হোম / সমাজ কল্যাণ / মানবাধিকার / সমাজ উন্নয়ন, রাজনীতি ও প্রশাসন
ভাগ করে নিন
ভিউজ্
  • অবস্থা Review in Process

সমাজ উন্নয়ন, রাজনীতি ও প্রশাসন

দেশ ও সমাজের সার্বিক উন্নয়নের সঙ্গে রাজনীতি ও প্রশাসনের যোগ সুনিবিড়। রাজনীতিকরা রাজনীতির ঊর্ধ্বে না উঠলে এবং প্রশাসন স্বচ্ছ, দক্ষ, রাজনীতিমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত না হলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই বিভাগে থাকছে উন্নয়ন-রাজনীতি-প্রশাসন সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে সমাজতাত্ত্বিকদের আলোচনা, ব্যাখ্যা ইত্যাদি।

রাজনীতি ও প্রশাসন : সিভিল সার্ভিসের দায়িত্ব ও কর্তব্য‌

আমলাদের বাকস্বাধীনতা চেয়েছিলেন প্যাটেল

অর্থনৈতিক বিকাশে গতি সঞ্চার এবং দক্ষতার সঙ্গে বিকাশ ও উন্নয়নের সুফল নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া - এই দুটি বিষয় আজ জাতির কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ওই দুটি বিষয় সম্ভব করে তুলতে প্রকৌশল খুঁজে বের করার কাজও অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে। বলা যায় এ কাজে অর্ধেক পথ আমরা ইতিমধ্য‌েই অতিক্রম করে এসেছি। এ দিকে প্রবল জনমত হল সিভিল সার্ভিসে দুর্নীতি ব্য‌াপক ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং উন্নয়নের জন্য‌ বরাদ্দ করা অর্থ গোপনে লুঠ হয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিককালে একটি বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে এমন অভিযোগও আমি শুনেছি যে গরিব মানুষ যেখানে ১৫ পয়সার মতো হাতে পেত, তা আজ কমতে কমতে পাঁচ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। দেশে বর্তমান প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের এক বিরাট কর্মযঞ্জ চলেছে। তাই সরকারের কাছে তাদের আশা প্রত্য‌াশা হল সর্ব্বোচ্চ মানের পরিষেবার।

নীতি প্রনয়নের ক্ষেত্রে পরামর্শ দান এবং রূপায়ণের যে দায়িত্বভার প্রশাসনিক আধিকারিকদের পালন করতে হয় তার ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সিভিল সার্ভিসের কাজকর্ম নানা ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সর্দার বল্লভভাই প্য‌াটেল ১৯৪৯ সালের অক্টোবর মাসে যে মন্তব্য‌ করেছিলেন তা এই প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে— ‘‘দক্ষ সর্বভারতীয় পরিষেবা যদি পেতে হয়, তা হলে এই সার্ভিসে পদাধিকারীদের বাকস্বাধীনতা দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব হবে সচিব, মুখ্য‌সচিব বা অধীনস্থ আধিকারিকদের নির্ভয়ে এবং বিনা অনুগ্রহে তাঁদের মতামত ব্য‌ক্ত করার সুযোগ দেওয়া। কিন্তু কোনও কোনও প্রদেশে এমন একটা প্রবণতা আমি চলতে দেখেছি যেখানে প্রশাসনিক পদাধিকারীদের মুখ বুজে আদেশ পালন করার নির্দেশই দেওয়া হয়। একটি সর্বভারতীয় সার্ভিস যদি না থাকে তা হলে ঐক্য‌ তৈরি হবে না, ঐক্য‌বদ্ধ ভারত আমরা দেখতে পাব না...’’

সর্দার প্য‌াটেল আরও বলেছেন,—‘‘আমার সচিব এখন এমন মতামত দিতে পারেন যা আমার মতের বিরুদ্ধে যায়। আমার সমস্ত সচিবকেই আমি এই স্বাধীনতা দিয়েছি। আমি তাঁদের বলেছি যে মন্ত্রীকে খুশি করতে পারবেন না মনে করে যদি কেউ সৎ ও সঠিক মতামত না দেন, তা হলে বরং তাঁর চাকরি ছেড়ে দেওয়া উচিত। আমি অন্য‌ সচিব খুঁজে আনব। খোলাখুলি মত প্রকাশ করলে আমি কখনও অসন্তুষ্ট হব না।’’

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

সিভিল সার্ভিসের কাজের আকর্ষণ

স্বাধীনতা লাভের সূচনা পর্বের বছরগুলিতে, ১৯৫০ থেকে ১৯৬০-এর প্রথম দিক পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রশাসক এবং সিভিল সার্ভিসের পদাধিকারীদের সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের। সিভিল সার্ভেন্টরা কাজও করতেন স্বাধীন ভাবে, পক্ষপাতহীন ভাবে। পরবর্তীকালে ক্রমশ এই সম্পর্কে চিড় ধরে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষে ভাগ হয়ে যায়। এর ফলে গড়ে ওঠে দুটি ভিন্ন রকমের সম্পর্ক। এক পক্ষ কাজকর্মে অনুশাসনের প্রতি আনুগত্য‌ দেখান। তাঁদের আচার আচরণও ছিল সঠিক ও সোজাসাপটা। অন্য‌ পক্ষ রাজনৈতিক প্রশাসকদের অনুগত হয়ে পড়েন। সিভিল সার্ভিসের আদর্শ, রীতিনীতি, আদবকায়দা, আচার-আচরণ, সব কিছু বিসর্জন দিয়ে রাজনৈতিক শাসক দলের মর্জিমাফিক চলতে শুরু করেন। রাজনৈতিক ক্ষমতা এক দল থেকে অন্য‌ দলের দখলে গেলে এই দ্বিতীয় ধরনের সিভিল সার্ভেন্টরা আবার দু’ ভাগে বিভক্ত হয়ে জান। ফলে এক পক্ষ রাজনৈতিক শাসকদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেন, অন্য পক্ষ শাসকদের কৃপাদৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হন। দ্বিতীয় পক্ষের পদাধিকারীরা কাজকর্ম, বদলি ও চাকরি সংক্রান্ত অন্যান্য বিশয়ে শাসকদের কাছে ন্যায়বিচার পান না।

মজার ব্যাপার হল, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কিন্তু দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। তা হল, শাসনব্যবস্থায় সুনাগরিকদেরও কিন্তু একটি ভূমিকা রয়েছে। সুশাসনের আদর্শ ও রীতিনীতি ভুলে গিয়ে রাজনৈতিক শাসক ও সিভিল সার্ভেন্টরা যখন গা ঘেঁষাঘেঁষি করে চলেন, বিপদ দেখা দেয় তখনই।

সিভিল সার্ভিসের পদাধিকারীদের নানা ধরনের প্রচুর চ্য‌ালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হয় যা এই সার্ভিসের অন্য‌তম আকর্ষণ। এক দিকে নীতি প্রণয়ন, অন্য‌ দিকে বাইরে প্রকৃত কাজের জায়গায় গিয়ে পর্যবেক্ষণ, তদারক ও দেখভালের সুযোগ—সিভিল সার্ভেন্টদের কাজেকর্মে প্রচুর সুযোগ ও সম্ভাবনার মুখোমুখি করে দেয়। দেশের বিকাশ ও অগ্রগতির কাজে তাঁদের ভূমিকা প্রধান ও বড় হয়ে দেখা দেয়। এই ধরনের চ্য‌ালেঞ্জের মোকাবিলা করে সিভিল সার্ভেন্টরা গর্ব অনুভব করতে পারেন এবং কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন। তবে এ সমস্তর জন্য‌ প্রয়োজন বেশ কিছু ভালো গুণ যা তাঁদের রপ্ত করে নিতে হয়।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

সিভিল সার্ভেন্টদের আচরণ

সর্বভারতীয় চাকরিতে নিযুক্ত পদাধিকারীদের একটি বিশেষ দায়িত্ব পালনের ভূমিকা রয়েছে। কারণ, গতানুগতিক কাজ তাঁদের সন্তুষ্টি এনে দিতে পারে না। সিভিল সার্ভিসে কিছু রীতিনীতি ও নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়, যাতে শেষ পর্যন্ত লাভ হয় সিভিল সার্ভেন্টদেরইপ্রথম প্রথম অবশ্য‌ তা মানা খুব কঠিন ও অসুবিধাজনক মনে হতে পারে। মাঝে মাঝে আইনকানুন রীতিনীতি ইত্য‌াদি মেনে চলা ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়া মনোভাব বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু কোনও রকম লাভক্ষতির হিসাব না করে কাজ হাতে নেওয়া প্রয়োজন। কারণ সিভিল সার্ভেন্টদের অনেকেই তাৎক্ষণিক লাভ মনে করে রাজনৈতিক শাসকদের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা রেখে কাজ করেন। শেষ পর্যন্ত কিন্তু যাঁরা রীতিনীতি,আইনকানুন ইত্য‌াদি মেনে কাজ করেন তাঁরাই জয়ী হন এবং সাফল্য‌ের মুখ দেখেন। ভালো কাজের স্বীকৃতিও তাঁদের কপালে জোটে। এই ধরনের পদাধিকারীরা বিভিন্ন গোষ্ঠী, অধঃস্তন কর্মচারী, জনসাধারণ, এমনকী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলেরও সমীহ ও সম্ভ্রম আদায় করতে পারেন।

সিভিল সার্ভিসে কর্মরত আধিকারিকদের পেশাদারি আচরণ মেনে চলতে হয়। তাতে এক দিকে যেমন সুশাসন কায়েম করা যায় অন্য‌ দিকে তেমনই সর্বভারতীয় চাকরির ভাগ্য‌ে সুখ্য‌াতিও জোটে। আর এতে আখেরে লাভ হয় দেশের — হয় প্রগতি ও সমৃদ্ধি। আরও বড় লাভ হল সর্বভারতীয় চাকরিতে সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস আরও দৃঢ় ও মজবুত হয়।

এ বার সিভিল সার্ভিসে কর্মরত পদাধিকারীদের উদ্দেশ্য‌ে আদর্শ আচরণ বিধি সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা যাক। কেমন হবে তাঁর আচরণ ---

() ব্য‌ক্তিগত সততা ও বিশ্বাসযোগ্য‌তাকে সর্বোচ্চ মাত্রায় নিয়ে যেতে হবে।

() প্রশাসনিক নীতি, আইন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সৎ ও খোলাখুলি আচরণ দরকার।

() পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বিষয়টি সম্পর্কে জ্ঞান ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

() এক জন দক্ষ ফিল্ড অফিসার হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

() সরকারের কাজকর্ম ও পরিষেবার নিশ্চিত জোগান ও সফল রূপায়ণের দিকগুলি চিহ্নিত করতে হবে।

() সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেরি করা বা কালক্ষেপ করা চলবে না।

() নেতা তথা কাণ্ডারীর ভূমিকা পালন করতে হবে।

() পরিষেবা-বঞ্চিত মানুষদের স্বার্থরক্ষায় সংবেদনশীল হতে হবে।

() নিজের মতামত সুস্পষ্ট ভাবে এবং যুক্তিতর্ক দিয়ে খোলাখুলি জানানো উচিত। (১০) জনসমক্ষে কোনও সরকারি নীতির সমালোচনা করা ঠিক নয়।

আরও কিছু আচরণ মেনে চলা দরকার, যা বিস্তারিত আলোচনায় আনা যাবে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

হতে হবে সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত

এ বার সিভিল সার্ভেন্টদের আচরণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় আসা যাক।

সিভিল সার্ভেন্টদের ব্য‌ক্তিগত সততা ও বিশ্বাসযোগ্য‌তাকে সর্বোচ্চ মাত্রায় নিয়ে যেতে হবে। সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসকের ওপর মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধি পায়, যা সিভিল সার্ভিসের ভিতকে মজবুত করে তোলে। সিভিল সার্ভিসের উঁচু তলার পদাধিকারীদের ক্ষেত্রে এ কথা বিশেষ ভাবে প্রযোজ্য, কারণ তাঁদের থাকতে হবে বদনাম দুর্নামের অনেক ওপরে। তাতে রাজনৈতিক শাসকদের কাছ থেকেও সমীহ আদায় করা যায় যা তাঁদের সঙ্গে স্বাভাবিক কাজকর্মে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এমনকী কোনও সময় যদি দুর্নীতি ঘটতে দেখা যায়, তখনও এই ধরনের সৎ ও দক্ষ পদাধিকারীরা সমান বা আরও বেশি সম্ভ্রম আদায় করে নিতে পারেন।

প্রশাসনিক নীতি, আইন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সিভিল সার্ভেন্টদের সৎ ও খোলাখুলি আচরণ দরকার। সংশ্লিষ্ট পদাধিকারীর পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি এব নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করা যায় যা পরোক্ষ ভাবে পদাধিকারীদের বেশি করে শক্তি জোগায়। সব সময় ইতিবাচক প্রচেষ্টা থাকা প্রয়োজন। কোনও বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় সংশ্লিষ্ট পদাধিকারীর সততা ও স্বচ্ছতা সাধারণ মানুষও উপলব্ধি করতে পারে। তা থেকে যে বল, সাহস ও শক্তি পাওয়া যায় তা কয়েক ব্য‌াটেলিয়ন আধা সামরিক বাহিনীর সমান।

মানুষ সিভিল সার্ভিসের পদাধিকারীকে সাধারণত সম্ভ্রম করে তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ও দক্ষতার জন্য‌। তাই সিভিল সার্ভেন্টদের পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বিষয়টি সম্পর্কে জ্ঞান ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিষগুলি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত হওয়ার পরই সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর পুরো কাজটাই করতে হবে যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে যাতে তার রূপায়ণ হয় সঠিক ও কার্যকর। গা-ছাড়া ননোভাব নিয়ে কাজ করলে সাধারণ মানুষের কাছে ফাঁকিটা ধরা পড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

বাইরে প্রকৃত কার্যক্ষেত্রে যেখানে অনেকটা সময়ই পদাধিকারীকে কাটাতে হতে পারে, সেখানে সিভিল সার্ভেন্টের বিচক্ষণতা পুরো ব্য‌বস্থায় পরিবর্তন আনতে সাহায্য‌ করে। এক জন দক্ষ ফিল্ড অফিসার হিসাবে তাঁর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এজন্য‌ প্রয়োজনে কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হতে পারে যা হয়তো সকলকে খুশি করতে নাও পারে। গতানুগতিক পথে না হেঁটে অন্য‌ ভাবে চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন যাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্য‌বস্থা নেওয়া যায়।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি থাকবে নিজেরই হাতে

সঠিক কাজ করতে কোনও রকম দ্বিধা থাকা উচিত নয়, বরং সিদ্ধান্তে অবিচল নিষ্ঠা ও সততা থাকা দরকার। কখনও কখনও সিভিল সার্ভেন্টকে এর জন্য কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও পড়তে হতে পারে।

সুশাসনের দাবি নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের মধ্য‌ে পড়ে। সরকারের কাজকর্ম ও পরিষেবার নিশ্চিত জোগান ও সফল রূপায়ণের দিকগুলি চিহ্নিত করতে হবে। এগিয়ে চলার পথে প্রতিবন্ধকতাগুলিকে চিহ্নিত করতে হবে এবং তা দূর করতে সম্ভাব্য‌ পরিবর্তন সম্বন্ধেও পরামর্শ দিতে হবে। কর্মসূচি রূপায়ণের ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী শক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে যাদের নিয়ে কাজ করতে হবে তাদের উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন। সব কিছুই খোলাখুলি আলোচনা করতে হবে এবং কেউ নতুন দিশা দেখালে তাকে স্বাগত জানাতে হবে যদি তা উন্নয়নের সহায়ক হয়। সরকারি পরিষেবা যদি দক্ষতার সঙ্গে দেওয়া যায় তা হলে এক দিকে যেমন যাদের পরিষেবা দেওয়া হচ্ছে তারা খুশি ও সন্তুষ্ট হয়, অন্য‌ দিকে তেমনই আর্থিক সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্য‌বহার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং দুর্নীতি দমন নিশ্চিত করা যায়।

সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি এড়িয়ে চলা বা অযথা তা বিলম্বিত করা শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে তোলে। তাই কোনও সিভিল সার্ভেন্টেরই সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেরি করা বা কালক্ষেপ করা উচিত নয়। নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে যদি কেউ দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন কিংবা ঝুঁকি ও দায়িত্ব নিতে ভয় পান তাঁর সিভিল সার্ভিসে যোগ দেওয়া উচিত নয়। কারণ সিভিল সার্ভিসে সারা জীবনই নানা ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য‌ সুস্পষ্ট ভাবে নীতি ও নির্দেশ বা সুপারিশ করে যেতে হয়। কোনও কিছু এড়িয়ে গেলে ফল মারাত্মক হতে পারে যা সুশাসনের পক্ষে মোটেই ভালো লক্ষ্মণ নয়।

সিভিল সার্ভিসে কর্মরত পদাধিকারীকে কাজেকর্মে নেতার ভূমিকা অর্থাৎ মূল কাণ্ডারীর ভূমিকা পালন করতে হয়। লক্ষ্য‌মাত্রা পূরণে পুরোপুরি দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং নিজের দফতরের ভালো কাজের মাপকাঠি স্থির করতে হবে। কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা সহকর্মীদের মধ্য‌ে বণ্টন করে দেওয়া যায় কিন্তু নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি রাখতে হবে নিজেরই কাছে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

নিজের মত খোলাখুলি স্পষ্ট জানান

সহকর্মীদের কথায় কথায় ভুলভ্রান্তি ধরলে বা অধস্তন কর্মীদের এ জন্য‌ গালমন্দ করলে সিভিল সার্ভিসে কর্মরত পদাধিকারীর কোনও উদ্য‌োগই সফল হবে না। নিজের কর্তৃত্ব বা নেতৃত্ব বজায় রেখে, সকলকেই সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে তবেই অধস্তন কর্মী, সহকর্মী, এমনকী সিনিয়ার অফিসারদের কাছেও সমীহ আদায় করা যাবে। নেতৃত্বে সাফল্য‌ের মূলমন্ত্র কিন্তু এটাই।

দরিদ্র (বিশেষ করে যারা প্রান্তিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত), মহিলা তফশিলি জাতি ও তফশিলি উপজাতি এবং সংখ্যালঘু মানুষদের স্বার্থরক্ষায় সংবেদনশীল হতে হবে। এ ধরনের মানুষদের বেশি করে প্রয়োজন সিভিল সার্ভিসে কর্মরত পদাধিকারীদের সাহায্য‌ ও সমর্থন। তাদের জন্য‌ ফলপ্রসূ কর্মসূচি রূপায়ণ এবং তাদের কল্য‌াণে সহমর্মিতার মনোভাব সকলের জন্য‌ সমান অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। তাদের জন্য‌ ইতিবাচক পদক্ষেপ সিভিল সার্ভিসে মানুষের আস্থা বাড়িয়ে তোলে।

সাধারণত মনুষের কল্য‌াণে সিভিল সার্ভিসের পদাধিকারীদের সঙ্গে পরামর্শ করেই নীতি নির্ধারণ করেন রাজনৈতিক শাসকেরা। মন্ত্রীদের পরামর্শ দেওয়ার সময় এবং সিনিয়ার অফিসার হিসেবে কাজ করার সময় নীতি নির্ধারণের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে দেখা প্রয়োজন। কোনও নীতি যদি সরকার গ্রহণ করতে চায় বা রূপায়ণ করতে ইচ্ছুক হয় সে ক্ষেত্রে পরীক্ষা করে দেখা দরকার রাজনৈতিক বাধ্য‌বাধকতায় শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক লাভ বা ফলের আশায় তা করা হচ্ছে কিনা বা জাতীয় স্বার্থে তা বেশি দিন সুফল দিতে পারবে কিনা। নিজের মতামত সুস্পষ্ট ভাবে এবং যুক্তিতর্ক দিয়ে খোলাখুলি জানানো উচিত। কোনও নীতি গ্রহণ করলে তার উপযুক্ততা এবং নীতির লক্ষ্য‌ বা উদ্দেশ্য‌ পূরণে তার উপযোগিতা বা প্রয়োজনীয়তা চিন্তা করে সে ব্য‌াপারে সুস্পষ্ট ভাবে এবং যুক্তির সঙ্গে পরামর্শ বা প্রস্তাব দিতে হবে। পরামর্শ দেওয়ার সময় তা মন্ত্রীর মনের মতো হবে কি না সে ব্য‌াপারে দ্বিধাগ্রস্ত হওয়ার কোনও কারণ নেই, নিজের বিচারবুদ্ধি ও বিচক্ষণতায় যে কাজ সঠিক হবে বলে মনে হয় তারই সুপারিশ করা প্রয়োজন। তাতে সহকর্মী থেকে মন্ত্রী সকলেই খুশি হবেন এং সমীহ করে চলবেন।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

তথ্য‌প্রযুক্তির সঙ্গে সড়গড় হন

জনসমক্ষে কখনওই কোনও সরকারি নীতির সমালোচনা করা ঠিক নয়। সিভিল সার্ভিসের পদাধিকারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য‌ হল গৃহীত নীতির সপক্ষে বক্তব্য‌ জানিয়ে ওই নীতির রূপায়ণে সরকারকে সর্বতোভাবে সহায়তা জোগানো। গৃহীত নীতির অযথা সমালোচনা করলে সরকারের অবমাননা তো ঘটেই, সেই সঙ্গে নিজেরও সম্ভ্রম নষ্ট হয়। যদি পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে সরকারি নীতি কোনও ভাবেই মেনে নেওয়া যাচ্ছে না, তা হলে বরং সিভিল সার্ভিসের পদ ছেড়ে অন্য‌ কোনও চাকরির সন্ধান করা উচিত।

সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। আধুনিকতার যুগে এক দিকে যেমন প্রযুক্তিগত বিপ্লব সম্ভব হয়েছে, অন্য‌ দিকে তেমনই বেসরকারি ক্ষেত্রের সম্প্রসারণ এবং নানা ধরনের সংস্থার জন্মও হয়েছে। তাই প্রয়োজনে বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষদের সাহায্য‌ ও সমর্থন পাওয়ার জন্য‌ জনসংযোগ বাড়ানোর কাজে মন দিতে হবে। কার্যক্ষেত্রে কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিতে তা পদাধিকারীকে সাহায্য‌ করবে। কাজকর্মকেও অনেক বেশি উন্নত করে তুলবে।

সুশাসন নিশ্চিত করতে তথ্য‌প্রযুক্তির সঙ্গে সড়গড় হতে হবে। তথ্য‌প্রযুক্তি এবং নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন কাজকর্ম ত্বরান্বিত করে, সরকারি পরিষেবাকে দক্ষ করে তোলে এবং দুর্নীতি দমনে সাহায্য‌ করে। তাই তথ্য‌প্রযুক্তির ব্য‌বহার এবং সম্ভাবনা সম্পর্কে নিজেকে ওয়াকিবহাল রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে প্রশাসনিক পদ্ধতি যত সহজতর হবে, সুশাসন তত বৃদ্ধি পাবে।

নিজের মন্ত্রকের চিন্তাভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি সুষ্পষ্ট ভাবে তুলে ধরার জন্য‌ আগে থেকেই নিজেকে ভালো ভাবে প্রস্তুত রাখতে হবে। নিজের দৃষ্টিকোণ সংক্ষেপে ব্য‌াখ্য‌া করতে হবে এবং আলোচ্য‌ বিষয়কে প্রাধান্য‌ দিতে হবে। বিষয়ের খুঁটিনাটি রাখতে হবে নিজের নখদর্পনে যাতে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে বা আলোচনায় তা সঠিক ভাবে তুলে ধরা যায়।

ধৈর্য ধরে যত্ন সহকারে অন্য‌ের কথা শুনতে হবে এবং নানা ধরনের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। কাজের জায়গা থেকে সমস্য‌ার ভালোমন্দ সম্পর্কে পাওয়া প্রতিবেদন খতিয়ে দেখতে হবে। এটাই হচ্ছে শেখার সব চেয়ে ভালো উপায়।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব

সিভিল সার্ভেন্টদের কাজ হল নীতির লক্ষ্য‌ ও উদ্দেশ্য‌ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সব ধরনের মতামতকে সংহত করা। এই কাজ করার সময় সমস্য‌ার কারিগরি, সামাজিক এবং রাজনৈতিক গভীরতা ও মাত্রার মূল্য‌ায়ন করা প্রয়োজন। নীতি নির্ধারণকারী ওপর মহলে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ নানা দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামতের সমন্বয় ঘটাতে হয় সেখানে। কর্মসূচির সফল ও ফলপ্রসূ রূপায়ণ নিশ্চিত করতে কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণে পিছপা হলে চলবে না।

কঠিন বাস্তবতা ও নীতির কথা মাথায় রেখে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করতে হবে। যে যে এলাকায় বা অঞ্চলে প্রস্তাবিত নীতি রূপায়িত হবে, সেখান থেকে এ সম্পর্কিত ভালোমন্দের ব্য‌াপারে প্রতিবেদন সংগ্রহ করে বাস্তবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা দরকার।

নতুন নতুন চ্য‌ালেঞ্জের সম্ভাবনাকে স্বাগত জানাতে হবে। তা এড়িয়ে গেলে চলবে না। এ ধরনের চ্য‌ালেঞ্জ নোওয়ার সময় কঠিন সিদ্ধান্ত যেমন নিতে হতে পারে তেমনই ব্য‌র্থ হওয়ারও ঝুঁকি থেকে যায়। তবে সকলের সঙ্গে মিলেমিশে কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে কাজ করলে কঠিন চ্য‌ালেঞ্জ নেওয়ার মানসিকতা সাফল্য‌ এনে দিতে বাধ্য‌।

কঠিন প্ররোচনা সত্ত্বেও নিজের নীতি ও বিশ্বাসে স্থির, অবিচল থাকতে হবে। মাথা গরম করলে চলবে না। প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলে কায়েমি স্বার্থের কিছু মানুষ ও সংস্থার কাছ থেকে বাধা আসতে পারে। ঠান্ডা মাথায় এবং স্থির বুদ্ধিতে এ সমস্ত কিছুর মোকাবিলা করতে হবে।

সিভিল সার্ভিসের পদাধিকারীকে সরকারের কাছে জবাবদিহি করতে হতে পারে। এ ছাড়াও রয়েছে জনসাধারণের কাছে দায়বদ্ধতা। সরকারি নীতি ও কর্মসূচির ভিত্তিতে কাজ করার সময় লক্ষ দিতে হবে কোনও কোনও এলাকার জন্য‌ তা রূপায়ণ করলে সাফল্য‌ পাওয়া যাবে। জনসাধারণের চাহিদার দিকগুলি চিহ্নিত করে কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে, তা হল রাজনৈতিক শাসকের আপেক্ষিক দায়িত্ব ও শাসনব্য‌বস্থার উন্নয়নে সিভিল সার্ভিসের কর্তব্য‌। সরকারি প্রশাসনকে শক্তিশালী করে তোলা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব বর্তায় সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের উপর।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

চাই ঠান্ডা মাথা, স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি

 

এই প্রসঙ্গে সরকারি পরিষেবা পাওয়ার কাজে যে ভীষণ অসুবিধা ও দুর্নীতির মুখোমুখি হতে হয় জনসাধারণকে এ কথা স্বীকার করে নেওয়া ভালো। দু-চার কথায় তা ব্য‌াখ্য‌া করা যাক—

) প্রশাসনিক এবং সরকারি পরিষেবার ব্য‌বস্থায় দুর্নীতি হয়েছে ব্য‌াপক। তাই দুর্নীতির সম্ভাব্য‌ সমস্ত পথ বন্ধ করে দিতে হবে। সরকারি পরিষেবা ব্য‌বস্থাকে সহজ সরল করে তোলা, তথ্য‌প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগ ও ব্য‌বহার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা তাই বিশেষ ভাবে প্রয়োজন। দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষদের চিহ্নিত করে দ্রুত শাস্তির ব্য‌বস্থা করতে হবে।

) মনে রাখতে হবে ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, সিভিল সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। রাজনৈতিক শাসকদের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের নীতি অনুসরণ করতে হয় সিভিল সার্ভিসকে। আইনগত কিছু বাধ্য‌বাধকতাও রয়েছে এর মধ্য‌ে। তাই এ ব্য‌াপারে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।

) সিভিল সার্ভিসের পদাধিকারীদের নীতি প্রণয়নের সময় তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামতকে সুষ্পষ্ট ভাবে জানতে হবে। দেখতে হবে তা জনস্বার্থের পরিপন্থী কিনা।

) পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ে যখন মন্ত্রক এবং কিছু কিছু সিভিল সার্ভিস পদাধিকারী অধস্তনদের উপর আইনবিরুদ্ধ কোনও আদেশ চাপিয়ে দেন এবং তা মানতে বাধ্য‌ করেন। আর্থিক লাভ বা দুর্নীতির জন্য‌ হয়তে তা করা হয়। এ ছাড়াও রয়েছে মাফিয়ার সমস্য‌া। এই সমস্ত পরিস্থিতি ও সমস্য‌ার সামাল দিতে হবে খুব ঠান্ডা মাথায়, দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বচ্ছ রেখে। প্রথমত, যে সমস্ত আদেশ অবৈধ বা যা আইনানুগত পদক্ষেপ নিতে বাধা সৃষ্টি করে তা উপেক্ষা করা উচিত। দ্বিতীয়ত, কোনও প্রশাসনিক আদেশ অন্য‌ায্য‌ বলে মনে হলে যুক্তিসহ তার প্রতিবাদ করতে হবে। তাতে কেরিয়ারে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বটে। কিন্তু সতীর্থ ও সহকর্মীদের সম্মান অর্জন করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে সহকর্মী এবং উচ্চপদস্থ কর্তারাই আপনার পাশে এসে দাঁড়াবেন। সাফল্য‌ এমনি এমনি পাওয়া যায় না। মিথ্য‌াচার অসাম্য‌ ও অন্য‌ায়ের ওপর ভিত্তি করে সাফল্য‌ অর্জন করা সম্ভব নয়।

রাজনৈতিক শাসক আইনসভার কাছে দায়বদ্ধ। তাদের চিন্তা করতে হবে শাসনব্য‌বস্থাকে কী ভাবে শক্তিশালী করে তোলা যেতে পারে সে সম্পর্কে। ছ’দশকেরও আগে সর্দার প্য‌াটেল নির্দেশিত পথে সারা দেশে এ সম্পর্কে আলোচনার আবহ তৈরি করে কাজের জগতে নামার প্রস্তুতি নিতে হবে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

সংস্কারের নানা ব্যাখ্যা

সাধারণ ভাবে সংস্কার শব্দটির অর্থ হল বর্তমান অবস্থা থেকে উন্নততর অবস্থানে উত্তরণ অথবা বর্তমান অবস্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ত্রুটি, বিচ্য‌ুতি এবং অন্তরায়গুলিকে মুক্তি ঘটিয়ে পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করা।

জনপ্রশাসনের ক্ষেত্রে এই সংস্কার শব্দটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে আসছে সুপ্রাচীন সময় থেকেই। কারণ সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গেই যুক্ত হয়ে আছে তার পরিবর্তিত চাহিদার সম্পর্ক, আর এই পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি বজায় রাখা এবং সেই ভাবে নিজস্ব আঙ্গিকের পরিবর্তন জনপ্রশাসনের ইতিহাসে বিশেষ ভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে আছে।

জনপ্রশাসনের প্রেক্ষাপটে এই সংস্কার প্রক্রিয়াকে ব্য‌াখ্য‌া করা হয়েছে নানা ভাবে এবং নানা প্রেক্ষিতে, যেমন প্রশাসনিক পরিবর্তন, প্রশাসনিক রূপান্তর, প্রশাসনিক পুনর্গঠন, প্রশাসনিক পুনর্নবীকরণ ইত্য‌াদি। যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এই প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্দেশ্য‌ হল প্রশাসনিক ব্য‌বস্থাকে পরিবর্তিত সময়, পরিস্থিতি এবং অন্তরায়গুলির সঙ্গে মানিয়ে চলার উপযোগী করে তোলা। এই সংস্কারের প্রক্রিয়া হল সুচিন্তিত, সুপরিকল্পিত এবং সুনির্দিষ্ট, যাতে এই প্রক্রিয়া প্রথাগত অন্তরায়গুলির মোকাবিলা করেই তার পথকে এবং অভীষ্টকে সুনিশ্চিত করতে সক্ষম হয়।

আধুনিক সমাজ ব্য‌বস্থার একটি অন্য‌তম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল ক্রমাগত এবং পদ্ধতিগত রূপান্তরের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা ও দক্ষতা অর্জন। ঐতিহ্য‌ের ঐতিহাসিক মূল্যের পাশাপাশি কিছু কিছু প্রতিবন্ধকতাও আছে। সেই সব প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য‌ই সমাজে পরিবর্তন প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। ফলে সমাজকেও পরিবেশ, সংস্কৃতি, মেধা ও প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তিত হতে হয় এবং প্রাচীন প্রথা ও পরিকাঠামোগুলির পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন পথের অনুগামী হওয়ার প্রাসঙ্গিকতা অনুভব করতে হয়।

প্রশাসনিক সংস্কারও এই সার্বিক পরিবর্তনেরই একটি অঙ্গ। কারণ প্রশাসন সার্বিক সমাজেরই উপ-সংস্কৃতি কিংবা উপ-সমাজব্য‌বস্থার অংশ ছাড়া অন্য‌ কিছু নয় এবং বৃহত্তর সামাজিক মূল্য‌বোধের প্রতিফলন ঘটানোই তার মূল লক্ষ্য‌। অন্য‌থায় প্রশাসনিক স্থিতাবস্থাই সমাজের বিভিন্ন ভারসাম্য‌হীনতা এবং বিচ্য‌ুতির অন্য‌তম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

প্রশাসনের সব চেয়ে বড় সহায়ক শক্তি

যে হেতু জন প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই সক্রিয় হতে হয়, তার ফলে মূল চরিত্র, কাঠামো এবং কাজ করার পদ্ধতি রাজনৈতিক পরিবেশের দ্বারা বিশেষ ভাবে প্রভাবিত হয়। এ ছাড়াও তার প্রাতিষ্ঠানিক গতিশীলতা ও প্রক্রিয়া নিছক জাতীয় লক্ষ্য‌, উদ্দেশ্য‌ ও অগ্রাধিকার নির্ণয়ের মধ্য‌ে সীমাবদ্ধ নয়। তার অন্য‌তম প্রধান দায়িত্ব নীতি ও সিদ্ধান্তগুলির কার্যকর রূপায়ণ। একই সঙ্গে তথ্য‌ ও প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি, জাতীয় সম্পদের ব্য‌বস্থাপনায় রাষ্টের কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ, সুষম ও যথাযথ অর্থনৈতিক ব্য‌বস্থা কায়েম, দীর্ঘ সময়ের সামাজিক বৈষম্য‌ের অবসান ঘটিয়ে নতুন প্রতিষ্ঠানের সন্ধান করা, জনপ্রশাসনের কাছে এক নতুন দায়িত্বের বার্তা বহন করে এনেছে। এর জন্য‌ প্রয়োজন প্রাসনিক দক্ষতার পরিকাঠামোগত রূপান্তর এবং যার জন্য‌ চাই যথাযথ পরিকল্পনা, দক্ষতা বৃদ্ধি, দৃষ্টিভঙ্গির রূপান্তর এবং একগুচ্ছ গঠনগত পুর্গঠন। প্রশাসনিক সংস্কারের এই প্রেক্ষাপট তাই বিভিন্ন বিষয়ের এবং বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির এক সমন্বিত প্রয়াসের প্রেক্ষাপট।

অন্য‌ দিকে নব্বইয়ের দশকের বাজার সংস্কারের ধারণার হাত ধরেই সারা বিশ্বের, বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির সামনে এসেছে সুশাসনের ধারণা যার মূল লক্ষ্য‌ হল দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা, দক্ষতা,কার্যকারিতা এবং বিকেন্দ্রীকরণ। ফলে সুশাসনতত্ত্বের প্রেক্ষাপটেই বর্তমান রাষ্ট্র, সরকার এবং আমলাতন্ত্রের প্রথাগত পরিবর্তনেরও দাবি উঠে এসেছে। তাই আজকের রাষ্ট্র ব্য‌বস্থার কাছে সংবেদনশীলতার চেয়েও বড় প্রশ্ন হল অংশীদারিত্ব এবং সমন্বয় সাধনের দায়িত্ব গ্রহণ। এর ফলে সব চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রশাসনিক ব্য‌বস্থায় মানুষের অংশগ্রহণ এবং একাধিক ভূমিকা পালনকারী সমন্বয় সাধনের উপর। এই অংশগ্রহণ এবং সমন্বয় সাধনের কেন্দ্রবিন্দুতে, সরকারের ভূমিকা হল জনসাধারণের তথা নাগরিকবৃন্দের অংশীদার হিসাবে। প্রথাগত সংগঠকের ভূমিকায় থেকে প্রশাসনের পক্ষে এই দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়। জনগণের আস্থা, বিশ্বাস এবং বন্ধুতাই সরকারের তথা প্রশাসনের সব চেয়ে বড় সহায়ক শক্তি হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর ফলে আমলাতন্ত্রের কাছেও নতুন ভূমিকায় নিজেকে উপস্থাপিত করার প্রত্য‌াশা থেকে যাচ্ছে। এই প্রত্য‌াশার অন্য‌ নাম প্রশাসনিক সংস্কার।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

৪৭-এর গিরিজাশঙ্কর বাজপেয়ী কমিটি (সাব হেডিং)

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট মধ্য‌ রাতে ভারত যখন স্বাধীনতা লাভ করেছিল তখন অন্য‌ান্য‌ সমস্য‌ার সঙ্গে তার সঙ্গী হয়েছিল দেশভাগ, শরণার্থীর আগমন, দেশীয় রাজ্য‌গুলির সমন্বয় সাধন এবং এক বিশাল সংখ্য‌ক আমলার হয় অবসর গ্রহণ না হয় ভারতের অন্য‌ ভাগে স্থানান্তর। স্বাধীন ভারতের প্রথম সরকার আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য‌ দিয়ে এক কল্য‌াণকামী রাষ্ট্র ব্য‌বস্থা গ্রহণ করেছিলেন। সদ্য‌োজাত সেই শিশুর কাছে বহুধা বিভক্ত এই রাষ্ট্র ব্য‌বস্থার সমন্বয় সাধনের মধ্য‌ দিয়ে সামনের পথে এগিয়ে যাওয়ার ছিল এক কঠিন চ্য‌ালেঞ্জের মোকাবিলা। উপনিবেশ শাসনের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত প্রশাসনিক যন্ত্রকে স্বাধীন ভারতের উন্নয়ন ভাবনায় রূপান্তরের প্রশ্নে তাই প্রথামিক ভাবে সময়োপযোগী নবীকরণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। এই নবীকরণ বা সংস্কারেরর কেন্দ্রে ছিল স্বাধীন দেশের রাষ্ট্র পরিচালনার গঠনতন্ত্র নির্মাণ এবং দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য‌ এবং উদ্দেশ্য‌ নির্ধারণের জন্য‌ পরিকল্পনা কমিশন গঠন। সেই সঙ্গে লক্ষ্য‌ ছিল এক দৃঢ় ও কঠিন আমলাতন্ত্রের ভিত্তি নির্মাণ, দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে যাঁদের দায়িত্ব হবে দেশ পরিচালনা, বৈদেশিক নীতি নির্ধারণ-সহ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য‌মাত্রা নির্ধারণে সহায়তা করা এবং গৃহীত নীতি রূপায়ণ করা।

এই প্রেক্ষাপটে স্বাধীন ভারতে, বিশেষত নেহরু যুগের সূচনা পর্বে, প্রথম যে পদক্ষেপটি সংস্কারের প্রশ্নে গৃহীত হয়েছিল তা হল ১৯৪৭ সালেই গিরিজাশঙ্কর বাজপেয়ীর নেতৃত্বে সচিবালয় পুনর্গঠন কমিটি গঠন। এই কমিটির প্রধান দায়িত্ব ছিল কর্মীবর্গের ঘটাতি সম্পর্কে অনুসন্ধান, সম্ভাব্য‌ কর্মীবর্গের পূর্ণ সদ্ব্য‌বহার এবং কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের কর্মপদ্ধতির উন্নয়ন বিষয়ে সুপারিশ। এই কমিটি ভারত সরকারকে নতুন কর্মীবর্গ নিয়োগের আগে কোনও নতুন কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করে। একই সঙ্গে এই কমিটি বিভিন্ন ধরনের আধিকারিকের মাধ্য‌মে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার চলতি পদ্ধতির ক্ষেত্রেও পরিবর্তন সুপারিশ করে। এই সুপারিশ অনুযায়ী ভারত সরকার পরবর্তী কালে কাজ শুরু করে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

গোপালস্বামী আয়েঙ্গার কমিটি (সাব হেডিং)

১৯৫০ সালে গঠিত হয় গোপালস্বামী আয়েঙ্গার কমিটি। গোপালস্বামী আয়েঙ্গারের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটি কেন্দ্রীয় সরকারের কর্ম পদ্ধতির উপর একটি বিস্তারিত সমীক্ষা সংগঠিত করে। এই কমিটি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিমণ্ডলীকে চারটি ব্য‌ুরোয় বিভক্ত করার সুপারিশ করে। এই চারটি বিভাগ ছিল কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদ, শিল্প ও বাণিজ্য‌, পরিবহন ও যোগাযোগ এবং শ্রম ও সামাজিক পরিষেবা। এ ছাড়া এই কমিটির সুপারিশ ছিল কেন্দ্রীয় সচিবালয়কে মোট ৩৭টি প্রাথমিক এককে বিভক্ত করা যার মধ্য‌ে থাকবে ২৮টি দফতর এবং ৮টি কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক দফতর এবং ক্য‌াবিনেট সচিবালয়। একই সঙ্গে সরকারি আধিকারিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশ্নে এই কমিটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অধীনে ‘সংগঠন ও পদ্ধতি’ নামে একটি বিভাগ সৃষ্টিরও সুপারিশ করে। যদিও আয়েঙ্গার কমিটির অধিকাংশ সুপারিশই গৃহীত হয়নি, কিন্তু সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই কেন্দ্রীয় সরকার ১৯৫০ সালের মে মাসে প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, আইন ও পরিষদীয় এবং প্রশাসনিক সংগঠন কমিটি গঠন করে।

পরিকল্পনা কমিশনের কমিটি

১৯৫০ সালের মার্চ মাসে পরিকল্পনা কমিশন গঠিত হল। পরিকল্পনা কমিশনের উদ্য‌োগে এ ডি গোড়োওয়ালার নেতৃত্বে পুনরায় একটি কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটি প্রশাসনিক সংস্কার সংক্রান্ত দুটি প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রথম প্রতিবেদনটির বিষয় ছিল জন প্রশাসন সংক্রান্ত এবং দ্বিতীয় প্রতিবেদনটির বিষয় ছিল রাষ্ট্রীয় উদ্য‌োগের দক্ষ ও কার্যকর প্রয়োগ সংক্রান্ত। এই কমিটির উল্লেখযোগ্য‌ সুপারিশগুলির মধ্য‌ে ছিল ‘সংগঠন ও পদ্ধতি’ সংক্রান্ত বিভাগ সৃষ্টি এবং প্রশিক্ষণের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ। সরকার গোড়োওয়ালা কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ‘সংগঠন ও পদ্ধতি’ সংক্রান্ত বিভাগ সৃষ্টি করে।

গোপালস্বামী কমিটি

সরকারের প্রশাসন যন্ত্রের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশ্নে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে আর এ গোপালস্বামীর নেতৃত্বে আরও একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি ছিল এক সদস্য‌ বিশিষ্ট। এই কমিটি কী কী সুপারিশ করেছিল সে সব সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে কিছু জানা যায়নি। তবে সরকারি স্তরে সুপারিশগুলি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে নানা আলোচনা হয়েছিল।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

অ্য‌াপলবিকে আমন্ত্রণ

নেহরু যুগে প্রশাসনিক সংস্কারের প্রশ্নে সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য‌ পদক্ষেপ হল জনপ্রশাসনের মার্কিন বিশেষজ্ঞ পল এইচ অ্য‌াপলবির দুটি প্রতিবেদন। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ভারতীয় প্রশাসনিক ব্য‌বস্থার কার্যকর সংস্কারের প্রশ্নে এই বিশেষজ্ঞকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। অ্য‌াপলবি তাঁর প্রথম প্রতিবেদনটি দাখিল করেন ১৯৫৩ সালে যার মুখ্য‌ প্রতিপাদ্য‌ ছিল ভারতীয় জনপ্রশাসন সমীক্ষা। তিনি দ্বিতীয় প্রতিবেদনটি দাখিল করেন ১৯৫৬ সালে যার মূল বিষয় ছিল সরকারি উদ্য‌োগে প্রতিষ্ঠিত শিল্প ও বাণিজ্য‌িক উদ্য‌োগগুলির সংগঠন, কর্মপদ্ধতি, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ইত্য‌াদি বিষয়ে সুপারিশ। অ্য‌াপলবির মোট ১২টি সুপারিশের মধ্য‌ে সরকারের পক্ষ থেকে ২টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ গ্রহণ করা হয়। প্রথমটি হল ইন্ডিয়ান ইনিস্টিটিউট অফ পাবলিক অ্য‌াডিমিনিস্ট্রেশন নামে একটি আধা সরকারি বৃত্তিগত প্রশিক্ষণ ও গবেষণা সংস্থা প্রতিষ্ঠা। ১৯৫৪ সালে ক্য‌াবিনেট সচিবালয়ে ‘সংগঠন ও পদ্ধতি’ নামের একটি কেন্দ্রীয় বিভাগ তৈরি করা হয়, যার শাখা বিস্তৃত হয় প্রতিটি মন্ত্রক ও বিভাগে। প্রধান লক্ষ্য‌ ছিল সরকারি নথিপত্র আদান প্রদানের গুণগত মান বৃদ্ধি করা। এরই ফলশ্রুতি হিসাবে প্রতিটি মন্ত্রক এবং বিভাগের জন্য‌ দফতর পরিচালনার ম্য‌ানুয়ালও তৈরি হয় ওই সময়ে।

আরও দুটি পদক্ষেপ

নেহরু যুগের অপর দুটি উল্লেখযোগ্য‌ সংস্কার কমিটি হল ১৯৫৬ সালের প্ল্যান প্রজেক্ট বিষয়ক কমিটি এবং ১৯৬২ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ বিষয়ক কমিটি। পরিকল্পনা কমিশনের উদ্য‌োগে গঠিত ১৯৫৬ সালের এই কমিটির দায়িত্ব ছিল পরিকল্পিত কর্মসূচিগুলির প্রকৌশল, কর্মপদ্ধতি এবং প্রায়োগিক দিকগুলি খতিয়ে দেখা যাতে কর্মসূচিগুলি অর্থনৈতিক ভাবে ফলপ্রসূ হয় এবং কার্যকর হয়। এই কমিটির সুপারিশেই ১৯৬৪ সালে একটি উন্নয়ন ও ব্য‌বস্থাপনা প্রশাসন বিভাগ তৈরি হয় যার উদ্দেশ্য‌ ছিল আধুনিক ব্য‌বস্থাপনার পদ্ধতিসমূহ প্রয়োগের পথ সুগম করা। এই প্রতিষ্ঠান ক্রমশ জেলা স্তরের উন্নয়ন প্রশাসনের অন্তরায়গুলিও খতিয়ে দেখতে শুরু করে।

সান্তানম কমিটি

অন্য‌ দিকে ১৯৬২ সালে কে সান্তানমের নেতৃত্বে গঠিত দুর্নীতি প্রতিরোধ বিষয়ক কমিটি প্রশাসনিক স্তরে দুর্নীতির ক্ষেত্রগুলিকে খতিয়ে দেখে কেন্দ্রীয় স্তরে একটি কেন্দ্রীয় ভিজিল্যান্স কমিশন গঠনের সুপারিশ করে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

প্রথম প্রশানিক সংস্কার কমিশন

১৯৬৪ সালের মাঝামাঝি জওহরলাল নেহরু মৃত্যু হয়। নেহরু যুগের অবসানের আগেই ভারতে গঠনতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, পরিকল্পনা কমিশন গঠন এবং প্রায় দুই দশকের নেহরু মন্ত্রিসভার কার্যকারিতা ভারতীয় প্রশাসনিক ব্য‌বস্থায় গণতন্ত্রের ভিত্তিকে শুধু সুদৃঢ়ই করেনি, সার্বিক প্রশাসনিক ব্য‌বস্থাকে জনমুখী করার একাধিক প্রয়াস গৃহীত হয়েছে এই সময়কালে। এই প্রেক্ষাপটেই ১৯৬৬ সালের জানুয়ারি মাসে লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মন্ত্রিসভা মোরারজি দেশাইয়ের নেতৃত্বে ছয় সদস্য‌ বিশিষ্ট দেশের প্রথম প্রশাসনিক সংস্কার কমিটি গঠন করে। কিন্তু লালবাহাদুর শাস্ত্রীর প্রয়াণের পর ১৯৬৭ সালের মার্চ মাসে ইন্দিরা গান্ধী মন্ত্রিসভায় মোরারজি দেশাই উপপ্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী হিসাবে যোগদান করার কারণে কমিশন অপর সদস্য‌ কে হনুমন্থাইয়াকে এই কমিশনের নতুন সভাপতি নিয়োগ করা হয়।

হনুমন্থাইয়া কমিশনের কার্যকাল ছিল দীর্ঘ প্রায় চার বছর। নিয়োগের সূত্র অনুযায়ী এই কমিশন কেন্দ্র এবং রাজ্য‌ স্তরের জন প্রশাসনের প্রায় সমস্ত বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করে এবং মোট ২০টি প্রতিবেদনের মধ্য‌ে দিয়ে ৫০০টি সুপারিশ করে এই চার বছরের কার্যকালে। এই কমিশনের প্রতিবেদনগুলি ভারতীয় জন প্রশাসনকে শুধু সমৃদ্ধই করেনি, প্রশাসনিক পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার ভবিষ্য‌ৎ পথগুলিকেই মসৃণ করেছে।

প্রথম সংস্কার কমিশনের প্রধান সুপারিশগুলির মধ্য‌ে উল্লেখযোগ্য‌ ছিল প্রশাসনিক সংস্কার বিভাগের দায়িত্বগুলির পুনর্মূল্য‌ায়ন করা। কমিশনের সুপারিশ ছিল প্রশাসনিক সংস্কার বিষয়ে নিয়মিত সমীক্ষা ও গবেষণা অব্য‌াহত রাখা, বিভিন্ন মন্ত্রক ও বিভাগগুলিতে সংগঠন ও পদ্ধতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা এবং কর্মীবর্গের আধুনিক বাবস্থাপনার পদ্ধতি অনুযায়ী নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্য‌বস্থা করা।

বিশেষ সেল গঠনের প্রস্তাব

এ ছাড়াও এই কমিশন তাদের সুপারিশগুলি কার্যকর করার জন্য‌ একটি বিশেষ সেল গঠনের প্রস্তাব দেয়। একই সঙ্গে কমিশন সুপারিশ করে যে কেন্দ্রীয় সংস্কার বিষয়ক সংস্থা যেন কর্মপদ্ধতি, কর্মীবর্গ এবং সংগঠন সংক্রান্ত বিষয়ে গবেষণা নির্ভর হয়। কেন্দ্র এবং রাজ্য‌ ছাড়াও জেলা স্তরের প্রসাসনিক ব্য‌বস্থা সম্পর্কেও কমিশনের সুপারিশ ছিল আধুনিক ব্য‌বস্থাপনার প্রতিটি দিককে আত্মস্থ করা এবং তাকে প্রয়োগ করা।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

আরও কমিটি, আরও কমিশন

যে বিষয়গুলি হনুমন্থাইয়া কমিশনের প্রতিবেদনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল সেগুলি হল ভারত সরকারের বিভিন্ন প্রশাসন যন্ত্রের পদ্ধতি ও প্রকরণ, কর্মীবর্গের প্রশাসন, নাগরিকদের ক্ষোভ বিক্ষোভের প্রশমন, কেন্দ্র-রাজ্য‌ সম্পর্ক, রাজ্য‌ প্রশাসন, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির প্রশাসন, পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক প্রশাসন, আর্থিক ও নিরীক্ষা প্রশাসন, আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, রেল ব্য‌বস্থা, ডাক ও তার বিভাগের প্রশাসন ইত্য‌াদি।

প্রথম প্রশাসনিক সংস্কার কমিশনের পরবর্তী সময়ে বিগত শতকে যে সব গুরুত্বপূর্ণ কমিটি গঠন করা হয়েছিল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য‌ হল ১৯৭৬ সালে ডি এস কোঠারির নেতৃত্বে গঠিত সরকারি পদে নির্বাচন ও নিয়োগ সংক্রান্ত কমিটি। প্রধানত সর্বভারতীয় কৃত্য‌কের নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার বিষয়ে সুপারিশ করাই ছিল এই কমিটির প্রধান দায়িত্ব। কমিটি তার প্রতিবেদনে সমস্ত অকারিগরি পদের নির্বাচনের ক্ষেত্রে সর্বভারতীয় কৃত্য‌কের জন্য‌ একটিই পরীক্ষার সুপারিশ করে।

পুলিশ কমিশন

ধরম বীরার নেতৃত্বে ১৯৭৭ সালে গঠিত ভারতীয় পুলিশ কমিশন। পুলিশি ব্য‌বস্থার সংস্কারের প্রশ্নে এই কমিশন গড়া আর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই কমিশন পুলিশের দায়িত্ব, কর্তব্য‌, তদন্তের ধরন, ম্য‌াজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধান, অপরাধ সংক্রান্ত নথিপত্রের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ইত্য‌াদি বিভিন্ন বিষয়ে মোট ৫০০টি সুপারিশ করে।

১৯৮১ সালে এল কে ঝার নেতৃত্বে গঠিত হয় অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন। এই সংস্কার কমিশন দেশের পরিবর্তিত অথর্নীতির সঙ্গে সমন্বয় সাধনের প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই কমিশন সরকারের কাছে দাখিল করা প্রতিবেদনে দেশের অর্থনৈতিক প্রশাসনকে আধুনিক এবং যুক্তিশীল হওয়ার পক্ষে সুপারিশ করে।

সারকারিয়া কমিশন

পরবর্তী কালে গঠিত হল সারকারিয়া কমিশন। আর এস সারকারিয়ার নেতৃত্বে গঠিত কেন্দ্র-রাজ্য‌ সম্পর্কের পুনর্বিন্য‌াস বিষয়ক এই কমিশন ছিল অত্য‌ন্ত সময়োপযোগী। এই কমিটির দায়িত্ব ছিল কেন্দ্র ও রাজ্য‌ের আর্থিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব ও ক্ষমতাগুলি পুনর্বিবেচনা করা এবং সময়োপযোগী চাহিদার নিরিখে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা। সারকারিয়া কমিশনের সমস্ত সুপারিশ সরকার মেনে না নিলেও এই প্রতিবেদন কেন্দ্র ও রাজ্য‌ স্তরে একাধিক আলোচনার উদ্রেক করেছিল। সৃষ্টি করেছিল ব্যাপক আলোড়ন।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

‘বাজারের’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

১৯৮০-র দশক থেকে পশ্চিম দুনিয়ায় জন প্রশাসন ‘নয়া উদারবাদের’ তত্ত্বের দ্বারা বিশেষ ভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। যার মূল প্রবণতা হল সমাজ ও অর্থনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসাবে রাষ্ট্রের পরিবর্তে ‘বাজারের’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রতি আস্থা। রাষ্ট্রের পুনর্ভাবনা সংক্রান্ত বিষয়ে ১৯৯০-এর দশকের সূচনায় বিশ্ব ব্য‌াঙ্কের ভাবনা ছিল সমাজ ও অর্থনীতিতে অত্য‌ধিক সরকারি নিয়ন্ত্রণ সম্পদের ত্রুটিপূর্ণ বণ্টন এবং কায়েমি স্বার্থ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে দুর্নীতি সর্ব স্তরে ব্য‌াপ্ত হয়েছে। এর থেকে পরিত্রাণ খোঁজা হয়েছে অবনিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারিকরণের মধ্য‌ে এবং যথার্থ জায়গায় বাজারের শক্তিকে উৎসাহিত করে। এই ভাবনার সহায়ক হিসাবে আরও যে বিষয়গুলি সামনে এসেছিল সেই সময়ে তা হল, প্রশাসনিক কাজকর্মে তথ্য‌ের অধিকার, তথ্য‌ প্রযুক্তির ব্য‌বহারকে উৎসাহিত করা এবং সরকারের বিকেন্দ্রীকরণ।

এই প্রেক্ষাপটে ১৯৯৬ সালের মে মাসে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ও রাজ্য‌গুলির মুখ্য‌সচিবদের যে সম্মেলন হয়েছিল তার মূল প্রতিপাদ্য‌ ছিল দায়বদ্ধ, মুক্ত ও স্বচ্ছ এবং নাগরিক-বান্ধব শাসন ব্য‌বস্থা এবং সরকারি কাজকর্মের গুণগত দিকগুলি উন্নত করা। এর ফলশ্রুতি হিসাবে এইচ ডি গৌরীর নেতৃত্বে স্বচ্ছতা ও তথ্য‌ের অধিকার সংক্রান্ত একটি কমিটি গঠন করা হয়। একই সঙ্গে সরকারি কাজকর্মে কম্পিউটারের প্রয়োগ ত্বরান্বিত করার জন্য‌ এন ভিত্তল-এর নেতৃত্বে অপর একটি কমিটি তৈরি হয়। অন্য‌ দিকে সমস্ত মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নাগরিক সম্পদ তৈরি করার উদ্য‌োগ নেওয়া হয়, সমস্ত বিভাগের পক্ষ থেকে বিভাগীয় তদন্ত ও ভিজিল্যান্স সংক্রান্ত তদন্তগুলি দ্রুত নিষ্পত্তি সহ বিভিন্ন ক্ষোভ ও অভিযোগের নিষ্পত্তির বিভাগীয় যন্ত্রগুলি উন্নত করার উদ্য‌োগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে কেন্দ্র ও রাজ্য‌ের সঙ্গে যুক্ত আধিকারিকদের পদোন্নতি ও বদলির প্রশ্নে প্রশাসন কৃত্য‌কের দ্রুত সংস্কারেরও উদ্য‌োগ নেওয়া হয়। মুখ্য‌সচিবদের সম্মেলনে আলোচিত মূল তিনটি বিষয় — দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা এবং সংবেদনশীলতা নিয়ে জাতীয় স্তরে বিতর্কের সূচনা হয় এবং ক্রমশ বিস্তৃততর জনমত আহ্বান করা হয়। বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ, অধ্য‌াপক ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মতামতের ভিত্তিতে জাতীয় স্তরে একটি কর্ম পরিকল্পনা গৃহীত হয়।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

৭৭-এর মুখ্য‌মন্ত্রীদের সম্মেলন

মুখ্য‌সচিব সম্মেলনে গৃহীত কর্মপরিকল্পনার মূল বিষয় ছিল তিনটি — ক) সরকারকে দায়বদ্ধ এবং নাগরিক বান্ধব করে তোলা, () স্বচ্ছতা এবং তথ্য‌ের অধিকার এবং () লোকসেবার সততা এবং কর্মদক্ষতার বিকাশ ঘটানো। এই কর্মপরিকল্পনা পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালের মে মাসে মুখ্য‌মন্ত্রীদের একটি সম্মেলনে বিস্তারিত আলোচনা সহ গৃহীত হয়।

এই কর্মপরিকল্পনার পরিপ্রেক্ষিতে যে পদক্ষেপগুলি পরবর্তী কালে গৃহীত হয়েছিল তার মধ্য‌ে উল্লেখযোগ্য‌ হল—

() সরকারের প্রতিটি মন্ত্রকের পক্ষ থেকে নাগরিকদের কী ধরনের পরিষেবা কোন সময়ের মধ্য‌ে দেওয়া হবে তার বিস্তারিত বিবরণ সহ নাগরিক সনদ প্রকাশের উদ্য‌োগ গ্রহণ করা;

() জনসাধারণের অভিযোগগুলির দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পত্তির জন্য‌ প্রতিটি মন্ত্রক এবং রাজ্য‌ সরকারের প্রতিটি বিভাগের তৃণমূল স্তর পর্যন্ত জনঅভিযোগ আধিকারিক নিয়োগের উদ্য‌োগ গ্রহণ করা;

() সরকারের চলতি আইনগুলির সংস্কার করার বিষয়ে পি সি জৈনের সভাপতিত্বে কমিটি গঠন করা;

() সংবিধানের ৭৩ এবং ৭৪ তম সংশোধনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পঞ্চায়েত ও পৌর প্রশাসন সহ প্রশাসনের অন্য‌ান্য‌ স্তরে জনসাধারণের অংশগ্রহণ যাতে বাড়ে তার জন্য উদ্য‌োগ গ্রহণ করা; এবং

() ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা।

এবং আরও পরে আরও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় --- বর্তমান শতকের সূচনা পর্বে ইংরাজ আমলের ১৯২৩ সালের সরকারি নথির গোপনীয়তা আইনের বিলোপ ঘটিয়ে প্রথমে ২০০৩ সালের তথ্য‌ের স্বাধীনতা আইন এবং পরে ২০০৫ সালের তথ্য‌ের স্বাধীনতা আইনের অধিকার বলবৎ করা হয়।

বিগত শতকের শেষ দিকে বাজার অর্থনীতির হাত ধরেই আন্তজার্তিক প্রেক্ষাপটে জন প্রশাসন পরিচালনায় যে তত্ত্বটির আবির্ভাব ঘটেছিল তার নাম সুশাসন। এর মূল লক্ষ্য‌ হল অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সামাজিক পুঁজি-নির্ভর, স্বচ্ছ, দায়বদ্ধ, সংবেদনশীল এবং অংশগ্রহণমূলক এক শাসনব্য‌বস্থা কায়েম করা। এই লক্ষ্য‌েই ২০০৫ সালে বীরাপ্পা মইলির নেতৃত্বে দ্বিতীয় প্রশাসনিক সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি মোট ১১টি প্রতিবেদন দাখিল করে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

প্রতিবন্ধকতার মোকাবিলা

২০০৫ সালে গঠিত বীরাপ্পা মইলির নেতৃত্বে দ্বিতীয় প্রশাসনিক সংস্কার কমিটি যে ১১টি প্রতিবেদন দাখিল করে তার মূল বিষয়গুলি ছিল সুশাসনের ভিত্তি হিসাবে তথ্য‌ের অধিকার, মানব সম্পদের সদ্ব্য‌বহার, বিপর্যয় মোকাবিলা, শাসন ব্য‌বস্থায় ন্য‌ায়নীতি, জন ব্য‌বস্থা, স্থানীয় শাসন, দ্বন্দ্বের মোকাবিলায় দক্ষতা বৃদ্ধি, সন্ত্রাস দমন, সামাজিক পুঁজির সদ্ব্য‌বহার, কর্মী বর্গের পুনর্নবীকরণ এবং বৈদ্য‌ুতিন মাধ্য‌ম নির্ভর শাসন ব্য‌বস্থা কায়েম করা।

সন্দেহ নেই একবিংশ শতাব্দীর সূচনা পর্বে ভারতকে যে সমস্ত প্রতিবন্ধকতার মোকাবিলা করে অগ্রসর হতে হচ্ছে তার মধ্য‌ে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হল বিশ্বায়নের নতুন ভাবনার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আর্থিক বিকাশের নতুন দিকগুলির উন্মোচন করা, বিভিন্ন দুর্নীতির মোকাবিলা করা, কেন্দ্র-রাজ্য‌ সম্পর্কের সহাবস্থান বজায় রাখা এবং বিভিন্ন ধরনের আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে উপযুক্ত অবস্থান নির্ধারণ করা। খুব সঙ্গত কারণেই বিশ শতকের মধ্য‌ ভাগে যে কল্য‌াণকামী রাষ্ট্র যাত্রা শুরু করেছিল ‘নিয়তির অভিসারে’ তার লক্ষ্য‌ এবং উদ্দেশ্য‌রও ব্য‌াপক পরিবর্তন ঘটেছে। ফলে এই রাষ্ট্রের প্রশাসন যন্ত্রেরও এক পেশাদারি মনোভাব নিয়ন্ত্রিত পরিবর্তন একান্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সংস্কার কমিটি সহ সাম্প্রতিক কালের অন্য‌ান্য‌ যে কমিটি এবং কমিশন তাদের সুপারিশগুলি দাখিল করেছে, সেগুলির কার্যকর প্রয়োগ একান্ত জরুরি। নাগরিক সনদ থেকে শুরু করে জনঅভিযোগ প্রশাসন, দুর্নীতি দমন এবং তথ্য‌ের অধিকার সংক্রান্ত আইনের কার্যকর প্রয়োগের জন্য‌ প্রয়োজন বিশেষ সংবেদনশীলতা, স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা। অন্য‌ দিকে ৭৩ এবং ৭৪ তম সংবিধান সংশোধনের উদ্দেশ্য‌কে বাস্তবায়িত করতে হলে প্রয়োজন ক্ষমতার প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণের সদিচ্ছা। গ্রাম এবং পৌর স্তরে প্রকৃত অর্থে ‘তৃতীয় সরকার’ কায়েম করতে হলে প্রয়োজন সম্পদের প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ এই স্তরে সমান্তরাল সরকারি কমিটিগুলির অবলুপ্তি।

সব শেষে মনে রাখা দরকার উন্নয়ন প্রশাসনে আমলাতন্ত্রের পরিবর্তিত এবং পেশাদারি ভূমিকাকে প্রাধান্য‌ দিয়েই ‘উন্নয়নমূলক আমলাতন্ত্রের’ ধারণা জন্ম নিয়েছে। এই মডেলকে অ-ওয়েবারিয় মডেল হিসাবেও চিহ্নিত করা হয়েছে। এই প্রশাসনের উদ্দেশ্য‌ হল সরকারি সংগঠনকে উন্নয়নের লক্ষ্য‌ে সাংগঠনিক ও আচরণগত ভাবে পরিবর্তিত করা।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

গণতন্ত্র ও বিকেন্দ্রীকরণ

দুই সংশোধনীর তাৎপর্য

১৯৯২ সাল। সেই বছরে সংবিধানের ৭৩ ও ৭৪-তম সংশোধনী আইন পাশ করা হয়। ওই দুই সংশোধনী আইন গণতন্ত্রের বিকাশ ও ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের ক্ষেত্রে অন্যতম এক উজ্জ্বল দ্যোতনা সৃষ্টি করে। উক্ত দুই সংশোধনী যথাক্রমে দেশের পঞ্চায়েত ব্য‌বস্থা ও পৌরসভাগুলির গঠন ও কার্যপ্রণালীতে মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। উক্ত সংশোধনীর ১১ তফশিলভুক্ত (পঞ্চায়েতের জন্য‌) ২৯টি ক্ষেত্র ও বারো তফশিলভুক্ত (পৌরসভার জন্য‌) ১৮টি ক্ষেত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে দেশের এই স্থানীয় সরকারগুলির (লোকাল গভনর্মেন্ট) ক্রিয়াকর্মের কী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এখানে চিহ্নিত করা আছে। প্রকৃত প্রস্তাবে বলা যেতে পারে যে, যে বৃহৎ গণতান্ত্রিক কাঠামোয় ভারত রাষ্ট্র স্বাধীনতার পরে আত্মপ্রকাশ করেছিল, একবিংশ শতাব্দীর নতুন নতুন চ্য‌ালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে তার কাঠামোয় যাতে কোনও রকম চিড় না ধরে সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে এই স্থানীয় সরকারগুলির ভিত্তি তথা সামগ্রিক রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি মজবুত করার লক্ষ্য‌েই উক্ত দুই সংশোধনী অন্য‌তম হাতিয়ার রূপে প্রকাশিত হয়েছে। এর কেন্দ্রবিন্দুতে আছে বিকেন্দ্রীকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ভাবনা।

এখন দেখা যাক যে তৃণমূল স্তরের গণতান্ত্রিক কাঠামো মজবুত করার লক্ষ্য‌ে ওই দুই সংশোধনী কোন কোন বিষয়ের উপর জোর দিচ্ছে।

প্রথমত, ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্য‌বস্থা (গ্রামস্তর, ব্লকস্তর ও জেলাস্তর) প্রবর্তনের উপর জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে পঞ্চায়েতের সমস্ত আসনে প্রার্থীদের নির্বাচিত (মনোনীত নয়) হয়ে আসতে হবে (অনুচ্ছেদ ২৪৩ সি)। পুরসভাগুলির ক্ষেত্রেও বিষয়টি সম ভাবে প্রযোজ্য‌ (অনুচ্ছেদ ২৪৩ আর)

দ্বিতীয়ত, ভারতের বিশাল জনগোষ্ঠীর (যা কিনা বিভিন্ন জাতি, ভাষা ও ধর্মে বিভক্ত) কথা মাথায় রেখে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সমাজের দুর্বলতর ও পিছিয়ে পড়া মানুষজনের অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকারগুলিতে আসন সংরক্ষণ (মহিলাসহ) আবশ্য‌ক করা হয়েছে।

তৃতীয়ত, গণতান্ত্রিক ভিত্তি তৃণমূল স্তরে প্রোথিত করার লক্ষ্য‌ে পঞ্চায়েতের ক্ষেত্রে গ্রামসভা এবং পুরসভাগুলির ক্ষেত্রে ওয়ার্ড কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এই সংগঠনগুলি পঞ্চায়েত ও পুরসভাগুলির সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এ ছাড়া ভবিষ্য‌ৎ কর্মপরিকল্পনার বিষয়গুলি তৃণমূল স্তরের এই সংগঠনগুলির মাধ্য‌মে উঠে আসবে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

সংশোধনীতে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

সংবিধানের ৭৩-তম ও ৭৪-তম সংশোধনী আইনে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রথমটি হল স্থানীয় সরকারগুলির সম্পদ সংগ্রহ (রিসোর্স মোবিলাইজেশন) সংক্রান্ত বিষয় এবং অন্য‌টি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও রূপায়ণ সংক্রান্ত বিষয়। পঞ্চায়েত ও পৌরসভাগুলির নিজস্ব সম্পদ সংগ্রেহর উপর জোর দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বলা হচ্ছে যে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর দেশের প্রতিটি রাজ্য‌কে অর্থ কমিশন (স্টেট ফাইনান্স কমিশন) গঠন করে আগামী বছরগুলিতে রাজ্য‌ সরকার এবং স্থানীয় সরকারগুলির মধ্য‌ে বিভিন্ন খাতে সম্পদ সংগ্রহ ও বিলি বণ্টনের ব্য‌বস্থা কী হবে তার সুনির্দিষ্ট এক রূপরেখা প্রস্তুত করতে হবে (অনুচ্ছেদ ২৪৩ আই এবং ২৪৩ ওয়াই)

অনুচ্ছেদ ২৪৩ জেড-এ বলা হয়েছে যে প্রতিটি রাজ্য‌কে জেলাস্তরে একটি পরিকল্পনা কমিটি গঠন করে সংশ্লিষ্ট জেলার পঞ্চায়েত ও পৌরসভাগুলির জন্য‌ উন্নয়নমূলক বিভিন্ন পরিকল্পনার রূপরেখা প্রস্তুত এবং তদানুযায়ী তা রূপায়ণের কাজ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে বলা দরকার যে এগারো এবং বারো নম্বর তফশিলভুক্ত বিষয়গুলি নির্বাচন করা হয়েছে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের কথা মাথায় রেখে। আগে যে কাজগুলি রাজ্য‌ সরকারের বিভিন্ন দফতরের মাধ্য‌মে করা হত, সেগুলিই বিকেন্দ্রীভূত হয়ে স্থানীয় সরকারগুলির হাতে ন্য‌স্ত হয়েছে।

এ বারে এক নজরে দেখা যাক উক্ত দুই সংশোধনী আমাদের রাজ্য‌ে পঞ্চায়েত ও পৌরসভা কর্মকাণ্ডে কতটা প্রভাব ফেলেছে।

১৯৭৮ সালের পর থেকে এখানে নিয়মিত ব্য‌বধানে নির্বাচনের মাধ্যমে পঞ্চায়েতগুলিতে ৫০ হাজার অধিক এবং পৌরসভাগুলিতে কমবেশি ৩ হাজার আসনে জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়ে আসছেন। বলাই বাহুল্য‌, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধদের দ্বারা স্থানীয় সরকারের পরিচালনা পশ্চিমবঙ্গে ১৯৯২-এর সংশোধনীর বহু আগে শুরু হয়েছে।

এগারো তফশিলভুক্ত ও বারো তফশিলভুক্ত বিষয়ের বেশ অনেকটাই পশ্চিমবঙ্গে ১৯৯২-এর সংশোধনীর আগে পঞ্চায়েত আইনে (১৯৭৩) ও পৌরসভা আইনে (১৯৯৩) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। বলা হয়ে থাকে যে পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত আইনই (সংশোধিত) উক্ত সংবিধান সংশোধনীর বিভিন্ন ধারা উপধারা সংযোজনের ক্ষেত্রে অনেকটা মডেলের কাজ করেছিল।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

দৃষ্টান্ত পশ্চিমবঙ্গ

৭৩-তম ও ৭৪-তম সংশোধনী আইনে বছর ১৯৯২-এর দশ বছর আগে ১৯৮২ সালে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম পৌর অর্থ কমিশন (মিউনিসিপাল ফাইনান্স কমিশন) গঠন করা হয়েছিল। এই অর্থ কমিশনের কার্যধারা অনেকটাই সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ২৪৩ ওয়াইয়ের অনুসারী ছিল। এর এক বছর পর ১৯৯৩ সালেও ওই রূপ আরও একটি কমিশন গঠন করা হয়। এ ছাড়া ১৯৯৫, ২০০০ এবং ২০০৬ সালে যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় রাজ্য‌ অর্থ কমিশন গঠন করা হয়েছিল। এবং সেই কমিশনগুলি যে সব সুপারিশ করেছিল সেগুলির অধিকাংশই রাজ্য‌ সরকার গ্রহণ করে। ২০১৩ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে চতুর্থ রাজ্য‌ অর্থ কমিশন গঠিত হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ পুরসভা আইনে প্রতিটি পুরসভাকে তার নিজস্ব উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও রূপায়ণের কথা বলা হয়েছে। এখানে সেই লক্ষ্য‌ে, প্রথম পর্যায়ে কলকাতা মেট্রোপলিটন অঞ্চলের চল্লিশটি পুরসভা (কর্পোরেশন সহ) নির্বাচন করে ২০০৪-৫ সাল থেকে এক উন্নয়ন পরিকল্পনার ছক (ড্রাফট ডেভেলপমেন্ট প্ল্য‌ান) প্রণয়ন করা হয়েছে। ওই উন্নয়ন পরিকল্পনার ছকে প্রতিটি পুরসভা আগামী পাঁচ বছরে কোথায় কী উন্নয়নের কাজ করবে তার নির্দিষ্ট দিশা উল্লিখিত আছে। পরবর্তী পর্যায়ে রাজ্যের বাকি ৮৫টি পুরসভাতেও ওই একই কাজ সাফল্য‌ের সঙ্গে রূপায়িত করা হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ও পুরসভায় শুধুমাত্র সমাজের দুর্বলতর শ্রেণির মানুষদের আসন সংরক্ষণের বিষয়টিই নিশ্চিত করা হয়নি, ভারতের অন্য‌ান্য‌ কিছু রাজ্য‌ের মতো (যেমন পঞ্চায়েতের ক্ষেত্রে মধ্য‌প্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থান, উত্তরাখণ্ড প্রভৃতি) মোট আসনের পঞ্চাশ শতাংশ মহিলাদের জন্য‌ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এ রাজ্য‌ে পঞ্চায়েতের ক্ষেত্রে গ্রামসভা ও গ্রাম সংসদ এবং পৌরসভার ক্ষেত্রে ওয়ার্ড কমিটি গঠনের বিষয়টি সুনিশ্চিত করা হয়েছে। এর দ্বারা গণতন্ত্রকে তৃণমূল স্তরে প্রসারিত করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। এই প্রয়াস বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য‌। পঞ্চায়েত ও পুরসভার উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলি উক্ত তৃণমূল স্তরের সংগঠন থেকেই প্রস্তাব আকারে উঠে আসে। এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে গ্রামসভা ও গ্রাম সংসদ এবং পুর অঞ্চলে ওয়ার্ড কমিটির মাধ্যমে স্থানীয় স্তরে সাধারণ মানুষ তাঁদের অভাব অভিযোগ, চাহিদা এবং আশা আকাঙ্ক্ষার কথা জানাতে পারেন।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

দ্বিতীয় প্রজন্মের উন্নয়ন প্রক্রিয়া

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ১৯৯২ সালের সংবিধান সংশোধনী স্থানীয় সরকারগুলিকে এক সাংবিধানিক মর্যাদা দান করেছে বটে, তবে রাজ্য‌ সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের যথোপযুক্ত মতাদর্শই কেবলমাত্র এর সঠিক রূপদান করতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও কথাটা সত্য‌ি। রাজনৈতিক চিন্তাধারার সরকারি স্তরে বাস্তবায়নই আজ পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েতি রাজ ব্য‌বস্থাকে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বে অন্য‌তম এক আগ্রহের বিষয় করে তুলেছে। তবে কাজ এখনও অনেক বাকি। গণতন্ত্রকে তৃণমূল স্তরে প্রোথিত করার প্রক্রিয়া শেষ হয়নি, বলা যেতে পারে শক্ত ভিতটুকু প্রতিষ্ঠা হয়েছে। নির্মাণ প্রক্রিয়া চলছে। এখন একে বলা হচ্ছে দ্বিতীয় প্রজন্মের উন্নয়ন প্রক্রিয়া। ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের প্রক্রিয়ায় কোন কোন ক্ষেত্রে দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে, কী ভাবে তা দূর করা যাবে, বর্তমান ত্রুটিগুলিই বা কী, সেই সব ত্রুটির সংশোধনই বা কী ভাবে সম্ভব — সবই এই প্রক্রিয়ার অন্তর্গত।

এ প্রসঙ্গে আরও বলা দরকার যে, এগারো ও বারো তফশিলভুক্ত যে কাজগুলি পঞ্চায়েত ও পুরসভার হাতে ন্য‌স্ত হয়েছে, তা সঠিক ভাবে রূপায়ণের কাজে উপযুক্ত পরিকাঠামো গড়ে তোলা আবশ্য‌ক (ইংরেজিতে যাকে বলে থ্রি এফ – ফান্ডস, ফাংশনস, ফাংশনারিজ) নইলে বিকেন্দ্রীকরণের কাজটাই মাঠে মারা যাবে। এ ছাড়া দীর্ঘকালে, স্থানীয় সরকারগুলি যদি তাদের নিজস্ব সম্পদ সংগ্রহ না বাড়ায় তবে যে তাদের অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখে পড়বে তা বলাই বাহুল্য‌। তাই বাস্তব সম্মত উপায়ে সম্পদের মানচিত্রকরণ (রিসোর্স ম্য‌াপিং) প্রয়োজন। ভবিষ্য‌তের দিনগুলির কথা ভেবে আরও সুষ্ঠু ভাবে স্থানীয় সরকারগুলিকে পরিচালনা এবং সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অঞ্চেলর মানুষজনকে নিয়ে, তাদের চাহিদার ভিত্তিতে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও রূপায়ণে (যার পোশাকি নাম পার্টিসিপেটারি প্রজেক্ট ডেভেলপমেন্ট) দিকে আরও বেশি জোর দিতে হবে যাতে করে এই সত্য‌ই প্রতিষ্ঠিত হয় — ‘ব্য‌ষ্টির জন্য‌ পঞ্চায়েত/পুরসভা নয়, সমষ্টিকে সঙ্গে নিয়ে এবং তাদের চহিদা ও আশা আকাঙ্ক্ষার সঠিক রূপায়ণের জন্য‌, সমাজের সব চেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষটির উন্নয়নের জন্য‌ই আমাদের সবার পঞ্চায়েত/পুরসভা।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

ভারতে সুশাসনের লক্ষ্যে প্রয়াস

নতুন জনব্য‌বস্থাপনার ধারণা

স্বাধীনতা লাভ এবং প্রজাতান্ত্রিক সংবিধান কার্যকর হওয়ার সময় থেকেই ভারত গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসনিক সংস্কারের কথা ভেবে এসেছে। নতুন পরিস্থিতিতে স্বাধীন ভারতের জনগণের নবীন আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য‌ এই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা হয়েছিল। এমনকী ঔপনিবেশিক সময়েও বিক্ষিপ্ত ভাবে প্রশাসনিক সংস্কারের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে তার উদ্দেশ্য‌ ছিল ঔপনিবেশিক শাসনকে আরও মজবুত করা। স্বাধীনতার পর সুশাসনের লক্ষ্য‌ে সংস্কারের তাগিদ জোরদার হয়। ১৯৫০ সালে এ ডি গোড়োওয়ালা কমিটি রিপোর্ট এবং ১৯৫৩ এবং ১৯৫৭ সালে অ্য‌াপলবির দুটি রিপোর্টের পর ১৯৬৪ সালে উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন প্রথম প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশন প্রশাসন ও পদ্ধতিগত বিভিন্ন দিক নিয়ে ২০টি রিপোর্ট দাখিল করে। মূলত রাজনৈতিক অস্থিরতা-সহ বিভিন্ন কারণে সাত ও আটের দশকে এ ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রগতি হয়নি। এর পর ফের বিষয়টি নিয়ে নড়াচড়া শুরু হয়, বেশ কিছু তাত্ত্বিক ও কার্যগত পরিবর্তন ঘটে। সূচনা হয় আধুনিক জনপ্রশাসন বিষয়ক ধারণার। ডাঃ বীরাপ্পা মইলির নেতৃত্বে গঠিত দ্বিতীয় প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন ২০০৫ সালে রিপোর্ট পেশ করে।

নয়ের দশকের গোড়া থেকে নতুন এক পরিচালন ধারণা জনব্য‌বস্থাপনায় গুরুত্ব পেতে শুরু করে। আমেরিকা সহ বিভিন্ন শিল্পোন্নত দেশে নতুন জনব্য‌বস্থাপনা (এনপিএম) নামে এই ধারণার প্রয়োগ দেখা যায়। বিশ্বায়নের সুবাদে দ্রুত এই ধারণা উন্নয়নশীল দেশগুলিতেও ছড়িয়ে পড়ে। নতুন জনব্য‌বস্থাপনা এমন এক সরকারি ব্য‌বস্থার কথা বলে যা স্বচ্ছ,দায়বদ্ধ, সাধারণ মানুষের প্রয়োজন মেটাতে সদা তৎপর, প্রতিশ্রুতি পালনে সক্রিয় এবং অন্তর্ভুক্তিকরণে বিশ্বাসী