় আসার পর জুলাই মাসে তড়িঘড়ি বাজেট পেশ করেছিলেন জেটলি। সে বার তিনি ততটা সাহসী হতে পারেননি। সে দিক থেকে এ বারই মোদী-জেটলির সামনে আর্থিক সংস্কারের স্পষ্ট দিশানির্দেশ দেওয়ার সেরা সুযোগ ছিল। রাজনীতিকরা মনে করছেন, যে কোনও সরকারের সামনেই প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটেই সাহসী হওয়ার সেরা রাজনৈতিক সুযোগ থাকে। ভর্তুকি তুলে দেওয়ার মতো সাহসী পদক্ষেপ করতে হলে প্রথমেই করতে হয়। যত সময় যায়, ততই নানা রকম রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা পিছু টেনে ধরে। মোদী সরকারের ক্ষেত্রেও সে কথা সত্যি। আগামী বছর এপ্রিলে চারটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। পশ্চিমবঙ্গ, কেরল, তামিলনাড়ু ও অসম। এই চারটি রাজ্যেই ভাল ফল করার জন্য মরিয়া হয়ে ঝাঁপাবে বিজেপি। তার ঠিক আগে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির বাজেটে অর্থনীতির তেতো দাওয়াই প্রয়োগ করা কার্যত অসম্ভব।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার উপর জোর

মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর শিল্পমহলে সাময়িক উদ্দীপনা দেখা গেলেও নতুন লগ্নি অধরাই ছিল। নতুন কারখানা তৈরিতে শিল্পমহলের অনীহা ক্রমশ মোদী-জেটলির দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠছিল। এই পরিস্থিতিতে বেসরকারি লগ্নির জন্য ‘লাল কার্পেট’ পেতে দিতে পারতেন জেটলি। তা তিনি করতে পারেননি। তার বদলে তিনি সরকারের হাতে আরও টাকা রেখেছেন। সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে আর্থিক বৃদ্ধির উপরে ভরসা রেখেছেন। পরিকাঠামোয় খরচ করার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার হাতে টাকা তুলে দেওয়ার বন্দোবস্ত করেছেন। এটা ঠিক যে পরিকাঠামো খাতে প্রত্যাশিত বেসরকারি লগ্নি আসছে না। কিন্তু তথ্য বলছে, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির হাতে এখনই দু’লক্ষ কোটি টাকারও বেশি নগদ মজুত রয়েছে। তা সত্ত্বেও তারা হাত গুটিয়ে বসে রয়েছে। আরও বেশি টাকা হাতে এলে তারা কী ভাবে খরচ করবে, সেই প্রশ্নও উঠেছে। অনেকে মনে করছিলেন, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নিকরণের মতো সদর্থক নীতির দেখা মিলবে বাজেটে। ঠিক যে ভাবে বাজপেয়ী জমানায় অরুণ শৌরিকে মন্ত্রী করে আলাদা বিলগ্নীকরণ মন্ত্রক তৈরি হয়েছিল। বেসরকারিকরণের কথা জেটলি বলেছেন ঠিকই। কিন্তু তা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার শেয়ার বেচে টাকা তুলতে। বেসরকারিকরণের পথে হাঁটতে নীতিগত ভাবে পারেননি।

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ বলেছেন, “জেটলির ভাগ্য তাঁর প্রতি সদয় ছিল। অশোধিত তেলের দাম কমে যাওয়ার মূল্যবৃদ্ধি কমে এসেছিল। আমি আশা করেছিলাম, এই অনুকূল সময়টাকে তিনি অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে একটা বড় মাপের কার্যকর নিখাদ ধাক্কা দেবেন। কিন্তু তা হয়নি।” বাজেটে যে নতুন করের রাস্তা তৈরি হয়নি, তিনি তার দিকেও আঙুল তুলেছেন। জেটলি জানান, অতি-ধনীদের আয়করের উপর সারচার্জ বসিয়ে যে আয় হবে, তার পুরোটাই কেন্দ্রের রাজকোষে থাকবে। রাজ্যগুলির সঙ্গে ভাগ করে নিতে হবে না।

জেটলির ব্যাখ্যা, চতুর্দশ অর্থ কমিশনের সুপারিশ মেনে রাজ্যগুলির হাতে নিজস্ব আয়ের প্রায় ৬২ শতাংশ তুলে দিতে হচ্ছে। তাই এমনিতেই তাঁর হাতে অর্থ কমে এসেছিল। তা-ও তিনি রাজকোষ ঘাটতি লাগামছাড়া হতে দেননি। চলতি বছরেও ৪.১ শতাংশের রাজকোষ ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে চলেছেন। তবে নতুন অর্থবর্ষে আর্থিক শৃঙ্খলা কিছুটা শিথিল করে হাতে বেশি টাকা রাখার সুযোগ তৈরি করেছেন। যাতে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে সরকারি ব্যয় বাড়ানো যায়। আর্থিক শৃঙ্খলা আইন অনুযায়ী আগামী দু’বছরে রাজকোষ ঘাটতি ৩ শতাংশে কমিয়ে আনার কথা। জেটলি দু’বছরের বদলে তিন বছরে সেই ঘাটতি লক্ষ্যমাত্রা ছোঁবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জেটলি হয়তো শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন যে, চলতি বছরে ঘাটতি বাড়লে আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সিগুলি বিরূপ মনোভাব নিতে পারে। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শিল্পমহলকে কর ছাড় বা উৎসাহ ভাতা দিতে গিয়ে কেন্দ্রের আয়-ব্যয়ের ফারাক বা রাজকোষ ঘাটতি বাড়লেও ক্ষতি ছিল না। রেটিং এজেন্সিগুলি যদি বুঝত মোদী সরকার আর্থিক সংস্কারের পথে বদ্ধপরিকর, তা হলে ঘাটতি বাড়লেও তারা ভারতের অর্থনীতি সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব নিত না।

রাজনীতিকরা মনে করাচ্ছেন, বাজেট প্রস্তুতিপর্বে অধিকাংশ কেন্দ্রের অর্থনৈতিক উপদেষ্টারা যুক্তি দেন, কেন্দ্র রাজকোষ ঘাটতির কথা ভুলে গিয়ে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির কথা ভাবুক। রাজ্যগুলিকেও রাজকোষ ঘাটতি শিথিলের সুযোগ দেওয়া হোক। তাই রাজকোষ ঘাটতি বাড়ালে রাজ্যগুলিরও সমর্থন পেতেন জেটলি। কিন্তু তিনি সেই ছক ভাঙার সাহস দেখাতে পারেননি। নতুন ট্রেন ঘোষণা না-করে রেল বাজেটে যে সাহস দেখিয়েছিলেন সুরেশ প্রভু।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

কৃষিতে বরাদ্দ ৮ লক্ষ ৫০ হাজার কোটি

প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটেই কৃষকদের সুখবর শোনালেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি৷ আগামী অর্থবর্ষে কৃষিখাতে ঋণের পরিমাণ এক ধাক্কায় ৫০ হাজার কোটি থেকে বাড়িয়ে আট লক্ষ ৫০ হাজার কোটি করার সিদ্ধান্ত নিলেন অর্থমন্ত্রী৷

প্রধানত কৃষি উত্পাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রক৷ শনিবার সংসদে বাজেট প্রস্তাব পেশ করতে গিয়ে শুরুতেই অর্থমন্ত্রী বলেন, কৃষিখাতে উত্পাদনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে৷ এর পরই বাজেট বরাদ্দে ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর কথা ঘোষণা করেন তিনি৷ সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং মাটির গুণগতমান বাড়ানোর উপরেও বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন জেটলি৷ তিনি বলেন, "কৃষি ক্ষেত্রে আমাদের দেশের পরিশ্রমী কৃষকরা যাতে তাঁদের কাজের উপযুক্ত প্রাপ্য পান সে বিষয়ে আমাদের নজর রাখতে হবে৷ সেই কারণেই ২০১৫-১৬ অর্থবর্ষে কৃষিক্ষেত্রে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা আট লক্ষ ৫০ হাজার কোটি করার প্রস্তাব করছি৷" এতদিন পর্যন্ত কৃষকরা সাত শতাংশ হারে তিন লক্ষ টাকা পর্যন্ত শষ্য খাতে ঋণ পেতে পারতেন৷ সময়ের মধ্যে যাঁরা ঋণ পরিষোধ করতেন তাঁদের ক্ষেত্রে সুদের হার চার শতাংশ ধার্য করা হত৷ অর্থমন্ত্রী হিসেব দিয়েছেন চলতি অর্থবর্ষের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাঙ্কগুলি তিন লক্ষ ৭০ হাজার কোটি টাকা কৃষি খাতে ঋণ দিয়েছে৷ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষিজীবীদের জন্য ঋণ যাতে আরও সুলভ হয় তার উপরেও আরও জোর দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী৷ তিনি বলেন, "আগামী অর্থবর্ষে গ্রামীণ পরিকাঠামো উন্নয়ন তহবিল আরআইডিএফ-কে  ২৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করার জন্য প্রস্তাব করছি৷ ‘নাবার্ড'-এর জন্য এই অর্থ ব্যয় করা যেতে পারে৷"

পাশাপাশি গ্রামীণ অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ খাতে তহবিল নির্মানে ১৫ হাজার কোটি এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণ খাতে ৪৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল নির্মাণের প্রস্তাব করেন৷ মাটির গুণগত মান উন্নয়ন এবং সেচ ব্যবস্থার উপরেও বিশেষ জোর দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী৷ পরম্পরা কৃষিবিকাশ যোজনা এবং প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সিঁচাই যোজনা খাতে অর্গানিক কৃষিক্ষেত্র ও খামার নির্মাণের উপরেও বাজেট প্রস্তাবে বিশেষ জোর দিয়েছেন তিনি৷ রাজ্যগুলির কাছেও এ ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতার আহ্বান জানান জেটলি৷ প্রতিবিন্দু জলের ব্যবহারে যাতে আরও বেশি পরিমাণ শষ্য উত্পাদন করা যায় সেদিকে নজর রাখতে বলেছেন অর্থমন্ত্রী৷ ‘পার ড্রপ মোর ক্রপ', এটাই কেন্দ্রের প্রাথমিক লক্ষ্য হবে, বলেছেন জেটলি৷ কৃষিক্ষেত্র যাতে আরও বৃদ্ধি করা যায় তার উপরেও জোর দিয়েছেন তিনি৷

সূত্র : সংবাদ প্রতিদিন, ১ মার্চ ২০১৫

১০০ দিনে বরাদ্দ বৃদ্ধি

পশ্চিমবঙ্গকে বিশেষ অর্থিক অনুদান দেওয়ার কথা ঘোষণা করলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী৷ এই সুবিধা পাবে বিহারও৷ এদিন শনিবার বাজেট পেশের সময় কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি বলেন, নতুন রাজ্য হিসাবে তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্রপ্রদেশকে বিশেষ আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয়েছে৷ সেই একইরকম সুবিধা পাবে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারও৷ পাশাপাশি, অর্থমন্ত্রী ১০০ দিনের কাজে বরাদ্দ বৃদ্ধির কথাও বলেছেন৷ উল্লেখ্য, দিনকয়েক আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে চিঠি দিয়ে বাংলার ঋণ মুকুবের আর্জি জানিয়েছিলেন৷ এমনকী মুখ্যমন্ত্রী তাঁর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে সময়ও চান৷ তারপরই কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি ফোন করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে৷ বলেন, আর্থিক ঋণ মুকুবের বিষয়টি  নিয়ে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতে প্রস্তুত কেন্দ্র৷

কয়েকদিন আগে বিশ্ববাণিজ্য সম্মেলনের অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, "রাজনীতি রাজনীতির জায়গায়৷ উন্নয়ন উন্নয়নের  জায়গায়৷ উন্নইনের সঙ্গে রাজনীতিকে কোনওভাবেই মেলানো হবে না৷" এদিন অর্থমন্ত্রী বাজেট পেশের পর বাংলা এবং বিহারের জন্য এই বিশেষ আর্থিক ঘোষণা সেই পদক্ষেপরই বাস্তবায়ন মনে করছে রাজনৈতিক মহল৷ ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, বাংলা এবং কেরল বিশেষ কর ছাড়ের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পাচেছ৷ বাংলার কাঁধে যে বিপুল অঙ্কের ঋণের বোঝা রয়েছে তার সিংহভাগই বিগত বাম জমানার৷ অন্যদিকে, ইউপিএ সরকারের আমলেও আর্থিক বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে রাজ্যকে৷ এই অবস্থায় নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করেই আয় বাড়িয়েছে রাজ্য৷ সেদিক থেকে কেন্দ্রের এই ঘোষণা তাত্পর্যপূর্ণ৷

এদিন বাজেটে ঘোষণা হয়, গরিবদের জন্য অটল পেনশন যোজনার সরকার দেবে হাজার টাকা, পেনশনভোগী দেবেন হাজার টাকা৷ ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে অ্যাকাউণ্ট খুলতে হবে৷ ৩৩০ টাকা দিলেই খোলা যাবে প্রধানমন্ত্রী বিমা যোজনা৷ দারিদ্রসীমার নিচে থাকা মানুষদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার কথা বলা হল৷ মহিলাদের সুরক্ষার জন্য বিশেষ বরাদ্দ৷ নির্ভয়া তহবিলে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ৷ পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু, হিমাচল প্রদেশ-সহ দেশে পাঁচটি এইমস তৈরি করা হবে৷ স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ২২ হাজার ৪০০ কোটি বরাদ্দ৷ স্বাস্থ্যবিমায় ১৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২৫ হাজার এবং প্রবীণদের জন্য ৩০ হাজার৷ দরিদ্রদের জন্য ইপিএফ এবং ইসিএস বাধ্যতামূলক নয়৷ তাঁদের জন্য বিশেষ প্রকল্প৷

সূত্র : সংবাদ প্রতিদিন, ১ মার্চ ২০১৫

লগ্নি এলে বাড়তি সুবিধা, রাজ্যকে চ্যালেঞ্জ জেটলির

বাজেট বক্তৃতায় কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি তখন বলছেন, “চতুর্দশ অর্থ কমিশনের সুপারিশ থেকে সর্বাধিক লাভবান হতে চলেছে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ। তা সত্ত্বেও পূর্বের রাজ্যগুলিকে আরও দ্রুত বৃদ্ধির সুযোগ করে দেওয়া দরকার। তাই অন্ধ্রপ্রদেশকে যে রকম বিশেষ সহায়তা দেওয়া হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারকে ঠিক সেই রকম বিশেষ সহায়তার প্রস্তাব করছি।”

শুনে আশ্বস্ত হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলবল। তাঁদের ধারণা ছিল, নগদ টাকা আসতে চলেছে রাজ্যের কোষাগারে। বিশেষত যখন আর্থিক সুরাহার দাবি নিয়েই ক’দিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠক করতে আসার কথা ঘোষণা করে দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। অচিরেই সেই ‘ভুল’ ভাঙে।

বাজেটের পরে জেটলি জানান, পশ্চিমবঙ্গে নতুন শিল্প বা উৎপাদন ইউনিট স্থাপনের জন্য অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ করে ‘ইনভেস্টমেন্ট অ্যালাওয়েন্স’ ও যন্ত্রাংশ রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ‘ডেপ্রিসিয়েশন অ্যালাওয়েন্স’ দেওয়া হবে। আগামী অর্থবর্ষ থেকে শুরু করে আগামী পাঁচ বছর এই সুবিধে পাবে দুই রাজ্য। এই ব্যাখ্যা শুনেই সম্বিত ফেরে তৃণমূল সাংসদদের। তাঁরা বুঝতে পারেন, মমতার ব্যাটের মুখে মোক্ষম গুগলি ফেলেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী। কারণ, একে তো এই সহায়তায় নগদ টাকার কোনও গল্প নেই। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে কোনও সংস্থা বিনিয়োগ করলে সে ক্ষেত্রেই ওই অ্যালাওয়েন্সের প্রশ্ন উঠছে। তা পাবে সংশ্লিষ্ট শিল্প সংস্থা। এক দিক দিয়ে দেখলে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হাতে শিল্প গড়ার অস্ত্রই তুলে দিয়েছেন জেটলি। কিন্তু সমস্যা হল, তৃণমূল সরকারের জমি ও সামগ্রিক নীতির কারণে এই রাজ্যের থেকে আগেই মুখ ফিরিয়েছেন অধিকাংশ নতুন বিনিয়োগকারী।

এই মর্মার্থ উপলব্ধি করেই চুপসে যান তৃণমূল সাংসদেরা। রাজ্যসভায় তৃণমূলের দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েনকে বলতে শোনা যায়, “বিহার বা বাংলাকে কোনও প্যাকেজই দেননি অর্থমন্ত্রী। সবটাই বুজরুকি। প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম অন্ধ্রের মতো সাড়ে আটশো কোটি টাকা পাবে পশ্চিমবঙ্গ। যদিও সেই টাকাটাও পশ্চিমবঙ্গের দাবির তুলনায় কম। এখন ভাল করে বাজেটটা দেখার পর বুঝতে পারছি, কেন্দ্রের চালাকিতে সেটুকু টাকাও পাওয়া যাবে না।”

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

হতাশ নন মুখ্য‌মন্ত্রীরা

তাৎপর্যপূর্ণ হল, ডেরেকের মতো এমন হতাশ প্রতিক্রিয়া দেননি বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার। বিশেষ আর্থিক সহায়তার অঙ্গীকারের পাশাপাশি বিহারে অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস (এইমস)-এর মতো একটি প্রতিষ্ঠান গড়ার ঘোষণা হয়েছে আজকের বাজেটে। যা শুনে নীতীশ আজ বলেছেন, “রাজ্য পুনর্গঠনের পর স্বাভাবিক নিয়মে বিহারের যা পাওয়া উচিত ছিল, বাজেটে তা-ই দেওয়া হয়েছে। এটা ইতিবাচক।” তিন দিন আগে জেটলির বাসভবনে গিয়ে তাঁর সঙ্গে নৈশভোজ করেছিলেন নীতীশ। তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্র বলছে, কেন্দ্রের কাছ থেকে এটুকুও যে তিনি আদায় করতে পেরেছেন, সেটাই রাজনৈতিক ভাবে তুলে ধরতে চাইছেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী। একই মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের। তাঁরা মনে করছেন, অর্থমন্ত্রীর ঘোষণার নেপথ্যে যত না অর্থনৈতিক উন্নতির তাড়না রয়েছে, তার চেয়ে বেশি নিহিত রয়েছে রাজনীতি। চতুর্দশ অর্থ কমিশনের সুপারিশ প্রকাশের পরেই জেটলি বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের ঋণের সমস্যা থাকবেই। কারণ, কমিশনের সুপারিশেই বলা হয়েছে, রাজ্যের মোট ঋণের মধ্যে কেন্দ্রীয় ঋণের পরিমাণ খুব সামান্য। বরং ক্ষুদ্র আমানতকারীদের থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ বেশি। তাই ঋণ পুনর্গঠন করার জায়গা খুবই সীমিত। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার কথা মেনে নিয়েও জেটলি সে দিন এবং আজ এই বার্তাই তুলে ধরতে চেয়েছেন যে, অর্থ কমিশনের সুপারিশের প্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গকে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা অনুদান দেওয়া হচ্ছে। কয়লা খনি নিলামের মাধ্যমেও রাজ্যের কোষাগারে যে বিপুল অর্থ আসছে। জেটলির বক্তব্য, এর পরেও প্রধানমন্ত্রী পূর্বের রাজ্যগুলির শ্রীবৃদ্ধি ঘটাতে চান। তাই আগ বাড়িয়ে বিশেষ সহায়তার কথা বলা হল। আর এখানেই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী আসলে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির প্রভাব বিস্তারের জমি তৈরি করে রাখলেন। এর পরেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ টানতে সফল না হলে বা কর কাঠামোর সংস্কার করে আর্থিক শৃঙ্খলা কায়েম করতে না পারলে সেটাই হবে বিজেপির অস্ত্র। দেরিতে হলেও সেই কৌশল আঁচ করেছে তৃণমূলও। বিকেল থেকে তাদের দুই কক্ষের নেতারাই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। লোকসভার সাংসদ সৌগত রায় বলেন, “অর্থমন্ত্রী গোটা দেশকে বিভ্রান্ত করছেন। বারবার বলছেন, কেন্দ্র বাড়তি অর্থ দিচ্ছে। অথচ ঘটনা হল, আগে ৬১.৮৮ শতাংশ টাকা দিত কেন্দ্র। এখন দেবে ৬২ শতাংশ। বাড়তি অর্থের প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে?” অন্য দিকে ডেরেক বলেন, “চতুর্দশ অর্থ কমিশনের সুপারিশ মেনে রাজ্যকে যেমন অনুদান দিয়েছে কেন্দ্র, তেমনই মাছের তেলে মাছ ভাজার ব্যবস্থাও করেছে। কেন্দ্রীয় অনুদানে চলা ১৫টি প্রকল্পে এ বার টাকা বন্ধ করে দিতে চলেছে তারা। পরিবর্তে ওই সব প্রকল্পে রাজ্যকে খরচ করতে বলছে। এর মধ্যে যেমন পিছিয়ে পড়া এলাকার উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে, তেমনই রয়েছে পুলিশের আধুনিকীকরণ, মডেল স্কুল নির্মাণ, পর্যটন পরিকাঠামো নির্মাণ ইত্যাদি।”

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

পশ্চিমবঙ্গের দাবি সম্পর্কে

প্রকাশ্যে সমালোচনা করলেও ঘনিষ্ঠ মহলে পশ্চিমবঙ্গের সরকারের ওপর ক্ষোভই জানিয়েছেন তৃণমূল সাংসদদের একাংশ। তাঁদের মতে, বাজেটের আগে নীতীশ ছাড়াও অন্ধ্র, ওড়িশা, কর্নাটকের মতো অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বা অর্থমন্ত্রীরা জেটলির সঙ্গে দেখা করেছিলেন। কেন্দ্রের কাছে নিজেদের রাজ্যের দাবি-দাওয়া পেশ করেছিলেন তাঁরা। আজকের বাজেটে সেই সব রাজ্যের জন্য কোথাও নতুন বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র, কোথাও হাসপাতাল, কোথাও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রকের একটি সূত্রই জানাচ্ছে, নীতীশের সঙ্গে জেটলির নৈশভোজ-বৈঠকের সময় বাজেটের নথি ছাপতে চলে গিয়েছিল। তা সত্ত্বেও জেটলি এই বিশেষ আর্থিক সহায়তার বিষয়টি তাঁর বাজেট বক্তৃতায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন।

অথচ এই উদ্যোগটাই দেখা যায়নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর অনুগত অর্থ ও শিল্পমন্ত্রী অমিত মিত্রের মধ্যে। অমিতবাবু আজ বলেছেন, “অন্ধ্রকে ৮৫০ কোটি টাকার মতো প্যাকেজ দিয়েছিল কেন্দ্র। যদি ওই টাকা দেয়, তা দুই রাজ্যের মধ্যে ভাগ হবে। যা নামমাত্র।” অথচ বাজেটের আগে দিল্লিতে অর্থমন্ত্রীদের বৈঠক এড়িয়ে গিয়েছিলেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী। রাজ্যের বিরোধীদের বক্তব্য, মমতাও যে এখন মোদীর সাক্ষাৎ চাইছেন, সেটা সারদা নিয়ে প্যাঁচে পড়ে। মাত্র ক’দিন আগেও নীতি আয়োগের বৈঠক বয়কট করেন তিনি। অর্থ মন্ত্রকের এক আমলার মতে, এ সবেরই হাতেনাতে ফল পেল পশ্চিমবঙ্গ। তাই এ বারের বাজেটে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে পশ্চিমবঙ্গের প্রাপ্তি কার্যত শূন্য। রাজ্যের হতাশ শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, “পশ্চিমবঙ্গ মেধার পীঠস্থান। এই রাজ্যের উন্নয়নের স্বার্থেই পশ্চিমবঙ্গে আরও কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উৎকর্ষ কেন্দ্র গড়ে তোলা দরকার।”

গত জুলাইয়ে কল্যাণী-সহ চারটি নতুন এইমস-এর জন্য ৫০০ কোটি বরাদ্দ করেছিল কেন্দ্র। তার এক পয়সাও খরচ করতে পারেনি পশ্চিমবঙ্গ। এ দিন নতুন ও পুরনো এইমস মিলিয়ে যে ১৭৫৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব হয়েছে, তাতে কল্যাণীর জন্যও টাকা ধরা হয়েছে। কিন্তু জমি-জটে জেরবার রাজ্য এ বারেও কিছু করতে পারবে কি না, স্বাস্থ্য দফতরের কর্তারাই সংশয়ে। রাজ্যের স্বাস্থ্যসচিব মলয় দে বলেন, “কল্যাণীতে ১৫০ একরের দু’টি জমি পছন্দ করে দিল্লিকে জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রকের টেকনিক্যাল টিম এবং এক জন যুগ্মসচিব জমি দেখেও গিয়েছেন। তার পর ওঁরা কিছু জানাননি। জানালেই জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু হবে।” তবে রাজ্যের শিক্ষা-স্বাস্থ্য অধিকর্তা সুশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, “আগে কল্যাণীটা চালু হোক। এইমস-এর মতো নতুন কোনও হাসপাতালের কথা ভাবছি না।”

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

বাজেটে দিলেন যা, নিলেন আরও বেশি

প্রত্যাশা ছিল মধ্যবিত্তকে একটু হাঁফ ছাড়ার সুযোগ দিতে করহীন আয়ের সীমা বাড়াবেন অরুণ জেটলি। নিদেন পক্ষে কিছুটা বাড়াবেন সঞ্চয়ে করছাড়ের সুযোগ। কিন্তু আদপে বাজেটে যা দিলেন, হয়তো তার থেকে বেশিই ফিরিয়ে নিলেন তিনি!

কারণ, হাতে গোনা গোটাকয়েক ক্ষেত্র ছাড়া আয়করে বাড়তি ছাড় সে ভাবে নেই। দুই শতাংশ বাড়তি সারচার্জ চেপেছে কোটিপতিদের উপর। তার উপর বেড়েছে পরিষেবা করের হার। ফলে রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়া থেকে শুরু করে পাঁচশো টাকার বেশি দামের জলসার টিকিট কেনা অনেক কিছুতেই বেশি টাকা গুনতে হবে সাধারণ মানুষকে।

আয়করের হার বা ধাপ কোনওটাই বদলায়নি। যে রোজগারে যেমন কর বসত, তা অপরিবর্তিতই রেখেছেন অর্থমন্ত্রী। তবে পেনশন ফান্ড ও নতুন পেনশন প্রকল্পে (নিউ পেনশন স্কিম বা এনপিএস) এখন দেড় লক্ষ টাকা পর্যন্ত রাখলে করছাড়ের সুযোগ মিলবে। আগে এই সীমা ছিল এক লক্ষ টাকা। এনপিএসে বাড়তি ৫০ হাজার টাকার উপর করছাড় মিলবে ৮০সিসিডি ধারায়। সেই সঙ্গে বেড়েছে স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়ামে করছাড়ের সুবিধা। এখন ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রিমিয়ামে করছাড় মেলে। এ বার তা পাওয়া যাবে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। প্রবীণ (৬০ বছরের বেশি) নাগরিকরা ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রিমিয়ামে ছাড় পান। তা বেড়ে হচ্ছে ৩০ হাজার টাকা। যে সমস্ত অতি প্রবীণ নাগরিকের (৮০ বছরের বেশি) স্বাস্থ্য বিমা নেই, বছরে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা খরচে করছাড় পাবেন তাঁরা। প্রবীণদের ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু চিকিৎসার খরচের জন্য করছাড়ের সুবিধা ৬০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৮০ হাজার টাকা করা হয়েছে। বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে প্রতিবন্ধীদেরও।

বেতনে যে পরিবহণ ভাতার উল্লেখ থাকে, আগে সেই বাবদ মাসে ৮০০ টাকা করের আওতার বাইরে থাকত। সেই অঙ্ক দ্বিগুণ করে ১,৬০০ টাকায় নিয়ে গিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

এই পর্যন্ত যদি প্রাপ্তির তালিকা হয়, ‘কেড়ে নেওয়া’র ফর্দ তবে আরও লম্বা। বছরে যাঁদের আয় এক কোটি টাকা বা তার বেশি, তাঁদের উপর অতিরিক্ত ২% সারচার্জ চাপিয়েছেন জেটলি। পেট্রোল-ডিজেলের দাম কমার সুযোগে তার উপর বসানো উৎপাদন শুল্ককে বদলে দিয়েছেন রোড সেস-এ। এমনকী জানিয়েছেন যে, প্রয়োজনে কিছু বা সব পরিষেবার ওপর ২% হারে স্বচ্ছ ভারত সেস বসানোর দরজা খোলা রাখছেন তিনি।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

মধ্য‌বিত্তের খরচ বাড়ছে

আগামী অর্থবর্ষের গোড়াতেই পণ্য-পরিষেবা কর চালু করার কথা ঘোষণা করেছেন জেটলি। তার সঙ্গে সাযুজ্য রেখে পরিষেবা করের হার বাড়িয়ে করেছেন ১৪%। অর্থাৎ মোবাইল ফোনের বিল, রেস্তোরাঁয় খাওয়ার খরচ, বাড়িতে বৈদ্যুতিন সামগ্রীর মেরামতি থেকে শুরু করে প্রায় সমস্ত পরিষেবা পেতেই গুনতে হবে বাড়তি কড়ি।

সেই সঙ্গে বেড়েছে পরিষেবা করের পরিধিও। ওয়াটার পার্ক, থিম পার্ক বা বিনোদন পার্কের টিকিটে পরিষেবা কর বসছে। গান বা জলসার টিকিট পাঁচশো টাকার বেশি হলে, পরিষেবা কর চাপবে তার উপরেও। ওই করের জেরে দাম বাড়বে লটারির টিকিট, মিউচুয়াল ফান্ড এজেন্টের পরিষেবা ইত্যাদির। কিছু ক্ষেত্রে বাড়তে পারে ফোনের বিলও। ফলে সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে কর বাঁচানোর যেটুকু সুযোগ মধ্যবিত্তরা পেয়েছেন, তাঁদের খরচ বাড়ছে আরও বেশি।

গত বাজেটে করহীন আয়ের ঊর্ধ্বসীমা দু’ লক্ষ থেকে বাড়িয়ে আড়াই লক্ষ টাকা করেছিলেন জেটলি। সঞ্চয়ে ৮০ সি ধারা এবং গৃহঋণের সুদেও ৫০ হাজার টাকা করে ছাড়ের সুযোগ বাড়িয়েছিলেন তিনি। অর্থমন্ত্রীর দাবি, তিনি সঞ্চয়ের প্রবণতা বাড়াতে চান। এবং তাঁর দুই বাজেটের দাওয়াইয়ে মোট ৪,৪৪,২০০ টাকা আয়ে করছাড়ের সুবিধা পেতে পারেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু বিরোধী-সহ অনেকেরই প্রশ্ন, ওই সুবিধা পেতে জীবনবিমা, স্বাস্থ্য বিমা, পেনশন প্রকল্পে এত টাকা কোথা থেকে ঢালবেন সাধারণ মধ্যবিত্ত? বছরে আয় ৮ লক্ষ টাকা হলেও, সাড়ে চার লক্ষ টাকা সঞ্চয় করা বেশ শক্ত।

কংগ্রেস নেতা দীপেন্দ্র হুডার অভিযোগ, “জেটলিও জানেন অধিকাংশ মধ্যবিত্তের পক্ষে এটি করা সম্ভব নয়। কারণ, গৃহঋণে ২ লক্ষ টাকা সুদ বাবদ করছাড় পেতে বার্ষিক কিস্তিই হতে হবে অন্তত তিন লক্ষ টাকা। তার উপর পিএফ-পিপিএফ-পেনশন-বিমায় অত টাকা ঢালতে গেলে মানুষ খাবেন কী?”

এই ক্ষোভের কথা বিলক্ষণ আঁচ করেছেন জেটলিও। যে কারণে তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যার সাড়ে তিন থেকে চার শতাংশ করদাতা। সরকারের হাতে পর্যাপ্ত টাকাও নেই। ইঙ্গিত স্পষ্ট, ইচ্ছে থাকলেও হাত-পা বাঁধা থাকায় এই মুহূর্তে মধ্যবিত্তদের করছাড়ের বাড়তি সুবিধা দিতে পারলেন না তিনি।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

রাজকোষ ঘাটতি লাগামের মধ্যে

রাজকোষ ঘাটতি লাগামের বাইরে যেতে দিলেন না। এবং তা করতে গিয়ে তাঁকে কোপ মারতে হল খরচে। একে আয় বাড়েনি। তার উপর সাহস দেখানো যায়নি সে ভাবে ভর্তুকি ছাঁটাইয়ে। আর এই সব কিছুর ফসল হিসেবেই সংস্কারমুখী সাহসী বাজেটের অঙ্ক মেলাতে হিমসিম খেলেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর অর্থমন্ত্রীর বাজেটকে ‘প্রগতিশীল, ইতিবাচক, বাস্তববাদী ও বিচক্ষণ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন, বাজেট সে ভাবে সাহসী হতে পারল কই? প্রশ্ন উঠেছে, বাজেটে আয়-ব্যয়ের হিসেবে শেষমেশ কতখানি বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে পেরেছেন জেটলি?

চলতি অর্থবর্ষে কর আদায় বিশেষ হয়নি। মাঝ বছরের অর্থনৈতিক পর্যালোচনাতেই দেখা গিয়েছিল, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় কম হওয়ার আশঙ্কা। তা সত্ত্বেও জেটলি রাজকোষ ঘাটতিকে ৪.১ শতাংশে বেঁধে রাখার চ্যালেঞ্জ থেকে সরেননি। সেই লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই খরচ ছাঁটাই করতে হয়েছে তাঁকে।

অথচ খরচ কমানোর বেশি পথও তাঁর সামনে খোলা ছিল না। বেতন-পেনশন বাবদ পরিকল্পনা বহির্ভূত ব্যয় কমানো সম্ভব নয়। তাই কোপ পরিকল্পনা ব্যয়ে। দেখা যাচ্ছে, গত বাজেটে ওই খাতে ৫ লক্ষ ৭৫ হাজার কোটি টাকা খরচ করার কথা বলা হয়েছিল। সেখানে গ্রামোন্নয়ন, স্বাস্থ্য-পরিকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এ বার খরচ ছাঁটাই হয়েছে এক লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। সব মিলিয়ে প্রায় ১ লক্ষ ১০ হাজার কোটি টাকা কম বরাদ্দ করেছেন জেটলি। অথচ পরিকল্পনা বহির্ভূত খাতে এক লক্ষ কোটি টাকা বাড়তি বরাদ্দ করতে হয়েছে তাঁকে।

এই অর্থবর্ষে রাজকোষ ঘাটতি ৪.১ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে বেঁধে রাখতে পারলেও রাজস্ব ঘাটতি সে ভাবে কমাতে পারেননি জেটলি। ২.৯% থেকে কমিয়ে আগামী বছর তা ২.৮% করার লক্ষ্য নিয়েছেন। তা-ও এই দুই ঘাটতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে তাঁকে সহায়তা করেছে নতুন হিসেবে বেড়ে যাওয়া জিডিপি (মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন)।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

আর্থিক শৃঙ্খলায় জোর

আর্থিক শৃঙ্খলা আইন অনুযায়ী, আগামী অর্থবর্ষে রাজকোষ ঘাটতি ৩.৬ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা ছিল। পরের বছর ৩ শতাংশে। কিন্তু জেটলি এ দিন জানিয়েছেন, নতুন বছরে (২০১৫-’১৬) ৩.৯%, তার পরের বছর (২০১৬-’১৭) ৩.৫% এবং তৃতীয় বছরে (২০১৭-’১৮) ঘাটতি ৩ শতাংশে কমিয়ে আনবেন। তাঁর যুক্তি, চতুর্দশ অর্থ কমিশনের সুপারিশ মেনে রাজ্যের হাতে বেশি অর্থ তুলে দিতে হয়েছে। তার উপর বৃদ্ধির হার বাড়াতে রয়েছে পরিকাঠামোয় বিপুল সরকারি লগ্নির বাধ্যবাধকতা। ফলে সরকারের হাতে টাকা রাখতে চেয়েছেন তিনি। সেই কারণেই একটু বেশি সময় রেখেছেন রাজকোষ ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে। কিন্তু এই বাবদ হাতে আসা বাড়তি টাকা শিল্পের প্রয়োজনে খরচ করার সাহস দেখাননি তিনি। উৎসাহ ভাতা বা বাড়তি সুবিধা দেননি শিল্পকে। বরং মন দিয়েছেন সামাজিক প্রকল্পগুলিতে। প্রশ্ন উঠেছে, পরিকল্পনা খাতেই যদি অর্থ বরাদ্দ কমে, তবে কী ভাবে বৃদ্ধির হার বাড়বে? যেখানে পরিকাঠামো বা সম্পদ গড়তে সরকারি বিনিয়োগ আসে ওই টাকা থেকে। জেটলির যুক্তি, রাজ্যগুলির হাতে যাওয়া বাড়তি অর্থ উন্নয়নে ব্যয় হবে। ফলে বাড়বে বৃদ্ধির হার। একই সঙ্গে জানিয়েছেন, পেট্রোল-ডিজেলের উপর বসানো বাড়তি শুল্ক থেকে পাওয়া টাকাও মূলত কাজে লাগানো হবে পরিকাঠামো গড়তে। পরিকাঠামো তৈরিতে ৭০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি ব্যয় হলে অর্থনীতির চাকায় পুরোদস্তুর গতি ফিরবে বলে দাবি করেছেন তিনি। রাজস্ব আদায় বাড়ানোর নতুন রাস্তা খুঁজে বার করতে পারেননি জেটলি। এই অর্থবর্ষে কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ৬৯ হাজার কোটি টাকা আয় কম হতে চলেছে। আগামী বছরও তাই মাত্র ১০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি আয়ের লক্ষ্য স্থির করেছেন তিনি। যার বেশির ভাগটাই আসবে কোটিপতিদের আয়করের উপর বাড়তি ২% সারচার্জ বসিয়ে। ভর্তুকির ক্ষেত্রেও খুব বেশি রাশ টানতে পারেননি। বাজেটের হিসেব বলছে, আগামী অর্থবর্ষে ভর্তুকির বহর কমবে মাত্র ২৬ হাজার কোটি টাকা। যার বেশিরভাগটাই তেলের দাম কমার সুফল। কারণ, খাদ্য বা সারের পিছনে ভর্তুকির বহরে বিশেষ হেরফের হয়নি। জেটলি জানিয়েছেন, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, আধার নম্বর ও মোবাইল মারফত নগদ ভর্তুকি পৌঁছে দিয়ে ভর্তুকির অপচয় বন্ধ করতে চান তিনি। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নিকরণ থেকেও আগামী বছর ঘরে তুলতে চান ৬৯,৫০০ কোটি। জেটলি জানিয়েছেন, বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর সামনে পাঁচটি চ্যালেঞ্জ ছিল। কৃষিতে আয় বাড়ানো, পরিকাঠামোয় লগ্নি আনা, কারখানায় উৎপাদন বাড়ানো, রাজ্যকে বাড়তি অর্থ জোগাতে গিয়ে নিজের টাকা কমে যাওয়ার সমস্যা যোঝা এবং রাজকোষ ঘাটতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। এর মধ্যে সম্ভবত সবথেকে গুরুত্ব পেয়েছে পরিকাঠামো। কিন্তু সেখানেও বাজপেয়ী জমানার ধাঁচে বড় মাপের সড়ক বা রেল প্রকল্পের ঘোষণা শোনা যায়নি। তহবিল তৈরি করে, করছাড়ের সুবিধাযুক্ত বন্ড চালু করে পরিকাঠামোয় বাড়তি অর্থ জোগানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। বাস্তবে তার ফল কেমন মিলবে, সেই প্রশ্ন কিন্তু রয়েই গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর স্বপ্নের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্পকে সফল করতে নানা রকম সুবিধার কথা ঘোষণা করেছেন জেটলি। কারখানার জন্য দক্ষ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীর জোগান নিশ্চিত করতে টাকা ঢেলেছেন ‘স্কিলিং ইন্ডিয়া’র পিছনেও। জেটলির দাবি, তাঁর বাজেটে বৈপ্লবিক ভাবে ব্যবসা ও বিনিয়োগের পথ সুগম করার কথা বলা হয়েছে। এখন নতুন শিল্প শুরু করতে ছাড়পত্র জোগাড় করতে অনেক সময় লাগে। তার বদলে তিনি একটি আইনি কাঠামো তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যা ভাঙলে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। শিল্পমহলের দাবি মেনে ২০১৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে পণ্য-পরিষেবা কর (জিএসটি) চালুর কথাও ঘোষণা করেছেন তিনি। এই চেষ্টা প্রশংসাযোগ্য হলেও অঙ্ক ঠিকমতো না-মেলানোর গ্লানি তাঁকে এই বাজেটেও তাড়া করল বলে মনে করছেন অনেকে।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

সামাজিক খাতে বরাদ্দের উপর গুরুত্ব

মনে করা হয়েছিল নরেন্দ্র মোদি সরকার বোধহয় সামাজিক ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা কমিয়ে শুধুমাত্র আর্থিক প্রগতির লক্ষ্য‌ে সংস্কারকে প্রাধান্য‌ দেবেন। কিন্তু এবারের বাজেটে সামাজিক খাতে গুরুত্ব দেওয়ার ব্য‌াপারটিই প্রতিভাত হয়েছে।

মনমোহন সিংহ জমানায় যখন একের পর এক সামাজিক নিরাপত্তার প্রকল্প ঘোষণা হতো, সেই সময় বিজেপি তাকে ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি বলে কটাক্ষ করত। যখন নরেন্দ্র মোদীকে বিজেপির প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থী করা হল, তখন ইউপিএর এই প্রকল্পগুলির পিছনে অর্থনৈতিক ভাবনাকে তুলোধনা করে ঝাঁঝালো প্রচার শুরু করেছিলেন আজকের প্রধানমন্ত্রী। লোকসভা নির্বাচনের সময় বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছিল মোদীর বিশ্বাস অর্থনীতিবিদ জগদীশ ভগবতীতে, যিনি মনে করেন, দেশের বৃদ্ধির হার সুনিশ্চিত করার জন্য জোরকদমে সংস্কার করতে হবে; আর সনিয়া গাঁধীর আস্থা অমর্ত্য সেনে, যাঁর মত, মানব সক্ষমতায় সরকারি খরচ না বাড়ালে বৃদ্ধি অর্থহীন। লোকসভা নির্বাচনের সময় অমর্ত্য বনাম ভগবতীর লড়াই আসলে হয়ে উঠেছিল মোদী বনাম গাঁধীর লড়াই। বারবার মোদী স্পষ্ট করেছিলেন, খয়রাতির অর্থনীতিতে তিনি বিশ্বাসী নন। ইউপিএ জমানায় আইনের মাধ্যমে খাদ্য, কাজ, শিক্ষার অধিকার দেওয়ার তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলতেন, মানুষকে পাইয়ে দেওয়ার রেওয়াজ থেকে বের করে তিনি বরং তাঁদের সক্ষম করতে চান।

কিন্তু আজ মোদী সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটে মোদীকে আশ্রয় নিতে দেখা গেল অমর্ত্য সেনের ভাবনায়। অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি একে একে ঘোষণা করলেন সামাজিক নিরাপত্তার প্রকল্প। তা সে ‘অটল পেনশন যোজনা’ হোক বা ‘প্রধানমন্ত্রী সুরক্ষা দুর্ঘটনা বিমা’। অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা, ধীরে ধীরে ভারতের সব নাগরিকের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা চালু করাই সরকারের লক্ষ্য। শুধু কি তাই, সদ্য গত কাল ইউপিএ জমানার একশো দিনের প্রকল্প নিয়ে সংসদে কংগ্রেসকে তীব্র কটাক্ষ করেছেন মোদী, আর আজ সেই প্রকল্পেই ‘সব থেকে বেশি’ বরাদ্দ করলেন অর্থমন্ত্রী। থামলেন না সেখানেও। একে একে ইউপিএ আমলে ঘোষিত শিশু উন্নয়ন প্রকল্প, শিশু নিরাপত্তা প্রকল্প, প্রধানমন্ত্রী কৃষি সেচ যোজনাগুলিতে আরও বেশি বরাদ্দ করার কথাও ঘোষণা করেন জেটলি।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

গরিব মানুষের প্রতি আস্থা

বিজেপি শিবিরে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে তার জবাব। বিজেপির নেতারা বলছেন, এর একটা বড় কারণ হল দিল্লি নির্বাচনের ধাক্কা। যে নির্বাচন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, লোকসভা থেকে মোদীর যে বিজয়-রথ চলে আসছিল, তা এসে থেমে গিয়েছে দিল্লিতে। আম আদমি পার্টির মতো একটি আঞ্চলিক দলের ঝড়ে ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছে বিজেপি। বিজেপি বড়লোকদের দল এই অভিযোগ তুলে গরিব, মধ্যবিত্তদের সমীহ আদায় করে নিয়েছেন অরবিন্দ কেজরীবাল। এই ভোটব্যাঙ্ক হাতছাড়া হতে শুরু করেছে বিজেপির থেকে। আর মোদীর নাকের ডগায় রাজধানীতে হার অক্সিজেন জুগিয়েছে সব বিরোধী দলকেও, যারা এখন এককাট্টা হয়ে জমি বিল নিয়ে মোদী-বিরোধী আন্দোলন শুরু করেছে। সেখানেও অভিযোগের সুর একই। মোদী সরকার গরিব-বিরোধী, কৃষক-বিরোধী। আর সে কারণেই এ বারের বাজেটে অর্থনৈতিক দর্শন বদলাতে হল সরকারকে। খোয়াতে বসা ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখতে ছাপ রাখতে হল আমআদমির। বাজেটে একগুচ্ছ সামাজিক নিরাপত্তার প্রকল্প ঘোষণা করে সরকারকে দেখাতে হল, মোদী সরকার আদৌ গরিব-বিরোধী নয়। বাজেটের পর বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ হোন বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ, সকলেই এই গরিবের সামাজিক নিরাপত্তারই ঢাক পেটাতে শুরু করেছেন।

এত দিন অমর্ত্য সেনের অর্থনীতির বিরোধিতা করে কেন সেই অর্থনৈতিক ভাবনাতেই ফিরতে হল? এই প্রশ্ন করা হয়েছে অর্থমন্ত্রীকেও। জেটলির জবাব, “আমি এর মধ্যে কোনও বিরোধ দেখি না। আমি শিল্পের জন্য ভাল পদক্ষেপ করছি বলেই গরিবদের উপেক্ষা করব, তার কোনও মানে নেই।” আর তার জন্যই ঘোষণা হল প্রধানমন্ত্রী সুরক্ষা বিমা যোজনা। বছরে মাত্র ১২ টাকা দিয়ে ২ লক্ষ টাকার দুর্ঘটনা বিমা পাওয়া যাবে। অটল পেনশন যোজনায় বছরে হাজার টাকা করে সরকার অর্ধেক অর্থ দেবে। ১৮ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে বছরে ৩৩০ টাকা প্রিমিয়াম দিয়ে দু’লক্ষ টাকার বিমা পাওয়া যাবে প্রধানমন্ত্রী জীবন জ্যোতি বিমা যোজনায়। পিপিএফ এবং ইপিএফ-এর তহবিলে পড়ে থাকা ৯ হাজার কোটি টাকা দিয়ে প্রবীণ নাগরিকদের কল্যাণ তহবিল গড়া হচ্ছে। দারিদ্রসীমার নীচে বৃদ্ধ, ছোট ও প্রান্তিক চাষিরা এর সুবিধা পাবেন। দেশের সাড়ে ১০ কোটি বৃদ্ধের মধ্যে ১ কোটির বয়স ৮০ বছরের উপরে। তার মধ্যে ৭০ শতাংশ গ্রামে থাকেন, দারিদ্রসীমার নীচে। জেটলির ঘোষণা, কাউকেই যাতে অসুখবিসুখ বা দুর্ঘটনায় পয়সার অভাবের চিন্তা করতে না হয়, তার ব্যবস্থা করবে সরকার। তফসিলি জাতি, জনজাতি, অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণিভুক্ত ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার মুদ্রা ব্যাঙ্ক গড়েও সাহায্যের কথা ঘোষণা হয়। তফসিলি জাতি, জনজাতি, মহিলাদের জন্য ১ লক্ষ ৩০ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দও করা হয়। জগদীশ ভগবতী এই দানসত্রে খুশি হবেন বলে মনে হয় না।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

এ বার ঋণ নীতি তৈরিতে কেন্দ্রের নজরদার কমিটি

ঋণ এবং মুদ্রা নীতি তৈরির ক্ষেত্রে একটি বিশেষ নজরদারি কমিটি তৈরি করছে কেন্দ্র।  এই ‘মনিটারি পলিসি কমিটি’ গঠন করার প্রস্তাব বাজেটে দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। এ বার থেকে ওই কমিটিই রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সঙ্গে যৌথ ভাবে ঋণ ও মুদ্রা নীতি পর্যালোচনা করবে। এর জন্য রিজার্ভ ব্যাঙ্ক আইন সংশোধন করা হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

নতুন ওই কমিটি গঠন করার কথা ঘোষণা করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকার রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সঙ্গে মনিটারি পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। উদ্দেশ্য, মূল্যবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশে বেঁধে রাখা। তবে জেটলি ওই কথা বললেও সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, মুদ্রা এবং ঋণনীতি পর্যালোচনার ক্ষেত্রে এত দিন রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে যে-লক্ষণরেখা ছিল, তা এ বার মুছে যেতে পারে। ওই দুই ক্ষেত্রেই এ বার থেকে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পাশাপাশি ভূমিকা পালন করবে কেন্দ্রীয় সরকারও।

এ দিন বাজেটে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও বেশ কিছু সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। ওই সব প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য, ব্যাঙ্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারের ভূমিকা ক্রমশ কমিয়ে আনা।

ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার সংস্কারের ক্ষেত্রে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা খতিয়ে দেখে সুপারিশ করার জন্য অ্যাক্সিস ব্যাঙ্কের প্রাক্তন চেয়ারম্যান পি জে নায়েকের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। সেই কমটির সুপারিশ অনুযায়ীই বাজেটে পদক্ষেপ করেছেন জেটলি। বাজেটে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, স্বশাসিত একটি ব্যাঙ্ক পর্ষদ গঠন করা হবে, যার কাজ হবে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান, এগ্জিকিউটিভ ডিরেক্টর এবং স্বাধীন ডিরেক্টর নিয়োগ করা। এত দিন এই কাজ করত মূলত কেন্দ্রীয় সরকার এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। নায়েক কমিটির অন্যতম সদস্য প্রতীপ কর বলেন, “ব্যাঙ্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।” তবে ইউকো ব্যাঙ্কের প্রাক্তন এগ্জিকিউটিভ ডিরেক্টর বি কে দত্তর মতো ব্যাঙ্কিং বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, “ব্যাঙ্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা কমিয়ে আনার জন্যই এই ব্যবস্থাগুলির কথা ভাবা হয়েছে।” ব্যাঙ্ক পরিচালন পর্ষদ গঠনের পাশপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির জন্য একটি হোল্ডিং ও ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানিও গঠন করার প্রস্তাব দিয়েছেন জেটলি। প্রতীপবাবু বলেন, “ব্যাঙ্কের মূলধন বা শেয়ার জমা থাকবে ওই হোল্ডিং কোম্পানির কাছেই। যদি তার মালিক কেন্দ্রীয় সরকারই থাকবে। ব্যাঙ্কের মূলধন সংগ্রহের বিষয়টি পরিচালনা করবে ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি।”

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

মুদ্রা ব্য‌াঙ্ক তৈরির ঘোষণা

ব্যাঙ্ক পরিচালনার ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রস্তাবের পাশাপাশি নাবার্ডের ধাঁচে ঋণ দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানকে তহবিল জোগানোর উদ্দেশ্যে মুদ্রা ব্যাঙ্ক গড়ার কথাও বাজেটে ঘোষণা করেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। এই ঋণ বন্টন করা হবে দেশের ক্ষুদ্র-ঋণ সংস্থা বা মাইক্রো ফিনান্স ইস্টিটিউশনগুলির মাধ্যমে। দেশে যে-সব মানুষের ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ পাওয়ার সুযোগ কম, তাঁদের ঋণ দেওয়াই মুদ্রা ব্যাঙ্ক স্থাপনের মুখ্য উদ্দেশ্য বলে জানান জেটলি। ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্য অগ্রাধিকার পাবে তফসিলি জাতি এবং উপজাতি তালিকাভুক্তরা। মুদ্রা ব্যাঙ্ক স্থাপনের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন অর্থমন্ত্রী।

মুদ্রা ব্যাঙ্ক চালু করার ফলে দেশের ক্ষুদ্র-ঋণ সংস্থাগুলি আরও চাঙ্গা হওয়ার সুযোগ পাবে বলে জানান ক্ষুদ্র-ঋণ সংস্থা ভিলেজ ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেসের ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং সিইও কুলদীপ মাইতি। মুদ্রা ব্যাঙ্ক স্থাপনের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে ছোট ও মাঝারি শিল্পের সংগঠন ফসমি এবং ফ্যাক্সি। ক্ষুদ্র-ঋণ সংস্থাগুলি যে ঋণ দেয় তার উপর পরিষেবা করও তুলে দেওয়া হয়েছে এই বাজেটে। এটাও ক্ষুদ্র-ঋণ সংস্থাগুলির উন্নয়নের বিশেষ সহায়ক হবে বলে মন্তব্য করেন কুলদীপবাবু। এ বার থেকে এনবিএফসিগুলি সারফেসি আইনের আওতায় আসবে বলে বাজেটে ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এই ব্যবস্থা ওই সব সংস্থাকে অনুৎপাদক সম্পদ পুনরুদ্ধারে বিশেষ ভাবে সাহায করবে। এত দিন এই আইনের সুযোগ পেত ব্যাঙ্কগুলি। ওই আইনের বলে আদালতে না গিয়েও অনুৎপাদক সম্পদ উদ্ধারের জন্য বন্ধকী সম্পত্তি ক্রোক করতে পারে ব্যাঙ্কগুলি। এ বার থেকে এনবিএফসিগুলিও সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে।

যে সব মানুষের ব্য‌াঙ্কের সুযোগ নেওয়ার অবস্থা নেই,তাদের জন্য‌ এই বিশেষ ব্য‌বস্থা অত্য‌ন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এটি আসলে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকরণের লক্ষ্য‌ে পদক্ষেপ। ব্রাজিল,চীন প্রভৃতি দেশ এই একটি প্রশ্নে আমাদের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে। এটিএম খোলা,বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে এটিএমের ব্য‌বস্থা করা বেশ গুরুত্ব দিয়েই বিবেচনা করা হয়েছে। ফলে ওই দেশগুলিতে বহু সংখ্য‌ক গ্রামীণ মানুষ অথর্নৈতিক অন্থর্ভুক্তিকরণের আওতায় আসতে পেরেছন। ভারতে সে রকম অবস্থায় পৌঁছতে পারে যদি সাধারণ মানুষকে আরও বেশি করে ব্য‌াঙ্কের আওতায় টেনে আনা যায়। জন ধন যোজনার মতো মুদ্রা ব্য‌াঙ্ক তৈরির ঘোষণাও সে রকমই একটি পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

কালো টাকা নিয়ে মোদীর ভরসা নয়া আইন

ভোটের আগে বলেছিলেন, ক্ষমতায় এলে ১০০ দিনের মধ্যে ফেরাবেন। আজ তাঁর সেনাপতি ঘোষণা করলেন, ভবিষ্যতে যাতে না যায়, সেই ব্যবস্থা করবেন। কড়া কানুন বানাবেন তার জন্য। ন’মাসেই মোদী সরকারের সুর বদলে গেল কালো টাকা নিয়ে।

নরেন্দ্র মোদীর মুখরক্ষায় এ বার কালো টাকা নিয়ে নতুন আইন করার কথা ঘোষণা করল কেন্দ্র। অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি জানিয়েছেন, সংসদের চলতি অধিবেশনেই তার জন্য বিল আনা হবে। সরকারের কাছে এটা স্পষ্ট, বর্তমান আইনে বিদেশে গচ্ছিত কালো টাকা ফেরত আনা বেশ কঠিন। এবং সেই কাজে সরকার যে মোটেই তেমন এগোতে পারেনি, জেটলি কি পরোক্ষে সেটাই কবুল করে নিলেন? প্রশ্ন তুলছেন বিরোধীরা।

সরকারের তরফে বলা হচ্ছে, ভবিষ্যতে যাতে আর কালো টাকা বিদেশে না যায় তার জন্য কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার পথে হাঁটতে চাইছেন মোদী। আজ বাজেট বক্তৃতায় জেটলি জানিয়েছেন, “কালো টাকা দেশের অর্থনীতি ও সমাজের জন্য একটি বড় সমস্যা। যথাযথ আইন করে কালো টাকার লেনদেন রোখা না গেলে দারিদ্র ও অসাম্য কোনও ভাবেই দূর করা সম্ভব হবে না। তাই বাজেট অধিবেশনেই কালো টাকা রুখতে একটি বিল নিয়ে আসা হবে।”

সরকারের আপাতত লক্ষ্য, চলতি অধিবেশনেই ওই বিলটি পাশ করে আইনে পরিণত করা। যাতে বিদেশে কালো টাকা পাচার বন্ধ করা যায়। একই সঙ্গে দেশীয় অর্থনীতিতে কালো টাকা রুখতে বেনামী লেনদেন প্রতিরোধেও আলাদা আইন তৈরি করবে কেন্দ্র। অর্থ মন্ত্রক সূত্রের খবর এই আইনের প্রথম নিশানা হবে আবাসন নির্মাণ শিল্প। কারণ এই শিল্পে বিপুল কালো টাকার লেনদেন হয় বর্তমানে। এর পাশাপাশি, নগদ লেনদেন কমাতে আরও বেশি করে ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের উপর জোর দিয়েছেন জেটলি। প্রয়োজনে কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনে বাড়তি ছাড় দেওয়ার কথাও ভাবছে অর্থ মন্ত্রক। জেটলি জানিয়েছেন, এক লক্ষ টাকার বেশি মূল্যের বেচা-কেনার ক্ষেত্রে প্যান নম্বরের উল্লেখ আবশ্যক হবে এ বার থেকে॥

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

কালো টাকা নিয়ে নতুন বিল

কালো টাকা নিয়ে নতুন বিলে থাকছে ---

(১) বিদেশে হওয়া আয় ও সম্পত্তির উপরে কর ফাঁকি দিলে ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড হবে। কোনও ‘সেটলমেন্ট কমিশন’-এর কাছেই আর্জি জানাতে পারবেন না অভিযুক্ত। তিনি যে পরিমাণ আয় বা সম্পত্তি গোপন করেছেন তার ৩ গুণ জরিমানা দিতে হবে। (২) আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে বা রিটার্নে বিদেশে থাকা সম্পত্তি নিয়ে অসম্পূর্ণ তথ্য দিলে ৭ বছর সশ্রম কারাদণ্ড হবে। (৩) বিদেশে অঘোষিত কোনও সম্পত্তি থেকে যে কোনও ধরনের আয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ হারে কর নেবে সরকার। এ ক্ষেত্রে কোনও রকম ছাড় দেওয়া হবে না। (৪) বিদেশে থাকা সম্পত্তি থেকে কোনও আয় না হলেও, সেই ব্যক্তিকে অবশ্যই রিটার্ন জমা দিতে হবে। (৫) কোনও ব্যক্তি, ব্যাঙ্ক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান উপরে বলা চারটি নিয়মের কোনও একটি ভাঙলে আইনি ব্যবস্থা ও জরিমানার মুখে পড়তে হবে। (৬) বিদেশি ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট থাকলে রিটার্নে অবশ্যই তা উল্লেখ করতে হবে। (৭) বিদেশে কোনও আয় বা সম্পত্তি সংক্রান্ত কর ফাঁকি দিলে তা আর্থিক নয়ছয় প্রতিরোধ আইন (২০০২)-এর আওতায় আসবে। এতে তদন্তকারী সংস্থা বিদেশে থাকা ওই হিসেব-বহির্ভূত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে আইনি প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে। (৮) বিদেশে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে সমস্যা হলে আর্থিক নয়ছয় প্রতিরোধ আইন (২০০২)-এ এ দেশে সমমূল্যের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারবে তদন্তকারী সংস্থা। কালো টাকার ব্যবহার রুখতে ফেমা আইনেও সংশোধনী আনবে সরকার। এই সব করেও কি কালো টাকা আনা নিয়ে প্রতিশ্রুতি পূরণের চাপ থেকে বেরোতে পারবেন মোদী? বিরোধী নেতা-মন্ত্রীদের বিবৃতিতে শুধু নয়, আম-আদমির আলোচনাতেও কিন্তু উঠে আসছে সংশয়। কারণ, আইন বানালেই অপরাধ বন্ধ হয় না। আইনের যথাযথ ও কঠোর প্রয়োগ ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নয়তো কানুন ফস্কা গেরো হয়েই থেকে যায়। তা ছাড়া প্রয়োগ তো পরের কথা, আইন করার আগে বিলের ধারাগুলি নিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষ সহজেই একমত হবে, এমনটা বলা যাচ্ছে না।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

সীমান্ত সড়কে দ্বিগুণ বরাদ্দ

অল্প কিছু দিন আগের কথা। দেশের রেল মানচিত্রে ঢুকেছিল অরুণাচল প্রদেশ। সেই অনুষ্ঠান উপলক্ষে অরুণাচলে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কড়া ভাষায় চিন জানিয়েছিল, অরুণাচল ‘বিতর্কিত এলাকা’। সেখানে গিয়ে মোদী দু’দেশের সম্পর্কে নতুন ভাবে অস্বস্তি তৈরি করেছেন। চিন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত বিবাদকে লোকসভা ভোটের আগে থেকেই বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন নরেন্দ্র মোদী ও তাঁর সহযোগীরা। ভারত-চিন সীমান্তে বেজিংয়ের সড়ক ও অন্য পরিকাঠামো তৈরি নিয়ে বিশেষ উদ্বিগ্ন কেন্দ্র। তারই প্রতিফলন ঘটেছে চলতি বছরের বাজেটে। চিন ও পাকিস্তান সীমান্তে সড়ক তৈরির জন্য বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়েছে মোদী সরকার।

লাদাখ অঞ্চলের ‘কারাকোরাম পয়েন্ট’ থেকে অরুণাচলের ‘ফিশ টেল’ পর্যন্ত ৪,০৫৬ কিলোমিটার বিস্তৃত চিন সীমান্ত। চিনের দিকে ভাল রাস্তা থাকায় সহজেই নিজেদের শেষ বর্ডার পোস্টে পৌঁছে যেতে পারে চিনা সেনা। কিন্তু ভারতীয় সেনা ও ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশকে রাস্তার জন্য সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। ওই সীমান্তের জন্য গত বার ১৫৬.৪৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। বাজেটে সেই বরাদ্দ বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। ভারত-পাক সীমান্তে রাস্তা তৈরির জন্য বরাদ্দও প্রায় ১০০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। রাস্তা তৈরি ছাড়াও সীমান্তে ফ্লাড লাইটিং, অনুপ্রবেশ রুখতে উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্র বসাতে ওই টাকা ব্যবহার করা হবে। ভারত-ভুটান ও ভারত-মায়ানমার সীমান্তে পরিকাঠামো তৈরির ক্ষেত্রেও বরাদ্দ বাড়িয়েছেন জেটলি।

তবে গত বাজেটের বরাদ্দের অল্পই ব্যবহার করা গিয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের কর্তারাই। বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রকল্প রূপায়ণের বিষয়টিতেও বিশেষ জোর দিতে হবে বলে মনে করেন তাঁরা।

চলতি বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ ১০.৯৫ শতাংশ বাড়িয়েছেন জেটলি। প্রতিরক্ষা উৎপাদনের ক্ষেত্রে সরকার ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ নীতির উপরেই জোর দিতে চায় বলে আজ ফের জানিয়েছেন জেটলি। তাঁর ব্যাখ্যা, ইতিমধ্যেই প্রতিরক্ষায় প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নির অনুমতি দিয়েছে কেন্দ্র। ভারতীয় প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলি যাতে দেশের চাহিদা মিটিয়ে রফতানির পথে হাঁটতে পারে, সে জন্যই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। জেটলির কথায়, “বিমান-সহ অস্ত্রশস্ত্র ও সরঞ্জাম ভারতে তৈরির উপরে জোর দিতে চায় সরকার।”

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

পরিকাঠামো চাঙ্গা করতে ৭০ হাজার কোটির টোটকা

বৃদ্ধির চাকায় গতি ফেরাতে পরিকাঠামো ক্ষেত্র চাঙ্গা করার কড়া দাওয়াই যে বাজেটে থাকছে, তা মোটামুটি নিশ্চিতই ছিল। শনিবার সেই লক্ষ্যে হেঁটেই অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি জানালেন, ২০১৫-’১৬ অর্থবর্ষে পরিকাঠামোয় লগ্নি বাড়ানো হবে ৭০ হাজার কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, প্রকল্প গড়তে হাতিয়ার করা হবে পুরনো সেই সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগকেই (পিপিপি)। এ দিন রেল, রাস্তা ও সেচ প্রকল্পের হাত ধরে করমুক্ত পরিকাঠামো বন্ড ফিরিয়ে আনার কথাও ঘোষণা করেছেন জেটলি, যা কিনলে করছাড়ের সুবিধা পাবেন সাধারণ লগ্নিকারীরা। পাশাপাশি রাস্তা ও রেলে বাজেট বরাদ্দ করেছেন যথাক্রমে ১৪,০৩১ এবং ১০,০৫০ কোটি টাকা। বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় পুঁজি ঢালার অঙ্ক প্রায় ৮০,৮৪৪ কোটি বাড়িয়ে ৩,১৭,৮৮৯ কোটি টাকা করার ইঙ্গিতও  দিয়েছেন। এ দিন জেটলি জানান, দেশ জুড়ে বিভিন্ন পরিকাঠামো প্রকল্প রূপায়ণের জন্য অর্থ জোগাতে জাতীয় লগ্নি ও পরিকাঠামো তহবিল গড়ছেন তাঁরা। যেখানে বছরে ঢালা হবে ২০ হাজার কোটি টাকা।

অবশ্য পরিকাঠামো তৈরির জন্য অর্থ জোগাড়ের ইঙ্গিত এর আগেই দিয়েছিল মোদী সরকার। বিশ্ব বাজারে তেলের দাম হুড়মুড়িয়ে নামার সময় চার বার পেট্রোল ও ডিজেলে উৎপাদন শুল্ক বাড়িয়েছিল তারা। এ দিন জেটলি রাস্তা ও জাতীয় সড়ক তৈরির জন্য অর্থের সংস্থান করতে ওই শুল্ক বাবদ আয় থেকেই বাড়তি ৪০ হাজার কোটি সরিয়ে রাখার ব্যবস্থা করেছেন। তবে সমস্যা হল, পরিকাঠামোয় সরকারি খরচ বাড়লে রাজকোষ ঘাটতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সে ক্ষেত্রে জেটলি জানান, আগামী অর্থবর্ষে তিনি ওই ঘাটতি জিডিপি-র ৩.৯ শতাংশে বেঁধেছেন। যা ৩ শতাংশে নামানোর লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছেন আরও দু’বছর পর, অর্থাৎ ২০১৭-’১৮ সালে। যদিও পরিকাঠামো চাঙ্গা করায় কেন্দ্রের এ হেন উদ্যোগ ঘিরে একই সঙ্গে উঠেছে প্রশ্ন। তাদের জিজ্ঞাসা, লগ্নির টাকা জোগাড়ে এত হাতড়াতে হচ্ছে কেন সরকারকে? বিশেষ করে যেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির ভাঁড়ারে অর্থের কোনও অভাব নেই।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

ব্যবসা শুরু, গোটানোর পথ সহজ করতে চান জেটলি

ভারতে ব্যবসা শুরু করার বিভিন্ন ছাড়পত্র জোগাড়ের জন্য সংস্থাগুলিকে এখনও এক দফতর থেকে অন্য দফতরে দৌড়দৌড়ি করতে হয়। বহু ক্ষেত্রেই সময়ে ছাড়পত্র না-মেলায় থমকে যায় প্রকল্পও। যা লগ্নিকারীদের কাছে ভারতকে বিনিয়োগের আকর্ষণীয় গন্তব্য করে তোলার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। এ বারের বাজেটে সেই লাল ফিতের ফাঁস কাটিয়ে শিল্পে গতি আনতে চেয়েছেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। সেই লক্ষ্যে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গড়ে তোলার কথা জানালেন তিনি, যার কাজ হবে বিভিন্ন ছাড়পত্র জোগাড়ের প্রক্রিয়াকে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসার পথ বাতলানো এবং তা নিয়ে খসড়া আইন তৈরি সম্পর্কে মতামত জানানো।

শুধু ব্যবসা চালুই নয়, একই ভাবে ব্যবসা গোটাতে বা রুগ্ণ সংস্থার ঘুরে দাঁড়াতে যে-পরিমাণ সময় লাগে, তা-ও কমিয়ে আনতে চায় মোদী সরকার। সিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোম্পানিজ অ্যাক্ট (সিকা) এবং বোর্ড ফর ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ফিনান্সিয়াল রিকনস্ট্রাকশন (বিআইএফআর) এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ বলেই বাজেটে মন্তব্য করেছেন জেটলি। বরং প্রস্তাব রেখেছেন দেশে বিশ্বমানের দেউলিয়া আইন চালু করার। লাল ফিতের ফাঁস এবং কেন্দ্রীর নীতিপঙ্গুত্ব নিয়ে শিল্পমহলের অভিযোগ অবশ্য মনমোহন সিংহের জমানা থেকেই। গত লোকসভা ভোটের আগে কিছুটা হলেও সংস্কারের ঝোড়ো ইনিংস খেলে অর্থনীতিতে প্রাণ ফেরানোর চেষ্টা করেছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। তার পর গদিতে বসার পর মেক ইন ইন্ডিয়া উদ্যোগের মাধ্যমে লগ্নি টানার কথা বলেছেন নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু, তাতেও বিনিয়োগ সে ভাবে আসেনি। এ বার তাই লগ্নি আসার পথ আরও সুগম করতে বার্তা দিলেন জেটলি। জানালেন, সম্প্রতি ই-বিজ পোটার্ল চালু করেছে কেন্দ্র। যেখানে এক- জানলা ব্যবস্থার মাধ্যমে ১৪টি ছাড়পত্র মিলছে। এ বার প্রকল্প চালু আগের সময় আরও কমিয়ে আনতে গোটা প্রক্রিয়াকেই নির্দিষ্ট কাঠামোয় বেঁধে ফেলতে চান তাঁরা। এমনকী ক্ষুদ্র ও মাঝারি সংস্থাগুলিকে টাকা দেওয়ার সময়সীমাও কমাতে উদ্যোগী হয়েছে কেন্দ্র।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

সোনা আমদানিতে কমাতে কেন্দ্রের তিন দাওয়াই

বিশ্বের অন্যতম গরিব দেশ হতে পারি, কিন্তু সোনা আমদানিতে আমরা এক নম্বরে৷‌ প্রতি বছর ৮০০ থেকে ১০০০ টন সোনা আমদানি করে ভারত৷‌ হিসেব মতো, এখন ভারতে ২০,০০০ টনের বেশি সোনা ব্যাঙ্কের লকারে বা বাড়ির আলমারিতে সম্পূর্ণ অকর্মণ্য অবস্হায় পড়ে আছে৷‌ এই সোনা বিনিয়োগও হয় না বা এ থেকে কোনও আয়ও হয় না কোনও পরিবারের৷‌ এই অবস্হা পরিবর্তন করতে, দেশে সোনা আমদানি কমাতে এবং সোনাকে আরও সরাসরি বিনিয়োগের হাতিয়ার করে তুলতে বাজেটে তিনদফা দাওয়াইয়ের কথা ঘোষণা করলেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি৷‌ এই তিন ব্যবস্হা হল: গোল্ড মানিটাইজেশন স্কিম, সভরিন গোল্ড বন্ড এবং দেশে স্বর্ণমুদ্রা তৈরির ব্যবস্হা৷‌ সরকারের কাছে এটা পরিষ্কার যে এদেশে সোনার প্রতি যেমন মোহ তাতে শুধু সোনার ওপর আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে বা অন্যভাবে জোর করে সোনার চাহিদা কমানো যাবে না৷‌ চাই এমন কিছু ব্যবস্হা যাতে মানুষ সোনা ছেড়ে অন্যত্র বিনিয়োগে আগ্রহী হয় বা সোনাকেই আরও ভাল বিনিয়োগের হাতিয়ার হিসেবে মনে করে৷‌ জেটলির গোল্ড মানিটাইজেশন স্কিম এমনই একটি প্রকল্প৷‌ এখনকার গোল্ড ডিপোজিট স্কিম এবং গোল্ড লোন স্কিমের বদলে আসছে এই প্রকল্প৷‌ ১৯৯৯ সালে চালু গোল্ড ডিপোজিট স্কিম সেভাবে সাধারণ মানুষের নাগালে কখনই আসেনি৷‌ সেখানে ন্যূনতম ৫০০ গ্রাম সোনা জমা রাখতে হয় এবং বেশিরভাগ ব্যাঙ্কই এই প্রকল্পে কোনও আগ্রহ দেখায়নি৷‌ নতুন গোল্ড মানিটাইজেশন স্কিম সম্পর্কে বিশদে এখনও জানা না গেলেও অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, এই প্রকল্পে সোনা জমা রেখে মানুষ নির্দিষ্ট হারে সুদ পাবেন৷‌ এবং এখান থেকে প্রয়োজনে ঋণও নেওয়া যাবে৷‌ এতদিন সোনা ছিল কিছুটা ফাটকাবাজি এবং কিছুটা দীর্ঘকালীন নিরাপত্তার আশ্বাস৷‌ এবার তাকে বিনিয়োগের একটা ভাল মাধ্যমে পরিণত করতে চান অর্থমন্ত্রী৷‌ সোনা জমা রেখে যে সুদ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে আগে তা সহজ ছিল না৷‌ জেটলির দ্বিতীয় প্রকল্প সভরিন গোল্ড বন্ড. সোনা না কিনে এই বন্ডে বিনিয়োগ করতে আহ্বান জানানো হচ্ছে গ্রাহকদের৷‌ এখানেও নির্দিষ্ট হারে সুদ মিলবে৷‌ এবং এই বন্ড ভাঙানোর সময়ে বাজারে চলতি সোনার দামের সমান মূল্য পাওয়া যাবে৷‌ অর্থমন্ত্রীর তৃতীয় দাওয়াই দেশে সোনার কয়েন তৈরি করা যাতে অশোক স্তম্ভের ছাপ থাকবে৷‌ এখন যে সোনার কয়েন বিভিন্ন দোকানে বিক্রি হয় তার প্রায় পুরোটাই আমদানি করা৷‌ দেশে কয়েন তৈরি হলে দেশের মধ্যে জমে থাকা সোনা কিছুটা সচল হবে৷‌ আমদানি কমবে বলে অর্থমন্ত্রীর আশা৷‌ স্বর্ণশিল্পমহল বাজেটের এই ৩ দফা ব্যবস্হায় খুশি৷‌ এতে বাজারে সোনার জোগান বাড়বে বলে তাঁরা মনে করছেন৷‌ তবে সোনায় আমদানি শুল্ক ১০শতাংশ থেকে না কমায় তাঁরা হতাশ৷‌

সূত্র : আজকাল, ১ মার্চ ২০১৫

কেন্দ্রীয় বাজেট এক নজরে

আজ সংসদে মোদি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সাধারণ বাজেট ২০১৫ পেশ হল| বাজেট পেশ করলেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি | আর্থিক সংস্কারের পথে সাবধানী পদক্ষেপ করল নরেন্দ্র মোদির সরকার| অরুণ জেটলির বাজেটের শুরুতেই বলেন, মুদ্রাস্ফীতি কমেছে। বেড়েছে টাকার দাম| জনতাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি মতোই ২৪ ঘন্টা কাজ করছে সরকার| জেটলির বাজেট এক নজরে...

  • ১.রাস্তা, রেল সম্প্রসারণে করমুক্ত পরিকাঠামো
  • ২. ২৮ হাজার গ্রামকে জুড়তে এক লক্ষ কিলোমিটার নতুন রাস্তা
  • ৩.তুলে দেওয়া হল সম্পত্তি কর
  • ৪. একই রইল ব্যক্তিগত আয়করের সীমা
  • ৫. তবে বছরে ১ কোটি টাকার বেশি আয় হলে ২ শতাংশ সারচার্জ
  • ৬. জন ধন যোজনায় গুরুত্ব, এর আওতায় ১২.৫ কোটি পরিবার আনার লক্ষ্যমাত্রা ধার্য
  • ৭. আয়কর দাখিলের সময় উল্লেখ করতে হবে বিদেশি সম্পত্তির পরিমাণ, কারাদণ্ড হতে পারে সঠিক আয়কর দাখিল না করলে
  • ১০. বিদেশ থেকে কালো টাকা ফেরাতে বিশেষ উদ্যোগ, নয়া আইনের প্রস্তাবনা।
  • ১১. বিদেশে কালো টাকা লুকিয়ে রেখে ধরা পড়লে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে
  • ১২. স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বরাদ্দ ৩৩ হাজার ১৫২ কোটি টাকা, আবাসন ও নগরন্নোয়নে ২২, ৪০৭ কোটি টাকা।
  • কালো টাকার উপর উচ্চ হারে কর।
  • ১৩. ২০২২ সালের মধ্যে প্রত্যকের মাথায় ছাদ অর্থাৎ বাড়ি| ২ কোটি গ্রামে, ৪ কোটি বাড়ি শহরে
  • ১৪. প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্য বিমায় ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয়কর ছাড়
  • ১৫. জম্মু-কাশ্মীর, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু, হিমাচলপ্রদেশে ও অসমে এইমস-এর ধাঁচে হাসপাতাল
  • ১৬. বিহার ও পশ্চিমবঙ্গকে বিশেষ আর্থিক সাহায্য
  • ১৭. চার বছরের জন্যে কর্পোরেট ট্যাক্স ৩০ শতাংশ থেকে কমে ২৫ শতাংশ।
  • ১৮. টেকনিক্যাল সার্ভিসে ট্যাক্স কমে হল ১০ শতাংশ
  • ১৯. এক লক্ষ টাকা লেনদেনে আবশ্যিক প্যান কার্ড
  • ২০. গঙ্গা পরিষ্কার ও স্বচ্ছ ভারত অভিযানে দান করলে কর ছাড়
  • ২১. নির্ভয়া ফান্ডে অর্থাৎ নারী সুরক্ষায় আরও ১০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ।
  • ২২. নারেগা প্রকল্পে বাড়ল বরাদ্দ, হল ৫,০০০ কোটি টাকা|
  • ২৩. প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ ২,৪৬, ৭২৭ কোটি টাকা
  • ২৪. পেনশন সুরক্ষিত করতে 'অটল পেনশন যোজনা'  আনার পরিকল্পনা
  • ২৫. কৃষিঋণ বাবদ ৮.৫ লক্ষ কোটি টাকা ব্যাঙ্কের মাধ্যমে দেওয়ার ঘোষণা
  • ২৬.  ১.৫ কোটি উপভোক্তাকে রান্নার গ্যাসে ভর্তুকি ব্যাঙ্কের মাধ্যমে
  • ২৭. বিশ্বমানের আইটি হাব তৈরি করার জন্যে প্রাথমিক পর্যায়ে ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ। কর্ণাটকে নতুন আইআইটি, জম্মু-কাশ্মীর ও অন্ধ্রতে আইআইএম।
  • ২৮. ৪০০০ মেগা ওয়াটের ৫টি নতুন মেগা পাওয়ার প্রজেক্ট শুরু করার প্রস্তাব দিলেন অর্থমন্ত্রী।
  • পিপিপি মডেল নতুনভাবে সাজানো হবে।
  • ২৯. বাড়বে পরিবহন কর
  • ৩০. বাড়ছে পরিষেবা কর| ফলে দাম বাড়বে ট্রেনের টিকিট-সহ বেশ কিছু জিনিসের
সূত্র : সংবাদ প্রতিদিন, ১ মার্চ ২০১৫

 

বাজেটকে নম্বর দিতে কুণ্ঠা শিল্পমহলের

প্রত্যাশা মতো সংস্কারের জয়ধ্বজা ওড়েনি। জমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে শিল্পায়নের পথে নানা সমস্যা নিয়ে বাজেটে কোনও উচ্চবাচ্যও নেই। বড় প্রাপ্তি বলতে দুই সম্পদ কর তুলে দেওয়া এবং কোম্পানি কর ৫ শতাংশ কমানোর ঘোষণা। ফলে মুখে কেউ কেউ অরুণ জেটলির প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটকে ‘দূরদৃষ্টি সম্পন্ন’-এর তকমা লাগালেও ক্ষোভটা রয়েই গিয়েছে শিল্পমহলের। আর সেটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যখন তাঁরা এই বাজেটকে দশের মধ্যে বিশেষ নম্বর দিতে চাননি।

শনিবার সাধারণ বাজেট পেশ করে অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি জানান, আগামী চার বছরে কোম্পানি কর ধাপে ধাপে ৩০% থেকে ২৫%-এ নামিয়ে আনা হবে। একই সঙ্গে তুলে দেওয়া হয়েছে সম্পদ কর। বাজেটে এই জোড়া প্রাপ্তিতে কিছুটা সন্তুষ্ট শিল্পমহল। কেন্দ্র কোম্পানি কর কাঠামো সরলীকরণের পথে হাঁটছে বলে মনে করছে কর্পোরেট দুনিয়া। তাঁরা আরও মনে করছেন, বাজেটে যে ধরনের কর প্রস্তাব রাখা হয়েছে, তা ব্যবসা করার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দেবে। ফলে লগ্নি আসার পথ প্রশস্ত হতে পারে বলেও অনেকের আশা। পাশাপাশি কোটি টাকার উপরে যাঁদের আয়, তাঁদের উপর ২% সারচার্জ বসানোর প্রস্তাবও দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

জোড়া প্রাপ্তিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন শিল্পপতি আদি গোদরেজ। একই সঙ্গে তিনি উল্টো দিকটাও তুলে ধরে বলেন, “তবে উৎপাদন শিল্পের জন্য বিশেষ কোনও সুবিধা দেয়নি। উল্টে উৎপাদন শিল্পের উপর সারচার্জ বসানোয় করের বোঝা বেড়েছে।” বেঙ্গল চেম্বার অব কমার্সের অন্যতম কর্তা অম্বরীশ দাশগুপ্তের মতে, কোম্পানি কর হ্রাসের সুবিধা কতটা দাঁড়াবে, তা ভবিষ্যতে বোঝা যাবে। তবে সম্পদ কর তুলে দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করে তিনি বলেন, “সম্পদ করের হিসেব অনেক বেশি জটিল ছিল।” এক কোটির বেশি বেতন পান যাঁরা, তাঁদের পক্ষে ২% বাড়তি সারচার্জ দেওয়া সহজ এই মন্তব্য করে অম্বরীশবাবুর বক্তব্য, এর ফলে সরকারি কোষাগারেও আসবে অতিরিক্ত ৮ হাজার কোটি টাকা।

বণিকসভা ফিকির প্রেসিডেন্ট জ্যোৎস্না সুরি অবশ্য জানান, দেশের আর্থিক উন্নয়নের জন্য অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট একটি রোডম্যাপ সামনে রেখেছেন। বণিকসভা সিআইআই-এর প্রেসিডেন্ট অজয় শ্রীরাম বলেন, “আর্থিক বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের দিকে নজর রেখেই তৈরি হয়েছে ইতিবাচক এই বাজেট।” একই সুরে ভারতী এন্টারপ্রাইজেস-এর রাজন ভারতী মিত্তল জানান, কোম্পানি কর কমিয়ে এবং সম্পদ কর তুলে দিয়ে ব্যবসা করার প্রক্রিয়াকে অনেক সহজ করে দিয়েছে কেন্দ্র। শুধুমাত্র কোম্পানি কর হ্রাস ও সম্পদ কর তুলে দেওয়াই নয়। কালো টাকার সমস্যা মেটাতে যে কড়া পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্র, তা স্বাগত জানিয়েছেন বণিকসভা ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্স, ভারত চেম্বার, ক্যালকাটা চেম্বার, এমসিসি চেম্বার অব কমার্স ও বেঙ্গল ন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স। কেপিএমজি-র কর বিশেষজ্ঞ রাজর্ষি দাশগুপ্তের মতে, কর কাঠামোয় পরিবর্তন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা জোগাবে।

তবে এই বাজেট নিয়ে ক্ষুব্ধ নির্মাণ শিল্পমহল। তাদের অভিযোগ, জমি অধিগ্রহণ-সহ যে সমস্যার মুখে পড়ছে এই শিল্প, তার সমাধানসূত্র মেলেনি।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

সূচক উঠলেও বাজারের ধন্দ কাটেনি

এক দিকে পরিকাঠামো উন্নয়নে একগুচ্ছ প্রকল্প ঘোষণা। অন্য দিকে শেয়ার ও বন্ডের বাজার চাঙ্গা করতে একাধিক পদক্ষেপ। এই দুইয়ের জেরে দীর্ঘ তিন বছর বাদে বাজেটের দিনে উঠল সূচক। শনিবার বাজেট পেশের পরে বাজার বন্ধের সময়ে সেনসেক্স ওঠে ১৪১.৩৮ পয়েন্ট। থিতু হয় ২৯,৩৬১.৫০ অঙ্কে। উল্লেখ্য, শনিবার হলেও এ দিন বাজেট উপলক্ষে খোলা ছিল বাজার। তবে সূচক উঠলেও বাজেট ভাল হল না মন্দ, তা নিয়ে ধন্দ ছিল লগ্নিকারীদের মনে। যে-কারণে লেনদেনের পুরো সময়টাই সূচক দুলেছে ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো। ২৯,৪১১ দিয়ে শুরু করে এক সময় তা নামে ২৮,৮৮২ পয়েন্ট। পরে ফের মাথা তোলে উপরের দিকে।

এ বারের বাজেটে চমকে দেওয়ার মতো তেমন কোনও ঘোষণাও ছিল না। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে দেশের আর্থিক উন্নতি নিশ্চিত করার জন্য জমি তৈরির কাজ অনেকটা সেরে রাখতে চেয়েছেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। যা উৎসাহিত করেছে বাজারকে। এর মধ্যে রয়েছে, আগামী অর্থবর্ষে রাজকোষ ঘাটতি ৩.৯ শতাংশে বেঁধে রাখা। ২০১৪-’১৫ সালে বৃদ্ধি ৭.৪ শতাংশে ও ২০১৫-’১৬ সালে ৮.৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য ধার্য করা। বাজারের প্রত্যাশা মিটিয়ে জেটলির পরিকাঠামো চাঙ্গা করার দাওয়াইও এ দিন ইন্ধন জোগায় সূচকের উত্থানে। এই তালিকায় আছে, ২০২০ সালের মধ্যে ১ লক্ষ কিলোমিটার নতুন রাস্তা তৈরি। গরিব মানুষদের জন্য ৬ লক্ষ বাড়ি ও ৬ কোটি শৌচাগার গড়ে তোলা। বন্দর উন্নয়নেও আছে একাধিক ব্যবস্থা। জেটলি ঘোষণা করেছেন, ২০১৫-’১৬ সালেই পরিকাঠামো উন্নয়নে ৭০ হাজার কোটি টাকা খরচ করা হবে।

আলাদা ভাবে শেয়ার বাজার-সহ মূলধনী বাজারকে চাঙ্গা করার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করাতেও এ দিন খুশি হয় সূচক। যেমন, শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রক সেবি-র সঙ্গে পণ্য লেনদেন বাজারের নিয়ন্ত্রক ফরোযার্ড মার্কেটস কমিশনকে (এফএমসি) মিশিয়ে দেওয়া। শ্রেয়ী ক্যাপিটাল মার্কেটস-এর এগ্জিকিউটিভ ডিরেক্টর অশোক পরাখ বলেন, “মূলধনী বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপ প্রশংসা দাবি করতে পারে। কারণ, ন্যাশনাল স্পট এক্সচেঞ্জে সম্প্রতি  ৫,৬০০ কোটি টাকার নয়ছয় সামনে এসেছে। পণ্য লেনদেনের ওই এক্সচেঞ্জটি এফএমসির আওতাতেই ছিল। সেবি-র সঙ্গে এফএমসিকে মিশিয়ে দেওয়ার ফলে মূলধনী বাজার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি আরও মজবুত হবে।” বাজেটে সম্পদ কর তোলার কথা বলা হয়েছে, যা স্বাগত জানিয়েছে শেয়ার বাজার। ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রাক্তন সভাপতি কমল পরাখ বলেন, “এর ফলে অনেকের হাতে লগ্নিযোগ্য অথ বাড়বে। এর একটা অংশ শেয়ার বাজারে আসবে সন্দেহ নেই।” প্রবীণ বাজার বিশেষজ্ঞ ও দেকো সিকিউ -রিটিজের কর্ণধার অজিত দে-র মতে, “এ বার শুরু হবে সূচকের লম্বা দৌড়”। ভারতের শেয়ার বাজারে বিনিয়োগের জন্য বিদেশি লগ্নিকারী সংস্থাগুলিকে আরও উৎসাহিত করার ব্যবস্থাও বাজেটে করেছেন জেটলি। বলা হয়েছে, ওই সব সংস্থার উপর মূলধনী লাভ-কর বসবে না। চালু হবে, এর থেকে পাওনা টাকার রসিদ বা এ ধরনের নথি বাজারে লেনদেনের ব্যবস্থা। ক্যালকাটা স্টক এক্সচেঞ্জের এমডি-সিইও বি মাধব রেড্ডি বলেন, “এর ফলে বাজারে লেনদেনের নতুন দিক খুলে গেল।”

এ বার বাজেটে কোম্পানি কর ৩০% থেকে কমিয়ে ধাপে ধাপে ২৫% করার প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এতে খুশি কর্পোরেট কর্তারা। যদিও শেষমেষ এই ব্যবস্থা তাঁদের কতটা সুবিধা দিতে পারবে, তা নিয়ে সংশয়ও রয়েছে একাংশের। বেঙ্গল চেম্বারের পরোক্ষ কর কমিটির চেয়ারম্যান ও ডিআইসি ইন্ডিয়ার সিনিয়র এগ্জিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট তিমিরবরণ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “করের হার কমানোর পাশাপাশি সংস্থাগুলি করে যে-সব ছাড় পায়, তার বেশ কিছু তুলে দেওয়া হবে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। সেটা হলে ওই করের হার কমলেও তা সংস্থাগুলির পক্ষে কতটা লাভজনক হবে, তা নিয়ে সংশয় আছে।” মূলধনী বাজারের ক্ষেত্রে আরও একটি উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব বাজেটে দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, দেশে আর্থিক সংস্থার এসইজেড (সেজ) তৈরি হবে। সেখান থেকে বিদেশি ব্যাঙ্ক, বিমা সংস্থা-সহ বিভিন্ন বিদেশি লগ্নিকারীরা সরাসরি শেয়ার এবং পণ্য বাজারে বিদেশি মুদ্রায় লগ্নি করতে পারবেন। কী ভাবে সেজটি পরিচালিত হবে, সেই সংক্রান্ত নির্দেশাবলি খুব শীঘ্রই ঘোষণা করে হবে বলে জানান তিনি। সেজটি স্থাপন করা হবে গুজরাতে। ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (এনএসই)-এর মুখপাত্র অরিন্দম সাহা জানান, “ওই সেজ-এ স্টক এক্সচেঞ্জ চালু করার উদ্দেশ্যে এনএসই অতি সম্প্রতি গুজরাত সরকারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।”

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার ৮ শতাংশের ওপর, বলছে সমীক্ষা

আগামী বছর অর্থনৈতিক অগ্রগতির হার ৮ শতাংশের ওপরে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে৷‌ এই হারকে ক্রমশ ১০ শতাংশের ওপর নিয়ে যাওয়া সম্ভব৷‌ ঠিকঠাক অগ্রগতি হলে সবার চোখের জল মুছিয়ে ভারতের যুব সম্প্রদায়ের আশা-আকাঙ্খা মেটানো সম্ভব হবে৷‌ আশার এই ছবিটি আঁকা হয়েছে অর্থনৈতিক সমীক্ষায়৷‌ কাল বাজেট৷‌ আজ অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি সংসদে পেশ করলেন ২০১৪-১৫-র অর্থনৈতিক সমীক্ষা৷‌ এতে বলা হয়েছে, জনতার রাজনৈতিক রায় সংস্কারের পক্ষে৷‌ ভারতের অর্থনীতি উজ্জ্বল সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলির মধ্যে মাথা তুলছে৷‌ সংস্কারের সম্ভাবনাও এখন উজ্জ্বল৷‌ সমীক্ষায় বলা হচ্ছে, সংস্কারের ক্ষেত্রে দরকার এখন মহা ঝটকা– ‘বিগ ব্যাং’৷‌ জনতার রায় অনুযায়ী সংস্কারের পথে ভারতীয় অর্থনীতির অগ্রগতি দুই অঙ্কের সংখ্যায় পৌঁছে যাবে বলেই আশা করছেন অর্থমন্ত্রী৷‌ অতীতের অর্থনৈতিক মন্দা, লাগাতার মুদ্রাস্ফীতি, প্রচণ্ড আর্থিক ঘাটতি, অভ্যম্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়া, আমানতের ভারসাম্যহীনতা এবং টাকার দাম ক্রমাগত কমে যাওয়ার মতো সমস্যাকে কাটিয়ে উঠেছে৷‌ সমীক্ষায় নতুন যে হিসেব পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে, তাতে, বাজার মূল্যে ২০১৫-১৬-য় অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার ৮.১ থেকে ৮.৫ শতাংশের মধ্যে থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে, চলতি বছরে যা ৭.৪ শতাংশ৷‌ এই অগ্রগতি সম্ভব হচ্ছে বেশ কিছু সংস্কার কর্মসূচি হাতে নেওয়ার জন্য৷‌ এর মধ্যে আছে ডিজেলের দাম নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা, শক্তিজাতীয় উৎপন্ন দ্রব্যগুলিতে কর বসানো, রান্নার গ্যাসের ভর্তুকিকে সরাসরি হস্তাম্তর প্রথার মধ্যে আনা, কয়লা ক্ষেত্রের সংস্কারের জন্য অর্ডিন্যান্স জারি করা, প্রতিরক্ষায় বিদেশি পুঁজির সীমা বাড়ানো ইত্যাদি৷‌ চিম্তার কারণ রয়েছে আর্থিক ঘাটতি নিয়ে৷‌ জি ডি পি-র ৪.১ শতাংশ ঘাটতির যে লক্ষ্য রয়েছে, তা থেকে সরে যাওয়া চলবে না৷‌ এই ব্যাপারে মধ্য মেয়াদি একটি লক্ষ্য রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে৷‌ সেটি হল জি ডি পি-র ৩ শতাংশ৷‌ ঘাটতি কমানোর দাওয়াই হল ভর্তুকি সামলানো৷‌ জিনিসপত্রের দামে ভর্তুকি গরিব মানুষের জীবনযাপনের মানে বড় পরিবর্তন আনতে পারে না, এরকমই অভিমত প্রকাশ করা হয়েছে সমীক্ষায়৷‌ যদিও নগদ ভর্তুকি গরিব পরিবারগুলিকে মুদ্রাস্ফীতি ও দামের ওঠাপড়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করে৷‌ ৩,৭৮,০০০ কোটি টাকার নগদ ভর্তুকি, যা জি ডি পি-র ৪.২৪ শতাংশ, দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াইয়ে এটা সংস্কারের পক্ষে ঠিকঠাক অস্ত্র নাও হতে পারে৷‌ গরিবকে নানারকম ভর্তুকি দেওয়ার ব্যাপারে সমীক্ষা বলছে, এতে গরিবের ভাল নাও হতে পারে৷‌ ভর্তুকির বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, ধনীরা গরিবের থেকে ভর্তুকি থেকে বেশি সুবিধা নেয়৷‌ বিদ্যুতে ভর্তুকি তুলনামূলকভাবে ধনীদেরই বেশি সাহায্য করে৷‌ যদিও সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ভর্তুকি তুলে দেওয়া বা কমিয়ে আনা মোটেই সম্ভব বা আকাব্ভিত নয়৷‌ তবে গোটা ভর্তুকি ব্যবস্হা ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে৷‌ বলা হয়েছে সরকারকে খরচ কমিয়ে রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে হবে।

সূত্র : আজকাল ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

রাজ্য করের ভাগ বেশি পাবে, কিন্তু দায়িত্ব বাড়ল

অর্থ কমিশন প্রস্তাব করেছে, কেন্দ্রীয় করের ক্ষেত্রে রাজ্যগুলির অংশীদারি এখনকার ৩২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪২ শতাংশ করা হোক৷‌ এই প্রস্তাব মেনে নিয়েছে কেন্দ্র৷‌ মুখ্যমন্ত্রীদের লেখা চিঠিতে জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি৷‌ চতুর্দশ অর্থ কমিশনের রিপোর্টে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, রাজ্যগুলি ২০১৪-১৫ আর্থিক বছরে পাবে ৩.৪৮ লক্ষ কোটি টাকা এবং ২০১৫-১৬-তে পাবে ৫.২৬ লক্ষ কোটি টাকা৷‌ বাড়তি করের অংশীদারি রাজ্যগুলিকে বাড়তি স্বশাসন দেবে, এ কথা বলা হয়েছে রিপোর্টে৷‌ কমিশনের আংশিক সময়ের সদস্য অভিজিৎ সেন একটি আপত্তিসূচক নোট দেন৷‌ কমিশনের প্রধান হলেন ওয়াই ভি রেড্ডি৷‌ সরকার গরিষ্ঠের সিদ্ধাম্ত মেনে নেয়৷‌ অভিজিৎ সেন তাঁর নোটে প্রথম বছরে বিভাজ্য করভাণ্ডার থেকে ৩৮ শতাংশ ভাগ দিতে চেয়েছেন৷‌ রাজ্যগুলির ২০১৫-২০ সালের রাজস্ব ও খরচ হিসেব করে কমিশন ১.৯৪ কোটি টাকার মঞ্জুরির সুপারিশ করেছে ১১টি রাজ্যের ঘাটতি মেটানোর জন্য৷‌ এই বাড়তি অংশীদারি রাজ্যগুলি পাওয়ার ফলে কেন্দ্রের আর্থির পরিসর কমবে একই অনুপাতে৷‌ সরকার অর্থ কমিশনের এই সুপারিশ মেনে নিয়েছে৷‌ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাজ্যগুলিকে বলেছেন তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকল্প তৈরি করতে৷‌ সব মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পাঠানো চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, রাজ্যগুলি অবাধে কেন্দ্র অনুমোদিত প্রকল্পগুলি বদলাতে পারে এবং তাদের উন্নয়নের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে পরিকল্পনা করতে পারে৷‌ উল্লেখ্য, আদায় করা করভাণ্ডারে রাজ্যের ভাগ বাড়ানোর ফলে স্বাভাবিক ভাবেই কেন্দ্রের ভাগ কমবে৷‌ এর ফলে নানা প্রকল্পে রাজ্যগুলির নিজেদের মতো পরিকল্পনার সুযোগ যেমন বাড়বে, তেমনি আর্থিক দায়ও বাড়বে৷‌ কেন্দ্র বহু ক্ষেত্রেই হাত তুলে নিতে পারবে৷‌ প্রধানমন্ত্রী অবশ্য জানিয়েছেন, জাতীয় অগ্রাধিকারের প্রকল্পগুলি, যেমন দারিদ্র্য দূরীকরণ, ১০০ দিনের কাজ, শিক্ষা, স্বাস্হ্য, গ্রামোন্নয়ন, কৃষি-সহ আরও কিছু প্রকল্পে কেন্দ্র টাকা দিয়ে যাবে৷‌ রাজ্যগুলির হাতে যখন বাড়তি টাকা আসছে তখন রাজ্যগুলি কেন্দ্রীয় সাহায্যের পুরনো কিছু প্রকল্প নতুন করে বিবেচনা করতে পারে৷‌ তিনি বলেন, কট্টর কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা থেকে আমরা সরে আসছি৷‌ কেন্দ্রের একাধিপত্যের বিরুদ্ধে রাজ্যগুলি বরাবরই প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছে৷‌ মুখ্যমন্ত্রীদের চিঠি পাঠানোর কথা জানিয়ে টুইটারে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আগে কখনও বিভাজ্য করভাণ্ডারে রাজ্যের ভাগ এক লাফে ১০ শতাংশ বাড়েনি৷‌ এটা নজিরহীন, ঐতিহাসিক৷‌ এটা যুক্তরাষ্ট্রীয় নীতির প্রতি তাঁর সরকারের দায়বদ্ধতারই প্রমাণ, দাবি মোদির৷‌ তিনি লিখেছেন, এর ফলে রাজ্যগুলির হাত আরও শক্ত হবে৷‌

সূত্র : আজকাল, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

রাজস্ব ভাগের সূত্রের সুদূরপ্রসারী প্রভাব

সমীক্ষা বলছে, চতুর্দশ অর্থ কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে রাজস্ব ভাগাভাগির সূত্রের প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী৷‌ মুদ্রাস্ফীতি প্রসঙ্গে বলা হয়েছে৷‌ ২০১৩ থেকে ৬ শতাংশের বেশি মুদ্রাস্ফীতি কমে গেছে৷‌ সেই সঙ্গে চলতি আমানতের ঘাটতি কমে যাওয়ায় ভারত আকর্ষণীয় বিনিয়োগের লক্ষ্য হয়ে উঠেছে৷‌ আশা করা যাচ্ছে এবার বর্ষা ভাল হবে৷‌ সমীক্ষা বলছে, মোট অভ্যম্তরীণ সঞ্চয় কমছে৷‌ ২০১১-১২-য় ছিল মোট জাতীয় উৎপাদনের ৩৩.৯ শতাংশ, ২০১২-১৩-য় ৩১.৮ শতাংশ, ২০১৩-১৪-য় ৩০.৬ শতাংশ৷‌ অন্য দিকে বিনিয়োগের হারও বিগত বছরগুলিতে কমেছে৷‌ ২০১১-১২-য় ৩৮.২ শতাংশের থেকে ২০১২-১৩-য় ৩৬.৬ শতাংশে নেমেছে৷‌ ২০১৩-১৪-য় হয়েছে ৩২.৩ শতাংশ৷‌ বিনিয়োগ নিয়ে বলা হয়েছে দীর্ঘকালীন অগ্রগতির জন্য বেসরকারি বিনিয়োগকেই প্রাথমিক ইঞ্জিন হতে হবে৷‌ সরকারি বিনিয়োগ বিশেষ করে রেলে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে অম্তত অম্তর্বর্তীকালে৷‌ সমীক্ষায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, বহু প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে৷‌ এবং এই প্রবণতা বিগত বছরগুলিতে বেড়েছে৷‌ বেশি বেশি করে বিনিয়োগের পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেল কার্যকর করা হোক৷‌ মোদির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’-কে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি ভারতকে দক্ষ করে তোলার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে৷‌ বলা হয়েছে, ২০১৪-১৫-য় মুদ্রাস্ফীতি নিচের দিকে নেমেছে৷‌ ২০১৪-১৫-য় মুদ্রাস্ফীতি নেমেছে ৩.৪ শতাংশ৷‌ যেখানে ২০১৩-১৪-য় কমেছে গড়ে ৬ শতাংশ৷‌ খাদ্যশস্যের উৎপাদন ২০১৪-১৫-য় ধরা হয়েছিল ২৫৭০.৭ কোটি টন৷‌ শেষ পর্যম্ত এই হিসেব পেরিয়ে যাবে গত ৫ বছরের খাদ্যশস্য উৎপাদনের গড়৷‌ ৮৫ লক্ষ টনের বেশি৷‌ সমীক্ষা বলছে, কৃষি ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো হোক এবং সুনিশ্চিত করা হোক খাদ্য নিরাপত্তা৷‌ খাদ্যে ভর্তুকির বিল ২০১৪-১৫-য় দাঁড়িয়েছে ১০৭৮২৩.৭৫ কোটি টাকা৷‌ বিগত বছরের থেকে ২০ শতাংশ বেশি৷‌ পরিকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে যথেষ্টই৷‌ পরিকাঠামোর উন্নয়নের হার ২০১১-১২-য় শিল্পোন্নয়নের হারের চেয়ে বেশি৷‌ এদিকে শিল্পোন্নয়ন বাড়ানোর জন্য বিবিধ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে সমীক্ষায় মম্তব্য করা হয়েছে৷‌ সমীক্ষার সুপারিশ, রেলের কাঠামো সংস্কার করা হোক, বাণিজ্যপদ্ধতি বদলানো হোক এবং প্রযুক্তিকে ঢেলে সাজানো হোক৷‌ সেই সঙ্গে রেলে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে বলা হয়েছে, অগ্রগতি ও উৎপাদন বাড়ানোর স্বার্থে৷‌ আর্থিক সংহতির ব্যাপারে সরকার দায়বদ্ধ থাকতে চায়৷‌ সমীক্ষা বলছে, বর্ধিত রাজস্ব অগ্রাধিকারের মধ্যে পড়ে৷‌ বহির্বাণিজ্য ক্ষেত্র অগ্রগতির পথে ফিরে আসছে৷‌ ২০০৮-এর পর থেকে এটা সব থেকে উল্লেখযোগ্য সময়৷‌ বলা হয়েছে, সরকার গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে ব্যাঙ্কিং, বিমা ও আর্থিক ক্ষেত্রে৷‌ সবার চোখের জল মোছানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার জনধন যোজনার মাধ্যমে৷‌ এই যোজনা এবং সেই সঙ্গে আধার ও মোবাইল নম্বর সমাধানের পথ খুলে দিয়েছে৷‌ পরিষেবা ক্ষেত্রের ব্যাপারে সমীক্ষা বলছে, প্রযুক্তিতে বড় অঙ্কের অগ্রগতি হতে চলেছে৷‌ ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’-কে সফল করে তুলতে গ্রামে তথ্যপ্রযুক্তির পরিষেবা দুর্বার গতিতে ঢুকছে৷‌ এ ছাড়া পর্যটন ক্ষেত্রকে অগ্রগতির মুখ দেখাচ্ছে বৈদ্যুতিন ভিসা৷‌ পরিষেবা ক্ষেত্র দুই অঙ্কের অগ্রগতির দিকে চলেছে৷‌ সমীক্ষা বলছে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্হায় পরিষেবা ক্ষেত্রের আলোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷‌ বাজারের বাধাগুলো তুলে নিতে চাওয়া হচ্ছে৷‌ সেই সঙ্গে চাওয়া হচ্ছে অভ্যম্তরীণ বিধিনিষেধও তুলে নেওয়া হোক৷‌ বলা হচ্ছে কৃষিপণ্যের জন্য জাতীয় সাধারণ বাজার তৈরি করা হোক৷‌ কৃষিপণ্য বিক্রি করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ২০০ কোটি টাকার অনুমোদন করছে৷‌ এর অন্যতম উদ্দেশ্য কৃষিপণ্যের বাজারিকরণের জন্য ই-প্ল্যাটফর্মের রূপায়ণ৷‌ এ ছাড়া রাজ্যগুলিকে বলা হচ্ছে, রাজ্যের মধ্যে কৃষিপণ্যের চলাচলের ব্যাপারে সমস্ত বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হোক৷‌ গোটা রাজ্যটাকেই একটা অভিন্ন বাজার হিসেবে ঘোষণা করা হোক৷‌ সমীক্ষা বলছে চতুর্দশ অর্থ কমিশন আর্থিক যুক্তরাষ্ট্রীয়তার প্রবণতা বাড়াবে৷‌ এদিকে পেট্রোপণ্যের ওপর বাড়তি কর চাপানোর কথা বলা হচ্ছে৷‌ বলা হচ্ছে, পেট্রোপণ্য ভর্তুকি দেওয়ার বদলে পেট্রোপণ্যের ওপর কর আরোপ করা হোক৷‌

সূত্র : আজকাল ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

আচ্ছে দিনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে আর্থিক সমীক্ষা

‘আচ্ছে দিন’ মনে হচ্ছে ‘আনেওয়ালে হ্যায়’। দিল্লির মসনদ দখলের লক্ষ্যে নরেন্দ্র মোদীর ফেরি করা সেই স্বপ্নই যেন এ বার উঠে এসেছে প্রাক্ বাজেট আর্থিক সমীক্ষায়। পরিসংখ্যানের বুনোটে। কিন্তু প্রশ্নচিহ্ন সহ।

শুক্রবার প্রকাশিত এই সমীক্ষায় পূর্বাভাস, আগামী আর্থিক বছরেই (২০১৫-’১৬) ৮% ছাপিয়ে যাবে বৃদ্ধির হার। পৌঁছবে ৮.১ থেকে ৮.৫ শতাংশে। এমনকী কয়েক বছরের মধ্যে তা টপকে যাবে ১০ শতাংশের গণ্ডিও। সে ক্ষেত্রে বিশ্বে সব থেকে দ্রুত বৃদ্ধির দেশ হিসেবে চিনকে অনেক পিছনে ফেলে দেবে ভারত। শুধু তা-ই নয়, মূল্যবৃদ্ধি সে ভাবে মাথাচাড়া দেবে না। বাণিজ্যে শ্রীবৃদ্ধি হবে। নিয়ন্ত্রণে থাকবে রাজকোষ ঘাটতিও। ফলে এই সমস্ত সুখবরে বলীয়ান অর্থ মন্ত্রকের মুখ্য উপদেষ্টা অরবিন্দ সুব্রহ্ম্যণনের দাবি, এ বার পরিকাঠামোয় বেশি টাকা ঢালতে আর ধার বাড়াতে হবে না। অর্থনীতির রথ ছুটবে টগবগিয়ে।

এই পর্যন্ত শুনলে মনে হয় যেন, শনিবার স্রেফ ফুল বিছানো রাস্তায় হেঁটে বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। কিন্তু বাস্তব যে তেমন নয়, তা স্পষ্ট সুব্রহ্ম্যণনের কথাতেই। তিনি বলছেন, বৃদ্ধির এই বিদ্যুৎ গতির দৌড়ে তিনি নিজেই কিছুটা হতবাক। শিল্পমহলেরও প্রশ্ন, কয়েক মাস আগেও ৬% বৃদ্ধির দাগ ছুঁতে খাবি খাচ্ছিল যে অর্থনীতি, এখন এমন অক্লেশে তা ১০ শতাংশের দিকে পা বাড়াচ্ছে কী ভাবে? তবে কি জিডিপি (দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন) মাপার পদ্ধতিতে যে বদল কেন্দ্র এনেছে, অর্থনীতিকে হঠাৎ ঝকঝকে দেখানোর চাবি সেখানেই লুকিয়ে? সুব্রহ্ম্যণনই জানিয়েছেন, অর্থনীতি বুলেট গতিতে এগোচ্ছে, এমনটা ভাবতে তিনি নারাজ। তবে বিশ্বজোড়া মন্দার প্রকোপ এবং সব থেকে খারাপ সময় কাটিয়ে যে তা দ্রুত বেরিয়ে আসছে, সে বিষয়ে তাঁর সন্দেহ নেই।

আসলে পরিসংখ্যানেরও অদ্ভুত বৈপরীত্য রয়েছে এ বারের সমীক্ষায়। বৃদ্ধির হার চড়া। বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং রাজকোষ ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে। ফুলেফেঁপে উঠছে বিদেশি মুদ্রার ভাঁড়ার। এক কথায়, অর্থনীতির ডানা মেলার সব লক্ষণই প্রায় স্পষ্ট। অথচ গত তিন মাসে দেশের ১০০টি বড় সংস্থার আয় কমেছে ৬%। শেয়ার বাজারে থলি উপুড় করে দিচ্ছে বিদেশি আর্থিক সংস্থাগুলি। কিন্তু কল-কারখানা গড়তে বিদেশি বিনিয়োগ এখনও তেমন আসছে না। রফতানি বাজার স্তিমিত। চাহিদা পুরোপুরি মাথা তোলেনি দেশের বাজারেও।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

অর্থনীতির সন্ধিক্ষণ

এই পরিস্থিতিতে সুব্রহ্ম্যণন মনে করছেন, আক্ষরিক অর্থেই অর্থনীতির এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাজেট পেশ করতে চলেছেন জেটলি। লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি তাঁর পিছনে। পেয়েছেন ভাগ্যের সহায়তা। কারণ, বিশ্ব বাজারে অশোধিত তেলের দাম হু হু করে নেমে আসায় রাজকোষ ঘাটতিতে লাগাম পরাতে সুবিধা হয়েছে তাঁর। পেট্রোল-ডিজেলে বাড়তি কর বসিয়ে জোগাড় করতে পেরেছেন পরিকাঠামোয় ঢালার অর্থ। কিন্তু এই সমস্ত সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতিকে দ্রুত বৃদ্ধির কক্ষপথে নিয়ে গিয়ে ফেলতে এখন প্রয়োজন সাহসী সংস্কার।

সাধারণত আর্থিক সমীক্ষা যে রকম ‘দুর্বোধ্য’ ভাষায় লেখা হয়, অনেকে বলছেন, এ বারেরটি সে দিক থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম। সম্ভবত আর একটি দিক থেকেও কিছুটা ব্যতিক্রমী সুব্রহ্ম্যণন। অর্থনীতির যুক্তির সঙ্গে তিনি মনে রেখেছেন রাজনীতির বাধ্যবাধকতা। যে কারণে সংস্কার চেয়েছেন। কিন্তু তা নিয়ে ধমাকা (বিগ ব্যাং) চাননি। তাঁর মতে, সংস্কারের পথে ছোট ছোট পা বাড়াতে হবে। তা করতে হবে নিয়মিত, নাছোড় ভাবে। তা হলেই সেগুলি জুড়ে জুড়ে রূপ নেবে বড় মাপের সংস্কার। উপদেষ্টা মনে করেন, ডিজেলের দাম বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া, গ্যাসের দাম বাড়ানো, অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকি ছাঁটাই, গরিব মানুষের হাতে সরাসরি নগদে ভর্তুকি, কয়লা খনির নিলাম, দ্রুত পণ্য-পরিষেবা কর চালু করা, জন-ধন যোজনায় সাফল্য, জমি অধিগ্রহণ আইন সংশোধন ইত্যাদি পদক্ষেপ জুড়ে জুড়েই ছুটতে পারে বড় মাপের সংস্কারের রথ। অনেক দিন থেকেই সুব্রহ্মণ্যন বলছেন, বৃদ্ধির চাকায় গতি ফেরাতে পরিকাঠামোয় বিপুল লগ্নি প্রয়োজন। মোদী-জমানায় দেশের শিল্পমহলের মধ্যে নতুন করে উদ্দীপনা তৈরি হলেও, এখনও লগ্নি করতে দু’বার ভাবছে তারা। দরজা খুলে দেওয়া সত্ত্বেও এখনও সে ভাবে আসেনি বিদেশি লগ্নি। এই পরিস্থিতিতে চাকা ঘোরানোর প্রাথমিক দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে বলে সওয়াল করেছেন তিনি। এ দিনের সমীক্ষা যদি ইঙ্গিত হয়, তা হলে বাজেটে পরিকাঠামো ক্ষেত্রে বিপুল বিনিয়োগের কথা বলতে পারেন জেটলি। এবং তিনি তা করবেন রাজকোষ ঘাটতিকে লাগাম পড়িয়েই।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

আর্থিক সমীক্ষা এক নজরে

পরিকাঠামো ক্ষেত্রে বিপুল বিনিয়োগের কথা বলতে পারেন জেটলি। এবং তিনি তা করবেন রাজকোষ ঘাটতিকে লাগাম পড়িয়েই।

সুব্রহ্ম্যণন মনে করছেন, বাজপেয়ী জমানায় পরিকাঠামো গড়তে সড়ক যে ভূমিকা নিয়েছিল, মোদী-রাজে তা হতে পারে রেল। রেল বাজেটে সুরেশ প্রভু ঘোষণাও করেছেন যে, পাঁচ বছরে রেলের পরিকাঠামোয় সাড়ে ৮ লক্ষ কোটি টাকা ব্যয় হবে। যে ভাবে অর্থনীতির ভিত শক্ত করতে চিন রেল-পরিকাঠামোয় জোর দিয়েছে। রেলমন্ত্রী প্রভু এ বার তাঁর বাজেটে নতুন ট্রেন বা স্টেশনের তালিকা দেননি। জোর দিয়েছেন থমকে থাকা প্রকল্প শেষের উপর। সেই একই ছবি আর্থিক সমীক্ষাতেও। অর্থ মন্ত্রকের হিসেবে, ৮ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি প্রকল্প আটকে রয়েছে। যা জিডিপি-র প্রায় ৭%। শুধু ওই প্রকল্পগুলি শেষ করতে পারলেই অর্থনীতিতে গতি ফেরানো সম্ভব। সুব্রহ্মণ্যন মনে করেন, আপাত দৃষ্টিতে ছোট ছোট এই সব কাজ যত্ন নিয়ে করে যেতে পারলেই ১০% বৃদ্ধির মাইলফলক পেরোতে পারে অর্থনীতি। অনেক ‘কিন্তু’ তার পরেও থাকে। যা সরকারের হাতের বাইরে। যেমন, ভাল কৃষি উৎপাদনের জন্য দরকার ভাল বর্ষা। শিল্প উৎসাহিত হবে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সুদ কমালে। পরিকাঠামোয় লগ্নির সুযোগ কমবে তেলের দর হঠাৎ বেড়ে গেলে। সমস্যা ডেকে আনতে পারে হঠাৎ লাগা যুদ্ধ কিংবা অন্য কোথাও ঘনিয়ে আসা মন্দা।

কিন্তু সেই সব দুর্ভাবনা সরিয়ে রাখলে, অর্থনীতি সত্যিই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বলে মনে করছে সমীক্ষা। জেটলির দায়িত্ব সেই ‘আচ্ছে দিন’কে বরণ করার।

আর্থিক সমীক্ষায় সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে ফিসকাল রেসপন্সিবিলিটি অ্য‌ান্ড বাজেট ম্য‌ানেজমেন্ট অ্য‌াক্টের প্রতিটি ধারা সঠিক ভাবে রূপায়ন করার ওপর। যদিও এই আইনটি ইউপিএ সরকারের আমলে চালু হয়েছিল কিন্তু বতর্মান বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার আইনের বিশিষ্ট বিষয়গুলিকে রূপায়নের ব্য‌াপারে বদ্ধ পরিকর। এর প্রধান বিষয় হল সরকারি অর্থ খরচের উপর লাগাম টানা। বেপরোয়াভাবে টাকা খরচ করা যাবে না।খয়রাতি সাহায্য‌ বা দান করে যথেচ্ছভাবে সাধারণ মানুষের টাকা শেষ করা একেবারেই বেআইনি। প্রত্য‌েকটি রাজ্য‌কে এ ব্য‌াপারে কড়া নজরদারি চালানোর কথা বলা হয়েছে।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

বাজেট নিয়ে প্রতিক্রিয়া

রেল বাজেট মোটের ওপর মন্দ নয়। ভাড়া বাড়েনি। আম আদমি খুশি। তবে কিছু পণ্যের উপর মাশুল বাড়ায় কপালে একটু ভাঁজ অবশ্যই পড়েছে। কলকাতার মেট্রো প্রভুর থেকে প্রসাদ পেয়েছে কণিকা মাত্র।

রাজ্য বাজেট ছিল বিশ্বকাপের আগে অনেকটা রঞ্জি ম্যাচের মতো। ভোটের মুখে প্রাপ্তি কিন্তু খারাপ হয়নি। ভ্যাট নিয়ে নানা ছাড় খুশি করেছে ছোট ব্যবসায়ীদের। স্ট্যাম্প ডিউটিতে ১% ছাড় মিলবে ৩০ লক্ষের জায়গায় ৪০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত সম্পত্তি হস্তান্তরেও। উপকৃত হবেন মধ্যবিত্তরা। চাহিদা বাড়বে কম দামি ফ্ল্যাটের।

আসা যাক ফাইনাল ম্যাচ বিশ্লেষণে। যদি জিজ্ঞেস করা হয়, এ বারের কেন্দ্রীয় বাজেট কেমন হল? এর উত্তর এক কথায় ‘ভাল’ বা ‘মন্দ’ বলা শক্ত। বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ যেমন মধ্যবিত্ত, ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, শেয়ার বাজারের লগ্নিকারী প্রত্যেকেই মনে করেন, বাজেট তাঁদের জন্যই রচিত হয়। তৈরি করেন নিজস্ব ‘উইশ লিস্ট’। বেশির ভাগ মিললেই তাঁদের কাছে বাজেট ভাল। না-মিললে মুখ ভার। সামগ্রিক ভাবে দেশের কথা অনেকেই ভাবেন না। এই সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটে জেটলির উপর ছিল ৪০০ রানের উইশ লিস্টের চাপ। রাজনীতির খাতিরে ছিল বাউন্সারের চাপ। চাপ ছিল দলের রাজনৈতিক লক্ষ্যপূরণের দৃষ্টিকোণ থেকেও। এত সব চাপ সামলে জেটলি কেমন বাজেট করলেন, দেখব এক নজরে।

মধ্যবিত্ত

আশা ছিল পাতে ঘি পড়বে। পড়েনি। করমুক্ত আয়ের স্তর বাড়েনি। বাড়েনি ৮০সি ধারায় ছাড়। পেনশন প্রকল্পে লগ্নিতে ছাড় মিললেও একটু বয়স্ক মানুষেরা এই সুবিধা পাবেন না। স্বাস্থ্য -বিমায় বাড়তি ১০ হাজার টাকা খরচ হয়তো কম আয়ের মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়। অন্য দিকে বাড়তি পরিষেবা কর শুষে নেবে লাভের গুড়। যাঁরা করের আওতায় নেই, তাঁদেরও গুনতে হবে এই কর। পরিবহণ ভাতা বাবদ ছাড় পাবেন শুধু চাকরিজীবীরাই। নিজের বসবাসের জন্য গৃহঋণের প্রয়োজন অনেকেরই থাকে না। অর্থাৎ সরকারের হিসেব মতো ৪,৪৪,২০০ টাকা ছাড় অনেকেই নিতে পারবেন না। সব মিলিয়ে মধ্যবিত্ত মধ্যম মান দিচ্ছে এই বাজেটকে।

করদাতা

উঁচু হারে করদাতারা খুশি করমুক্ত বন্ড পুনরায় চালু হওয়ার আশ্বাসে। যাঁরা চলতি বছরে অবসর নেবেন, তাঁদের জন্য আছে সুসংবাদ। সম্পদ কর বিলোপ করাও ভাল খবর অনেকের কাছে। অতি ধনীরা ২ শতাংশ অতিরিক্ত সারচার্জ দিতে আপত্তি করবেন না, কারণ তাঁদের সম্পদ কর দিতে হচ্ছে না। সব মিলিয়ে উচ্চবিত্ত মানুষেরা অখুশি নন।

গৃহিণী

পরিষেবা কর বাড়ায় উদ্বিগ্ন। বিনোদন, বিউটি পার্লারে কোপ। উৎপাদন শুল্ক বাড়ায় দাম বাড়বে বেশ কিছু পণ্যের। অর্থাৎ হাতে টাকা কমবে। অন্য দিকে অবশ্য লকারে পড়ে থাকা সোনা জমা রেখে সুদ পাওয়া যেতে পারে এই খবরে তাঁরা উৎসাহিত। কিনতে পাওয়া যাবে গোল্ড বন্ড। মিলবে অশোকস্তম্ভ মার্কা ভারতীয় স্বর্ণমুদ্রা। উপহার হিসেবে মন্দ হবে না।

আমজনতা

সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা। নামমাত্র খরচে দুর্ঘটনা বিমা। জীবনবিমা এবং ন্যূনতম পেনশনের ব্যবস্থা একদম নিচুতলার মানুষের জন্য বড় পদক্ষেপ। জাতীয় উৎপাদন আরও বেশি হারে বাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন জেটলি। দেখতে হবে জাতীয় আয়ের কত শতাংশ ছাঁকনি গলে নিচুতলায় পৌঁছয়।

শিল্প-বাণিজ্য মহল

কোম্পানি কর ধাপে ধাপে ৫ শতাংশ কমানো বড় সুখবর। অন্য দিকে অবশ্য কয়েকটি ছাড় তুলেও নেওয়া হবে। পদক্ষেপটি ভাল, কারণ ছাড় নিয়ে অনেক ভুল বোঝাবুঝি ছিল। এখন ব্যাপারটি সরল হল। পরিকাঠামো শিল্পে অতিরিক্ত ৭০ হাজার কোটি টাকা লগ্নির প্রস্তাব খুবই যুক্তিযুক্ত। এর ফলে বিভিন্ন শিল্প উপকৃত হবে। বাড়বে কর্মসংস্থান। ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্যও বেশ কিছু ব্যবস্থা আছে জেটলির বাজেটে। শিল্পপতিরা এই বাজেটকে দশে ৭ থেকে ৯.৫ নম্বর দিয়েছেন। তবে বাজেট সবে পেশ করা হয়েছে। পুরো বিশ্লেষণ হতে আরও কয়েক দিন লাগবে। চুলচেরা বিশ্লেষণ হলে কষা যাবে ভাল-মন্দের অঙ্ক।

লগ্নিকারী

কোম্পানি কর কমায় শেয়ার বাজার খুশি। তবে শনিবার বাজার বাজেটকে পুরো বুঝে উঠতে পারেনি। তাই সূচক উত্তাল ছিল দিনভর। দিনের শেষে অবশ্য সেনসেক্স বন্ধ হয়েছে ১৪১ পয়েন্ট উপরে। ডিভিডেন্ড বণ্টন-করে হাত দেওয়া হয়নি। বন্ড-বাজারকে শক্তিশালী করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বাজেটে। বাজেটে বাজার বেজায় খুশি না-হলেও আর্থিক বৃদ্ধির গতি বাড়বে এই আশ্বাসে ভর করে বাজার আগামী দিনে তেজীই থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। সোমবার বাজার খুললে বাজেটের প্রকৃত প্রতিফলন দেখা যাবে সূচকের ওঠা-নামার তালে।

দেশ

বাজেটে বড় কোনও বোমা ফাটেনি। বেশ কিছু নতুন সড়ক নির্মাণের কথা বলা হলেও অনেকটা চিদম্বরমের পথেই হেঁটেছেন জেটলি। তবে বাজেটে কোনও নতুন দিশা নেই, তা নয়। আসলে এত বড় দেশের এত সমস্যা একটি বাজেটের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়।

প্রতিশ্রুতি অবশ্য ছিল অনেক। এর একটি বড় অংশ এ বারও অধরা রয়ে গেল। রাজনৈতিক কারণে সংস্কারের পথে বড় পদক্ষেপ করা গেল না। সব মিলিয়ে এ বারের বাজেট আলোকপাত করেছে বহু বিষয়ের উপরে। সব ক্ষেত্রে অল্প-বিস্তর উন্নতি হলেও মোট ফল খারাপ হবে না। এমনিতেই অর্থনীতির অনেক শর্ত এখন বেশ অনুকূলে। এর সঙ্গে বাজেটের সুফল যুক্ত হয়ে বুলেট ট্রেনের গতিতে না-হোক রাজধানী এক্সপ্রেসের গতিতে দেশ এগোবে বলে আশা করা যেতেই পারে।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ২ মার্চ ২০১৫

বাজেট বিষয়ে যে কথাগুলো জানা ভালো

আয়করে কিছু বাড়তি ছাড় পাওয়া গেল কি না, এটুকুর বাইরে বাজেট নিয়ে আমজনতার বিশেষ আগ্রহ নেই। থাকার কথাও নয়। জিডিপির মারপ্যাঁচ আর রাজকোষ ঘাটতি, বিনিয়োগের হযবরল নিয়ে খামখা রাতের ঘুম নষ্ট করে কে? কিন্তু, এই অনাগ্রহের ফাঁক গলেই এমন অনেক কিছু ঘটে যায়, যেগুলো আমার আপনার জানা দিরকার, কিন্তু আমরা জানি না। তেমনই কয়েকটা বিষয়ের কথা বলব।

প্রথম কথা, আমরা যারা মোটের ওপর সচ্ছল, তারা মাঝেমধ্যেই অভিযোগ করি, আমাদের রক্ত জল করা রোজগার থেকে আমরা কর দিয়ে মরি, আর গরিবরা দিব্যি নিখরচায় হাজার সুবিধা পায়। কথাটা ঠিক নয়। গরিব মানুষকেও কর দিতে হয়। উৎপাদন শুল্ক, বিক্রয় কর, ‘ভ্যাট’ বা যুক্তমূল্য করের মতো পরোক্ষ কর গরিব, বড়লোক দেখে না। গরিব মানুষ যখনই প্যাকেজড পণ্য কেনেন, যেমন ওষুধ, সাবান বা বিস্কুট অথবা মোবাইল ফোন রিচার্জের মতো কোনও পরিষেবার দাম মেটান, তখন প্রত্যেক বার তাঁদেরও পরোক্ষ করগুলো দিতে হয়। বড়লোকের তুলনায় গরিব নিজেদের রোজগারের অনেক বেশি অংশ নানা পণ্য কিনতে ব্যয় করেন, ফলে হিসেব কষলে হয়তো দেখা যাবে, আয়ের শতাংশ হিসেবে বড়লোকদের তুলনায় গরিবই বেশি কর দিচ্ছেন। মনে রাখা ভালো, দেশের মাত্র পাঁচ শতাংশ মানুষ আয়কর দেন। ডাক্তার, উকিল, কনসালট্যান্ট, গৃহশিক্ষকদের মতো বহু স্বনিযুক্ত মানুষ প্রকৃত রোজগার চেপে যেতে পারেন। ভারতে কৃষি আয়ে কর নেই। পঞ্জাব হরিয়ানায় প্রাসাদনিবাসী চাষিরাও এক পয়সা আয়কর দেন না।

ভর্তুকির কথা বলি। দরিদ্র থেকে লক্ষপতি, সবাই এলপিজির সিলিন্ডারে সমান ভর্তুকি পান। সরকারি স্কুলকলেজে বড়লোকের ছেলেমেয়েরাও নামমাত্র খরচে পড়াশোনা করে। আমার ছেলে যাদবপুরে কম্পিউটার সায়েন্স পড়ত। মাসে ৫০ টাকা টিউশন ফি। ধনী চাষি অনেক বেশি মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহার করেন, ফলে এই সারের ভর্তুকি গরিবের তুলনায় বড়লোক চাষিদের পকেটেই পৌঁছয় অনেক বেশি। কাজেই, গরিবরা কর না দিয়ে সব কিছু নিখরচায় পেয়ে যাচ্ছে, এমন কথা বলার আগে দু’বার ভেবে নেওয়া ভালো।

দ্বিতীয় কথা, যে নীতি ‘গ্রোথ’ বা আর্থিক বৃদ্ধির দিকে ঝুঁকে থাকে, তা দ্রুত বিনিয়োগ বান্ধব ও দরিদ্র বিরোধী নীতি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায়। কিন্তু মানুষকে দারিদ্রের বাইরে নিয়ে আসতে হলে উৎপাদনশীল চাকরির ব্যবস্থা করতেই হবে। সে জন্য বৃদ্ধির বিকল্প নেই। অতএব, শিল্পবান্ধব নীতি দরিদ্রবান্ধবও বটে। ভারতের মতো দরিদ্রবহুল দেশে শুধু আর্থিক বৃদ্ধি দিয়েই অন্তত অদূর ভবিষ্যতে দারিদ্রের সমস্যার সমাধান করে ফেলা যাবে না, সে কথা অনস্বীকার্য। গরিবের জন্য খাদ্যে ভর্তুকি, বা অপেক্ষাকৃত কম কর্মসংস্থানের মাসগুলিতে নিশ্চিত কাজের ব্যবস্থা জরুরি। কিন্তু যে নীতি ভারতকে বিনিয়োগের উপযোগী করে তোলার চেষ্টা করবে, সেটাকেই দরিদ্রের পরিপন্থী বলে দাগিয়ে দেওয়ার কোনও যৌক্তিকতা নেই।

তিন, যোজনা ব্যয় এবং যোজনাবহির্ভূত ব্যয় নিয়েও ভুল ধারণা আছে। যোজনা খাতে ব্যয় মূলত উন্নয়নের কাজে ব্যবহৃত হয়, আর যোজনাবহির্ভূত ব্যয় হল মূলত বিভিন্ন পরিকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণের খরচ। ধরেই নেওয়া হয়, দ্বিতীয় ব্যয়ের তুলনায় প্রথমটা ভালো বা বেশি জরুরি। কিন্তু কেন? নতুন রাস্তা বা হাসপাতাল তৈরি করা কেন পুরনো রাস্তা বা হাসপাতাল রক্ষণাবেক্ষণের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে? বরং, নতুন নির্মাণে এক টাকা খরচ করলে যত সামাজিক লাভ, পুরনো পরিকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণে সেই টাকা খরচ করলে বহু ক্ষেত্রে সামাজিক লাভ বেশি হবে। কেন যোজনা ব্যয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তার কারণ সম্ভবত অন্যত্র। নতুন বিনিয়োগ হলে সরকারি দফতরগুলোর পোয়াবারো। তাতে অনেক বেশি ‘কাট মানি’ আদায় করা যায়।

শেষে বলি, অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন, চতুর্দশ অর্থ কমিশনের সুপারিশ মেনে তাঁরা দেশের মোট রাজস্বে রাজ্যগুলির হিস্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে  ৪২ শতাংশ করে দিয়েছেন। কিন্তু অর্থমন্ত্রী বলেননি যে, কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলির খাতে এত দিন কেন্দ্রের থেকে রাজ্যগুলি যে টাকা পেত, এ বার থেকে তার অনেকটাই কমে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে ছবিটা কী রকম দাঁড়াল, তার বিবিধ হিসেব পাওয়া যাচ্ছে। একটা হিসেবে দেখছি, গত বছর কেন্দ্রের হাতে এক টাকা থাকলে রাজ্যগুলি তার থেকে ৩৬ পয়সা পেত, এ বার পাচ্ছে ৩৭ পয়সা। কাজেই, রাজ্যগুলির হাতে যে টাকা বাড়ল, তা অতি সামান্য। অর্থমন্ত্রীর গালভরা দাবির সঙ্গে বাস্তব প্রাপ্তির মিল নেই। তবে, রাজ্যগুলির হাতে মোট টাকার অঙ্ক প্রায় সমান থাকলেও এ বার তাদের স্বাধীনতা অনেক বেশি। কোন খাতে কত টাকা খরচ হবে, রাজ্যই স্থির করবে। এর ভালো আর মন্দ, দুই দিকই আছে। এই টাকায় কোনও রাজ্য সম্পদ তৈরি করতে পারে, ভবিষ্যতের জন্য তৈরি হতে পারে। আবার, অন্য কোনও ভোটের আগে মানুষের মন পেতে এই টাকাটা উড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু সেই বাজে খরচের পর সে রাজ্যগুলোর আর অভিযোগ করার উপায় থাকবে না যে কেন্দ্র তাদের দরকারের কথা না ভেবেই বিভিন্ন প্রকল্প চাপিয়ে দেয়।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১১ মার্চ ২০১৫

বাজেট ও আগামী দিনের অর্থনীতি

লক্ষ্য কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও দারিদ্র দূরীকরণ

রাজকোষ ঘাটতিকেই পাখির চোখ করেছিলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। বাজেটের কিছু দিন আগে থেকেই তাঁর কথাবার্তায় তারই আভাস ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল। অর্থমন্ত্রী তাঁর কথা রেখেছেন।

নরেন্দ্র মোদী সরকারের এটাই ছিল প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। স্বাভাবিক ভাবেই এই বাজেটকে ঘিরে শিল্পমহলের প্রত্য‌াশা ছিল বিপুল। বিপুল প্রত্য‌াশা ছিল সার্বিক ভাবে আমজনতারও। বাজেট, অর্থশাস্ত্রের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনও দেশের আগাম আর্থিক বছরের আয়-ব্য‌য়ের একটা আনুমানিক হিসাবমাত্র। অর্থাৎ হিসাব মতো এটা নিছকই আয়-ব্য‌য় সংক্রান্ত কিছু শুকনো অঙ্কের কচকচি। এতে তাই আমজনতার কোনও কৌতুহল থাকার কথা নয়। কিন্তু কার্যত বাজেটকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্য‌ে বিপুল উৎসাহ লক্ষ করা যায়। এর কারণ কী, সেটা বুঝতে গেলে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর বাজেট ভাষণটির দিকে একটু লক্ষ রাখতে হবে। বাজেট ভাষণের দু’টি অংশ থাকে -- পার্ট এ এবং পার্ট বি। পার্ট এ-তে থাকে সরকারের কর্ম পরিকল্পনা। অর্থাৎ আগামী বছর সরকার কী করবে বলে ভাবছে তার একটা রূপরেখা। আর পার্ট বি-তে থাকে সরকারের আয়-ব্য‌য়ের আনুমানিক অঙ্কগুলি। বাজেট ভাষণের এই যে গঠন,এ বার বাজেট ভাষণের শুরুতে অর্থমন্ত্রী তার একটা উল্লেখ করেছেন। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বাজেট ভাষণে সরকারের অর্থনৈতিক নীতির গতিমুখ ও গতিবেগ দেশবাসীর কাছে হাজির করার একটা সুযোগ থাকে। সেই সুযোগটি গ্রহণ করেই তিনি তাঁর সরকারের ‘রোডম্য‌াপটি’ সবার সামনে উপস্থাপিত করতে চান। কোন রোডম্য‌াপ তা-ও তিনি বাজেট ভাষণে সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করেছেন। সেই রোডম্য‌াপ যা দেশের বৃদ্ধির হার ত্বরান্বিত করবে, বিনিয়োগ বৃদ্ধি করবে এবং বৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে। আমরা অর্থমন্ত্রীর রোডম্য‌াপ ধরেই আলোচনা করব তাঁর লক্ষ্য‌ ও প্রস্তাবের সঙ্গে সামঞ্জস্য‌ কতটা সুরক্ষিত করছে এই বাজেট। তবে অর্থনীতির বৃদ্ধির প্রসঙ্গটি যে হেতু বিনিয়োগের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত সে হেতু এই দু’টি প্রসঙ্গ আমরা এক সঙ্গে আলোচনা করব। আবার বাজেট ভাষণেরই অন্য‌ত্র অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সরকারের প্রতিটি টাকা জনসাধারণের মঙ্গল সাধনের জন্য‌ কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, দারিদ্র দূরীকরণ এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধির লক্ষ্য‌ে খরচ করা হবে। বৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের মধ্য‌ে পৌছে দেওয়া, অর্থমন্ত্রীর এই কথার আমরা তাই দু’টি মানে করব -- কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও দারিদ্র দূরীকরণ।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৫

সেচের উন্নতিতে ৫৩০০ কোটি

অর্থনীতির বৃদ্ধি কখন ঘটে ? অর্থনীতির বৃদ্ধি ঘটে তখনই যখন উৎপাদনের বৃদ্ধি ঘটলে। অর্থনীতির উৎপাদন ক্ষেত্র তিনটি --- কৃষি, শিল্প এবং পরিষেবা। ভারত মূলত কৃষিপ্রধান দেশ। একটা সময় ছিল যখন কৃষিই ছিল সমগ্র দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা। জনসংখ্য‌ার গরিষ্ঠ অংশই যেমন কৃষির উপর নির্ভরশীল ছিল তেমনই জাতীয় আয়ের বেশি অংশটাই আসত কৃষি থেকে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, কৃষির সেই সুদিন আর নেই। অনেক দিন ধরেই নেই। এখনও অবশ্য দেশের বেশির ভাগ মানুষ জীবিকার প্রশ্নে কৃষির উপর নির্ভরশীল, কিন্তু জাতীয় আয়ের গরিষ্ঠ অংশই আসে পরিষেবা ক্ষেত্র থেকে। এর ফলে এই দেশে আয়ের ক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর একটি বৈষম্য‌ের সৃষ্টি হচ্ছে, যা দেশের সামাজিক সুস্থিতিকে নষ্ট করে দিচ্ছে। আর তারই সঙ্গে দারিদ্রকে স্থায়িত্ব দিচ্ছে। এই অবস্থায় কৃষির উপর একটি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন ছিল। কৃষি উৎপাদন যদি বাড়ানো হত তা হলে তা যেমন এক দিকে অর্থনীতির বৃদ্ধির পক্ষে সহায়ক হত তেমনই বৃদ্ধির সুফল সমাজের একেবারে দরিদ্রতম শ্রেণির মানুষের কাছেও পৌঁছত। কিন্তু কৃষির উন্নয়নের লক্ষ্য‌ে কেন্দ্রীয় বাজেটে যে প্রস্তাব রাখা হয়েছে, তা উদ্দেশ্য‌ পূরণ করার লক্ষ্যে কতটা সহায়ক হবে সেটা এখনই বোঝা সম্ভব না। সেচের অভাব ভারতীয় কৃষির একটি দীর্ঘকালীন সমস্য‌া। সেচের উন্নতির জন্য‌ ৫৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে ‘প্রধানমন্ত্রী কৃষি সিঁচাই’ যোজনায়। এটি বাজেট প্রস্তাবের একটি ভালো দিক। তবে মনে রাখা দরকার, গত বাজেটে এই একই যোজনায় যে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল তা কিন্তু খরচ করে ওঠা সম্ভব হয়নি। মনে রাখতে হবে সেই টাকা কিন্তু এখনও পড়ে রয়েছে। তা ছাড়া সেটি ছিল আংশিক বাজেট। বরাদ্দের পরিমাণ তাই স্বাভাবিক ভাবেই কম ছিল। দুটো মিলিয়ে তাই কৃষি সেচের ক্ষেত্রে বরাদ্দের পরিমাণটি খুব বেশি তা বলা যায় না।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৫

সুসংহত জাতীয় কৃষি বাজার

সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া বাজেট প্রস্তাবে জমির উৎকর্ষ বৃদ্ধি, কৃষি ঋণ ও কৃষি বিক্রয়ের কথাও বলা হয়েছে। এ দেশে জমি ক্রমশই উর্বরতা হারাচ্ছে রাসায়নিক সারের অত্য‌ধিক ব্য‌বহারের কারণে। জমির স্বাস্থ্য‌ ফেরানোর জন্য কৃষি মন্ত্রক যে ‘পরম্পরাগত কৃষি বিকাশ যোজনা’ প্রবর্তন করেছে অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি তাতে সমর্থন জানিয়েছেন। অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে গ্রামীণ উন্নয়ন সংক্রান্ত বিভিন্ন ফান্ডে। অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে রুরাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ফান্ডে (২৫ হাজার কোটি টাকা)। লঙ টার্ম রুরাল ক্রেডিট ফান্ডে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা। শর্ট টার্ম কো-অপারেটিভ রুরাল ক্রেডিট ফাইন্যান্স ফান্ডে বরাদ্দ হয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা এবং শর্ট টার্ম আরআরবি রিফাইন্যান্স ফান্ডে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রীর প্রত্যাশা, এই অর্থ সাহায্যে কৃষিঋণ বণ্টিত হবে ৮.৫ লক্ষ টাকা। সব শেষ আনা হয়েছে কৃষিপণ্য‌ের বিক্রয়জনিত সমস্য‌াটির কথা। আমাদের দেশে কৃষকদের মধ্য‌ে সংখ্য‌ায় বেশি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা। এদের অন্য‌তম বড় সমস্য‌া নিজেরা ফসল বাজারে নিয়ে যেতে পারে না বলে এরা সে ভাবে ফসলের দাম পায় না। এই সমস্য‌া কাটাতে অর্থমন্ত্রী রাজ্য‌গুলির সঙ্গে কথা বলে একটি ‘সুসংহত জাতীয় কৃষি বাজার’ স্থাপনের উদ্য‌োগ নেবেন বলে জানিয়েছেন। যে বাজার তৈরি হলে চাষিরা তাদের ফসল দেশের যে কোনও বাজারে বিক্রি করতে পারবে। অর্থাৎ এই বাজার আসলে ই-বাজার। কিন্তু প্রশ্ন হল, প্রায় নিরক্ষর চাষি যেখানে হাতের কাছে বাজারেই পৌঁছতে পারছে না, সেখানে সে ই-বাজারে ফসল বিক্রি করতে পারবে ? তবে এ কথাও সত্য‌ি আজ যা কল্পনা করা যায় কাল তা বাস্তবায়িতও করা যায়। আশা করা যাক, আগামী বাজেটে এমন একটি সুসংহত বাজারের একটি সুসংহত রূপরেখা অর্থমন্ত্রী উপস্থাপিত করতে পারবেন। পারলে ভারতীয় কৃষি যে তার পঙ্গুত্ব অনেকটা কাটিয়ে উঠতে পারবে সে কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৫

পরিকাঠামো বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব

কৃষির পর আসে শিল্প। স্বাধীনতার পর দেশের শিল্প বিকাশের দায়িত্বটি সরকার পুরেপুরি বেসরকারি হাতে ছেড়ে দেয়নি। ফলে রাষ্ট্রের অধীনে নানা ধরনের শিল্প এ দেশে গড়ে উঠেছিল। কিন্তু যত দিন গিয়েছে ভারত তত পরিণত হয়ে উঠেছে। ততই বোঝা গিয়েছে সরাসরি উৎপাদনের দায়িত্ব নেওয়া, নিতান্ত জনস্বার্থে প্রয়োজন না হলে, সরকারের কাজ নয়। ফলে উনিশশো নব্বইয়ের দশকে নয়া আর্থনীতিক নীতির গোড়াপত্তনের পর থেকে আস্তে আস্তে বিলগ্নীকরণের মাধ্য‌মে সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত উৎপাদনের ক্ষেত্রের বোঝাগুলি ঘাড় থেকে নামিয়ে ফেলতে শুরু করে।

এই কাজটি প্রতিটি সরকার গত দু’দশক ধরে নিয়মমাফিক করে যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠতেই পারে সরকার অলাভজনক সংস্থার শেয়ার আগে বিক্রি না করে কেন লাভজনক সংস্থাগুলির শেয়ার আগে বিক্রি করতে গেল। এই প্রশ্নের একটি বাঁধা গতের উত্তর আছে। অলাভজনক সস্থার শেয়ার কে কিনবে? তা হলে একটা জিনিস করা যেতে পারে। যে নবরত্ন কোম্পানিগুলি সরকারের আছে, সেই কোম্পানির শেয়ারের সঙ্গে প্য‌াকেজ হিসাবে অলাভজনক সংস্থার শেয়ার বিক্রি করা যেতে পারে। যাই হোক শিল্প প্রসঙ্গে আলোচনা করার শুরুতেই রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে বিলগ্নীকরণের প্রসঙ্গটি প্রথেমই উচ্চারণ করার কারণ এটা বোঝানো যে শিল্পায়নের প্রশ্নে বেসরকারি উদ্য‌োগের উপর নির্ভরতাই সরকারের প্রাথমিক নীতি। তবে বেসরকারি লগ্নি চাইলেই আসে না, বিশেষত বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে। বেসরকারি পুঁজি সেখানেই তার লগ্নি ঢালতে চাইবে যেখানে পরিকাঠামো প্রস্তুত। এই পরিকাঠামোর মধ্য‌ে রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে বাজার --- সব কিছুই আছে। অর্থমন্ত্রী তাই সঠিক লক্ষ্য‌েই পরিকাঠামো বিকাশের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। পরিকাঠামো বিকাশ সংক্রান্ত প্রস্তাবসমূহের মধ্য‌ে প্রথমেই আছে রাস্তা ও রেলের কাজে বাজেটীয় সহায়তা প্রদানের কথা। এখানে একটা প্রশ্ন আছে। এ কথা কথাচ্ছলে প্রায়ই বলা হয় রেল যদি স্রেফ তার টিকিটবিহীন যাত্রাটুকু রুখতে পারে তা হলে সারা দেশের রেলপথগুলিকে সোনায় মুড়ে দেওয়া যায়। কথাটার নিহিতার্থ বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তাই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, ফাঁকফোকরগুলি আগে বন্ধ না করে রেলে ১৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা কতটা যুক্তিসঙ্গত ?

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৫

জাতীয় বিনিয়োগ ও পরিকাঠামো তহবিল

রেল ব্যবস্থায় আরও দুর্বলতার কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। যেমন রেল ভাড়া দীর্ঘদিন না বাড়ানো। জনমোহনের সস্তা রাজনীতি করতে গিয়ে যাত্রী ভাড়া না বাড়িয়ে দীর্ঘদিন ধরে রেলকে রুগ্ন করা হয়েছে। যারা দরিদ্র তাদের জন্য‌ যদি আলাদা ভাবে সস্তায় খাদ্য‌, জ্বালানি ইত্য‌াদি সরবরাহ করা যায় তা হলে একই উপায়ে সস্তার টিকিটও বিক্রি করা যেত। রেলে এতটা লগ্নির পরিবর্তে তাই নতুন রাস্তা নির্মাণে আর একটু বেশি বিনিয়োগ করা যেত। তুলনামূলক ভাবে বরং একটি ভালো প্রস্তাব জাতীয় বিনিয়োগ ও পরিকাঠামো তহবিল গঠন।

পরিকাঠামো ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য‌ প্রতি বছর ধারাবাহিক ভাবে ২০ হাজার কোটি টাকার জোগান সুনিশ্চিত করতে ন্য‌াশনাল ইনভেস্টমেন্ট অ্য‌ান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ড (জাতীয় বিনিয়োগ ও পরিকাঠামো তহবিল) গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া এই খাতে অর্থের জোগান সুনিশ্চিত করতে কর-সাশ্রয়ী পরিকাঠামো বন্ড আবার ফিরিয়ে আনা যে মধ্য‌বিত্ত করদাতাদের খুশি করবে সেটা বলাই বাহুল্য‌। পরিকাঠামো উন্নয়নে আর একটি উল্লেখযোগ্য‌ পরিকল্পনা পাঁচটি ৮ হাজার মেগাওয়াট শক্তিসম্পন্ন বিদ্য‌ুৎ প্রকল্প গঠন। বাজেট প্রস্তাব অনুযায়ী এই বিদ্য‌ুৎ প্রকল্প গঠনের জন্য‌ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে দরপত্র আহ্বান করার আগে সরকার প্রকল্প নির্মাণ সংক্রান্ত যাবতীয় ছাডপত্রের বন্দোবস্ত করে রাখবেন। ফলে বিনিয়োগকারীরা প্রকল্পের বরাত পাওয়া মাত্র কাজ শুরু করতে পারবেন। পদ্ধতিটিকে বলা হচ্ছে ‘প্লাগ অ্য‌ান্ড প্লে’। ভারতে পরিকাঠামো শিল্পে যাঁরা বিনিয়োগ করেন তাঁদের কাছে এই প্রস্তাবের গুরুত্ব অপরিসীম। এর কারণ একেই পরিকাঠামো শিল্পে লগ্নি আর মুনাফা অর্জনের প্রারম্ভ, এই দুইয়ের মধ্য‌ে সময়ের বিস্তর ব্য‌বধান থাকে। তার উপর লগ্নি শুরু করার পর কাজ শুরু করতেই লেগে যায় অনেকটা সময়। কারণ? তথাকথিত বহুচর্চিত সেই লাল ফিতের ফাঁস। বিভিন্ন ধরনের ছাড়পত্র (কেন্দ্রীয় ও রাজ্য‌ সরকারের কাছ থেকে ন্যূনতম মোট ৭০ রকমের ছাড়পত্র লাগে একটি পরিকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পে) আদায় করতে সময় লেগে যায় অনেকটা। এই সময়টুকু যদি সরকারই বাঁচিয়ে দেওয়ার উদ্য‌োগ নেয় তা হলে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত হওয়ারই কথা।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৫

কোম্পানি কর হ্রাসের প্রস্তাব

শিল্পক্ষেত্রকে উৎসাহিত করার আরও একটি উল্লেখযোগ্য প্রচলিত রাস্তা হল আবাসন শিল্পকে উৎসাহিত করা। কারণ আবাসন শিল্পকে উৎসাহিত করা হলে আনুষঙ্গিক শিল্পসমূহও উৎসাহ পায়। এ রকমই একটি আনুষঙ্গিক শিল্প হল সিমেন্ট ও লোহা শিল্প। বেশ কিছু দিন ধরেই দেশের আবাসন শিল্পটি ঝিমিয়ে রয়েছে। অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি আবাসন শিল্পকে চাঙ্গা করতে ‘সবার জন্য‌ ঘর’ প্রকল্পটি চালু করার কথা ঘোষণা করেছেন। এই প্রকল্প অনুসারে দেশের প্রতিটি পরিবার ২০২২ সালের মধ্য‌ে একটি করে পাকাপোক্ত ঘর পাবে। এই ‘সবার জন্য‌ ঘর’ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত করতে হলে ২০২২ সালের মধ্য‌ে শহরাঞ্চলে ২ কোটি এবং গ্রামাঞ্চলে চার কোটি বাড়ি বানাতে হবে।

শিল্পমহলকে খুব বেশি করে চাঙ্গা করা যায় যদি করের কাঠামোর পরিবর্তনের কথা ঘোষণা করা হয়। এর কারণ বিশেষ বিশেষ শিল্পের ক্ষেত্রে যে সমস্ত ঘোষণা করা হয় তাতে সংশ্লিষ্ট শিল্প হয়তো কিছুটা উপকৃত হয়, কিন্তু পাশাপাশি কর-কাঠামোর পরিবর্তন যদি সামগ্রিক শিল্পক্ষেত্রের পরিপন্থী হয় তা হলে সেই সুফল শেষ পর্যন্ত খুব একটা কার্যকর হয় না। শিল্পক্ষেত্রকে সামগ্রিক ভাবে উৎসাহিত করার মতো একটি ঘোষণা করা হয়েছে বাজেট প্রস্তাবে। কোম্পানি কর ধাপে ধাপে ৫ শতাংশ কমিয়ে আনা হবে। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য‌ আমাদের কোম্পানি করের সর্বোচ্চ হারটি ৩০ শতাংশ, যা অন্য‌ান্য‌ এশীয় দেশের চেয়ে বেশি। কিন্তু কার্যত কোম্পানি কর বাবদ যা আয় সরকারের হয় তা মোট কোম্পানি আয়ের ২৩ শতাংশের মতো। এই যে ব্য‌বধান এটা ঘটে নানা রকম ছাড়ের সুযোগের জন্য‌। অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি তাই প্রস্তাব করেছেন আগামী চার বছরে কোম্পানি কর ধাপে ধাপে ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হবে এবং সেই সঙ্গে প্রত্য‌াহার করে নেওয়া হবে ছাড়ের সুবিধাগুলি। তবে এই প্রস্তাবের আশু কিছু ফল অর্থনীতি এখনই পাবে না। কারণ এই পরিবর্তন চালু হবে ২০১৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৫

অর্থনীতির বৃদ্ধি নিয়ে সংশয়

কোম্পানি কর ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার প্রস্তাবে এখনই কোনও প্রভাব না পড়লেও এখনই যেটা শিল্পক্ষেত্রের উপর প্রভাব ফেলবে তা হল সারচার্জের বৃদ্ধি। সারচার্জ ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করা হয়েছে সেই সব সংস্থার ক্ষেত্রে যাদের বার্ষিক আয় ১ কোটি টাকা থেকে ১০ কোটি টাকা এবং ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১২ শতাংশ করা হয়েছে সেই সব সংস্থার ক্ষেত্রে যাদের আয় ১০ কোটি টাকার বেশি। তবে এ দেশে কার্যরত বিদেশি কোম্পানিগুলির ক্ষেত্রে কিন্তু কোনও পরিবর্তন আনা হয়নি। এর ফলে বিদেশি বিনিয়োগ হয়তো বাড়বে। আমাদের মতো দেশে ক্ষুদ্র শিল্পের বিশেষ গুরুত্ব এইখানে যে এই শিল্প কেবল আয় বৃদ্ধি করে না, সামাল দেয় কর্মহীনতার মতো সমস্য‌াকেও। তবে কৃষির মতো ক্ষুদ্র শিল্পেরও উন্নতির পথে প্রধান প্রতিবন্ধক ঋণ। এই ঋণ সমস্য‌া সমাধানের জন্য‌ ১৯৮৯ সালে স্থাপন করা হয়েছিল সিডবি বা স্মল ইন্ডাস্ট্রিজ ডেভেলপমেন্ট ব্য‌াঙ্ক অফ ইন্ডিয়া। ২০০০ সালে ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র সংস্থাগুলির জন্য‌ সিডবি ও ভারত সরকারের যৌথ উদ্য‌োগে গঠন করা হয় ক্রেডিট গ্য‌ারান্টি ফান্ড স্কিম ফর মাইক্রো অ্য‌ান্ড স্মল এন্টারপ্রাইজেস।

এ বারে বাজেটে এই তালিকায় নতুন সংযোজনের নাম মুদ্রা বা মাইক্রো ইউনিটস ডেভেলপমেন্ট রিফাইন্যান্স এজেন্সি ব্য‌াঙ্ক। এই ব্য‌াঙ্কের প্রাথমিক মূলধন হিসাবে ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন অর্থমন্ত্রী। এই ব্য‌াঙ্ক প্রধানত তফশিলি জাতি ও উপজাতি সম্প্রদায়ভুক্ত উদ্য‌োগীদের ঋণের প্রয়োজন মেটাবে।

উৎপাদন ক্ষেত্রের তৃতীয় নাম হিসাবে এ বার আসবে পরিষেবা ক্ষেত্র। বর্তমানে ভারতীয় অর্থনীতির সব চেয়ে দ্রুত প্রসারণশীল ক্ষেত্র এটিই। হয়তো বা এই কারণেই পরিষেবা ক্ষেত্রের জন্য‌ আলাদা করে কোনও ব্য‌বস্থা গ্রহণের প্রয়োজন আছে বলে মনে করেননি অর্থমন্ত্রী। তবে এই ক্ষেত্রের দ্রুত বৃদ্ধিকে ব্য‌বহারের জন্য‌ হয়তো পরিষেবা করের হার বাড়িয়েছেন।

সব মিলিয়ে অর্থনীতির বৃদ্ধির যে লক্ষ্মণের কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী, বিভিন্ন বাজেট প্রস্তাব সেই লক্ষ্য‌পূরণে কতটা সহায়ক হবে তা নিয়ে সংশয় আছে। সংশয় যেটা নিয়ে নেই, সেটা হল অর্থনীতির কোনও বৈপ্লবিক পরিবর্তন এই বাজেট হাতে নিয়ে প্রত্যাশা করা যায় না।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৫

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কম

গরিব দেশের পুঁজি কম। তাই যখনই এক দিক সামলানোর চেষ্টা হয় তখনই অন্য‌ দিকে টান পড়ে যায়। স্বাধীনতার পর আমাদের দেশের নেতৃবৃন্দ তাই একটা অত্য‌াশ্চর্য তত্ত্বের জন্ম দিয়েছিলেন। সেই তত্ত্বের নাম হল ‘চুঁইয়ে পড়ার তত্ত্ব’। চুঁইয়ে পড়ার এই তত্ত্ব অনুযায়ী অর্থনীতির বৃদ্ধির উপর জোর দেওয়া হলে দিলে সেই বৃদ্ধির সুফল আপনা থেকেই চুঁইয়ে চুঁইয়ে সমাজের গরিব শ্রেণির উপর গিয়ে পড়বে। কিন্তু এই তত্ত্ব যে আদতে কাজ করছে না তা স্বাধীনতার পরে দু’ দশকের মধ্য‌েই বোঝা গিয়েছিল। তাই তৃতীয় পরিকল্পনা থেকেই দারিদ্র দূরীকরণের বিশেষায়িত লক্ষ্য‌ নিয়ে প্রকল্প সাজানো শুরু হয়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা দেখছি চিকিৎসার খরচ ক্রমশই মহার্ঘ হয়ে উঠছে। সমাজের একটি শ্রেণির মানুষ, মধ্য‌বিত্ত ও ধনী যারা, তারা এই সমস্য‌ার সামাল দিচ্ছে স্বাস্থ্য‌বিমার মাধ্য‌মে। কিন্তু গরিব মানুষের সে সুযোগ কম। সুযোগ কম প্রবীণদের, এমনকী তাদের হাতে যদি যথেষ্ট টাকাও থাকে। গরিব মানুষদের স্বাস্থ্য‌বিমার কিস্তি মেটানোর টাকা থাকে না আর প্রবীণ মানুষদের স্বাস্থ্য‌বিমার সুযোগই দিতে চায় না বিমা কোম্পানিগুলি। এই বিমা সমস্য‌ার সমাধান করতে প্রবীণ নাগরিকদের চিকিৎসা বাবদ ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত (যেটা আগে ছিল ৬০ হাজার টাকা) খরচকে কর ছাড়ের সুযোগ দেওয়া হবে। কিন্তু গরিব মানুষদের জন্য‌ এমন কোনও প্রকল্পের কথা ভাবা হয়নি।

বস্তুত স্বাস্থ্য‌ খাতে বরাদ্দের পরিমাণ এ বারের বাজেটে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত বাজেটে (মনে রাখা দরকার গত বাজেটটি পূর্ণাঙ্গ বাজেট ছিল না) বরাদ্দের অঙ্কটি ছিল ৩৫,১৬৩ কোটি টাকা। এ বারে তা কমে হয়েছে ৩৩,১৫২ কোটি টাকা। একই ঘটনা ঘটেছে শিক্ষা বরাদ্দের ক্ষেত্রে। সেখানে অবশ্য বরাদ্দ সরাসরি কমানো হয়নি ঠিকই, কিন্তু গত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৬৮,২৬৮ কোটি টাকা,এ বারে ৬৮,৯৬৮ কোটি টাকা। অথচ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য‌, এ দু’টিই হল মানব সম্পদ উন্নয়নের প্রাথমিক শর্ত।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৫

সামাজিক সুরক্ষায় নজর

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমানো এবং শিক্ষা খাতে বরাদ্দ একই রেখে দেওয়ার অর্থ অবশ্য এই নয় যে, বাজেট প্রস্তাবে সামাজিক সুরক্ষার ভাবনাটিকে পুরোপুরি নস্য‌াৎ করে দেওয়া হয়েছে। যে সরকারের শিল্পবন্ধু হিসাবে একটা তকমা আছে তাদের সামাজিক সুরক্ষায় এত বেশি গুরুত্ব আরোপ করাটা অনেককেই বিস্মিত করেছে। যেমন গরিব মানুষদের জন্য‌ মাসিক ১ টাকা কিস্তিতে চালু করা হয়েছে দুর্ঘটনা বিমা, প্রধানমন্ত্রী বিমা সুরক্ষা যোজনা। এই যোজনা অনুযায়ী বিমা গ্রাহকদের যদি দুর্ঘটনায় মৃত্য‌ু হলে পাওয়া যাবে ২ লক্ষ টাকা। চালু করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী জীবনজ্য‌োতি বিমা। এই বিমা অনুসারে বার্ষিক ৩৩০ টাকা কিস্তির বিনিময়ে পাওয়া যাবে ২ লক্ষ টাকার জীবনবিমার সুরক্ষা। প্রবীণ নাগরিকদের তৈরি করা হচ্ছে সিনিয়ার সিটিজেন্স ওয়েলফেয়ার ফান্ড বা প্রবীণ নাগরিক কল্য‌াণ তহবিল।

উপরে বর্ণিত প্রতিটি যোজনাই সাধুবাদযোগ্য‌। কিন্তু যদি লক্ষ করে দেখা যায়, দেখা যাবে এতে সরকারের ঘাড়ে আর্থিক দায়ভার চাপছে খুবই কম। সিনিয়ার সিটিজেন্স ওয়েলফেয়ার ফান্ডটি তৈরি করা হবে পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ডের দীর্ঘদিন দাবিহীন অবস্থায় পড়ে থাকা যথাক্রমে ৩ হাজার ও ৬ হাজার কোটি টাকা নিয়ে। অর্থাৎ এখানে খরচ শূন্য‌। বাকি রইল বিমার কিস্তি বাবদ টাকা। সে আর কতটুকু ? সস্তায় বাজিমাৎ করার এ এক অপূর্ব নিদর্শন।

এ বারে আসা যাক মহাত্মা গান্ধী গ্রামীণ কর্ম নিশ্চয়তা প্রকল্প প্রসঙ্গে। প্রথমেই বলা যাক বরাদ্দ বৃদ্ধির কথা। বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে ৬৯৯ কোটি টাকা। বিগত ভাঙা বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এ বারে বরাদ্দ করা হয়েছে ৩৪ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা। আর্থিক অঙ্কের বিচারে এটি বৃদ্ধি ঠিকই, কিন্তু মুদ্রাস্ফিতীর কথা মাথায় রাখতে হবে।

সামাজিক সুরক্ষা খাতে নতুন আর একটি সংযোজন পেনশন যোজনা। যারা চলতি বছরের মধ্য‌ে এই প্রকল্পে যোগ দেবে তাদের বার্ষিক কিস্তির ৫০ শতাংশ বা এক হাজার টাকা, যেটি কম হবে, সেটি সরকার দেবে এবং এই সুরক্ষা দেওয়া হবে পরবর্তী পাঁচ বছর পর্যন্ত। খুব ভালো এই প্রস্তাব। কিন্তু গরিব মানুষ কী ভাবেই বা পাঁচ বছর বাদে এই যোজনা চালিয়ে নিয়ে যাবে? বার্ষিক কিস্তি কত টাকা হলে কত টাকা পেনশন পাওয়া যাবে, কত বছর বয়স থেকে ? এই পেনশন ফান্ডের তত্ত্বাবধান করবে কোন সংস্থা ? টাকাটা কি শেয়ার বাজারে লগ্নি করা হবে ? এ সব প্রশ্নের উত্তর যতক্ষণ না পাওয়া যাচ্ছে ততক্ষণ কিন্তু এই প্রকল্পটি সম্বন্ধেও সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তে আসা কঠিন। সব মিলিয়ে অর্থনীতির বৃদ্ধির দিকে তাকাতে গিয়ে সামাজিক সুরক্ষা জালের উপর থেকে কেন্দ্রীয় সরকার একেবারে চোখ সরিয়ে নেয়নি, এই মুহূর্তে ১১০ কোটি ভারতবর্ষের এটি ভরসা।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৫

আয়কর কাঠামোয় দু-একটি ছাড়

অর্থমন্ত্রীর বাজেটের দ্বিতীয় পর্বের শুরু কর প্রস্তাব দিয়ে। আমরাও সেখান থেকে শুরু করব। এই ব্য‌াপারে মধ্য‌বিত্ত ও উচ্চবিত্ত আমজনতার, মানে যাঁরা খবরের কাগজে বাজেট পড়েন ও টিভিতে বাজেট শোনেন, তাঁদের প্রধান আকর্ষণের জায়গা প্রত্য‌ক্ষ কর কাঠামো। আরও পরিষ্কার করে বললে আয়কর ও কোম্পানি কর নিয়ে। এখানে বিশেষ খুশির খবর শোনাতে পারেননি অর্থমন্ত্রী।

আয়কর কাঠামোর কোনও পরিবর্তন ঘটানো হয়নি, দু-একটি ছোটখাটো ছাড়ের সুযোগ দেওয়া ছাড়া। ব্য‌ক্তিগত আয়করের ক্ষেত্রে যে ছাড়গুলি দেওয়া হয়েছে সেগুলি বেশ ইতিবাচক। স্বাস্থ্য‌বিমা বাবদ কর ছাড়ের সীমা বাড়ানো হয়েছে। সঠিক সিদ্ধান্ত। পরিকাঠামো বন্ডকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বেশ ভালো। কেবলমাত্র গৃহঋণ বাবদ ছাড়ের সীমাগুলি আর একটু সম্প্রসারিত হলে সেটি আবাসন শিল্পকে বাড়তি উৎসাহ জোগাত। আবার সম্পদ কর তুলে দিয়ে পরিবর্তে যাদের বার্ষিক আয় এক কোটি টাকার উপর তাদের কাছ থেকে ২ শতাংশ হারে সারচার্জ আদায়ের সিদ্ধান্তটিও বেশ ভালো। সম্পদ কর বাবদ আয় হচ্ছিল বছরে ১ হাজার কোটি টাকার মতো। পরিবর্ত ব্য‌বস্থায় মনে করা হচ্ছে আয় হবে বছরে ৯ হাজার কোটি টাকা। এটা বড় কথা তো বটেই, তার চেয়ে বড় কথা এই ব্য‌বস্থা প্রগতিশীল কর কাঠামোর অনুপন্থী। সম্পদ কর প্রযোজ্য‌ ছিল আয় নির্বিশেষে সব ধরনের মানুষের উপর। নতুন ব্য‌বস্থায় যার আয় বেশি সে কর দেবে বেশি।

ব্য‌ক্তিগত আয়কর বাদ দিলে কোম্পানি আয়করের প্রসঙ্গটি আমরা ইতিপূর্বেই আলোচনা করেছি। শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে তার সম্ভাব্য‌ প্রভাবও আলোচনা করেছি। এ সবের সঙ্গে আমজনতার সম্পর্ক কম। বরং যেটার সঙ্গে আমজনতার সম্পর্ক বেশি সেই পরিষেবা করও বাড়ানো হয়েছে।

করের এই সব পরিবর্তেনর মূল লক্ষ্য‌ রাজকোষ ঘাটতিকে লাগামের মধ্য‌ে বেঁধে রাখা। রাজকোষ ঘাটতি সহজ কথায় সরকারের আয়ব্য‌য়ের ঘাটতি। কিন্তু এই সব পরিবর্তনের মাধ্য‌মেও ঘাটতিকে যেখানে বেঁধে রাখার কথা ছিল সেখানে রাখতে পারবেন না। যে ‘রাজকোষ দায়বদ্ধতা ও বাজেট পরিচালন আইন’ অনুযায়ী এই কাজটি করার কথা, সেই আইন অনুযায়ী আগামী আর্থিক বছরে রাজকোষ ঘাটতি ৩.৬ শতাংশে বেঁধে রাখতে হত। অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি নিজের জন্য‌ যে লক্ষ্য‌মাত্রা নির্ধারণ করেছেন তা হল ৩.৯ শতাংশ।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৫

কর আদায়ে ব্যর্থতা

সরকার এই যে বিনিয়োগের থলি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল না অর্থনীতির বৃদ্ধির লক্ষ্যে, সেটার অন্যতম প্রধান কারণ তো রাজকোষ ঘাটতিকে বেঁধে রাখার লক্ষ্যমাত্রাটি ছোঁয়া। তা সেটাও পারল না কেন ? পরিসংখ্যান বলছে, গত বাজেটে অর্থমন্ত্রী রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্য নিয়েছিলেন সেটা পূরণ করতে পারেননি। রাজস্ব আদায় হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা কম। কেন এমন হল ? বলা হচ্ছে, দেশের আর্থিক বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। সত্যি কথা। হয়নি বলেই বৃদ্ধির একটি উজ্জ্বলতর ছবি তুলে ধরতে জাতীয় আয় পরিমাপের ভিত্তিবর্ষটি পালটাতে (আগে ছিল ২০০৪-০৫, করা হল ২০১১-১২) হয়েছে। পালটানোর ফলে ৪.৭ শতাংশ বৃদ্ধির হারটিকে ৭.৪ শতাংশ দেখানো যাচ্ছে। কিন্তু আর্থিক বৃদ্ধি যথেষ্ট না হওয়াটাই রাজস্ব আদায় কম হওয়ার একমাত্র কারণ নয়। যেটা বড় কারণ সেটা আসলে ডাক্তারি পরিভাষায় ‘ক্রনিক ডিজিজ’, সেটা হল কর আদায়ে ব্যর্থতা। যে ব্যর্থতা আছে বলেই আবার কালো টাকার এত বাড়বাড়ন্ত। এই ব্যর্থতার আবার দু’টি কারণ। এক, কর কাঠামোয় অসংখ্য ছাড়ের সুযোগ তৈরি করে রাখা। দুই, কর আদায়ে প্রশাসনিক গাফিলতি, যে গাফিলতির মধ্যে পড়ে কর্তব্যে অবহেলা আর দুর্নীতি। ব্যর্থতা কাটানোর একটা ইঙ্গিত অর্থমন্ত্রী দিয়েছেন কর ছাড়ের সুবিধা প্রত্যাহারের আগাম সতর্কতা জারি করে। কিন্তু বিড়ালের গলায় আসল ঘণ্টাটা বাঁধার কী হবে ? কী ভাবে আটকাবেন দুর্নীতি ?

কালো টাকা মানে তো কালো রঙের টাকা নয়, কালো টাকা মানে কর ফাঁকি দেওয়া টাকা। কর ফাঁকি বন্ধ করে কালো টাকার জন্ম আটকাতে নতুন বিল আনার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। এই আইনের একটি ধারা হবে এমন, কোনও ব্যক্তি, সংস্থা, ব্যাঙ্ক বা কোনও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যে বা যাঁরা এই ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন তাঁদের উপযুক্ত শাস্তি ও জরিমানার ব্যবস্থা করা হবে। এই যে ‘কোনও ব্যক্তি’ শব্দগুচ্ছ, সেটি যদি কোনও কর-প্রশাসনের আধিকারিক হন, তা হলে কি তিনিও সম পরিমাণ শাস্তি ও জরিমানার যোগ্য হবেন ? আইন হয়তো তাই বলবে। কিন্তু সেটুকুই যথেষ্ট নয়। যাঁর চোর ধরার কথা, তিনিই যদি চুরিতে সাহায্য করেন এবং ধরা পড়েন, তা হলে তাঁর শাস্তি হওয়া উচিত বহু গুন বেশি।

কালো টাকা উদ্ধারের চেষ্টা এ দেশে নতুন নয়। যেমন নতুন নয়, সে সব উদ্যোগের ব্যর্থতার কথা। কালো টাকা উদ্ধারে আইনও আছে। সে আইনে ফাঁক আছে বলেই নতুন আইন প্রণয়নের চেষ্টা হচ্ছে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৫

ব্য‌াঙ্কিং ক্ষেত্রে সংস্কার ও বাজেটের ভূমিকা

বাজেটের অ আ ক খ

অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি ২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় লোকসভায় পেশ করলেন বর্তমান সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। গত বছর নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন হওয়ার পর ১০ জুলাই তারিখে তিনি যে বাজেট পেশ করেছিলেন তা ছিল বছরের আংশিক সময়ের বাজেট। বাজেট হল আগামী অর্থ বছরের আয়ব্য‌য়ের অগ্রিম হিসাবনিকেশ। আগামী মাসে কোনও ব্য‌ক্তির আয় হতে পারে ২৫ হাজার টাকা আর ব্য‌য় ২৮ হাজার টাকা। সুতরাং ৩ হাজার টাকার ঘাটতি। এই ঘাটতি পূরণের জন্য‌ ঋণ নিতে হবে অথবা অন্য‌ কোনও সংস্থান করতে হবে। তবে আয়ব্য‌য়ের যে হিসাব ধরা হল নানা কারণে তা নাও মিলতে পারে। দেশের বাজেটের ক্ষেত্রেও ব্য‌াপারটা একই রকম। এখানেও আগামী আর্থিক বছরের জন্য‌ আয়ব্য‌য়ের অগ্রিম হিসাব কষা হয়। বাজেটে অর্থমন্ত্রী ২০১৫-১৬ আর্থিক বছরের জন্য‌ ব্য‌য়ের পরিমাণ ধরেছেন ১৭,৭৭,৪৭৭ কোটি টাকা। এর মধ্য‌ে পরিকল্পনা-বহির্ভূত খাতে ব্য‌য়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ১৩,১২,২০০ কোটি টাকা এবং পরিকল্পনা খাতে ৪,৬৫,২৭৭ কোটি টাকা। গত বাজেটে এই ব্য‌য় দু’টি ধরা হয়েছিল যথাক্রমে ১২,১৯,৮৯২ কোটি টাকা ও ৫,৭৫,০০০ কোটি টাকা এবং মোট ব্য‌য় ১৭,৯৪,৮৯২ কোটি টাকা। পরিকল্পনা খাতে বরাদ্দ অর্থে দেশে স্থায়ী পরিকাঠামো গড়ে ওঠে এবং ফলে এই খাতে বেশি বরাদ্দ দেশে দীর্ঘস্থায়ী বিকাশের পক্ষে সহায়ক হয়। বাজেটে আগামী বছরের জন্য‌ আয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ১২,২১,৮২৮ কোটি টাকা ফলে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫,৫৫,৬৪৯ কোটি টাকা। সরকারকে ঋণ করে এই ঘটাতি মেটাতে হয়। এই ঘাটতিকেই বলে রাজকোষ ঘাটতি। ২০১৫-১৬ সালের এই রাজকোষ ঘাটতি মোট অভ্য‌ন্তরীণ উৎপাদনের নিরিখে দাঁড়িয়েছে ৩.৯ শতাংশ। গত বাজেটে আয় ও রাজকোষ ঘাটতি ধরা হয়েছিল যথাক্রমে ১২,৬৩,৭১৫ কোটি টাকা ও ৫,৩১,১৭৭ কোটি টাকা এবং রাজকোষ ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল মোট অভ্য‌ন্তরীণ উৎপাদনের ৪.১ শতাংশ। বাজেটে আয় ব্য‌য়ের যে হিসাব কষা হচ্ছে এক বছর পর তা নাও মিলতে পারে। প্রকৃত চিত্রটা জানা যায় দু’বছর পর।

সূত্র : যোজনা মার্চ ২০১৫

জিডিপি বাড়ছে, আশা জাগছে

অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি বাজেট পেশের সূচনা পর্বে দেশের অর্থনীতির এক উজ্জ্বল চিত্র তুলে ধরেছেন। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন ২০১৪-১৫ সালে জিডিপি বা মোট অভ্য‌ন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির হার দাঁড়াবে ৭.৪ শতাংশ এবং তিনি আশা ব্য‌ক্ত করেছেন ২০১৫-১৬ সালে এই হার আরও বেড়ে দাঁড়াবে ৮ থেকে ৮.৫ শতাংশ। ফলে অচিরেই বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আমরা দু’ অঙ্কের লক্ষ্য‌মাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হব বলে আশা করা যায়। এ ছাড়া মুদ্রাস্ফীতি কমে আসাতেও তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সর্ব শেষ পরিসংখ্য‌ান অনুযায়ী ভোগ্য‌পণ্য‌ের মূল্য‌স্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৫.১ শতাংশ এবং পাইকারি মূল্য‌সূচক তো বাড়েইনি, বরং উল্টে কমে গিয়েছে। চলতি খাতে ঘাটতিও জাতীয় আয়ের ১.৩ শতাংশের নীচে নেমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে। এপ্রিল ২০১৪-র পর দেশে এসেছে ৫৫ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ৫৫০০ কোটি ডলারের বিদেশি মুদ্রা। বিদেশি মুদ্রার এই অনুকূল প্রবাহে আমাদের এই মুদ্রাভাণ্ডারটি পূর্বের সমস্ত রেকর্ড ছাপিয়ে ৩৪০ বিলিয়ন তথা ৩৪ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছে গিয়েছে। এর ফলে এক দিকে ভারতীয় মুদ্রা শক্তিশালী হয়েছে এবং অন্য‌ দিকে বিশ্ব-অর্থনীতিতে আমাদের সম্মানটাও অনেক বেড়ে গিয়েছে।

অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই আর্থিক সমৃদ্ধিকে তিনি দেশের সার্বিক বিকাশের লক্ষ্য‌ে কাজে লাগাতে চান। অর্থাৎ এই সমৃদ্ধিকে তিনি দেশের কোটি কোটি মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চান। দেশের সাধারণ মানুষের জন্য‌ তিনি বাজেটে ঘোষণা করেছেন একাধিক সামাজিক কর্মসূচি। একই সঙ্গে তাঁর লক্ষ্য‌ দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য‌ কাজের সুযোগ বাড়িয়ে দেশ থেকে দারিদ্র দূর করা। আর এই কাজে দেশের ব্য‌াঙ্কগুলিকে সহযোগী করেই তিনি এগোতে চান। কারণ সারা দেশ জুড়ে গ্রামেগঞ্জে ব্য‌াঙ্কগুলির যে অসংখ্য‌ শাখা স্থাপিত হয়েছে সেগুলির মাধ্য‌মেই এই সব মানুষের কাছে সরাসরি সরকারের অনুদান ও অন্য‌ান্য‌ পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। কারণ গরিব মানুষের জন্য‌ সরকারি প্রকল্পের অর্থ অনেকটাই ফড়েদের পকেটে ঢুকছে এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পে কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও তার সামাজিক প্রতিফলন ঘটছে না।

সূত্র : যোজনা মার্চ ২০১৫

জন-ধন যোজনা

গরিব মানুষের কাছে সমৃদ্ধির ছোঁয়া পৌঁছে দিতে প্রয়োজন এই সব মানুষের ব্য‌াঙ্ক অ্য‌াকাউন্ট। কিন্তু ব্য‌াঙ্ক জাতীয়করণের পর চার দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও এবং গ্রামে গঞ্জে ব্য‌াঙ্কের অসংখ্য‌ শাখা স্থাপিত হলেও দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষই এখনও ব্যাঙ্কগুলির ছত্রছায়ার বাইরেই রয়ে গিয়েছেন। এর ফলে চিট ফান্ডে টাকা রেখে তাঁরা যেমন সর্বস্রান্ত হচ্ছেন, অন্য‌ দিকে ঋণের জন্য‌ চড়া সুদে মহাজনদের দ্বারস্থ হয়ে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছেন এবং সর্বোপরি সরকারের অনুদানের টাকার পুরোটাও তাঁদের হাতে এসে পৌঁছচ্ছে না। দেশের সমস্ত মানুষকে ব্য‌াঙ্কের ছাতার তলায় আনতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গত বছরের ১৫ আগস্ট তারিখে স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতায় ঘোষণা করেন ‘জন-ধন প্রকল্প’-এর কথা। এই প্রকল্পে মানুষ কোনও প্রাথমিক জমা না দিয়েই শূন্য‌ ব্য‌ালেন্সে ব্য‌াঙ্ক অ্য‌াকাউন্ট খুলতে পারবেন। তা ছাড়া কেওয়াইসি সংক্রান্ত হাজারো হ্য‌াপা পোয়াবারও প্রয়োজন নেই। ন্যূনতম কাগজপত্র জমা দিয়েই ব্যাঙ্কে অ্য‌াকাউন্ট খোলা যাবে। এমনকী সই করতে না পারলেও চলবে। রয়েছে বায়োমেট্রিক ব্য‌বস্থা। এই ব্য‌বস্থায় আঙুলের ছাপ দিয়ে লেনদেন করা যাবে। গ্রাহকদের দেওয়া হবে ‘রু-পে’ ডেবিট কার্ড। এবং এই কার্ড ব্য‌বহার করে তারা এটিএম থেকে টাকা তুলতে পারবেন। তা ছাড়া গ্রাহকরা কোনও প্রিমিয়াম না দিয়েই ৩০ হাজার টাকার জীবনবিমার সুবিধা পাবেন। আর ছ’ মাস অ্যাকাউন্ট ঠিকঠাক চালাতে পারলে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন। অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি শ্লাঘার সঙ্গে বলেছেন মাত্র ১০০ দিনের মধ্য‌ে দেশের সাড়ে ১২ কোটি পরিবারকে জন-ধন প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে।

জন-ধন প্রকল্পটি দেশের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে দিতে অর্থমন্ত্রী ডাক বিভাগের বিশাল নেটওয়ার্কটিকে কাজে লাগানোর কথা বাজেটে উল্লেখ করেছেন। সারা দেশে রয়েছে ১,৫৪,০০০টি ডাকঘর এবং এগুলি পেমেন্ট ব্য‌াঙ্ক হিসাবে কাজ শুরু করলে জন-ধন প্রকল্পটিকে পুরোপুরি সফল করে তোলা সম্ভব। উল্লেখ্য‌ গত বছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী দেশে পেমেন্ট ব্য‌াঙ্ক এবং স্মল ব্য‌াঙ্ক স্থাপন করার কথা ঘোষণা করেছিলেন।

সূত্র : যোজনা মার্চ ২০১৫

কৃষিক্ষেত্রে ব্য‌াঙ্ক ঋণ

প্রতি বছরের মতো এ বছরের বাজেটেও অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি কৃষিক্ষেত্রে ব্য‌াঙ্ক ঋণের লক্ষ্য‌মাত্রা ধার্য করেছেন। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের জন্য‌ তিনি এই লক্ষ্য‌মাত্রা ধার্য করেছেন ৮ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থ বছরের জুলাই মাসে পেশ করা বাজেটে তিনি কৃষি ঋণের লক্ষ্য‌মাত্রা রেখেছিলেন ৭ লক্ষ কোটি টাকা। দেশের অর্থনীতির সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি হল এই কৃষিক্ষেত্র। কারণ কৃষিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে আমাদের দেশের অর্থনীতি। যদিও দেশের জাতীয় আয়ের মাত্র ১৬ শতাংশ আসে এই ক্ষেত্র থেকে তবুও সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানের দিক থেকে এই ক্ষেত্রটি রয়েছে সবার উপরে। তা ছাড়া দেশের জনসংখ্য‌া যে ভাবে ক্রমশই বেড়ে চলেছে তাতে তাঁদের অন্ন জোগানোর জন্য কৃষিকে অবহেলা করার এতটুকু উপায় নেই। অর্থমন্ত্রী জেটলি বাজেটে দেশের পরিশ্রমী কৃষকদের কথা বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই দেশের কৃষি উৎপাদন বেড়ে চলেছে, ফলে বেড়ে চলেছে খাদ্য‌শস্য‌ের উৎপাদনের পরিমাণ। দেশের খাদ্য‌শস্য উৎপাদনের পরিমাণ ২০০৯-১০ সালের ২১ কোটি ৮১ লখ টন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৩-১৪ সালে দাঁড়িয়েছে ২৬ কোটি ৪৪ লখ টন। প্রতি বছর খরিফ এবং রবি মরশুমে ব্য‌াঙ্কগুলির তরফে মঞ্জুর করা হয় স্বল্পমেয়াদি কৃষি ঋণ। এ ছাড়া কৃষি যন্ত্রপাতি এবং পরিকাঠামোর উন্নতির জন্য‌ ব্য‌াঙ্কগুলি কৃষকদের মঞ্জুর করে দীর্ঘমেয়াদি কৃষি ঋণ। ব্য‌াঙ্ক থেকে ঋণ পাওয়ার ফলে মহাজনদের উপর কৃষকদের নির্ভরতা অনেকটা কমে এসেছে এবং কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর ব্যাপারে ব্য‌াঙ্কগুলির স্বল্প সুদে কৃষি ঋণ উল্লেখযোগ্য‌ ভূমিকা পালন করে চলেছে। রিজার্ভ ব্য‌াঙ্কের তরফেও ব্য‌াঙ্কগুলির জন্য‌ কৃষি ঋণের লক্ষ্য‌মাত্রা রাখা হয়েছে তাদের দাদনের ১৮ শতাংশ। কিন্তু বেশির ভাগ বছরই তারা এই লক্ষ্য‌মাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছে না, যদিও বাজেটে ঘোষিত ঋণের পরিমাণ টাকার অঙ্কে অনেকটাই বেশি মনে হচ্ছে।

সূত্র : যোজনা মার্চ ২০১৫

গ্রামীণ পরিকাঠামো উন্নয়ন তহবিল

বাজেটে গ্রামীণ পরিকাঠামো উন্নয়ন তহবিলের মূলধনি খাতে ২৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় ছোট মাপের পরিকাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্য‌ে এই তহবিলটি কাজ করে থাকে। যেমন রাস্তাঘাট, প্রাথমিক বিদ্য‌ালয় বা অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র নির্মাণ, কূপ খনন প্রভৃতি। গ্রামীণ পরিকাঠামো উন্নয়ন তহবিল জাতীয় কৃষি ও গ্রামোন্নয়ন ব্য‌াঙ্কের পরিচালনাধীন। এর সম্পদের মূল উৎস হল ব্য‌াঙ্কগুলি থেকে জরিমানা বাবদ আদায় করা অর্থ। রিজার্ভ ব্য‌াঙ্কের নিয়ম অনুযায়ী ব্য‌াঙ্কগুলির জন্য‌ তাদের দাদনের একটি নির্দিষ্ট অংশ কৃষিক্ষেত্র এবং অন্য‌ান্য‌ অগ্রাধিকার ক্ষেত্রকে ঋণ হিসাবে দেওয়া বাধ্য‌তামূলক। এবং লক্ষ্য‌ পূরণ না হলে তাদের জরিমানা করা হয়। এই জরিমানার অর্থই পুষ্ট করে পরিকাঠামো উন্নয়ন তহবিলটিকে। তা ছাড়া প্রতি বছর বাজেট থেকে এই তহবিলের মূলধনি খাতে অর্থও বরাদ্দ করা হয়। তা ছাড়া কৃষকরা, বিশেষত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা, যাতে সহজেই ঋণ পেতে পারেন সে দিকে লক্ষ্য‌ রেখে বাজেটে দীর্ঘমেয়াদি গ্রামীণ ঋণ তহবিলের জন্য‌ বরাদ্দ করা হয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা। ক্ষুদ্র সেচ প্রকল্প গড়ে তোলা, কৃষি যন্ত্রপাতি কেনা, কৃষিকাজের জন্য‌ ট্রাক্টর প্রভৃতি কেনা এই সব প্রয়োজনে এই তহবিল থেকে অর্থের সংস্থান হতে পারে। এ ছাড়াও সমবায় ক্ষেত্র ও আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্য‌াঙ্কগুলি যাতে কৃষকদের স্বল্পমেয়াদি ঋণের সমস্য‌া মেটাতে পারে সে দিকে লক্ষ রেখে এই দু’টি ক্ষেত্রে বরাদ্দ করা হয়েছে যথাক্রমে ৪৫ হাজার ও ১৫ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে অগ্রাধিকার প্রাপ্ত ক্ষেত্রের ঋণের তালিকাটিতেও কয়েকটি নতুন ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রিজার্ভ ব্য‌াঙ্কের নির্দেশ অনুযায়ী ব্য‌াঙ্কগুলির জন্য‌ তাদের দাদনের ৪০ শতাংশ অগ্রাধিকার প্রাপ্ত ক্ষেত্রকে ঋণ দেওয়া বাধ্য‌তামূলক। এই সব ঋণের মধ্য‌ে উল্লেখযোগ্য‌ কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্য‌োগের জন্য‌ ঋণ, শিক্ষা ঋণ, ক্ষুদ্র ঋণ, একটি সীমা পর্যন্ত গৃহ নির্মাণ বাবদ ঋণ প্রভৃতি। এ ব্য‌াপারে বাজেটে নতুন যে ক্ষেত্রগুলির কথা বলা হয়েছে, সেগুলি হল কৃষিপণ্য‌ের প্রক্রিয়াকরণ, কৃষি পরিকাঠামো, মাঝারি উদ্য‌োগ, পুনর্নবীকরণযোগ্য‌ শক্তি (সৌরবিদ্য‌ুৎ, বায়ুবিদ্যুৎ ইত্য‌াদি)। তা ছাড়া সামাজিক পরিকাঠামো (যেমন স্কুল, হাসপাতাল প্রভৃতি) গড়ে তুলতে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ এই ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত। তবে যে সব শহরের লোকসংখ্য‌া এক লক্ষের কম কেবলমাত্র সেই সব শহরে এই পরিকাঠামো ঋণ প্রযোজ্য‌ হবে। বিদেশি ব্য‌াঙ্কের ক্ষেত্রে অবশ্য‌ এই পরিকাঠামো ঋণের ব্য‌াপারে্ কোনও পূর্বশর্ত রাখা হয়নি।

সূত্র : যোজনা মার্চ ২০১৫

ক্ষুদ্র উদ্য‌োগীদের জন্য‌ নতুন ব্য‌াঙ্ক

অর্থমন্ত্রী জেটলি বাজেটে অবিধিবদ্ধ ক্ষেত্রের অসংখ্য‌ ক্ষুদ্র উদ্য‌োগীদের জন্য‌ ঋণের প্রয়োজন মেটাতে একটি নতুন ব্য‌াঙ্ক গঠনের প্রস্তাব রেখেছেন। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে রয়েছে ৫ কোটি ৭৭ লক্ষ ক্ষুদ্র উদ্য‌োগী এবং এঁরা স্বত্বাধিকারী হিসাবে নিজেরাই এই সব উদ্য‌োগ পরিচালনা করেন। এঁদের ৬২ শতাংশই আবার তফশিলি জাতি, উপজাতি এবং অন্য‌ান্য‌ পিছিয়ে পড়া বর্গের মানুষজন। এঁরা পরিশ্রমী উদ্য‌োগপতি হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছেন, গঠন করেছেন অসংখ্য‌ ছোট ছোট উৎপাদন শিল্প, বাণিজ্য‌ ও পরিষেবা কেন্দ্র। এই সব উদ্য‌োগ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এক বড় ভূমিকা পালন করে চলেছে। এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে বৃহৎ কর্পোরেট ক্ষেত্রগুলি দেশের আর্থিক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পেতে এদের বিশেষ অসুবিধাও নেই। কিন্তু দেশের সার্বিক বিকাশের ক্ষেত্রে এই সব ছোট উদ্য‌োগকে বৃহৎ সংস্থাগুলির সহযোগী হিসাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। অথচ প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের ক্ষেত্রে ব্য‌াঙ্কগুলি এদের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে রয়েছে, যদিও ক্ষুদ্র উদ্য‌োগগুলির ঋণের প্রয়োজন মেটাতে ব্য‌াঙ্কগুলির পরিকল্পনার শেষ নেই।

প্রস্তাবিত ব্য‌াঙ্কটির নামকরণ করা হয়েছে মাইক্রো ইউনিটস ডেভেলপমেন্ট রিফাইনান্স এজেন্সি বা মুদ্রা (MUDRA) ব্য‌াঙ্ক। এই ব্য‌াঙ্কের মূলধনের পরিমাণ রাখা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যাঙ্কের আওতাভুক্ত ঋণ-জামিন তহবিলের মূলধনের পরিমাণ রাখা হয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা। দেশের ক্ষুদ্র উদ্য‌োগগুলি বেশির ভাগই ঋণের জন্য‌ এই সব ক্ষুদ্র আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির (মাইক্রোফিন্যান্স ইনস্টিটিউশনস) উপর নির্ভরশীল। এই সব ক্ষুদ্র আর্থিক প্রতিষ্ঠান যাতে ক্ষুদ্র উদ্য‌োগগুলিকে আরও বেশি করে ঋণ দিতে উৎসাহিত হয় সে জন্য‌ মুদ্রা ব্যাঙ্ক থেকে তারা কম সুদে ঋণ নিতে পারবে। যোজনাটির নাম দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রী মুদ্রা যোজনা। তফশিলি জাতি ও উপজাতির উদ্য‌োগীদের ঋণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই সহায়তার ফলে অল্পবয়সি, শিক্ষিত ও দক্ষ কর্মীরা নিজেরাই উদ্য‌োগ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে এবং ভবিষ্য‌তে প্রথম প্রজন্মের উদ্য‌োগপতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

এ ছাড়াও অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র এবং মাঝারি উদ্যোগীদের একটি অন্যতম সমস্যা হল তাঁদের বকেয়া বিল দীর্ঘদিন পড়ে থাকে। যে সব কোম্পানি বা সংস্থাকে এঁরা চুক্তিমতো নিজেদের উৎপাদিত পণ্য সরবরাহ করে থাকে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এতে এই সব ক্ষুদ্র উদ্যোগের কার্যকর মূলধনে টান পড়ে এবং তাঁদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাজেটে এই বিষয়টিতেও দৃষ্টি দেওয়া হয়েছে এবং একটি ‘ট্রেড রিসিভেবল ডিসকাউন্টিং সিস্টেম’ চালু করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।

সূত্র : যোজনা মার্চ ২০১৫

সুবর্ণ জমা প্রকল্প

আমরা জেনে আসছি মানুষ ব্য‌াঙ্কে টাকা জমা রাখেন এবং সেই জমার উপর তাঁরা সুদ পান। অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন মানুষ টাকার মতো ব্য‌াঙ্কে সোনা জমা রাখলে এই সোনার উপর সুদ পাবেন অতিরিক্ত সোনা। ধরা যাক ১০০ গ্রাম সোনা জমা রাখবেন, বছরের শেষে হয়তো পেলেন ১০২ গ্রাম সোনা। এখানে সুদ দেওয়া হল ২ শতাংশ। কতটা সুদ দেওয়া হবে সে ব্য‌াপারে সুস্পষ্ট ঘোষণা হয়নি।

কিন্তু এ ধরনের প্রকল্প ঘোষণা কেন? অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য‌, সোনার ব্য‌বহারের ক্ষেত্রে ভারতবর্ষ পৃথিবীর দেশগুলির মধ্য‌ে একেবারে উপরের দিকে, অথচ আমাদের নিজস্ব সোনা উৎপাদন নেই বললেই চলে। ফলে প্রতি বছর দেশকে আমদানি করতে হয় ৮০০ থেকে ১০০০ টন সোনা। এর জন্য‌ প্রচুর বিদেশি মুদ্রা খরচ হয়। অথচ আমাদের দেশে সোনা মজুতের ঘাটতি নেই এবং এই সোনার পরিমাণ ২০ হাজার টনেরও বেশি। কিন্তু এই সোনা রয়েছে ব্য‌াঙ্কের লকারে, মানুষের ঘরের আলমারিতে, মন্দিরের গর্ভগৃহে বা মাটির নীচের প্রকোষ্ঠে। এই সোনার কিছুটাও বের করে আনতে পারলে সোনা আমদানির পরিমাণ অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। যে সোনা ব্য‌াঙ্কের কাছে জমা থাকবে সেই সোনা তারা আবার ধার হিসাবে সোনার কারবারি বা কারিগরকে দিতে পারবে এবং অপেক্ষাকৃত কম সুদে তারা এই সোনা নিতে পারবে। এই ভাবে সোনাকে টাকার মতো ব্য‌বহার করা সম্ভব হবে। তবে বাড়িতে যে সব স্বর্ণালঙ্কার রয়েছে সেগুলি জমা করলে অলঙ্কারগুলি একই রকম অবস্থায় ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে না। কারণ এগুলিকে গলিয়ে ব্য‌বহার করা হবে। সুতরাং সাধারণ গৃহস্থ এই প্রকল্পে খুব একটা আগ্রহী হবেন বলে মনে হয় না। তবে মন্দির কর্তৃপক্ষ বা যারা বিনিয়োগের জন্য‌ সোনার বার বা মুদ্রা কেনেন তাঁরা এই প্রকল্পে আগ্রহী হতে পারেন। তা ছাড়া অশোকচক্র খচিত এক নতুন ধরনের স্বর্ণমুদ্রা চালু করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। এর ফলে দেশে সোনার জোগান বাড়বে এবং চাহিদাও কিছুটা পূরণ হবে। এ ছাড়াও গোল্ড বন্ড চালু করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ধরা যাক কোনও ব্য‌ক্তি ১০০ গ্রামের গোল্ড বন্ড কিনতে চান এবং এই বন্ডের সময়সীমা তিন বছর। তাঁকে ১০০ গ্রাম সোনার সম পরিমাণ টাকা দিয়ে বন্ড কিনতে হবে। তিন বছর পর সুদ ৯ গ্রাম সোনা, অর্থাৎ সুদে-আসলে বিনিয়োগকারীকে মেয়াদ শেষে হিসেব করে ১০৯ গ্রাম সোনার অর্থমূল্য দেওয়া হবে।

সূত্র : যোজনা মার্চ ২০১৫

সরকারি ব্য‌াঙ্কগুলির স্বায়ত্তশাসন

বাজেটে সরকারি ব্য‌াঙ্কগুলিকে বেশি করে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ব্য‌াপারে সরকারের চিন্তাভাবনা হল ভবিষ্য‌তে এই ব্য‌াঙ্কগুলিকে নিয়ে একটি হোল্ডিং কোম্পানি গঠন করা। হোল্ডিং কোম্পানির কাজ হল তার অধীনস্থ কোম্পানিগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং তাদের হয়ে নীতি প্রণয়ন। অর্থাৎ যে কাজটা এখন সরকার করছে তার দায়িত্ব বর্তাবে এই হোল্ডিং কোম্পানির উপর। এর ফলে আমলাতন্ত্র থেকে মুক্ত হয়ে ব্য‌াঙ্কগুলি কাজকর্মের ব্য‌াপারে আরও পেশাদার হয়ে উঠতে পারে। তবে আপাতত এ ব্য‌াপারে একটি ব্য‌ুরো গঠন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই ব্য‌ুরোর কাজ হবে সরকারি ব্য‌াঙ্কের উচ্চতম পদে আধিকারিক (ব্য‌াঙ্কের চেয়্য‌ারম্য‌ান, ম্য‌ানেজিং ডিরেক্টর বা আরও অন্য‌ান্য‌ উচ্চপদাধিকারী প্রমুখ) নিয়োগের উদ্দেশ্য‌ে অনুসন্ধান চালানো, ব্য‌বসা সংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া এবং মূলধন সংগ্রহের ক্ষেত্রে উদ্ভাবনীমূলক ইনস্ট্রুমেন্টস চালু করা। কেন্দ্রীয় সরকার চায় মূলধনের ক্ষেত্রে ব্য‌াঙ্কগুলি ধীরে ধীরে তাদের উপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেরাই বাজার থেকে জোগাড় করুক এই মূলধন। কারণ ব্য‌াঙ্কগুলির লোকসান সামাল দিতে বছরের পর বছর কেন্দ্রীয় সরকার এদের মূলধনি সহায়তা করে চলেছে। এর ফলে সরকারের ঘাড়ে বোঝা বাড়ছে। ২০০৮-৯ থেকে ২০১৪-১৫ এই সাত বছরে সরকারি ব্য‌াঙ্কগুলিকে যে মূলধন দেওয়া হয়েছে তার মোট পরিমাণ ৬৮৭২৪ কোটি টাকা। ব্য‌াসেল থ্রি নর্মস অনুযায়ী ২০১৯ সালের মার্চের মধ্য‌ে সরকারি ব্য‌াঙ্কগুলির মূলধনের প্রয়োজন হবে ৫২০০০০ কোটি টাকা। অন্য‌থায় ব্য‌াঙ্কগুলির ঋণ দেওয়ার গতি হ্রাস পাবে এবং অর্থনীতিতে দুর্যোগ নেমে আসবে। বাজেটে অবশ্য‌ আগামী আর্থিক বছরের জন্য‌ ব্য‌াঙ্কগুলির মূলধন বাবদ বরাদ্দ করা হয়েছে ৯৫৫৫ কোটি টাকা। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য‌, তাঁদের হাতেও অর্থের জোগান পর্যাপ্ত নয়। তা ছাড়া রাজকোষ ঘাটতি মোট অভ্য‌ন্তরীণ উৎপাদনের ৩ শতাংশের মধ্য‌ে নামিয়ে আনার লক্ষ্য‌মাত্রা দেওয়া হয়েছে। বাজেটে ঘোষিত ব্য‌াঙ্কিং ব্য‌ুরোর পরামর্শ অনুযায়ী ব্য‌াঙ্কগুলির দক্ষতা বাড়াতে লাভের সংস্থান করতে হবে এবং একই সঙ্গে বাজার থেকে মূলধন সংগ্রহের ব্য‌াপারে সদর্থক চিন্তাভাবনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

সূত্র : যোজনা মার্চ ২০১৫

ব্য‌াঙ্কিং সংক্রান্ত অন্য‌ান্য‌ ঘোষণা

ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা সংক্রান্ত আরও কিছু ঘোষণা করা হয়েছে এ বারের বাজেটে।

নতুন দেউলিয়া আইন প্রণয়নের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। অনাদায়ী ব্য‌াঙ্ক ঋণের ক্ষেত্রে বলা হয় অনেক সময় সংস্থাটি রুগ্ন হয়ে পড়লেও মালিক কিন্তু বহাল তবিয়তেই থাকছেন। কারণ রুগ্ন শিল্প আইন বা শিল্প ও আর্থিক পুনর্গঠন পরিষদ সংক্রান্ত নিয়ম অনুযায়ী সংস্থাটিকে বন্ধ করে দিয়ে এবং মালপত্র বিক্রি করে ব্য‌াঙ্কের ঋণ পরিশোধ করা যাচ্ছে না। নতুন দেউলিয়া আইনে এই বিষয়গুলির উপর নজর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

সারফেসি (সিকিউরিটাইজেশন অ্য‌ান্ড রিকনস্ট্রাকশন অফ ফাইনান্সিয়াল অ্যাসেটস অ্য‌ান্ড এনফোর্সমেন্ট অফ সিকিউরিটি ইন্টারেস্ট) আইনের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। এই আইন প্রণীত হয় ২০০২ সালে। এই আইনে ঋণের টাকা শোধ না হলে ব্য‌াঙ্কগুলি নিজেরাই সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে এবং সেই সম্পত্তি বিক্রি করে ঋণের টাকা উশুল করতে পারে। এই আইনে এ ভাবে ঋণ আদায়ের অধিকার কেবলমাত্র ব্য‌াঙ্কগুলিরই ছিল। বাজেটে নন ব্য‌াঙ্কিং কমার্শিয়াল কোম্পানিগুলিকেও এই আইনের আওতায় আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে যে সব কোম্পানি রিজার্ভ ব্য‌াঙ্কের কাছে নিবন্ধভুক্ত রয়েছে এবং যাদের সম্পদের মূল্য‌ ৫০০ কোটি টাকার বেশি তারাই এই আইনের সুযোগ পাবে।

বাজেটে রিজার্ভ ব্য‌াঙ্ক আইনের সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। রিজার্ভ ব্য‌াঙ্ক আইন সংশোধনের ফলে সরকারের তরফে একটি মনিটরি পলিসি কমিটি গঠন করা সম্ভব হবে এবং এই কমিটি ঋণ ও মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও পর্যালোচনা করবে।

ব্য‌াঙ্কের স্থায়ী আমানতের সুদের উপর (১০ হাজার টাকা বেশি হলে) উৎসমূলক কর টিডিএস কেটে নেওয়ার নিয়ম চালু থাকলেও সমবায় ব্য‌াঙ্কের সদস্য‌ আমানতকারীরা এই কর কেটে নেওয়ার হাত থেকে এত দিন রেহাই পেতেন। বাজেটে এই ছাড় তুলে নেওয়া হয়েছে। তবে সমবায় ঋণদান সমিতিগুলির ক্ষেত্রে এই ছাড় বহাল থাকবে বলে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন।

ব্য‌াঙ্কিং ক্ষেত্রে পরীক্ষানিরীক্ষা

ব্য‌াঙ্ক জাতীয়করণের পর থেকে এখনও পর্যন্ত দেশের ব্য‌াঙ্কিং ক্ষেত্র নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা কম হয়নি। দেশের প্রত্য‌ন্ত অঞ্চলেও ব্য‌াঙ্কের অসংখ্য‌ শাখা খোলা হয়েছে। এবং গরিব মানুষকে ব্য‌াঙ্কের ছাতার তলায় আনতে অসংখ্য‌ প্রকল্পও ঘোষণা করা হয়েছে। সাম্প্রতিক প্রকল্প জন-ধন যোজনা। কয়েক কোটি অ্য‌াকাউন্ট খোলাও হয়েছ, যদিও এগুলির স্থায়িত্ব সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ থাকছে।

কৃষকদের কল্যাণের জন্য প্রতি বছর বাজেটে একাধিক প্রকল্প ঘোষণা করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, কৃষকদের আত্মহনন কিন্তু কমছে না। ১৯৯১ থেকে ২০১০ পর্যন্ত এই আত্মহননের সংখ্যা ২,৩২,৪৬৪। কৃষি উৎপাদনের খরচ বেড়ে চলেছে, কিন্তু ফসলের ঠিকমতো দাম না পাওয়ায় কৃষকরা লোকসানের মুখে পড়ছেন এবং দেনা শোধ করতে না পেরে আত্মহত্যা করছেন।

আসলে ব্যাঙ্কের আধিকারিক ও কর্মচারীদের এক বিরাট অংশের মধ্যে সংবেদনশীলতার অভাব যেমন রয়েছে, সে রকম তাঁদের মধ্যে পেশাদারিত্বর অভাবও দেখা যাচ্ছে এবং দক্ষতাও উঁচু স্তরে পৌছচ্ছে না। প্রয়োজন সরকারি ব্যাঙ্কগুলিকে বেশি করে স্বাধীনতা দেওয়া। বাজেটে সামাজিক ব্যাঙ্কিং কর্মসূচির সঙ্গে এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং ব্যুরো গঠন করে এই সব ব্যাঙ্কগুলিকে স্বায়ত্তশাসনের দিকে এগিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সরকারি ব্যাঙ্কগুলি সংস্কারের পথে এগিয়ে যাবে, নিজেরাই দায়িত্বশীল হয়ে কাজকর্ম করতে পারবে এবং দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

সূত্র : যোজনা মার্চ ২০১৫

কেন্দ্রীয় বাজেট ২০১৫-১৬ : কী পেলেন মহিলারা

লিঙ্গ বৈষম্য‌ের নিরিখে ভারত

পেশ হল ২০১৫-১৬ আর্থিক বছরের কেন্দ্রীয় বাজেট। এই বাজেটের জন্য‌ সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছিলেন। এটা যে নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট শধু তাই নয়, বরং যে দ্রুত গতিতে অর্থনৈতিক সংস্কারের লক্ষ্য‌ে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে তার পরিপ্রেক্ষিতেও এই বাজেট অত্য‌ন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামগ্রিক ভাবে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের চরিত্র বা গতির পরিবর্তন হলে তার সব চেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে মহিলাদের উপর। কারণ এ দেশের সমাজ, পরিবার তথা অর্থনৈতিক মহলে ক্ষমতার সমীকরণ এখনও ভীষণ ভাবে পুরুষ কেন্দ্রিক। সাম্প্রতিক কালে মহিলাদের উপর হিংসা ও নির্যাতনের ঘটনা যে ভাবে বেড়ে চলেছে সেই পরিপ্রেক্ষিতে নারীকেন্দ্রিক বিষয়গুলি আরও বেশি করে গুরুত্ব পাচ্ছে। আর খুব সঙ্গত ভাবেই নারী নির্যাতনের সংক্রান্ত ঘটনাই যে কোনও আলাপ আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে এখন। আর সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইস্তেহারে এই ধরনের ঘটনার জন্য তীব্র উদ্বেগ প্রকাশও করা হয়েছিল।

এ দেশে মহিলাদের অবস্থান যে অনেক নীচে তা বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচি থেকেই সুষ্পষ্ট। আর সেই কারণেই তাদের উপর চলে নির্যাতন। হিংসার ঘটনাও ঘটে। বিগত বছরগুলিতে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি পেলেও মহিলাদের মধ্য‌ে সাক্ষরতার হার এখনও লক্ষণীয় ভাবে কম। এখনও দেশের এক তৃতীয়াংশ মহিলা নিরক্ষর। বিগত কয়েক দশক ধরেই নারী পুরুষের অনুপাত রীতিমতো চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১১ সালের জনগণনার তথ্য‌ অনুযায়ী দেশের ১০০০ পুরুষ পিছু মহিলার সংখ্য‌া মাত্র ৯১৪। কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণ এমন ভাবে কমছে তাও নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।

জাতীয় নমুনা সর্বেক্ষণের (এনএসএস) সর্বশেষ তথ্য‌ অনুযায়ী (২০১১-১২) কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণ মোটামুটি ২২ শতাংশ। এবং বিগত কয়েক বছরে এই অংশগ্রহণের হার ক্রমশই নিম্নগামী হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে। গ্রামাঞ্চলে কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণের হার প্রায় ৮ শতাংশ কমেছে। দেশের লিঙ্গবৈষম্য‌ের চিত্র রাষ্ট্রসঙঘের লিঙ্গ বৈষম্য‌ সূচকেও প্রতিফলিত হয়েছে। ২০১১ সালে এই সূচকে ভারতের মূল্যমান ছিল ০.৬১৭। ওই বছর বিশ্বের ১৪৯টি দেশের মধ্যে ভারতের অবস্থান গিয়ে দাঁড়ায় ১২৯-এ। এ ব্য‌াপারে চিন্তিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৫

তিনটি স্তর থেকে বিচার

লিঙ্গ বৈষম্য‌ের সূচকে ভারত যে জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে তাতে চিন্তিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। এই প্রেক্ষাপটেই এ বারের কেন্দ্রীয় বাজেট এবং নারী সমাজের উপর এই বাজেটের প্রভাব কতটা তা বিশ্লেষণ করতে হবে। নারী সমাজের প্রতি এ বছরের দেশীয় বাজেট কতটা সংবেদনশীল, মূলত তিনটি স্তর থেকে তার বিচার করা যেতে পারে। একটি নির্দিষ্ট বরাদ্দের মাধ্য‌মে ব্য‌য় মহিলাদের জন্য‌ নির্দিষ্ট খাত ছাড়াও সামগ্রিক ভাবে সামাজিক ক্ষেত্রে ব্য‌য় লিঙ্গ-সাম্য প্রতিষ্ঠার পথে এক বড় পদক্ষেপ। সুতরাং প্রথমত, এই বিষয়টির পর্যালোচনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত মহিলাদের জন্য‌ নির্দিষ্ট করে যে সব প্রকল্প/কর্মসূচির কথা বলা হয়েছে তার বিচার বিশ্লেষণ করতে হবে। এ ছাড়াও বিভিন্ন মন্ত্রক ও দফতরের ‘জেন্ডার বাজেট’ অঙ্গীকারের অঙ্গ হিসাবে যে বরাদ্দ থাকে (মহিলাদের জন্য‌ নির্দিষ্ট প্রকল্প/কর্মসূচিগুলি বাদে) তার বিচার বিশ্লেষণ করেও সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প/কর্মসূচি মহিলাদের প্রতি কতটা সংবেদনশীল সে সম্বন্ধে খানিকটা ধারণা পাওয়া যায়। এ বার কেন্দ্রীয় বাজেটের যে কোনও পর্যালোচনা করার সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিবর্তনের কথা অবশ্যই মাথায় রাখা দরকার। চতুর্দশ অর্থ কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী রাজ্য‌গুলির প্রতি কেন্দ্রীয় অনুদানের কাঠামোর পুনর্বিন্য‌াস ঘটেছে। রাজ্য‌গুলিকে বর্ধিত হারে অনুদান দেওয়ার ব্য‌বস্থা করা হয়েছে এই নতুন কাঠামোয়। চতুর্দশ অর্থ কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী মোট কর রাজস্ব থেকে রাজ্য‌গুলিকে আরও বেশি অংশ দেওয়ার (৩২ থেকে ৪২ শতাংশ) ব্যবস্থা হয়েছে এবং সেই সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকার নিজস্ব ব্য‌য়ের ধরনেরও পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এই ভাবে কিছু প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কয়েকটি প্রকল্প আবার কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনেই রেখে দেওয়া হয়েছে। এর সঙ্গে আরও একটা কথা মনে রাখা দরকার যে মোট কর রাজস্বে বৃদ্ধি না ঘটার দরুন ব্য‌য়ের জন্য‌ সরকারের হাতে অর্থ কমে গিয়েছে। কারণ বেশি ব্য‌য় করতে গেলে রাজকোষ ঘাটতিও লাগাম ছাড়া হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৫

সামাজিক ক্ষেত্রে ব্য‌য় লিঙ্গ-সাম্য‌ প্রতিষ্ঠার মূল পদক্ষেপ

সামাজিক ক্ষেত্রে ব্য‌য় ছাড়া আর্থসামাজিক সাম্য‌ প্রতিষ্ঠা কখনওই সম্ভব নয় এবং দেশের জনসংখ্য‌ার সমস্ত অংশের জন্য‌ই এটা ভীষণ জরুরি। তবে সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশ, বিশেষ করে সমাজের সমস্ত স্তরের মহিলাদের পক্ষে এই ব্য‌য় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তাদের কাজের চাপ বা বিভিন্ন কাজের জন্য‌ তাদের সময় বরাদ্দ, সবই এই বিষয়টির সঙ্গে প্রত্য‌ক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জড়িত। দেশের মহিলা কর্মীদের অধিকাংশই কাজ করেন অপ্রথাগত ক্ষেত্রে, যেখানে ন্যূনতম সামাজিক সুরক্ষা ব্য‌বস্থা নেই। তাই শিক্ষা, স্বাস্থ্য‌, আবাসন ও স্য‌ানিটেশনের মতো ক্ষেত্রগুলিতে রাষ্ট্র যদি আরও বেশি বিনিয়োগ না করে তা হলে দেশের অসংখ্য‌ পরিবারের জীবনযাত্রার মান ক্রমশই নিম্নগামী হবে এবং তাতে পরিবারগুলিতে মহিলাদের প্রতি চলে আসা বৈষম্য‌ের কারণে তাদের অবস্থা আরও শোচনীয় হবে।

এ ছাড়াও বিনা পারিশ্রমিকে মহিলারা যে গৃহস্থালি ও পরিচর্যামূলক কাজ করে যান তার উপরও উল্লিখিত ক্ষেত্রগুলির ক্ষেত্রে বরাদ্দের প্রত্য‌ক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব রয়েছ। সহজেই পরিশ্রুত পানীয় জল পাওয়া গেলে দূরদুরান্ত থেকে জল বয়ে আনার কষ্ট ও পরিশ্রম কমবে মহিলাদের। অনুরূপ ভাবে স্বাস্থ্য‌ পরিষেবা সুলভ হলে অপরের পরিচর্যায় ব্যাস্ত থাকেন যে মহিলারা তাঁরা নিজেরাও কিছুটা পরিচর্যা পাবেন। আবার, বিদ্য‌ালয়ে উপযুক্ত ও পরিচ্ছন্ন স্য‌ানিটেশন ব্য‌বস্থা না থাকার কারণেই যে বিদ্য‌ালয়ছুট ছাত্রীদের হার বাড়ছে এই তথ্য‌টিও সবাই জানেন ও বোঝেন। সামাজিক ক্ষেত্রে স্বল্প বরাদ্দ বা বরাদ্দের কাটছাঁট নিয়ে বহু বছর ধরেই তর্কবিতর্ক চলছে, কারণ বেশ কয়েক বছর ধরেই সামাজিক ক্ষেত্রে সরকারেরর ব্য‌য় ওঠানামা করছে। প্রশাসন এবং বাজেট দায়বদ্ধতা কেন্দ্রের (সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স অ্য‌ান্ড বাজেট অ্য‌াকাউন্টিবিলিটি) সংকলিত তথ্য‌ অনুযায়ী মোট অভ্য‌ন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপির নিরিখে খাদ্য‌ ভর্তুকি সহ সামাজিক ক্ষেত্রে ব্য‌য় ৩.৪০ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ২.৫৭ শতাংশ। পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে যখন রাজ্য‌গুলিও সামাজিক ক্ষেত্রে তাদের ব্য‌য়বরাদ্দ বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে তখন এই ক্ষেত্রে ব্য‌য়বরাদ্দ হ্রাসের বিষয়টিকে একটু অন্য‌ দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লষণ করতে হবে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৫

বরাদ্দে কাটছাঁট লিঙ্গ-সাম্য‌ প্রতিষ্ঠায় বাধা

নির্দিষ্ট প্রকল্পগুলিতে কেন্দ্রীয় সরকার যে ভাবে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে তার ধরন যদি লক্ষ করা যায় তা হলে দেখা যাবে যে কেন্দ্র মূলত প্রকল্পের মূলধনী ব্য‌য়ের জন্য‌ই অঙ্গীকারবদ্ধ। প্রকল্প চালাতে যে ধারাবাহিক বা পৌনঃপুনিক খরচ হয় তা মেটাতে কেন্দ্রীয় সরকার আদৌ দায়বদ্ধ নয়। যে সমস্ত প্রকল্প অনেক দিন ধরে চলছে সেগুলির মূলধনী ব্য‌য় তো ক্রমশই কমতে বাধ্য‌। এর ফলে শেষ পর্যন্ত প্রকল্পগুলি রূপায়ণের আর্থিক দায়িত্ব কিন্তু রাজ্য‌ সরকারগুলির উপরই এসে পড়বে। রাজ্য‌গুলি প্রকল্প রূপায়ণের দায়িত্ব নিচ্ছে এটা বড় বিষয় নয়, কিন্তু এর ফলে প্রকল্প খাতে ব্য‌য়বরাদ্দ ব্য‌ ব্য‌য়ের ধরন কী ভাবে প্রভাবিত হবে সেটাই আসল বিষয়। সামাজিক ক্ষেত্রের চালু প্রকল্পগুলির রূপায়ণের ব্যাপারটির দিকে যদি লক্ষ করা যায় তা হলে দেখা যাবে যে প্রকল্প রূপায়ণের ক্ষেত্রে রাজ্য‌গুলির মধ্য‌ে বিরাট তফাত রয়েছে। এর মাধ্য‌মেই এই ধরনের প্রকল্প বা কর্মসূচিগুলির প্রতি সংশ্লিষ্ট রাজ্য‌গুলির কতটা দায়বদ্ধতা আছে বা তা চালিয়ে নিয়ে যেতে তার আগ্রহ কতটা তা প্রতিফলিত হয়। এ বার থেকে রাজ্য‌গুলিকে প্রদত্ত আর্থিক সহায়তা প্রকৃতিগত ভাবে আরও উন্মুক্ত (আনটায়েড) হবে। ফলে তার ব্য‌য়ের ধরন হবে নমনীয়। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্য‌ে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ব্য‌য়ের বাধ্য‌বাধকতা থাকবে না। নারীকেন্দ্রিক বিষয়গুলিতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবের কারণে রাজ্য‌গুলি সামগ্রিক স্তরে বরাদ্দ কমাতে পারে, তা না হলে বরাদ্দের ধরনে পরিবর্তন ঘটাতে পারে। বরাদ্দে কাটছাঁট বা বরাদ্দের ধরনে পরিবর্তন ঘটলে সামাজিক ক্ষেত্রে লিঙ্গ-সাম্য‌ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাধা পড়বে। কারণ, স্বাস্থ্য‌, পানীয় জল বা স্য‌ানিটেশনের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ক্ষেত্র খাতে বরাদ্দ লিঙ্গ বৈষম্য‌ দূর করার ক্ষেত্রে বড় হাতিয়ার। এর পাশাপাশি বর্ধিত পণ্য‌ মাশুল ও ডিজেলের মূল্য‌ বৃদ্ধির চাপে অবশ্য‌ই মৌলিক পণ্য‌সামগ্রীর মূল্য‌ বৃদ্ধি ঘটবে এবং তার ফলে মহিলাদের উপর বিনা পারিশ্রমিকে কাজের চাপও বাড়বে। মহিলারা তাঁদের যত্ন, পরিচর্যা দিয়ে পরিবারকে সুস্থ, সবল রাখবেন, কিন্তু তাঁরা নিজেরা অবহেলিত রয়ে যাবেন, অপুষ্টিতে ভুগবেন।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৫

পাঁচটি নারীকেন্দ্রিক প্রকল্পে বরাদ্দ নেই

মহিলাদের বিশেষ কিছু সমস্য‌ার মোকাবিলা করার জন্য‌ই নারীকেন্দ্রিক প্রকল্পগুলির সূচনা করা হয়। সমাজে নারীর অবস্থান নিয়ে এই প্রকল্পগুলির মধ্য‌েও অবশ্যই পিতৃতান্ত্রিক মনোভাব প্রতিফলিত হয়েছে। তা সত্বেও এই প্রকল্পগুলি নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে অত্যন্ত জরুরি। ব্য‌য় বাজেটের অংশ হিসাবে যে জেন্ডার বাজেট বিবৃতি (জিবিএস) প্রকাশ করা হয় তাতে মহিলাকেন্দ্রিক প্রকল্প ও কর্মসূচিগুলির পাশাপাশি যে সমস্ত প্রকল্পে বরাদ্দের তিরিশ শতাংশ বা তার বেশি অর্থ মহিলাদের জন্য‌ নির্দিষ্ট করে রাখা হয় সেগুলির সম্বন্ধেও যাবতীয় তথ্য‌ থাকে। ২০১৫-১৬ আর্থিক বছরে মহিলাদের জন্য‌ নির্দিষ্ট প্রকল্প/কর্মসূচি খাতে বাজেট বরাদ্দ হয়েছে প্রায় ১৭ কোটি টাকা। শুধু চরম মান বা সংখ্য‌াগত বিচারের যে (অ্য‌াবসোলিউট টার্ম) এই বরাদ্দ গত কয়েক বছরে কমেছে তা নয়, বরং মোট বাজেট বরাদ্দ ও জিডিপির অনুপাতেও এই বরাদ্দ হ্রাস পেয়েছ।

সামগ্রিক ভাবে নারীকেন্দ্রিক প্রকল্প/কর্মসূচি খাতে বরাদ্দ কাটছাঁটের পরিপ্রেক্ষিতে নারী ও শিশু বিকাশ মন্ত্রকের বরাদ্দের ক্ষেত্রে লক্ষণীয় পরিবর্তন হয়েছে। এই মন্ত্রকই মহিলাদের উন্নয়ন ও কল্য‌াণে গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনার ক্ষেত্রে সমন্বয়কারী বা নোডাল মন্ত্রক। বিগত দুই বাজেটের তুলনা করলে দেখা যাবে যে বহু প্রকল্প খাতে বরাদ্দ যৎসামান্য‌ই রয়ে গেছে। এমনকী কোনও কোনও ক্ষেত্রে বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাঁচটি প্রকল্প/কর্মসূচির জন্য বর্তমান বাজেটে কোনও বরাদ্দ নেই। সেগুলো হল, রাষ্ট্রীয় মহিলা কোষ, ধর্ষিতাদের জন্য পুনর্বাসনমূলক ন্যায়বিচার, শিশুকন্যাদের জন্য বিমার সুরক্ষা সহ শর্তসাপেক্ষে নগদ হস্তান্তর (ধনলক্ষ্মী), একা মহিলা/দুঃস্থ ও বিধবাদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে সহায়তা প্রদান কর্মসূচি এবং গার্হস্থ্য হিংসা থেকে মহিলাদের সুরক্ষা প্রদান আইন রূপায়ণে রাজ্যগুলিকে সহায়তা প্রদান। বিপন্ন মহিলাদের জন্য‌ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে সহায়তা প্রদান এবং গার্হস্থ্য নির্যাতন প্রতিরোধ আইন (২০০৫) রূপায়ণে রাজ্য‌গুলিকে সহায়তা প্রদান -- নারী কল্য‌াণ ও নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই দু’টি কর্মসূচির বিরাট তাৎপর্য রয়েছে। ২০১১-র জনগণনার তথ্য‌ অনুযায়ী বিধবা ও পরিত্য‌ক্ত মহিলাদের সংখ্য‌া বাড়ছে। অর্থাৎ এ বার থেকে অনেক বেশি মহিলারই এ ধরনের আশ্রয়কেন্দ্রের প্রয়োজন পড়বে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৫

সবলা প্রকল্পে বরাদ্দ নামমাত্র

গত বছর গার্হস্থ্য নির্যাতন প্রতিরোধ আইন রূপায়ণ খাতে যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছিল তা ব্য‌য় করা যায়নি। সে কারণেই হয়তো এই বছর এই খাতে কোনও বরাদ্দ রাখা হয়নি। আবার হয়তো এও আশা করা হয়েছে এখন থেকে রাজ্য‌গুলির হাতে জাতীয় করের বর্ধিত অংশ যাবে। তার ফলে রাজ্যগুলি নিজেরাই প্রয়োজনমতো এই খাতে বরাদ্দ করতে পারবে। তবে পূবর্বর্তী বছরের বরাদ্দ অর্থ ব্য‌য় করা যাচ্ছে না। এর থেকেই বোঝা যায় সংশ্লিষ্ট প্রকল্প রূপায়ণে রাজ্য‌গুলি কতটা অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তাই এই ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজ্য‌গুলির হাতে এতটা দায়িত্ব ও ক্ষমতা দেওয়া নিয়ে উদ্বেগের অবকাশ রয়েই যায়। বয়ঃসন্ধির মেয়েদের ক্ষমতায়নে রাজীব গান্ধী প্রকল্পের (সবলা) বরাদ্দেই সব চেয়ে বেশি কাটছাঁট করা হয়েছে। বাজেট নথি অনুযায়ী ২০১৪-১৫ অর্থবর্ষে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ৭০০ কোটি টাকা। এই প্রকল্প খাতে কেন্দ্রীয় বরাদ্দ এ বার কমিয়ে করা হয়েছে মাত্র ১০ কোটি টাকা। ভেবে দেখুন, ৭০০ কোটি থেকে একেবারে ১০ কোটি। বয়ঃসন্ধির কিশোরীদের পুষ্টি এবং স্বাস্থ্য‌ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রয়োজন মেটানোর জন্য‌ যে প্রকল্পের ব্য‌বস্থা সেই খাতের বরাদ্দই এ ভাবে তলানিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। রাজ্য‌গুলিকে এ বার ‘নির্ভয়া’ তহবিলের মাধ্য‌মে অর্থ প্রদান করা হবে। এখানেও রাজ্য‌গুলির জন্য‌ নির্দিষ্ট কোনও বরাদ্দ না থাকায় এই অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ভবিষ্য‌ৎ কী হবে তা নিয়েও প্রশ্নচিহ্ন রয়ে যায়। মহিলাদের উপর যে কোনও হিংসার ঘটনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা সরকারি ভাবে বলা হলেও বিপদ মোকাবিলার নির্দিষ্ট কেন্দ্রে বা ‘ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার’ কর্মসূচি খাতে এক ধাপ বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই খাতে বরাদ্দ কমিয়ে ২০ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে করা হয়েছে মাত্র ২ কোটি টাকা। অথচ নির্যাতন বা হিংসার কবলে পরা মহিলাদের সর্বতো ভাবে সাহায্য‌ করার জন্য‌ই ওই কর্মসূচির অবতারণা। বাজেট নথির বিস্তারিত ব্য‌াখ্য‌ায় বলা হয়েছে যে ২৫ লক্ষের বেশি জনসংখ্য‌ার বেশি শহরগুলিতে এই ধরনের কেন্দ্র খোলা হবে কিন্তু অর্থের উৎস নিয়ে কোনও বিস্তারিত ব্য‌াখ্য‌া নেই এই বাজেটে। সব চেয়ে বড় কথা, এই ধরনের কেন্দ্রগুলি একটি আপৎকালীন বিপদ মোকাবিলার ব্য‌বস্থার অঙ্গ হবে যাতে কোনও হিংসামূলক ঘটনার পর এই কেন্দ্রগুলির সাহায্য নেওয়া যায়।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৫

ক্রেশ প্রকল্পে বরাদ্দ বৃদ্ধি

আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের মতো যে সমস্ত প্রকল্প এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রদান করবে সেগুলির উপর আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাজেটে এগুলির কোনও কথা উল্লেখ করা হয়নি।

উপরোক্ত প্রকল্প/কর্মসূচিগুলি ছাড়া কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু বিকাশ মন্ত্রকের অধীনে আরও দু’টি প্রকল্প রয়েছে। এই দু’টি প্রকল্প নারীর সাম্য‌ ও সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার পথে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলি হল -- ‘রাজীব গান্ধী জাতীয় ক্রেশ প্রকল্প’ এবং ‘কন্য‌াসন্তানকে বাঁচাও, কন্য‌াসন্তানকে পড়াও অভিযান’। অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বলতর শ্রেণিকে ক্রেশের সুযোগসুবিধা দেওয়ার জন্য‌ই ‘রাজীব গান্ধী জাতীয় ক্রেশ প্রকল্প’। এই খাতে ২০১৪-১৫ আর্থিক বছরে যেখানে বরাদ্দ ছিল ৬২.৫০ কোটি টাকা সেখানে চলতি বাজেটে (২০১৫-১৬ আর্থিক বছর) এই বরাদ্দ বাড়িয়ে করা হয়েছে ১০২.৯৭ কোটি টাকা। এই পদক্ষেপ অত্য‌ন্ত প্রশংসনীয়। কারণ পরিচর্যামূলক অন্য‌ান্য‌ কাজের মতো শিশুর পরিচর্যার দায়িত্ব মূলত মহিলাদের নিতে হয়। আর কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের কম অংশগ্রহণে এটা একটা বড় কারণ বলে অনেকে মনে করেন। এ ছাড়াও যে সমস্ত দরিদ্র মহিলার কাছে সচেতন কর্মসংস্থানের কোনও সুযোগ নেই, স্বপ্ন হলেও এই বর্ধিত বরাদ্দে তাঁরা খানিকটা হলেও উপকৃত হবেন। তাঁরা বিকল্প কোনও কাজের কথা জানতে পারবেন। এ ছাড়াও এই ধরনের প্রকল্পে বরাদ্দ বৃদ্ধি ঘটলে বিনা পারিশ্রমিকে পরিচর্যামূলক কাজের গুরুত্ব নিয়ে সর্ব স্তরে আলাপ আলোচনা হবে এবং এই ধরনের খাতে রাজ্য‌ের তরফে বরাদ্দের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে আসবে। নারীকেন্দ্রিক প্রকল্পগুলিতে বরাদ্দ কাটছাঁটের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর শুরু হওয়া ‘কন্য‌াসন্তানকে বাঁচাও, কন্য‌াসন্তানকে পড়াও অভিযান’ (বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও) -- এর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। দেশে পুরুষের অনুপাতে নারীর সংখ্য‌া হ্রাসের মতো গুরুতর সমস্য‌ার মোকাবিলাই এর লক্ষ্য‌। এই কর্মসূচি কিন্তু নারী ও শিশু বিকাশ মন্ত্রকের আওতাধীন নয়। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রক এই কর্মসূচিটি পরিচলানা করছে এবং গত বছর এই কর্মসূচি বাবদ বরাদ্দ ছিল ১০০ কোটি টাকা।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৫

গ্রামীণ আবাসন ক্ষেত্রে বরাদ্দ কম

নারী ও শিশু বিকাশ মন্ত্রকের কর্মসূচিগুলিতেই শুধু নয়, গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের আওতাধীন নারী কল্য‌াণমূলক কর্মসূচিগুলিতেও বরাদ্দ কমানো হয়েছে। গ্রামীণ আবাসন ক্ষেত্রে বরাদ্দ কমেছে। সম্পত্তির স্বত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে যে দেশে নারী আর পুরুষের মধ্য‌ে এত বৈষম্য‌ সেখানে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ কমানোর সিদ্ধান্ত যু্ক্তিযুক্ত কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন জাগে। মহিলাদের নিরাপত্তার জন্য‌ ২০১৩-১৪ সালে ১ হাজার কোটি টাকা নিয়ে যে নির্ভয়া তহবিল গড়া হয়েছিল। পরবর্তী বাজেটগুলিতেও এই তহবিলে বরাদ্দের অঙ্ক অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বর্তমান বরাদ্দকে ধরে এই তহবিল মোট ৩ হাজার কোটি টাকা কমেছে। কিন্তু কিছু আবছা ধারণা ছাড়া কী ভাবে এই তহবিলের অর্থের সদ্ব্য‌বহার হবে তার কোনও পরিকল্পনা বা রূপরেখা নেই। মাত্র দু’টি কর্মসূচি ছাড়া আর অন্য‌ কোন কোন ক্ষেত্রে এই তহবিলের অর্থ কাজে লাগানো হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। প্রকল্প কর্মসূচিটি এই রেল বাজেটে ঘোষণা করা হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় পরীক্ষামূলক ভাবে রেলের বাছাই করা মহিলা কোচ ও কম্পার্টমেন্টে নজরদারি ক্য‌ামেরা বসানো হবে। আর গণ সড়ক পরিবহন ব্য‌বস্থায় মহিলাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটাই দ্বিতীয় কর্মসূচিটির লক্ষ্য‌, যার জন্য‌ বাজেটে ব্য‌য় ধার্য করা হয়েছে ৬৫৩ কোটি টাকা।

দেখা যাচ্ছে যে মহিলাদের উপর হিংসার ঘটনার প্রতিরোধে মূলত তথ্য‌প্রযুক্তি নির্ভর নজরদারি ব্য‌বস্থার উপরই জোর দেওয়া হচ্ছে এবং সেই খাতেই থাকছে বরাদ্দ। কিন্তু আন্তজার্তিক স্তরে যত সমীক্ষা হয়েছে তাতে এমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে সিসিটিভির নজরদারির ভয়ে অপরাধের ঘটনা বা অপরাধের প্রবণতা কমেছে। বরং এই ধরনের নজরদারি ব্য‌বস্থার ফলে মহিলাদের ব্য‌ক্তি স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে। যেটা প্রকৃত প্রয়োজন সেটা হল অত্য‌াবশ্য‌ক পরিষেবাগুলিকে সরকারি ব্য‌বস্থাপনার আওতায় আনা, কারণ মহিলারা বেশির ভাগ সময়ই সরকারি ব্য‌বস্থাপনার উপরই ভরসা করেন। কিন্তু এ বারের বাজেটে অর্থাৎ ২০১৫-১৬ সালে, এ বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৫

কাটছাঁট আরও অনেক ক্ষেত্রে

মহিলাদের জন্য‌ অনেক নির্দিষ্ট প্রকল্প/কর্মসূচিগুলি ছাড়াও জেন্ডার বাজেট বিবৃতিতে সেই সমস্ত প্রকল্পের সম্বন্ধে তথ্য‌ থাকে যেগুলির উপকারভোগীদের ৩০ শতাংশ বা তার বেশি মহিলা। এখানেও অনেক মন্ত্রক অর্থাৎ দফতরের ক্ষেত্রে বরাদ্দ কমেছে। এর মধ্য‌ে এমন ১৩টি ক্ষেত্রে বরাদ্দ কমানো হয়েছে নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যেগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র পাঁচটি ক্ষেত্রে বরাদ্দ বেড়েছে। লিঙ্গভিত্তিক বরাদ্দের ক্ষেত্রে কৃষি ও সমবায় দফতরের ক্ষেত্রেই সব চেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বরাদ্দ বৃদ্ধি ঘটেছে। এই পরিবর্তনের জন্য‌ অনেক দিন ধরেই অপেক্ষা করা হচ্ছিল। কৃষি ক্ষেত্রে কৃষক মহিলাদেরও যে বাজেটে শেষ পর্যন্ত স্বীকৃতি দেওয়া হল সেটা এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

এ ছাড়া অন্য‌ান্য‌ খাতে বরাদ্দ চিত্রটা যথেষ্ট হতাশা জাগায়। নারী ও শিশু বিকাশের জন্য‌ বরাদ্দ কেন এত কমল তা নিয়েও ধোঁয়াশা রয়ে যায়। মূলত সুসংহত শিশু বিকাশ প্রকল্পে (আইসিডিএস) বরাদ্দে বিপুল কাটছাঁটের দরুনই সামগ্রিক ভাবে নারী ও শিশু বিকাশ খাতে বরাদ্দ কমেছে। সুসংহত শিশু বিকাশ প্রকল্পে বরাদ্দ ১৬ হাজার কোটি টাকা থেকে একেবারে অর্ধেক কমিয়ে ৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। অথচ গর্ভবতী মহিলাদের জন্য‌ স্বাস্থ্য‌ের উন্নতি ও তাদের পুষ্টিবিধানে এই প্রকল্পটি অত্য‌ন্ত গুরুত্পূর্ণ। এর পাশাপাশি, এই প্রকল্পের একটি নির্দিষ্ট সাম্মানিক অর্থের বিনিময়ে যাঁরা কাজ করেন প্রকল্প খাতে বাজেট সহায়তার বরাদ্দ কমা মানে তাঁরাও বর্ধিত পারিশ্রমিক তথা উন্নততর কাজের পরিবেশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অথচ বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইস্তেহারে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, যে সমস্ত অঙ্গনওয়ারি কর্মী ও সহযোগী কর্মী এই প্রকল্প রূপায়ণের মূল কাণ্ডারী তাঁদের অবস্থার উন্নতি ঘটানো হবে। কেন্দ্রীয় সরকার মূলত এই প্রকল্পের মূলধনী ব্য‌য় বহনে দায়বদ্ধ। তার জন্যই এই প্রকল্প খাতে বরাদ্দ কাটছাঁট বলে যদি ধরে নেওয়া হয় তা হলে প্রকল্পে কর্মরত কর্মীদের কাজের পরিবেশের উন্নতি সাধন বা তাদের বর্ধিত পারিশ্রমিক দেওয়ার দায়িত্ব রাজ্য‌ সরকারগুলিকে নিতে হবে। তামিলনাড়ু বা কেরলের মতো অনেক রাজ্য‌ই ইতিমধ্য‌ে নিজেদের তরফে কেন্দ্রীয় বরাদ্দের তুলনায় বেশি বরাদ্দ রেখেছেন এবং আগামী দিনেও তারা এই ধারা বজায় রাখবে বলে আশা করা যায়। কিন্তু যে রাজ্যগুলি এই বিষয়টিকে কোনও রকম গুরুত্বই দিচ্ছে না তাদের ক্ষেত্রে কী হবে তা ভেবে দেখার মতো বিষয়।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৫

এ বার দায়িত্ব রাজ্যের

নারীকেন্দ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে গেলে স্বাস্থ্য‌ মন্ত্রকের বরাদ্দ যে ভাবে কমানো হয়েছে তা-ও যথেষ্ট উদ্বেগজনক। এই মন্ত্রকের জন্য‌ বরাদ্দ কমানো হয়েছে প্রায় ১৮৫০ কোটি টাকা। এ দেশে মহিলাদের স্বাস্থ্য‌ বিষয়ক সব ক’টি সূচকই কিন্তু উদ্বেগজনক। এই সূচক থেকে দেখা যাচ্ছে যে গ্রামাঞ্চলের ৭৫ শতাংশের বেশি মহিলা রক্তাল্পতার শিকার।

অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত মহিলাদের যে বিপুল অংশ কাজ করে তার পরিপ্রেক্ষিতে এই ক্ষেত্রের জন্য‌ একটি সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষার ব্য‌বস্থা থাকা উচিত -- যার মধ্য‌ে অবদানমূলক পেনশন (কনট্রিবিউটারি পেনশন), দুর্ঘটনা ও জীবনিবমা প্রকল্প থাকবে। এই উদ্দেশ্য‌ বাজেট বরাদ্দ রয়েছে ১২০০ কোটি টাকা। কিন্তু এই বরাদ্দ নেহাৎই অপর্যাপ্ত। এই অর্থে সংশ্লিষ্ট কর্মরতদের ৩ শতাংশও উপকৃত হবেন না। তা ছাড়া, এই অর্থ সদ্ব্য‌বহারে কোনও সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। কর্মীদের স্বীকৃত অংশের মহিলাদের হার এত কম যে এই প্রকল্প থেকে মুষ্টিমেয় কিছু মহিলাই সরাসরি উপকৃত হবেন। এ ছাড়া পেনশন প্রকল্পে নিজস্ব অবদানের যে অংশ রাখা হয়েছে তাতে বেশির ভাগ মহিলাই পিছিয়ে যাবেন। মহিলাদের উপর বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প বা ‘অটল পেনশন যোজনা’ সহ অন্য‌ান্য‌ প্রকল্পের কী প্রভাব পড়বে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। এই প্রকল্পগুলির প্রকৃত রূপায়ণে বিস্তারিত তথ্য‌ বিশ্লেষণ না করে কোনও সিদ্ধান্তে আসা ঠিক নয়। মহিলাদের দৃষ্টিকোণ থেকে অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হল ‘মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মনিশ্চয়তা আইন’। কারণ এই প্রকল্পের উপকারভোগীদের একটা বড় অংশই মহিলা। এই প্রকল্পে বরাদ্দ হ্রাসের একটা আশঙ্কা থাকলেও তা মোটামুটি ৩৪ হাজার কোটি টাকায় স্থিতিশীল রয়েছে। এই প্রকল্পের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে অনেক দরিদ্র মহিলা উপকৃত হবেন এবং সেই সঙ্গে গ্রামাঞ্চলের মহিলাদের মধ্য‌ে কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের হারও বাড়বে। পরিকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ নির্মাণশিল্পকে উৎসাহিত করে। কর্মসংস্থানে অন্য‌ান্য‌ ক্ষেত্রগুলির মধ্য‌ে নির্মাণকেন্দ্র দরিদ্র মহিলাদের কাছে একটা বড় ভরসা হতে পারে। কিন্তু সংগঠিত বৃহৎ নির্মাণশিল্পে মহিলাদের সংখ্য‌া এত কম যে এখানে আশা করার মতো কিছুই নেই।

২০১৫-১৬ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে এটাই দেখা যাচ্ছে যে মহিলাদের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বা কর্মসূচিতে কেন্দ্রীয় বরাদ্দ কমেছে। তাই নারীর সাম্য ও সমানাধিকার প্রতিষ্ঠায় এই ধরনের প্রকল্প বা কর্মসূচি চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারগুলির ভূমিকা এখন অনেক বড় হয়ে উঠেছে। এ ক্ষেত্রে কোনও কোনও রাজ্য খুব ভালো কাজ করলেও সব ক’টি রাজ্যই যে সেই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবে এমনটা আশা করা ভুল।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৫

রাজ্য বাজেট ২০১৫

রাজ্য বাজেটে কমলো ভ্যাটের বোঝা

কেন্দ্রীয় বাজেটের ঠিক আগের দিন, শুক্রবার রাজ্য বাজেট পেশ করতে গিয়ে যথারীতি তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনকালের একগুচ্ছ সাফল্যের খতিয়ান দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র। দিয়েছেন সামাজিক ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি রাজ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়াতে কর কাঠামোর পুনর্বিন্যাসের কিছু প্রস্তাবও। যেগুলিকে সাধারাণ ভাবে স্বাগত জানালেও শিল্পায়নের ছবিটা বদলাতে রাজ্যের উদ্যোগ কতটা সদর্থক, কী ভাবেই বা বিপুল ব্যয় বরাদ্দে অর্থ সঙ্কুলান হবে, সে সব নিয়ে শিল্পমহলের সংশয় অবশ্য একেবারে মুছে দিতে পারেননি। কারণ, ২০১৫-’১৬-র বাজেটে সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

কর কাঠামোর সংস্কারের ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী মূলত ছোট -মাঝারি শিল্প এবং ব্যবসায়ীদেরই বাড়তি গুরুত্ব দিয়েছেন বলে মনে করছেন শিল্পমহলের অনেকে। প্রথমত, বাজেটে অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাব, যে-সব সংস্থার বার্ষিক ব্যবসার সীমা ১০ লক্ষ টাকা, তাদের ভ্যাট বা যুক্তমূল্য কর দিতে হবে না। এখন এই সীমা ৫ লক্ষ। ফলে ২০ হাজারেরও বেশি ছোট ব্যবসায়ী ভ্যাটের বোঝা এড়াতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, যে-সব সংস্থার বার্ষিক ব্যবসার অঙ্ক ১০ কোটি টাকার কম তাদের ‘সেলফ অডিট স্টেটমেন্ট’ আর দিতে হবে না।

তৃতীয়ত, যে-সব ব্যবসায়ী ভ্যাটে নথিভুক্ত হননি, তাঁদের এর আওতায় আনতে বিশেষ ‘অ্যামনেস্টি’ প্রকল্প আনবে রাজ্য, যাতে সুদ ও জরিমানা ছাড়াই আগের বছরগুলির জন্য কম কর দিয়ে নথিভুক্ত হওয়া যাবে। চতুর্থত, বকেয়া কর নিয়ে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল অ্যাপেলেট অ্যান্ড রিভিশনাল বোর্ড’-এর অধীনে থাকা এক কোটি টাকা পর্যন্ত দাবির মামলাগুলিকে ‘ফাস্ট ট্র্যাক অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অথরিটি’-র কাছে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। পঞ্চমত, ভ্যাট অ্যাসেসমেন্টের নির্দেশ প্রকাশের এক মাসের মধ্যে তার রিফান্ড অনুমোদিত হবে ও ২০১৫-র সেপ্টেম্বরের মধ্যে বকেয়া মামলা মেটানো হবে।

অন্য দিকে, কর কাঠামোর কিছু সংস্কারের কথাও বলেছেন অর্থমন্ত্রী। যেমন কর বসানোর পদ্ধতি সরল করা, সহজে ও দ্রুত বৃত্তিকর রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থা চালু করা, বৃত্তিকরের সঙ্গে বাণিজ্য কর বিভাগকে মিশিয়ে দেওয়া ইত্যাদি। সামাজিক খাতে ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধি বা ছোট-মাঝারি শিল্পের জন্য ভ্যাট-এর বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার যে-প্রস্তাব অর্থমন্ত্রী দিয়েছেন, তাকে সাধারণ ভাবে স্বাগত জানিয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন বণিকসভা— সিআইআই, বেঙ্গল ন্যাশনাল চেম্বার, এমসিসি চেম্বার, ভারত চেম্বার, ইন্ডিয়ান চেম্বার, ফেডারেশন অব ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন্স-সহ সকলেই। ভ্যাট-সহ বেশ কিছু ছাড় পাওয়ায় খুশি ছোট-মাঝারি শিল্পের সংগঠন ফসমি ও ফ্যাক্সি। বেঙ্গল চেম্বারের কর্তা অম্বরীশ দাশগুপ্তের বক্তব্য, এই বাজেট জনমুখী। অ্যামনেস্টি প্রকল্প-সহ বেশ কিছু প্রস্তাব তাঁরা আগেই অর্থমন্ত্রীকে দিয়েছিলেন বলে দাবি বণিকসভার অন্যতম কর্তা তিমিরবরণ চট্টোপাধ্যায়ের। কর বিশেষজ্ঞ রাজর্ষি দাশগুপ্তর বক্তব্য, পণ্য-পরিষেবা করের দিকে এগোতে সাহায্য করবে অ্যামনেস্টি প্রকল্প।

তবে অম্বরীশবাবুর বক্তব্য, সব দফতরে ব্যয় বরাদ্দ বাড়লেও প্রায় ৪৯ হাজার কোটি টাকার বাড়তি অর্থের সঙ্কুলান কোথা থেকে হবে তার স্পষ্ট দিশা মেলেনি বাজেট বক্তৃতায়। ছোট-মাঝারি শিল্পকে গুরুত্ব দেওয়ায় খুশি হলেও তা আখেরে রাজ্যের শিল্পায়নে কতটা কাজে লাগবে তা নিয়ে তিমিরবরণবাবুর মতোই সংশয় রয়েছে এমসিসি চেম্বারের কর্তা অরুণ সরাফের মনেও। জমি-সহ রাজ্যে শিল্পায়নের বেশ কিছু সমস্যার জন্য অরুণবাবুর আশা ছিল, বাড়তি কিছু সুবিধা মিলবে। তিমিরবরণবাবুর বক্তব্য, ছোট ও মাঝারি শিল্পের প্রায় ৭০%-ই বড় শিল্পের উপর নির্ভরশীল। তাই বড় শিল্প রাজ্যে না-থাকলে শুধু ভ্যাটের ছাড় দিলে ছোট ও মাঝারি শিল্পের কতটা উপকার হবে? তাঁর সঙ্গে সহমত, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছোট-মাঝারি শিল্পের অনেকেই। এ ছাড়া, তাঁদের মতে, অন্য অনেক রাজ্যের চেয়ে পশ্চিমবঙ্গে করের হার বেশ চড়া। রাজ্য প্রবেশ কর না-তোলায় হতাশ ভারত চেম্বার। তাদের বক্তব্য, রাজ্যের শিল্পকে কাঁচামালের জন্য মূলত ভিন্ রাজ্যের উপরই নির্ভর করতে হয়। অন্য দিকে, গত বছর কর আদায়ের লক্ষ্য পূরণে রাজ্যের ব্যর্থতার সমালোচনা করেছে ইন্ডিয়ান চেম্বার। বস্তুত, ২০১৩-’১৪-এর পরে চলতি অর্থবর্ষে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা নিয়ে যে-সংশয় রয়েছে তা স্পষ্ট বাজেটেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিল্পকর্তার বক্তব্য, এটাই স্পষ্ট করছে রাজ্যের সার্বিক শিল্পায়নের করুণ দশা।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

বাড়ি কেনায় মধ্যবিত্তকে সুবিধা স্ট্যাম্প ডিউটিতে

নির্মাণ ও আবাসন শিল্পে রাজ্য সরকারের নেক-নজর অব্যাহত।

শুক্রবার বাজেট পেশ করে অমিত মিত্র জানান, যে-সমস্ত সম্পত্তির মূল্য ৩০ লক্ষ টাকার বেশি, সেগুলি রেজিস্ট্রি করার সময়ে অতিরিক্ত ১% স্ট্যাম্প ডিউটি দিতে হয়। এই ঊর্ধ্বসীমা বাড়িয়ে ৪০ লক্ষ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ ৪০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত মূল্যের সম্পত্তির ক্ষেত্রে এখন ৭ শতাংশের বদলে ৬% স্ট্যাম্প ডিউটি দিতে হবে।

রাজ্য সরকারের দাবি, মধ্যবিত্তদের হাতের নাগালে মাথা গোঁজার ঠাঁই এনে দিতেই এই ছাড় দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুই মধ্যবিত্ত-বাজার চাঙ্গা করতে এই পদক্ষেপ নয়। নির্মাণ শিল্পকে নতুন প্রাণ দিতেও ৪০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত দামের বাড়ির উপর স্ট্যাম্প ডিউটি কমানো হয়েছে। তাঁদের যুক্তি, রাজ্যে উৎপাদন ও বড় শিল্পের সংখ্যা নগণ্য হওয়ায় সে বাবদ রাজস্ব আদায়ের রাস্তা অপরিসর। ফলে রাজ্যের আর্থিক বৃদ্ধির পেছনে নির্মাণ শিল্পের ভূমিকা ক্রমশ বাড়ছে। সে ক্ষেত্রে এই শিল্প মার খেলে রাজ্যের বৃদ্ধিও মার খাবে। আর্থিক টানাটানিতে জেরবার রাজ্য সরকার সেই পরিস্থিতি সামাল দিতেই এই সুবিধার প্রস্তাব দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ভ্যাটের পরেই স্ট্যাম্প ডিউটি থেকে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় করে রাজ্য সরকার। কিন্তু সেই রাজস্ব আদায়েও মার খেয়েছে রাজ্য। ২০১৪-’১৫ সালে স্ট্যাম্প ডিউটি থেকে ৫৩৯৯.০৬ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছিল রাজ্য। বাস্তবে তা হয়নি। ৪২৫৭.১১ কোটি টাকা স্ট্যাম্প ডিউটি থেকে আয় করেছে সরকার। অর্থাৎ স্ট্যাম্প ডিউটির ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রার থেকে ২১ শতাংশ কম আয় করেছে অমিতবাবুর দফতর।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের খবর, রাজ্যের আশা এক শতাংশ স্ট্যাম্প ডিউটি কমলে চাহিদা বাড়বে। বাড়বে রেজিস্ট্রি করার প্রবণতাও। সব মিলিয়ে সরকারি কোষাগারে টাকা আসবে। উপদেষ্টা সংস্থা কেপিএমজি-র কর বিশেষজ্ঞ রাজর্ষি দাশগুপ্ত জানান, সাধ্যের মধ্যে বাড়ি দিতে পারলে ক্রেতার সংখ্যা বাড়তে বাধ্য। বাজার বড় করার এই সরকারি পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন তিনি। বাজেটে ২০১৫-’১৬ সালে স্ট্যাম্পে ডিউটি থেকে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা ৪৫৯৭.৬৭ কোটি ধরা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট শিল্পমহলের দাবি, নির্মাণ শিল্প যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা প্রমাণ করেছে গত মাসে রাজ্য সরকার আয়োজিত শিল্প সম্মেলন ‘গ্লোবাল বেঙ্গল সামিট’। গত মাসে আয়োজিত এই সম্মেলনে রাজ্যের মুখ রেখেছে নির্মাণ শিল্পই। ২২টি উপনগরী গড়ার জন্য রাজ্য সরকারকে ৭৬০০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে তারা।

নির্মাণ শিল্পের সংগঠন ক্রেডাই-এর অন্যতম কর্তা হর্ষবর্ধন পাটোডিয়ার দাবি, যে-মধ্যবিত্ত বাজার এ রাজ্যের আবাসন শিল্পের ভরসা, সরকারি পদক্ষেপের ফলে সেই বাজারের চাহিদাও বাড়বে লাফিয়ে লাফিয়ে। একই সুরে জৈন গোষ্ঠীর ঋষি জৈন ও প্রাইমার্ক গোষ্ঠীর সিদ্ধার্থ পাসারি জানান, মূলত ক্রেতাদের দিকে নজর রেখেই এই সুবিধা। তবে আখেরে আবাসন শিল্পও লাভবান হবে। ক্রেডাই-এর প্রাক্তন কর্তা প্রদীপ সুরেকার মতে, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে মধ্যবিত্ত ফ্ল্যাটের দামও বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে স্ট্যাম্প ডিউটি কমানোয় স্বস্তি পাবেন ক্রেতারা। গত বছরের গোড়াতেও ঘুরিয়ে স্ট্যাম্প ডিউটি কমিয়েছিল রাজ্য সরকার। ফ্ল্যাট, বাড়ি-সহ সম্পত্তির বাজার দরের সঙ্গে সরকারি মূল্যায়নের ফারাক কমানোর কথা জানিয়েছিলেন অমিতবাবু। সাধারণত সরকারি মূল্যায়নের উপরে ভিত্তি করেই স্ট্যাম্প ডিউটির হিসেব কষা হয়। ফলে মূল্যায়ন কমলে, সব মিলিয়ে ফ্ল্যাট বাবদ খরচের বোঝাও কমবে।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ১ মার্চ ২০১৫

কর্মসংস্থান, কর কাঠামো সরল করার লক্ষ্যে রাজ্যের বাজেট

অতিরিক্ত কর্মসংস্হান তৈরি এবং কর ব্যবস্হাকে সরল করাই এবারের রাজ্য বাজেটের মূল লক্ষ্য৷‌ এমনটাই দাবি করেছেন অর্থমন্ত্রী ড. অমিত মিত্র৷‌ শুক্রবার বিধানসভায় ২০১৫-১৬ আর্থিক বছরের বাজেট প্রস্তাব পেশ করে তিনি জানান, আগামী দিনে আরও ১৭ লক্ষ ৫০ হাজার নতুন কর্মসংস্হান তৈরি হবে৷‌ কর ব্যবস্হায় সরলীকরণের ফলে রাজস্ব বেড়ে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছবে৷‌ একই সঙ্গে সরকারের জনপ্রিয় কন্যাশ্রী বৃত্তির পরিমাণ বাড়ানো হল৷‌ ঘোষণা করা হল আগামী দিনে ৪০ লক্ষ স্কুল পড়ুয়াকে দেওয়া হবে সাইকেল৷‌ ছাড় হয়েছে ভ্যাটে, স্ট্যাম্প শুল্কে, প্রমোদ করে৷‌ সুবিধে মিলবে চা-বাগানের সেসেও৷‌ তবে বাজেটে নতুন করের প্রস্তাব নেই৷‌ বড় ধরনের কোনও কর ছাড়ের কথাও জানানো হয়নি৷‌ বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ৭ কোটি টাকা৷‌ অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, পরিকল্পনা খাতে বরাদ্দ ১৬ শতাংশ বৃদ্ধির কারণে রাজ্যে উন্নয়নের গতি বাড়বে৷‌ অর্থমন্ত্রী আবারও কেন্দ্রের তীব্র সমালোচনা করেছেন৷‌ বলেছেন, রাজ্য থেকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে টাকা, ফেলে রাখা হয়েছে ভয়াবহ ঋণের ফাঁদে৷‌ ১০০ দিনের প্রকল্পে কাটছাঁটের সমালোচনা করেছেন অর্থমন্ত্রী৷‌ তাঁর দাবি, গত আর্থিক বছরে ১৬ লক্ষ ৬ হাজার কর্মসংস্হানের সুযোগ করতে পেরেছে রাজ্য সরকার৷‌ আগামী আর্থিক বছরে সেই সংখ্যা বাড়তে চলেছে৷‌ নিজেদের সাফল্যের খতিয়ান দিতে গিয়ে অমিতবাবু জানান, রাজ্যে খাদ্যশস্যের মজুত তিন বছরে ৯ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে৷‌ ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গ প্রথম স্হানে৷‌ অর্থমন্ত্রী তাঁর বাজেট ভাষণে কিছু নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন৷‌ গ্রামাঞ্চলে গত দু’বছরে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যম্ত পড়ুয়াদের ৫ লক্ষ সাইকেল দেওয়া হয়েছে৷‌ আগামী ২ বছরে আরও ৪০ লক্ষ সাইকেল দেওয়া হবে৷‌ কন্যাশ্রী বৃত্তির পরিমাণ বার্ষিক ৫০০ থেকে ৭৫০ টাকা করা হচ্ছে৷‌ লোকপ্রসার প্রকল্প নামে ৩০ হাজার লোকশিল্পীকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে৷‌ পরিবহণ কর্মীদের জন্য মাসিক দেড় হাজার টাকা পেনশন, ৭৫০ টাকা ফ্যামিলি পেনশন, দেড় লক্ষ টাকা পর্যম্ত স্বাস্হ্য সুরক্ষা, ২৫ হাজার টাকা বিবাহ ও দু’বার পর্যম্ত মাতৃত্বকালীন সুবিধা, মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ ২ লক্ষ টাকা দেওয়া হবে৷‌ এ ছাড়াও দেড় কোটি অসংগঠিত শ্রমিককেই বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা স্কিমে এনে সামাজিক মুক্তি কার্ড দেওয়া হবে৷‌ এর সঙ্গে ক্ষুদ্র সেচ ব্যবস্হায় চাষীদের উৎসাহিত করতে একটি নতুন প্রকল্প নিতে চলেছে সরকার৷‌ ১০ লক্ষ পাম্প বসানোর জন্য প্রতি ক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা করা হবে৷‌ বাজেটে অর্থমন্ত্রী উন্নয়নের জন্য কিছু প্রতিশ্রুতি রেখেছেন৷‌

সূত্র : আজকাল, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

রাজ্য বাজেটে জোর উন্নয়নে

পরিকাঠামো উন্নয়ন

পূর্ত, সড়ক, পরিবহণ, পানীয় জল, বিদ্যুৎ পরিকাঠামো ব্যবস্হায় বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছে রাজ্য সরকার৷‌ ৫০০ কোটি টাকার সেচবন্ধু প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে৷‌ প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার রাস্তা চওড়া ও সংস্কার করা হয়েছে৷‌

স্বাস্হ্য পরিষেবায় জোর

অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, ন্যায্য মূল্যের ওষুধের দোকান এই রাজ্যেই মডেল৷‌ ৯৫টি এ ধরনের দোকান ইতিমধ্যে চালু হয়ে গেছে৷‌ আরও ২১টি চালু হবে৷‌ হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা তিন বছরে বেড়ে হয়েছে ৭৪ হাজার ৫০৭টি৷‌ পি পি পি মডেলে সরকারি হাসপাতালে ন্যায্য মূল্যে রোগ নির্ণয় কেন্দ্র, ডায়ালিসিস পরিষেবা আরও ২৬টি হাসপাতালে এ বছরের আগস্টে চালু হয়ে যাবে৷‌ বিশেষ: চিকিৎসকের অভাব মেটাতে ৬টি জেলা হাসপাতালে অতিরিক্ত ৬০টি ডি এন ডি কোর্স খোলা হয়েছে৷‌ আরও ৪টি সরকারি হাসপাতালে এই পরিকল্পনা রয়েছে৷‌

বাড়ছে স্কুল, কলেজ

শিক্ষা ব্যবস্হায় অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি অর্থমন্ত্রীর৷‌ পরবর্তী শিক্ষা বর্ষে ৪৪টি মডেল স্কুলের কাজ শুরু হয়ে যাবে৷‌ জঙ্গলমহলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাঁওতালি মাধ্যমে পড়াশুনোর জন্য ১ হাজার ১৫১ জন প্যারাটিচার নিয়োগ করা হয়েছে৷‌ পিছিয়ে পড়া জেলায় ছাত্রী হস্টেল এবং নতুন স্কুল তৈরির কাজ প্রায় শেষ৷‌ শুধু সরকারি নয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্হাপনেও উৎসাহ দিচ্ছে রাজ্য সরকার৷‌ উত্তর ২৪ পরগনায় ‘টেকনো ইন্ডিয়া ইউনিভার্সিটি’ এবং বীরভূমে ‘সিকম স্কিলফ ইউনিভার্সিটি’ ইতিমধ্যে ক্লাস শুরু করে দিয়েছে৷‌ আরও ৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজ্য সরকার অনুমোদন দিয়েছে৷‌ রাজ্যে ৪৫টি নতুন কলেজ তৈরি হচ্ছে৷‌ অবহেলিত এলাকায় আরও ৫০টি ডিগ্রি কলেজ এ বছর আগস্ট থেকে কাজ শুরু করবে৷‌ কোচবিহার, পুরুলিয়ায় নতুন দুটি সরকারি কলেজের কাজ চলছে৷‌ ৯২টি নতুন আই টি আই এ বছর চালু হবে৷‌ ৩২টি পলিটেকনিকের কাজ চলছে৷‌

শিল্পে এগিয়ে যেতে

অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, সম্প্রতি বিশ্ব বাংলা বাণিজ্য সম্মেলনে নতুন ২ লক্ষ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে৷‌ যাতে লগ্নির মোট প্রস্তাব দাঁড়িয়েছে ৩ লক্ষ কোটি টাকায়৷‌ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক ঋণে রেকর্ড ছুঁয়ে ৪০ হাজার ৭১৩ কোটিতে পৌঁছেছে৷‌ বৃদ্ধির হার দেশের মধ্যে প্রথম বলে বাজেটে দাবি করা হয়েছে৷‌ নতুন অর্থবর্ষে প্রতি জেলায় এক জানলা ব্যবস্হা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে৷‌ গোয়ালতোড়, হরিণঘাটা, হলদিয়ায় তিনটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক তৈরি করা হবে৷‌ ১৫টি ক্লাস্টার উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে৷‌ তথ্য-প্রযুক্তি ও ইলেকট্রনি‘ শিল্প প্রসারে ৮টি আই টি পার্ক এ বছর চালু হয়ে যাবে৷‌ এ ছাড়া মালদা, হাওড়া, কল্যাণী-সহ আরও ৭টির কাজ শুরু হয়ে যাবে৷‌ তথ্য-প্রযুক্তি, ইলেকট্রনি‘ শিল্পে প্রায় ২ লক্ষ পেশাদার কর্মসংস্হান আশা করছে রাজ্য সরকার৷‌

সূত্র : আজকাল, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

জামবনিতে সামাজিক বিচ্ছেদ সইতে না পেরে আত্মঘাতী ৫ কিশোরী

শোকে পাথর সীমাম্তের গ্রাম ওড়ো৷‌ মাঝেমধ্যে স্তব্ধতাকে ভেঙে দিচ্ছে ডুকরে ওঠা কান্নার রোল৷‌ নায়েকপাড়া থেকে শোক ছড়িয়ে পড়ছে সারা গ্রামে৷‌ সোমবার সন্ধ্যায় নায়েকপাড়ার ৬ কিশোরী কীটনাশক খেয়ে লুটিয়ে পড়ে গ্রামের পাশে ধানখেতে৷‌ মারা গেছে নমিতা, বেবি, সরস্বতী, সোমা ও পালন নায়েক৷‌ মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে পূজা নায়েক৷‌ ঘটনার দিন পূজাই প্রথম গ্রামের কয়েকজনের কাছে খবরটা পৌঁছে দেয়৷‌ এর পর গ্রামবাসীরা ছোটেন মাঠে৷‌ সঙ্গে সঙ্গে খবর যায় পার্শ্ববর্তী আধাসেনার ক্যাম্পে৷‌ সবাই মিলে ঝাড়গ্রাম জেলা হাসপাতালে নিয়ে আসার পথে মারা যায় ৫ জন৷‌ ঝাড়গ্রাম থেকে পরে পূজাকে আশঙ্কাজনক অবস্হায় স্হানাম্তরিত করা হয়৷‌ তদম্তে নেমে পুলিসও বেশ ধন্ধে রয়েছে৷‌ কেন বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করল প্রাম্তিক কৃষক পরিবারের এই পাঁচ কিশোরী! ওড়োর নায়েকপাড়ায় প্রায় পাশাপাশি বাড়ি ওদের৷‌ কারও মাটির দেওয়াল খড়ের ছাউনি তো কারও আবার নিকোনো মাটির দেওয়ালে পড়েছে অ্যাসবেসটসের আচ্ছাদন৷‌ মৃত কিশোরী বেবি নায়েক ও পালন নায়েকের বাড়ি পাশাপাশি৷‌ তারা সম্পর্কে খুড়তুতো বোন৷‌ সরস্বতী, সোমাও তাই৷‌ পালনের বাবা তনু নায়েক বলেন, ‘গরু বেঁধে ঘুমিয়েছিল পালন৷‌ বিকেলের দিকে ঘরের বউদের সঙ্গেই ছিল৷‌ ঘরের কাজ করে৷‌ এর পর সন্ধেয় পুকুরে যায়৷‌ আর ফেরেনি৷‌’ সোমার বাবা চিত্ত নায়েক জানান, সোমা নবম শ্রেণীতে পড়ত৷‌ সংসারের কাজ করছিল৷‌ ঝাঁট দিচ্ছিল৷‌ এর পর মুড়ি খেয়ে সে বেরিয়ে যায়৷‌ কী কারণে ৬ কিশোরী বিষ খাওয়ার সিদ্ধাম্ত নিল সে ব্যাপারে খোলসা করতে পারেননি প্রাম্তিক কৃষক পরিবারের এই মানুষজন৷‌ তবে জানা গেছে, ছোট থেকেই এই ৬ কিশোরীর মধ্যে খুব ভাল বন্ধুত্ব ছিল৷‌ একসঙ্গে ঘোরাফেরা করত৷‌ ৫ মার্চ দোল পূর্ণিমার দিন পার্শ্ববর্তী ঝাড়খণ্ড রাজ্যের জিরাপাড়া গ্রামের এক যুবকের সঙ্গে সরস্বতীর বিয়ের ঠিক হয়েছিল৷‌ সরস্বতী মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করবে বলে বাড়ির অভিভাবকদের জানায়৷‌ কিন্তু তার দাদু সামাজিক প্রথায় বিয়ের কথা বলেন৷‌ সরস্বতীর বান্ধবীরা কি তার বিয়ের ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছিল না? কিন্তু তার জন্য এক সঙ্গে বিষ খেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে? পুলিসের একটি অংশ অবশ্য মনে করছে এই ৬ কিশোরীর মধ্যে গভীর ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল৷‌ একে অপরকে ছাড়ার কথা ভাবতে পারছিল না হয়ত ওরা৷‌ তবে এ ব্যাপারে একমাত্র পূজা এই ঘটনার রহস্যের জাল খুলে দিতে পারে বলে মনে করছে পুলিস৷‌ ঘটনার খবর পেয়ে এদিন ওড়ো গ্রামে যান জামবনি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি সমীর ধল৷‌ মঙ্গলবার জেলা তৃণমূলের সভাপতি ও কার্যকরী সভাপতি দীনেন রায় ও প্রদ্যোৎ ঘোষ ঘটনাস্হল ঘুরে দেখেন৷‌ শোকসম্তপ্ত পরিবারগুলোকে সাম্ত্বনা দেন৷‌ এদিন ঝাড়গ্রামের অতিরিক্ত পুলিস সুপার অজিত সিং যাদব সাংবাদিকদের বলেন, তদম্ত না হলে কিছু জানা যাবে না৷‌ এদিন পাঁচ কিশোরীর মৃতদেহ ময়না তদম্ত হয় ঝাড়গ্রাম পুলিস মর্গে৷‌

সূত্র : সোমনাথ নন্দী, আজকাল, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

চা বাগানে এখন চলমান দুর্ভিক্ষ

উত্তরবঙ্গের বন্ধ চা-বাগানে একের পর এক ঘটে যাওয়া শ্রমিকের মৃত্যু, হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোনও ঘটনা নয়৷‌ এটি একটি ‘চলমান দুর্ভিক্ষ’৷‌ বন্ধ বাগান ঘুরে সেই অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে এভাবেই ব্যাখ্যা করলেন সমাজসেবী ডাঃ বিনায়ক সেন৷‌ বন্ধ বাগানে অপুষ্টির মাত্রা রীতিমতো আশঙ্কাজনক বলে মম্তব্য করেছেন তিনি৷‌ পাশাপাশি এই সমস্যা মেটাতে রাজ্যের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি৷‌ বাগান বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বিকল্প কোনও কাজের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হয়নি৷‌ বন্ধ হয়ে যাওয়া বাগান যেগুলো রাজ্য অধিগ্রহণ করেছে সেগুলিও ঠিকমতো চলছে না৷‌ এই সমীক্ষার রিপোর্ট রাজ্য সরকারকে দেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন৷‌ কেন্দ্রকেও জানানো হবে৷‌ বিনায়ক সেনের এই অভিযোগকে কার্যত ‘ভুল’ বলে মম্তব্য করেছেন খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক৷‌ তিনি জানিয়েছেন, ‘ডাঃ সেনের বক্তব্য সঠিক নয়৷‌ প্রত্যেকটি বন্ধ বাগানে আমরা ২ টাকা কেজি দরে চাল, গম দিচ্ছি৷‌ কেরোসিন দেওয়া হচ্ছে৷‌ প্রতিদিনের চলার জন্য যা যা প্রয়োজন, তার সিংহভাগটাই আমরা জোগান দিচ্ছি৷‌’ উল্লেখ্য, গত কয়েক বছর ধরে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন বন্ধ চা-বাগানে অর্ধাহার অনাহারে বেশ কিছু সংখ্যক চা-শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল৷‌ বাগান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাগানগুলিও বসবাসের অযোগ্য হয়ে যায়৷‌ জীবিকা বলতেও কিছু নেই৷‌ নদীর পাড়ে পাথর ভেঙে কোনওরকমে সংসার চালাচ্ছে তারা৷‌ এরকম অবস্হায় সেই সমস্ত বাগানে সমীক্ষার কাজ শুরু করেন সমাজসেবী বিনায়ক সেন৷‌ পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিসের সভাপতি বিনায়ক সেন সহ এই সমীক্ষার কাজে সহযোগিতা করে শিলিগুড়ি ও জলপাইগুড়ি ওয়েলফেয়ার অর্গানাইজেশন, ফোরাম ফর পিপলস হেলথ এবং ডুয়ার্স জাগরণ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্হা৷‌ গত বছরের জুলাই মাসেই ডুয়ার্সের বন্ধ রায়পুর চা-বাগানের শ্রমিক পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তাদের অপুষ্টি নিয়ে বডি মাস ইন্ডে‘ অথবা বি এম আই সেন্সাস করেন তাঁরা৷‌ সেই সমীক্ষায় চমকে দেওয়ার মতো রিপোর্ট তৈরি করেছেন তাঁরা৷‌ বিনায়ক সেন জানিয়েছেন, ‘অপুষ্টির হার কোথাও ১৭, কোথাও ১৬ আবার কোথাও ১৪ শতাংশের নিচে৷‌ এরকম পরিস্হিতিতে মৃত্যু মিছিল হবেই৷‌ এটি একটি চলমান দুর্ভিক্ষ৷‌’ রায়পুর ছাড়াও আরও বেশ কয়েকটি চা-বাগান পরিদর্শন করেছেন তাঁরা৷‌ তিনি অভিযোগ করেছেন, বন্ধ বাগানে ১০০ দিনের কোনও কাজ হচ্ছে না৷‌ এই সমীক্ষার রিপোর্ট দু-একদিনের মধ্যেই রাজ্য সরকারকে পাঠাবেন তাঁরা৷‌

সূত্র : আজকাল, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

আবাসনে নতুন বাজার, একা মেয়ের নিজের ঠিকানার খোঁজ

আর্থিক স্বাধীনতা আর নেট-প্রযুক্তির ডানায় ভর করে এখন একা বাড়ি কেনার ‘আকাশ ছুঁতে’ চাইছেন অনেক মহিলা। পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট যে, বাড়ি বা ফ্ল্যাট কিনতে আগ্রহী এই ‘সিঙ্গল উওম্যান’ বা একক মহিলা ক্রেতার সংখ্যা বাড়ছে তরতরিয়ে। ফলে ক্রমশ তৈরি হচ্ছে আস্ত এক নতুন বাজার। আর সেই বাজারের দখল নিতে ওই মহিলাদের পছন্দ-অপছন্দ মাথায় রেখে প্রকল্পের নীল নকশা তৈরিতে পিছপা হচ্ছে না নির্মাণ সংস্থাগুলি।

কেউ নিজের শহরেই মাথার উপর ছাদের জোগাড় করতে চান। কেউ চাকরিসূত্রে অন্য শহরে এসে সেখানে খুঁজছেন মাথা গোঁজার ঠাঁই। কেউ আবার ফ্ল্যাট বা বাড়ি কিনতে চান ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে। সঙ্গে পেতে চান গৃহঋণের সুদে করছাড়ের সুবিধাও। এমন নানা প্রয়োজন থেকেই ফ্ল্যাট বা বাড়ির চাহিদা বাড়ছে একা নারীদের মধ্যে। তাঁরা বিভিন্ন পেশার, বিভিন্ন বয়সের এমনকী সমাজের বিভিন্ন স্তরেরও।

এক বিনিয়োগ সংস্থার সমীক্ষা অনুযায়ী, চলতি বছরের মধ্যেই দেশের আর্থিক প্রগতির ১২ শতাংশ হবে মেয়েদের হাত ধরে। আর ২০২৫ সালের মধ্যে তা দাঁড়াবে ২৫ শতাংশ। এই সমীক্ষার একটি প্রতিফলন ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে দিল্লি, মুম্বই, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, কলকাতার মতো বড় শহরে। বাড়ির নতুন ক্রেতাদের মধ্যে অনেকেই সেখানে একা মহিলা। একই ছবি স্পষ্ট হতে শুরু করেছে জয়পুর, চণ্ডিগড়, ইনদওরের মতো দ্বিতীয় স্তরের শহরেও। ফলে সে কথা মাথায় রেখেই এখন ঘুটি সাজাচ্ছেন আবাসন নির্মাতারা।

রিয়েল এস্টেট বিশেষজ্ঞ সংস্থা কুশম্যান অ্যান্ড ওয়েকফিল্ডসের অন্যতম মুখপাত্র অভিজিৎ দাস বলেন, ‘‘কাজের জায়গায় মহিলাদের সংখ্যা বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে তাঁদের রোজগারের অঙ্ক। ফলে এখন বাড়ি কেনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ও খরচসাপেক্ষ সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করছেন না তাঁরা। তা ছাড়া, লগ্নির লাভজনকতা ও নিরাপত্তার বিচারেও বাড়ি বেশ আকর্ষণীয়।’’

রোজগারের পাশাপাশি রয়েছে বদলে যাওয়া জীবনধারাও। বিয়ের আগে, পরে কিংবা বিয়ে না-করলে, সব অবস্থাতেই অনেক সময়ই এখন অন্য শহরে চাকরি করতে যাচ্ছেন মহিলারা। কিন্তু একা মেয়ে হিসেবে বাড়ি ভাড়া পেতে নানা সমস্যা আর অপ্রিয় প্রশ্নের মুখে পড়তে বাধ্য হন তাঁরা। ফলে তা এড়াতে এঁদের অনেকেই এখন চেষ্টা করছেন নিদেন পক্ষে এক কামরার একখানা ফ্ল্যাট কিনে ফেলতে। জামশেদপুর থেকে কলকাতায় চাকরি করতে এসে এই সমস্যা পোহাতে হচ্ছিল সুতপা রায়কে। শেষমেশ ছোট একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন তিনি। তাঁর কথায়, বাড়ি কেনার পরিকল্পনা ছিলই। পরিস্থিতির চাপে সেই সিদ্ধান্ত দ্রুত নিতে হয়েছে।

সুতপার মতো এই একা মহিলা ক্রেতাদের টানতে এখন বিশেষ ভাবে প্রকল্প পরিকল্পনা করছে অনেক আবাসন সংস্থা। যেমন, বিশেষ ভাবে জোর পাচ্ছে নিরাপত্তা ও যাতায়াতের সুবিধার বিষয়টি। সিদ্ধা গোষ্ঠীর সঞ্জয় জৈন, প্রাইমার্কের সিদ্ধার্থ পাসারি থেকে শুরু করে জৈন গোষ্ঠীর ঋষি জৈন— সকলেরই দাবি, বাড়ি তৈরির সময় মাথায় রাখা হচ্ছে মহিলাদের সুবিধা-অসুবিধা। দেখা যাচ্ছে, বিপণি, জিম, সুইমিং পুলের মতো সুবিধা পেতে অনেকেই একটু বেশি দাম দিতে পিছপা নন। অনেকে আবার শুরু থেকেই ফ্ল্যাট তৈরি করতে চান নিজেদের প্রয়োজন মাফিক। তাই সেই বিষয়টিও নির্মাণ সংস্থাগুলিকে মাথায় রাখতে হবে বলে মনে করেন আর এক বিশেষজ্ঞ সংস্থা জোনস লাং লাসেলের এক মুখপাত্র।

নতুন গজিয়ে ওঠা এই বাজারের দিকে নজর রাখছে ব্যাঙ্কগুলিও। অধিকাংশ ব্যাঙ্কই গৃহঋণের সুদে মহিলা ক্রেতাদের বিশেষ ছাড় দেয়। ব্যাঙ্কগুলির দাবি, তা নিতে এগিয়ে আসছেন অনেক বেশি মহিলা ক্রেতা।

মহিলাদের নামে বাড়ি কেনার চল নতুন নয়। কিন্তু তা কেনা হয় নিছকই কাগজে-কলমে। আসল মালিক হন গৃহকর্তাই। ব্যাঙ্ক এবং নির্মাণ সংস্থাগুলির দাবি, সেই ছবি এখন বদলে দিচ্ছেন একক মহিলা ক্রেতারা।

সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা, ৮ মার্চ ২০১৫

বাড়ি চাই ? হতে পারে ভবিষ্যনিধির টাকায়

এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ডের ৫ কোটির বেশি গ্রাহককে এ বার সরাসরি আবাসনের সুযোগ দিতে চায় এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড অর্গানাইজেশন (ইপিএফও)৷‌ এ জন্য ৬ সদস্যের কমিটি গড়েছে তারা৷‌ চেয়ারম্যান মণীশ গুপ্তের নেতৃত্বে কমিটি এক মাসের মধ্যেই রিপোর্ট জমা দেবে৷‌ মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে ইপিএফও৷‌ সম্প্রতি শ্রমমন্ত্রী বি দত্তাত্রেয় লোকসভায় জানিয়েছিলেন, পি এফের মাধ্যমে আবাসনের সুযোগ দেওয়ার কথাও বিবেচনা করছে সরকার৷‌ নরেন্দ্র মোদী ২০২২ সালের মধ্যে সকলের জন্য আবাসনের সুযোগ তৈরি করতে চান৷‌ সেই লক্ষ্যেই বেশ কিছু মেগা আবাসন প্রকল্পের কথা বিবেচনা করছে কেন্দ্রীয় সরকার৷‌ পিএফের মাধ্যমে আবাসন এমনই একটি প্রকল্প৷‌ ইপিএফও-র কাছে এই মুহূর্তে ৬.৫ লাখ কোটি টাকার তহবিল রয়েছে৷‌ প্রতি বছর সেখানে নতুন করে জমা পড়ে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা৷‌ প্রধানমন্ত্রীর দফতর এক নোটে বলেছে, পিএফ তহবিলের মাত্র ১৫ শতাংশ যদি আবাসন খাতে দেওয়া যায়, তা হলেও আবাসন খাতে আসবে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা৷‌ এর মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ নতুন আবাসন গড়া যাবে৷‌ যদিও এই আবাসন হবে কম দামি৷‌ কারণ ইপিএফে ৭০ শতাংশের বেশি কর্মীরই মাসিক আয় ১৫ হাজার টাকার কম৷‌ বাড়ি বা ফ্ল্যাটের দাম বেশি হলে তা এই কর্মীদের আয়ত্তের বাইরেই থেকে যাবে৷‌ কেন্দ্র চায় এমন একটি প্রকল্প তৈরি করতে, যেখানে পিএফ থেকে ঋণ নিয়ে কর্মীরা সহজেই বাড়ির খরচ দিতে পারবেন৷‌ এখন বাড়ি তৈরি বা কেনার জন্য পিএফ থেকে ঋণ নেওয়ার ব্যবস্হা চালু আছে৷‌ কিন্তু কে কোথায়, কী ধরনের বাড়ি করবেন বা ফ্ল্যাট কিনবেন, তা কর্মীদের ওপরেই নির্ভর করে৷‌ এই পুরো ব্যাপারটাকে একটি ছাতার তলার নিয়ে আসতে চাইছে মোদী সরকার৷‌ এ জন্য তারা বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক, হাউসিং ফিনান্স কোম্পানি, রাষ্ট্রায়ত্ত নির্মাণ সংস্হা এনবিসিসি এবং ডিডিএ ইত্যাদি সংস্হার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে৷‌ এ দিকে বুধবার বৈঠকে বসছে ইপিএফও-র সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ট্রাস্টি (সিবিটি)৷‌ সেখানে আবাসন-সহ বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে৷‌ এ বারের বাজেটে পিএফ নিয়ে বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি৷‌ বলেছেন, নির্দিষ্ট পরিমাণের নীচে আয় করেন যে সব কর্মী, তাঁদের আর পিএফ তহবিলে অর্থ দিতে হবে না৷‌ যদিও এ জন্য চাকরিদাতাদের প্রদেয় অর্থে কোনও পরিবর্তন হবে না৷‌ অর্থাৎ চাকরিদাতার অর্থেই ভবিষ্যতে সুরক্ষা তহবিলের সুযোগ পাবেন ওই কর্মচারীরা৷‌ যদিও কত টাকার নীচে বেতন হলে এমন ব্যবস্হা হবে, তা বাজেটে জানাননি অর্থমন্ত্রী৷‌ এ ছাড়া ইপিএফের বদলে অন্য কিছু সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগও কর্মচারীদের দিতে চান জেটলি৷‌ বুধবার এই সব ব্যাপার নিয়েই আলোচনা করবে সিবিটি৷‌

সূত্র : আজকাল, ১১ মার্চ ২০১৫

কোয়েল প্রশিক্ষণে স্বনির্ভর হচ্ছেন সুন্দরবনের মহিলারা

 

সুন্দরবনের মহিলাদের স্বর্নিভর করতে কোয়েল চাষের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ব্যাঘ্র প্রকল্প দফতর। আর সেই চাষে আগ্রহীও সুন্দরবনের বিভিন্ন দ্বীপের কয়েক হাজার মহিলা।

প্রায় বছর খানেক ধরে সুন্দরবনের গোসাবা ব্লকের কুমিরমারি, পাখিরালা, আমলামেথি এবং ক্যানিং ব্লকের নিকারিঘাটা গ্রামে শুরু হয়েছে কোয়েল পাখির চাষ। ওই এলাকার কয়েক হাজার মহিলা এবং পুরুষ এখন এই কোয়েল পাখি চাষ করছেন।

বন দফতর সুত্রের খবর, ইতিমধ্যে গ্রামের মহিলাদের প্রায় হাজার দশেক কোয়েল পাখি বিলি করা হয়েছে। সাধারণত, ৩৫-৪০ দিনের কোয়েল পাখি বিক্রি করা হয়। তখন এই পাখির গড় ওজন থাকে ১৮০-২০০ গ্রাম। কোয়েল পাখি পালনে কোনও রকম প্রতিষেধক বা কৃমিনাশকের ওষুধের প্রয়োজন হয় না। তাই মুরগির থেকে কোয়েল পাখি পালনের চাহিদা বাড়ছে সুন্দরবনের বিভিন্ন দ্বীপে। এই পাখি বছরে প্রায় ২৮০টি ডিম দেয়। আর তাই মুরগি বা হাঁসের থেকে কোয়েল পাখি পালন অনেক বেশি লাভজনক।

koyel

উত্তর নিকারিঘাটা গ্রামের রামপ্রসাদ নস্কর, আশালতা নস্কররা বলেন, “আগে মুরগি পালন করতাম। কিন্তু তা ছেড়ে দিয়েছি। এখন কোয়েলের  চাষ করছি। এতে আমাদের যথেষ্ট লাভ হচ্ছে। আস্তে আস্তে দেখছি কোয়েলের মাংস ও ডিমের প্রতি মানুষের আগ্রহও বাড়ছে।”

বন দফতর জানিয়েছে, গবেষণায় দেখা গিয়েছে, পৃথিবীতে যত প্রকার প্রাণীর ডিম ও মাংস আছে, তার মধ্যে কোয়েলের ডিম ও মাংসের গুণগত মান তুলনায় বেশি। এটি পুষ্টিকরও বটে। এই পাখির মাংস শরীরে কোলেস্টেরল বাড়তে দেয় না। ডিম ও মাংসে প্রোটিনের পরিমাণ মুগরির মাংস ও ডিমের থেকে বেশি। কোয়েলের মাংস শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়তা করে। গর্ভবতী মায়েদের সুষম খাদ্য হিসাবে খুবই উপকারী।

ব্যাঘ্র প্রকল্প দফতরের ডেপুটি ফিল্ড ডিরেক্টর কিশোর মানকর বলেন, “কোয়েলের ডিমে ও মাংসের মধ্যে প্রোটিন, মিনারেল ভিটামিন, এনজাইম এবং অ্যামিনো অ্যাসিড এমন ভাবে রয়েছে, যা খেলে শরীরের সব ধরনের পুষ্টির অভাব পূরণ হয়। শরীরের কার্যক্ষমতা বাড়ায়।’’ তাঁর আশা, ধীরে ধীরে কোয়েলের চাষ জীবিকা হিসেবে আরও জনপ্রিয় হবে। তবে বাংলাদেশে যে পরিমাণ কোয়েল চাষ হয়, ভারতে তা হয় না। এ বার এখানকার বিভিন্ন দ্বীপে কেয়েল চাষ করে সেই পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে বলে তিনি জানান।

ইতিমধ্যে কোয়েল পাখির ডিম ও মাংস বাজারজাত করতে শুরু করেছে ব্যাঘ্র প্রকল্প দফতর। পশ্চিমবঙ্গ সরকার অনুমোদিত বিভিন্ন মাংসের দোকানে তা সরবরাহ করার উদ্যোগও করেছে।

কোয়েল পালনের ফলে সুন্দরবনের বিভিন্ন দ্বীপের মহিলারা আর্থিক ভাবে স্বনির্ভর হচ্ছে বলে ব্যঘ্র প্রকল্প দফতরের দাবি। এতে মহিলাদের মধু সংগ্রহ ও মাছ ধরার জন্য জঙ্গলে যাওয়ার প্রবণতা কমছে। বাঘের আক্রমণে মৃত্যুর ঘটনাও যার জেরে কমবে বলে আশা দফতরের।

সুত্র আনন্দবাজার  পত্রিকা

কলকাতা মেট্রো


কলকাতা মেট্রো
পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার অংশবিশেষে পরিষেবা প্রদানকারী দ্রুত পরিবহণ ব্যবস্থা। এই নেটওয়ার্কে ২২.৩০ কিলোমিটার পথে ২৩টি মেট্রো স্টেশন বিদ্যমান, যার মধ্যে ১৫টি স্টেশন ভূগর্ভস্থ। কলকাতা মেট্রো নেটওয়ার্কে ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি ব্রড গেজ ট্র্যাকে ভূগর্ভস্থ, ভূতলস্থ এবং উড়াল, তিন প্রকার স্টেশনই রয়েছে।

১৯৮৪ সালে চালু হওয়া কলকাতা মেট্রো ভারতের প্রথম মেট্রো রেল পরিষেবা (দ্বিতীয় মেট্রো পরিষেবা দিল্লি মেট্রো চালু হয় ২০০২ সালে)। এটি ভারতীয় রেলের অধীনস্থ এবং ভারতীয় রেলের একটি ক্ষেত্রীয় রেলওয়ের মর্যাদা ভোগ করে।

বর্তমান মেট্রো লাইনটি উত্তরে দমদম থেকে দক্ষিণে কবি নজরুল (গড়িয়া) পর্যন্ত প্রসারিত। এই পথটির দৈর্ঘ্য ২৩.৩ কিলোমিটার। মোট স্টেশনের সংখ্যা ২১। ভূগর্ভস্থ ও উড়াল – উভয় প্রকার ট্র্যাকেই ট্রেন চলাচল করে। বর্তমানে কলকাতা মেট্রোর একাধিক সম্প্রসারণ প্রকল্প ও নতুন লাইন নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলছে। প্যারিস মেট্রোর মতো কলকাতা মেট্রোতেও দেশের বিভিন্ন মণীষী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নামে স্টেশনের নামকরণ করা হয়ে থাকে। পার্ক স্ট্রিট অঞ্চলের মেট্রো ভবনে কলকাতা মেট্রোর সদর কার্যালয় অবস্থিত।

ইতিহাস

সেন্ট্রাল মেট্রো ১৯৪৯ সালে পশ্চিমবঙ্গের তদনীন্তন মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায় কলকাতার ক্রমবর্ধমান ট্রাফিক সমস্যার সমাধানে শহরে একটি ভূগর্ভস্থ রেলপথ নির্মাণের কথা বিবেচনা করেন। এই মর্মে একটি ফরাসি বিশেষজ্ঞ দলকে দিয়ে সমীক্ষা চালানো হলেও, কোনো সুসংহত সমাধানসূত্র পাওয়া যায়নি। এরপর ১৯৬৯ সালে কলকাতার ট্রাফিক সমস্যা সমাধানে মেট্রোপলিটান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট (রেলওয়ে) নামে একটি প্রকল্প গৃহীত হয়। এই প্রকল্পের প্রতিবেদনে কলকাতার ট্রাফিক সমস্যার সমাধানে দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থা চালু করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প পথ নেই বলে জানানো হয়। ১৯৭১ সালে প্রকাশিত প্রকল্পের মাস্টার প্ল্যানে কলকাতার জন্য মোট ৯৭.৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পাঁচটি মেট্রো লাইনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই পাঁচটি পথের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপিত হয় ১৬.৪৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট দমদম-টালিগঞ্জ লাইনটির উপর। ১৯৭২ সালের ১ জুন প্রস্তাব অনুমোদিত হয়। ওই বছর ২৯ ডিসেম্বর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এই প্রকল্পের শিলান্যাস করেন। ১৯৭৩-৭৪ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়।

প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও ১৯৭৭-৭৮ সালে অর্থের জোগান বন্ধ থাকা, ভূগর্ভস্থ পরিষেবাগুলির স্থানান্তরণ, আদালতের নানা স্থগিতাদেশ, কাঁচামালের অনিয়মিত সরবরাহ ইত্যাদি কারণে প্রকল্প রূপায়ণে অযথা দেরি হতে থাকে। অবশেষে তদানীন্তন রেলমন্ত্রী আবু বরকত আতাউর গনি খান চৌধুরীর বিশেষ উদ্যোগ, কর্মদক্ষতা, ও কূটনৈতিক দূরদৃষ্টির ফলে প্রকল্পের কাজে দ্রুততা আসে, এবং ১৯৮৪ সালের ২৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এসপ্ল্যানেড-ভবানীপুর (নেতাজি ভবন) ৩.৪০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট রুটে ভারতের প্রথম তথা এশিয়ার পঞ্চম মেট্রো পরিষেবা কলকাতা মেট্রোর উদ্বোধন করেন। ওই বছরই ১২ নভেম্বর চালু হয় দমদম-বেলগাছিয়া ২.১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট রুটটিও। উল্লেখ্য, এটিই কলকাতা মেট্রোর দীর্ঘতম স্টেশন দূরত্ব। ১৯৮৬ সালের ২৯ এপ্রিল টালিগঞ্জ অবধি মেট্রো সম্পসারিত হলে এসপ্ল্যানেড থেকে টালিগঞ্জ অবধি ১১টি স্টেশন নিয়ে ৯.৭৯ কিলোমিটার পথের কাজ সম্পূর্ণ হয়।

২২ নভেম্বর ১৯৯২ তারিখে দমদম-বেলগাছিয়া অংশটিকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। কারণ এই বিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র অংশটি খুব একটা জনপ্রিয়তা পায়নি। টালিগঞ্জ অবধি সম্প্রসারণের দীর্ঘ আট বছর পরে ১৩ অগস্ট ১৯৯৪ তারিখে দমদম-বেলগাছিয়া শাখাটিকে ১.৬২ কিলোমিটার সম্প্রসারিত করে শ্যামবাজার অবধি নিয়ে আসা হয়। সেই বছরের ২ অক্টোবর তারিখে ০.৭১ কিলোমিটার এসপ্ল্যানেড-চাঁদনি চক শাখাটি চালু হয়। শ্যামবাজার-শোভাবাজার-গিরিশ পার্ক (১.৯৩ কিলোমিটার) ও চাঁদনি চক-সেন্ট্রাল (০.৬০ কিলোমিটার) শাখাদুটি চালু হয় ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫ তারিখে। গিরিশ পার্ক থেকে সেন্ট্রালের মধ্যবর্তী ১.৮০ কিলোমিটার পথ সম্পূর্ণ হয় ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৯৫ তারিখে। এর ফলে বর্তমান মেট্রোলাইনটির কাজ সম্পূর্ণ হয়।

সম্প্রতি ২২শে আগস্ট ২০০৯ টালিগঞ্জ (বর্তমানে মহানায়ক উত্তমকুমার) স্টেশন থেকে গড়িয়া বাজার (বর্তমানে কবি নজরুল) স্টেশন পর্যন্ত ৫.৮৫ কিলোমিটার সম্প্রসারিত নতুন মেট্রোপথের উদ্বোধন করা হয়।

উত্তর-দক্ষিণ করিডোর

কবি নজরুল (গড়িয়া বাজার) মেট্রো স্টেশন।

কলকাতা মেট্রোর উত্তর-দক্ষিণ করিডোরের স্টেশনসমূহ হল :

  • কবি সুভাষ
  • শহিদ ক্ষুদিরাম - ক্ষুদিরাম বসুর নামে উৎসর্গিত
  • কবি নজরুল - পূর্বনাম গড়িয়া বাজার স্টেশন, কাজী নজরুল ইসলামের নামে উৎসর্গিত
  • গীতাঞ্জলি - পূর্বনাম নাকতলা স্টেশন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের নামে উৎসর্গিত
  • মাস্টারদা সূর্য সেন - পূর্বনাম বাঁশদ্রোণী স্টেশন, বিপ্লবী সূর্য সেনের নামে উৎসর্গিত
  • নেতাজি - পূর্বনাম কুঁদঘাট স্টেশন, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর নামে উৎসর্গিত
  • মহানায়ক উত্তমকুমার - পূর্বনাম টালিগঞ্জ স্টেশন, বাংলা চলচ্চিত্র অভিনেতা উত্তম কুমারের নামে উৎসর্গিত
  • রবীন্দ্র সরোবর
  • কালীঘাট
  • যতীন দাস পার্ক – পূর্বনাম হাজরা স্টেশন, স্বাধীনতা সংগ্রামী যতীন দাসের নামে উৎসর্গিত
  • নেতাজী ভবন – পূর্বনাম ভবানীপুর স্টেশন, স্টেশনের নিকটস্থ নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর বাসভবনের নামে নামাঙ্কিত
  • রবীন্দ্র সদন
  • ময়দান – প্রস্তাবিত নাম গোষ্ঠ পাল
  • পার্ক স্ট্রিট – রাস্তাটির বর্তমান পোষাকি নাম মাদার টেরিজা সরণি হলেও স্টেশনের নাম অপরিবর্তিতই আছে
  • এসপ্ল্যানেড
  • চাঁদনি চক
  • সেন্ট্রাল
  • মহাত্মা গান্ধী রোড – মহাত্মা গান্ধী রোড ও চিত্তরঞ্জন অ্যাভেনিউ-এর সংযোগস্থলে অবস্থিত
  • গিরীশ পার্ক – পূর্বনাম জোড়াসাঁকো স্টেশন, নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষের নামে উৎসর্গিত
  • শোভাবাজার-সুতানুটি – কলকাতার আদি বসতি সুতানুটি গ্রামের নামে উৎসর্গিত
  • শ্যামবাজার
  • বেলগাছিয়া
  • দমদম
  • নোয়াপাড়া

 

পূর্ব-পশ্চিম করিডোর

বিধাননগর (সল্টলেক) থেকে হাওড়া পর্যন্ত নির্মীয়মান পূর্ব-পশ্চিম করিডোরের প্রস্তাবিত স্টেশনগুলি হল :

  • সল্টলেক সেক্টর ফাইভ
  • করুণাময়ী
  • সেন্ট্রাল পার্ক
  • সল্টলেক সিটি সেন্টার
  • বেঙ্গল কেমিক্যাল
  • যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন
  • ফুলবাগান
  • শিয়ালদহ স্টেশন
  • বউবাজার
  • সেন্ট্রাল জংশন
  • মহাকরণ
  • হাওড়া স্টেশন

 

বৈশিষ্ট্যসমূহ

কারিগরি বৈশিষ্ট্যসমূহ ও নির্মাণপদ্ধতি

মেট্রো পরিকাঠামো বিনির্মাণ একটি অত্যন্ত জটিল কাজ। কারণ, এই কাজে একযোগে প্রয়োগ করতে হয় সিভিল, ইলেকট্রিক্যাল, সিগন্যালিং ও টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং ক্ষেত্রের একাধিক আধুনিক প্রযুক্তি। ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ারগণ তাঁদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও বিদেশ থেকে আহরিত জ্ঞানকে সম্বল করে ভারতে প্রথম কয়েকটি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ ঘটান কলকাতা মেট্রো সংস্থাপনকালে।

  • ডায়াফ্রাম দেওয়াল ও শিট পাইলের সাহায্যে কাট অ্যান্ড কভার অর্থাৎ খনন ও ভরাটকরণ পদ্ধতিতে নির্মাণকাজ চালানো হয়।
  • মাটির নিচে যখন খননকার্য চলছিল, তখন উপরের রাস্তায় ট্র্যাফিক পরিষেবা সচল রাখার জন্য প্রশস্ত ডেকিং-এর ব্যবস্থা করা হয়।
  • বায়ুচাপ ও এয়ারলক ব্যবহার করে সিল্ড টানেলিং করা হয়।
  • ইলাস্টিক ফাস্টেনিং, রাবার প্যাড, এপক্সি মর্টার এবং নাইলন ইনসার্টস ব্যবহার করে ব্যাল্যাস্টবিহীন ট্র্যাক নির্মাণ করা হয়।
  • স্টেশন ও সুড়ঙ্গের পরিবেশ নিয়ণকল্পে শীততাপ-নিয়ন্ত্রণ ও বায়ুচলনের ব্যবস্থা করা হয়।
  • ট্র্যাকশনের জন্য তৃতীয় রেল কারেন্ট কালেকশনের ব্যবস্থা করা হয়।
  • শুষ্ক ধরনের ট্রান্সফর্মার ও সিএফ-৬ সার্কিট ব্রেকার্স সহ ভূগর্ভস্থ সাবস্টেশন স্থাপন করা হয়।
  • টানেল ট্রেন ভিএইচএফ-রেডিও সংযোগ ব্যবস্থা রাখা হয়।
  • মাইক্রোপ্রসেসর-ভিত্তিক ট্রেন নিয়ন্ত্রণ ও সাবস্টেশনগুলির জন্য তত্ত্বাবধায়কীয় রিমোট কন্ট্রোল ব্যবস্থা চালু করা হয়।
  • স্বয়ংক্রিয় টিকিট বিক্রয় ও পরীক্ষণ বা চেকিং-এর ব্যবস্থা করা হয়।

 

সাধারণ বৈশিষ্ট্যসমূহ

সামগ্রিক ট্র্যাক দৈর্ঘ্য

২২.৩ কিলোমিটার

স্টেশন

২১ (১৫টি মাটির তলায়, ১টি ভূপৃষ্ঠে, ৫টি উত্তোলিত)

গেজ

৫ ফুট ৬ ইঞ্চি (১৬৭৬ মিলিমিটার) ব্রডগেজ

প্রতি ট্রেনের কামরাসংখ্যা

সর্বোচ্চ অনুমোদিত গতি

৫৫ কিলোমিটার/ঘণ্টা

গড় গতি

৩০ কিলোমিটার/ঘণ্টা

ভোল্টেজ

৭৫০ ভোল্ট ডিসি

বিদ্যুৎ সংগ্রহ পদ্ধতি

৭৫০ ভোল্ট ডিসি ব্যবহার করে তৃতীয় রেল

ভ্রমণ সময় : দমদম থেকে কবি নজরুল

৪১ মিনিট (প্রায়)

প্রতি কামরার লোকধারণ ক্ষমতা

২৭৮ জন দণ্ডায়মান ও ৪৮ জন উপবিষ্ট

প্রতি ট্রেনের লোকধারণ ক্ষমতা

২৫৯০ জন যাত্রী (প্রায়)

দুটি ট্রেনের আগমনের মধ্যে সময়ান্তর

অফিস টাইমে ৭ মিনিট ও ১০-১৫ মিনিট অন্যান্য সময়ে

প্রকল্প রূপায়ণে সামগ্রিক ব্যয়

১৮২৫ কোটি ভারতীয় টাকা (প্রায়)

পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ

পরিশুদ্ধ ও শীতল বায়ুযুক্ত কৃত্রিম বায়ুচলন

রোলিং স্টক

সমগ্র রেকটি ভেস্টিবিউল-বেষ্টিত। রোলিং স্টক সরবরাহ করে চেন্নাইয়ের আইসিএফ এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সরবরাহ করে বেঙ্গালুরুর এনজিইএফ। এই রোলিং স্টকগুলি অদ্বিতীয়, কারণ ডবলিউএজি-৬ সিরিজের কয়েকটি লোকোমোটিভ ছাড়া এগুলি ভারতের একমাত্র এন্ড-মাইন্টেড ক্যাব দরজা-বিশিষ্ট।

কলকাতা মেট্রোর ভূগর্ভস্থ রেল পরিষেবার জন্য আইসিএফ এই কোচগুলি বিশেষ নকশায় নির্মিত করে সরবরাহ করে। এর বৈশিষ্ট্যগুলি হল :

  • ট্র্যাকশনের বিদ্যুৎসংযোগ তৃতীয় রেল বিদ্যুৎ সংগ্রহ ব্যবস্থায় লব্ধ হয়।
  • স্বয়ংক্রিয় দরজা খোলা/বন্ধ হওয়ার ব্যবস্থা ও নিরবিচ্ছিন্ন ট্রানজিট পর্যবেক্ষণ করা হয়ে থাকে।
  • কোনওরকম মানবিক ব্যর্থতার ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় ট্রেন রক্ষণব্যবস্থা লব্ধ, এতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্রেক প্রযুক্ত হয়ে হয়।
  • ট্রেনও স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে। ড্রাইভার কেবল তত্ত্বাবধান করে থাকেন।
  • আসন্ন স্টেশনের নাম ঘোষণা করে গণসম্বোধন ব্যবস্থাও চালু আছে। ট্রেন স্টেশনে উপস্থিত হলে সেই স্টেশনের নামও ঘোষণা হয়ে থাকে। এই ঘোষণা হয় বাংলায় এবং তারপর ঘোষণার হিন্দি ও ইংরেজি অনুবাদও সম্প্রচারিত হয়। ট্রেনের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক ট্রেন ক্রিউ-এর যে কোনও সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন এবং এই ব্যবস্থায় সরাসরি যাত্রীদের সম্বোধন করে ঘোষণা করতে পারেন।

এই সকল অত্যাধুনিক কলাকৌশলবিশিষ্ট কোচগুলির নকশা ও নির্মাণ অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও উচ্চমানের। সুরক্ষা ব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে বিবেচিত হয়। কোনওরকম কারিগরি সহযোগিতা ছাড়াই যা লব্ধ হয়ে থাকে। সমগ্র ব্যবস্থাটি ২৩৫৬ জন যাত্রী ধারণক্ষমতা সম্পন্ন।

ভাড়া কাঠামো

 

কলকাতে মেট্রোর সাধারণ টিকিট

মেট্রো রেলের ভাড়া নির্দিষ্ট নয়। দুরত্ব অনুসারে এই ভাড়া পরিবর্তিত হয়ে থাকে। একটি ত্রিবার্ষিক বিরতির পর সর্বশেষ ১ অক্টোবর ২০০১ তারিখে মেট্রোর ভাড়া পর্যালোচিত হয়েছিল। বর্তমানের ভাড়া কাঠামোটি নিম্নরূপ:

জোন

দুরত্ব (কিলোমিটারে)

ভাড়া (টাকায়)

৫ কিমি পর্যন্ত

৫.০০

৫-১০ কিমি

১০.০০

১০-১৫ কিমি

১৫.০০

১৫-২০ কিমি

১৫.০০

২০-২৫ কিমি

২০.০০

২৫ কিমি বা তার বেশি

২৫.০০

টিকিট

কলকাতার মেট্রো রেলে নিম্নোক্ত ধরণের টিকিট দেখা যায়:

  • দৈনিক টিকিট
    • একক ব্যক্তি একমুখী যাত্রা
    • একক ব্যক্তি দ্বিমুখী যাত্রা (গমন ও প্রত্যাবর্তন)
    • বহু ব্যক্তি (২-৭ জন) একমুখী যাত্রা
    • বহু ব্যক্তি (২-৭ জন) দ্বিমুখী যাত্রা (গমন ও প্রত্যাবর্তন)
  • মাল্টি রাইড টিকিট
    • মিনিমাম মাল্টি রাইড (এমএমআর) – ২১ দিনের জন্য কার্যকর। এতে ১১টি রাইডের ভাড়ায় ১২টি রাইড লব্ধ হয়।
    • লিমিটেড মাল্টি রাইড (এলএমআর) – ৩০ দিনের জন্য কার্যকর। এতে ৩০টি রাইডের ভাড়ায় ৪০টি রাইড লব্ধ হয়।
    • এক্সটেন্ডেড মাল্টি রাইড (ইএমআর) - ৯০ দিনের জন্য কার্যকর। এতে ৫৫টি রাইডের ভাড়ায় ৮০টি রাইড লব্ধ হয়।

স্বয়ংক্রিয় ভাড়া সংগ্রহ

১৯৯৪ সালের অগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতা মেট্রো চৌম্বকীয় কোডযুক্ত টিকিট ও যাত্রী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা-সহ স্বয়ংক্রিয় ভাড়া সংগ্রহ বা অটোমেটিক ফেয়ার কালেকশন (এএফসি) ব্যবস্থা চালু করে। পরে এই ব্যবস্থা দমদম থেকে কবি নজরুল অবধি সকল স্টেশনে চালু করা হয়। চৌম্বকীয় টিকিটগুলি টিকিট মেশিন দ্বারা বিতরিত হয়। সে টিকিট একটি স্বয়ংক্রিয় ফেয়ার-কালেকশন গেটে নির্দিষ্ট স্থানে ঢোকালে স্টেশনে প্রবেশ করতে পারা যায়। চৌম্বকীয় টিকিট ছয় প্রকার –

  • একক রাইড
  • দুই রাইড (গমন ও প্রত্যাবর্তন)
  • বারো রাইড (এলএমআর)
  • ৪৮ রাইড (ইএমআর)
  • বহু ব্যক্তি একমুখী যাত্রা (এমপিএস)
  • বহু ব্যক্তি দ্বিমুখী যাত্রা (এমপিআর)
  • বর্তমানে বারো রাইড (এলএমআর)৪৮ রাইড (ইএমআর) পরিবর্তিত হয়ে ১২ রাইড (এমএমআর), ৪০ রাইড (এলএমআর) ও ৮০ রাইড (ইএমআর) করা হয়েছে।টিকিট অফিস মেশিন (টিওএম) এমন একটি মেশিন যা থেকে বুকিং কাউন্টারগুলি টিকিট ইস্যু করে। এই টিকিটগুলি স্বয়ংক্রিয় ফেয়ার কালেকশন গেটে ঢোকালে স্টেশনে প্রবেশ করা যায়। আবার স্টেশন থেকে বের হবার সময়ও একই পদ্ধতিতে বের হতে হয়। এই সময় গেট টিকিটগুলি ফিরিয়ে দেয় না। এই ব্যবস্থায় কখনও যদি যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দেয়, তবে সেক্ষেত্রে সাধারণ পদ্ধতিতে টিকিট বিতরণ ও পরীক্ষা করা হয়ে থাকে।

স্মার্ট কার্ড

২০০৫ সাল থেকে মেট্রো রেল স্মার্ট কার্ড ভিত্তিক টিকিট ব্যবস্থা চালু করে। এক্ষেত্রে কোনও ব্যক্তি একটি স্মার্ট (সম্ভবত আরএফআইডি-চিপ ইনস্টল করা) কার্ড ইস্যু করে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থে রিচার্জ করতে পারেন। স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুরত্ব নির্ধারিত হয়ে যায় ও সেই হিসাবে অর্থ রিচার্জ করা অর্থ থেকে কেটে নেওয়া হয়। এই ব্যবস্থা চৌম্বকীয় টিকিটের খরচ কমায়, তাই চৌম্বকীয় টিকিটের তুলনায় তিন টাকা কম মূল্যে মেট্রোয় পরিভ্রমণ করা যায়।

সুত্র: বিকাশপিডিয়া, পশ্চিমবঙ্গ

পাঁচ নাবালিকার বিয়ে রুখে দিল প্রশাসন ।

গোপনে একই গ্রামের পাঁচ-পাঁচটি নাবালিকার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছিল তাদের পরিবার। প্রশাসনের কানে কিন্তু পৌঁছে গিয়েছিল সেই খবর। শনিবার সেই গ্রামে গিয়ে পাঁচ নাবালিকারই বিয়ে যৌথ ভাবে রুখে দিল পুরুলিয়া জেলা প্রশাসন এবং চাইন্ড লাইন।

কোটশিলা থানার যে গরয়াটাঁড় গ্রামের এই ঘটনা, সেই গ্রামেই বাড়ি রেখা কালিন্দীর। নাবালিকা বিয়ে বন্ধ করার ‘ব্র্যান্ড অ্যাম্বাস্যাডর’ হিসাবেই যাকে চেনে গোটা দেশ। যে মেয়ে পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের বিয়ে নিজে রুখে হইচই ফেলে দিয়েছিল কয়েক বছর আগে। রেখার দেখানো পথ ধরে উঠে একে একে উঠে এসেছে বীণা কালিন্দী, সুনীতা মাহাতো, আফসানা খাতুনদের মতো প্রতিবাদী মুখ। যারা প্রত্যেকেই পুরুলিয়ার।

 

সেই গরয়াটাঁড় গ্রামেই ৫ নাবালিকার বিয়ের তোড়জোড়ের খবর বোঝাল, বাল্যবিবাহ রোধে অনেক পথ এগিয়েও আরও অনেক এগোতে হবে পুরুলিয়াকে। রেখা নিজেও শুনে উদ্বিগ্ন। তাঁর কথায়, ‘‘বিয়ের উপযুক্ত বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে হওয়ার অনেক সমস্যা রয়েছে। ব্যাপারটা আমি নিজে ব্যক্তিগত ভাবে জানি। নানা শারীরিক অসুবিধা হয়। আমার দিদিরও কম বয়সে বিয়ে হয়েছিল। তার চারটে সন্তান মারা যায়। আমি খুব কাছ থেকে এ সব দেখেছি।’’

এই গ্রামে এক সঙ্গে পাঁচটি পরিবার তাদের মেয়েদের বিয়ে ঠিক করেছে এবং বিয়ে হবে এ মাসেই—সেই খবর পেয়েই জেলা সমাজ কল্যাণ দফতরের আধিকারিক সুব্রত ঘোষ, বিডিও (ঝালদা ২) বিডিও দীপঙ্কর মুখোপাধ্যায়, জেলা শিশু সুরক্ষা আধিকারিক শিশির মাহাতো, জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষের সদস্য সচিব রোহন সিংহ, চাইল্ড লাইনের ঝর্ণা মুখোপাধ্যায় গ্রামে পৌঁছন। তাঁদের সঙ্গে কোটশিলা থানার পুলিশকর্মীরাও ছিলেন।

তাঁরা গ্রামে পৌঁছে প্রথমেই আনন্দ কুমারের বাড়িতে যান। এই বাড়ির মেয়ের বয়স মেরেকেটে তেরো বা চোদ্দো। কেন বিয়ের বয়স না হওয়া সত্ত্বেও মেয়েটির বিয়ে ঠিক করা হয়েছে জানতে চান প্রশাসনিক কর্তারা। মা মানসী কুমার অবশ্য কিছুতেই স্বীকার করতে চাইছিলেন না যে, তাঁরা মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছেন। সবে কথাবার্তা শুরু হয়েছে। রোহনবাবু তাঁদের জানান, মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই বিয়ে দেওয়া বিধি বহির্ভূত কাজ।

পরের গন্তব্য কর্ণ কুমারের বাড়ি। তাঁর কাছেও এই প্রশ্ন রাখেন প্রশাসনের আধিকারিকেরা। আমতা আমতা করে এই পরিবারের অভিভাবকেরাও জানান, কথাবার্তা চলছে। পাকা কিছু হয়নি। ইন্দ্রজিৎ কুমারের বাড়িতে পৌঁছলে বাড়ির লোকেরা প্রশাসনকে মেয়ের ঠিকুজি দেখিয়ে দাবি করেন, মেয়ের বিয়ের বয়স হয়ে গিয়েছে। ঠিকুজিটি উল্টে পাল্টে দেখতে গিয়ে নীচে লেখা একটি মোবাইল নম্বরে চোখ আটকে যায় রোহনবাবুর। ইন্দ্রজিৎবাবুকে জিজ্ঞাসা করায় তিনি জানান, ওই নম্বরটি ঠিকুজি যিনি তৈরি করেছেন, তাঁর। সঙ্গে সঙ্গে সেই নম্বরে ফোন করে রোহনবাবু জানতে চান, ‘আপনিই কি এই ঠিকুজি তৈরি করেছেন?’ ও-পার থেকে ‘হ্যাঁ’ শুনে পরের প্রশ্ন, ‘ঠিকুজিটি দেখছি ১৯৯৭ সালে তৈরি করা। তখন কি পুরুলিয়ায় মোবাইল পরিষেবা চালু হয়েছিল?’ ফোনের ও-প্রান্ত থেকে আর কোও জবাব পাননি আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষের সদস্য সচিব।

শেষে পাঁচটি পরিবারকেই বোঝানো হয়, উপযুক্ত বয়সের আগে বিয়ে দেওয়া হলে মেয়ের কী কী শারীরিক ক্ষতি হতে পারে। আইনের দিকটিও বোঝানো হয়। অভিভাকদের কেউ কেউ বলেন, তাঁদের বয়স হয়ে যাচ্ছে। পরে কী হবে কে বলতে পারে। তাই সময় থাকতেই বিয়ে দিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ।

জিজ্ঞাসাবাদে প্রশাসনিক কর্তারা আরও জানতে পারেন, এই গ্রামের অনেক মেয়েই স্কুলছুট। যুক্তি দেওয়া হয়, অনটনে সংসার চলে না। তাই লেখাপড়াও হয় না। প্রশাসন থেকে স্পষ্ট বলে দেওয়া হয়, মেয়েদের লেখাপড়া শেখান। কিন্তু বিয়ের বয়সের আগে বিয়ে দেওয়া যাবে না। পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারের কাছ থেকে মুচলেকাও নিয়েছে প্রশাসন। মুচলেকায় তাঁরা লিখেছেন, আঠারো বছর হওয়ার আগে কেউ মেয়ের বিয়ে দেবেন না।

চাইল্ড লাইনের কো-অর্ডিনেটর দীপঙ্কর সরকার বলেন, ‘‘গ্রামে অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। এ দিন অভিভাবকদের কাছে রেখা কালিন্দীর নাম জানিয়ে তাঁর কৃতিত্বের কথাও বলা হয়। কিন্তু, অভিভাবকেরা বিশেষ গুরুত্ব দেননি।’’ রেখা নিজেও বলছে, ‘‘বাল্য বিবাহের একটা রেওয়াজ এলাকায় চিরকালই রয়েছে। অভিভাবকদের সচেতনতা তো দরকারই। তবে, সবচেয়ে জরুরি মেয়েদের রুখে দাঁড়ানো।’’

সুত্রঃ প্রশান্ত পাল, কোটশিলা, ১৭ এপ্রিল, ২০১৬, ০৪:৫৬:২১, আনন্দবাজার পত্রিকা

লক্ষ্মী হাতপাখা তৈরির গ্রাম শিরোমণিতে

মেদিনীপুর দুপুরে খেতে বসেছেন বাড়ির কর্তা৷ সামনে কাঁসার থালা -বাটিতে থরে থরে সাজানো যত্নের ব্যঞ্জন৷ পাশে হাতপাখা নিয়ে বসে গিন্নি৷ গরমের সন্ধ্যায় হঠাত্ লোডশেডিং৷ পড়াশোনা লাটে ওঠায় হুল্লোড়ের মেজাজে কচিকাঁচারা৷ ছাদে মাদুর পেতে বসে দেদার আড্ডা আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাতপাখার দোলাচল৷ অথবা মনে করুন গনগনে জ্বর কমানোর সেরা দাওয়াই৷ গায়ে কম্বল, কপালে জলপট্টি আর সঙ্গে মায়ের হাতে হাতপাখার হাওয়া৷ যদি মনে করেন এই এসির যুগে এই দৃশ্যগুলির মতোই লুন্ত হয়েছে হাতপাখা , তবে ভুল করছেন৷ মেদিনীপুর সদর ব্লকের শিরোমণি গ্রামের ব্যস্ততা দেখলে ভুল ভাঙবে৷ এই গ্রামের বাসিন্দাদের মূল পেশা হাতপাখা তৈরি৷ ওঁরা বলছেন, যুগ পালটেছে, হাওয়াও পালটেছে, পাল্টায়নি শুধু গরমে তালপাতার তৈরি হাতপাখার চাহিদা৷ প্রায় ১০০ বছর ধরে বংশপরম্পরায় এই কাজটিই করছেন তাঁরা প্রায় ২৫ -৩০টি পরিবার৷ শিরোমণির মধ্যপাড়া তাই এখন চুড়ান্ত ব্যস্ত৷ ওঁরা জানাচ্ছেন , হাতপাখার চাহিদা একটুও না কমলেও , যোগান কমেছে কচি পাতার৷

মেদিনীপুর সদর ব্লকের হাতপাখার এই গ্রাম রানি শিরোমণির স্মৃতিবিজড়িত৷ সকাল হলেই গাঁয়ের পুরুষরা বেরিয়ে পড়েন৷ কেউ কচি তালপাতার সন্ধানে আবার কেউ তৈরি করা পাখা বিক্রি করতে৷ লালগড় , রামগড় , ধেড়ুয়া , বিনপুর কিংবা আরও দূরে যেতে হয় তালপাতা সংগ্রহের জন্য৷ বাড়ির সকলে মিলে হাতপাখা তৈরি করেন৷ এর পর তা শহরে গিয়ে বিক্রির পালা৷ গ্রামের হাতপাখা শিল্পী গৌতম কদমা , বরুণ কদমা , গোপাল বাগদের কথায় , ‘আমরা সকলেই গরিব৷ বেশির ভাগেরই নিজস্ব জমি নেই৷ ভাগে কিছু জমি চাষবাস করি৷ লোকের বাড়িতে মজুরি খাটতেও যাই৷ কিন্ত্ত বছরের বেশির ভাগ সময়টাই আমরা বাড়িতে হাতপাখা তৈরি করি৷ ওঁরা জানালেন , বাজারে তালপাতার হাতপাখা বিক্রি হয় ১০ টাকায়৷ শিরোমণি গ্রামের এই শিল্পীদের কথায় , ‘হাতপাখার চাহিদা বেড়েছে , খরচও বেড়েছে৷ কিন্ত্ত কমেছে লাভের পরিমাণ৷ সরকার গ্রামগঞ্জে হস্তশিল্পীদের পরিচয়পত্র -সহ অন্যান্য সুযোগ -সুবিধার ব্যবস্থা করলেও , এই গ্রামের হাতপাখা শিল্পীরা না পেয়েছেন কোনও পরিচয়পত্র , না পেয়েছেন সরকারি সুযোগ৷ শিরোমণি গ্রামে হাতপাখা শিল্পীদের আক্ষেপ শুধু এটাই৷ গ্রামের বাসিন্দা সঞ্জয় সিং বলেন , ‘আমাদের দুর্দশার কথা কেউ ভাবে না৷ কোনও আমলেই আমরা কিছু পাইনি৷ মেদিনীপুর সদর ব্লকের বিডিও ঋত্বিক হাজরা বলেন , ‘ওই গ্রামের দিকে আমাদের নজর আছে৷ ওখানে অনেকগুলি পরিবার রয়েছে, যাঁরা তালপাতা তৈরির কাজে যুক্ত৷ এর আগে শুধু একবার ওদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা হয়েছিল৷ ‘আনন্দধারা ’ প্রকল্পের আওতায় এনে ওঁদের সরকারি সুযোগ -সুবিধা দেওয়া যেতে পারে৷ ভোটপর্ব মিটলে সে দিকে দেখা যেতে পারে৷ ’গরমে নাওয়া -খাওয়া ভুলে রুজি -রোজগারে ব্যস্ত শিরোমণি গ্রাম

সুত্র: এই সময়

নগরোন্নয়নে নতুন দিশা দেখালো পশ্চিমবঙ্গ

রাস্তার সৌন্দর্যায়ন থেকে, নতুন থিম সিটি, জনপরিষেবা থেকে শুরু করে নতুন পরিকাঠামো সব কিছুতেই এই দপ্তর অনেক এগিয়ে।

পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের কিছু কৃতিত্ব

রাস্তার সৌন্দর্যায়ন থেকে, নতুন থিম সিটি, জনপরিষেবা থেকে শুরু করে নতুন পরিকাঠামো সব কিছুতেই এই দপ্তর অনেক এগিয়ে।

পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের কিছু কৃতিত্ব

  • কলকাতায় ই এম বাইপাস সংলগ্ন এলাকা থেকে পার্ক সার্কাস পর্যন্ত নতুন ‘মা’ উড়ালপুল তৈরি হয়েছে।
  • ধাপা সংলগ্ন এলাকায় জয়হিন্দ প্রকল্প, গার্ডেনরিচ জল প্রকল্প চালু হয়েছে।
  • রাজ্য সরকার নতুন টাউনশিপ নীতি প্রণয়ন হয়েছে।
  • ২০১৩ সালে গঙ্গাসাগর-বকখালি উন্নয়ন পর্ষদ, ২০১৫ সালে ফুরফুরাশরিফ উন্নয়ন পর্ষদ ও তারাপীঠ উন্নয়ন পর্ষদ তৈরি করা হয়েছে।
  • ইকো ট্যুরিজম বোর্ড গঠন করার জন্য ওয়েস্ট বেঙ্গল টাউন এবং কান্ট্রি অ্যাক্ট ১৯৭৯ সংশোধন করা হয়েছে।
  • ২০০৭-১১ সালে শহরের গরীব মানুষদের জন্য ৪৭,৯৫৬ টি গৃহ নির্মাণ হয়েছিল, সেই সংখ্যাটি ২০১১-১৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫,৫৮৯।
  • ২০০৭-২০১১ সালে নতুন জল সরবরাহ প্রকল্পের সংখ্যা ছিল ৬২, ২০১১-১৫ সালে এর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩।
  • ২০০৭-২০১১ সালে পরিকল্পিত ব্যয় ছিল ৩২০৯.৬৫ কোটি এবং ২০১১-১৫ সালে এর পরিমাণ ৫৪৭৩.৫৭ কোটি টাকা।
  • গীতাঞ্জলি স্টেডিয়াম তৈরি হয়েছে। নজরুল মঞ্চ পুনর্নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে।
  • রাজারহাটে ইকো ট্যুরিজম পার্ক তৈরি হয়েছে। এছাড়া নিউটাউনে প্রকৃতি তীর্থ, বর্ধমানে ম্যাণ্ডেলা পার্ক, ডুমুরজলা লেক এলাকায় ইকো পার্ক তৈরি হয়েছে।
  • রবীন্দ্র তীর্থ, নজরুল তীর্থ, মাদারস ওয়াক্স মিউজিয়াম, আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টার তৈরি হয়েছে নিউটাউন এলাকায়।
  • মিলেনিয়াম পার্ক, বৈষ্ণবঘাটা-পাটুলি তে বেনুবনছায়া, হাওড়ায় গঙ্গাপাড়ের সৌন্দর্যায়ন থেকে রবীন্দ্র সরোবর লেকের উন্নয়ন ও সংস্করণ সব কিছুই করা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আমলে।
তথ্য সংকলন: বিকাশপিডিয়া টীম, পশ্চিমবঙ্গ

ছোট, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পে এগিয়ে পশ্চিমবঙ্গ

রাজ্যে প্রায় ৫০,৮৫০ টি ইউনিট MSME তৈরি হয়েছে। আর সেখানে কাজ পেয়েছেন ৫,৪৫,০০০ এর বেশি লোক। ছোট, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পের উন্নতির জন্য ২০১৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এনেছে ‘বিশ্ব বাংলা’। এই ব্র্যান্ড বিশ্বের কাছে তুলে ধরছে বাংলার হস্তশিল্প, তাঁত শিল্প ও সংস্কৃতিকে। কলকাতা ও শান্তিনিকেতন মিলিয়ে রাজ্যে বিশ্ব বাংলার ৫টি ‘বিশ্ব বাংলা’ শোরুম রয়েছে।

বাংলার ছোট, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পপতিদের এক ছাদের তলায় এনে তাদের সমস্যার সমাধানের জন্য সরকার এনেছে ‘সিনার্জি’। ৩৫ হাজার ৫০০ ছোট, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পপতিদের এক ছাতার তলায় আনতে হাওড়া, মালদা, এবং শিলিগুড়িতে ইভেন্টের আয়োজন করা হয়েছে।

মানুষের সুবিধার্থে সরকার তৈরি করে দিয়েছে একটি ওয়েবসাইট-  www.myenterprisewb.in। টেকনোলজি সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানের জন্য তৈরি করা হয়েছে টেকনোলজি ফেলসিটেশন সেন্টার।

বেশ কিছু জেলায় বানানো হয়েছে ইউনিক ক্লিয়ারেন্স সেন্টার। ২০১৫ সালে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে সহযোগিতার জন্য সরকার ২০০ কোটি টাকার একটি ফান্ড তৈরি করেছে। ২০১৫ সালে আইআইএম কলকাতার সহযোগিতায় তৈরি হয়েছে ইনভেস্ট পোর্টাল www.msmebengalinvest.in

২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে বাংলার ছোট, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পের উন্নতির জন্য ইউনেসকোর সঙ্গে হাত মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ৯টি জেলার ২৬টি গ্রামে তৈরি করেছে ‘রুরাল ক্রাফট হাব’। পরবর্তীকালে এই জায়গাগুলিতে পর্যটন গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

শিল্পের উন্নতির জন্য বেলুড়ে ২০০ একর জমিতে তৈরি হবে ‘শিল্প তীর্থ’। শিল্পে পশ্চিমবঙ্গকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সরকারের একটি নতুন উদ্যোগ হলো রিয়ালিটি শো ‘এগিয়ে বাংলা’।

তথ্য সংকলন : বিকাশপিডিয়া টীম, পশ্চিমবঙ্গ

গ্রামের পোড়া মুখের ক্ষত এবার সারাবেন শহরের চিকিত্সকেরা

কয়েক মাস আগের কথা৷ কাঠ জ্বালিয়ে রান্না করছিলেন বছর তিরিশের ফুলবন্তি৷ হঠাত্ই গায়ে আগুন ধরে যায় জলপাইগুড়ির এই গৃহবধূর৷ প্রাণে বাঁচলেও গলা আর মুখের একটা বড় অংশে আগুন ক্ষত রেখে যায়৷ জেলা হাসপাতালের ডাক্তারবাবুরা বলেছিলেন , কলকাতায় নিয়ে প্লাস্টিক সার্জনকে দেখালে ঠিক হতে পারেন ফুলবন্তি৷ কিন্ত্ত দিন আনি দিন খাই পরিবারে অত রেস্ত কোথায় যে কলকাতায় দিনের পর দিন থেকে চিকিত্সা করাবে ? তাই বিকৃত মুখ নিয়ে বেঁচে থাকাই ভবিতব্য ধরে নিয়েছেন তিনি৷ ফুলবন্তি জানেন না , তাঁর ভবিষ্যত বদলাতে চলেছে৷ কারণ , এ বার কার্যত তাঁর দরজায় এসে চিকিত্সায় উপকার হবে কি না , বলে যাবেন শহরের ডাক্তারবাবুরা৷

আজ্ঞে হঁ্যা৷ গ্রামে যাওয়ার নামে যে রাজ্যে ভিরমি খান চিকিত্সকরা , সেখানেই রোগী খুঁজতে এ বার প্রত্যন্ত গ্রামে যাচ্ছেন শহুরে চিকিত্সকরা৷ কোনও বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগ নয়৷ স্বাস্থ্য দন্তরের উদ্যোগে আর জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের সাহায্যে গ্রামে গিয়ে প্লাস্টিক সার্জারি প্রয়োজন , এমন রোগীকে খুঁজে এনে অস্ত্রোপচার করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছেন আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্লাস্টিক সার্জারির বিশেষজ্ঞরা৷ আজ , সোমবার থেকেই পাইলট স্তরে যার কাজ শুরু হবে জলপাইগুড়ি জেলায়৷ আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ জানান , ‘গ্রামাঞ্চলে এমন অনেক রোগী থাকে , যাঁদের রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারি প্রয়োজন৷ কিন্ত্ত সঠিক সময়ে সঠিক চিকিত্সদের কাছে পৌঁছতে না -পারার জন্য তাঁরা চিকিত্সা করানোর সুযোগ পান না৷ এমন রোগীদের খুঁজে এনে অস্ত্রোপচার করার উদ্যোগ নিয়েছে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ৷ আমাদের প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগ সেখানে নোডাল সেন্টার হিসেবে কাজ করবে৷ ’কারা এই সুযোগ পাবেন ? আর জি করের ডাক্তারবাবুরা বলছেন , আঘাতজনিত যে কোনও শারীরিক ক্ষত যা চিরতরে শরীরে দাগ ফেলে গিয়েছে , অ্যাসিড আক্রান্ত , আগুনে পোড়া , জন্মগত কোনও শারীরিক ত্রুটি --- এককথায় প্লাস্টিক সার্জারির সাহায্যে যে সমস্ত ক্ষত এবং ক্ষতির নিরাময় সম্ভব , সে রকম সব রোগীই চলে আসবে এই স্ক্রিনিংয়ের আওতায়৷ এমন রোগীকে কী ভাবে খুঁজে আনবেন শহরের ডাক্তাররা ? শহরের মেডিক্যাল কলেজের দায়িত্ব সামলে , গ্রামে গ্রামে ঘোরার অত সময় কোথায় ? স্বাস্থ্য দন্তর সূত্রে খবর , প্রাথমিক স্ক্রিনিং -এর কাজে ব্যবহার করা হবে গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা আশা কর্মীদের৷ আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান রূপনারায়ণ ভট্টাচার্য বলেন , ‘আশা কর্মীরাই গ্রামে গ্রামে ঘুরে এই রোগীদের প্রাথমিক চিহ্নিতকরণের কাজটা করবে৷ তার পর তাঁদের নামের তালিকা ফোন নম্বর নিয়ে তৈরি হবে একটি তালিকা৷ তালিকায় কিছু নাম যোগ হলে আমাদের খবর দেবেন সংশ্লিষ্ট জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক৷ তার পর আমরা গিয়ে ফাইনাল স্ক্রিনিং করে কবে কোন রোগীকে আসতে হবে , সেটা বলে দেব৷ ’এতে কী লাভ ? স্বাস্থ্যকর্তাদের দাবি, এর ফলে দুটো সুবিধা হবে৷ প্রথমত , প্রত্যন্ত গ্রামের যে সমস্ত রোগী সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিত্সা পরিষেবা থাকা সত্ত্বেও প্লাস্টিক সার্জারির মতো সুপারস্পেশালিটি চিকিত্সা থেকে বঞ্চিত হতেন , তাঁরা চিকিত্সা করানোর সুযোগ পাবেন৷ দ্বিতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, জেলাওয়াড়ি রোগীর তালিকা কলকাতার ডাক্তারদের হাতে থাকায় , তাঁদের সিরিয়ালি ডেকে নিতে পারবেন আর জি করের ডাক্তারবাবুরা৷ স্বাস্থ্যকর্তাদের আশা , যার ফলে শিশুসাথীর মতোই সুসংহত রেফারেল সিস্টেম গড়ে উঠবে৷

আশায় বুক বাঁধছেন স্বাস্থ্যকর্তা এবং আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের ডাক্তারবাবুরা৷ ফুলবন্তিদের মুখে হাসি ফুটবে অবশ্য অস্ত্রোপচারের পর পুরোনো মুখ ফিরে পাওয়ার পরই৷

সুত্র: এই সময়

আলিপুর চিড়িয়াখানা

কলকাতার অভিজাত আলিপুর এলাকায় অবস্থিত, ৪৫ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত, আলিপুর জুওলোজিক্যাল গার্ডেন অথবা আলিপুর চিড়িয়াখানা, ঔপনিবেশিক যুগ থেকে রয়েছে। এই চিড়িয়াখানা ওয়েলস-এর রাজপুত্র সপ্তম এডওয়ার্ড দ্বারা প্রবর্তিত হয়েছিল। এমনকি কয়েক দশক আগে এই চিড়িয়াখানা কলকাতার গর্ব ছিল এবং এটি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য ছিল, যেখানে বার্ষিক গননা অনুযায়ী ২০ লাখ দর্শক আসত এবং বড়দিন ও নতুন বছরের সময় এই দর্শক সংখ্যা ১০ গুন বেড়ে যেত। আলিপুর চিড়িয়াখানা বিরল প্রাণীদের ‘বন্দী প্রজননে’ বিশেষজ্ঞ। বিরল এবং সাধারণ প্রাণী উভয়ের আধিক্য ছাড়াও, এই চিড়িয়াখানায় একটি সরীসৃপ ঘর, ক্যালকাটা আ্যকোরিয়াম এবং শিশুদের জন্য আরও একটি পৃথক চিড়িয়াখানা ছিল। এই চিড়িয়াখানার সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রাণীগুলি ছিল – আফ্রিকান সিংহ, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, চিতা বাঘ, ভারতের শ্রেষ্ঠ এক শৃঙ্গ গণ্ডার, জিরাফ, জেব্রা, জলহস্তী, ভারতীয় হাতি, উট এবং জায়ান্ট এলান্ড। এই চিড়িয়াখানায় এছাড়াও একটি পক্ষিশালা ছিল যেখানে কিছু বিরল প্রজাতির পাখি; যেমন – আমেরিকার কাকাতুয়া প্রজাতির বড় তোতা, কনুর, টুরাকস, লরি,লরিকিটস, হর্নবিলস্ এবং বিভিন্ন অ-উড়ন্ত প্রজাতির পাখি, যেমন – ফিসান্টস, উটপাখি এবং এমু দেখা যেত। এখানে উপস্থিত বড় জলাশয়টি শীতকালে পরিযায়ী পাখিদের জন্য একটি আশ্রয়স্থল ছিল, যা বন্য প্রাণী এবং পক্ষি ফটোগ্রাফারদের জন্য একটি লোভনীয় দৃশ্য হিসাবে প্রমানিত। এটি অদ্বৈত-এর একটি আশ্রয়স্থল, যা হল ২৫০ বছর বয়সী আলবাড্রার একটি দৈত্য কচ্ছপ। কিংবদন্তি আছে যে এই কচ্ছপটি সিসিলির লর্ড ক্লাইভের একটি ব্যক্তিগত সমষ্টি এবং ব্রিটিশ নাবিকগণদের মাধ্যমে ১৮৭৫ সালে, এটি আলিপুর চিড়িয়াখানায় এসে পৌঁছায়।

কিন্তু এগুলি হাজার হাজার বছর আগের কথা। আলিপুর চিড়িয়াখানার বর্তমান ভগ্নাবশেষ, যা একদা প্রাচীনতম এবং ভারতের বৃহত্তম প্রথাগত জুওলোজিক্যাল পার্ক ছিল, বর্তমানে পর্যাপ্তরূপে প্রতিপালিত হয় না। এই চিড়িয়াখানার বসবাসকারীদের জীবনযাত্রার অবস্থা কুখ্যাত দক্ষিণ আমেরিকান কারাগারের বন্দীদের চেয়েও অনেক বেশী খারাপ। হাস্যকর ভাবে, যেই চিড়িয়াখানা একদা পশুদের “বন্দী প্রজনন” বিশিষ্টতার জন্য বিখ্যাত ছিল সেই চিড়িয়াখানার প্রাণীদের মৃত্যুর হার ক্রমশ বেড়ে চলেছে। চেক প্রজাতন্ত্র থেকে আমদানি করা দুটি লাল ক্যাঙ্গারু সম্প্রতি মারা গেছে এবং চিড়িয়াখানার কর্মকর্তারা এটা দাবী করছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যায় এদের মৃত্যু ঘটেছে। এই পশু মৃত্যুর ঘটনায় পেটা (পি.ই.টি.এ) অসন্তুষ্ট হয়েছেন এবং অযোগ্যতার দরুন এই চিড়িয়াখানা বন্ধ করার আদেশ দিয়েছেন। গত বছরেও একটি লাল ক্যাঙ্গারুর মৃত্যুকে অনুসরণ করে এই আদেশ দেওয়া হয়েছে। একটি সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী জানা গেছে যে, আলিপুর চিড়িয়াখানায় প্রাণীদের মোট মৃতের সংখ্যা ৬৭ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তার মধ্যে পাখি হল ৩০-টি ও সরীসৃপ ২০-টি এবং দুটি নবজাত মারমোসেট, ২০১১ সালের আগস্ট মাসে গড় মৃত্যুর হার হয়ে দাঁড়িয়েছিল ৮ মাসে ৮-টি। বিগত ১৮ মাসে মোট ৪-টি শিম্পাঞ্জির মৃত্যু ঘটেছে। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ দ্বারা জানা গেছে যে, এই সময় সিংহ এবং বাঘেরও মৃত্যু ঘটেছে। চিড়িয়াখানার এক কর্মকর্তা বলেছেন যে “হতে পারে মৃত্যুর সংখ্যা বেশী কিন্তু অধিকাংশ মৃত্যুই বয়স সংক্রান্ত এবং অত্যন্ত স্বাভাবিক”। চিড়িয়াখানার পরিচালক শ্রীমান এম.সিংঘাল-এর একটি প্রাতিষ্ঠানিক রিপোর্ট এখনও মুলতুবী রয়েছে।

উচ্চহারে প্রাণী মৃত্যুর অনেক কারন আছে কিন্তু বেশিরভাগই ক্ষত বা সংক্রমণের কারনে হয়েছে। প্রথমত, চিড়িয়াখানার প্রাণীগুলি একটি অত্যন্ত অপরিচ্ছন্ন এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বাস করে। এমনকি তাদের যে খাবার এবং জল সরবরাহ করা হয় তা অত্যন্ত খারাপ মানের। সঠিক খাদ্য এবং পানীয় জল এবং অপরিচ্ছন্ন জীবনযাপনের জন্য এখানকার প্রাণীদের মধ্যে প্রায়শই সংক্রমণ ঘটে। এমনকি পশুচিকিৎসকের কোন চিহ্ন পর্যন্ত সেখানে নেই। এই সব কারনেই চিড়িয়াখানার স্বাস্থ্য পরিকাঠামো শোচনীয় হয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, চিড়িয়াখানার রক্ষণাবেক্ষণ দল প্রাণীদের জন্য সামান্য সহানুভূতিও প্রদর্শন করেনা এবং বাস্তবে পশুদের আচরণ বোঝার কোন জ্ঞানও তাদের নেই। লাল ক্যাঙ্গারুর মৃত্যু, চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের অবহেলার একটি উদাহরণ। কারণ – চিড়িয়াখানা রক্ষণাবেক্ষণ দলের কোন সদস্যদেরই ক্যাঙ্গারু প্রতিপালন করার যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই। তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি অবশ্যই হল জায়গার সমস্যা। বেশিরভাগ লোহার এই খাঁচাগুলি ঔপনিবেশিক যুগের। বাঘ ও সিংহরা এই গুহার মধ্যে ঢুকতে বাধা পায়, যার অর্থ হল এদের চেয়ে ছোট আকারের চিতাবাঘেরা এখানে ঢুকতে পারে।

২০০৯ সালে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের একটি বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, “একটি বড় চিড়িয়াখানায় ৭৫-টি প্রজাতির ৭৫০-টি পশুদের জন্য ৭৫ হেক্টর জমি থাকতে হবে বা গড়ে প্রত্যেক প্রাণীর জন্য ০.১ হেক্টর জমি থাকতে হবে”। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, আলিপুর চিড়িয়াখানা প্রাণী প্রতি শুধুমাত্র ০.০১৩ হেক্টর স্থান প্রদান করতে পারে, যা নির্ধারিত স্থানের কেবলমাত্র এক দশমাংশ। একটি আদর্শ আকারের চিড়িয়াখানা হিসাবে এই চিড়িয়াখানার স্থান সমস্যা কেন্দ্রীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ (সি.জেড.এ) স্থান নির্ণায়ক নীতির এক সরাসরি অবমাননা। সি.জেড.এ. স্থান নির্ণায়ক নীতির মতে নির্ধারিত স্থান পূরণ করতে আলিপুর চিড়িয়াখানা ১৪,০০০ বর্গ মিটার দ্বারা পিছিয়ে আছে।

এছাড়াও, প্রাণীদের গৃহসুলভ অনুভূতি প্রদান করতে প্রাণী পরিবেষ্টনী পৃথক বিশ্রামের এলাকা, আশ্রয়কেন্দ্র, পানীয় জলের কেন্দ্র দ্বারা সজ্জিত করা উচিত, কিন্তু বাস্তবে বিশেষ করে বাঘ এবং সিংহের জন্য প্রদিত নিম্নমানের পরিবেষ্টন প্রাণীদের ওঠা বসার জন্য একদমই যথেষ্ট নয়। এই স্থান মানসিক সমস্যা বৃদ্ধি করে বিশেষ করে মাংসাশী প্রাণীদের মধ্যে, বিশেষজ্ঞরা যাকে বলে “অপরিবর্তনীয় আচরণ”। এছাড়াও, ফুর্তিবাজ, অসংবেদনশীল এবং অধিকাংশই মত্ত দর্শকরা চিড়িয়াখানায় তাদের এস.এল.আর. ক্যামেরা নিয়ে এসে মূর্খ মনোভাবের সঙ্গে রূক্ষভাবে পশুদের গোপনীয়তা ভঙ্গ করে, ফলস্বরূপ পশুরা আরও বেশী অন্তর্মুখী হয়ে পড়ে, বিশেষ করে মাংসাশী পশুরা। আলিপুর চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ উপলব্ধি করেছেন যে, এই সময় এক সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তাই, তারা ঘোষণা করেছেন যে চিড়িয়াখানায় প্রাণী গ্রহণের এই নতুন প্রকল্পে এক উৎসাহব্যঞ্জক প্রতিক্রিয়ার প্রয়োজন। এই প্রকল্পে বলা হয়েছে যে, দত্তক নেওয়া প্রাণীদের এই চিড়িয়াখানায় রাখা হবে কিন্তু দত্তক নেওয়া পিতামাতাকেই এই প্রাণী কল্যান ও দেখাশোনার সকল দায়িত্ব নিতে হবে। অবশ্যই প্রাণীর মালিক হওয়ায় অন্যান্য খরচ ছাড়াও দত্তক নেওয়া পিতামাতাকে বার্ষিক একটি বড় রকমের অর্থ দিতে হবে। এই প্রকল্পের অধীনে কিছু দিন আগে একটি জাগুয়ারকে দত্তক নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সচেতন বন্যপ্রাণী কর্মী সংস্থা যেমন সি.জেড.এ – এই একটি ব্যাপারে একমত যে আলিপুর চিড়িয়াখানা অত্যন্ত জনাকীর্ণ, একটি চিড়িয়াখানার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রচন্ড রকমের অভাব রয়েছে এবং তাই সি.জেড.এ-র নিয়ম অনুযায়ী পুরাতন প্রাণী পরিবেষ্টন ভেঙে নতুন ভাবে চিড়িয়াখানার সম্পূর্ণ পুনর্গঠন করা খুবই প্রয়োজন। সরকার আলিপুর চিড়িয়াখানা থেকে কিছু পশুদের স্থানান্তর করে ভগবানপুরে একটি উপগ্রহ চিড়িয়াখানা তৈরির উপর বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছেন।

আলিপুর চিড়িয়াখানা, যা একদা ভারতের বৃহত্তম ও প্রাচীনতম প্রথাগত রাজ্য জুওলোজিক্যাল পার্ক, যা “বন্দী প্রজননের” বিশেষজ্ঞ ছিল, তা কলকাতার জন্য আজ একটি লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতীতের সেই গৌরবময় ঐতিহ্যবাহী চিড়িয়াখানা পুনঃস্থাপনে সরকার এবং সি. জেড.এ. এবং অন্যান্য মিত্র সংস্থার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত, কারণ এক সময়ের এই জনপ্রিয় চিড়িয়াখানা অযোগ্যতার কারনে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখা সত্যিই এক দুঃখজনক ব্যাপার হবে।

সূত্র: ম্যাপস ইন্ডিয়া ডট কম

2.96825396825
মন্তব্য যোগ করুন

(ওপরের বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন মন্তব্য / পরামর্শ থাকে, তাহলে দয়া করে আমাদের উদ্দেশ্যে পোস্ট করুন).

Enter the word
Back to top