যদি আগুন না থাকতো আজ পৃথিবীতে তাহলে কি হতে পারতো! কি হতে পারে তা কল্পনাও করা যাবেনা। তবে হ্যাঁ এটাও ঠিক হয়তো এতো এতো মানুষ যুদ্ধে মারা জেত্না। তবে মানব সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার আগুন। আগুনের আবিস্কার মানব সভ্যতাকে কয়েক মিলিয়ন বছর এগিয়ে দিয়েছিল। পুরাণ এবং বিজ্ঞান গ্রিক পুরাণ অনুযায়ী, দেবতা প্রমিথিউসের রোষে পৃথিবীতে সর্বপ্রথম অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। হিন্দুদের আগুনের দেবতা আবার স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা। আরও বেশ কিছু প্রাচীন গ্রন্থে আগুন নিয়ে আছে অনেক গল্প গাঁথা। তবে কোন কোন বিশেষজ্ঞের দাবী, পাথরে পাথর ঘষা থেকেই আগুনের উৎপত্তি। তবে আগুনের ইতিহাস প্রায় চারশ থেকে সাড়ে চারশ মিলিয়ন বছর আগেকার। গ্রীক দেবতা প্রমিথিউসের রোষে সর্বপ্রথম আগুন উৎপত্তি না কি আদিম মানুষের পাথরে পাথর ঘষায় আগুনের উৎপত্তি, এই সব নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রাচীন রহস্য উদঘাটনে বৈজ্ঞানিকভাবে সবচেয়ে স্বীকৃত এবং নির্ভরযোগ্য কার্বন টেস্ট অনুযায়ী ফসিল রেকর্ডে আগুনের দেখা মেলে ৪২০ মিলিয়ন বছর আগে। বৃক্ষের ভস্মীভবন এবং কয়লার প্রাপ্তির মধ্যে দিয়ে। মধ্য অর্ডোভিশিয়ান যুগে ৪৭০ মিলিয়ন বছর আগে যখন ভূমণ্ডলে বৃক্ষরাজি জন্মাতে শুরু করে, এর ফলে বায়ুমণ্ডলে জমতে থাকে অক্সিজেন। আর অক্সিজেনের ঘনীভবন শতকরা ১৩ ভাগ ছাড়িয়ে গেলেই বনে আগুন লাগার সম্ভাবনা দেখা দেয়। দাউ দাউ করে আগুন ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। এর নাম ‘ওয়াইল্ড ফায়ার’। বৈজ্ঞানিকদের আবিষ্কারে ৪১০ মিলিয়ন বছর আগে এমন ওয়াইল্ড ফায়ারে বৃক্ষ পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়ার প্রমাণ মিলেছে। যখন থেকে ঘাস জন্মাতে শুরু করে তখন থেকেই প্রকৃতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অধিকার করে নেয় ঘাস জাতীয় উদ্ভিদ। তখন বেড়ে যায় এই আগুন লাগার ঘটনাও। সময়টা ৬০ থেকে ৭০ লাখ বছর আগেকার। কারণ শুকনা ঘাসে আগুন লাগার সম্ভাবনাও বেশি। আগুন আবিষ্কৃত হওয়ার পর প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত যতটা না আগুন জ্বালানো হয়েছে বরং তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আগুন নিয়ন্ত্রণ করা। চার লাখ বছর আগে আগুনের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ছিল কিনা তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। তবে ১৯ লাখ বছর আগেকার আগুনে ঝলসানো খাবারের অস্তিত্ব মিলেছে। এ থেকে ধারণা করা হয়, আগুনের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কয়েক সহস্র শতাব্দী পুরনো। তবে আগুনের নিয়ন্ত্রিত, নিয়মিত ও বহুবিধ ব্যবহারের ইতিহাস ৫০ হাজার থেকে এক লাখ বছরের মাত্র। যুগে যুগে ধ্বংসকারীদেরও প্রধান পছন্দ ছিল আগুন। এর প্রমাণ আমরা পাই সেই মধ্যযুগ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ের অনেক যুদ্ধবিগ্রহ পর্যন্ত। রণাঙ্গনে আগুনের গোলা নিক্ষেপের ইতিহাসও বেশ পুরনো। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে আগুনের ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে। আগুনের ব্যবহার মানব সভ্যতার একটি বড় অগ্রগতির নিদর্শন ছিল আগুনের ব্যবহার শেখা। কিন্তু এমন একটা সময় ছিল যখন আগুন ছিলই না। বলা ভালো মানুষের জ্ঞান ছিল না আগুনের ব্যাপারে। যথারীতি প্রশ্ন চলেই আসে যে, তাহলে ঠিক কবে থেকে আগুন ব্যবহার করা শুরু করলো মানুষ? কে প্রথম আগুনকে আয়ত্বে আনে? হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ববিদ রিচার্ড রাংহামের মতে, হোমিনিডরা মানুষ হিসেবে নিজেদেরকে উন্নীত করে আগুনের আবিষ্কার এবং তারাই আগুঙ্কে নিয়ন্ত্রণও করতে শেখে। এই সময়টাকে তিনি ১.৮ মিলিয়ন বছর আগেকার কোনো একটা সময় বলে মনে করেন। বর্তমানে রান্না করাটা আমাদের কাছে স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে গিয়েছে। তবে রাংহামের মতে, এটি কেবল রান্না করা নয়, বরং মানুষ যে আসলেই বুদ্ধিমান মানুষ সেটাও প্রমাণ করে। অতীতে আমাদের উন্নত এবং বুদ্ধিমান হওয়ার একটি স্তরকে মনে করিয়ে দেয় এই রান্না করা এবং তাতে আগুনের ব্যবহার। তবে রিচার্ড রাংহামের এই কথাগুলো নিয়ে সমালোচনা হয়েছে প্রচুর। নিয়ান্ডারথাল, হোমো ইরেক্টাস নাকি আধুনিক মানুষ! কে আগুনের আবিষ্কারক? আগুন আবিষ্কারের সময় এবং কে আগুন আবিষ্কার করেছে কিংবা নিয়ন্ত্রণ করেছে প্রথম সেটা নিয়েই আলোচনা শুরু হয় গবেষকদের মধ্যে। নিয়ান্ডারথাল, হোমো ইরেক্টাস নাকি আধুনিক মানুষ? কারা আগুনের আবিষ্কারক এবং প্রথম নিয়ন্ত্রক? এর উত্তর জানতে হলে প্রথমে এদেরকে ভালো করে জানতে হবে। ১.৮ মিলিয়ন বছর আগে মানুষের যে পূর্বপুরুষেরা পৃথিবীতে ছিল তাদেরকে হোমো ইরেক্টাস বলেই মনে করা হয়। এরা ছিল অনেক বেশি লম্বা আর কম বুদ্ধিসম্পন্ন। হোমো ইরেক্টাস থেকে পরবর্তীতে দুটো ধাপ সামনে এগিয়ে গেলেই পাওয়া যায় নিয়ান্ডারথাল এবং আধুনিক মানুষদের। নিয়ান্ডারথালদের উদ্ভব হয়েছে ৬,০০,০০০ বছর আগে। আর আধুনিক মানুষের উদ্ভব হয় ২,০০,০০০ বছর আগে। হোমো ইরেক্টাসদের তুলনায় নিয়ান্ডারথাল ছিল ক্ষীণকায়। এদের মস্তিষ্ক ছিল তুলনামূলকভাবে বড় এবং তারা হোমো ইরেক্টাসদের চাইতে অনেক বেশি বুদ্ধি ধারণ করতো। মনে করা হয়, হোমো সেপিয়েন্সদের সাথে লড়াই করতে গিয়ে এরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। রিচার্ড রাংহামের মতে, হোমো ইরেক্টাসরাই প্রথম আগুন আবিষ্কার করে এবং এর ব্যবহার শুরু করে। এদের শারীরিক গঠন থেকেই এমন একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছান তিনি। ছোট চোয়াল ও দাঁত, সংক্ষিপ্ত অন্ত্রনালী এবং অন্যান্য হোমিনিডদের চাইতে বড় মগজবিশিষ্ট হোমো ইরেক্টাস সম্পর্কে এবং এদের গঠনের নিদর্শন থেকেই বোঝা যায় যে, এরা নিয়মিত নরম এবং রান্না করা খাবার গ্রহণ করতো। রিচার্ডের যুক্তি বেশ সহজ এবং গ্রহণযোগ্য। নৃতাত্ত্বিক তথ্যে আগুনের প্রথম ব্যবহারের নিদর্শন নৃতাত্ত্বিক তথ্য কিন্তু অন্য কথা বলে। সেই অনুসারে ১.৬ মিলিয়ন বছর আগেই কেনিয়ার একটি স্থানে আগুন ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া যায়। তবে এই আগুন প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয়েছিল নাকি মানুষের দ্বারা সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে ডেভিড র্যাংকহামের দেখানো তথ্য ও যুক্তি অনুসারে, হোমো ইরেক্টাসেরা আফ্রিকা থেকে ইউরোপে আসার সময় আগুন নিয়ে আসেনি। হয় আগুনের ব্যবহার তখনো সেভাবে কেউ জানতো না, অথবা আগুন খুব বেশি উপকারী কিছু ছিল না তাদের কাছে। এখন প্রশ্ন হলো, ইউরোপে যদি আগুন হোমো ইরেক্টাসেরা না এনে থাকে তাহলে এখানে আগুনের আবিষ্কার হলো কীভাবে? নৃবিজ্ঞানী উইল রোব্রোক এবং পাওলা ভিলা বছরের পর বছর এ বিষয়ে অনুসন্ধান এবং গবেষণা চালান। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ৩,০০,০০০ এবং ৪,০০,০০০ বছর আগেও যে ইউরোপে আগুনের ব্যবহার ছিল তেমন বেশ কিছু নিদর্শন এবং বেশ কিছু স্থানে খুঁজে পান। এই সময়ের আগে আগুনের কোনো চিহ্ন কোথাও খুঁজে পাননি তারা। তবে সম্প্রতি পাওয়া তথ্যানুসারে, ইসরায়েলের তাবুন গুহা থেকে ৩৫০০০০ বছর আগে আগুন ব্যবহারের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে। হোমো সেপিয়েন্সরা ১,০০,০০০ বছর আগে এইসব স্থানগুলোতে এলেও আগুনের ব্যাপারে কাজ করেছিল নিয়ান্ডারথালরাই। আগুনকে নিয়ন্ত্রণেও এনেছিল এরা। তবে তার অর্থ এই নয় যে, সবখানে নিয়ান্ডারথালরা সমানভাবে আগুনের ব্যবহার করেছিল। কিছু কিছু স্থানে আগুনের ব্যবহার মানুষের বৃদ্ধির চাইতেও বেশি পরিমাণে বেড়ে গিয়েছিল। আর অন্যান্য স্থানে আগুনের ব্যবহার ছিলই না বলা চলে। ব্রিটিশ নৃবিজ্ঞানী ডেনিস সানগ্যাথ এ ব্যাপারে প্রচুর অনুসন্ধানের পর এমন কিছু তথ্য পান যেগুলো নিয়ান্ডারথাল এবং আগুন সংক্রান্ত সমস্ত আলোচনায় জল ঢেলে দেয়। ফ্রান্সে তারা এমন দুটি নিয়ান্ডারথাল গুহা খুঁজে পান যেখানে প্রচন্ড ঠান্ডা থাকা সত্ত্বেও নিয়ান্ডারথালরা আগুন জ্বালায়নি। এমন আরো অনেক তথ্য সংগ্রহের পর ডেনিস সিদ্ধান্তে আসেন যে, আদতে নিয়ান্ডারথালরা আগুনের ব্যবহার কিছুটা জানলেও সেটা তৈরি করতে জানতো না। আগুনকে হোমিনিডরা আয়ত্বে আনে ১২,০০০ বছর আগে। এর আগে নিয়ান্ডারথালরা চেষ্টা করেছে সবসময়, কিন্তু পারেনি। তাদের মধ্যে আগুনের ব্যবহার ছিল। তবে সেটা হয়েছে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া আগুনকে কেন্দ্র করেই। সেটাকেই তারা ব্যবহার করেছে, বেশিক্ষণ ধরে জিইয়ে রেখেছে ব্যবহারের জন্য। তবে নিজ থেকে আগুন জ্বালানোর কৌশল তাদের জানা ছিল না। এনিয়েও অনেক তর্কবিতর্ক রয়েছে গবেষকদের মধ্যে। এখনও অনুসন্ধান চলছে। তবে এটা প্রমানিত যে কোন দেব বা দেবী নয়, মানুষই প্রথম আগুনের আবিস্কার করেছিল। সময়টা ১০০০০ বছরেরও পূর্বে। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)।তথ্য সুত্রঃ উইকিপিডিয়া এবং সমসাময়িক পত্রপত্রিকা।