হোম / সমাজ কল্যাণ / সমাজ উন্নয়ন, রাজনীতি ও প্রশাসন / পশ্চিমবঙ্গ উৎসব এবং অনুষ্ঠান
ভাগ করে নিন
ভিউজ্
  • অবস্থা সম্পাদনার জন্য উন্মুক্ত

পশ্চিমবঙ্গ উৎসব এবং অনুষ্ঠান

পশ্চিমবঙ্গের উৎসব এবং অনুষ্ঠান

পশ্চিমবঙ্গের উৎসব – অনুষ্ঠান তাদের একটি নিজস্ব স্বতন্ত্র সৌন্দর্যতা বহন করে। সারা বছর ধরে পালিত বিভিন্ন উৎসব ও অনুষ্ঠানগুলির মধ্যে দিয়ে রাজ্যের সাংস্কৃতিক গতিশীলতা প্রকাশ পায়। বিভিন্ন উৎসবগুলির মধ্যে দূর্গাপূজা, ঈদ, দীপাবলি, কালী পূজা, খ্রীষ্টমাস, দোল-যাত্রা এবং পয়লা বৈশাখ হল অন্যতম।

পশ্চিমবঙ্গ, ঐতিহ্যগত ঐশ্বর্যের স্পন্দিত স্থল হিসাবে গণ্য হয়। মিশ্র-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সমৃদ্ধ, এই রাজ্য বিভিন্ন স্থানীয় উৎসবের সময় উল্লাস এবং স্ফূর্তির এক শশব্যস্ত ক্ষেত্রে পরিণত হয়।

দূর্গাপূজা, কালীপূজা, দোলযাত্রার মত ধর্মনিষ্ঠ ও জনপ্রিয় উৎসবই হোক বা পয়লা বৈশাখ, গঙ্গাসাগর মেলা এবং শিবরাত্রির মত প্রসিদ্ধ অনুষ্ঠানই হোক, পশ্চিমবঙ্গে উৎসবের ভান্ডার অসীম।

প্রাচীনকাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ দুর্গাপূজা পালনে এক গতানুগতিক ঐতিহ্য অনুসরণ করে। আজকের দিনে, এই উৎসব শুধুমাত্র রাজ্যের স্থানীয় সীমানা অতিক্রম করে নি, এটি তার ঐন্দ্রজালিক যাদুমন্ত্রে সফলভাবে জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। এই দূর্গাপূজা সম্পূ্র্ণ চার দিন ব্যাপী পালন করা হয়। তার প্রথম দিন হল সপ্তমী, তারপর অষ্টমী, নবমী ও বিজয়া দশমী অনুষ্ঠিত হয়।

ঈদ হল অন্য আরেকটি প্রধান উৎসব যা পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায়ের দ্বারা পালিত হয় এবং সেইসঙ্গে এটি বিশ্বের সমস্ত প্রান্তের ইসলামি সম্প্রদায়ের মধ্যে পালিত হয়।

অন্যদিকে দীপাবলী, উত্তর-ভারতের অধিবাসীদের দ্বারা পালিত হয়, পশ্চিমবঙ্গে কালীপূজা, মা কালীর পূজার মাধ্যমে পালিত হয়।

খ্রীষ্টমাস হল খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব, যা ওই দিনে যীশু খ্রীষ্টের জন্ম উদযাপনের মাধ্যমে পালন করা হয়।

দোলযাত্রা পশ্চিমবঙ্গের একটি প্রধান অনুষ্ঠান, এই উপলক্ষে এখানকার মানুষ একে অপরকে রঙের আবরণে ঢেকে ফেলে। পয়লা বৈশাখ এখনও বাঙালির ক্যালেন্ডারে অন্য আরেক উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান, এই দিনে তারা নতুন বর্ষকে স্বাগত জানায়।

এখানে একটি ঘটনা অগ্রাহ্য করা চলে না যে এখানকার উৎসব ও অনুষ্ঠানগুলি পশ্চিবঙ্গের সামগ্রিক পরিচিতি ও সহজাত প্রবৃত্তি প্রদান করে।

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন উৎসব ও অনুষ্ঠানগুলির বর্ণনা নীচে দেওয়া হল:

দূর্গাপূজা

অসুররাজ মহীষাসুরকে বধ করার পর দেবী দূর্গার বিজয় উল্লাসকে কেন্দ্র করে এই উৎসব পালিত হয়। শরৎ ঋতুতে এই দূর্গাপূজার উল্লসিত পরিমন্ডল সমস্ত বাংলার মানুষদেরকে সম্পূ্র্ণরূপে আচ্ছন্ন করে রাখে। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও বিজয়া দশমী হল এই উৎসবের প্রধান চারটি দিন যখন দেবী প্রতিমা পূজিত হন।

বাংলায় দূর্গাপূজাকে ঘিরে যে কাল্পনিক ইতিহাস রয়েছে তা একটি খুবই আকর্ষণীয় গল্প। একবার দৈত্য মহিষাসুর তার আন্তরিক ধ্যানের মাধ্যমে ভগবান শিবকে প্রসন্ন করেন। ফলস্বরূপ, ভগবান শিব তাকে অমরত্বের বরদান করেন। এই ঘটনার পর মহিষাসুর তার প্রকৃত সত্ত্বায় ফিরে আসে এবং কোনওরকম দ্বিধা ছাড়াই মানুষকে হত্যা করতে শুরু করে।

ঈদ

পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার পশ্চিমবঙ্গে, বিভিন্ন আনন্দময় এবং সমৃদ্ধ উৎসবের প্রাচুর্য্য রয়েছে। একটি কথার চলন আছে, যে বাঙালির ক্যালেন্ডারে ১২ মাসে ১৩ পার্বণ পালিত হয়। এই ধর্ম-নিরপেক্ষ রাজ্যটিতে শুধুমাত্র বাঙালি উৎসবই পালিত হয় না, এখানে ঈদ্ ও খ্রীষ্টমাসের মতো উৎসবগুলিও চরম উৎসাহের সাথে পালিত হয়।

ঈদ্ হল একটি বৃহত্তম মুসলিম উৎসব যেটি খুবই ধুমধাম এবং জাঁকজমকের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে পালিত হয়। ঈদ-উল-ফিতর, রমজান (যা সূর্যাস্ত পর্যন্ত নামাজ ও উপবাসের কঠোর মাধ্যমের সঙ্গে জড়িত)মাসের পর চরম ধূমধামের সঙ্গে পালিত হয়। রমজান মাসের শেষ দশটি রাত লৈলূত-উল-কাদার বা “ক্ষমতার রাত্রি”-র পবিত্র দিন হিসাবে গণ্য হয়। কল্পনা অনুসারে এই লৈলূত-উল-কাদার-এর সময় পবিত্র কোরাণ স্বর্গ থেকে অবতীর্ণ হন। তবে এই সুপ্রসন্ন মুহূর্তের প্রকৃত উৎস হল আল্লাহ এবং মহম্মদের মধ্যে এক গোপন ভাববিনিময়।

দীপাবলি

পশ্চিমবঙ্গের গর্ব তার প্রসিদ্ধ বাংলা সংস্কৃতি ও রন্ধন প্রণালীর মধ্যে আচ্ছন্ন রয়েছে। বাঙালি খুবই আবেগপ্রবণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ, যারা ধুমধাম এবং জাঁকজমকের সঙ্গে প্রতিটি অনুষ্ঠান পালন করতে ভালবাসে। আলো ও শব্দের উৎসব দীপাবলি, এই রাজ্যের একটি বিশিষ্ট উৎসব।

পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম উৎসব, দূর্গাপূজা একটি শ্রেষ্ঠ উৎসব- রাজ্য ও রাজ্যের বাইরে থেকে আগত মানুষের ভিড় যার সাক্ষী হয়ে থাকে, রাস্তায় ভিড়ের বন্যার মধ্যে দিয়ে বিভিন্ন প্যান্ডেলে মনোরম দৃশ্যের আভাস পাওয়া যায়।

আলোর উৎসব, দিওয়ালী বা দীপাবলী, দূর্গাপূজার পরেই অনুষ্ঠিত হয়।

কালীপূজা

পশ্চিমবঙ্গ, তার সাংস্কৃতিক উন্মত্ততা এবং উল্লসিত উৎসব পালন সহ একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। বর্ণময় বাংলা সংস্কৃতি এবং শহরের প্রাণবন্ত নাগরিকগণ স্ফূর্তির সঙ্গে প্রতিটি আহ্লাদিত উপলক্ষ উদযাপন করতে ভালবাসে। একটি শুদ্ধ বাঙালি উৎসব কালীপূজা, এই রাজ্যে সমৃদ্ধি এবং জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হয়।

পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তম উৎসব দূর্গাপূজা, গোটা রাজ্যে ধূমধাম ও আড়ম্বর পূর্ণ ভাবে পালিত হয়। তার পাঁচ দিন পরে, পূর্ণ চন্দ্রের উপস্থিতিতে বা পূর্ণিমার রাতে যখন কৌশিকী চন্দ্রপ্রভা সমগ্র ব্রহ্মান্ডকে আলোড়িত করে, তখন লক্ষ্মীপূজার দিনে সম্পদের দেবী লক্ষীর পূজা করা হয়।

শরতের পরবর্তী অন্ধকারে এবং অমঙ্গলসূচক নতুন চন্দ্র বা অমাবস্যার রাতে পশ্চিমবঙ্গে দীপাবলি ও কালীপূজার পালন করা হয়। দেবী কালীর মূর্তি হল দেবী দুর্গার বিপদজ্জনক রূপ- গাঢ় কৃষ্ণ গাত্রবর্ণ, শিলীভূত তৃতীয় চক্ষুসহ এক আতঙ্কজনক রূপ, তাঁর দীর্ঘ মূর্তি শুধুমাত্র সর্প ও মস্তকের খুলির মালা পরিহিত, রক্তাক্ত আকারে অগ্নিসদৃশ মেজাজে দাঁড়য়ে থাকে।

রাসযাত্রা

বিভিন্ন বাঙালি উৎসবগুলির মধ্যে রাসযাত্রা হল একটি জনপ্রিয় উৎসব। সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে এই ধর্মীয় উৎসব রাসযাত্রা পালিত হয়। এটি সাধারণত প্রতি বছর শীতকালে প্রায় ডিসেম্বর নাগাদ অনুষ্ঠিত হয়।

এই রাসাযাত্রা উৎসবটি রাস যাত্রা নামেও পরিচিত, ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে সম্মান এবং শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অংশে পালন করা হয়। এই উৎসবটি বিশেষভাবে অগণিত অবিশ্বাস্য এবং বিস্ময়কর কার্যক্রমের মধ্যে দিয়ে পালিত হয়। এটিতে বৃন্দাবনে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সর্বদা তাঁর রাখাল বন্ধুদের সাথে অবস্থানের সময়ের উপর বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়।

রাসযাত্রায়, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের পূজা করা হয়। এই রাসযাত্রার সময় পশ্চিমবঙ্গে গোটা রাজ্য জুড়ে মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই মেলা খুবই বিখ্যাত ও এখানে প্রচুর মানুষের ভিড় হয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ একটানা সাত দিন ধরে পূজিত হন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জীবন ও তাঁর বেশ কিছু অলৌকিক কার্যকলাপ এইসব মেলাগুলিতে তুলে ধরা হয়। এই সময় অনুষ্ঠিত মেলাগুলি রাসা মেলা বা রাস মেলা নামে জনপ্রিয়।

নবান্ন

পশ্চিমবঙ্গে ফসল উৎসব নবান্ন, অনেকটা তামিল উৎসব পোঙ্গলের ন্যায় পালিত হয়। নবান্ন ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্ব অঞ্চলে পালিত হয়। নব কথার অর্থ হল নতুন এবং অন্ন কথার অর্থ হল শস্য। যখন ‘আমন’ ধান চাষ করা হয় তখন এটি পালিত হয়। এই ফসল কাটার উৎসবগুলি ভারতের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রাথমিকভাবে ভারত কৃষিভিত্তিক দেশ এবং ফসলের ফলন সময়োপযোগী বৃষ্টিপাতের উপর নির্ভর করে। উৎপাদন যাতে সারা বছর ভালো হয় তাই দেবতাকে তৃপ্ত করার লক্ষ্যে এই উৎসব বিশাল জাঁকজমকের সঙ্গে আয়োজন করা হয়।

বাংলাদেশে, নবান্ন প্রাথমিকভাবে একটি হিন্দু উৎসব। শরৎ কালীন ফসল কাটার পর এই উৎসবটি পালিত হয়। যেমন মহালয়া, এই উৎসবে পূর্বপুরুষদের নতুন ধানের সঙ্গে প্রসন্ন করার এক গুরুত্বপূর্ণ রীতি ছিল। তারপর, এই অর্ঘ্য বিভিন্ন দেব-দেবী, পবিত্র অগ্নিদেব, প্রাণী ও ব্রাহ্মনদের নিবেদন করা হত। চাল এই উৎসবের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গৃহাঙ্গন চালের পিটুলি দ্বারা সজ্জিত করা হয় এবং চালের পিঠে প্রতিবেশীদের মধ্যে বিনিময় করা হয়।

খ্রীষ্টমাস

পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উন্মত্ততা, মেলা ও উৎসবের প্রাচুর্য্যতা লক্ষ্য করা যায়। এই ধর্ম-নিরপেক্ষ রাজ্যটি আনন্দ উপভোগের জন্য জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বিভিন্ন উৎসবকে উল্লসিত ভাবে পালনের মধ্যে দিয়ে জীবনের আনন্দ খুঁজে পায়। তাই, খ্রীস্টানদের একটি ঐতিহ্যগত উৎসব, খ্রীষ্টমাসও এখানে জাঁকজমকের সঙ্গে পালন করা হয়।

কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের শহরতলির একটি বৃহদাকার অংশ খ্রীস্টান জনসাধারণ নিয়ে গঠিত। তাই পশ্চিমবঙ্গে ২৫-শে ডিসেম্বর যীশু খ্রীষ্টের জন্মদিবস উপলক্ষ্যে বার্ষিক উৎসব হিসাবে খ্রীষ্টমাস আড়ম্বর পূর্ণ ভাবে পালিত হয়। চলতি ভাষায় বাঙালিরা এটিকে বড় দিন হিসাবে উল্লেখ করে। পশ্চিমবঙ্গে এই খ্রীষ্টমাস – খ্রীষ্টমাস গাছ, উপহার ও প্রচলিত খাবার পুরভরা টার্কি ও পুডিং-এর সঙ্গে জাঁকজমকের সাথে উদযাপিত হয়।

গঙ্গা সাগর মেলা

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটি তার সাংস্কৃতিক উন্মত্ততায় ঐশ্বর্যশালী হয়ে রয়েছে, এখানকার পালিত উৎসবগুলি এই রাজ্যের হয়ে অনেক কথা বলে। সারা বছর ধরে অনুষ্ঠিত এই বর্ণময় উৎসবগুলি উচ্ছ্বাসিত নাগরিকদের ইচ্ছাপূরণ করে চলে এবং তারা উৎসাহের সঙ্গে সমস্ত অনুষ্ঠানগুলি পালন করে। গঙ্গাসাগর মেলা সম্ভবত রাজ্যের সর্ববৃহত্তম মেলা।

নামের সুপারিশ অনুযায়ী, গঙ্গাসাগর মেলা দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলায় গঙ্গাসাগর বা বৃহৎ বঙ্গোপসাগরের তীরে অনুষ্ঠিত হয়। এই উৎসব মকর সংক্রান্তি উপলক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হয়। এইসময় তীর্থযাত্রী ও ভক্তরা এই সাগর দ্বীপে ঝাঁকে ঝাঁকে ভিড় করে।

জানুয়ারী ও ফেব্রুয়ারী মাসে শীতকালে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়। ঠাণ্ডা সমুদ্রের হাওয়া ও লবণামৃত এই পবিত্র জলে একবার ডুব দিতে মানুষরা এখানে আসে এবং তারা পাপ মুক্ত হয়।

তিন দিন ব্যাপী রাজ্যে এই মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বিভিন্ন কোণ থেকে তীর্থযাত্রীরা ঈশ্বরের আশীর্বাদ পেতে এবং প্রায়শ্চিত্ত করার লক্ষ্যে এই হিম-শীতল সমু্দ্রের জলে স্নান করার জন্য এখানে আসে।

পৌষ মেলা

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটি, তার অতুলনীয় সৌন্দর্য্য, মেলা ও উৎসবগুলির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার ও প্রাচীন ইতিহাসের প্রাচুর্য্যে উল্লিখিত হয়ে আছে। পৌষ মেলাও এক ধরনের মেলা যা শান্তিনিকেতনে অনুষ্ঠিত হয় এবং এটি শুদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে রচিত।

শীতকালের গোড়ার দিকে, পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার সুন্দর স্বর্গোদ্যান শান্তিনিকেতনে প্রতি বছর এই পৌষ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই মেলা সাম্প্রতিক বছরের বিদায় লগ্নে এবং নতুন বছরের আগমনীর প্রস্তুতির সময়, এক নতুন আশা এবং নতুন প্রতিশ্রুতি নিয়ে, পৌষ মাসের ৭ থেকে ৯ তারিখের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়।

শান্তিনিকেতন, প্রখ্যাত নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তার অনুপ্রেরণায় সৃষ্ট, সারা বছর ধরে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎসবের প্রাচুর্য্যে এই ভূমি প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছে। পৌষ মেলা সম্ভবত শান্তিনিকেতনের মেলা প্রাঙ্গনে আয়োজিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব।

জয়দেব মেলা

বাঙালি সংস্কৃতির উপবিষ্ট পশ্চিমবঙ্গ, তার প্রাচীন ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য। এখানকার আবেগ-প্রবণ ও প্রাণবন্ত মানুষ মেলা ও উৎসবের মাধ্যমে তাদের জীবন উপভোগ করতে ভালবাসে। বিভিন্ন মেলাগুলির মধ্যে, জয়দেব মেলা হল এক ঐতিহ্যগত সাংস্কৃতিক উৎসব যা ধর্মীয় উৎসাহের সঙ্গে পালিত হয়।

কথিত আছে, বাঙালির ক্যালেন্ডার বারো মাসে তেরো পার্বণ। উৎসাহী এবং সমৃদ্ধ বাঙালির উপলক্ষ পালনের জন্য শুধু একটি সামান্য কারণ প্রয়োজন। প্রতি বছর বর্ধমানের কেঁন্দুলি মেলা প্রাঙ্গনে এই জয়দেব মেলা অনুষ্ঠিত হয়।

রবীন্দ্রনাথের মহিমান্বিত শান্তিনিকেতন, যা শীতকালীন উৎসবে আচ্ছাদিত তার থেকে সামান্য দূরে কলকাতার উপকন্ঠে এই ক্ষুদ্র, চিত্রানুরাগী গ্রামটি অবস্থিত। কবি জয়দেবের ভক্তি-অর্চনার প্রতিভাকে শ্রদ্ধা জানাতে প্রতি বছর জানুয়ারী মাসে এই মেলার আয়োজন করা হয়। এই মেলা লোক ঐতিহ্যের সঙ্গে জীবিত রয়েছে এবং দেশের সব কোণ থেকে পর্যটক এবং তীর্থযাত্রীরা ধর্মীয় টানে এই মেলা প্রাঙ্গনে ভিড় করে।

সরস্বতী পূজা

সরস্বতী পূজা এমন এক ধরনের উৎসব যা পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব বাঙালির বাড়িতে পালন করা হয়। এই দিনে, জ্ঞান এবং চারুকলার দেবী মহান নিষ্ঠার সঙ্গে পূজিত হন। বাঙালি সম্প্রদায় জ্ঞান এবং চারুকলাকে তাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে বিবেচনা করে। সব বয়সের ব্যক্তিই অতুলনীয় উৎসাহের সঙ্গে সরস্বতী পূজায় অংশগ্রহণ করে।

দেবী সরস্বতী অধিকাংশ বাঙালির ঘরে একটি আবশ্যিক হিসাবে পূজিত হন। এমনকি যারা নাস্তিক তাদের ঘরেও সরস্বতী পূজা পালন করা হয়। এটির কারণ সম্ভবত দেবী সরস্বতী, জ্ঞান ও চারুকলার সংক্ষিপ্তসার বলে বিবেচিত হন। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বিদ্যা ও সাংস্কৃতিক মানের উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়। পশ্চিমবঙ্গে এমন কোনও শিল্পীই নেই যিনি সরস্বতী পূজা সম্পাদন করেন না। জ্ঞান এবং চারুকলার এই দেবী তার বাম হাতে ‘বীণা’ সহ সাদা শাড়িতে ভূষিত।

শিবরাত্রি

শিবরাত্রি নামক প্রসিদ্ধ উৎসব শ্রদ্ধার সঙ্গে সমস্ত দেশ জুড়ে পালিত হয়। কিন্তু বিভিন্ন রাজ্যে, সম্ভবত ভিন্ন ধর্মের উপস্থিতির কারণে এতে কিছু ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। পশ্চিমবঙ্গে এই শিবরাত্রি অনেক উদ্যমের সঙ্গে পালিত হয়।

ভক্তরা এই শিবরাত্রিতে সারাদিন ব্যাপী উপবাস থাকে। শিবপূজা রাত্রিবেলায় অনুষ্ঠিত হয় এবং এতে শিব লিঙ্গকে দুধের দ্বারা স্নান করানো হয়। পশ্চিমবঙ্গে, এক ধরনের উর্বর কাদামাটি দিয়ে নিষ্ঠাভাবে চারটি শিবলিঙ্গ তৈরির এক ঐতিহ্যগত প্রথা রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে, এই ধরনের কাদামাটি পবিত্র গঙ্গা নদীর তীরে দেখতে পাওয়া যায়। এই চারটি শিবলিঙ্গ রাতভর পূজার সময় এক এক করে অর্পন করা হয়। সম্পূর্ণ রাতকে চারটি সমান সময়কালে বিভক্ত করা হয়, যাকে প্রহর বলা হয়। প্রথম প্রহরে, শিবলিঙ্গকে শুদ্ধ দুধ দিয়ে স্নান করানো হয়। দ্বিতীয় প্রহরে এটিকে দই-য়ের দ্বারা মাখিয়ে দেওয়া হয়, তৃতীয় প্রহরে শিবলিঙ্গকে ঘি দ্বারা স্নান করানো হয় এবং চতুর্থ প্রহরে এটিকে মধু সহযোগে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। রাতভর পূজা করার পর, ভক্তরা অবশেষে ‘প্রসাদ’ গ্রহণের মাধ্যমে তাদের উপবাস ব্রত ভঙ্গ করে।

পয়লা বৈশাখ

বাঙালির নতুন বর্ষ, পশ্চিমবঙ্গে পয়লা বৈশাখ নামেও সুপরিচিত। বাংলা ক্যালেন্ডারের প্রথম দিনটি, সমগ্র রাজ্য জুড়ে হৃদয়গ্রাহী উৎসব এবং অনুষ্ঠানের জন্য সূচিত হয়। বাংলা ক্যালেন্ডারের প্রথম মাসটি হল বৈশাখ মাস এবং এই মাসের প্রথম দিনটি বা ‘পয়লা’ দিনটি বাংলার নববর্ষের সূচনাকে ইঙ্গিত করে। সমগ্র বাংলায় এই অনুষ্ঠান সমস্ত আঞ্চলিক বা ধর্মীয় পার্থক্য নির্বিশেষে একসঙ্গে পালিত হয়। পশ্চিম বাংলার বাইরের বাঙালিদের মধ্যেও এই খুশির অনুষ্ঠানটিকে পালন করতে দেখা যায়। এটি সাধারণত ইংরাজী মাসের মাঝামাঝি সময় এপ্রিল মাসে বাংলা নববর্ষ পালিত হয়।

রথযাত্রা

প্রাণবন্ত এবং উচ্ছসিত মানুষের এই ভূমি পশ্চিমবঙ্গ তার বর্ণময় উৎসবের জন্য সুপ্রসিদ্ধ। একটি কথার প্রচলন আছে যে, বাংলার ক্যালেন্ডারে বারো মাস তেরো পার্বণ। বাঙালির ঐতিহ্যগত উৎসব হল রথযাত্রা। এই বর্ণময় অনুষ্ঠানে মানুষ প্রভূ জগন্নাথকে বহন করে রথ টেনে নিয়ে যায়।

এই রথযাত্রা প্রধানত জুন-জুলাই মাসে বর্ষার গোড়ার দিকে পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলায় অনুষ্ঠিত হয়। এইসময় সশব্দ গর্জনের সঙ্গে বিদীর্ণ বাদল মেঘ ভারী বৃষ্টি অনুষঙ্গী করে নীলকাশে বিছিয়ে পড়ে। শ্রীরামপুরের কাছে হুগলী নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত মাহেশ, তার বিখ্যাত রথযাত্রা পালনের জন্য বিশ্বব্যাপী বিখ্যাত। সাহিত্যস্রষ্টা শ্রী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত সাহিত্য গ্রন্থ ‘রাধারাণী’র পিছনে ১৮৭৫ সালের বিখ্যাত মাহেশ রথযাত্রার এক বিশাল অনু্প্রেরণা ছিল।

বিষ্ণুপুর উৎসব

পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুর তার চমৎকার পোড়ামাটির শিল্প, প্রাচীন মন্দির, মার্জিত পশমী শাড়ি এবং সমৃদ্ধ সঙ্গীতের ঐতিহ্যের জন্য বিখ্যাত। বাঁকুড়ার, বিষ্ণুপুরের এই সমস্ত বৈশিষ্ট্য বিষ্ণুপুর উৎসবকে দৃঢ়তা প্রদান করে। এই বিষ্ণুপুর উৎসব প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে ২৭ থেকে ৩১-তারিখের মধ্যে আয়োজিত হয়। শহরের বিখ্যাত মদনমোহন মন্দিরের কাছাকাছি স্থানে এটি অনুষ্ঠিত হয়।

বিষ্ণুপুর উৎসব স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকদের কাছে একটি খুব জনপ্রিয় উৎসব হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অনেক শিল্পী তাদের চমৎকার পোড়ামাটির কাজ, ভাস্কর্য এবং খোদাইয়ের বিভিন্ন কারুকার্য বিক্রয় ও প্রদর্শনীর জন্য এই উৎসবে নিয়ে আসে। স্থানীয় হস্তশিল্পীরা তাদের পণ্যের সঙ্গে এই প্রদর্শনীর রঙ্গভূমিতে ঝাঁকে ঝাঁকে ভিড় করে। অন্যান্য রাজ্যের হস্তশিল্পীরাও এই উৎসবে অংশগ্রহণ করে। খাঁটি পশমের শাড়ি, ঝিনুকের কাজ, ছৌ মুখোশ, জামাকাপড়, খাবার ইত্যাদি দোকানে প্রদর্শিত হয়। বিষ্ণুপুরে অবস্থিত তার নিজস্ব সঙ্গীত বিদ্যালয় ‘বিষ্ণুপুর ঘরানা’-র জন্য ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পরিক্রমায় বিষ্ণুপুরের নাম উল্লেখ রয়েছে। ‘বিষ্ণুপুর ঘরানা’র কাছের ও দূরের বহু গায়ক ও সঙ্গীতবিদ এবং অন্যান্য কিছু শাস্ত্রীয় শৈলী উৎসবের সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করে। অনেক বিশিষ্ট সঙ্গীতশিল্পীদের উপস্থিতির জন্য, এই স্থান শাস্ত্রীয় সঙ্গীত-প্রেমীদের কাছে একটি স্বর্গ হয়ে ওঠে। এই কারণেই বিষ্ণুপুর উৎসব অন্যান্য সাধারণ মেলা ও উৎসবগুলির চেয়ে আলাদা। এই উৎসব শিল্প, সঙ্গীত, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের এক অতুলনীয় মিশ্রন। আশ্চর্যের কিছুই নেই যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে অগ্রসর হচ্ছে।

রাসমেলা

রাসযাত্রা উৎসব সমারোহের সময়ে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত রাসমেলার সঙ্গে মানুষ জড়িত। পশ্চিমঙ্গের বিভিন্ন রাজ্য জড়ে প্রচুর মেলা আয়োজিত হয়, এর মধ্যে বেশ কিছু মেলা রাজধানী কলকাতাতেও অনুষ্ঠিত হয় তবে, এগুলির মধ্যে কোচবিহারের বার্ষিক রাসমেলা সবচেয়ে প্রসিদ্ধ।

জনপ্রিয় বাঙালি উৎসব, রাসযাত্রা উৎসব ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও তার চিরন্তন প্রেম শ্রী রাধিকার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের পরিপ্রেক্ষিতে অনুষ্ঠিত হয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রেম-কাহিনী এবং বৃন্দাবনে তাঁর অতিবাহিত মহিমান্বিত দিনগুলিকে স্মরণ করে এই রাসযাত্রা উৎসব পালিত হয়। যদিও এই রাসযাত্রা উৎসব সারা রাজ্য জুড়ে পালিত হয়, তবে উত্তরবঙ্গেই এই উৎসব সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয়। বাংলার উত্তর অংশে বহদিন থেকে এটি পালিত হয়। আগে রাজা-মহারাজাদের সময়ের থেকে আজকের দিনে এই উৎসব মানুষের মধ্যে আরোও বেশি ছড়িয়ে গেছে তবে, পুরনো তাৎপর্য এবং রাজকীয় ঐতিহ্য এখনও সম্মানের সঙ্গে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। বিশাল রাজবাড়ি বা কোচবিহারের রাজপ্রাসাদগুলিকে রাসযাত্রা উৎসবের সময় সাজিয়ে তোলা হয়। এই রাসমেলার সময় এই সমস্ত ভবনগুলি রঙ-বেরঙের দোকান, উৎসাহী মানুষের ভিড়, হস্তশিল্প এবং অন্যান্য পণ্যের সমৃদ্ধ সংগ্রহের মাধ্যমে এক বড় ধরনের মেলার আকার ধারণ করে।

সূত্র: ম্যাপ ইনফো

3.04255319149
মন্তব্য যোগ করুন

(ওপরের বিষয়বস্তুটি সম্পর্কে যদি আপনার কোন মন্তব্য / পরামর্শ থাকে, তাহলে দয়া করে আমাদের উদ্দেশ্যে পোস্ট করুন).

Enter the word
ন্যাভিগেশন
Back to top