হোম / সমাজ কল্যাণ / বানিজ্যিক / যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্য‌বস্থা ও বৈচিত্রের উদযাপন
ভাগ করে নিন
ভিউজ্
  • অবস্থা সম্পাদনার জন্য উন্মুক্ত

যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্য‌বস্থা ও বৈচিত্রের উদযাপন

বহু সংস্কৃতিসম্পন্ন ভারত কী ভাবে বৈচিত্রের উদযাপন করেছে তা নিয়ে আলোচনা করেছেন নয়াদিল্লি ইনস্টিটিউট অফ সোশাল সায়েন্সেস-এর অধিকর্তা অ্য‌াশনারায়ণ রায়।

এই সময় যুক্তরাষ্ট্রেরই সময়

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রীয় তত্ত্বের এক নবজাগরণ ঘটছে। গত দুই দশক বা তার কিছুটা বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রবাদের একটা পুনরুজ্জীবন লক্ষ করা যাচ্ছে। অর্থাৎ এই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন রাজনৈতিক সমস্য‌ার সমাধান হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপরই ভরসা করা হচ্ছে। জোট সরকার জমানায় ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের নীতি আরও গভীর ভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে। বেলজিয়ামের মতো দেশ পূর্ণাঙ্গ যুক্তরাষ্ট্রীয় হয়ে ওঠার জন্য‌ সংবিধান পর্যন্ত সংশোধন করেছে। বর্ণবৈষম্য‌ের পরবর্তী দক্ষিণ আফ্রিকার সংবিধানে কিছু যুক্তরাষ্ট্রীয় বৈশিষ্ট্য‌ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তী কোনও কারণে সেগুলি লঘু করে দেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রবাদ দক্ষিণ আফ্রিকার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্য‌বস্থার ভবিষ্য‌ৎ নির্ধারণ করবে বলে আশা করা যায়।

সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য‌ বিষয় হল যে, স্থানীয় প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলির কাছে ক্ষমতার হস্তান্তরের মতো বিভিন্ন ব্য‌বস্থাপনার মাধ্য‌মে এককেন্দ্রিক ও অযুক্তরাষ্ট্রীয় দেশগুলিও (যেমন ব্রিটেন ও স্পেন) বিভিন্ন্ যুক্তরাষ্ট্রীয় নিয়মকানুন অনুসরণ করছে। উপসাগরীয় দেশগুলির অর্থচালিত আধা সমাধানের নীতি এই অঞ্চলের অগ্রগতির পথ রুদ্ধ করলেও ইয়েমেন জাতীয় আলোচনাচক্রের (ন্য‌াশনাল ডায়ালগ কনফারেন্স) মাধ্য‌মে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি গ্রহণ করেছে। ইরাক, নেপাল, দক্ষিণ সুদান এবং অন্য‌ান্য‌ কয়েকটি দেশও যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করছে। যুক্তরাষ্ট্র হয়ে উঠতে আগ্রহী কোনও কোনও দেশ এমন দৃষ্টান্ত রেখেছে যা মোটেই অনুসরণযোগ্য‌ নয়। তা সত্ত্বেও এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, এই সময় যুক্তরাষ্ট্রেরই সময়।

যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্য‌বস্থার সঙ্গে কেন আন্তজার্তিক মাত্রা জড়িত থাকে ? বিশ্ব জুড়ে আজ যুক্তরাষ্ট্রবাদের যে নতুন আবেদন, তার উৎস নিহিত রয়েছে এই ধারণার সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত মূল্য‌বোধে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য‌েই নাগরিকরা ঐক্য‌ের মধ্য‌েও তাদের বৈচিত্র বজায় রাখতে পারবে। জাতিগত, ভাষাগত এবং ধর্মীয় সংখ্য‌ালঘুরা তাঁদের নিজস্ব পরিচয় নিয়ে বাঁচতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো বিকেন্দ্রীভূত প্রশাসন তথা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তৃণমূল স্তরের অংশগ্রহণের পথ প্রশস্ত করে।

যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্য‌বস্থার পূর্ণতা

যুক্তরাষ্ট্রবাদের জনপ্রিয়তাবৃদ্ধির আর একটি অন্য‌তম কারণ হল এর নমনীয়তা ---নতুন নতুন পরিবেশ, পরিস্থিতির সঙ্গে এর মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো অনুসরণকারী ২৫টি দেশের মধ্য‌ে বেশ কিছু সাদৃশ্য‌ রয়েছে। কিন্তু ক্ষমতা বণ্টন, সরকারের বিভিন্ন স্তরের মধ্য‌ে আর্থিক দায়দায়িত্বের বণ্টন এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষেত্রে এগুলির মধ্য‌ে বিরাট পার্থক্য। তবে যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার উপর আদৌ যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্য‌ বা ব্য‌র্থতা নির্ভর করে না। এটা নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কৃতির উপর।

তাই এ ক্ষেত্রে অবশ্য‌ই কোনও অভিন্ন আদর্শ বা মডেল নেই। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ভাবে যুক্তরাষ্ট্র গড়ে উঠেছে। একটি রাষ্ট্রের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্য‌বস্থার সাফল্য‌ের ফর্মুলা অন্য‌ একটি দেশে প্রযোজ্য‌ নাও হতে পারে। তবে একে অপরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র গড়ে তোলার সময় অবশ্য‌ই একটি মডেলের রূপরেখা তৈরি করতে হবে। অবশ্য‌ই হঠাৎ করে কেউই যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্য‌বস্থা আবিষ্কার করে ফেলতে পারে না। সঙ্ঘর্ষ-পরবর্তী সমাজগুলিতে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্য‌বস্থা গড়ে তোলা মুখের কথা নয়। যথেষ্ট কঠিন কাজ। প্রকৃতির মতোই এটা ঘটে যায়। একে লালন করতে হয়। একে মজবুত করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রবাদ কোনও দর্পণ নয় যেখানে বাস্তবের প্রতিচ্ছবি পড়বে। বরং তা বাস্তবকে তৈরি করবে। যুক্তরাষ্ট্র সময় বিশেষে মানুষকে ভালো হতে, সুআচরণ করতে অনুপ্রাণিত করে। কিন্তু অন্য‌ অর্থে এটা একটা অনিশ্চয়তার মধ্য‌ে ঝাঁপও বটে। তবে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপর ভিত্তি করে যে রাজনৈতিক ব্য‌বস্থা গড়ে উঠবে তা এই নতুন কাঠামোকেই আরও অনেক স্থিতিশীল করে তুলবে। নানা ভাবে তাকে সুস্থিতি দেবে। স্থিরতা প্রদান করবে। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্য‌ে বৈচিত্রকে ধারণ করার মতো নানা উপাদান রয়েছে। তারই সমন্বয়ে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্য‌বস্থা পূর্ণতা পায়।

বৈচিত্রের উদযাপন

আমাদের ব্রহ্মাণ্ড বৈচিত্রময়। বৈচিত্রই আমাদের জীবনের মূল রসদ। অমর্ত্য‌ সেনের ভাষায় প্রত্য‌েকের ব্য‌ক্তিগত পরিচয়ক্রমে ‘মানব পরিচয়কে তুচ্ছ করে’ মানব জাতির ক্ষুদ্র সংস্করণ’-এর রূপ নিচ্ছে। আবার এই বৈচিত্রই আজ বিশ্বজুড়ে অসন্তোষ হিংসা এমনকী সন্ত্রাসবাদের জন্ম দিচ্ছে। বৈচিত্র মানবজাতির সম্পদ, কোনও দায় নয়। বৈচিত্র কোনও বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে না, বরং যথাযথ ভাবে চালিত করা গেলে বৈচিত্রই হয়ে উঠতে পারে দেশের শক্তি। বৈচিত্রের প্রতি শ্রদ্ধা একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারে। রাষ্ট্র এক, কিন্তু জাতির মধ্য‌ে রয়েছে বহুত্ব। বৈচিত্রের মধ্য‌েই রয়েছে একটি দেশের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার শক্তি। বৈচিত্রই বিভিন্ন উদ্ভাবনের প্রেরণা।

একবিংশ শতকে বহুসংস্কৃতি সম্পন্ন সমাজের বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিতেই হবে। দ্রুত বিশ্বায়ন, চটজলদি যোগাযোগ, এক জায়গা থেকে অন্য‌ জায়গায় মানুষের পাড়ি জমানোর প্রবণতা এবং সেই সঙ্গে নানা রকম ধ্য‌ানধারণার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে একটা কথা পরিষ্কার যে, আগামী দিনে এই গ্রহ অসমসত্ত্ব জনগোষ্ঠীতে ভরে যাবে—যারা কেউ কারও মতো নয়। এটাই হবে এই বিশ্বের পরিবর্তিত মুখ। অধ্য‌াপক ভিক্ষু পারেখের মতে, ‘সংস্কৃতিগত সমসত্ত্ব সমাজের সদস্য‌রা যান্ত্রিক ভাবে একই বিশ্বাস এবং রীতিনীতি অনুসরণ করছে, আজকের দিনে এই ধারণা নৃতত্বের গল্পকথা ছাড়া আর কিছুই নয়।

মানুষের অবাধ চলাচল ও বিশ্বায়নের ফলে যুক্তরাষ্ট্রবাদ এক নতুন জীবন পেয়েছে। তা ছাড়া, বহুসংস্কৃতি সম্পন্ন সমাজগুলি যদি সহাবস্থানের মন্ত্র না শেখে তবে ফল হবে মারাত্মক। তবে এর অর্থ এই নয় যে, আমাদের সময়ের আগে বহুসংস্কৃতি সম্পন্ন সমাজের অস্তিত্ব ছিল না।

রোমান সাম্রাজ্য‌ে, মধ্য‌যুগীয় ভারত এবং অটোমান সাম্রাজ্য‌ের মতো অনেক প্রাকআধুনিক সমাজেই সাংস্কৃতিক বৈচিত্রের অস্তিত্ব ছিল। অনেক সমাজেই ভিন্ন ভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী বহু কাল ধরে পাশাপাশি বসবাস করছে। আবার অনেক সমাজে, সাম্প্রতিক অভিবাসন জোয়ারের ফলস্বরূপ সাংস্কৃতিক ভিন্নতা এসেছে। কোনও দেশে বিশেষ সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীগুলি কোনও বিশেষ স্থানের অধিবাসী, কোনও দেশে আবার সেটা নয়। কোনও দেশে বহুসংস্কৃতিসম্পন্ন সমাজগুলির মধ্য‌ে শান্তি সম্প্রীতি বজায় রয়েছে। আবার কোনও কোনও দেশে একে অপরের মধ্য‌ে ভয়াবহ সংঘর্ষ বেঁধেছে।

বহু সংস্কৃতিসম্পন্ন সমাজের কাছে ভালো বিকল্প যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো

অনেক সমাজ তাদের বৈচিত্রকে আড়াল করতে চেয়েছে এবং সেই বৈচিত্রের অন্তর্নিহিত বিষমসত্ত্ব চরিত্রকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে। আবার কোনও কোনও সমাজজনগোষ্ঠী বিনিময়ের মাধ্য‌মে বিষমসত্ত্ব চরিত্রের অবসান ঘটাতে চেয়েছ। আবার কোনও সমাজ এর জন্য‌ মহামিলন অর্থাৎ কিনা ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীকে মিলিয়ে-মিশিয়ে একাকার করে দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। কিন্তু স্বশাসন ও অংশীদারিত্বমূলক শাসনের এক যথাযথ সমন্বয়ের মাধ্য‌মে বৈচিত্রকে বজায় রাখাই এ ক্ষেত্রে বাঞ্ছনীয়। কারণ বৈচিত্রের উদযাপনই একটি সমাজ ও জাতিকে মজবুত করে।

বহু সংস্কৃতিসম্পন্ন সমাজগুলির কাছে সব চেয়ে ভালো বিকল্প হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো।

যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্য‌ে বৈচিত্রের মধ্য‌ে যে ভাবে ঐক্য‌ের সুর ধ্বনিত হয়, তাতে বহুসংস্কৃতিসম্পন্ন সমাজগুলি শ্য‌াম আর কুল দুই-ই রাখতে পারবে।

যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় দেশের অভ্য‌ন্তরীণ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে সংখ্য‌ালঘু সম্প্রদায় সংখ্য‌াগরিষ্ঠের মর্যাদা পেতে পারে। এখানে বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম এবং সংস্কৃতি স্বীকৃতি পায়, সমাদরে গৃহীত হয়। এই শাসনব্য‌বস্থা বৈচিত্রকে সম্মান দেয়, মূল্য‌ দেয়। এই শাসনব্য‌বস্থা বৈচিত্রের প্রসার ঘটিয়ে বৈচিত্রের সুফলগুলি ধরে রাখতে পারে।

কোনও জাতি সমাজ হিসেবে কারও কোনও তকমার সঙ্গে ভারতের উদাহরণ ঠিক মেলে না। ইউ আর অনন্তমূর্তি যেমন কিনা বলেছিলেন, ভারতে এক জন মানুষ একই সঙ্গে দ্বাদশ ও একবিংশ শতকে বাস করেন—কিংবা এর মাঝের সব শতকে। ভারতের চরিত্র এত জটিল যে এক কথায় তা প্রকাশ করা অসম্ভব। এ দেশের শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস এবং এর বহুমুখী বৈচিত্রের জন্য‌ই এ দেশকে এত ভাবে দেখা হয়, এত ভাবে বিচার করা হয়। স্বনামধন্য‌ মার্কিন লেখক মার্ক টোয়েন ১৮৮৬ সালে ভারত ভ্রমণকালে বলেছিলেন, ‘ঈশ্বর বা মানুষ যা যা করতে পারে এই ভূমিতে ঠিক তাই তাই হয়েছে।’

মানুষজন, সংস্কৃতি, ভাষা এবং ধর্মীয় বৈচিত্রের এক চমকপ্রদ সমাহার ঘটেছে এ দেশে। ভারতের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্টগুলি ছাঁচে ফেলা কোনও অনড় নিয়ম নয়। সমকালের গন্ডিতেও এগুলি আবদ্ধ নয়। আর এখানেই ভারতের দৃষ্টান্ত অনন্য‌।

অনন্য‌ দৃষ্টান্ত ভারত

বিখ্য‌াত ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ই পি টমসনের মতে, ‘ভারত সম্ভবত আগামী বিশ্বের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ। হিন্দু, মুসলমান, ধর্মনিরপেক্ষ, স্তালিনপন্থী, উদারপন্থী, মাওবাদী, গান্ধীবাদী --- বিশ্বের সমন্বয়কারী সব প্রভাব এই সমাজে প্রবাহিত। প্রাচ্য‌ বা পাশ্চাত্য‌ের এমন কোনও চিন্তা নেই যা কোনও ভারতীয় মনে সক্রিয় নয়।’ ভারত বৈচিত্রের মধ্য‌ে ঐক্য‌ের এক অনন্য‌ নিদর্শন। এটা এমন এক সমাজের নিদর্শন যেখানে বৈচিত্রের উদযাপন আধুনিক জাতির বন্ধনকে আরও মজবুত করেছে। এ দেশে অনন্য‌ বৈচিত্রের টানে যুগে যুগে কালে কালে কত না দেশ থেকে দলে দলে মানুষ এখানে ভিড় করেছেন। ভারতের জনসাধারণের মধ্য‌ে কত না জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণ ঘটেছে। বেশির ভাগ স্থানেই যেখানে প্রধান মানবসংস্কৃতি অন্য‌ান্য‌ সংস্কৃতির আত্তীকরণে বা অপসারণে উদ্য‌ত হয়েছে, তখন ভারত বৈচিত্র লালনে উৎসাহ দিয়েছে।

সংস্কৃতি শুধুমাত্র অতীতের ঐতিহ্য‌, প্রথা বা রীতিনীতি বজায় রাখার মাধ্য‌ম নয়। বিভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষার, ধর্মের মধ্য‌েকার বৈচিত্রও এক ধরনের মূল্য‌বোধ যা সমাজগুলিকে লালন করতে হয়। প্রকৃত বৈচিত্রের মধ্য‌ে যুক্ত থাকেন আরও বেশি অংশীদার, নিহিত থাকে আরও বেশি উদ্দীপনা এবং আরও বেশি ক্ষমতায়ন। ভারত একটি বহুত্ববাদী সমাজ এবং একটি ধর্মনিরপেক্ষ জাতি। টি এন মদনের মতে, ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা নিহিত আছে তার বহুত্ববাদে। ইশাইয়া বার্লিন বলেছেন, ‘বহুত্ববাদ এমন একটি ধারণা যে মানুষজন বিভিন্ন স্বার্থপূরণ করতে চেয়েও পুরোপুরি যুক্তিসংগত এবং মানুষ থাকবে, তারা একে অপরকে বুঝতে সক্ষম হবে, সহানুভূতিশীল হবে এবং একে অপরের কাছ থেকে আলো পাবে। শুধুমাত্র যে বিষয়টি মানুষকে মানবিক করে তোলে সে বিষয়টি বিভিন্ন সংস্কৃতির কাছে অভিন্ন বলে এবং তা সংস্কৃতিগুলির মধ্য‌ে সেতুবন্ধনের কাজ করে বলে সময় ও কালে বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্য‌ে পারস্পরিক যোগাযোগ সম্ভবপর হয়েছে (ঈশাইয়া বার্লিন, দ্য প্রপার স্টাডি অফ ম্য‌ানকাইন্ড, ১৯৯৭)।

ভারতের বহুত্ববাদ ঐতিহাসিকভাবে সত্য‌।আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের আগেই বহুত্ববাদকে প্রাধান্য‌ দিয়ে রাজতন্ত্র চলত। বহুত্ববাদের শিক্ষা তারই অবদান।

ভারতের বৈচিত্রই ঐক্য‌

আত্তীকরণ এবং মিলিয়ে মিশিয়ে দেওয়া বা মেল্টিং পট মডেলকে স্বীকার করেনি ভারত। তার বদলে এ দেশ ‘স্য‌ালাড পাত্র’ বা ‘গ্লোরিয়াস মোজাইক’ মডেলকেই বেছে নিয়েছে, যেখানে প্রত্য‌েক জাতিগোষ্ঠী/সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী নিজেদের স্বাতন্ত্র বজায় রাখতে পারবে। মহাত্মা গান্ধীর সেই বিখ্য‌াত উক্তির মধ্য‌েই মূল সুর ধরা পড়েছে — ‘‘আমার ঘরের চার পাশে উঁচু দেয়াল দিয়ে রুদ্ধ করতে এবং সমস্ত জানলা বন্ধ করে দিতে আমি চাই না। আমি চাই দেশ দেশান্তরের সংস্কৃতি মুক্ত বাতাসের মতো আমার ঘরে খেলা করুক। কিন্তু সেই বাতাসে আমি যেন কোনও ভাবেই দিশা না হারাই।’’

একটা সময় ছিল যখন সদ্য‌ স্বাধীন দেশগুলির অব্য‌র্থ মন্ত্র ছিল, ‘বৈচিত্রের মধ্য‌ে ঐক্য‌’। সমস্ত সভায়, অনুষ্ঠানে বারবার শুধু ছিল একই কথার একঘেঁয়ে পুনরাবৃত্তি। কোনও কোনও দেশ তো আবার ওই শব্দবন্ধটিকে তাদের সংবিধানেও স্থান দিয়েছে। ভারত যে আদর্শ স্থাপন করেছে তাকে শুধুমাত্র একটি শব্দবন্ধেই প্রকাশ করা যায়, ‘বৈচিত্রই ঐক্য‌’। ভারত শুধু বিভিন্ন সংস্কৃতি, ধর্ম ও ভাষার বৈচিত্রকে মূল্য‌ দেয়নি বরং তাকে সযত্নে লালন করেছে। সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় রীতিনীতি, চিন্তাভাবনা, ধ্য‌ানধারণার নিয়মিত আদানপ্রদান এ দেশে এক অনন্য‌ সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ও সমন্বয় ঘটিয়েছে। যদি বলা হয় ভারতের সাফল্য‌ের চাবিকাঠি কী ? ভারতের গণতান্ত্রিক শাসনকাঠামোর ভিত্তি যুক্তরাষ্ট্রীয়। ভারতের বিশালায়তন এবং অভূতপূর্ব বৈচিত্রসম্পন্ন দেশের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোই জাতীয় স্বাতন্ত্র ও জাতীয় আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের পক্ষে আদর্শ বলে চিহ্নিত হয়েছে। এই অবস্থাই বহুত্ববাদ বা বৈচিত্রময় সমাজের বিশেষ বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলি সংরক্ষণের পক্ষে উপযুক্ত। কোনও জনসম্প্রদায়ই এ দেশের প্রভু নয় — এই বিশ্বাসের মধ্য‌েই নিহিত আছে ভারতের সাফল্য‌ের মূলমন্ত্র। স্বাধীনতা সগ্রামের সময় গান্ধীজি এক বার বলেছিলেন যে, ‘‘বিপুল সংখ্য‌াগরিষ্ঠতা থাকলেও কোনও গোষ্ঠী আলাদা করে বিশেষ সুবিধা পাবে না...এবং ধর্মীয়, ভাষাগত। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সংখ্য‌ালঘু গোষ্ঠীকে সংখ্য‌াগরিষ্ঠের কর্মকাণ্ড থেকে রক্ষা করা হবে।’’ তাই ‘বৈচিত্রের মধ্য‌ে ঐক্য‌’ শব্দবন্ধটিকে নিছকই একটি কথা ভাবলে চলবে না। বরং গণতন্ত্র, যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্য‌বস্থা, সহিষ্ণুতা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠার এক জীবনাদর্শ।

ধর্মনিরপেক্ষতাই ভারতের ভবিতব্য‌

ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার সহ নাগরিকদের অন্য‌ান্য‌ মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য‌ সাংবিধানিক রক্ষাকবচের ব্য‌বস্থা রয়েছে ভারতের সংবিধানে।

ভারতের সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। মৌলিক অধিকারের অঙ্গ হিসাবে ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারকে সুনিশ্চিত করা হয়েছে। যে কোনও ধর্মাবলম্বী ভারতবাসীর নিজের ধর্মীয় মতামত ব্য‌ক্ত করা, ধর্ম পালন এবং ধর্ম প্রচারের স্বাধীনতা রয়েছে। সংখ্য‌ালঘুদের বিষয়ে ভারতের অবস্থান সুস্পষ্ট করে দেওয়া হয় সেই ১৯৩০-এই। স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃবৃন্দ এই মর্মে অবস্থান নিয়েছিলেন যে : ‘‘যতক্ষণ একটি সংখ্য‌ালঘু গোষ্ঠীকে পদদলিত করার চেষ্টা চলে বা তাকে সংখ্য‌াগরিষ্ঠের তালে তাল মিলিয়ে চলার জন্য‌ বাধ্য‌ করা হয়, ততক্ষণ একটি দেশে স্থিতাবস্থা থাকতে পারে না...ভারতে আমরা এই বিষয়টি সকলের কাছে পরিষ্কার করে দিতে চাই যে, আমাদের নীতিই হবে সংখ্য‌ালঘুদের এই স্বাধীনতা দেওয়া এবং কোনও অবস্থাতেই তাদের উপর বলপ্রয়োগ বা দমননীতি সহ্য‌ করা হবে না।’ ’ ভারত ধর্মনিরপেক্ষ, কারণ এ দেশের মানুষ, সংস্কৃতি, জাতীয় ভাবধারাও ধর্মনিরপেক্ষ। ধর্মনিরপেক্ষতাই ভারতের ভবিতব্য‌।

ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। কিন্তু ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এ দেশে যত ছুটিছাটা রয়েছে, অন্য‌ কোনও ধর্মনিরপেক্ষ দেশে তা নেই। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা কখনও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনে বাধা দেয়নি। কারণ ভারতের সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে ধর্ম অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত রয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা নিয়ে গত কয়েক বছরে কিছু বিতর্ক দেখা দিয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতার সমর্থকদের মতে, রাষ্ট্র হিসাবে ভারত যথেষ্ট ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে উঠতে পারেনি। অন্য‌ দিকে ধর্মনিরপেক্ষতার সমালোচকরা অভিযোগ করেন যে, রাষ্ট্র আসলে ধর্মনিরপেক্ষতার আড়ালে সংখ্য‌ালঘুদের তোষণ করছে। ধর্মনিরপেক্ষতা ভারতীয় গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য‌ অঙ্গ। ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের সীমাবদ্ধতা বা ব্য‌বহারিক দিক নিয়ে আজ যে বিতর্ক চলছে তাতে এই বিতর্কের গুরুত্ব কমে যায় না।

বিশ্বায়নের গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কিছু আশঙ্কা জেগেছে। প্রকৃত এবং সম্ভাব্য‌ দুই রকম আশঙ্কাই। বিশ্বায়নের প্রবল দাপট বিভিন্ন সংস্কৃতি-বৈচিত্র ভেঙেচুরে তাকে একটা সমসত্ত্ব রূপ দেওয়ার চেষ্টা করবে না তো ? সেই আশঙ্কা মানুষের মধ্য‌ে রয়েছে।

সহাবস্থানের অভিজ্ঞতা

দীর্ঘকাল ধরে বৈচিত্রের সঙ্গে সহাবস্থানের অভিজ্ঞতা ভারত সারা বিশ্বকে জোর গলায় শোনাতে পারে। ভারতের বৈচিত্রের উপর বিভিন্ন সময়ে আঘাত এসেছে। বিশ্বের দরবারে বৈচিত্রের মধ্য‌ে ঐক্য‌র অনন্য‌ আদর্শ হিসাবে ভারত তার নিজের স্থান করে নিলেও আর্থিক বৈষম্য‌, ধর্মীয় মৌলবাদ ও জাতিসংঘর্ষ এই ঐক্য‌ের ভিত্তি ধ্বংস করে দিতে চাইছে। সংস্কৃতি, ধর্ম ও জাতিসত্ত্বার নামে ভয়াবহ দাঙ্গার সাক্ষী থেকেছেন এ দেশের মানুষ।

আধুনিক সমাজগুলি ক্রমেই বহু সংস্কৃতিসম্পন্ন হয়ে উঠেছে। সমস্ত সমাজই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আচরণ নিয়ে বেশি মাথা ঘামানো হয়। ধর্মনিরপেক্ষতা কখনওই সংখ্য‌ালঘুর সাম্প্রদায়িকতাকে বৈধতা দেয় না। অধ্য‌াপক শিব বিশ্বনাথনের ভাষায় ধর্মনিরপেক্ষতা সংখ্য‌ালঘুর তরফে আইন লঙ্ঘনকে সংখ্য‌াগরিষ্ঠের তুলনায় ভালো বলে মনে করে না।

ভারতের ভাষাগত বৈচিত্রও সমান ভাবে বিস্ময়কর। ভাষাই একটি গোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও স্বাতন্ত্রের চরম প্রতীক। বহুভাষাবাদ ভারতীয় জনজীবনের বৈশিষ্ট্য। এ দেশের বহু লেখকই যে ভাষায় লেখেন, সে ভাষায় হয়তো তাঁরা কথা বলেন না। মহাদেশ সম এই দেশে প্রায়শই একই ব্য‌ক্তি ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য‌ে আলাদা আলাদা ভাষা বা উপভাষা ব্য‌বহার করে থাকেন। এটাই এখানকার বৈশিষ্ট্য। যেমন উত্তরপূর্ব ভারতের এক জন খাসি মহিলা তাঁর মতো অন্য‌ মহিলাদের সঙ্গে খাসি ভাষায় কথা বলেন। কিন্তু খাসি পুরুষদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি পুরুষদের উপভাষা ব্য‌বহার করেন। দেশের বিভিন্ন অংশে ভাষার আন্দোলন দেশের ঐক্য‌ ও অখণ্ডতাকে বিপন্ন করেছে। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ প্রধান ভাষাকে জাতীয় ভাষার মর্যাদা দিয়ে এবং ভাষাভিত্তিক রাজ্য‌ গঠন করে অসামান্য‌ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন।

বৈচিত্রের মধ্য‌ে ঐক্য‌, সকলকে আপন করে নেওয়া বা সকলকে শামিল করে এগিয়ে চলার নীতি নিয়ে ভারতের যে ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে, সময় ও ইতিহাসের পরীক্ষায় তা উত্তীর্ণ হয়েছে। গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ সাংবিধানিক কাঠামোতে আইনের অনুশাসন ও মৌলিক মানবাধিকারগুলির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের পরীক্ষানিরীক্ষায় সাফল্য‌ই বিশ্বের দরবারে ভারতকে বিশেষ স্থান দিয়েছে।

সূত্র : যোজনা, ফেব্রুয়ারি ২০১৫

2.86666666667
মন্তব্য যোগ করুন

(ওপরের বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন মন্তব্য / পরামর্শ থাকে, তাহলে দয়া করে আমাদের উদ্দেশ্যে পোস্ট করুন).

Enter the word
ন্যাভিগেশন
Back to top