হোম / সমাজ কল্যাণ / মানবাধিকার / সমাজ উন্নয়ন, রাজনীতি ও প্রশাসন
ভাগ করে নিন
ভিউজ্
  • অবস্থা Review in Process

সমাজ উন্নয়ন, রাজনীতি ও প্রশাসন

দেশ ও সমাজের সার্বিক উন্নয়নের সঙ্গে রাজনীতি ও প্রশাসনের যোগ সুনিবিড়। রাজনীতিকরা রাজনীতির ঊর্ধ্বে না উঠলে এবং প্রশাসন স্বচ্ছ, দক্ষ, রাজনীতিমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত না হলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই বিভাগে থাকছে উন্নয়ন-রাজনীতি-প্রশাসন সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে সমাজতাত্ত্বিকদের আলোচনা, ব্যাখ্যা ইত্যাদি।

রাজনীতি ও প্রশাসন : সিভিল সার্ভিসের দায়িত্ব ও কর্তব্য‌

আমলাদের বাকস্বাধীনতা চেয়েছিলেন প্যাটেল

অর্থনৈতিক বিকাশে গতি সঞ্চার এবং দক্ষতার সঙ্গে বিকাশ ও উন্নয়নের সুফল নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া - এই দুটি বিষয় আজ জাতির কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ওই দুটি বিষয় সম্ভব করে তুলতে প্রকৌশল খুঁজে বের করার কাজও অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে। বলা যায় এ কাজে অর্ধেক পথ আমরা ইতিমধ্য‌েই অতিক্রম করে এসেছি। এ দিকে প্রবল জনমত হল সিভিল সার্ভিসে দুর্নীতি ব্য‌াপক ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং উন্নয়নের জন্য‌ বরাদ্দ করা অর্থ গোপনে লুঠ হয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিককালে একটি বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে এমন অভিযোগও আমি শুনেছি যে গরিব মানুষ যেখানে ১৫ পয়সার মতো হাতে পেত, তা আজ কমতে কমতে পাঁচ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। দেশে বর্তমান প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের এক বিরাট কর্মযঞ্জ চলেছে। তাই সরকারের কাছে তাদের আশা প্রত্য‌াশা হল সর্ব্বোচ্চ মানের পরিষেবার।

নীতি প্রনয়নের ক্ষেত্রে পরামর্শ দান এবং রূপায়ণের যে দায়িত্বভার প্রশাসনিক আধিকারিকদের পালন করতে হয় তার ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সিভিল সার্ভিসের কাজকর্ম নানা ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সর্দার বল্লভভাই প্য‌াটেল ১৯৪৯ সালের অক্টোবর মাসে যে মন্তব্য‌ করেছিলেন তা এই প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে— ‘‘দক্ষ সর্বভারতীয় পরিষেবা যদি পেতে হয়, তা হলে এই সার্ভিসে পদাধিকারীদের বাকস্বাধীনতা দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব হবে সচিব, মুখ্য‌সচিব বা অধীনস্থ আধিকারিকদের নির্ভয়ে এবং বিনা অনুগ্রহে তাঁদের মতামত ব্য‌ক্ত করার সুযোগ দেওয়া। কিন্তু কোনও কোনও প্রদেশে এমন একটা প্রবণতা আমি চলতে দেখেছি যেখানে প্রশাসনিক পদাধিকারীদের মুখ বুজে আদেশ পালন করার নির্দেশই দেওয়া হয়। একটি সর্বভারতীয় সার্ভিস যদি না থাকে তা হলে ঐক্য‌ তৈরি হবে না, ঐক্য‌বদ্ধ ভারত আমরা দেখতে পাব না...’’

সর্দার প্য‌াটেল আরও বলেছেন,—‘‘আমার সচিব এখন এমন মতামত দিতে পারেন যা আমার মতের বিরুদ্ধে যায়। আমার সমস্ত সচিবকেই আমি এই স্বাধীনতা দিয়েছি। আমি তাঁদের বলেছি যে মন্ত্রীকে খুশি করতে পারবেন না মনে করে যদি কেউ সৎ ও সঠিক মতামত না দেন, তা হলে বরং তাঁর চাকরি ছেড়ে দেওয়া উচিত। আমি অন্য‌ সচিব খুঁজে আনব। খোলাখুলি মত প্রকাশ করলে আমি কখনও অসন্তুষ্ট হব না।’’

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

সিভিল সার্ভিসের কাজের আকর্ষণ

স্বাধীনতা লাভের সূচনা পর্বের বছরগুলিতে, ১৯৫০ থেকে ১৯৬০-এর প্রথম দিক পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রশাসক এবং সিভিল সার্ভিসের পদাধিকারীদের সম্পর্ক ছিল পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের। সিভিল সার্ভেন্টরা কাজও করতেন স্বাধীন ভাবে, পক্ষপাতহীন ভাবে। পরবর্তীকালে ক্রমশ এই সম্পর্কে চিড় ধরে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষে ভাগ হয়ে যায়। এর ফলে গড়ে ওঠে দুটি ভিন্ন রকমের সম্পর্ক। এক পক্ষ কাজকর্মে অনুশাসনের প্রতি আনুগত্য‌ দেখান। তাঁদের আচার আচরণও ছিল সঠিক ও সোজাসাপটা। অন্য‌ পক্ষ রাজনৈতিক প্রশাসকদের অনুগত হয়ে পড়েন। সিভিল সার্ভিসের আদর্শ, রীতিনীতি, আদবকায়দা, আচার-আচরণ, সব কিছু বিসর্জন দিয়ে রাজনৈতিক শাসক দলের মর্জিমাফিক চলতে শুরু করেন। রাজনৈতিক ক্ষমতা এক দল থেকে অন্য‌ দলের দখলে গেলে এই দ্বিতীয় ধরনের সিভিল সার্ভেন্টরা আবার দু’ ভাগে বিভক্ত হয়ে জান। ফলে এক পক্ষ রাজনৈতিক শাসকদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেন, অন্য পক্ষ শাসকদের কৃপাদৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হন। দ্বিতীয় পক্ষের পদাধিকারীরা কাজকর্ম, বদলি ও চাকরি সংক্রান্ত অন্যান্য বিশয়ে শাসকদের কাছে ন্যায়বিচার পান না।

মজার ব্যাপার হল, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কিন্তু দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। তা হল, শাসনব্যবস্থায় সুনাগরিকদেরও কিন্তু একটি ভূমিকা রয়েছে। সুশাসনের আদর্শ ও রীতিনীতি ভুলে গিয়ে রাজনৈতিক শাসক ও সিভিল সার্ভেন্টরা যখন গা ঘেঁষাঘেঁষি করে চলেন, বিপদ দেখা দেয় তখনই।

সিভিল সার্ভিসের পদাধিকারীদের নানা ধরনের প্রচুর চ্য‌ালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হয় যা এই সার্ভিসের অন্য‌তম আকর্ষণ। এক দিকে নীতি প্রণয়ন, অন্য‌ দিকে বাইরে প্রকৃত কাজের জায়গায় গিয়ে পর্যবেক্ষণ, তদারক ও দেখভালের সুযোগ—সিভিল সার্ভেন্টদের কাজেকর্মে প্রচুর সুযোগ ও সম্ভাবনার মুখোমুখি করে দেয়। দেশের বিকাশ ও অগ্রগতির কাজে তাঁদের ভূমিকা প্রধান ও বড় হয়ে দেখা দেয়। এই ধরনের চ্য‌ালেঞ্জের মোকাবিলা করে সিভিল সার্ভেন্টরা গর্ব অনুভব করতে পারেন এবং কাজ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন। তবে এ সমস্তর জন্য‌ প্রয়োজন বেশ কিছু ভালো গুণ যা তাঁদের রপ্ত করে নিতে হয়।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

সিভিল সার্ভেন্টদের আচরণ

সর্বভারতীয় চাকরিতে নিযুক্ত পদাধিকারীদের একটি বিশেষ দায়িত্ব পালনের ভূমিকা রয়েছে। কারণ, গতানুগতিক কাজ তাঁদের সন্তুষ্টি এনে দিতে পারে না। সিভিল সার্ভিসে কিছু রীতিনীতি ও নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়, যাতে শেষ পর্যন্ত লাভ হয় সিভিল সার্ভেন্টদেরইপ্রথম প্রথম অবশ্য‌ তা মানা খুব কঠিন ও অসুবিধাজনক মনে হতে পারে। মাঝে মাঝে আইনকানুন রীতিনীতি ইত্য‌াদি মেনে চলা ঝুঁকি এড়িয়ে যাওয়া মনোভাব বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু কোনও রকম লাভক্ষতির হিসাব না করে কাজ হাতে নেওয়া প্রয়োজন। কারণ সিভিল সার্ভেন্টদের অনেকেই তাৎক্ষণিক লাভ মনে করে রাজনৈতিক শাসকদের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা রেখে কাজ করেন। শেষ পর্যন্ত কিন্তু যাঁরা রীতিনীতি,আইনকানুন ইত্য‌াদি মেনে কাজ করেন তাঁরাই জয়ী হন এবং সাফল্য‌ের মুখ দেখেন। ভালো কাজের স্বীকৃতিও তাঁদের কপালে জোটে। এই ধরনের পদাধিকারীরা বিভিন্ন গোষ্ঠী, অধঃস্তন কর্মচারী, জনসাধারণ, এমনকী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলেরও সমীহ ও সম্ভ্রম আদায় করতে পারেন।

সিভিল সার্ভিসে কর্মরত আধিকারিকদের পেশাদারি আচরণ মেনে চলতে হয়। তাতে এক দিকে যেমন সুশাসন কায়েম করা যায় অন্য‌ দিকে তেমনই সর্বভারতীয় চাকরির ভাগ্য‌ে সুখ্য‌াতিও জোটে। আর এতে আখেরে লাভ হয় দেশের — হয় প্রগতি ও সমৃদ্ধি। আরও বড় লাভ হল সর্বভারতীয় চাকরিতে সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস আরও দৃঢ় ও মজবুত হয়।

এ বার সিভিল সার্ভিসে কর্মরত পদাধিকারীদের উদ্দেশ্য‌ে আদর্শ আচরণ বিধি সম্পর্কে কিছু আলোচনা করা যাক। কেমন হবে তাঁর আচরণ ---

() ব্য‌ক্তিগত সততা ও বিশ্বাসযোগ্য‌তাকে সর্বোচ্চ মাত্রায় নিয়ে যেতে হবে।

() প্রশাসনিক নীতি, আইন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সৎ ও খোলাখুলি আচরণ দরকার।

() পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বিষয়টি সম্পর্কে জ্ঞান ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

() এক জন দক্ষ ফিল্ড অফিসার হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

() সরকারের কাজকর্ম ও পরিষেবার নিশ্চিত জোগান ও সফল রূপায়ণের দিকগুলি চিহ্নিত করতে হবে।

() সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেরি করা বা কালক্ষেপ করা চলবে না।

() নেতা তথা কাণ্ডারীর ভূমিকা পালন করতে হবে।

() পরিষেবা-বঞ্চিত মানুষদের স্বার্থরক্ষায় সংবেদনশীল হতে হবে।

() নিজের মতামত সুস্পষ্ট ভাবে এবং যুক্তিতর্ক দিয়ে খোলাখুলি জানানো উচিত। (১০) জনসমক্ষে কোনও সরকারি নীতির সমালোচনা করা ঠিক নয়।

আরও কিছু আচরণ মেনে চলা দরকার, যা বিস্তারিত আলোচনায় আনা যাবে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

হতে হবে সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত

এ বার সিভিল সার্ভেন্টদের আচরণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় আসা যাক।

সিভিল সার্ভেন্টদের ব্য‌ক্তিগত সততা ও বিশ্বাসযোগ্য‌তাকে সর্বোচ্চ মাত্রায় নিয়ে যেতে হবে। সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসকের ওপর মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধি পায়, যা সিভিল সার্ভিসের ভিতকে মজবুত করে তোলে। সিভিল সার্ভিসের উঁচু তলার পদাধিকারীদের ক্ষেত্রে এ কথা বিশেষ ভাবে প্রযোজ্য, কারণ তাঁদের থাকতে হবে বদনাম দুর্নামের অনেক ওপরে। তাতে রাজনৈতিক শাসকদের কাছ থেকেও সমীহ আদায় করা যায় যা তাঁদের সঙ্গে স্বাভাবিক কাজকর্মে বিশেষ সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এমনকী কোনও সময় যদি দুর্নীতি ঘটতে দেখা যায়, তখনও এই ধরনের সৎ ও দক্ষ পদাধিকারীরা সমান বা আরও বেশি সম্ভ্রম আদায় করে নিতে পারেন।

প্রশাসনিক নীতি, আইন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সিভিল সার্ভেন্টদের সৎ ও খোলাখুলি আচরণ দরকার। সংশ্লিষ্ট পদাধিকারীর পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি এব নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করা যায় যা পরোক্ষ ভাবে পদাধিকারীদের বেশি করে শক্তি জোগায়। সব সময় ইতিবাচক প্রচেষ্টা থাকা প্রয়োজন। কোনও বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় সংশ্লিষ্ট পদাধিকারীর সততা ও স্বচ্ছতা সাধারণ মানুষও উপলব্ধি করতে পারে। তা থেকে যে বল, সাহস ও শক্তি পাওয়া যায় তা কয়েক ব্য‌াটেলিয়ন আধা সামরিক বাহিনীর সমান।

মানুষ সিভিল সার্ভিসের পদাধিকারীকে সাধারণত সম্ভ্রম করে তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান ও দক্ষতার জন্য‌। তাই সিভিল সার্ভেন্টদের পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বিষয়টি সম্পর্কে জ্ঞান ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট বিষগুলি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত হওয়ার পরই সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর পুরো কাজটাই করতে হবে যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে যাতে তার রূপায়ণ হয় সঠিক ও কার্যকর। গা-ছাড়া ননোভাব নিয়ে কাজ করলে সাধারণ মানুষের কাছে ফাঁকিটা ধরা পড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

বাইরে প্রকৃত কার্যক্ষেত্রে যেখানে অনেকটা সময়ই পদাধিকারীকে কাটাতে হতে পারে, সেখানে সিভিল সার্ভেন্টের বিচক্ষণতা পুরো ব্য‌বস্থায় পরিবর্তন আনতে সাহায্য‌ করে। এক জন দক্ষ ফিল্ড অফিসার হিসাবে তাঁর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এজন্য‌ প্রয়োজনে কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হতে পারে যা হয়তো সকলকে খুশি করতে নাও পারে। গতানুগতিক পথে না হেঁটে অন্য‌ ভাবে চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন যাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্য‌বস্থা নেওয়া যায়।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি থাকবে নিজেরই হাতে

সঠিক কাজ করতে কোনও রকম দ্বিধা থাকা উচিত নয়, বরং সিদ্ধান্তে অবিচল নিষ্ঠা ও সততা থাকা দরকার। কখনও কখনও সিভিল সার্ভেন্টকে এর জন্য কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও পড়তে হতে পারে।

সুশাসনের দাবি নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের মধ্য‌ে পড়ে। সরকারের কাজকর্ম ও পরিষেবার নিশ্চিত জোগান ও সফল রূপায়ণের দিকগুলি চিহ্নিত করতে হবে। এগিয়ে চলার পথে প্রতিবন্ধকতাগুলিকে চিহ্নিত করতে হবে এবং তা দূর করতে সম্ভাব্য‌ পরিবর্তন সম্বন্ধেও পরামর্শ দিতে হবে। কর্মসূচি রূপায়ণের ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী শক্তির প্রয়োগ ঘটিয়ে যাদের নিয়ে কাজ করতে হবে তাদের উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন। সব কিছুই খোলাখুলি আলোচনা করতে হবে এবং কেউ নতুন দিশা দেখালে তাকে স্বাগত জানাতে হবে যদি তা উন্নয়নের সহায়ক হয়। সরকারি পরিষেবা যদি দক্ষতার সঙ্গে দেওয়া যায় তা হলে এক দিকে যেমন যাদের পরিষেবা দেওয়া হচ্ছে তারা খুশি ও সন্তুষ্ট হয়, অন্য‌ দিকে তেমনই আর্থিক সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্য‌বহার, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং দুর্নীতি দমন নিশ্চিত করা যায়।

সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি এড়িয়ে চলা বা অযথা তা বিলম্বিত করা শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে তোলে। তাই কোনও সিভিল সার্ভেন্টেরই সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেরি করা বা কালক্ষেপ করা উচিত নয়। নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে যদি কেউ দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন কিংবা ঝুঁকি ও দায়িত্ব নিতে ভয় পান তাঁর সিভিল সার্ভিসে যোগ দেওয়া উচিত নয়। কারণ সিভিল সার্ভিসে সারা জীবনই নানা ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য‌ সুস্পষ্ট ভাবে নীতি ও নির্দেশ বা সুপারিশ করে যেতে হয়। কোনও কিছু এড়িয়ে গেলে ফল মারাত্মক হতে পারে যা সুশাসনের পক্ষে মোটেই ভালো লক্ষ্মণ নয়।

সিভিল সার্ভিসে কর্মরত পদাধিকারীকে কাজেকর্মে নেতার ভূমিকা অর্থাৎ মূল কাণ্ডারীর ভূমিকা পালন করতে হয়। লক্ষ্য‌মাত্রা পূরণে পুরোপুরি দায়িত্ব পালন করতে হবে এবং নিজের দফতরের ভালো কাজের মাপকাঠি স্থির করতে হবে। কর্তৃত্ব বা ক্ষমতা সহকর্মীদের মধ্য‌ে বণ্টন করে দেওয়া যায় কিন্তু নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি রাখতে হবে নিজেরই কাছে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

নিজের মত খোলাখুলি স্পষ্ট জানান

সহকর্মীদের কথায় কথায় ভুলভ্রান্তি ধরলে বা অধস্তন কর্মীদের এ জন্য‌ গালমন্দ করলে সিভিল সার্ভিসে কর্মরত পদাধিকারীর কোনও উদ্য‌োগই সফল হবে না। নিজের কর্তৃত্ব বা নেতৃত্ব বজায় রেখে, সকলকেই সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে তবেই অধস্তন কর্মী, সহকর্মী, এমনকী সিনিয়ার অফিসারদের কাছেও সমীহ আদায় করা যাবে। নেতৃত্বে সাফল্য‌ের মূলমন্ত্র কিন্তু এটাই।

দরিদ্র (বিশেষ করে যারা প্রান্তিক গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত), মহিলা তফশিলি জাতি ও তফশিলি উপজাতি এবং সংখ্যালঘু মানুষদের স্বার্থরক্ষায় সংবেদনশীল হতে হবে। এ ধরনের মানুষদের বেশি করে প্রয়োজন সিভিল সার্ভিসে কর্মরত পদাধিকারীদের সাহায্য‌ ও সমর্থন। তাদের জন্য‌ ফলপ্রসূ কর্মসূচি রূপায়ণ এবং তাদের কল্য‌াণে সহমর্মিতার মনোভাব সকলের জন্য‌ সমান অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। তাদের জন্য‌ ইতিবাচক পদক্ষেপ সিভিল সার্ভিসে মানুষের আস্থা বাড়িয়ে তোলে।

সাধারণত মনুষের কল্য‌াণে সিভিল সার্ভিসের পদাধিকারীদের সঙ্গে পরামর্শ করেই নীতি নির্ধারণ করেন রাজনৈতিক শাসকেরা। মন্ত্রীদের পরামর্শ দেওয়ার সময় এবং সিনিয়ার অফিসার হিসেবে কাজ করার সময় নীতি নির্ধারণের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে দেখা প্রয়োজন। কোনও নীতি যদি সরকার গ্রহণ করতে চায় বা রূপায়ণ করতে ইচ্ছুক হয় সে ক্ষেত্রে পরীক্ষা করে দেখা দরকার রাজনৈতিক বাধ্য‌বাধকতায় শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক লাভ বা ফলের আশায় তা করা হচ্ছে কিনা বা জাতীয় স্বার্থে তা বেশি দিন সুফল দিতে পারবে কিনা। নিজের মতামত সুস্পষ্ট ভাবে এবং যুক্তিতর্ক দিয়ে খোলাখুলি জানানো উচিত। কোনও নীতি গ্রহণ করলে তার উপযুক্ততা এবং নীতির লক্ষ্য‌ বা উদ্দেশ্য‌ পূরণে তার উপযোগিতা বা প্রয়োজনীয়তা চিন্তা করে সে ব্য‌াপারে সুস্পষ্ট ভাবে এবং যুক্তির সঙ্গে পরামর্শ বা প্রস্তাব দিতে হবে। পরামর্শ দেওয়ার সময় তা মন্ত্রীর মনের মতো হবে কি না সে ব্য‌াপারে দ্বিধাগ্রস্ত হওয়ার কোনও কারণ নেই, নিজের বিচারবুদ্ধি ও বিচক্ষণতায় যে কাজ সঠিক হবে বলে মনে হয় তারই সুপারিশ করা প্রয়োজন। তাতে সহকর্মী থেকে মন্ত্রী সকলেই খুশি হবেন এং সমীহ করে চলবেন।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

তথ্য‌প্রযুক্তির সঙ্গে সড়গড় হন

জনসমক্ষে কখনওই কোনও সরকারি নীতির সমালোচনা করা ঠিক নয়। সিভিল সার্ভিসের পদাধিকারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য‌ হল গৃহীত নীতির সপক্ষে বক্তব্য‌ জানিয়ে ওই নীতির রূপায়ণে সরকারকে সর্বতোভাবে সহায়তা জোগানো। গৃহীত নীতির অযথা সমালোচনা করলে সরকারের অবমাননা তো ঘটেই, সেই সঙ্গে নিজেরও সম্ভ্রম নষ্ট হয়। যদি পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে সরকারি নীতি কোনও ভাবেই মেনে নেওয়া যাচ্ছে না, তা হলে বরং সিভিল সার্ভিসের পদ ছেড়ে অন্য‌ কোনও চাকরির সন্ধান করা উচিত।

সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। আধুনিকতার যুগে এক দিকে যেমন প্রযুক্তিগত বিপ্লব সম্ভব হয়েছে, অন্য‌ দিকে তেমনই বেসরকারি ক্ষেত্রের সম্প্রসারণ এবং নানা ধরনের সংস্থার জন্মও হয়েছে। তাই প্রয়োজনে বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষদের সাহায্য‌ ও সমর্থন পাওয়ার জন্য‌ জনসংযোগ বাড়ানোর কাজে মন দিতে হবে। কার্যক্ষেত্রে কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিতে তা পদাধিকারীকে সাহায্য‌ করবে। কাজকর্মকেও অনেক বেশি উন্নত করে তুলবে।

সুশাসন নিশ্চিত করতে তথ্য‌প্রযুক্তির সঙ্গে সড়গড় হতে হবে। তথ্য‌প্রযুক্তি এবং নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন কাজকর্ম ত্বরান্বিত করে, সরকারি পরিষেবাকে দক্ষ করে তোলে এবং দুর্নীতি দমনে সাহায্য‌ করে। তাই তথ্য‌প্রযুক্তির ব্য‌বহার এবং সম্ভাবনা সম্পর্কে নিজেকে ওয়াকিবহাল রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে প্রশাসনিক পদ্ধতি যত সহজতর হবে, সুশাসন তত বৃদ্ধি পাবে।

নিজের মন্ত্রকের চিন্তাভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি সুষ্পষ্ট ভাবে তুলে ধরার জন্য‌ আগে থেকেই নিজেকে ভালো ভাবে প্রস্তুত রাখতে হবে। নিজের দৃষ্টিকোণ সংক্ষেপে ব্য‌াখ্য‌া করতে হবে এবং আলোচ্য‌ বিষয়কে প্রাধান্য‌ দিতে হবে। বিষয়ের খুঁটিনাটি রাখতে হবে নিজের নখদর্পনে যাতে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে বা আলোচনায় তা সঠিক ভাবে তুলে ধরা যায়।

ধৈর্য ধরে যত্ন সহকারে অন্য‌ের কথা শুনতে হবে এবং নানা ধরনের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। কাজের জায়গা থেকে সমস্য‌ার ভালোমন্দ সম্পর্কে পাওয়া প্রতিবেদন খতিয়ে দেখতে হবে। এটাই হচ্ছে শেখার সব চেয়ে ভালো উপায়।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার দায়িত্ব

সিভিল সার্ভেন্টদের কাজ হল নীতির লক্ষ্য‌ ও উদ্দেশ্য‌ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সব ধরনের মতামতকে সংহত করা। এই কাজ করার সময় সমস্য‌ার কারিগরি, সামাজিক এবং রাজনৈতিক গভীরতা ও মাত্রার মূল্য‌ায়ন করা প্রয়োজন। নীতি নির্ধারণকারী ওপর মহলে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ নানা দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামতের সমন্বয় ঘটাতে হয় সেখানে। কর্মসূচির সফল ও ফলপ্রসূ রূপায়ণ নিশ্চিত করতে কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণে পিছপা হলে চলবে না।

কঠিন বাস্তবতা ও নীতির কথা মাথায় রেখে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করতে হবে। যে যে এলাকায় বা অঞ্চলে প্রস্তাবিত নীতি রূপায়িত হবে, সেখান থেকে এ সম্পর্কিত ভালোমন্দের ব্য‌াপারে প্রতিবেদন সংগ্রহ করে বাস্তবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা দরকার।

নতুন নতুন চ্য‌ালেঞ্জের সম্ভাবনাকে স্বাগত জানাতে হবে। তা এড়িয়ে গেলে চলবে না। এ ধরনের চ্য‌ালেঞ্জ নোওয়ার সময় কঠিন সিদ্ধান্ত যেমন নিতে হতে পারে তেমনই ব্য‌র্থ হওয়ারও ঝুঁকি থেকে যায়। তবে সকলের সঙ্গে মিলেমিশে কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে কাজ করলে কঠিন চ্য‌ালেঞ্জ নেওয়ার মানসিকতা সাফল্য‌ এনে দিতে বাধ্য‌।

কঠিন প্ররোচনা সত্ত্বেও নিজের নীতি ও বিশ্বাসে স্থির, অবিচল থাকতে হবে। মাথা গরম করলে চলবে না। প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলে কায়েমি স্বার্থের কিছু মানুষ ও সংস্থার কাছ থেকে বাধা আসতে পারে। ঠান্ডা মাথায় এবং স্থির বুদ্ধিতে এ সমস্ত কিছুর মোকাবিলা করতে হবে।

সিভিল সার্ভিসের পদাধিকারীকে সরকারের কাছে জবাবদিহি করতে হতে পারে। এ ছাড়াও রয়েছে জনসাধারণের কাছে দায়বদ্ধতা। সরকারি নীতি ও কর্মসূচির ভিত্তিতে কাজ করার সময় লক্ষ দিতে হবে কোনও কোনও এলাকার জন্য‌ তা রূপায়ণ করলে সাফল্য‌ পাওয়া যাবে। জনসাধারণের চাহিদার দিকগুলি চিহ্নিত করে কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে, তা হল রাজনৈতিক শাসকের আপেক্ষিক দায়িত্ব ও শাসনব্য‌বস্থার উন্নয়নে সিভিল সার্ভিসের কর্তব্য‌। সরকারি প্রশাসনকে শক্তিশালী করে তোলা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব বর্তায় সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তাদের উপর।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

চাই ঠান্ডা মাথা, স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি

 

এই প্রসঙ্গে সরকারি পরিষেবা পাওয়ার কাজে যে ভীষণ অসুবিধা ও দুর্নীতির মুখোমুখি হতে হয় জনসাধারণকে এ কথা স্বীকার করে নেওয়া ভালো। দু-চার কথায় তা ব্য‌াখ্য‌া করা যাক—

) প্রশাসনিক এবং সরকারি পরিষেবার ব্য‌বস্থায় দুর্নীতি হয়েছে ব্য‌াপক। তাই দুর্নীতির সম্ভাব্য‌ সমস্ত পথ বন্ধ করে দিতে হবে। সরকারি পরিষেবা ব্য‌বস্থাকে সহজ সরল করে তোলা, তথ্য‌প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগ ও ব্য‌বহার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা তাই বিশেষ ভাবে প্রয়োজন। দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষদের চিহ্নিত করে দ্রুত শাস্তির ব্য‌বস্থা করতে হবে।

) মনে রাখতে হবে ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, সিভিল সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। রাজনৈতিক শাসকদের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের নীতি অনুসরণ করতে হয় সিভিল সার্ভিসকে। আইনগত কিছু বাধ্য‌বাধকতাও রয়েছে এর মধ্য‌ে। তাই এ ব্য‌াপারে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।

) সিভিল সার্ভিসের পদাধিকারীদের নীতি প্রণয়নের সময় তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামতকে সুষ্পষ্ট ভাবে জানতে হবে। দেখতে হবে তা জনস্বার্থের পরিপন্থী কিনা।

) পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ে যখন মন্ত্রক এবং কিছু কিছু সিভিল সার্ভিস পদাধিকারী অধস্তনদের উপর আইনবিরুদ্ধ কোনও আদেশ চাপিয়ে দেন এবং তা মানতে বাধ্য‌ করেন। আর্থিক লাভ বা দুর্নীতির জন্য‌ হয়তে তা করা হয়। এ ছাড়াও রয়েছে মাফিয়ার সমস্য‌া। এই সমস্ত পরিস্থিতি ও সমস্য‌ার সামাল দিতে হবে খুব ঠান্ডা মাথায়, দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বচ্ছ রেখে। প্রথমত, যে সমস্ত আদেশ অবৈধ বা যা আইনানুগত পদক্ষেপ নিতে বাধা সৃষ্টি করে তা উপেক্ষা করা উচিত। দ্বিতীয়ত, কোনও প্রশাসনিক আদেশ অন্য‌ায্য‌ বলে মনে হলে যুক্তিসহ তার প্রতিবাদ করতে হবে। তাতে কেরিয়ারে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বটে। কিন্তু সতীর্থ ও সহকর্মীদের সম্মান অর্জন করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে সহকর্মী এবং উচ্চপদস্থ কর্তারাই আপনার পাশে এসে দাঁড়াবেন। সাফল্য‌ এমনি এমনি পাওয়া যায় না। মিথ্য‌াচার অসাম্য‌ ও অন্য‌ায়ের ওপর ভিত্তি করে সাফল্য‌ অর্জন করা সম্ভব নয়।

রাজনৈতিক শাসক আইনসভার কাছে দায়বদ্ধ। তাদের চিন্তা করতে হবে শাসনব্য‌বস্থাকে কী ভাবে শক্তিশালী করে তোলা যেতে পারে সে সম্পর্কে। ছ’দশকেরও আগে সর্দার প্য‌াটেল নির্দেশিত পথে সারা দেশে এ সম্পর্কে আলোচনার আবহ তৈরি করে কাজের জগতে নামার প্রস্তুতি নিতে হবে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

সংস্কারের নানা ব্যাখ্যা

সাধারণ ভাবে সংস্কার শব্দটির অর্থ হল বর্তমান অবস্থা থেকে উন্নততর অবস্থানে উত্তরণ অথবা বর্তমান অবস্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ত্রুটি, বিচ্য‌ুতি এবং অন্তরায়গুলিকে মুক্তি ঘটিয়ে পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করা।

জনপ্রশাসনের ক্ষেত্রে এই সংস্কার শব্দটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে আসছে সুপ্রাচীন সময় থেকেই। কারণ সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গেই যুক্ত হয়ে আছে তার পরিবর্তিত চাহিদার সম্পর্ক, আর এই পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি বজায় রাখা এবং সেই ভাবে নিজস্ব আঙ্গিকের পরিবর্তন জনপ্রশাসনের ইতিহাসে বিশেষ ভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে আছে।

জনপ্রশাসনের প্রেক্ষাপটে এই সংস্কার প্রক্রিয়াকে ব্য‌াখ্য‌া করা হয়েছে নানা ভাবে এবং নানা প্রেক্ষিতে, যেমন প্রশাসনিক পরিবর্তন, প্রশাসনিক রূপান্তর, প্রশাসনিক পুনর্গঠন, প্রশাসনিক পুনর্নবীকরণ ইত্য‌াদি। যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এই প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্দেশ্য‌ হল প্রশাসনিক ব্য‌বস্থাকে পরিবর্তিত সময়, পরিস্থিতি এবং অন্তরায়গুলির সঙ্গে মানিয়ে চলার উপযোগী করে তোলা। এই সংস্কারের প্রক্রিয়া হল সুচিন্তিত, সুপরিকল্পিত এবং সুনির্দিষ্ট, যাতে এই প্রক্রিয়া প্রথাগত অন্তরায়গুলির মোকাবিলা করেই তার পথকে এবং অভীষ্টকে সুনিশ্চিত করতে সক্ষম হয়।

আধুনিক সমাজ ব্য‌বস্থার একটি অন্য‌তম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল ক্রমাগত এবং পদ্ধতিগত রূপান্তরের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা ও দক্ষতা অর্জন। ঐতিহ্য‌ের ঐতিহাসিক মূল্যের পাশাপাশি কিছু কিছু প্রতিবন্ধকতাও আছে। সেই সব প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য‌ই সমাজে পরিবর্তন প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। ফলে সমাজকেও পরিবেশ, সংস্কৃতি, মেধা ও প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তিত হতে হয় এবং প্রাচীন প্রথা ও পরিকাঠামোগুলির পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন পথের অনুগামী হওয়ার প্রাসঙ্গিকতা অনুভব করতে হয়।

প্রশাসনিক সংস্কারও এই সার্বিক পরিবর্তনেরই একটি অঙ্গ। কারণ প্রশাসন সার্বিক সমাজেরই উপ-সংস্কৃতি কিংবা উপ-সমাজব্য‌বস্থার অংশ ছাড়া অন্য‌ কিছু নয় এবং বৃহত্তর সামাজিক মূল্য‌বোধের প্রতিফলন ঘটানোই তার মূল লক্ষ্য‌। অন্য‌থায় প্রশাসনিক স্থিতাবস্থাই সমাজের বিভিন্ন ভারসাম্য‌হীনতা এবং বিচ্য‌ুতির অন্য‌তম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

প্রশাসনের সব চেয়ে বড় সহায়ক শক্তি

যে হেতু জন প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই সক্রিয় হতে হয়, তার ফলে মূল চরিত্র, কাঠামো এবং কাজ করার পদ্ধতি রাজনৈতিক পরিবেশের দ্বারা বিশেষ ভাবে প্রভাবিত হয়। এ ছাড়াও তার প্রাতিষ্ঠানিক গতিশীলতা ও প্রক্রিয়া নিছক জাতীয় লক্ষ্য‌, উদ্দেশ্য‌ ও অগ্রাধিকার নির্ণয়ের মধ্য‌ে সীমাবদ্ধ নয়। তার অন্য‌তম প্রধান দায়িত্ব নীতি ও সিদ্ধান্তগুলির কার্যকর রূপায়ণ। একই সঙ্গে তথ্য‌ ও প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি, জাতীয় সম্পদের ব্য‌বস্থাপনায় রাষ্টের কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ, সুষম ও যথাযথ অর্থনৈতিক ব্য‌বস্থা কায়েম, দীর্ঘ সময়ের সামাজিক বৈষম্য‌ের অবসান ঘটিয়ে নতুন প্রতিষ্ঠানের সন্ধান করা, জনপ্রশাসনের কাছে এক নতুন দায়িত্বের বার্তা বহন করে এনেছে। এর জন্য‌ প্রয়োজন প্রাসনিক দক্ষতার পরিকাঠামোগত রূপান্তর এবং যার জন্য‌ চাই যথাযথ পরিকল্পনা, দক্ষতা বৃদ্ধি, দৃষ্টিভঙ্গির রূপান্তর এবং একগুচ্ছ গঠনগত পুর্গঠন। প্রশাসনিক সংস্কারের এই প্রেক্ষাপট তাই বিভিন্ন বিষয়ের এবং বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির এক সমন্বিত প্রয়াসের প্রেক্ষাপট।

অন্য‌ দিকে নব্বইয়ের দশকের বাজার সংস্কারের ধারণার হাত ধরেই সারা বিশ্বের, বিশেষত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির সামনে এসেছে সুশাসনের ধারণা যার মূল লক্ষ্য‌ হল দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা, দক্ষতা,কার্যকারিতা এবং বিকেন্দ্রীকরণ। ফলে সুশাসনতত্ত্বের প্রেক্ষাপটেই বর্তমান রাষ্ট্র, সরকার এবং আমলাতন্ত্রের প্রথাগত পরিবর্তনেরও দাবি উঠে এসেছে। তাই আজকের রাষ্ট্র ব্য‌বস্থার কাছে সংবেদনশীলতার চেয়েও বড় প্রশ্ন হল অংশীদারিত্ব এবং সমন্বয় সাধনের দায়িত্ব গ্রহণ। এর ফলে সব চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রশাসনিক ব্য‌বস্থায় মানুষের অংশগ্রহণ এবং একাধিক ভূমিকা পালনকারী সমন্বয় সাধনের উপর। এই অংশগ্রহণ এবং সমন্বয় সাধনের কেন্দ্রবিন্দুতে, সরকারের ভূমিকা হল জনসাধারণের তথা নাগরিকবৃন্দের অংশীদার হিসাবে। প্রথাগত সংগঠকের ভূমিকায় থেকে প্রশাসনের পক্ষে এই দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়। জনগণের আস্থা, বিশ্বাস এবং বন্ধুতাই সরকারের তথা প্রশাসনের সব চেয়ে বড় সহায়ক শক্তি হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর ফলে আমলাতন্ত্রের কাছেও নতুন ভূমিকায় নিজেকে উপস্থাপিত করার প্রত্য‌াশা থেকে যাচ্ছে। এই প্রত্য‌াশার অন্য‌ নাম প্রশাসনিক সংস্কার।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

৪৭-এর গিরিজাশঙ্কর বাজপেয়ী কমিটি (সাব হেডিং)

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট মধ্য‌ রাতে ভারত যখন স্বাধীনতা লাভ করেছিল তখন অন্য‌ান্য‌ সমস্য‌ার সঙ্গে তার সঙ্গী হয়েছিল দেশভাগ, শরণার্থীর আগমন, দেশীয় রাজ্য‌গুলির সমন্বয় সাধন এবং এক বিশাল সংখ্য‌ক আমলার হয় অবসর গ্রহণ না হয় ভারতের অন্য‌ ভাগে স্থানান্তর। স্বাধীন ভারতের প্রথম সরকার আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য‌ দিয়ে এক কল্য‌াণকামী রাষ্ট্র ব্য‌বস্থা গ্রহণ করেছিলেন। সদ্য‌োজাত সেই শিশুর কাছে বহুধা বিভক্ত এই রাষ্ট্র ব্য‌বস্থার সমন্বয় সাধনের মধ্য‌ দিয়ে সামনের পথে এগিয়ে যাওয়ার ছিল এক কঠিন চ্য‌ালেঞ্জের মোকাবিলা। উপনিবেশ শাসনের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত প্রশাসনিক যন্ত্রকে স্বাধীন ভারতের উন্নয়ন ভাবনায় রূপান্তরের প্রশ্নে তাই প্রথামিক ভাবে সময়োপযোগী নবীকরণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। এই নবীকরণ বা সংস্কারেরর কেন্দ্রে ছিল স্বাধীন দেশের রাষ্ট্র পরিচালনার গঠনতন্ত্র নির্মাণ এবং দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য‌ এবং উদ্দেশ্য‌ নির্ধারণের জন্য‌ পরিকল্পনা কমিশন গঠন। সেই সঙ্গে লক্ষ্য‌ ছিল এক দৃঢ় ও কঠিন আমলাতন্ত্রের ভিত্তি নির্মাণ, দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে যাঁদের দায়িত্ব হবে দেশ পরিচালনা, বৈদেশিক নীতি নির্ধারণ-সহ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য‌মাত্রা নির্ধারণে সহায়তা করা এবং গৃহীত নীতি রূপায়ণ করা।

এই প্রেক্ষাপটে স্বাধীন ভারতে, বিশেষত নেহরু যুগের সূচনা পর্বে, প্রথম যে পদক্ষেপটি সংস্কারের প্রশ্নে গৃহীত হয়েছিল তা হল ১৯৪৭ সালেই গিরিজাশঙ্কর বাজপেয়ীর নেতৃত্বে সচিবালয় পুনর্গঠন কমিটি গঠন। এই কমিটির প্রধান দায়িত্ব ছিল কর্মীবর্গের ঘটাতি সম্পর্কে অনুসন্ধান, সম্ভাব্য‌ কর্মীবর্গের পূর্ণ সদ্ব্য‌বহার এবং কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের কর্মপদ্ধতির উন্নয়ন বিষয়ে সুপারিশ। এই কমিটি ভারত সরকারকে নতুন কর্মীবর্গ নিয়োগের আগে কোনও নতুন কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করে। একই সঙ্গে এই কমিটি বিভিন্ন ধরনের আধিকারিকের মাধ্য‌মে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার চলতি পদ্ধতির ক্ষেত্রেও পরিবর্তন সুপারিশ করে। এই সুপারিশ অনুযায়ী ভারত সরকার পরবর্তী কালে কাজ শুরু করে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

গোপালস্বামী আয়েঙ্গার কমিটি (সাব হেডিং)

১৯৫০ সালে গঠিত হয় গোপালস্বামী আয়েঙ্গার কমিটি। গোপালস্বামী আয়েঙ্গারের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটি কেন্দ্রীয় সরকারের কর্ম পদ্ধতির উপর একটি বিস্তারিত সমীক্ষা সংগঠিত করে। এই কমিটি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিমণ্ডলীকে চারটি ব্য‌ুরোয় বিভক্ত করার সুপারিশ করে। এই চারটি বিভাগ ছিল কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদ, শিল্প ও বাণিজ্য‌, পরিবহন ও যোগাযোগ এবং শ্রম ও সামাজিক পরিষেবা। এ ছাড়া এই কমিটির সুপারিশ ছিল কেন্দ্রীয় সচিবালয়কে মোট ৩৭টি প্রাথমিক এককে বিভক্ত করা যার মধ্য‌ে থাকবে ২৮টি দফতর এবং ৮টি কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক দফতর এবং ক্য‌াবিনেট সচিবালয়। একই সঙ্গে সরকারি আধিকারিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশ্নে এই কমিটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অধীনে ‘সংগঠন ও পদ্ধতি’ নামে একটি বিভাগ সৃষ্টিরও সুপারিশ করে। যদিও আয়েঙ্গার কমিটির অধিকাংশ সুপারিশই গৃহীত হয়নি, কিন্তু সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই কেন্দ্রীয় সরকার ১৯৫০ সালের মে মাসে প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, আইন ও পরিষদীয় এবং প্রশাসনিক সংগঠন কমিটি গঠন করে।

পরিকল্পনা কমিশনের কমিটি

১৯৫০ সালের মার্চ মাসে পরিকল্পনা কমিশন গঠিত হল। পরিকল্পনা কমিশনের উদ্য‌োগে এ ডি গোড়োওয়ালার নেতৃত্বে পুনরায় একটি কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটি প্রশাসনিক সংস্কার সংক্রান্ত দুটি প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রথম প্রতিবেদনটির বিষয় ছিল জন প্রশাসন সংক্রান্ত এবং দ্বিতীয় প্রতিবেদনটির বিষয় ছিল রাষ্ট্রীয় উদ্য‌োগের দক্ষ ও কার্যকর প্রয়োগ সংক্রান্ত। এই কমিটির উল্লেখযোগ্য‌ সুপারিশগুলির মধ্য‌ে ছিল ‘সংগঠন ও পদ্ধতি’ সংক্রান্ত বিভাগ সৃষ্টি এবং প্রশিক্ষণের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ। সরকার গোড়োওয়ালা কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ‘সংগঠন ও পদ্ধতি’ সংক্রান্ত বিভাগ সৃষ্টি করে।

গোপালস্বামী কমিটি

সরকারের প্রশাসন যন্ত্রের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশ্নে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে আর এ গোপালস্বামীর নেতৃত্বে আরও একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি ছিল এক সদস্য‌ বিশিষ্ট। এই কমিটি কী কী সুপারিশ করেছিল সে সব সম্পর্কে বিস্তারিত ভাবে কিছু জানা যায়নি। তবে সরকারি স্তরে সুপারিশগুলি নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে নানা আলোচনা হয়েছিল।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

অ্য‌াপলবিকে আমন্ত্রণ

নেহরু যুগে প্রশাসনিক সংস্কারের প্রশ্নে সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য‌ পদক্ষেপ হল জনপ্রশাসনের মার্কিন বিশেষজ্ঞ পল এইচ অ্য‌াপলবির দুটি প্রতিবেদন। ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ভারতীয় প্রশাসনিক ব্য‌বস্থার কার্যকর সংস্কারের প্রশ্নে এই বিশেষজ্ঞকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। অ্য‌াপলবি তাঁর প্রথম প্রতিবেদনটি দাখিল করেন ১৯৫৩ সালে যার মুখ্য‌ প্রতিপাদ্য‌ ছিল ভারতীয় জনপ্রশাসন সমীক্ষা। তিনি দ্বিতীয় প্রতিবেদনটি দাখিল করেন ১৯৫৬ সালে যার মূল বিষয় ছিল সরকারি উদ্য‌োগে প্রতিষ্ঠিত শিল্প ও বাণিজ্য‌িক উদ্য‌োগগুলির সংগঠন, কর্মপদ্ধতি, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ ইত্য‌াদি বিষয়ে সুপারিশ। অ্য‌াপলবির মোট ১২টি সুপারিশের মধ্য‌ে সরকারের পক্ষ থেকে ২টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ গ্রহণ করা হয়। প্রথমটি হল ইন্ডিয়ান ইনিস্টিটিউট অফ পাবলিক অ্য‌াডিমিনিস্ট্রেশন নামে একটি আধা সরকারি বৃত্তিগত প্রশিক্ষণ ও গবেষণা সংস্থা প্রতিষ্ঠা। ১৯৫৪ সালে ক্য‌াবিনেট সচিবালয়ে ‘সংগঠন ও পদ্ধতি’ নামের একটি কেন্দ্রীয় বিভাগ তৈরি করা হয়, যার শাখা বিস্তৃত হয় প্রতিটি মন্ত্রক ও বিভাগে। প্রধান লক্ষ্য‌ ছিল সরকারি নথিপত্র আদান প্রদানের গুণগত মান বৃদ্ধি করা। এরই ফলশ্রুতি হিসাবে প্রতিটি মন্ত্রক এবং বিভাগের জন্য‌ দফতর পরিচালনার ম্য‌ানুয়ালও তৈরি হয় ওই সময়ে।

আরও দুটি পদক্ষেপ

নেহরু যুগের অপর দুটি উল্লেখযোগ্য‌ সংস্কার কমিটি হল ১৯৫৬ সালের প্ল্যান প্রজেক্ট বিষয়ক কমিটি এবং ১৯৬২ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ বিষয়ক কমিটি। পরিকল্পনা কমিশনের উদ্য‌োগে গঠিত ১৯৫৬ সালের এই কমিটির দায়িত্ব ছিল পরিকল্পিত কর্মসূচিগুলির প্রকৌশল, কর্মপদ্ধতি এবং প্রায়োগিক দিকগুলি খতিয়ে দেখা যাতে কর্মসূচিগুলি অর্থনৈতিক ভাবে ফলপ্রসূ হয় এবং কার্যকর হয়। এই কমিটির সুপারিশেই ১৯৬৪ সালে একটি উন্নয়ন ও ব্য‌বস্থাপনা প্রশাসন বিভাগ তৈরি হয় যার উদ্দেশ্য‌ ছিল আধুনিক ব্য‌বস্থাপনার পদ্ধতিসমূহ প্রয়োগের পথ সুগম করা। এই প্রতিষ্ঠান ক্রমশ জেলা স্তরের উন্নয়ন প্রশাসনের অন্তরায়গুলিও খতিয়ে দেখতে শুরু করে।

সান্তানম কমিটি

অন্য‌ দিকে ১৯৬২ সালে কে সান্তানমের নেতৃত্বে গঠিত দুর্নীতি প্রতিরোধ বিষয়ক কমিটি প্রশাসনিক স্তরে দুর্নীতির ক্ষেত্রগুলিকে খতিয়ে দেখে কেন্দ্রীয় স্তরে একটি কেন্দ্রীয় ভিজিল্যান্স কমিশন গঠনের সুপারিশ করে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

প্রথম প্রশানিক সংস্কার কমিশন

১৯৬৪ সালের মাঝামাঝি জওহরলাল নেহরু মৃত্যু হয়। নেহরু যুগের অবসানের আগেই ভারতে গঠনতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, পরিকল্পনা কমিশন গঠন এবং প্রায় দুই দশকের নেহরু মন্ত্রিসভার কার্যকারিতা ভারতীয় প্রশাসনিক ব্য‌বস্থায় গণতন্ত্রের ভিত্তিকে শুধু সুদৃঢ়ই করেনি, সার্বিক প্রশাসনিক ব্য‌বস্থাকে জনমুখী করার একাধিক প্রয়াস গৃহীত হয়েছে এই সময়কালে। এই প্রেক্ষাপটেই ১৯৬৬ সালের জানুয়ারি মাসে লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মন্ত্রিসভা মোরারজি দেশাইয়ের নেতৃত্বে ছয় সদস্য‌ বিশিষ্ট দেশের প্রথম প্রশাসনিক সংস্কার কমিটি গঠন করে। কিন্তু লালবাহাদুর শাস্ত্রীর প্রয়াণের পর ১৯৬৭ সালের মার্চ মাসে ইন্দিরা গান্ধী মন্ত্রিসভায় মোরারজি দেশাই উপপ্রধানমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী হিসাবে যোগদান করার কারণে কমিশন অপর সদস্য‌ কে হনুমন্থাইয়াকে এই কমিশনের নতুন সভাপতি নিয়োগ করা হয়।

হনুমন্থাইয়া কমিশনের কার্যকাল ছিল দীর্ঘ প্রায় চার বছর। নিয়োগের সূত্র অনুযায়ী এই কমিশন কেন্দ্র এবং রাজ্য‌ স্তরের জন প্রশাসনের প্রায় সমস্ত বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করে এবং মোট ২০টি প্রতিবেদনের মধ্য‌ে দিয়ে ৫০০টি সুপারিশ করে এই চার বছরের কার্যকালে। এই কমিশনের প্রতিবেদনগুলি ভারতীয় জন প্রশাসনকে শুধু সমৃদ্ধই করেনি, প্রশাসনিক পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার ভবিষ্য‌ৎ পথগুলিকেই মসৃণ করেছে।

প্রথম সংস্কার কমিশনের প্রধান সুপারিশগুলির মধ্য‌ে উল্লেখযোগ্য‌ ছিল প্রশাসনিক সংস্কার বিভাগের দায়িত্বগুলির পুনর্মূল্য‌ায়ন করা। কমিশনের সুপারিশ ছিল প্রশাসনিক সংস্কার বিষয়ে নিয়মিত সমীক্ষা ও গবেষণা অব্য‌াহত রাখা, বিভিন্ন মন্ত্রক ও বিভাগগুলিতে সংগঠন ও পদ্ধতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা এবং কর্মীবর্গের আধুনিক বাবস্থাপনার পদ্ধতি অনুযায়ী নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্য‌বস্থা করা।

বিশেষ সেল গঠনের প্রস্তাব

এ ছাড়াও এই কমিশন তাদের সুপারিশগুলি কার্যকর করার জন্য‌ একটি বিশেষ সেল গঠনের প্রস্তাব দেয়। একই সঙ্গে কমিশন সুপারিশ করে যে কেন্দ্রীয় সংস্কার বিষয়ক সংস্থা যেন কর্মপদ্ধতি, কর্মীবর্গ এবং সংগঠন সংক্রান্ত বিষয়ে গবেষণা নির্ভর হয়। কেন্দ্র এবং রাজ্য‌ ছাড়াও জেলা স্তরের প্রসাসনিক ব্য‌বস্থা সম্পর্কেও কমিশনের সুপারিশ ছিল আধুনিক ব্য‌বস্থাপনার প্রতিটি দিককে আত্মস্থ করা এবং তাকে প্রয়োগ করা।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

আরও কমিটি, আরও কমিশন

যে বিষয়গুলি হনুমন্থাইয়া কমিশনের প্রতিবেদনের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল সেগুলি হল ভারত সরকারের বিভিন্ন প্রশাসন যন্ত্রের পদ্ধতি ও প্রকরণ, কর্মীবর্গের প্রশাসন, নাগরিকদের ক্ষোভ বিক্ষোভের প্রশমন, কেন্দ্র-রাজ্য‌ সম্পর্ক, রাজ্য‌ প্রশাসন, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির প্রশাসন, পরিকল্পনা, অর্থনৈতিক প্রশাসন, আর্থিক ও নিরীক্ষা প্রশাসন, আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, রেল ব্য‌বস্থা, ডাক ও তার বিভাগের প্রশাসন ইত্য‌াদি।

প্রথম প্রশাসনিক সংস্কার কমিশনের পরবর্তী সময়ে বিগত শতকে যে সব গুরুত্বপূর্ণ কমিটি গঠন করা হয়েছিল তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য‌ হল ১৯৭৬ সালে ডি এস কোঠারির নেতৃত্বে গঠিত সরকারি পদে নির্বাচন ও নিয়োগ সংক্রান্ত কমিটি। প্রধানত সর্বভারতীয় কৃত্য‌কের নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার বিষয়ে সুপারিশ করাই ছিল এই কমিটির প্রধান দায়িত্ব। কমিটি তার প্রতিবেদনে সমস্ত অকারিগরি পদের নির্বাচনের ক্ষেত্রে সর্বভারতীয় কৃত্য‌কের জন্য‌ একটিই পরীক্ষার সুপারিশ করে।

পুলিশ কমিশন

ধরম বীরার নেতৃত্বে ১৯৭৭ সালে গঠিত ভারতীয় পুলিশ কমিশন। পুলিশি ব্য‌বস্থার সংস্কারের প্রশ্নে এই কমিশন গড়া আর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই কমিশন পুলিশের দায়িত্ব, কর্তব্য‌, তদন্তের ধরন, ম্য‌াজিস্ট্রেটের তত্ত্বাবধান, অপরাধ সংক্রান্ত নথিপত্রের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ইত্য‌াদি বিভিন্ন বিষয়ে মোট ৫০০টি সুপারিশ করে।

১৯৮১ সালে এল কে ঝার নেতৃত্বে গঠিত হয় অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন। এই সংস্কার কমিশন দেশের পরিবর্তিত অথর্নীতির সঙ্গে সমন্বয় সাধনের প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই কমিশন সরকারের কাছে দাখিল করা প্রতিবেদনে দেশের অর্থনৈতিক প্রশাসনকে আধুনিক এবং যুক্তিশীল হওয়ার পক্ষে সুপারিশ করে।

সারকারিয়া কমিশন

পরবর্তী কালে গঠিত হল সারকারিয়া কমিশন। আর এস সারকারিয়ার নেতৃত্বে গঠিত কেন্দ্র-রাজ্য‌ সম্পর্কের পুনর্বিন্য‌াস বিষয়ক এই কমিশন ছিল অত্য‌ন্ত সময়োপযোগী। এই কমিটির দায়িত্ব ছিল কেন্দ্র ও রাজ্য‌ের আর্থিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব ও ক্ষমতাগুলি পুনর্বিবেচনা করা এবং সময়োপযোগী চাহিদার নিরিখে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা। সারকারিয়া কমিশনের সমস্ত সুপারিশ সরকার মেনে না নিলেও এই প্রতিবেদন কেন্দ্র ও রাজ্য‌ স্তরে একাধিক আলোচনার উদ্রেক করেছিল। সৃষ্টি করেছিল ব্যাপক আলোড়ন।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

‘বাজারের’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

১৯৮০-র দশক থেকে পশ্চিম দুনিয়ায় জন প্রশাসন ‘নয়া উদারবাদের’ তত্ত্বের দ্বারা বিশেষ ভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। যার মূল প্রবণতা হল সমাজ ও অর্থনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসাবে রাষ্ট্রের পরিবর্তে ‘বাজারের’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার প্রতি আস্থা। রাষ্ট্রের পুনর্ভাবনা সংক্রান্ত বিষয়ে ১৯৯০-এর দশকের সূচনায় বিশ্ব ব্য‌াঙ্কের ভাবনা ছিল সমাজ ও অর্থনীতিতে অত্য‌ধিক সরকারি নিয়ন্ত্রণ সম্পদের ত্রুটিপূর্ণ বণ্টন এবং কায়েমি স্বার্থ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে দুর্নীতি সর্ব স্তরে ব্য‌াপ্ত হয়েছে। এর থেকে পরিত্রাণ খোঁজা হয়েছে অবনিয়ন্ত্রণ এবং বেসরকারিকরণের মধ্য‌ে এবং যথার্থ জায়গায় বাজারের শক্তিকে উৎসাহিত করে। এই ভাবনার সহায়ক হিসাবে আরও যে বিষয়গুলি সামনে এসেছিল সেই সময়ে তা হল, প্রশাসনিক কাজকর্মে তথ্য‌ের অধিকার, তথ্য‌ প্রযুক্তির ব্য‌বহারকে উৎসাহিত করা এবং সরকারের বিকেন্দ্রীকরণ।

এই প্রেক্ষাপটে ১৯৯৬ সালের মে মাসে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ও রাজ্য‌গুলির মুখ্য‌সচিবদের যে সম্মেলন হয়েছিল তার মূল প্রতিপাদ্য‌ ছিল দায়বদ্ধ, মুক্ত ও স্বচ্ছ এবং নাগরিক-বান্ধব শাসন ব্য‌বস্থা এবং সরকারি কাজকর্মের গুণগত দিকগুলি উন্নত করা। এর ফলশ্রুতি হিসাবে এইচ ডি গৌরীর নেতৃত্বে স্বচ্ছতা ও তথ্য‌ের অধিকার সংক্রান্ত একটি কমিটি গঠন করা হয়। একই সঙ্গে সরকারি কাজকর্মে কম্পিউটারের প্রয়োগ ত্বরান্বিত করার জন্য‌ এন ভিত্তল-এর নেতৃত্বে অপর একটি কমিটি তৈরি হয়। অন্য‌ দিকে সমস্ত মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নাগরিক সম্পদ তৈরি করার উদ্য‌োগ নেওয়া হয়, সমস্ত বিভাগের পক্ষ থেকে বিভাগীয় তদন্ত ও ভিজিল্যান্স সংক্রান্ত তদন্তগুলি দ্রুত নিষ্পত্তি সহ বিভিন্ন ক্ষোভ ও অভিযোগের নিষ্পত্তির বিভাগীয় যন্ত্রগুলি উন্নত করার উদ্য‌োগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে কেন্দ্র ও রাজ্য‌ের সঙ্গে যুক্ত আধিকারিকদের পদোন্নতি ও বদলির প্রশ্নে প্রশাসন কৃত্য‌কের দ্রুত সংস্কারেরও উদ্য‌োগ নেওয়া হয়। মুখ্য‌সচিবদের সম্মেলনে আলোচিত মূল তিনটি বিষয় — দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা এবং সংবেদনশীলতা নিয়ে জাতীয় স্তরে বিতর্কের সূচনা হয় এবং ক্রমশ বিস্তৃততর জনমত আহ্বান করা হয়। বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ, অধ্য‌াপক ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার মতামতের ভিত্তিতে জাতীয় স্তরে একটি কর্ম পরিকল্পনা গৃহীত হয়।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

৭৭-এর মুখ্য‌মন্ত্রীদের সম্মেলন

মুখ্য‌সচিব সম্মেলনে গৃহীত কর্মপরিকল্পনার মূল বিষয় ছিল তিনটি — ক) সরকারকে দায়বদ্ধ এবং নাগরিক বান্ধব করে তোলা, () স্বচ্ছতা এবং তথ্য‌ের অধিকার এবং () লোকসেবার সততা এবং কর্মদক্ষতার বিকাশ ঘটানো। এই কর্মপরিকল্পনা পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালের মে মাসে মুখ্য‌মন্ত্রীদের একটি সম্মেলনে বিস্তারিত আলোচনা সহ গৃহীত হয়।

এই কর্মপরিকল্পনার পরিপ্রেক্ষিতে যে পদক্ষেপগুলি পরবর্তী কালে গৃহীত হয়েছিল তার মধ্য‌ে উল্লেখযোগ্য‌ হল—

() সরকারের প্রতিটি মন্ত্রকের পক্ষ থেকে নাগরিকদের কী ধরনের পরিষেবা কোন সময়ের মধ্য‌ে দেওয়া হবে তার বিস্তারিত বিবরণ সহ নাগরিক সনদ প্রকাশের উদ্য‌োগ গ্রহণ করা;

() জনসাধারণের অভিযোগগুলির দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পত্তির জন্য‌ প্রতিটি মন্ত্রক এবং রাজ্য‌ সরকারের প্রতিটি বিভাগের তৃণমূল স্তর পর্যন্ত জনঅভিযোগ আধিকারিক নিয়োগের উদ্য‌োগ গ্রহণ করা;

() সরকারের চলতি আইনগুলির সংস্কার করার বিষয়ে পি সি জৈনের সভাপতিত্বে কমিটি গঠন করা;

() সংবিধানের ৭৩ এবং ৭৪ তম সংশোধনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পঞ্চায়েত ও পৌর প্রশাসন সহ প্রশাসনের অন্য‌ান্য‌ স্তরে জনসাধারণের অংশগ্রহণ যাতে বাড়ে তার জন্য উদ্য‌োগ গ্রহণ করা; এবং

() ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করা।

এবং আরও পরে আরও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় --- বর্তমান শতকের সূচনা পর্বে ইংরাজ আমলের ১৯২৩ সালের সরকারি নথির গোপনীয়তা আইনের বিলোপ ঘটিয়ে প্রথমে ২০০৩ সালের তথ্য‌ের স্বাধীনতা আইন এবং পরে ২০০৫ সালের তথ্য‌ের স্বাধীনতা আইনের অধিকার বলবৎ করা হয়।

বিগত শতকের শেষ দিকে বাজার অর্থনীতির হাত ধরেই আন্তজার্তিক প্রেক্ষাপটে জন প্রশাসন পরিচালনায় যে তত্ত্বটির আবির্ভাব ঘটেছিল তার নাম সুশাসন। এর মূল লক্ষ্য‌ হল অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সামাজিক পুঁজি-নির্ভর, স্বচ্ছ, দায়বদ্ধ, সংবেদনশীল এবং অংশগ্রহণমূলক এক শাসনব্য‌বস্থা কায়েম করা। এই লক্ষ্য‌েই ২০০৫ সালে বীরাপ্পা মইলির নেতৃত্বে দ্বিতীয় প্রশাসনিক সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি মোট ১১টি প্রতিবেদন দাখিল করে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

প্রতিবন্ধকতার মোকাবিলা

২০০৫ সালে গঠিত বীরাপ্পা মইলির নেতৃত্বে দ্বিতীয় প্রশাসনিক সংস্কার কমিটি যে ১১টি প্রতিবেদন দাখিল করে তার মূল বিষয়গুলি ছিল সুশাসনের ভিত্তি হিসাবে তথ্য‌ের অধিকার, মানব সম্পদের সদ্ব্য‌বহার, বিপর্যয় মোকাবিলা, শাসন ব্য‌বস্থায় ন্য‌ায়নীতি, জন ব্য‌বস্থা, স্থানীয় শাসন, দ্বন্দ্বের মোকাবিলায় দক্ষতা বৃদ্ধি, সন্ত্রাস দমন, সামাজিক পুঁজির সদ্ব্য‌বহার, কর্মী বর্গের পুনর্নবীকরণ এবং বৈদ্য‌ুতিন মাধ্য‌ম নির্ভর শাসন ব্য‌বস্থা কায়েম করা।

সন্দেহ নেই একবিংশ শতাব্দীর সূচনা পর্বে ভারতকে যে সমস্ত প্রতিবন্ধকতার মোকাবিলা করে অগ্রসর হতে হচ্ছে তার মধ্য‌ে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হল বিশ্বায়নের নতুন ভাবনার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আর্থিক বিকাশের নতুন দিকগুলির উন্মোচন করা, বিভিন্ন দুর্নীতির মোকাবিলা করা, কেন্দ্র-রাজ্য‌ সম্পর্কের সহাবস্থান বজায় রাখা এবং বিভিন্ন ধরনের আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে উপযুক্ত অবস্থান নির্ধারণ করা। খুব সঙ্গত কারণেই বিশ শতকের মধ্য‌ ভাগে যে কল্য‌াণকামী রাষ্ট্র যাত্রা শুরু করেছিল ‘নিয়তির অভিসারে’ তার লক্ষ্য‌ এবং উদ্দেশ্য‌রও ব্য‌াপক পরিবর্তন ঘটেছে। ফলে এই রাষ্ট্রের প্রশাসন যন্ত্রেরও এক পেশাদারি মনোভাব নিয়ন্ত্রিত পরিবর্তন একান্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সংস্কার কমিটি সহ সাম্প্রতিক কালের অন্য‌ান্য‌ যে কমিটি এবং কমিশন তাদের সুপারিশগুলি দাখিল করেছে, সেগুলির কার্যকর প্রয়োগ একান্ত জরুরি। নাগরিক সনদ থেকে শুরু করে জনঅভিযোগ প্রশাসন, দুর্নীতি দমন এবং তথ্য‌ের অধিকার সংক্রান্ত আইনের কার্যকর প্রয়োগের জন্য‌ প্রয়োজন বিশেষ সংবেদনশীলতা, স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা। অন্য‌ দিকে ৭৩ এবং ৭৪ তম সংবিধান সংশোধনের উদ্দেশ্য‌কে বাস্তবায়িত করতে হলে প্রয়োজন ক্ষমতার প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণের সদিচ্ছা। গ্রাম এবং পৌর স্তরে প্রকৃত অর্থে ‘তৃতীয় সরকার’ কায়েম করতে হলে প্রয়োজন সম্পদের প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ এই স্তরে সমান্তরাল সরকারি কমিটিগুলির অবলুপ্তি।

সব শেষে মনে রাখা দরকার উন্নয়ন প্রশাসনে আমলাতন্ত্রের পরিবর্তিত এবং পেশাদারি ভূমিকাকে প্রাধান্য‌ দিয়েই ‘উন্নয়নমূলক আমলাতন্ত্রের’ ধারণা জন্ম নিয়েছে। এই মডেলকে অ-ওয়েবারিয় মডেল হিসাবেও চিহ্নিত করা হয়েছে। এই প্রশাসনের উদ্দেশ্য‌ হল সরকারি সংগঠনকে উন্নয়নের লক্ষ্য‌ে সাংগঠনিক ও আচরণগত ভাবে পরিবর্তিত করা।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

গণতন্ত্র ও বিকেন্দ্রীকরণ

দুই সংশোধনীর তাৎপর্য

১৯৯২ সাল। সেই বছরে সংবিধানের ৭৩ ও ৭৪-তম সংশোধনী আইন পাশ করা হয়। ওই দুই সংশোধনী আইন গণতন্ত্রের বিকাশ ও ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের ক্ষেত্রে অন্যতম এক উজ্জ্বল দ্যোতনা সৃষ্টি করে। উক্ত দুই সংশোধনী যথাক্রমে দেশের পঞ্চায়েত ব্য‌বস্থা ও পৌরসভাগুলির গঠন ও কার্যপ্রণালীতে মৌলিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। উক্ত সংশোধনীর ১১ তফশিলভুক্ত (পঞ্চায়েতের জন্য‌) ২৯টি ক্ষেত্র ও বারো তফশিলভুক্ত (পৌরসভার জন্য‌) ১৮টি ক্ষেত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে দেশের এই স্থানীয় সরকারগুলির (লোকাল গভনর্মেন্ট) ক্রিয়াকর্মের কী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এখানে চিহ্নিত করা আছে। প্রকৃত প্রস্তাবে বলা যেতে পারে যে, যে বৃহৎ গণতান্ত্রিক কাঠামোয় ভারত রাষ্ট্র স্বাধীনতার পরে আত্মপ্রকাশ করেছিল, একবিংশ শতাব্দীর নতুন নতুন চ্য‌ালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে তার কাঠামোয় যাতে কোনও রকম চিড় না ধরে সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে এই স্থানীয় সরকারগুলির ভিত্তি তথা সামগ্রিক রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি মজবুত করার লক্ষ্য‌েই উক্ত দুই সংশোধনী অন্য‌তম হাতিয়ার রূপে প্রকাশিত হয়েছে। এর কেন্দ্রবিন্দুতে আছে বিকেন্দ্রীকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ভাবনা।

এখন দেখা যাক যে তৃণমূল স্তরের গণতান্ত্রিক কাঠামো মজবুত করার লক্ষ্য‌ে ওই দুই সংশোধনী কোন কোন বিষয়ের উপর জোর দিচ্ছে।

প্রথমত, ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্য‌বস্থা (গ্রামস্তর, ব্লকস্তর ও জেলাস্তর) প্রবর্তনের উপর জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে পঞ্চায়েতের সমস্ত আসনে প্রার্থীদের নির্বাচিত (মনোনীত নয়) হয়ে আসতে হবে (অনুচ্ছেদ ২৪৩ সি)। পুরসভাগুলির ক্ষেত্রেও বিষয়টি সম ভাবে প্রযোজ্য‌ (অনুচ্ছেদ ২৪৩ আর)

দ্বিতীয়ত, ভারতের বিশাল জনগোষ্ঠীর (যা কিনা বিভিন্ন জাতি, ভাষা ও ধর্মে বিভক্ত) কথা মাথায় রেখে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সমাজের দুর্বলতর ও পিছিয়ে পড়া মানুষজনের অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকারগুলিতে আসন সংরক্ষণ (মহিলাসহ) আবশ্য‌ক করা হয়েছে।

তৃতীয়ত, গণতান্ত্রিক ভিত্তি তৃণমূল স্তরে প্রোথিত করার লক্ষ্য‌ে পঞ্চায়েতের ক্ষেত্রে গ্রামসভা এবং পুরসভাগুলির ক্ষেত্রে ওয়ার্ড কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এই সংগঠনগুলি পঞ্চায়েত ও পুরসভাগুলির সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এ ছাড়া ভবিষ্য‌ৎ কর্মপরিকল্পনার বিষয়গুলি তৃণমূল স্তরের এই সংগঠনগুলির মাধ্য‌মে উঠে আসবে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

সংশোধনীতে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

সংবিধানের ৭৩-তম ও ৭৪-তম সংশোধনী আইনে আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রথমটি হল স্থানীয় সরকারগুলির সম্পদ সংগ্রহ (রিসোর্স মোবিলাইজেশন) সংক্রান্ত বিষয় এবং অন্য‌টি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও রূপায়ণ সংক্রান্ত বিষয়। পঞ্চায়েত ও পৌরসভাগুলির নিজস্ব সম্পদ সংগ্রেহর উপর জোর দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বলা হচ্ছে যে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর দেশের প্রতিটি রাজ্য‌কে অর্থ কমিশন (স্টেট ফাইনান্স কমিশন) গঠন করে আগামী বছরগুলিতে রাজ্য‌ সরকার এবং স্থানীয় সরকারগুলির মধ্য‌ে বিভিন্ন খাতে সম্পদ সংগ্রহ ও বিলি বণ্টনের ব্য‌বস্থা কী হবে তার সুনির্দিষ্ট এক রূপরেখা প্রস্তুত করতে হবে (অনুচ্ছেদ ২৪৩ আই এবং ২৪৩ ওয়াই)

অনুচ্ছেদ ২৪৩ জেড-এ বলা হয়েছে যে প্রতিটি রাজ্য‌কে জেলাস্তরে একটি পরিকল্পনা কমিটি গঠন করে সংশ্লিষ্ট জেলার পঞ্চায়েত ও পৌরসভাগুলির জন্য‌ উন্নয়নমূলক বিভিন্ন পরিকল্পনার রূপরেখা প্রস্তুত এবং তদানুযায়ী তা রূপায়ণের কাজ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে বলা দরকার যে এগারো এবং বারো নম্বর তফশিলভুক্ত বিষয়গুলি নির্বাচন করা হয়েছে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের কথা মাথায় রেখে। আগে যে কাজগুলি রাজ্য‌ সরকারের বিভিন্ন দফতরের মাধ্য‌মে করা হত, সেগুলিই বিকেন্দ্রীভূত হয়ে স্থানীয় সরকারগুলির হাতে ন্য‌স্ত হয়েছে।

এ বারে এক নজরে দেখা যাক উক্ত দুই সংশোধনী আমাদের রাজ্য‌ে পঞ্চায়েত ও পৌরসভা কর্মকাণ্ডে কতটা প্রভাব ফেলেছে।

১৯৭৮ সালের পর থেকে এখানে নিয়মিত ব্য‌বধানে নির্বাচনের মাধ্যমে পঞ্চায়েতগুলিতে ৫০ হাজার অধিক এবং পৌরসভাগুলিতে কমবেশি ৩ হাজার আসনে জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়ে আসছেন। বলাই বাহুল্য‌, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধদের দ্বারা স্থানীয় সরকারের পরিচালনা পশ্চিমবঙ্গে ১৯৯২-এর সংশোধনীর বহু আগে শুরু হয়েছে।

এগারো তফশিলভুক্ত ও বারো তফশিলভুক্ত বিষয়ের বেশ অনেকটাই পশ্চিমবঙ্গে ১৯৯২-এর সংশোধনীর আগে পঞ্চায়েত আইনে (১৯৭৩) ও পৌরসভা আইনে (১৯৯৩) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। বলা হয়ে থাকে যে পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত আইনই (সংশোধিত) উক্ত সংবিধান সংশোধনীর বিভিন্ন ধারা উপধারা সংযোজনের ক্ষেত্রে অনেকটা মডেলের কাজ করেছিল।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

দৃষ্টান্ত পশ্চিমবঙ্গ

৭৩-তম ও ৭৪-তম সংশোধনী আইনে বছর ১৯৯২-এর দশ বছর আগে ১৯৮২ সালে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম পৌর অর্থ কমিশন (মিউনিসিপাল ফাইনান্স কমিশন) গঠন করা হয়েছিল। এই অর্থ কমিশনের কার্যধারা অনেকটাই সংবিধানের অনুচ্ছেদ নং ২৪৩ ওয়াইয়ের অনুসারী ছিল। এর এক বছর পর ১৯৯৩ সালেও ওই রূপ আরও একটি কমিশন গঠন করা হয়। এ ছাড়া ১৯৯৫, ২০০০ এবং ২০০৬ সালে যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় রাজ্য‌ অর্থ কমিশন গঠন করা হয়েছিল। এবং সেই কমিশনগুলি যে সব সুপারিশ করেছিল সেগুলির অধিকাংশই রাজ্য‌ সরকার গ্রহণ করে। ২০১৩ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে চতুর্থ রাজ্য‌ অর্থ কমিশন গঠিত হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ পুরসভা আইনে প্রতিটি পুরসভাকে তার নিজস্ব উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও রূপায়ণের কথা বলা হয়েছে। এখানে সেই লক্ষ্য‌ে, প্রথম পর্যায়ে কলকাতা মেট্রোপলিটন অঞ্চলের চল্লিশটি পুরসভা (কর্পোরেশন সহ) নির্বাচন করে ২০০৪-৫ সাল থেকে এক উন্নয়ন পরিকল্পনার ছক (ড্রাফট ডেভেলপমেন্ট প্ল্য‌ান) প্রণয়ন করা হয়েছে। ওই উন্নয়ন পরিকল্পনার ছকে প্রতিটি পুরসভা আগামী পাঁচ বছরে কোথায় কী উন্নয়নের কাজ করবে তার নির্দিষ্ট দিশা উল্লিখিত আছে। পরবর্তী পর্যায়ে রাজ্যের বাকি ৮৫টি পুরসভাতেও ওই একই কাজ সাফল্য‌ের সঙ্গে রূপায়িত করা হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত ও পুরসভায় শুধুমাত্র সমাজের দুর্বলতর শ্রেণির মানুষদের আসন সংরক্ষণের বিষয়টিই নিশ্চিত করা হয়নি, ভারতের অন্য‌ান্য‌ কিছু রাজ্য‌ের মতো (যেমন পঞ্চায়েতের ক্ষেত্রে মধ্য‌প্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থান, উত্তরাখণ্ড প্রভৃতি) মোট আসনের পঞ্চাশ শতাংশ মহিলাদের জন্য‌ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এ রাজ্য‌ে পঞ্চায়েতের ক্ষেত্রে গ্রামসভা ও গ্রাম সংসদ এবং পৌরসভার ক্ষেত্রে ওয়ার্ড কমিটি গঠনের বিষয়টি সুনিশ্চিত করা হয়েছে। এর দ্বারা গণতন্ত্রকে তৃণমূল স্তরে প্রসারিত করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে। এই প্রয়াস বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য‌। পঞ্চায়েত ও পুরসভার উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলি উক্ত তৃণমূল স্তরের সংগঠন থেকেই প্রস্তাব আকারে উঠে আসে। এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে গ্রামসভা ও গ্রাম সংসদ এবং পুর অঞ্চলে ওয়ার্ড কমিটির মাধ্যমে স্থানীয় স্তরে সাধারণ মানুষ তাঁদের অভাব অভিযোগ, চাহিদা এবং আশা আকাঙ্ক্ষার কথা জানাতে পারেন।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

দ্বিতীয় প্রজন্মের উন্নয়ন প্রক্রিয়া

এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ১৯৯২ সালের সংবিধান সংশোধনী স্থানীয় সরকারগুলিকে এক সাংবিধানিক মর্যাদা দান করেছে বটে, তবে রাজ্য‌ সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের যথোপযুক্ত মতাদর্শই কেবলমাত্র এর সঠিক রূপদান করতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও কথাটা সত্য‌ি। রাজনৈতিক চিন্তাধারার সরকারি স্তরে বাস্তবায়নই আজ পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েতি রাজ ব্য‌বস্থাকে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বে অন্য‌তম এক আগ্রহের বিষয় করে তুলেছে। তবে কাজ এখনও অনেক বাকি। গণতন্ত্রকে তৃণমূল স্তরে প্রোথিত করার প্রক্রিয়া শেষ হয়নি, বলা যেতে পারে শক্ত ভিতটুকু প্রতিষ্ঠা হয়েছে। নির্মাণ প্রক্রিয়া চলছে। এখন একে বলা হচ্ছে দ্বিতীয় প্রজন্মের উন্নয়ন প্রক্রিয়া। ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের প্রক্রিয়ায় কোন কোন ক্ষেত্রে দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে, কী ভাবে তা দূর করা যাবে, বর্তমান ত্রুটিগুলিই বা কী, সেই সব ত্রুটির সংশোধনই বা কী ভাবে সম্ভব — সবই এই প্রক্রিয়ার অন্তর্গত।

এ প্রসঙ্গে আরও বলা দরকার যে, এগারো ও বারো তফশিলভুক্ত যে কাজগুলি পঞ্চায়েত ও পুরসভার হাতে ন্য‌স্ত হয়েছে, তা সঠিক ভাবে রূপায়ণের কাজে উপযুক্ত পরিকাঠামো গড়ে তোলা আবশ্য‌ক (ইংরেজিতে যাকে বলে থ্রি এফ – ফান্ডস, ফাংশনস, ফাংশনারিজ) নইলে বিকেন্দ্রীকরণের কাজটাই মাঠে মারা যাবে। এ ছাড়া দীর্ঘকালে, স্থানীয় সরকারগুলি যদি তাদের নিজস্ব সম্পদ সংগ্রহ না বাড়ায় তবে যে তাদের অস্তিত্ব সঙ্কটের মুখে পড়বে তা বলাই বাহুল্য‌। তাই বাস্তব সম্মত উপায়ে সম্পদের মানচিত্রকরণ (রিসোর্স ম্য‌াপিং) প্রয়োজন। ভবিষ্য‌তের দিনগুলির কথা ভেবে আরও সুষ্ঠু ভাবে স্থানীয় সরকারগুলিকে পরিচালনা এবং সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অঞ্চেলর মানুষজনকে নিয়ে, তাদের চাহিদার ভিত্তিতে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও রূপায়ণে (যার পোশাকি নাম পার্টিসিপেটারি প্রজেক্ট ডেভেলপমেন্ট) দিকে আরও বেশি জোর দিতে হবে যাতে করে এই সত্য‌ই প্রতিষ্ঠিত হয় — ‘ব্য‌ষ্টির জন্য‌ পঞ্চায়েত/পুরসভা নয়, সমষ্টিকে সঙ্গে নিয়ে এবং তাদের চহিদা ও আশা আকাঙ্ক্ষার সঠিক রূপায়ণের জন্য‌, সমাজের সব চেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষটির উন্নয়নের জন্য‌ই আমাদের সবার পঞ্চায়েত/পুরসভা।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

ভারতে সুশাসনের লক্ষ্যে প্রয়াস

নতুন জনব্য‌বস্থাপনার ধারণা

স্বাধীনতা লাভ এবং প্রজাতান্ত্রিক সংবিধান কার্যকর হওয়ার সময় থেকেই ভারত গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসনিক সংস্কারের কথা ভেবে এসেছে। নতুন পরিস্থিতিতে স্বাধীন ভারতের জনগণের নবীন আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য‌ এই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা হয়েছিল। এমনকী ঔপনিবেশিক সময়েও বিক্ষিপ্ত ভাবে প্রশাসনিক সংস্কারের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে তার উদ্দেশ্য‌ ছিল ঔপনিবেশিক শাসনকে আরও মজবুত করা। স্বাধীনতার পর সুশাসনের লক্ষ্য‌ে সংস্কারের তাগিদ জোরদার হয়। ১৯৫০ সালে এ ডি গোড়োওয়ালা কমিটি রিপোর্ট এবং ১৯৫৩ এবং ১৯৫৭ সালে অ্য‌াপলবির দুটি রিপোর্টের পর ১৯৬৪ সালে উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন প্রথম প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশন প্রশাসন ও পদ্ধতিগত বিভিন্ন দিক নিয়ে ২০টি রিপোর্ট দাখিল করে। মূলত রাজনৈতিক অস্থিরতা-সহ বিভিন্ন কারণে সাত ও আটের দশকে এ ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রগতি হয়নি। এর পর ফের বিষয়টি নিয়ে নড়াচড়া শুরু হয়, বেশ কিছু তাত্ত্বিক ও কার্যগত পরিবর্তন ঘটে। সূচনা হয় আধুনিক জনপ্রশাসন বিষয়ক ধারণার। ডাঃ বীরাপ্পা মইলির নেতৃত্বে গঠিত দ্বিতীয় প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন ২০০৫ সালে রিপোর্ট পেশ করে।

নয়ের দশকের গোড়া থেকে নতুন এক পরিচালন ধারণা জনব্য‌বস্থাপনায় গুরুত্ব পেতে শুরু করে। আমেরিকা সহ বিভিন্ন শিল্পোন্নত দেশে নতুন জনব্য‌বস্থাপনা (এনপিএম) নামে এই ধারণার প্রয়োগ দেখা যায়। বিশ্বায়নের সুবাদে দ্রুত এই ধারণা উন্নয়নশীল দেশগুলিতেও ছড়িয়ে পড়ে। নতুন জনব্য‌বস্থাপনা এমন এক সরকারি ব্য‌বস্থার কথা বলে যা স্বচ্ছ,দায়বদ্ধ, সাধারণ মানুষের প্রয়োজন মেটাতে সদা তৎপর, প্রতিশ্রুতি পালনে সক্রিয় এবং অন্তর্ভুক্তিকরণে বিশ্বাসী।

নয়ের দশকের শেষ দিকে কেন্দ্র প্রশাসনিক ব্য‌বস্থার সংস্কার ও পুনর্গঠনের জন্য‌ উদ্য‌োগী হয়। জনব্য‌বস্থাপনায় এমন এক মডেল আনার কথা ভাবা হয়, যার মধ্য‌ে রয়েছে—

) দক্ষতা কার্যকারিতা, উন্নত পরিষেবা এবং লক্ষ্য‌ পূরণের ওপর জোর দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

) সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিতে কাজের পরিবেশ ও কর্মসংস্কৃতির উন্নয়ন এবং নাগরিক বান্ধব পরিচালন ব্য‌বস্থা।

) আমলাতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন ঘটিয়ে তার অভিমুখ, ব্য‌বহার ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

পরিবর্তনের অনুঘটক হবে আমলাতন্ত্র

স্থিতাবস্থা বজায় রাখার চেষ্টা না করে এই বোধ আসা প্রয়োজন যে, বর্তমানের বিশ্বায়ন, উদারীকরণ ও বেসরকারিকরণের যুগে পরিবর্তনের অনুঘটক হিসাবে আমলাতন্ত্রকেই বৃহৎ ভূমিকা পালন করতে হবে। সনাতন চিন্তাভাবনা ও কর্মসংস্কৃতি বদলানোর পাশাপাশি আগ্রহ দেখাতে হবে প্রযুক্তি উদ্ভাবন, প্রতিযোগিতা, সাম্য, ব্যক্তির অধিকার এবং বৃহত্তর সামাজিক উদ্দেশ্য পূরণের প্রতি।

ব্য‌র্থতার জন্য‌ সব সময়ে সরকারি পরিকাঠামোকে দোষারোপ করা ঠিক নয়। স্বাধীনতার পর গত ৬৫ বছরে ভারতের সরকারি প্রশাসনিক ব্যবস্থা সময়ের ঝাপটা সয়ে এখনও যে বহাল রয়েছে তাই নয়, অন্য‌ অনেক উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের তুলনায় এর কাঠামোও যথেষ্ট মজবুত।

তবে দীর্ঘ এই সময়কালে এর মধ্য‌ে যে বেশ কিছু বিচ্য‌ুতি প্রবেশ করেছে, তা অনস্বীকার্য। উডরো উইলসন বলেছিলেন, ‘সংবিধান রচনা করা সোজা, তা পালন করা কঠিন।’ এই বিচ্য‌ুতির প্রধান কারণ হল রাজনীতি এবং প্রশাসনের সঙ্গে জড়িত অভিজাত শ্রেণির দ্বিচারিতা। কারণ যে কোনও ব্য‌বস্থা রূপায়ণের দায়িত্ব মূলত তাঁদেরই।

সমাজের সর্ব স্তরের মানুষ এখন তাঁদের সাংবিধানিক অধিকার ও প্রশাসনিক প্রাপ্য‌ের বিষয়ে অনেক বেশি সচেতন, কিন্তু এরই সঙ্গে তাঁদের উপর ন্য‌স্ত কর্তব্য‌ের বিষয়ে তাঁরা উদাসীন। যে সহনশীলতা, স্বাধীনতার পর প্রথম দুই দশকে ভারতীয়দের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্য‌বহারের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল, ক্ষমতা দখলের উদগ্র প্রয়াসে আজ তা বিলুপ্ত।

দায়বদ্ধতা ও সংবেদনশীলতার অভাবে আইন প্রণয়নকারী ও প্রশাসকদের মধ্য‌ে দায়িত্বশীল সরকারের মূল ভাবনাটিই হারিয়ে গেছে। রাজনৈতিক তর্কবিতর্ক ও ভাষার আলঙ্করিক প্রয়োগের অভাব নেই, কিন্তু নাগরিকদের প্রত্য‌াশা ও চাহিদা পূরণে কার্যকর উদ্য‌োগ চোখে পড়ছে না। আমরা নীতি পরিকল্পনা, কর্মসূচি ও প্রকল্প প্রণয়ন করতে দড়, কিন্তু সেগুলি রূপায়ণের ক্ষেত্রে উদ্য‌োগী নই। এ জন্য‌ই প্রগতি উন্নয়নের পথে আমাদের গতি অত্য‌ন্ত শ্লথ। সর্বোপরি, ভারতের আমলাতন্ত্র নিরুত্তাপ, গতিহীন এবং নাগরিকদের অভাব অভিযোগের নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অমানবিক। এতেই শেষ নয়, এটি বিশ্বের সব থেকে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্য‌বস্থাগুলির মধ্য‌ে অন্য‌তম — ভারতীয় আমলাতন্ত্রের এমন একটি ভাবমূর্তিও গড়ে উঠেছে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

মানব উন্নয়নে ভারত অনেকটাই নীচে

ভারতের গরিবরা গরিবই থেকে যায়। তাদের সংখ্য‌া বাড়তেই থাকে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল মুছে যায় জনসংখ্য‌া বৃদ্ধির বিপুল চাপে। ভারতে অর্থনৈতিক দিক থেকে মজবুত মধ্য‌বিত্ত শ্রেণি, উজ্জ্বল তথ্য‌ প্রযুক্তি শিল্প এবং পরমাণু শক্তি থাকলেও দেশের অসংখ্য‌ মানুষ এখনও চরম দারিদ্র ও বঞ্চনার মধ্য‌ে দিন কাটান। সরকারের কার্য সম্পাদনার ক্ষমতা এখনও কম, রয়েছে লগ্নিযোগ্য‌ সম্পদের অভাব। শিক্ষা, স্বাস্থ্য‌, জনকল্য‌াণ, পরিকাঠামো ক্ষেত্রে মৌলিক চাহিদা এখনও পূরণ হয়নি। এমনকী বহু জায়গায় এখনও বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া যায়নি। দরিদ্রদের মধ্য‌ে অনেকেই এক দশক আগে যে পরিস্থিতিতে ছিলেন, বর্তমানে তার চেয়েও খারাপ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। তাই রাষ্ট্রসঙ্ঘের উন্নয়ন প্রকল্প বা ইউএনডিপি-র বার্ষিক মানব উন্নয়ন রিপোর্টে ভারতের স্থান অনেকটাই নীচে।

এই পরিস্থিতিতে সুস্থিত উন্নয়নের লক্ষ্য‌ে প্রয়োজনীয় নীতি কৌশল প্রণয়ন করা দরকার। প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত উদ্ভাবন ছাড়াও সুশাসনের জন্য‌ দুর্নীতিমুক্ত সুদৃঢ় সঙ্কল্প প্রয়োজন। এই নৈতিক সঙ্কল্পের স্বীকৃতি এক দিশার জন্ম দেয়। যাঁরা দেশ শাসন করছেন, তাঁরা যদি প্রকৃতই সমাজের সেবা করতে চান তা হলে তাঁদের প্রচেষ্টাকে সেই অভিমুখে চালিত করতে হবে। এই অভিমুখ দাবি করে ব্যক্তির ‘নৈতিক দায়িত্ব, দায়বদ্ধতা, ত্য‌াগ, অনুকম্পা, ন্য‌ায় এবং সদিচ্ছা’।

এমন একটি মডেল গ্রহণ করতে হবে যেখানে সুশাসনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মাত্রা ছাড়াও নৈতিকতাও গুরুত্ব পায়। এর মধ্য‌ে থাকবে — () সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অভীষ্ট লক্ষ্য‌ অর্জনের ওপর জোর (দক্ষতা, কার্যকারিতা ও পরিষেবার গুণগত মান), () কেন্দ্রীভূত সাংগঠনিক কাঠামোর পরিবর্তে বিকেন্দ্রায়িত পরিচালন ব্য‌বস্থা, যেখানে গ্রামীণ, শহুরে ও পৌরপ্রতিষ্ঠানগুলির মধ্য‌ে সংযোগ সাধন হবে। সম্পদ বণ্টন ও পরিষেবা প্রদান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার থাকবে তৃণমূল স্তরে, () বিকল্প সন্ধান করার মতো নমনীয়তা, যাতে খরচ যথা সম্ভব কমানো যায়, () দায়িত্ব ও কর্তব্য‌ের মধ্য‌ে সমন্বয় সাধন, () প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি, () পরিবেশ বদলের সঙ্গে সাযুজ্য‌ রেখে এবং বহুমুখী স্বার্থের সমন্বয় ঘটিয়ে মজবুত নীতি কৌশল, () ফলাফল ও তার ব্য‌য় প্রকাশের মাধ্য‌মে আরও স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা সুনিশ্চিত করা।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা

সুশাসনের মডেলটিতে আরও যে সব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন সেগুলি হল—

) যথাযথ বাজেট প্রস্তত করা এবং পরিবর্তন সহায়ক ব্য‌বস্থাপনা। () দুর্নীতি দূর করা এবং অভিযোগ প্রতিবিধানের যথাযথ ব্য‌বস্থা করা। () পরিষেবা প্রদানের ব্য‌বস্থার উন্নতি সাধন এবং নতুন ব্য‌বস্থাপনার প্রয়োজনীয় সংস্থানগুলির আত্মীকরণ এবং () সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজের পরিবেশ সৃষ্টি করা ও কর্মসংস্কৃতির উন্নতি ঘটানো।

বিশ্বায়ন এবং তার জেরে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, বর্তমান সময়ের শাসন পদ্ধতিকে বিশেষ ভাবে প্রভাবিত করেছে। আন্তজার্তিক মঞ্চে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলি এক সঙ্গে কাজ করছে। এরই প্রেক্ষিতে জন্ম নিয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন — বৃহত্তর সামাজিক কল্য‌াণে বেসরকারি সংস্থাকে কী ভাবে প্রণোদিত করা যায়। এখানে দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি অত্য‌ন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমানে নতুন এক মডেল নিয়েও খুব আলোচনা হচ্ছে, যার নাম পাবলিক-প্রাইভেট কমিউনিটি পার্টনারশিপ — পিপিসিপি। এখানে সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলি এক যোগে সামাজিক কল্য‌াণের লক্ষ্য‌ে কাজ করে। ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলিতে এই মডেল প্রয়োগ করা হচ্ছে। পাওয়া যাচ্ছে সাফল্য‌। এ ক্ষেত্রে মুনাফা লাভের থেকে লক্ষ্য‌ অর্জনের উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

দায়বদ্ধতা বলতে যদি সরকারি কর্মী ও জনকর্মসূচিতে যোগ দেওয়া বেসরকারি সংস্থাগুলির সাধারণ মানুষের প্রয়োজনে সাড়া দেওয়া বোঝায়, তা হলে তা পরিমাপের একটা পদ্ধতি থাকা উচিত। এই পদ্ধতিকে বহুমাত্রিক হতে হবে, যাতে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় এর হেরফের ধরা পড়ে। প্রথাগত ভাবে ‘টপ ডাউন’ পদ্ধতি সব সময় বিশেষ ভাবে উপযোগী নাও হতে পারে। পরিষেবা প্রদানের পদ্ধতি যেমন বদলাচ্ছে, সংযোজিত হচ্ছে জটিলতর এজেন্সি প্রথা, তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দায়বদ্ধতা পরিমাপের পদ্ধতিও পাল্টানো দরকার। নজরদারি বাড়াতে সংসদীয় কমিটি, ওমব্য‌াডসম্য‌ান প্রভৃতিকে আরও শক্তিশালী করে তোলা উচিত। অনুভূমিক স্তরেও দায়বদ্ধতা সুনিশ্চিত করতে হবে। গুরুত্ব দিতে হবে ফিড ব্য‌াকের উপর। দায়বদ্ধতার নতুন এই ক্ষেত্র নিজস্ব নিয়ম, মান, নীতি প্রভৃতি প্রস্তুত করতে কিছুটা সময় নেবে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

সুশাসনের হাতিয়ার ই-প্রশাসন

সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হল বহুমাত্রিক দায়বদ্ধতার হিসাবে বহুবিধ ব্য‌বস্থা ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বীকৃতি দেওয়া।

তথ্য‌প্রযুক্তি ক্ষেত্রে যে বিপ্লব দেখা দিয়েছে তার জোরে এটি এখন সুশাসনের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। বৈদ্য‌ুতিন শাসন বা ই-প্রশাসন নিয়ে এখন সারা বিশ্বেই আলোচনা হচ্ছে। আমাদের দেশও তার ব্যতিক্রম নয়। এই ই-প্রশাসনের মাধ্য‌মে সরকার ও নাগরিকদের মধ্য‌ে সরাসরি সংযোগের একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। মোটামুটি ভাবে যে চারটি ক্ষেত্রে নাগরিকদের সরকারের সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শে আসতে হয়, যেখানে এই ই-প্রশাসন চমৎকার কাজ করতে পারে। এগুলি হল—

) বিল, কর প্রভৃতি প্রদান;

) নথিভুক্তকরণ, শিশুর জন্ম থেকে শুরু করে বাড়ি কেনা বা গাড়ির লাইসেন্স করা, নানা বিষয়ে হতে পারে;

) তথ্য‌ জানতে পারা;

) অভিযোগ দায়ের করা।

-প্রশাসন স্থানিক দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়ে প্রত্য‌ন্ত গ্রামের সঙ্গে শহরের সরকারি কার্যালয়ের প্রত্য‌ক্ষ সংযোগ স্থাপন করে, কর্মী সংখ্য‌া কমায়, খরচ বাঁচায়, সরকারি ব্য‌বস্থায় অপচয় রোধ করে এবং লম্বা লাইন ও কেরানিদের অত্য‌াচার এড়িয়ে নাগরিক ও সরকারের মধ্য‌ে সরাসরি সংযোগের ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। তবে মনে রাখা দরকার, -প্রশাসন, সুশাসনের একটি হাতিয়ার মাত্র। দায়িত্বশীল আধিকারিকদের নজরদারি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের কর্তৃত্ব ছাড়া এটি চলতে পারে না। আমাদের দেশে জনসংখ্য‌ার অধিকাংশ নিরক্ষর হওয়া সত্ত্বেও কী ভাবে এই সব নতুন মাধ্য‌মকে কাজে লাগিয়ে সুশাসনের সুদৃঢ় ভিত্তি গড়ে তোলা যায়, সেটাই আজ আমাদের সামনে সব থেকে বড় চ্য‌ালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নাগরিক স্বার্থের উপর ভিত্তি করে শাসনের একটি নতুন ধারণা গড়ে উঠেছে। এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা, মেধানির্ভর ব্য‌বস্থাপনার উপর জোর দেওয়া হয়। নৈতিকতার মূল ভিত্তিটি দাঁড়িয়ে থাকে ‘অপরের জন্য‌ অনুভবের নীতিতে’। একটি নীতিজ্ঞান সম্পন্ন সংগঠন, এ ক্ষেত্রে সরকার এমন এক ইতিবাচক সংস্কৃতির জন্ম দেয়, যেখানে প্রতিটি সদস্য‌দের মধ্য‌ে আনুগত্য‌ের বোধ থাকে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

দায়িত্ব ও কর্তব্য‌ের পুনর্বণ্টন

নেতাদের বিভিন্ন স্তরে আলোচনা এবং পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্য‌মে গৃহীত নীতির রূপায়ন সুনিশ্চিত করতে ব্য‌বস্থা নেওয়া হয়। সরকার ও জনপ্রশাসনের আধুনিকীকরণ বলতে বোঝায় নতুন করে সরকারি দায়িত্বের সংজ্ঞা নিরূপণ। একবিংশ শতকের রাষ্ট্র ব্য‌বস্থাপনায় সরকার, ব্য‌বসায়িক মহল এবং সমাজের মধ্য‌ে দায়িত্ব ও কর্তব্য‌ের পুনর্বণ্টন দরকার। এ জন্য‌ প্রয়োজন আধুনিক ব্য‌বস্থাপনা কৌশল, মান নিয়ন্ত্রণ, বাজেট প্রস্তুত এবং ব্য‌য় ও সুবিধার পারস্পরিক বিশ্লেষণ। ভবিষ্য‌তে জন পরিষেবা প্রদানের ক্ষেত্রে লক্ষ্য‌ অর্জনই মুখ্য‌ হতে চলেছে। মৌলিক এই পরিবর্তনের মুখ্য‌ দুটি হাতিয়ার হতে চলেছে আধুনিক ব্য‌বস্থাপনা এবং ই-প্রশাসনের সার্থক প্রয়োগ। ই-প্রশাসন প্রকল্পগুলি শুধুমাত্র জনকর্তৃপক্ষ এবং সংস্থাগুলির আধুনিকীকরণই ঘটাচ্ছে না, সাধারণ মানুষের কাছে প্রশাসনিক পদ্ধতিকে আরও স্বচ্ছ করে তুলছে। এর প্রেক্ষিতে সরকারি কর্মীদের উপরেও আরও দায়বদ্ধ হয়ে ওঠার চাপ বাড়ছে।

সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য‌ দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক ব্য‌বস্থা একান্ত আবশ্য‌ক। এ জন্য‌— () দুর্নীতির সুযোগ কমিয়ে সরকারি কর্মীদের মধ্য‌ে দায়বদ্ধতা বোধ আরও বাড়াতে হবে। () দুর্নীতি প্রতিরোধক ব্য‌বস্থার কার্যকর প্রয়োগ সুনিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য‌ প্রয়োজন অভিযোগের তদন্ত ও শাস্তি বিধানের জন্য‌ সময় বেঁধে দেওয়া, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতা ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। এই মূলগত শর্তগুলি পালন ছাড়াও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে আরও বেশ কিছু হাতিয়ার দরকার। এর মধ্য‌ে রয়েছে—

) জাতীয় স্তরে একটি সমন্বয় কর্তৃপক্ষ স্থাপন, যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে রণকৌশল স্থির ও কার্যকর করবে। এদের কাজে নজরদারি করবে একটি নাগরিক পর্ষদ।

) দুর্নীতির মামলার তদন্ত ও বিচারের জন্য‌ একটি উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন স্বাধীন সংস্থা গঠন।

) মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য‌ বিশেষ আদালত গঠন।

) নির্বাচনী আইন ও অথর্নৈতিক বিধির আমূল সংস্কার সাধন যাতে দুর্নীতির বিষয়ে উৎসাহ দান বন্ধ হয়।

) কেন্দ্র ও রাজ্য‌গুলিতে সর্বাধিক কতগুলি দফতর হতে পারবে তা বেঁধে দেওয়ার জন্য‌ আইন প্রণয়ন, যাতে রাজনৈতিক লাভের জন্য‌ মন্ত্রক গঠন করা না হয়।

) দুর্নীতি প্রতিরোধক সংস্থাগুলিকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া, উচ্চস্তরীয় কর্মশালার আয়োজন এবং বিদেশে দুর্নীতির ঘটনার তদন্তে আন্তর্জাতিক সহায়তা গ্রহণ।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

সংসদীয় গণতন্ত্রে সুশাসনের পথ

কালো টাকার বিরুদ্ধে ভারত অভিযান শুরু করেছে। সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়। এটি সংসদে পেশ করা হয় ২০১২ সালের ২১ মে। নীতিনির্ধারকরা এখন খতিয়ে দেখছেন, কী ভাবে কলোবাজারের সৃষ্টি হয়, সম্পদ কী ভাবে লুকিয়ে রেখে কৃত্রিম অভাব তৈরি করা হয় এবং কী ভাবে এক সমান্তরাল অর্থনীতি চলতে থাকে। শ্বেতপত্রে নিরীক্ষকদের দায়বদ্ধতা বাড়ানো, দুর্নীতির ঘটনা যাঁরা প্রকাশ্য‌ে আনছেন তাঁদের সুরক্ষা, সামাজিক নীতিবোধ শক্তিশালী করার মতো বিভিন্ন ব্য‌বস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।

মুদ্রাস্ফীতির উচ্চ হারে সব দ্রব্য‌সামগ্রীর দামই লাগামছাড়া ভাবে বাড়ছে। সাধারণ মানুষের দুর্দশা চরমে উঠেছে। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিক্ষিপ্ত কিছু ব্য‌বস্থার বদলে সার্বিক সুসমন্বিত নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

সুশাসন এবং পরিচ্ছন্ন প্রশাসনের শর্তই হল দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ, জনজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কার্যকর বিধি এবং আইনের উপস্থিতি এবং সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ, সেই আইনের সুচারু ন্য‌য়সঙ্গত প্রয়োগ। এনপিএম সরকারি ব্য‌য় হ্রাস, কর্মীসংখ্য‌া কমানো এবং সংগঠনের মূল্য‌বোধ পরিবর্তনের কথা বলে। বেসরকারিকরণের উপর জোর দিলেও যাবতীয় রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিকদের সন্তোষবিধানের দায়িত্ব যে সরকারেরই — এ ব্য‌াপারে এনপিএম-এও কোনও অস্পষ্টতা নেই।

এনপিএমের ধারণা সরকারি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নাগরিক অভিমুখিতা আনার উপর জোর দেয়। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, আউটসোর্সিং ইত্য‌াদির মাধ্য‌মে জনপরিষেবায় নানা উদ্ভাবন প্রয়োগ করতে চায় এই ধারণা। সম্প্রতি যে সব সংস্কার কর্মসূচির রূপায়ণ করা হয়েছে, তার মাধ্য‌মে ভারতীয় প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা বাড়বে বলে আশা করা যায়। এর মধ্য‌ে রয়েছে—() সরকারি দফতরে নাগরিক সনদের প্রতিলিপি রাখা, () তথ্য‌ের অধিকার আইন ২০০৫-এর প্রয়োগ, () তৃণমূল স্তর পর্যন্ত ই-প্রশাসন চালু এবং দ্বিতীয় প্রশাসনিক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ মেনে জনপরিষেবা বিল, হুইসল ব্লোইং আইন, লোকপাল আইন প্রভৃতি প্রস্তুত করা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা কতটা আন্তরিক, দুর্নীতিগ্রস্ত আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ব্য‌বস্থা নিতে আমরা কতটা সচেষ্ট — এগুলি তারই নিদর্শন হয়ে থাকবে। এ ছাড়া আইন প্রণয়নকারীদের মধ্য‌ে নীতিবোধের প্রসার, বিচারবিভাগ এবং অসরকারি সংগঠনগুলির দায়বদ্ধতা সুনিশ্চিত করা প্রভৃতি পদক্ষেপ সংসদীয় গণতন্ত্রে সুশাসনের পথ পরিষ্কার করবে।

সূত্র : যোজনা, মার্চ ২০১৪

পশ্চিমবঙ্গ পরিভ্রমণ মাধ্যম

পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ মানুষের পরিবহনের অপরিহার্য মাধ্যম হল বাস। পরিবহনের এই মাধ্যমটি রেল বা কোনও নির্দিষ্ট ট্র্যাকের দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়, এটি রাজ্যের যে কোনও দূরবর্তী স্থানেও উপপল্ধ রয়েছে। বাসগুলি শহর ও গ্রাম উভয় স্থানেই চলাচল করে। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের এমনও কিছু প্রত্যন্ত গ্রাম রয়েছে যেখানে সারাদিনে কেবলমাত্র একটিমাত্র বাস দ্বারা পরিষেবা প্রদান করা হয়। রাজ্য-চালিত এবং বেসরকারি বাসগুলি লাখ-লাখ মানুষকে দৈনন্দিন পরিষেবা প্রদান করে চলেছে।

রাজ্য নিগম, যেমন কলকাতা রাজ্য পরিবহন নিগম, পশ্চিমবঙ্গ ভূতল পরিবহন সংস্থা, দক্ষিণবঙ্গ রাজ্য পরিবহন নিগম এবং উত্তরবঙ্গ রাজ্য পরিবহন নিগম বাস পরিষেবা পরিচালনা করে। যদিও বেশীরভাগ বাসই বেসরকারি মালিকানাধীনে চলে। পাবলিক বাসগুলি যদিও বৃহত্তর জায়গা সহ আরামপ্রদ তবে, বেসরকারি বাসগুলির তুলনায় খুবই বেশি সময়ের অন্তরে চলে। সেগুলি বিভিন্ন ভাবে শ্রেণীবদ্ধ করা আছে; যেমন – লিমিটেড স্টপ্ বাস (সীমিত জায়গায় দাঁড়ানো বাস), মর্নিং – সানডাউন্ বাস (সকাল – সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলমান বাস), স্পেশ্যালস, এক্সপ্রেস সার্ভিসেস ইত্যাদি। বেসরকারিভাবে চালিত বাসগুলির মধ্যেও আবার বিভিন্ন ধরন রয়েছে; যেমন – মিনিবাস এবং চাটার্ড ও ছোট বাসও হতে পারে।

রাজ্যের রেলপথের মোট দৈর্ঘ্য হল প্রায় ৪৪৮১ কিলোমিটার। রাজ্যের রাজধানী কলকাতায় ভারতীয় রেলপথের দুটি সদরদপ্তর রয়েছে। রেলপথের দুটি বিভাগ হল– ইস্টার্ন রেলওয়ে (উত্তর রেলপথ) এবং সাউথ-ইস্টার্ন রেলওয়ে (দক্ষিণ – পূর্ব রেলপথ)। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেল, রাজ্যের উত্তর প্রান্তে পরিবহন পরিষেবা প্রদান করে এবং দার্জিলিং-হিমালয় রেলপথ হল এন.এফ.আর এবং ইউনেস্কো (ইউ.এন.ই.এস.সি.ও)দ্বারা ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যগত স্থানের একটি অংশ।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে দুটি বাণিজ্যিক বিমানবন্দর রয়েছে। প্রথমটি হল কলকাতার নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং অন্য আরেকটি হল শিলিগুড়ির বাগডোগরা বিমানবন্দর। বাগডোগরা বিমানবন্দর প্রাথমিক রূপে অন্তর্দেশীয় পরিষেবা পরিবেশন করত কিন্তু সাম্প্রতিককালে এটি পারো, ভূটান, ব্যাংকক ও থাইল্যান্ড-এ আন্তর্জাতিক পরিষেবা চালু করেছে। রাজ্যে প্রধান দুটি বন্দর রয়েছে, সেগুলি হল কলকাতা বন্দর এবং হলদিয়া বন্দর।

কলকাতায় ট্রামকে সম্পূর্ণরূপে “কলকাতার অতি নিজস্ব ঐতিহ্য” – রূপে আখ্যায়িত করা হয়। কলকাতার শশব্যস্ততাবহূল শহরে, যান্ত্রিক পরিবহনের মাধ্যম হিসাবে এই ট্রাম তার চরিত্রগত সু্স্থির গতির মাধ্যমে দূষণমুক্ত, পরিবেশ-বান্ধবরূপে কলকাতায় সস্তায় পরিষেবা প্রদান করে। কলকাতাই ভারতের এমন একমাত্র শহর এবং বিশ্বেরও সেই কয়েকটি শহরের মধ্যে একটি যেখানে এখনও ট্রামের প্রচলন রয়েছে। কলকাতা ট্রাম সেই ১৮৭৩ সাল থেকে চলে আসছে এবং এই শহর ট্রামের সঙ্গে তাদের সেই বিশ্বের প্রাচীন চারুতাকে আজও উপভোগ করে চলেছে। একটি ব্যস্ততাহীন চলন্ত ট্রামের জানলা থেকে দেখলে এই শহরকে অবশ্যই আরোও আবেগপ্রবণ দেখায়।

পশ্চিমবঙ্গ মেট্রো রেল বা পাতাল রেল হল ভূ-গর্ভস্থ রেল সংযোগ এবং কলকাতার ব্যস্তবহূল শহরের কাছাকাছি প্রাপ্য সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায়। কলকাতা মেট্রো রেল ১৯৮৪ সাল থেকে চলে আসছে এবং এটি সমগ্র ভারতের সর্বপ্রথম ভূ-গর্ভস্থ মেট্রো রেল। এটি তার দক্ষ কার্যকারীতা, পরিচ্ছন্নতা, আরামপ্রদ স্বাচ্ছন্দ্যতা ও স্বল্প-সময় মানের জন্য সারা বিশ্বের কাছে উচ্চ সম্ভ্রমতার সাথে সাদরে গৃহীত।

পরিবহনের একটি মাধ্যম রিকশা, যা পশ্চিমবঙ্গে সচরাচর সবসময় মানুষের অবলম্বন হিসাবে উপলল্ধ রয়েছে। রিকশা শব্দটি ‘জিঁরিকিশা’ থেকে উৎপত্তি হয়েছে, জাপানীদের কাছে যার আক্ষরিক অর্থ হল মানব-চালিত যানবাহন। ১৯০০ সালে চীনা অভিবাসীদের দ্বারা কলকাতায় এটির প্রবর্তন হয়েছিল এবং তখন থেকেই এটি পরিবহনের জনপ্রিয় মাধ্যম হিসাবে এখানে রয়ে গেছে। ডোমিনিক লেপিয়্যের – এর ‘আনন্দ নগরীর’ রিকশা পশ্চিম বাংলার বাইরের অধিবাসীদের অবিস্মরণীয় করে রেখেছে। পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু গলি-রাস্তায় নিরাপত্তার জন্য ভারী যানবাহনের যাতায়াত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং সেই সমস্ত রাস্তায় পরিবহনের একমাত্র বিকল্প হল এই রিকশা। এগুলি স্বল্প দূরত্বে ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত এবং যখন কেউ তার গন্তব্যের খুবই কাছে পৌছতে চায় তখন অনেকেই এটিকে পছন্দ করেন। রিকশা অতি সহজেই যেকোনও সংকীর্ণ গলি ও রাস্তায় ঢুকে পড়ে, তাই সর্বদাই এর চাহিদা রয়েছে।

কলকাতার চক্র রেল, পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী শহরের ধারেপাশে প্রাপ্ত পরিবহনের এক অন্যতম সুবিধাজনক উপায়। পূর্বে, অন্যান্য বড় বড় শহরের ন্যায় কলকাতার কেন্দ্রীয় অংশে কোনও রেল সংযোগ ব্যবস্থা ছিল না। ক্রমবর্ধিত জনসংখ্যার সাথে সাথে শহরে একটি রেল সংযোগ ব্যবস্থার চাহিদাও বাড়তে থাকে। প্রয়োজনীয় সমস্যাপূরণে চক্র রেল কলকাতায় হুগলী নদীর তীর বরাবর চালিত রয়েছে। পূর্ব রেল দ্বারা পরিচালিত এই চক্র রেল এখন সারা শহর জুড়ে চমৎকার সংযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।

ট্রাম

কলকাতায় ট্রামকে সম্পূর্ণরূপে “কলকাতার অতি নিজস্ব ঐতিহ্য” – রূপে আখ্যায়িত করা হয়। কলকাতার শশব্যস্ততাবহূল শহরে, যান্ত্রিক পরিবহনের মাধ্যম হিসাবে এই ট্রাম তার চরিত্রগত সু্স্থির গতির মাধ্যমে দূষণমুক্ত, পরিবেশ-বান্ধবরূপে কলকাতায় সস্তায় পরিষেবা প্রদান করে। কলকাতাই ভারতের এমন একমাত্র শহর এবং বিশ্বেরও সেই কয়েকটি শহরের মধ্যে একটি যেখানে এখনও ট্রামের প্রচলন রয়েছে। কলকাতা ট্রাম সেই ১৮৭৩ সাল থেকে চলে আসছে এবং এই শহর ট্রামের সঙ্গে তাদের সেই বিশ্বের প্রাচীন চারুতাকে আজও উপভোগ করে চলেছে। একটি ব্যস্ততাহীন চলন্ত ট্রামের জানলা থেকে দেখলে এই শহরকে অবশ্যই আরোও আবেগপ্রবণ দেখায়।
কলকাতায় ট্রাম শহরের বিভিন্ন কেন্দ্রের মধ্যে দিয়ে চলাচল করে এবং কার্যত এটি কলকাতার প্রায় সমস্ত কোণে আবৃত রয়েছে।

  • রুট নং – ১ বেলগাছিয়া – এসপ্ল্যানেড
  • রুট নং – ২ বেলগাছিয়া – বিবাদী বাগ
  • রুট নং – ৩ বেলগাছিয়া – এসপ্ল্যানেড
  • রুট নং – ৪ বেলগাছিয়া – বিবাদী বাগ
  • রুট নং – ৫ শ্যামবাজার – এসপ্ল্যানেড
  • রুট নং – ৬ শ্যামবাজার – বিবাদী বাগ
  • রুট নং – ৭ বাগবাজার – এসপ্ল্যানেড
  • রুট নং – ৮ বাগবাজার – বিবাদী বাগ
  • রুট নং – ৯ শ্যামবাজার – এসপ্ল্যানেড
  • রুট নং – ১০ শ্যামবাজার – বিবাদী বাগ
  • রুট নং – ১১ বেলগাছিয়া – হাওড়া স্টেশন্
  • রুট নং – ১২ গালিফ স্ট্রীট – হাওড়া স্টেশন্
  • রুট নং – ১৩ গালিফ স্ট্রীট – হাওড়া স্টেশন্
  • রুট নং – ১৪ রাজাবাজার – বিবাদী বাগ
  • রুট নং – ১৫ হাই কোর্ট – এসপ্ল্যানেড
  • রুট নং – ১৫/১২ রাজাবাজার – হাওড়া স্টেশন্
  • রুট নং – ১৬ বিধাননগর – বিবাদী বাগ
  • রুট নং – ১৭ বিধাননগর – এসপ্ল্যানেড
  • রুট নং – ১৮ পার্ক সার্কাস – হাওড়া স্টেশন্
  • রুট নং – ২০ পার্ক সার্কাস – হাওড়া স্টেশন্
  • রুট নং – ২২ পার্ক সার্কাস – বিবাদী বাগ
  • রুট নং – ২৪ বালিগঞ্জ স্টেশন – বিবাদী বাগ
  • রুট নং – ২৪/২৯ বালিগঞ্জ – টালিগঞ্জ
  • রুট নং – ২৫ বালিগঞ্জ স্টেশন – বিবাদী বাগ
  • রুট নং – ২৬ বালিগঞ্জ স্টেশন – হাওড়া স্টেশন
  • রুট নং – ২৭ বালিগঞ্জ স্টেশন – বেহালা
  • রুট নং – ২৮ টালিগঞ্জ – এসপ্ল্যানেড
  • রুট নং – ২৯ টালিগঞ্জ – এসপ্ল্যানেড
  • রুট নং – ৩০ কালিঘাট – হাওড়া স্টেশন
  • রুট নং – ৩১ কালিঘাট – এসপ্ল্যানেড
  • রুট নং – ৩২ টালিগঞ্জ – হাওড়া স্টেশন
  • রুট নং – ৩৫ বেহালা – এসপ্ল্যানেড
  • রুট নং – ৩৬ ক্ষিদিরপুর – এসপ্ল্যানেড
  • রুট নং – ৩৫/৩৬ বেহালা – ক্ষিদিরপুর
  • রুট নং – ৩৭ জোকা – বিবাদী বাগ

 

বাস

বাস, পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ মানুষের জন্য পরিবহনের ক্ষেত্রে এক অতি অনিবার্য মাধ্যম। পরিবহনের এই মাধ্যমটি রেল বা কোনও নির্দিষ্ট ট্র্যাকের দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়, এটি এমনকি রাজ্যের যে কোনও দূরবর্তী স্থানেও উপপল্ধ রয়েছে। বাসগুলি শহর ও গ্রাম উভয় স্থানেই চলাচল করে। এমনকি পশ্চিমবঙ্গের এমনও কিছু প্রত্যন্ত গ্রাম রয়েছে যেখানে সারাদিনে কেবলমাত্র একটিমাত্র বাস দ্বারা পরিষেবা প্রদান করা হয়। রাজ্য-চালিত এবং বেসরকারি বাসগুলি লাখ-লাখ মানুষকে দৈনন্দিন পরিষেবা প্রদান করে চলেছে। যদিও বেশীরভাগ বাসই বেসরকারি মালিকানাধীনে চলে। পাবলিক বাসগুলি যদিও বৃহত্তর জায়গার সঙ্গে আরোও বেশি আরামপ্রদ তবে, বেসরকারি বাসগুলির তুলনায় খুবই বেশি সময়ের অন্তরে চলে। সেগুলি বিভিন্ন ভাবে শ্রেণীবদ্ধ করা আছে; যেমন – লিমিটেড স্টপ্ বাস (সীমিত জায়গায় দাঁড়ানো বাস), মোর্নিং-সানডাউন্ বাস (সকাল – সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলমান বাস), স্পেশ্যালস, এক্সপ্রেস সার্ভিসেস ইত্যাদি। বেসরকারিভাবে চালিত বাসগুলির মধ্যেও আবার বিভিন্ন ধরন রয়েছে; যেমন – মিনিবাস এবং চাটার্ড ও ছোট বাসও হতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গের বাসগুলির ভাড়ায় খুবই সাশ্রয়ী মূল্যের খরচ হয়। মাঝখানে অনেক স্টপেজ সহ এগুলিতে ভ্রমণের ক্ষেত্রে একটি খুবই সুবিধাজনক উপায়। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সমস্ত বাসগুলিতেই প্রতিবন্ধী, মহিলা ও বরিষ্ঠ ব্যাক্তিদের জন্য কিছু বসার আসন সংরক্ষিত করা থাকে। স্থানীয় বাসগুলির টিকিট সেই বাসেই ওঠা পরিবাহীর কাছ থেকে উপলব্ধ হয়। দীর্ঘ দূরত্বের যাওয়ার বাস টিকিট, প্রধান প্রধান বাস স্ট্যান্ডগুলিতে পাওয়া যায় এবং কখনও কখনও বাস ছাড়ার সময়ও উপলব্ধ হয়। বেশি দূরত্বের বাসগুলিতে বিনোদন ও বিলাসিতাসহ শীততাপ ব্যবস্থা উপলব্ধ রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ খুবই বিস্তীর্ণ সড়ক সংযোগ দ্বারা সু-সংযুক্ত রয়েছে। জাতীয় সড়ক, আন্তঃ-রাজ্য সড়ক এবং অভ্যন্তরীণ-রাজ্য সড়ক পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যকে পরিষেবা প্রদান করে। কলকাতা থেকে রামপুরহাট, দীঘা, বহরমপুর, শিলিগুড়ি, নামখানা, ডায়মন্ড হারবার এবং আরোও অন্যান্য রুটে দৈনন্দিন ভিত্তিতে দীর্ঘ দূরত্বের বাস পরিষেবা রয়েছে। এখান থেকে প্রতিবেশী রাজ্য যেমন বিহার, ঝাড়খন্ড এবং ওড়িশার বাসও উপলব্ধ রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ বাসগুলি আন্তর্জাতিকভাবে যাতায়াত করে। রাজধানী শহর কলকাতা থেকে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ এবং ভূটানের নিয়মিতরূপে বাস উপলব্ধ রয়েছে।

মেট্রো রেল

পশ্চিমবঙ্গ মেট্রো রেল বা পাতাল রেল হল ভূ-গর্ভস্থ রেল সংযোগ এবং কলকাতার ব্যস্তবহূল শহরের কাছাকাছি প্রাপ্য সবচেয়ে সুবিধাজনক উপায়। কলকাতা মেট্রো রেল ১৯৮৪ সাল থেকে চলে আসছে এবং এটি সমগ্র ভারতের সর্বপ্রথম ভূ-গর্ভস্থ মেট্রো রেল ছিল। এটি তার দক্ষ কার্যকারীতা, পরিচ্ছন্নতা, আরামপ্রদ স্বাচ্ছন্দ্যতা ও স্বল্প-সময় মানের জন্য সারা বিশ্বের কাছে উচ্চ সম্ভ্রমতার সাথে সাদরে গৃহীত।

কলকাতায় মেট্রো রেল মোট ১৬.৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সহ বর্তমানে দমদম থেকে টালিগঞ্জ পর্যন্ত প্রসারিত করা হয়েছে। এটি ১৭-টি স্টেশন্ জুড়ে যাতায়াত করে; যেমন-বেলগাছিয়া, শ্যামবাজার, শোভাবাজার, গিরিশ পার্ক, মহাত্মা গান্ধি রোড, সেন্ট্র্যাল, চাঁদনী চৌক, এসপ্ল্যানেড, পার্ক স্ট্রীট, ময়দান, রবীন্দ্র সদন, ভবানীপুর, যতীন দাস পার্ক, কালীঘাট এবং রবীন্দ্র সরোবর।

টালিগঞ্জ থেকে গড়িয়া শেষপ্রান্ত পর্যন্ত কলকাতা মেট্রো রেলের প্রসারিত রুটটি অগ্রগতির মধ্যে রয়েছে; এর মধ্যে যে সমস্ত স্টেশনগুলি রয়েছে, সেগুলি হল কূদঘাট, নিউ গড়িয়া, গড়িয়া বাজার, বাঁশদ্রোণী, প্রণবনগর এবং নাকতলা। এটি কলকাতার প্রায় সমস্ত প্রধান জনবহুল শহরগুলিকে আবৃত করায় এটি অত্যন্ত উপকারী হয়ে উঠবে। এই ব্যস্ত এলাকাটি আবৃত করতে একটি মসৃণ যাত্রার মাধ্যমে মাত্র ৩৩ মিনিট সময় লাগে, ব্যস্ত সময়ে যাতায়াতের অন্য মাধ্যমে এই দূরত্ব গেলে প্রায় ৯০ মিনিট সময় লাগে।

প্রতিটি মেট্রো রেল প্রায় ২৫৫৮ জন যাত্রী বহন করে এবং দিনের সময়ের উপর নির্ভর করে প্রতি ৫-১৫ মিনিট অন্তর এই পরিষেবা উপলব্ধ রয়েছে। কলকাতা মেট্রো রেল উন্নত প্রযুক্তি দ্বারা সুসজ্জিত রয়েছে এবং যাত্রীদের নিরাপত্তাই প্রধান লক্ষণীয় বিষয়। মেট্রো স্টেশন ও মেট্রো রেলগুলির অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়ন্ত্রিত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং উপযুক্ত বায়ু চলাচলের জন্য ভিতরে শীতল বায়ু প্রেরণ করা হয়। প্রতিটি মেট্রো স্টেশন থেকে দৈনিক টিকিট ও একাধিক বার চড়ার টিকিট উপলব্ধ হয়। কিছু কিছু স্টেশন এস্ক্যালেটার (চলন্ত সিঁড়ি) দিয়েও সুসজ্জিত করা রয়েছে।

রিকশা

রিকশা এখানকার পরিবহনের একটি মাধ্যম, যা পশ্চিমবঙ্গে সচরাচর সবসময় মানুষের অবলম্বন হিসাবে উপলল্ধ রয়েছে। রিকশা শব্দটি ‘জিঁরিকিশা’ থেকে উৎপত্তি হয়েছে, জাপানীদের কাছে যার আক্ষরিক অর্থ হল মানব-চালিত যানবাহন। তারা ১৯০০ সালে চীনা অভিবাসীদের দ্বারা কলকাতায় এটির প্রবর্তন চালু করা হয়েছিল এবং তখন থেকেই এটি পরিবহনের জনপ্রিয় মাধ্যম হিসাবে এখানে রয়ে গেছে। ডোমিনিক লেপিয়্যের-এর ‘আনন্দ নগরীর’ রিকশা পশ্চিম বাংলার বাইরের অধিবাসীদের অবিস্মরণীয় করে রেখেছে। যারা পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু গলি-রাস্তায় নিরাপত্তার জন্য ভারী যানবাহনের যাতায়াত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং সেই সমস্ত রাস্তায় পরিবহনের একমাত্র বিকল্প হল এই রিকশা। এগুলি স্বল্প দূরত্বে ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত এবং যখন কেউ তার গন্তব্যের খুবই কাছে পৌছতে চায় তখন অনেকেই এটিকে পছন্দ করেন। রিকশা অতি সহজেই যেকোনও সংকীর্ণ গলি ও রাস্তায় ঢুকে পড়ে, তাই সর্বদাই এর চাহিদা রয়েছে।

রিকশা, পশ্চিমবঙ্গে পরিবহনের একটি দূষণমুক্ত মাধ্যম এবং সেইসঙ্গে বাস ও রেলের তুলনায় এর ভাড়াও সাশ্রয়ী মূল্যের। একজন চালক দুটি চাকায় রিক্সা টেনে নিয়ে দৌড়ায়। পশ্চিমবঙ্গে এই রিকশা বেছে নেওয়ার বেশ কয়েকটি বিকল্প রয়েছে; যেমন – সাইকেল রিকশা, হাতে টানা রিকশা এবং সাইকেল ভ্যান রিকশা। সাইকেল রিকশা এবং হাতে টানা রিকশা, এই উভয় দুটিতেই দুইজন করে বসার আসন রয়েছে, তবে বাচ্চাদের জন্য অতিরিক্ত ভাড়া ন্যস্ত রয়েছে। সাইকেল-ভ্যান রিকশাগুলি পণ্য বহনের কাজেও ব্যবহৃত হয়। এই রিকশাগুলি পশ্চিমবঙ্গের সমগ্র জায়গায় সক্রিয় রয়েছে কিন্তু নিরাপত্তার কারণে কলকাতার কিছু নির্বাচিত অংশে এর ব্যবহার রয়েছে। ১৯০০ সালে চীনা অভিবাসীদের দ্বারা কলকাতায় এটির প্রবর্তন চালু করা হয়েছিল এবং তখন থেকেই এটি পরিবহনের জনপ্রিয় মাধ্যম হিসাবে এখানে রয়ে গেছে।

কারোর জন্য রিকশায় যাতায়াত পশ্চিমবঙ্গের পরিবহনের একটি অপরিহার্য মাধ্যম। অন্যান্য কিছু মানুষ এতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় উত্থাপণ করেছেন কারণ রিকশাচালকদের জন্য এটি একটি খুবই শ্রম নিবিড় কাজ।

চক্র রেল


কলকাতার চক্র রেল, পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী শহরের ধারেপাশে প্রাপ্ত পরিবহনের এক অন্যতম সুবিধাজনক উপায়। পূর্বে, অন্যান্য বড় বড় শহরগুলোর ন্যায় কলকাতার কেন্দ্রীয় অংশে কোনও রেল সংযোগ ব্যবস্থা ছিল না। ক্রমবর্ধিত জনসংখ্যার সাথে সাথে শহরে একটি রেল সংযোগ ব্যবস্থার চাহিদাও বাড়তে থাকে। প্রয়োজনীয় সমস্যাপূরণে চক্র রেল কলকাতায় হুগলী নদীর তীর বরাবর চালিত রয়েছে। পূর্ব রেল দ্বারা পরিচালিত এই চক্র রেল এখন সারা শহর জুড়ে চমৎকার সংযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। তবে, পশ্চিমবঙ্গের আর অন্য কোনও স্থানে এই চক্র রেল পরিষেবা নেই।

চক্র রেলের তার নিজস্ব স্টেশন রয়েছে; যেমন – দমদম, পাতিপুকুর, বেলগাছিয়া, টালা, উল্টোডাঙ্গা রোড, বাগবাজার, শোভাবাজার, চিৎপুর, বড়বাজার, বিবাদী বাগ, প্রিন্সেপ ঘাট, হ্যাসটিঙ্গস, খিদিরপুর, রিমাউন্ট রোড, মাঝেরহাট, নিউ আলিপুর, টালিগঞ্জ, লেক গার্ডেনস, বালিগঞ্জ, স্যার গুরুদাস ব্যানার্জ্জী হল্ট, বিধাননগর রোড হয়ে পুনরায় দমদমে ফেরৎ যায়।

কলকাতা চক্র রেল দমদম থেকে জেসপ, যশোর রোড, ভি.আই.পি রোড এবং কলকাতা এয়্যারপোর্ট ডোমেস্টিক টার্মিন্যাল সড়ক হয়ে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত প্রায় ৩.৮ কিলোমিটার প্রসারণের কাজ অগ্রগতিতে রয়েছে। অন্য আরেকটি, মাঝেরহাট থেকে প্রিন্সেপ ঘাট পর্যন্ত কলকাতার সমগ্র পরিধি জুড়ে ৫.৮ কিলোমিটার প্রসারণের কাজ অগ্রগতিতে রয়েছে, এটি বেহালা ও বজবজ অঞ্চলের জনসাধারণের কাছে খুবই উপযোগী হয়ে উঠবে। এই চক্র রেলের আরও প্রসারণের কাজও নিরীক্ষণের মধ্যে রয়েছে; সেগুলির রুট হল উল্টোডাঙ্গা থেকে রাজারহাট এবং ব্যারাকপুর থেকে সোনারপুর ভায়া রাজারহাট নিউ টাউন। এই চক্র রেল সংযোগ উপস্থিতি প্রকৃতপক্ষে সমগ্র শহরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে এবং এক উন্নততর কলকাতা গড়ে উঠবে।

পশ্চিমবঙ্গ সমাজ

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সংস্কৃতি সমৃদ্ধ এবং স্পন্দনশীল। পশ্চিমবঙ্গের সমাজ বহু শতাব্দীর প্রাচীন ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করে। শিল্প, সাহিত্য ও সঙ্গীত এই রাজ্যের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে একজন সদস্য দেখা যাবে যে, যেকোন একটি শিল্পকলার সঙ্গে জড়িত। পশ্চিমবঙ্গের সমাজ একটি বিশ্বজনীন সমাজ।

মহান পুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়দের অদ্বিতীয় অবদানে পশ্চিমবঙ্গের সমাজ সমৃদ্ধ। নোবেলজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলার সংস্কৃতিতে নবজাগরণ এনেছেন। কলকাতার সাংস্কৃতিক আলোকায়ন কিছু প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে; যেমন – কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা মেডিকেল কলেজ।

পশ্চিমবঙ্গের সমাজ একটি বিশ্বজনীন সমাজ। এই রাজ্যের জনসংখ্যা বিভিন্ন ধর্ম, সম্প্রদায়, জাতি এবং গোষ্ঠীর মানুষ নিয়ে গঠিত। বিশ্বজনীন প্রকৃতি সমাজকে আরো প্রাণবন্ত এবং গতিশীল করে তোলে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বন্ধুত্বপূর্ণ এবং অমায়িক হয়, আপনি দুর্গা পূজা, দিওয়ালী এবং বড়দিনর উৎসবে এই রাজ্য পরিদর্শন করলে এটি বেশ স্পষ্ট ভাবেই অনুভব করবেন।

এই রাজ্যের সমাজ তার অনন্য সূক্ষ্মতার জন্যেও সুপরিচিত। যেই সব খাদ্য প্রেমীরা এখানে রসগোল্লা, ভাপা ইলিশ, লুচি, আলুর দম, মাছের কালিয়া, চিংড়ি মাছের মালাইকারী আরও বহু খাবার উপভোগ করতে আসেন তাদের জন্য এটি এক উত্তম ভোজনসংক্রান্ত স্বর্গোদ্যান।

সংস্কৃতি

পশ্চিমবঙ্গ ভারতের এক অন্যতম রাজ্য যা সমৃদ্ধ এবং ঐশ্বর্যময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সম্পন্ন। বিভিন্ন সম্প্রদায়, উপজাতি ও ধর্মীয় পটভূমি থেকে আগত মানুষরা এই রাজ্যে বাস করছে এবং বিভিন্ন ধর্মানুষ্ঠান এবং রীতিনীতি অনুসরণ করছে, যা রাজ্যের সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করে। এই রাজ্যের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বিভিন্ন ভাষায এবং উপভাষার মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়।

বিভিন্ন শিল্পকলার রূপ যথা নাচ, গান এবং শিল্পকলায় পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি সমৃদ্ধ। এইসব ক্ষেত্রের প্রধান অবদানকারীরা হলেন – অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বোস, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, যামিনি রায়, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামকিংকর বেজ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ।

এমনকি সাহিত্য ক্ষেত্রেও বাংলা ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। বাংলার প্রধান কিংবদন্তি লেখকরা হলেন -কবি জয়দেব, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, এন সি চৌধুরী, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত, মধুসূদন দত্ত, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অমিতাভ ঘোষ, অরুন্ধতী রায়, সুকুমার রায়, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাস, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এবং আরো অনেক। এখানকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বাউল সঙ্গীত, গম্ভীরা,ভাওয়াইয়া, ছৌ নাচ – এর মত বিভিন্ন লোক সঙ্গীত এবং নৃত্য দ্বারা প্রভাবিত।

মানুষের সাংস্কৃতিক জীবনকে মেলা এবং উৎসব যেমন – দুর্গা পূজা, দিওয়ালী, হোলি, পয়লা বৈশাখ এবং আরো অনেক অনুষ্ঠান উদ্দীপিত করে। পাঁচদিন ধরে অনুষ্ঠিত দূর্গাপূজায় রাজ্যের সাংস্কৃতিক সৌন্দর্য প্রকাশিত হয়। দূরস্হান থেকে আগত লোকজন এই আধ্যাত্মিক উৎসবে বিমোহিত হয়।

সম্প্রদায়

পশ্চিমবঙ্গের মানুষজন বিভিন্ন জাতি, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং সম্প্রদায়ের অন্তর্গত। বাংলার মানুষের প্রথাগত পোশাক হল ধুতির সঙ্গে একটি জামা। আধুনিক শহুরে মানুষজন তাদের সুবিধার্থে পায়জামা ও ফুল প্যান্ট পরিধান পছন্দ করে। কিন্তু প্রবীণ মানুষজন এখনও এই প্রথাগত পোশাকটি উপভোগ করেন। গ্রামীণ এবং শহুরে উভয় এলাকার মহিলারা শাড়ি, ফুল প্যান্ট এবং সালোয়ার কামিজ ইত্যাদি পরিধান করে। পশ্চিমবঙ্গে ৪০-টি বিশিষ্ট সম্প্রদায়ের উপজাতি দেখা যায়, তাদের মধ্যে কিছু হল- সাঁওতাল, মুনা, ওঁড়াও, লেপচা, এবং ভুটিয়া। এই উপজাতিরা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক দশমাংশ নিয়ে গঠিত।

পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ মানুষই হিন্দু এবং হিন্দু-ধর্ম মত অনুসরণ করে। মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত। কিছু মানুষ বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং শিখ ধর্মের অন্তর্গত। এই রাজ্যে বিভিন্ন রকমের মানুষের বসতি থাকায় এটি একটি বিশ্বজনীন সমাজভুক্ত। পশ্চিমবঙ্গের মানুষদের অন্যতম প্রধান জীবিকা হল কৃষিকাজ। গ্রামীণ মানুষেরা চাল, গম, ডাল, সবজি ইত্যাদি চাষের সাথে নিযুক্ত, যা শুধুমাত্র রাজ্যেরই না বরং পুরো দেশের খাদ্যাদির প্রয়োজন মেটায়। পশ্চিমবঙ্গের মানুষরা বাংলয় কথা বলে, কিন্তু হিন্দি, পাঞ্জাবি, ভোজপুরি ভাষাও এখানে প্রচলিত।

পাঁচটি পৃথক বর্ণের প্রজাতি থেকে আগত মানুষরা পশ্চিমবঙ্গের বসবাস করে। প্রাচীনতম জাতির মূল উৎস হল প্রোটো-অস্ট্রেলিয়ান। নিষাদ হল প্রধানত এক ধরনের আদিবাসী গোষ্ঠী যাদের মালভুমি এবং ছোটনাগপুর এবং মধ্য ভারতের সংলগ্ন এলাকায় দেখা যায়। উপজাতিরা বেঁটে, লম্বা মাথা, কালো গায়ের রঙ এবং চওড়া নাক যুক্ত হয়। দ্রাবিড় জাতিরা লম্বা মাথা, লম্বা গঠন এবং তীক্ষ্ণ নাক যুক্ত হয়, যাদেরকে বাংলায় দেখা যায়। দার্জিলিং-এর অধিবাসীরা মঙ্গোলীয় জাতি। পঞ্চম জাতিটি হল আলপাইন বা ইন্দো-আর্য জাতি, যাদের ফরসা রঙ, টিকালো নাক এবং লম্বা শরীর।

পশ্চিমবঙ্গের কারুশিল্প

পশ্চিমবাংলাই সবসময় দেশের সংস্কৃতিক বাহিনীকে চালনা করছে। তা সে সঙ্গীত, শিল্পকলা বা কারুশিল্প যাই হোক – হস্ত নির্মিতবস্তু এবং হস্তশিল্পেও এই রাজ্যের এক দৃষ্টান্তমূলক দক্ষতা আছে। বাংলার বিভিন্ন শিল্পী ও কারিগরেরা বহুদিন ধরেই তাদের অত্যাশ্চর্য ও বর্ণময় হস্তশিল্প দেশ ও বিদেশে সরবরাহ করে। বাংলার কারুশিল্পকে অনেক ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে, তাদের মধ্যে কয়েকটি হল –

  • চর্ম শিল্প
  • বাঁশ ও বেত
  • কাঁসা এবং পিতল
  • মাটির পুতুল
  • চীনামাটি
  • শৃঙ্গ ভাস্কর্য
  • পাটজাত পণ্য
  • চন্দন কাঠ খোদাই
  • তাঁত
  • মৃৎশিল্প
  • মঙ্গল ঘট
  • লক্ষ্মী ঘট
  • তুলসী মঞ্চ
  • মনসা ঘট
  • শাঁখের ভাস্কর্য
  • খোদাই
  • অস্থি খোদিত ভাস্কর্য
  • পাথর খোদিত ভাস্কর্য
  • কাঠের কাজ
  • ডোকরা ধাতু শিল্প
  • সিল্ক পর্দা

প্রতিটি সুক্ষ্ম কাজের নিজস্ব একটি স্বতন্ত্রতা আছে। বাংলার তাঁতিরা বিভিন্ন ধরনের শিল্প কাজে দক্ষ। জামদানি, কাঁথা এবং বিভিন্ন ধরনের তাঁত পণ্য বাংলার সমৃদ্ধ বয়ন শিল্পকে অনেকটাই ধরে রেখেছে। এই রাজ্য কিছু অসামান্য ধাতু ও পাথরের কারুশিল্পের সঙ্গেও আশীর্বাদ প্রাপ্ত। ধাতু ও পাথরের ভাস্কর্য, প্রদর্শনী দ্রব্য, গহনা ইত্যাদি এরই অন্তর্ভুক্ত। ডোকরা ধাতু কাজ হল হস্তশিল্পের এক অতি দুর্লভ রূপ, যা বাংলা ও পূর্ব ভারতের কিছু অন্যান্য জায়গায় পাওয়া যায়। বাংলার কারিগররা বিভিন্ন ধরনের ভাস্কর্য কর্মে দক্ষ যেমন – পাথর, অস্থি, কাঠ জাত পণ্য এবং শাঁখের ভাস্কর্য।

মৃৎশিল্প

ভারতের পূর্বাঞ্চলের অন্যতম রাজ্য পশ্চিম বঙ্গ হস্তশিল্পের জন্য সুপরিচিত, এরই মধ্যে মৃৎশিল্প হল অন্যতম। পশ্চিমবঙ্গে, মৃৎশিল্পের ক্ষুদ্র শিল্পগুলি বাঁকুড়া, মুর্শিদাবাদ এবং মেদিনীপুর জেলায় রয়েছে। সাধারণত গ্রামের নারী সম্প্রদায় এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। কখনো কখনো পুরুষরাও মৃৎশিল্প তৈরীতে নিজেদের যুক্ত করে। পশ্চিমবঙ্গে মৃৎশিল্পের বিভিন্ন বৈচিত্র্য দেখা যায়। সেগুলি মৃত্তিকা দ্বারা তৈরি এবং বিভিন্ন মাপ ও আকারে পাওয়া যায়। মৃৎশিল্প এক অন্যতম স্থানীয় হস্তশিল্প যা আদ্যিকাল থেকে রাজ্যে প্রচলিত আছে। এছাড়াও বিভিন্ন উদ্দেশ্যে মৃন্ময় পাত্রাদি ব্যবহার করা হয়।

মঙ্গল ঘট হল মাটির ঘট যা সাধারন ভাবে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামের কুম্ভকারদের দ্বারা আঁকা ও রং করা হয়। যেগুলিকে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু গৃহের একটি অপরিহার্য বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই মৃণ্ময় পাত্রাদি বিভিন্ন ধরনের গৃহস্থালির শুভকর্মে ব্যবহৃত হয় যেমন- বিবাহ অনুষ্ঠান, জন্মানুষ্ঠান এবং বিভিন্ন মঙ্গলজনক ধর্মানুষ্ঠান।

লক্ষ্মী ঘট বা ফুলদানি সাধারণত মঙ্গলজনক কর্মে জোড়ায় আনা হয়। এই জোড়া ঘটের একটি লক্ষ্মী বা ধনের দেবী এবং অন্য একটি প্রভু গণেশের জন্য বলে মানা হয়। লক্ষ্মী ঘট এছাড়াও লক্ষ্মী হিসাবে পরিচিত সম্পদ দেবীর পূজায় ব্যবহৃত হয়। এই ধরনের ঘটকে পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত অন্যান্য মৃন্ময় পাত্রাদির মধ্যে সবথেকে মঙ্গলজনক হিসেবে গণ্য করা হয়।

মনসা ঘট বিভিন্ন আকারের পাওয়া যায়। এই মাটির পাত্রাদি সর্প দেবীকে সম্মান দেওয়ার জন্যে আঁকা হয়। এই অঙ্কন প্রধানত ঊর্ধ্বোত্থিত মৃন্ময় ঘটের উপর করা হয়। দেবীর মুখচিত্র অঙ্কনের পাশাপাশি, সর্প ফণার চিত্রও এই ঘটের উপর আঁকা হয়।

তুলসী মঞ্চ মাটি দিয়ে তৈরি করা হয় এবং কোথাও কোথাও ইট দ্বারা নির্মাণ করা হয়। এই মৃন্ময় মঞ্চে বিভিন্ন দেব দেবীদের প্রতিকৃতি অঙ্কণ করা হয় বিশেষত রাধাকৃষ্ণ। তুলসী মঞ্চ ভূমি থেকে প্রায় তিন থেকে চার ফুট উত্থাপিত করে একটি স্তম্ভ আকারে নির্মাণ করা হয়। সাধারণত এই স্তম্ভের ব্যাস প্রায় দেড় থেকে দুই ফুট হয়। এই চৌহদ্দির সব পক্ষ বাঁকা হয়। তুলসী মঞ্চের আকৃতি বিভিন্ন রকমের হতে পারে, আয়তক্ষেত্রাকার, অষ্টকোণী বা ষড়ভূজাকার। তুলসী মঞ্চের প্রতিটি দিকে বিভিন্ন দেব দেবীদের প্রতিকৃতি অঙ্কণ করা হয় বিশেষত রাধাকৃষ্ণ।

তুলসী মঞ্চ মাটিতে স্থাপন করা হয় এবং ধীরে ধীরে এর ভিতটি প্রশস্ত করা হয়। ইট দিয়ে সজ্জিত করার পর মাটি দিয়ে এর কাঠামোটি তৈরি করা হয়। তারপর একটি তুলসী বা বেসিল চারা রোপণ করা হয়। হিন্দুদের কাছে তুলসী গাছ খুবই পবিত্র এবং বিশুদ্ধ বলে মনে করা হয়। পরিবারের কল্যাণ কামনা করে তুলসী গাছ প্রতিটি হিন্দু গৃহে মহিলাদের দ্বারা পূজিত হয়।

শিল্পকলা

শিল্পকলা পশ্চিমবঙ্গের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ও প্রত্যেক গৃহের একটি অভিন্ন অংশ। রাজ্যের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের শিল্পকলা নাচ, গান, হস্তশিল্প এবং চিত্রকলা মিশে আছে। পশ্চিমবঙ্গের শিল্প সমৃদ্ধকরণে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর – এর অবদান অতুলনীয়। তিনি শতাব্দী জুড়ে নতুন উচ্চাকাঙ্ক্ষী সঙ্গীতজ্ঞ এবং নর্তক-নর্তকীদের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আসছেন।

বস্তুত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক নতুন ধারার কণ্ঠসংগীত সৃষ্টি করেন, যা তাঁর নামনুসারে ‘রবীন্দ্র সঙ্গীত’ নামে পরিচিত। এগুলি তাঁরই লিখিত এবং রচিত। প্রকৃতপক্ষে, এই গানগুলি বাংলা ভাষায় লেখা, যেগুলির পরে বহু অন্যান্য ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের তৈরি এক বিদ্যালয় শান্তিনিকেতনে বিভিন্ন ধরনের শিল্পকলা শেখানো হয়, যা পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি অর্জন করেছে এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় নামে তা পরিচিত। ব্যালে নৃত্য শৈলী, উদয় শঙ্কর ও তার স্ত্রী অমলা শঙ্কর দ্বারা ভারতে প্রচলিত হয়েছে। রাজধানী শহর কলকাতায় তারা বহু নৃত্য শিল্পীদের এই শৈলীর প্রশিক্ষণ দেন এবং তাদের দল নিয়ে বিশ্ব জুড়ে নৃত্য শৈলী প্রদর্শন করেন।

চারুকলা ক্ষেত্রে, বাংলার শিল্পীরা তাদের অসাধারণ কাজের জন্য বিখ্যাত। এই বিখ্যাত শিল্পীরা ভারতীয় চারু ও কারু কলাকে একটি নতুন পথ প্রদর্শন করেছেন, উদাহরণ স্বরূপ – গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বোস, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যামিনি রায়, রামকিঙ্কর বেজ্। বাংলা লোকগিতিতে বাউল ঐতিহ্য অত্যন্ত জনপ্রিয়। বহুসংখক অন্যান্য ধরনের লোকসঙ্গীত যেমন গম্ভীরা এবং ভাওয়াইয়ও প্রচলিত। শিল্প কলার অন্য এক রূপ নৃত্য, বাংলা সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। শাস্ত্রীয় নৃত্য যেমন – ভারতনট্যম, মণিপুরী, কত্থক এবং লোক শৈলী যেমন – ছৌ নাচ শিল্পীদের দ্বারা শেখান হয়। ছৌ-লোকনৃত্য পুরুষ নর্তক দ্বারা মুখোশ পরে প্রদর্শন করা হয়।

তাঁত

হস্তচালিত পন্যের মধ্যে তাঁত হল এক অন্যতম রূপ, যা পশ্চিমবঙ্গ আমাদের উপহার দিয়েছে। বাংলার শিল্প ও নৈপুণ্যের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে সুসংগত রেখে, বাংলার তাঁত এবং তাঁতের শাড়ি ফ্যাশন ডিজাইনার্, শৈলী প্রেমী এবং ব্যবহারকারীদের কাছে অতি প্রিয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলায় তাঁত শাড়ি ভূষিত জননীসুলভ চিত্র প্রত্যেক গৃহেই এক খুবই সাধারণ এবং প্রীতিজনক দৃশ্য। একটি ঐতিহ্যগত বাঙ্গালী মহিলার সবচেয়ে সম্ভাব্য চিত্রের বৈশিষ্ট্যটি হল লাল সাদা তাঁতের শাড়ির সঙ্গে লাল আঁচল। এই চমৎকার শাড়িটি বাঙ্গালীদের পূজায় এবং অন্যান্য উৎসবে অতি আবশ্যক। এটি খুব সহজেই উপলব্ধ করা যায় যে, তাঁত বাংলা ও সংলগ্ন এলাকায় অতি জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ।

মসলিনের মত কড়কড়ে ও পালকের ন্যায় ওজনের জন্য তাঁত খুবই জনপ্রিয়। তাঁত শাড়ি সত্যিই আরামদায়ক ও দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য আদর্শ। শাড়ির পুরো গা জুড়ে থাকা চওড়া এবং রেশমী সুতোর কাজ সর্বোত্তম বাঙ্গালী নকশার এক চমৎকার উদাহরণ। এছাড়াও রঙিন তাঁত বস্ত্র সালোয়ার কামিজ, পাঞ্জাবি এবং জামা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। তাঁতের শাড়ির আঁচল অথবা পল্লুটি সম্পূরক সুতোর কাজ দিয়ে অলঙ্কৃত করা হয়, যা এই পরিধানটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। আধুনিক মহিলাদের কাছেও তাঁত পোশাক খুব জনপ্রিয়, বিশেষত চাকুরীরতা মহিলা, যারা এটিকে দৈনন্দিন ব্যবহার ও অনুষ্ঠানে ব্যবহার করতে পারেন, একই প্রানবন্ততার সঙ্গে।

অস্থি খোদিত ভাস্কর্য

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের অদ্ভুত কারুশিল্পগুলির মধ্যে অস্থি খোদাই ভাস্কর্য বহু বছর ধরে প্রচলিত। ভারতের এই পূর্ব রাষ্ট্র সর্বদা ভারতের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হয়ে রয়েছে এবং হস্তনির্মিত সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী পণ্য এরই একটি অংশ।

পশ্চিমবঙ্গ গজদন্ত খোদাই ভাস্কর্যে বিশেষজ্ঞ এবং কারুশিল্পী গজদন্ত খোদাই করে সূক্ষ্ম শিল্পপণ্য তৈরি করে। গজদন্তের সাদা প্রতিভালিপ্ত হস্তনির্মিত পণ্যশিল্পের নিজস্ব একটি আভিজাত্য রয়েছে, যা অত্যন্ত ঐশ্বর্যশালী। গজদন্তের প্যানেল নির্মিত বিছানা, আলমারি, সাজসজ্জা করার টেবিল, কেদারা, সিংহাসন, পালকি ও অন্যান্য অনুরূপ পণ্য রাজা ও রানীদের কাছে খুবই ইপ্সিত ছিল। বাংলার কারিগর দ্বারা তৈরি গজদন্তের টেবিল বা পাত্র এই পরিবার গুলিতে খুবই প্রচলিত ছিল। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলা এই বিষয়ে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পশ্চিমবঙ্গের খাগড়া এবং জয়গঞ্জ সুরুচিপূর্ণ অস্থি খোদাই ভাস্কর্যের জন্যে এই জেলার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু।

পশ্চিমবঙ্গে গজদন্ত খোদাই ভাস্কর্যে হিন্দু ও ইসলামী উভয় নকশাই করা থাকে, যা সব ধর্ম নির্বিশেষে সমান ভাবে পছন্দের। হিন্দু দেবদেবীর নকশা শিল্পকলায় খুবই সাধারণ। গজদন্ত নির্মিত মূর্তিগুলি তার সহজাত বহুমুখিতার জন্য আশ্চর্যকর। গজ ও অশ্বের নকশা টানা গজদন্ত নির্মিত পণ্য ও গহনা বাক্স খুবই জনপ্রিয় পণ্য। এই অলংকার বাক্স, বিশেষত রাজকীয় মহিলাদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় ছিল।

এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুরের উভয় জেলা, বিশেষ করে নারায়ণ চক, তমলুক এবং জোত ঘনশ্যাম এলাকা পশু শৃঙ্গ দ্বারা নির্মিত চিরুনির জন্য সুপরিচিত। এটি গ্রামের লোকেরা খুব বেশী পরিমাণে ব্যবহার করে,কারন তারা বিশ্বাস করে যে এই পশু শৃঙ্গ নির্মিত চিরুনি মাথা ও চুলের জন্য উপকারী। কালো ও ধূসর রঙের চকচকে এই চিরুনিগুলির এক নিজস্বতা আছে।

পাথর খোদিত ভাস্কর্য

পাথর খোদিত ভাস্কর্য পশ্চিমবঙ্গে একসময় খুবই প্রচলিত ছিল। ক্রমাগত বাজারে অন্যান্য শিল্প আসার সাথে সাথে এই ভাস্কর্য অনেকটাই বিলুপ্তির পথে এসে গেছে। কিন্তু এখনও পশ্চিমবঙ্গের প্রতিভাবান কারিগররা এই সুন্দর নৈপুণ্য পণ্য নির্মাণে অব্যাহত আছে, এবং তার এক নিজস্ব সৌন্দর্যশীলতা প্রদর্শন করে। এই ভাস্কর্য শিল্পীদের কোন প্রথাগত প্রশিক্ষণ নেই। তারা পূর্বপুরুষদের থেকে এই বুনিয়াদি শিক্ষা অর্জন করেছে এবং তাদের নিজস্ব জ্ঞান মিশ্রিত করেছে। শেষ পর্যন্ত, এটি সৌন্দর্যায়িত হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের পাথর খোদাই ভাস্কর্য শিল্পীরা বিশেষত পাথরের পাত্র নির্মাণের সাথে নিযুক্ত। হস্তচলিত খোদাই বিভিন্ন আকার ও আকৃতির পাত্র নির্মাণ করতে ব্যবহৃত হয়। খোদাই করার উদ্দেশ্য ফাইলাইট পাথর ব্যবহৃত হয়, একটি অর্ধ-নরম ধূসর রঙের পাথর যা দিয়ে সহজেই খোদাই করা যায়। পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার শিমূলপুর এই ক্ষেত্রে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। পাথরের বাসনপত্র যত্ন সহকারে ব্যবহার করা প্রয়োজন, এই জন্যই বহু অন্যন্য উপকরণ সাধারণ মানুষদের কাছে বেশি প্রচলিত।

বর্ধমান, পাটুন ও দাঁইহাট-এর ভাস্কর অথবা সুত্রধররা তাদের সুক্ষ্ম পাথর খোদাই কাজের জন্য বিখ্যাত। তাদের খোদাই করার বিষয় হল মূর্তি এবং মন্দির ও গৃহের দেয়ালে খোদাই করা ক্ষুদ্র মানব মূর্তি। দণ্ডায়মান ভাস্কর্য তাদের কর্মক্ষেত্রের এক অবিশ্বাস্য উদাহরণ। পশ্চিমবঙ্গের মন্দিরগুলিতে লাল ইট পাথরের ব্যবহার খুব প্রচলিত। এই মন্দিরগুলিকে আরও অলঙ্কৃত করার জন্য পাথর কেটে নকশা করা হয়। বিভিন্ন নকশা যেমন – হাতি, অশ্ব এবং দেবদেবী বঙ্গের মন্দিরগুলির এক প্রচলিত পাথর খোদিত ভাস্কর্য।

কাঁথা

বাংলার মহিলাদের দ্বারা বাহিত কাঁথা শিল্প বাংলার এক অসাধারণ সূচিকর্ম শিল্প। এই ধরনের গ্রামীণ সূচিকর্ম ব্যাপক ভাবে রাজ্যে ব্যবহৃত হয়। বাঙ্গালী পরিবারের মা ও বোনেরা কাঁথা শিল্পকে বিভিন্ন রূপে গ্রহন করেছেন, হয় গৃহস্থালী বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে। কাঁথা শিল্প সমাজের আয়না রুপে কাজ করে, যার মধ্য দিয়ে ধর্মীয় ও সামাজিক বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটে। তারা এই অপূর্ব রূপের হস্তচালিত শিল্পের মাধ্যমে তাদের স্বপ্ন এবং ইচ্ছাকে চিত্রাঙ্কন করে।

কাঁথা একটি সহজে চলমান সেলাই উপর ভিত্তি করে করা হয় কিন্তু এটি সেরা শিল্প কর্মের কাজেও ব্যবহার করা যেতে পারে। কাঁথার সরলতা এর অপরিমেয় জনপ্রিয়তার কারণ। কাঁথার উৎপত্তি কোঁথা-র সাথে সম্পর্কিত, সংস্কৃতে যার অর্থ ছিন্ন বস্ত্র। এটি বলা হয় যে বুদ্ধ দেবের শিষ্যরা ঠাণ্ডা থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্যে একসাথে দুটি বস্ত্র সেলাই করতেন যাতে এটি মোটা ও উষ্ণ হয়। শ্রী শ্রী চৈতন্য চরিতামৃতে উল্লেখ করা হয়েছে যে কাঁথা একটি নারীর আত্ম অভিব্যক্তি তুল্য।

শেষ পণ্যের উপর ভিত্তি করে কাঁথার বিভিন্ন নমুনা গুলি হল –

  • অর্চিলতা কাঁথা – ছোট, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আয়নার পর্দা রূপে ব্যবহৃত হয়।
  • দুরজানি বা থালিয়া – বেশিরভাগই মানিব্যাগ তৈরি করতে ব্যবহৃত হয়।
  • বাঁইতো কাঁথা – বইয়ের এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রীর আচ্ছাদন হিসেবে ব্যবহার হয়।
  • সুজানি কাঁথা – এক আলংকারিক কাঁথা, যা অষ্টাদশ শতাব্দীর থেকে কম্বল হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
  • ওয়ার কাঁথা – যা আলংকারিক বালিশের আচ্ছাদন হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
  • রুমাল কাঁথা – যা রুমাল ও পাত্রের আচ্ছাদন হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

কাঁথা যে ভাবেই ব্যবহার হোক না কেন, এটি বাংলার মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

দেওয়ালে ঝুলন্ত সামগ্রী (ওয়াল হ্যাঙ্গিং)

পশ্চিমবঙ্গের অত্যন্ত সুন্দরভাবে অলঙ্কৃত ওয়াল হ্যাঙ্গিং, রাজ্যের কারিগরদের সমৃদ্ধ শৈল্পিক দক্ষতা এবং সৃজনশীল কল্পনাকে প্রতিনিধিত্ব করে। পশ্চিমবঙ্গের এক অন্যতম উদীয়মান শিল্প, হস্তজাত শিল্প বহু আলংকারিক পণ্য উৎপাদন করে।

পশ্চিমবঙ্গ ভারতের এক অন্যতম পাট উৎপাদক রাজ্য। রাজ্যের হস্তজাত শিল্প থেকে পাটের বহু পণ্য উৎপাদিত হয় যেমন – সুন্দর ডিজাইনের গালিচা, আকর্ষণীয় পাটের থলি, পাটের রঙিন দুয়ারে পাতার মাদুর এবং অনেক অন্যান্য অলঙ্কারিক গৃহস্থালি পণ্য। ওয়াল হ্যাঙ্গিং, পশ্চিমবঙ্গের এই ধরণের এক ক্ষুদ্র কুটির ও গ্রামীণ শিল্পের রূপ।

পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় শিল্পীরা পাটের সূক্ষ্ম সুতো দিয়ে বুনে বিভিন্ন সুন্দর ওয়াল হ্যাঙ্গিং তৈরি করে। পাট তন্তুর প্রাকৃতিক সোনালী রঙ ওয়াল হ্যাঙ্গিংগুলিকে এক হলুদ এবং সোনালী বর্ণ প্রদান করে। আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে কারিগররা রঙিন রেশম সুতো এবং পুঁতি দিয়ে এই ওয়াল হ্যাঙ্গিংগুলিকে সুসজ্জিত করে।

এই ওয়াল হ্যাঙ্গিং আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসা প্রাপ্ত, রাজ্য পরিদর্শন করতে আসা যে কোন পর্যটক এটি ক্রয় করবে বলে ঠিক করেই রাখে। ওয়াল হ্যাঙ্গিং, বিভিন্ন উদ্দেশ্যে পরিবেশন করা হয়। একদিকে ওয়াল হ্যাঙ্গিং, একটি অলঙ্কারিক উপকরণ হিসাবে ব্যবহার করা হয় যা গৃহের শোভা বাড়ায়, অন্যদিকে এটি স্মারক হিসাবে ব্যবহার করা হয় যা আপনজন এবং প্রিয়জনদের উপহার দেওয়া হয়।

হস্তকলা শিল্প পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির মেরুদন্ড। এই ক্ষুদ্রায়তন হস্তশিল্প ও কুটির শিল্প থেকে রাজ্য, রাজস্বের এক বৃহৎ অংশ আয় করেন। হস্তজাত শিল্পের ওয়াল হ্যাঙ্গিং, অতীতের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করে, যা পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান যুগের অর্থনৈতিক অবস্থাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

বালুচরি

বালুচরির রেশম ঐতিহ্য, যা শাড়ির পার্শ্বে ও আঁচলে জরি দ্বারা ভূষিত ব্যক্তিত্বমন্ডলীর নকশার জন্যে সুপরিচিত। শাড়ি ভারতীয় নারীদের প্রথাগত পরিধান। বিভিন্ন প্রকারের শাড়ি ভারতে জনপ্রিয়, যেগুলিকে তাদের বুনন, নকশা, অলঙ্কার ইত্যাদির ভিত্তিতে শ্রেণীকরণ করা হয়েছে। কিছু সাধারণ বৈচিত্র্যের শাড়ি হল – কাঞ্জিভরম, ইক্কত, বেনারসি, তাঁত, পোচামপল্লী, কোটকি সিল্ক, চান্দেরী, বালুচরি, গাড়োয়াল সিল্ক ইত্যাদি।

বালুচরি সিল্ক এক প্রকার রেশমের বয়ন, যার মধ্যে কারিগররা ভারতীয় পুরানের কাহিনী বয়নের মাধ্যমে লিখেছেন। এই শিল্প সাম্প্রতিককালে কেন্দ্রীয় সরকার এবং কিছু ফরাসি জ্যাকার্ড ধরনের তাঁতের সাহায্যে পুনর্জাগরিত করা হয়েছে। বালুচরি, ব্যাঙ্গালোর ও পশ্চিমবঙ্গের দুই ধরনের রেশমের সুতো দ্বারা বোনা হয়। এক বিশেষ তাঁত যন্ত্রে রেশম বুননটি উল্লম্বভাবে নির্ধারণ করা হয় এবং অন্যটি অনুভূমিকভাবে নির্ধারণ হয়। একটি শাড়ি তৈরি করতে কারুশিল্পীদের অনেক প্রচেষ্টা লাগে। এই রেশমের সুতোগুলিকে বোনার আগে ফুটন্ত জলে ধুয়ে নেওয়া হয়। পরের দিন, গরম রঙের মধ্যে ডুবিয়ে এগুলিকে রঙ্গীন করা হয়। তারপর এই সুতো গুলিকে ঘূর্ণমান চাকায় ঘোরান হয়। প্রায় পাঁচ থেকে ছয় মাসের কঠোর পরিশ্রমের পর আমরা এই সুন্দর বালুচরি শাড়ি পাই।

ঢাকাই জামদানি

বিভিন্ন ধরনের হাতে বোনা বস্ত্রের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের শিল্প ঐশ্বর্য ও নৈপুণ্য প্রতিফলিত হয়। এই নিদারূণ হস্তচালিত-তাঁত পণ্যের মধ্যে ঢাকাই বা ঢাকাই জামদানি একটি নিজস্ব স্বতন্ত্র শৈলী বজায় রাখে। সুতির শাড়ির উপর বোনা ঢাকাই-এর নকশা বহু বছর ধরে খ্যাতি অর্জন করে আসছে। এই শব্দটির উৎপত্তি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে হয়েছে। নামানুসারে এই হস্তচালিত তাঁত শৈলী মূলত ঢাকাতে এবং অবিভক্ত বাংলার কিছু অন্যন্য অংশে প্রচলিত ছিল, কিন্তু বঙ্গ ভঙ্গের পর এটি পশ্চিমবঙ্গেও প্রচলিত হয়। ঢাকাই শৈলী সুতি বস্ত্রের উপর বোনা হয়। এই ঢাকাই সাধারন ভাবে সুতি বস্ত্রের উপর বোনা হয়, কিন্তু যখন এটি রেশম বস্ত্রের উপর বোনা হয় তখন একটি চাকচিক্যময় ঢাকাই-এর সৃষ্টি হয়।

বাংলা ও ভারতের অন্যান্য অংশের মহিলাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ঢাকাই শাড়ি পরিধান বেশ জনপ্রিয়। বাংলাদেশী ঢাকাই শাড়িগুলি বেশিরভাগই ধূসর রঙের হয়, কিন্তু ভারতীয় সংস্করণগুলি বিভিন্ন রঙের হয়। সোনালি ও রুপালি জরির কাজ করা ধূসর কালো ঢাকাই যে কোন মহিলার দখলে থাকা বেশ ঈর্ষনীয় এবং এটি দেশের এক অন্যতম রুচিশীল শাড়ি। ঢাকাই জামদানি শাড়ির সুক্ষ জমিন, প্রায় নিখুঁত শোভাময় মসলিনের অনুরূপ। বাংলার ওপার থেকে আগত এই বিস্ময়কর ঢাকাই শাড়ি বর্তমানে ভারতের গর্ব। এটি দেশের একটি গুরত্বপূ্র্ণ রপ্তানিকারক উপাদান।

পশ্চিমবঙ্গ উৎসব এবং অনুষ্ঠান

পশ্চিমবঙ্গের উৎসব এবং অনুষ্ঠান

পশ্চিমবঙ্গের উৎসব – অনুষ্ঠান তাদের একটি নিজস্ব স্বতন্ত্র সৌন্দর্যতা বহন করে। সারা বছর ধরে পালিত বিভিন্ন উৎসব ও অনুষ্ঠানগুলির মধ্যে দিয়ে রাজ্যের সাংস্কৃতিক গতিশীলতা প্রকাশ পায়। বিভিন্ন উৎসবগুলির মধ্যে দূর্গাপূজা, ঈদ, দীপাবলি, কালী পূজা, খ্রীষ্টমাস, দোল-যাত্রা এবং পয়লা বৈশাখ হল অন্যতম।

পশ্চিমবঙ্গ, ঐতিহ্যগত ঐশ্বর্যের স্পন্দিত স্থল হিসাবে গণ্য হয়। মিশ্র-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সমৃদ্ধ, এই রাজ্য বিভিন্ন স্থানীয় উৎসবের সময় উল্লাস এবং স্ফূর্তির এক শশব্যস্ত ক্ষেত্রে পরিণত হয়।

দূর্গাপূজা, কালীপূজা, দোলযাত্রার মত ধর্মনিষ্ঠ ও জনপ্রিয় উৎসবই হোক বা পয়লা বৈশাখ, গঙ্গাসাগর মেলা এবং শিবরাত্রির মত প্রসিদ্ধ অনুষ্ঠানই হোক, পশ্চিমবঙ্গে উৎসবের ভান্ডার অসীম।

প্রাচীনকাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ দুর্গাপূজা পালনে এক গতানুগতিক ঐতিহ্য অনুসরণ করে। আজকের দিনে, এই উৎসব শুধুমাত্র রাজ্যের স্থানীয় সীমানা অতিক্রম করে নি, এটি তার ঐন্দ্রজালিক যাদুমন্ত্রে সফলভাবে জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। এই দূর্গাপূজা সম্পূ্র্ণ চার দিন ব্যাপী পালন করা হয়। তার প্রথম দিন হল সপ্তমী, তারপর অষ্টমী, নবমী ও বিজয়া দশমী অনুষ্ঠিত হয়।

ঈদ হল অন্য আরেকটি প্রধান উৎসব যা পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায়ের দ্বারা পালিত হয় এবং সেইসঙ্গে এটি বিশ্বের সমস্ত প্রান্তের ইসলামি সম্প্রদায়ের মধ্যে পালিত হয়।

অন্যদিকে দীপাবলী, উত্তর-ভারতের অধিবাসীদের দ্বারা পালিত হয়, পশ্চিমবঙ্গে কালীপূজা, মা কালীর পূজার মাধ্যমে পালিত হয়।

খ্রীষ্টমাস হল খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব, যা ওই দিনে যীশু খ্রীষ্টের জন্ম উদযাপনের মাধ্যমে পালন করা হয়।

দোলযাত্রা পশ্চিমবঙ্গের একটি প্রধান অনুষ্ঠান, এই উপলক্ষে এখানকার মানুষ একে অপরকে রঙের আবরণে ঢেকে ফেলে। পয়লা বৈশাখ এখনও বাঙালির ক্যালেন্ডারে অন্য আরেক উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান, এই দিনে তারা নতুন বর্ষকে স্বাগত জানায়।

এখানে একটি ঘটনা অগ্রাহ্য করা চলে না যে এখানকার উৎসব ও অনুষ্ঠানগুলি পশ্চিবঙ্গের সামগ্রিক পরিচিতি ও সহজাত প্রবৃত্তি প্রদান করে।

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন উৎসব ও অনুষ্ঠানগুলির বর্ণনা নীচে দেওয়া হল:

দূর্গাপূজা

অসুররাজ মহীষাসুরকে বধ করার পর দেবী দূর্গার বিজয় উল্লাসকে কেন্দ্র করে এই উৎসব পালিত হয়। শরৎ ঋতুতে এই দূর্গাপূজার উল্লসিত পরিমন্ডল সমস্ত বাংলার মানুষদেরকে সম্পূ্র্ণরূপে আচ্ছন্ন করে রাখে। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও বিজয়া দশমী হল এই উৎসবের প্রধান চারটি দিন যখন দেবী প্রতিমা পূজিত হন।

বাংলায় দূর্গাপূজাকে ঘিরে যে কাল্পনিক ইতিহাস রয়েছে তা একটি খুবই আকর্ষণীয় গল্প। একবার দৈত্য মহিষাসুর তার আন্তরিক ধ্যানের মাধ্যমে ভগবান শিবকে প্রসন্ন করেন। ফলস্বরূপ, ভগবান শিব তাকে অমরত্বের বরদান করেন। এই ঘটনার পর মহিষাসুর তার প্রকৃত সত্ত্বায় ফিরে আসে এবং কোনওরকম দ্বিধা ছাড়াই মানুষকে হত্যা করতে শুরু করে।

ঈদ

পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার পশ্চিমবঙ্গে, বিভিন্ন আনন্দময় এবং সমৃদ্ধ উৎসবের প্রাচুর্য্য রয়েছে। একটি কথার চলন আছে, যে বাঙালির ক্যালেন্ডারে ১২ মাসে ১৩ পার্বণ পালিত হয়। এই ধর্ম-নিরপেক্ষ রাজ্যটিতে শুধুমাত্র বাঙালি উৎসবই পালিত হয় না, এখানে ঈদ্ ও খ্রীষ্টমাসের মতো উৎসবগুলিও চরম উৎসাহের সাথে পালিত হয়।

ঈদ্ হল একটি বৃহত্তম মুসলিম উৎসব যেটি খুবই ধুমধাম এবং জাঁকজমকের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে পালিত হয়। ঈদ-উল-ফিতর, রমজান (যা সূর্যাস্ত পর্যন্ত নামাজ ও উপবাসের কঠোর মাধ্যমের সঙ্গে জড়িত)মাসের পর চরম ধূমধামের সঙ্গে পালিত হয়। রমজান মাসের শেষ দশটি রাত লৈলূত-উল-কাদার বা “ক্ষমতার রাত্রি”-র পবিত্র দিন হিসাবে গণ্য হয়। কল্পনা অনুসারে এই লৈলূত-উল-কাদার-এর সময় পবিত্র কোরাণ স্বর্গ থেকে অবতীর্ণ হন। তবে এই সুপ্রসন্ন মুহূর্তের প্রকৃত উৎস হল আল্লাহ এবং মহম্মদের মধ্যে এক গোপন ভাববিনিময়।

দীপাবলি

পশ্চিমবঙ্গের গর্ব তার প্রসিদ্ধ বাংলা সংস্কৃতি ও রন্ধন প্রণালীর মধ্যে আচ্ছন্ন রয়েছে। বাঙালি খুবই আবেগপ্রবণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ, যারা ধুমধাম এবং জাঁকজমকের সঙ্গে প্রতিটি অনুষ্ঠান পালন করতে ভালবাসে। আলো ও শব্দের উৎসব দীপাবলি, এই রাজ্যের একটি বিশিষ্ট উৎসব।

পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম উৎসব, দূর্গাপূজা একটি শ্রেষ্ঠ উৎসব- রাজ্য ও রাজ্যের বাইরে থেকে আগত মানুষের ভিড় যার সাক্ষী হয়ে থাকে, রাস্তায় ভিড়ের বন্যার মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন প্যান্ডেলে মনোরম দৃশ্যের আভাস পাওয়া যায়।

আলোর উৎসব, দিওয়ালী বা দীপাবলী, দূর্গাপূজার পরেই অনুষ্ঠিত হয়।

কালীপূজা

পশ্চিমবঙ্গ, তার সাংস্কৃতিক উন্মত্ততা এবং উল্লসিত উৎসব পালন সহ একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। বর্ণময় বাংলা সংস্কৃতি এবং শহরের প্রাণবন্ত নাগরিকগণ স্ফূর্তির সঙ্গে প্রতিটি আহ্লাদিত উপলক্ষ উদযাপন করতে ভালবাসে। একটি শুদ্ধ বাঙালি উৎসব কালীপূজা, এই রাজ্যে সমৃদ্ধি এবং জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হয়।

পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম উৎসব দূর্গাপূজা, গোটা রাজ্যে ধূমধাম ও আড়ম্বর পূর্ণ ভাবে পালিত হয়। তার পাঁচ দিন পরে, পূর্ণ চন্দ্রের উপস্থিতিতে বা পূর্ণিমার রাতে যখন কৌশিকী চন্দ্রপ্রভা সমগ্র ব্রহ্মান্ডকে আলোড়িত করে, তখন লক্ষ্মীপূজার দিনে সম্পদের দেবী লক্ষীর পূজা করা হয়।

শরতের পরবর্তী অন্ধকারে এবং অমঙ্গলসূচক নতুন চন্দ্র বা অমাবস্যার রাতে পশ্চিমবঙ্গে দীপাবলি ও কালীপূজার পালন করা হয়। দেবী কালীর মূর্তি হল দেবী দুর্গার বিপদজ্জনক রূপ- গাঢ় কৃষ্ণ গাত্রবর্ণ, শিলীভূত তৃতীয় চক্ষুসহ এক আতঙ্কজনক রূপ, তাঁর দীর্ঘ মূর্তি শুধুমাত্র সর্প ও মস্তকের খুলির মালা পরিহিত, রক্তাক্ত আকারে অগ্নিসদৃশ মেজাজে দাঁড়য়ে থাকে।

রাসযাত্রা

বিভিন্ন বাঙালি উৎসবগুলির মধ্যে রাসযাত্রা হল একটি জনপ্রিয় উৎসব। সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে এই ধর্মীয় উৎসব রাসযাত্রা পালিত হয়। এটি সাধারণত প্রতি বছর শীতকালে প্রায় ডিসেম্বর নাগাদ অনুষ্ঠিত হয়।

এই রাসাযাত্রা উৎসবটি রাস যাত্রা নামেও পরিচিত, ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে সম্মান এবং শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অংশে পালন করা হয়। এই উৎসবটি বিশেষভাবে অগণিত অবিশ্বাস্য এবং বিস্ময়কর কার্যক্রমের মধ্যে দিয়ে পালিত হয়। এটিতে বৃন্দাবনে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সর্বদা তাঁর রাখাল বন্ধুদের সাথে অবস্থানের সময়ের উপর বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়।

রাসযাত্রায়, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পূজা করা হয়। এই রাসযাত্রার সময় পশ্চিমবঙ্গে গোটা রাজ্য জুড়ে মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই মেলা খুবই বিখ্যাত ও এখানে প্রচুর মানুষের ভিড় হয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ একটানা সাত দিন ধরে পূজিত হন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও তাঁর বেশ কিছু অলৌকিক কার্যকলাপ এইসব মেলাগুলিতে তুলে ধরা হয়। এই সময় অনুষ্ঠিত মেলাগুলি রাসা মেলা বা রাস মেলা নামে জনপ্রিয়।

নবান্ন

পশ্চিমবঙ্গে ফসল উৎসব নবান্ন, অনেকটা তামিল উৎসব পোঙ্গলের ন্যায় পালিত হয়। নবান্ন ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্ব অঞ্চলে পালিত হয়। নব কথার অর্থ হল নতুন এবং অন্ন কথার অর্থ হল শস্য। যখন ‘আমন’ ধান চাষ করা হয় তখন এটি পালিত হয়। এই ফসল কাটার উৎসবগুলি ভারতের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রাথমিকভাবে ভারত কৃষিভিত্তিক দেশ এবং ফসলের ফলন সময়োপযোগী বৃষ্টিপাতের উপর নির্ভর করে। উৎপাদন যাতে সারা বছর ভালো হয় তাই দেবতাকে তৃপ্ত করার লক্ষ্যে এই উৎসব বিশাল জাঁকজমকের সঙ্গে আয়োজন করা হয়।

বাংলাদেশে, নবান্ন প্রাথমিকভাবে একটি হিন্দু উৎসব। শরৎ কালীন ফসল কাটার পর এই উৎসবটি পালিত হয়। যেমন মহালয়া, এই উৎসবে পূর্বপুরুষদের নতুন ধানের সঙ্গে প্রসন্ন করার এক গুরুত্বপূর্ণ রীতি ছিল। তারপর, এই অর্ঘ্য বিভিন্ন দেব-দেবী, পবিত্র অগ্নিদেব, প্রাণী ও ব্রাহ্মনদের নিবেদন করা হত। চাল এই উৎসবের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গৃহাঙ্গন চালের পিটুলি দ্বারা সজ্জিত করা হয় এবং চালের পিঠে প্রতিবেশীদের মধ্যে বিনিময় করা হয়।

খ্রীষ্টমাস

পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উন্মত্ততা, মেলা ও উৎসবের প্রাচুর্য্যতা লক্ষ্য করা যায়। এই ধর্ম-নিরপেক্ষ রাজ্যটি আনন্দ উপভোগের জন্য জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বিভিন্ন উৎসবকে উল্লসিত ভাবে পালনের মধ্যে দিয়ে জীবনের আনন্দ খুঁজে পায়। তাই, খ্রীস্টানদের একটি ঐতিহ্যগত উৎসব, খ্রীষ্টমাসও এখানে জাঁকজমকের সঙ্গে পালন করা হয়।

কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের শহরতলির একটি বৃহদাকার অংশ খ্রীস্টান জনসাধারণ নিয়ে গঠিত। তাই পশ্চিমবঙ্গে ২৫-শে ডিসেম্বর যীশু খ্রীষ্টের জন্মদিবস উপলক্ষ্যে বার্ষিক উৎসব হিসাবে খ্রীষ্টমাস আড়ম্বর পূর্ণ ভাবে পালিত হয়। চলতি ভাষায় বাঙালিরা এটিকে বড় দিন হিসাবে উল্লেখ করে। পশ্চিমবঙ্গে এই খ্রীষ্টমাস – খ্রীষ্টমাস গাছ, উপহার ও প্রচলিত খাবার পুরভরা টার্কি ও পুডিং-এর সঙ্গে জাঁকজমকের সাথে উদযাপিত হয়।

গঙ্গা সাগর মেলা

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটি তার সাংস্কৃতিক উন্মত্ততায় ঐশ্বর্যশালী হয়ে রয়েছে, এখানকার পালিত উৎসবগুলি এই রাজ্যের হয়ে অনেক কথা বলে। সারা বছর ধরে অনুষ্ঠিত এই বর্ণময় উৎসবগুলি উচ্ছ্বাসিত নাগরিকদের ইচ্ছাপূরণ করে চলে এবং তারা উৎসাহের সঙ্গে সমস্ত অনুষ্ঠানগুলি পালন করে। গঙ্গাসাগর মেলা সম্ভবত রাজ্যের সর্ববৃহত্তম মেলা।

নামের সুপারিশ অনুযায়ী, গঙ্গাসাগর মেলা দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলায় গঙ্গাসাগর বা বৃহৎ বঙ্গোপসাগরের তীরে অনুষ্ঠিত হয়। এই উৎসব মকর সংক্রান্তি উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হয়। এইসময় তীর্থযাত্রী ও ভক্তরা এই সাগর দ্বীপে ঝাঁকে ঝাঁকে ভিড় করে।

জানুয়ারী ও ফেব্রুয়ারী মাসে শীতকালে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। ঠাণ্ডা সমুদ্রের হাওয়া ও লবণামৃত এই পবিত্র জলে একবার ডুব দিতে মানুষরা এখানে আসে এবং তারা পাপ মুক্ত হয়।

তিন দিন ব্যাপী রাজ্যে এই মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বিভিন্ন কোণ থেকে তীর্থযাত্রীরা ঈশ্বরের আশীর্বাদ পেতে এবং প্রায়শ্চিত্ত করার লক্ষ্যে এই হিম-শীতল সমু্দ্রের জলে স্নান করার জন্য এখানে আসে।

পৌষ মেলা

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটি, তার অতুলনীয় সৌন্দর্য্য, মেলা ও উৎসবগুলির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও প্রাচীন ইতিহাসের প্রাচুর্য্যে উল্লিখিত হয়ে আছে। পৌষ মেলাও এক ধরনের মেলা যা শান্তিনিকেতনে অনুষ্ঠিত হয় এবং এটি শুদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে রচিত।

শীতকালের গোড়ার দিকে, পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার সুন্দর স্বর্গোদ্যান শান্তিনিকেতনে প্রতি বছর এই পৌষ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই মেলা সাম্প্রতিক বছরের বিদায় লগ্নে এবং নতুন বছরের আগমনীর প্রস্তুতির সময়, এক নতুন আশা এবং নতুন প্রতিশ্রুতি নিয়ে, পৌষ মাসের ৭ থেকে ৯ তারিখের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়।

শান্তিনিকেতন, প্রখ্যাত নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তার অনুপ্রেরণায় সৃষ্ট, সারা বছর ধরে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎসবের প্রাচুর্য্যে এই ভূমি প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছে। পৌষ মেলা সম্ভবত শান্তিনিকেতনের মেলা প্রাঙ্গনে আয়োজিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব।

জয়দেব মেলা

বাঙালি সংস্কৃতির উপবিষ্ট পশ্চিমবঙ্গ, তার প্রাচীন ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য। এখানকার আবেগ-প্রবণ ও প্রাণবন্ত মানুষ মেলা ও উৎসবের মাধ্যমে তাদের জীবন উপভোগ করতে ভালবাসে। বিভিন্ন মেলাগুলির মধ্যে, জয়দেব মেলা হল এক ঐতিহ্যগত সাংস্কৃতিক উৎসব যা ধর্মীয় উৎসাহের সঙ্গে পালিত হয়।

কথিত আছে, বাঙালির ক্যালেন্ডার বারো মাসে তেরো পার্বণ। উৎসাহী এবং সমৃদ্ধ বাঙালির উপলক্ষ পালনের জন্য শুধু একটি সামান্য কারণ প্রয়োজন। প্রতি বছর বর্ধমানের কেঁন্দুলি মেলা প্রাঙ্গনে এই জয়দেব মেলা অনুষ্ঠিত হয়।

রবীন্দ্রনাথের মহিমান্বিত শান্তিনিকেতন, যা শীতকালীন উৎসবে আচ্ছাদিত তার থেকে সামান্য দূরে কলকাতার উপকন্ঠে এই ক্ষুদ্র, চিত্রানুরাগী গ্রামটি অবস্থিত। কবি জয়দেবের ভক্তি-অর্চনার প্রতিভাকে শ্রদ্ধা জানাতে প্রতি বছর জানুয়ারী মাসে এই মেলার আয়োজন করা হয়। এই মেলা লোক ঐতিহ্যের সঙ্গে জীবিত রয়েছে এবং দেশের সব কোণ থেকে পর্যটক এবং তীর্থযাত্রীরা ধর্মীয় টানে এই মেলা প্রাঙ্গনে ভিড় করে।

সরস্বতী পূজা

সরস্বতী পূজা এমন এক ধরনের উৎসব যা পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব বাঙালির বাড়িতে পালন করা হয়। এই দিনে, জ্ঞান এবং চারুকলার দেবী মহান নিষ্ঠার সঙ্গে পূজিত হন। বাঙালি সম্প্রদায় জ্ঞান এবং চারুকলাকে তাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে বিবেচনা করে। সব বয়সের ব্যক্তিই অতুলনীয় উৎসাহের সঙ্গে সরস্বতী পূজায় অংশগ্রহণ করে।

দেবী সরস্বতী অধিকাংশ বাঙালির ঘরে একটি আবশ্যিক হিসাবে পূজিত হন। এমনকি যারা নাস্তিক তাদের ঘরেও সরস্বতী পূজা পালন করা হয়। এটির কারণ সম্ভবত দেবী সরস্বতী, জ্ঞান ও চারুকলার সংক্ষিপ্তসার বলে বিবেচিত হন। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বিদ্যা ও সাংস্কৃতিক মানের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়। পশ্চিমবঙ্গে এমন কোনও শিল্পীই নেই যিনি সরস্বতী পূজা সম্পাদন করেন না। জ্ঞান এবং চারুকলার এই দেবী তার বাম হাতে ‘বীণা’ সহ সাদা শাড়িতে ভূষিত।

শিবরাত্রি

শিবরাত্রি নামক প্রসিদ্ধ উৎসব শ্রদ্ধার সঙ্গে সমস্ত দেশ জুড়ে পালিত হয়। কিন্তু বিভিন্ন রাজ্যে, সম্ভবত ভিন্ন ধর্মের উপস্থিতির কারণে এতে কিছু ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। পশ্চিমবঙ্গে এই শিবরাত্রি অনেক উদ্যমের সঙ্গে পালিত হয়।

ভক্তরা এই শিবরাত্রিতে সারাদিন ব্যাপী উপবাস থাকে। শিবপূজা রাত্রিবেলায় অনুষ্ঠিত হয় এবং এতে শিব লিঙ্গকে দুধের দ্বারা স্নান করানো হয়। পশ্চিমবঙ্গে, এক ধরনের উর্বর কাদামাটি দিয়ে নিষ্ঠাভাবে চারটি শিবলিঙ্গ তৈরির এক ঐতিহ্যগত প্রথা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে, এই ধরনের কাদামাটি পবিত্র গঙ্গা নদীর তীরে দেখতে পাওয়া যায়। এই চারটি শিবলিঙ্গ রাতভর পূজার সময় এক এক করে অর্পন করা হয়। সম্পূর্ণ রাতকে চারটি সমান সময়কালে বিভক্ত করা হয়, যাকে প্রহর বলা হয়। প্রথম প্রহরে, শিবলিঙ্গকে শুদ্ধ দুধ দিয়ে স্নান করানো হয়। দ্বিতীয় প্রহরে এটিকে দই-য়ের দ্বারা মাখিয়ে দেওয়া হয়, তৃতীয় প্রহরে শিবলিঙ্গকে ঘি দ্বারা স্নান করানো হয় এবং চতুর্থ প্রহরে এটিকে মধু সহযোগে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। রাতভর পূজা করার পর, ভক্তরা অবশেষে ‘প্রসাদ’ গ্রহণের মাধ্যমে তাদের উপবাস ব্রত ভঙ্গ করে।

পয়লা বৈশাখ

বাঙালির নতুন বর্ষ, পশ্চিমবঙ্গে পয়লা বৈশাখ নামেও সুপরিচিত। বাংলা ক্যালেন্ডারের প্রথম দিনটি, সমগ্র রাজ্য জুড়ে হৃদয়গ্রাহী উৎসব এবং অনুষ্ঠানের জন্য সূচিত হয়। বাংলা ক্যালেন্ডারের প্রথম মাসটি হল বৈশাখ মাস এবং এই মাসের প্রথম দিনটি বা ‘পয়লা’ দিনটি বাংলার নববর্ষের সূচনাকে ইঙ্গিত করে। সমগ্র বাংলায় এই অনুষ্ঠান সমস্ত আঞ্চলিক বা ধর্মীয় পার্থক্য নির্বিশেষে একসঙ্গে পালিত হয়। পশ্চিম বাংলার বাইরের বাঙালিদের মধ্যেও এই খুশির অনুষ্ঠানটিকে পালন করতে দেখা যায়। এটি সাধারণত ইংরাজী মাসের মাঝামাঝি সময় এপ্রিল মাসে বাংলা নববর্ষ পালিত হয়।

রথযাত্রা

প্রাণবন্ত এবং উচ্ছসিত মানুষের এই ভূমি পশ্চিমবঙ্গ তার বর্ণময় উৎসবের জন্য সুপ্রসিদ্ধ। একটি কথার প্রচলন আছে যে, বাংলার ক্যালেন্ডারে বারো মাস তেরো পার্বণ। বাঙালির ঐতিহ্যগত উৎসব হল রথযাত্রা। এই বর্ণময় অনুষ্ঠানে মানুষ প্রভূ জগন্নাথকে বহন করে রথ টেনে নিয়ে যায়।

এই রথযাত্রা প্রধানত জুন-জুলাই মাসে বর্ষার গোড়ার দিকে পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলায় অনুষ্ঠিত হয়। এইসময় সশব্দ গর্জনের সঙ্গে বিদীর্ণ বাদল মেঘ ভারী বৃষ্টি অনুষঙ্গী করে নীলকাশে বিছিয়ে পড়ে। শ্রীরামপুরের কাছে হুগলী নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত মাহেশ, তার বিখ্যাত রথযাত্রা পালনের জন্য বিশ্বব্যাপী বিখ্যাত। সাহিত্যস্রষ্টা শ্রী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত সাহিত্য গ্রন্থ ‘রাধারাণী’র পিছনে ১৮৭৫ সালের বিখ্যাত মাহেশ রথযাত্রার এক বিশাল অনু্প্রেরণা ছিল।

বিষ্ণুপুর উৎসব

পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুর তার চমৎকার পোড়ামাটির শিল্প, প্রাচীন মন্দির, মার্জিত পশমী শাড়ি এবং সমৃদ্ধ সঙ্গীতের ঐতিহ্যের জন্য বিখ্যাত। বাঁকুড়ার, বিষ্ণুপুরের এই সমস্ত বৈশিষ্ট্য বিষ্ণুপুর উৎসবকে দৃঢ়তা প্রদান করে। এই বিষ্ণুপুর উৎসব প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে ২৭ থেকে ৩১-তারিখের মধ্যে আয়োজিত হয়। শহরের বিখ্যাত মদনমোহন মন্দিরের কাছাকাছি স্থানে এটি অনুষ্ঠিত হয়।

বিষ্ণুপুর উৎসব স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকদের কাছে একটি খুব জনপ্রিয় উৎসব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অনেক শিল্পী তাদের চমৎকার পোড়ামাটির কাজ, ভাস্কর্য এবং খোদাইয়ের বিভিন্ন কারুকার্য বিক্রয় ও প্রদর্শনীর জন্য এই উৎসবে নিয়ে আসে। স্থানীয় হস্তশিল্পীরা তাদের পণ্যের সঙ্গে এই প্রদর্শনীর রঙ্গভূমিতে ঝাঁকে ঝাঁকে ভিড় করে। অন্যান্য রাজ্যের হস্তশিল্পীরাও এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে। খাঁটি পশমের শাড়ি, ঝিনুকের কাজ, ছৌ মুখোশ, জামাকাপড়, খাবার ইত্যাদি দোকানে প্রদর্শিত হয়। বিষ্ণুপুরে অবস্থিত তার নিজস্ব সঙ্গীত বিদ্যালয় ‘বিষ্ণুপুর ঘরানা’-র জন্য ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পরিক্রমায় বিষ্ণুপুরের নাম উল্লেখ রয়েছে। ‘বিষ্ণুপুর ঘরানা’র কাছের ও দূরের বহু গায়ক ও সঙ্গীতবিদ এবং অন্যান্য কিছু শাস্ত্রীয় শৈলী উৎসবের সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করে। অনেক বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পীদের উপস্থিতির জন্য, এই স্থান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত-প্রেমীদের কাছে একটি স্বর্গ হয়ে ওঠে। এই কারণেই বিষ্ণুপুর উৎসব অন্যান্য সাধারণ মেলা ও উৎসবগুলির চেয়ে আলাদা। এই উৎসব শিল্প, সঙ্গীত, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের এক অতুলনীয় মিশ্রন। আশ্চর্যের কিছুই নেই যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে অগ্রসর হচ্ছে।

রাসমেলা

রাসযাত্রা উৎসব সমারোহের সময়ে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত রাসমেলার সঙ্গে মানুষ জড়িত। পশ্চিমঙ্গের বিভিন্ন রাজ্য জড়ে প্রচুর মেলা আয়োজিত হয়, এর মধ্যে বেশ কিছু মেলা রাজধানী কলকাতাতেও অনুষ্ঠিত হয় তবে, এগুলির মধ্যে কোচবিহারের বার্ষিক রাসমেলা সবচেয়ে প্রসিদ্ধ।

জনপ্রিয় বাঙালি উৎসব, রাসযাত্রা উৎসব ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও তার চিরন্তন প্রেম শ্রী রাধিকার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের পরিপ্রেক্ষিতে অনুষ্ঠিত হয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রেম-কাহিনী এবং বৃন্দাবনে তাঁর অতিবাহিত মহিমান্বিত দিনগুলিকে স্মরণ করে এই রাসযাত্রা উৎসব পালিত হয়। যদিও এই রাসযাত্রা উৎসব সারা রাজ্য জুড়ে পালিত হয়, তবে উত্তরবঙ্গেই এই উৎসব সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয়। বাংলার উত্তর অংশে বহদিন থেকে এটি পালিত হয়। আগে রাজা-মহারাজাদের সময়ের থেকে আজকের দিনে এই উৎসব মানুষের মধ্যে আরোও বেশি ছড়িয়ে গেছে তবে, পুরনো তাৎপর্য এবং রাজকীয় ঐতিহ্য এখনও সম্মানের সঙ্গে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বিশাল রাজবাড়ি বা কোচবিহারের রাজপ্রাসাদগুলিকে রাসযাত্রা উৎসবের সময় সাজিয়ে তোলা হয়। এই রাসমেলার সময় এই সমস্ত ভবনগুলি রঙ-বেরঙের দোকান, উৎসাহী মানুষের ভিড়, হস্তশিল্প এবং অন্যান্য পণ্যের সমৃদ্ধ সংগ্রহের মাধ্যমে এক বড় ধরনের মেলার আকার ধারণ করে।

সূত্র: ম্যাপ ইনফো

2.96551724138
মন্তব্য যোগ করুন

(ওপরের বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন মন্তব্য / পরামর্শ থাকে, তাহলে দয়া করে আমাদের উদ্দেশ্যে পোস্ট করুন).

Enter the word
ন্যাভিগেশন
Back to top