হোম / সমাজ কল্যাণ / মানবাধিকার / বিশেষ সামাজিক নিবন্ধ
ভাগ করে নিন
ভিউজ্
  • অবস্থা সম্পাদনার জন্য উন্মুক্ত

বিশেষ সামাজিক নিবন্ধ

সামাজিক বিষয়ের উপরে বিশেষ নিবন্ধ

দুর্গা, সরস্বতী, লক্ষ্মী কত নামে মেয়েদের ডাকা হয় এখানে। কুমারী পুজোও হয়। আবার এখানেই মেয়েদের ভবিষ্যৎকে গোল্লায় পাঠানো হয় উপযুক্ত বয়স হওয়ার আগেই তাদের বিয়ে দিয়ে। রামমোহন বিদ্যাসাগরের দেশে এই ঘটনা আমাদের বিষাদ বাড়ায়। কিন্তু সম্প্রতি এই অবস্থাটা একটু বদলাচ্ছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বোধ, নতুন ভবিষ্যৎ গড়ার আকাঙ্ক্ষা এবং সচেতনতা তৈরি করছে ছোট ছোট প্রতিবাদ। তার জেরেই বাল্যবিবাহ কমছে পশ্চিমবঙ্গে। রাজ্যের গ্রামেগঞ্জে বাল্যবিবাহের প্রতিরোধে উঠে দাঁড়াচ্ছেন বিয়ের পিড়িতে বসতে না চাওয়া কিশোরী মেয়েরা। সম্প্রতি প্রকাশিত জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষার চতুর্থ রাউন্ডের রিপোর্ট এই বড় ঘটনাটাকে আমাদের চোখের সামনে নিয়ে এল। পড়াশোনা শেষ না করে বিয়ে করব না বলে পাত্রপক্ষ কিংবা বাড়ির লোকের মুখের ওপর জানিয়ে দেওয়া, জোর করে বিয়ে দিতে গেলে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া, বাড়ির লোকের বিয়ে দেবার চেষ্টার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ জানানো ইত্যাদি যেসব ঘটনা মাঝেমধ্যে গণমাধ্যমে ভেসে ওঠে সেগুলোই একত্রে মিলে গিয়ে এই বড় খবরটা তৈরি করে দিল। বাংলার মেয়েরাই এটা ঘটালেন।

 

মালদার ইংলিশবাজারের তুলি খাতুনের কথাই ধরুন। ১৪ বছর হতেই তুলির বাবা-মা তার বিয়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। পাত্র গাঁয়েরই ১৯ বছর বয়সি একটি ছেলে। তুলি স্কুলে পড়ে। সে সাফ জানিয়ে দিল যে এখন বিয়ে করবে না। পড়াশোনা চালিয়ে যাবে। মেয়ের জেদের মুখে পিছু হঠলেন বাবা-মা। বাংলার গ্রামে এই তুলিদের সংখ্যা এখন বাড়ছে। দেহ-মনে উপযুক্তভাবে বেড়ে ওঠার জন্য গাঁয়ে-গঞ্জে সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা এখন আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। সরকারি ও বেসরকারি স্তরে বেড়েছে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ পরিবর্তনের প্রয়াস। তুলি জানিয়েছে, তাকে কমবয়সে বিয়ের বিপদের কথা প্রথম বুঝিয়েছিলেন গাঁয়ের কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য সহায়তা ও পরামর্শদান কেন্দ্র অন্বেষা ক্লিনিকের দিদিমণিরা।
একটু চোখ-কান খোলা রাখলেই দেখা যাবে অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নিজেদের ইচ্ছা, মতামত ও ভালোমন্দের কথা স্পষ্ট করে বলে দেওয়ার ব্যাপারে মেয়েরা পায়ে পায়ে অনেকটাই এগিয়ে এসেছে। একটা ক্ষমতায়ন ঘটেছে তাদের। ফলে কমছে বাল্যবিবাহ। জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষার রিপোর্ট বলছে, পশ্চিমবঙ্গে এখন ২০-২৪ বছর বয়সি মেয়েদের ৪০.৭ শতাংশের ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয়। স্বাস্থ্য সমীক্ষার তৃতীয় রাউন্ডের রিপোর্টে এই অনুপাত ছিল ৫৩.৩ শতাংশ। বাল্যবিবাহে এক সময় পশ্চিমবঙ্গ ছিল দেশের প্রথম চারটি রাজ্যের মধ্যে। বাল্যবিবাহ কমার ক্ষেত্রে একটা বড় ভূমিকা নিয়েছে শিক্ষার প্রসার। বিরাট বদল নয় কিন্তু এই বদলকে সম্মান করতে শিখতে হয়। রাজ্যের ১৫-৪৯ বছর বয়সি মহিলাদের ৭১ শতাংশই এখন সাক্ষর। অল্প বয়সে বিয়ে যারা চাইছে না তারা প্রায় সবাই লেখাপড়া শিখে স্বাধীনভাবে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা বলছে। কেউ কেউ বলছে হাতের কাজ শেখার কথা। স্কুল ছাড়িয়ে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধী হলেও এরা সবাই বাবা-মাকে ভালোবাসে। লেখাপড়া শিখে পরিবারের দুঃখ দূর করতে চায় তারা। বিয়ে তাকে জীবনযুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য শিক্ষা নামক গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বনটি থেকেও অনেক দূরে সরিয়ে দেয়, সে জানে। এরা কেউই বিয়ের বিরোধী নয়, এরা বাল্যবিবাহের বিরোধী। বয়স না হওয়ার আগেই নিজেদের ইচ্ছের তোয়াক্কা না করেই তাদের বিয়ে দিয়ে দেবার বিরোধী তারা। পণ দেওয়া এবং নেওয়া কোনওটাই তারা পছন্দ করে না। পাত্র নির্বাচনের ব্যাপারে এদের স্বাধীন মতামত আছে।

এই সমীক্ষার আওতায় এসেছে ১৫-৪৯ বছর বয়সি মেয়েরা। এরা জানে শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিও বাল্যবিবাহ কমার একটা বড় কারণ। স্কুলে যাওয়া এইসব কিশোরী চায় একটা স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন। বাল্যবিবাহ তাদের শরীর-স্বাস্থ্যকে তছনছ করে দেয়। তা মানেই শরীর ও মনে তৈরি না হওয়া একটি কিশোরীর বছর বছর মা হয়ে চলা। স্বাস্থ্য সচেতনতা তাদের শিখিয়েছে অপুষ্টিতে ভরা ভগ্ন স্বাস্থ্য মায়ের প্রসবের বিপদ বাড়ে। বিপদ বাড়ে নবজাতকেরও। লেখাপড়া না জানা অল্পবয়সি মা স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির নানা অন্যায় আবদার মেনে নিতে বাধ্য হয়।

ঘরের কাজ এবং সন্তানের পরিচর্যা এই দুয়ের ঠেলায় তার নিজের জন্য আর কোনও সময় থাকে না। অনেক পরিবারে থাকে পুত্রসন্তানের জন্য চাপ। শ্বশুর শাশুড়িকে একটা পুত্রসন্তানের মুখ দেখানোর জন্য বারবার মা হয়ে যেতে হয় তাকে। অন্যদিকে অল্পবয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়েটি তো স্কুলের পড়া শেষ করতে পারেনি। শিক্ষা না থাকায় সন্তানের পরিচর্যার ক্ষেত্রেও সে পিছিয়ে থাকে। বুঝতে পারে না ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নির্দেশ। নানা কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসের শিকার হয়। সাপে কাটা তার যে শিশুটি উপযুক্ত চিকিৎসায় বেঁচে যেতে পারত তাকে সে নিজের হাতে ওঝার হাতে তুলে দেয়।

জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা রাজ্যে বাল্যবিবাহ কমার পাশাপাশি প্রসূতি ও শিশুমৃত্যুর ঘটনাও কমেছে বলে জানিয়েছে। অগ্রগতি হয়েছে টিকাকরণে। পোলিও টিকাকরণে পশ্চিমবঙ্গের সাফল্য এই অগ্রগতির একটা বড় প্রমাণ। আপাতদৃষ্টিতে বোঝা না গেলেও এই অগ্রগতির সঙ্গেও বাল্যবিবাহ কমার একটা সম্পর্ক রয়েছে। কারণ মালদা, পুরুলিয়ার তুলি খাতুন, রেখা কালিন্দী,অনিতা টুডুর মতো যেসব মেয়ে অল্পবয়সে বিয়ে না হওয়ার বিরুদ্ধে সরব হয়েছে তাদের অনেকেই তো যাচ্ছে স্কুলে। লেখাপড়া শেখার পর উপযুক্ত বয়সে যখন তার বিয়ে হচ্ছে সে তখন এক শিক্ষিত স্ত্রী ও মা। মা হওয়ার সময় নিজের সতর্কতা এবং নবজাতকের সুরক্ষার ব্যাপারটা সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন। সে নিজে একটা ওষুধের নাম পড়তে পারে, বুঝতে পারে চিকিৎসকের নির্দেশ। সন্তানের টিকাকরণের প্রয়োজনীয়তা তাকে বোঝাতে হয় না। তার ঝোঁক থাকে হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসবের দিকে, কারণ সেখানে উপযুক্ত ব্যবস্থা আছে। উপযুক্ত বয়সে বিয়ে এবং প্রসবকালীন সচেতনতার যোগফলেই পশ্চিমবঙ্গ ও দেশের অন্যান্য ১২টি রাজ্যে কমেছে প্রসূতি ও শিশুমৃত্যুর হার।

পশ্চিমবঙ্গ কেন দেশের সব জায়গাতেই বাল্যবিবাহের ঘটনা পিছিয়ে থাকা সম্প্রদায়ের মধ্যেই বেশি। বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, পুরুলিয়া, মালদা, মুর্শিদাবাদ জেলাগুলিতে বাল্যবিবাহের ঘটনা বরাবরই বেশি। এই জেলাগুলির জনসংখ্যার একটা বড় অংশ আদিবাসী ও অনগ্রসর সম্প্রদায়। এখন সেখানেও এই ঘটনা কমেছে। গণমাধ্যমে মাঝেমধ্যেই পুরুলিয়া বাঁকুড়া কিংবা মালদার কিশোরী মেয়েদের বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঘটনা ভেসে ওঠে। সবসময় যে এই প্রতিবাদ তার প্রার্থিত তীরে পৌঁছেছে তা হয়তো নয়। কিন্তু গ্রামের নিস্তরঙ্গ জীবনে তা আলোড়ন তৈরি করেছে। পুরুলিয়ার রেখা, কালিন্দী, মালদার তুলি খাতুন কিংবা অনিতা টুডুর মতো মেয়েরা বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে যে দৃষ্টান্ত তৈরি করছে তা মেয়েদের নিস্তরঙ্গ জীবনেও চলতি অবস্থাটাকে বদলে দেওয়ার একটা ঢেউ তুলেছে। শুধু মেয়েরাই নয় অভিভাবক এবং এলাকার প্রভাবশালী মানুষরাও বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকেই বদলেছেন নিজের পুরানো অবস্থান।

মনোভঙ্গির এই পরিবর্তনকে মোটেই ছোট করে দেখলে চলবে না। আর কিছু না হোক মেয়েদের কথা শোনার একটি অভ্যাস তৈরি হচ্ছে। আর শুনলেই তো জানা যায়। বেরিয়ে আসে সমাধান। আগে যে ভাইটি বা বোনটি কী খেল, কী পড়ল, কেনই বা বন্ধ হল তার স্কুল, কেন তার ছোটখাট বোনটির বিয়ে হয়ে গেল বয়সে অনেক বড় গম্ভীর প্রকৃতির একটি মানুষের সঙ্গে—সেসব ব্যাপারে কোনও খোঁজখবর রাখত না। সেও এখন পুরানো ধারণা বদলাতে শুরু করেছে। এই ব্যাপারটা যত বাড়বে ততই বদলাবে অবস্থা। বাল্যবিবাহ বাড়া বা কমার ব্যাপারটা পরিসংখ্যানের গ্রাফে না আটকে থেকে বদলে যাবে একটা মানসিকতায়। বাল্যবিবাহ জেগে থাকবে শুধু ইতিহাসে।

তথ্য সুত্রঃ বর্তমান পত্রিকা, ১০ই এপ্রিল ২০১৬

2.98412698413
মন্তব্য যোগ করুন

(ওপরের বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন মন্তব্য / পরামর্শ থাকে, তাহলে দয়া করে আমাদের উদ্দেশ্যে পোস্ট করুন).

Enter the word
ন্যাভিগেশন
Back to top