অসমীয়া   বাংলা   बोड़ो   डोगरी   ગુજરાતી   ಕನ್ನಡ   كأشُر   कोंकणी   संथाली   মনিপুরি   नेपाली   ଓରିୟା   ਪੰਜਾਬੀ   संस्कृत   தமிழ்  తెలుగు   ردو

এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ও আমাদের স্বাস্থ্য সেবা

এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ও আমাদের স্বাস্থ্য সেবা

এবারের জাতিসংঘের সাধারণ সভার আলোচনা বিশেষভাবে আলোচনা করেছে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বিষয়ে। জাতিসংঘের সাধারণ সভার ৭০ বছরের ইতিহাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য বিষয়ক আলোচনা হয়েছে এই বার নিয়ে মাত্র চারবার, ২০১১ সালে এইচআইভি ও এইডস প্রতিরোধ বিষয়ে, এবং সেই বছরের শেষের দিকে ক্যান্সার, ডায়াবেটিস ইত্যাদি অসংক্রামক রোগের প্রতিরোধ বিষয়ে, ২০১৪ সালে ইবোলার বিস্তার থামানোর জন্য করণীয় বিষয়ে আলোচনার জন্য; এবং এবার এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধে কী করণীয় সেই বিষয়ে। জাতিসংঘের সদস্য সব দেশগুলো যখন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে তখন সেই বিষয়টির গুরুত্ব সহজে অনুমেয়।

মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধের কারণে প্রতি বছর ক্যান্সারের চেয়ে-ও বেশি লোক মারা যায়, সারা পৃথিবী জুড়ে বছরে প্রায় ৭ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেন, এবং ধারণা করা হচ্ছে যে ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ১০ মিলিয়নে। এছাড়া ২০৫০ সাল নাগাদ এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ জনিত কারণে (যেমন, চিকিৎসা খাত, সেবাদানের খরচ, কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনে হ্রাস) সারা বিশ্বব্যাপী অপচয় গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন আমেরিকান ডলারে।

যখন বিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে এন্টিবায়োটিক ওষুধ বেশ জনপ্রিয়তা পায় তখন সবাই মনে করতো যে প্রায় সব রোগ, বিশেষ করে ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগের প্রতিরোধক হিসেবে সব সময় কাজ করবে। সেই সময়ে অনেক লোকের জীবন বাঁচলে-ও বর্তমানে বাস্তবতা অন্যরকম, কারণ অধিকাংশ জীবাণু বা ব্যাকটেরিয়া আমাদের প্রচলিত সব ধরণের ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, ফলে এন্টিবায়োটিক ওষুধ দিয়ে এইসব ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুর নির্মূল সম্ভব নয় আর; ফলে মানুষের মৃত্যু হতে থাকবে ওষুধ আবিষ্কারের আগের সময়ের মতন। যেমন, বর্তমানে শুধুমাত্র আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ লোক বিভিন্ন ধরণের ব্যাকটেরিয়া জনিত রোগে আক্রান্ত হন যা এন্টিবায়োটিক ওষুধ দ্বারা সারান যায় না, ফলে প্রায় ২৩ হাজারের মতন লোক মারা যায় প্রতিবছর শুধুমাত্র আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রেই। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন আগামী দিনগুলোতে এই সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকবে।

অনেক রোগ, যেগুলোর আগে চিকিৎসা করা যেতো এন্টিবায়োটিক ওষুধের মাধ্যমে সেইসব রোগের ক্ষেত্রে-ও এই প্রতিরোধ গড়ে উঠছে, যেমন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে গনেরিয়া (এক ধরণের যৌনতা-বাহিত রোগ) রোগটি প্রায় চিকিৎসার অসাধ্য হয়ে উঠেছে পৃথিবীর অনেক জায়গায় এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধের কারণে। এছাড়া ই. কোলি ব্যাকটেরিয়ার একটি বংশ পাওয়া গেছে যেগুলো বিদ্যমান সব এন্টিবায়োটিক ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। বিশ্বের প্রায় সর্বত্রই, এমনকি সাধারণ সংক্রমণের ক্ষেত্রে-ও এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ গড়ে উঠছে। মূত্রনালীর সংক্রমণ ও যৌনরোগ যেমন ক্ল্যামেডিয়া, সিফিলিস ইত্যাদি রোগ, যেগুলোকে আগে এন্টিবায়োটিক ওষুধ দ্বারা নিরাময়যোগ্য ছিলো সেগুলো এখন প্রতিরোধী, ফলে প্রতিবছর এইসব রোগে মারা যাচ্ছে অনেক মানুষ। অর্থাৎ, একই সাথে রোগযন্ত্রণা দীর্ঘ হচ্ছে এবং মৃত্যুর হার বাড়ছে।

প্রশ্ন করতে পারেন যে ঠিক কীভাবে এই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এইসব জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াসমূহ। মূলত মানব স্বাস্থ্যসেবা এবং গৃহপালিত পশুপাখির চিকিৎসায় যত্রতত্র যেমন খুশি তেমনভাবে অর্থাৎ অপ্রয়োজনীয়ভাবে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ছাড়াই ওষুধগুলো ব্যবহারের কারণে এই প্রতিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণভাবে বোঝালে ব্যাপারটি এইরকম- মনে করুন আপনার একটি চর্মরোগ হয়েছে ব্যাকটেরিয়া-জনিত কারণে, এবং আপনি এর জন্য এক ধরণের এন্টিবায়োটিক মলম ব্যবহার করলেন, আপনার ডাক্তার বললো যে অন্তত সাতদিন ব্যবহার করতে, কিন্তু চারদিনের মাথায় দেখলেন যে আপনার চর্মরোগ ভালো হতে শুরু করেছে এবং আপনি মলমটি ব্যবহার করা বন্ধ করে দিলেন এবং আপনি মলমটি আবর্জনার সাথে ফেলে দিলেন; আপনার চর্মরোগ ভালো হতে শুরু করলে-ও হয়তো দেখা যেতে পারে যে আসলে সব ব্যাকটেরিয়া মরে নি, যেসব ব্যাকটেরিয়া বেঁচে গেছে তাদের পরবর্তী বংশধর ওই ওষুধ প্রতিরোধের জন্য সুরক্ষা গড়ে তুলবে, অর্থাৎ যা আপনাকে মারে না তা আপনাকে শক্তিশালী করে তুলে- এই রকম প্রবাদের মতন। এছাড়া আপনার ফেলে দেয়া এন্টিবায়োটিক ওষুধটি বাইরের পরিবেশের অনেক ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুকে মেরে ফেলবে, এবং একই সাথে কিছু কিছু জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়া টিকে থাকার তাগিদে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। মূলত এভাবে অনেক ব্যাকটেরিয়া বিভিন্ন কারণে নানা দেশে বা শহরে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, যাদেরকে একাধিক এন্টিবায়োটিক ওষুধ দিয়েও কাবু করা যায় না বা যাচ্ছে না।

একেকটি ওষুধ তৈরির পেছনে লাগে অনেক গবেষণা, বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম, জ্ঞানের পরিসর এবং অনেক বছরের কাজ; কিন্তু একটি ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে অনায়সে যদি ব্যবহারীকারীরা অসাবধানী হন এবং ডাক্তার বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী না ব্যবহার করেন। এন্টিবায়োটিক এইসব ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ একদিনে গড়ে উঠেনি, তিল তিল করে দিনের পর দিন ধরে গড়ে উঠেছে, যার দায় অনেকাংশে ব্যবহারকারীদের। এইসব এন্টিবায়োটিক ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে সক্ষম জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াদেরকে “সুপারবাগ” (Superbugs) বলা হয়।

জীবনের সবচেয়ে মৌলিক স্তরে পৃথিবীর প্রতিটি জৈব-ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত, প্রভাবিত হয় কিন্তু আণূবীক্ষণিক জীবাণু থেকে শুরু করে ব্যাকটেরিয়ার ব্যাপক উপনিবেশ দ্বারা, আমাদের শরীর-ও ব্যতিক্রম নয়, মানব শরীর প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন কোষ মানব দ্বারা এবং ৩৯ ট্রিলিয়ন অন্যান্য জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়ার কোষ দ্বারা গঠিত- এইসব জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়া কিন্তু আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য। এইসব জীবাণু আমাদের খাদ্য পরিপাকে সহায়তা করে, আমাদের অন্যান্য ক্ষতিকর জীবাণু থেকে সুরক্ষা দেয়, আমাদের ত্বক পরিষ্কার রাখে ইত্যাদি। সমস্যা হচ্ছে যে ক্ষতিকর জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াদের দমন করতে গিয়ে আমরা মেরে ফেলছি ভালোগুলোকে-ও, যেমন নিউমোনিয়া থেকে নিরাময়ের জন্য আমরা একই সাথে মেরে ফেলি আমাদের অন্ত্র বা পেটের অনেক ব্যাকটেরিয়া ও আণুবীক্ষণিক জীবকে যারা আমাদের পেটের প্রদাহ রোধ করে কিংবা কোষ্ঠকাষ্ঠিন্য দূর করে। যেমন, গবেষণায় দেখা গেছে যে পেট ও শরীরের ভেতরের ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট হলে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, বিষণ্নতা এবং অন্যান্য অনেক শারীরিক ও মানসিক রোগ সৃষ্টি হতে পারে।  শুধু তাই নয়, পরিবেশের যাবতীয় সব চক্রে (যেমন, পানি চক্র, অক্সিজেন চক্র, কার্বন ও নাইট্রোজেন চক্র ইত্যাদি) জীবাণুদের অবদান রয়েছে, বলা হয়ে থাকে আমরা যত অক্সিজেন গ্রহণ করে তার অধিকাংশ গাছের তুলনায় জীবাণুদের (বিভিন্ন বিপাক ও জৈবরাসায়নিক বিক্রিয়া ও চক্রের মাধ্যমে) দ্বারা নির্গত। তাই বুঝতেই পারছেন আমাদের জীবন ও পরিবেশের জন্য জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াদের গুরুত্ব কতো অপরিমেয়। তাই আমাদের টিকে থাকার জন্যই আমাদের উচিত এন্টিবায়োটিক ব্যবহারে সচেতন হওয়া।

যেহেতু ব্যাকটেরিয়া সব জায়গায় আছে, এবং এইসব ব্যাকটেরিয়ার অধিকাংশ ক্ষতিকর নয়, ক্ষেত্রবিশেষে কিছু কিছু ব্যাকটেরিয়া উপকারী যেগুলো অন্যান্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার সাথে টিকে থাকার জন্য প্রতিযোগিতা করে এবং এমনকি ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াদের চাপের মুখে রাখে। অথচ যখন আপনি অপ্রয়োজনে এন্টিবায়োটিক ওষুধ ব্যবহার করেন তখন খারাপ ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি উপকারী ব্যাকটেরিয়াদের-ও মেরে ফেলেন।

এন্টিবায়োটিক ওষুধ তৈরি করা হয় সাধারণত প্রকৃতিতে সহজল্ভ্য বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা, অথবা অন্যান্য জীবাণুদের নির্যাস বা নিঃসৃত রাসায়নিক পদার্থ থেকে, যেমন মাটিতে থাকা ব্যাকটেরিয়া থেকে অথবা ছত্রাক থেকে বানানো পেনিসিলিন ইত্যাদি। কিন্তু এইসব সহজল্ভ্য প্রাকৃতিক উপাদানগুলো প্রায় “শেষ” হয়ে এসেছে, বলা হয়ে থাকে আমরা অধিকাংশ কোনো না কোনো ওষুধে ব্যবহার করে ফেলেছি। তাই বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন কৃত্রিমভাবে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ বানাতে, কিন্তু এইসব সময়সাধ্য ব্যাপার। কিন্তু নিত্য নতুন রোগ কিংবা পুরানো রোগের চিকিৎসার জন্য আমাদের নতুন এন্টিবায়োটিক ওষুধের প্রয়োজন, কারণ ব্যাকটেরিয়া এবং অন্যান্য জীবাণু দ্রুত অভিযোজিত হতে পারে. ফলে এন্টিবায়োটিক ওষুধের প্রতি প্রতিরোধ দ্রুত ঘটে।

অন্যান্য প্রাণী ও জীবাণুর মতন ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএনতে-ও (বংশগতির সূত্রবহনকারী) বিক্ষিপ্ত পরিবর্তন ঘটে, অধিকাংশ সময় এইসব পরিবর্তন খারাপ কিছু নয় কিংবা অভিযোজনের জন্য তেমন সহায়ক নয়, তবে ক্ষেত্রবিশেষে এইসব বিক্ষিপ্ত পরিবর্তনের কিছু কিছু ব্যাকটেরিয়াদের দুর্গম বা প্রতিকুল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য সহায়তা করে। যখন আপনি যত্রতত্র এন্টিবায়োটিক ওষুধ ব্যবহার করেন তখন টিকে থাকার জন্য ব্যাকটেরিয়াতে বিক্ষিপ্ত পরিবর্তন ঘটে এবং প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বংশগতিসূত্রানুসারে প্রবাহিত হয়, এছাড়া ব্যাকটেরিয়াসমূহ পরষ্পরের সাথে তাদের ডিএনএ শেয়ার করতে পারে, ফলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা এক ব্যাকটেরিয়া থেকে অন্য ব্যাকটেরিয়াতে-ও বিকশিত হয়।

অনেকে ধারণা করতেন যে নিত্যনতুন ওষুধ আবিষ্কার ও উৎকর্ষ প্রযুক্তির কল্যাণে ব্যাকটেরিয়াদের এই প্রতিরোধ ভেঙে পড়বে সহজে, তবে বাস্তবতা অন্যরকম, কারণ প্রয়োজনীয় অর্থ ও বিনিয়োগ থাকলে-ও চাইলেই নিত্যনতুন ওষুধ তৈরি করা যায় না যেহেতু একেকটি গবেষণার পেছনে লাগে প্রচুর সময় এবং ব্যাকটেরিয়ার নিত্যনতুন প্রতিরোধ ব্যবস্থার চেয়ে ওষুধ রসায়নের এগিয়ে থাকা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না।

অনেক ওষুধ কোম্পানি-ও ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধ ক্ষমতার সাথে তাল মিলিয়ে ওষুধ তৈরি করতে পারছে না, দেখা গেলো যে অনেক মিলিয়ন ডলার খরচ করে একটি নতুন ওষুধ আনলে-ও সেটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠছে কয়েক বছরেই, ফলে ওষুধ কোম্পানিগুলো লোকসানের ভয়ে গবেষণায় বিনিয়োগের ব্যাপারে অনেক সতর্ক। এছাড়া, যেসব দেশে ওষুধের দাম কীরকম হবে (বিশেষ করে মৌলিক ও জীবনরক্ষার জন্য অতিপ্রয়োজনীয় ওষুধের ক্ষেত্রে) সেই ব্যাপারে নির্দিষ্ট নীতিমালা বা আইন আছে, কিংবা যেসব দেশে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার অধীনে এন্টিবায়োটিক বিনামূল্যে (যেমন, কানাডা) বিতরণ করা হয় সেইসব দেশে প্রত্যাশিত লাভ পায় না ওষুধ কোম্পানিগুলো। তাই ওষুধ কোম্পানির প্রতি নির্ভর করে বা আশা করে থাকলে আমাদের চলবে না, এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধের বিপরীতে আমাদের এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের আচরণ পাল্টাতে হবে।

এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমানোর বিকল্প নেই, শুধুমাত্র গুরুতর রোগ ও সংক্রামনের জন্যই এর ব্যবহার সীমিত করা উচিত; এবং এই কাজটি করতে হবে আমাকে, আপনাকে, সবাইকে; সচেতনা ও সদিচ্ছা ছাড়া উপায় নেই। রোগ নির্ণয়ের জন্য ভালো উপায়ের ব্যবহার এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রতি মনোযোগ দিতে হবে; এভাবে দীর্ঘ সময়ে হয়তো যেসব ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে সেগুলোকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।

সামান্য হাত পা কাটলেই কিংবা সাধারণ ফোস্কা ইত্যাদি হলেই এন্টিবায়োটিক ওষুধের ব্যবহার কমাতে হবে বা সীমিত করতে হবে। বিকল্প চিকিৎসা নেয়া যেতে পারে, যেমন, অন্টিবায়োটিক না নিয়ে বরং ভাইরাসের দ্বারা ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলার থেরাপি রয়েছে। এছাড়া গাদ পদার্থ প্রতিস্থাপনের (fecal matter transplants) মাধ্যমে-ও আন্ত্রিক বা পেটের সংক্রামণের চিকিৎসা করা যায়। অর্থাৎ, কোনো রোগ হলেই এন্টিবায়োটিক সেবন বা লাগাতে হবে এই ধারণার পরিহার জরুরী।

অন্য আরেকটি ব্যাপার এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধের পেছনে দায়ী – অতিরিক্ত এন্টিবায়োটিক সাবান, শ্যাম্পু ও প্রসাধনী সামগ্রীর ব্যবহার। গৃহ ও আমাদের আশপাশে সাধারণ যেসব ব্যাকটেরিয়া থাকে সেগুলোর জন্য এন্টিবায়োটিক সাবান ব্যবহার করতে গিয়ে আমরা ভালোগুলোকে মেরে ফেলি এবং খারাপগুলো আরেক বেশি প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। সাধারণ সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করলেই চলে দৈনন্দিন কাজকর্মে। আমাদের এইসব আচরণ না পাল্টালে আমাদেরই বিপদ।

গবেষণা মতে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রে এন্টিবায়োটিক ব্যবস্থাপত্রের অর্ধেকের বেশি হচ্ছে অপ্রয়োজনীয়। গৃহপালিত বা খামারে পালিত পশুর ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার আরো বেশি শোচনীয়, কারণ দেখা যায় যে অনেকে কৃষক শুধু মাত্র রোগ সংক্রমণ ঠেকানোর জন্যই নয়, বরং পশু মোটাতাজাকরণ ও পশুপাখির উর্বরতা বাড়ানোর জন্য অনুমোদিত এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন, যেমন, পশুপাখি লালনপালনে ব্যবহৃত মোট এন্টিবায়োটিকের ৮০% ব্যবহৃত হয় পশুপাখিদের রোগ নিরাময়ে নয় বরং তাদের মোটাতাজাকরণে। এইসব ওষুধ কিন্তু পানি চক্রে ও আমাদের কৃষি ব্যবস্থায় গিয়ে ঠেকে, ফলে এইসব সুপারবাগের বিকাশের সম্ভাবনা বা ঝুঁকি অনেকগুণ বেড়ে যায়।

শুধুমাত্র খামার, হাসপাতাল ইত্যাদি স্থানে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া ও জীবাণু পাওয়া যায় এমন নয়, বরং আমাদের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা হচ্ছে এদের স্বর্গ, যেহেতু যাবতীয় বর্জ্য, ওষুধ ইত্যাদি এসে মিশে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় এবং এখানে টিকে থাকার জন্য ব্যাকটেরিয়ারা অন্যান্য সব পদার্থ ও অন্যান্য জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে দ্রুত, এমনকি এইসব ব্যাকটেরিয়া পরষ্পরের সাথে ডিএনএ বিনিময় করে আরো শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলে। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হচ্ছে যে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার ক্রটির কারণে এইসব প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া গিয়ে মিশতে পারে সহজে আমাদের যাপিত পরিবেশে, এমনকি আমাদের পানি ও খাদ্য চক্রে। যেমন, একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে চীনে এন্টিবায়োটিক ওষুধের ব্যবহার এতো বেশি যে পানির ট্যাপে কিংবা বাড়ির খাবারের পানিতে এন্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে, অনেকক্ষেত্রে মানুষের সহ্যক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি। চীনের কয়েকটি নদীর পানির নমুনায় পাওয়া গেছে প্রায় ৬০টির বেশি এন্টিবায়োটিক! ধারণা করা যায় আমাদের দেশে বুড়িগঙ্গা ও কিংবা শহরসংলগ্ন অনেক নদীর ক্ষেত্রে-ও এইরকম হবে। একইভাবে, চীনের একটি ওষুধ কোম্পানির কারখানার নিকটবর্তী জলে পাওয়া গেছে মানুষের চিকিৎসা মাত্রায় প্রায় ১০ হাজার গুণ বেশি পরিমাণের এন্টিবায়োটিক।

এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ সমস্যা পরিমাপের জন্য রয়েছে ওষুধ প্রতিরোধ সূচক (Drug Resistance Index), এই সূচকের মান ০ (শূন্য) থেকে ১০০ (একশত) পর্যন্ত হয়, ০ বলতে বোঝায় কোনো প্রতিরোধ গড়ে ওঠিনি, অর্থাৎ সব এন্টিবায়োটিক কাজ করে, এবং অন্যদিকে ১০০ বলতে বোঝায় জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়াসমূহ পুরোপুরি প্রতিরোধী। ইউরোপের ২৭টি দেশের মধ্যে ২২টি দেশেই (শুধুমাত্র জার্মানি ও সুইডেন ছাড়া) গত চৌদ্দ বছরে এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ অনেক বেড়েছে, ক্ষেত্র বিশেষে (যেমন, বুলগেরিয়া) বেশ বিপদজনক।

পশ্চিমা মিডিয়ার অনেকগুলোতে এই এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বিষয়ে লেখালেখি হলে-ও আমাদের দেশের কোনো মিডিয়া বা সংবাদপত্রে এই বিষয়ে কিছু চোখে পড়ে নি। আমাদের দেশের অধিকাংশ জনগণ এইসব বিষয়ে ধারণা রাখেন না, কিন্তু যেকোনো কাজের জন্য সচেতনতা হচ্ছে প্রথম শর্ত। তাই এই বিষয়ে সাধারণ মানুষের বোঝানো দরকার এবং তাদের সহযোগিতা জরুরী। সরকার ও সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো এই বিষয়ে গণসচেতনতা ও দিকনির্দেশনার জন্য কাজ করতে পারে।

একটি বিষয় মনে রাখা দরকার যে জাতিসংঘের সাধারণ সভা ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বিষয়ে অনেক দিকনির্দেশনা দেয়া ও আলোচনা করলে-ও এইসব সুপারিশ প্রয়োগ করার দায়িত্ব সদস্য রাষ্ট্রগুলোর। সদস্য রাষ্ট্রগুলোকেই তাদের জনগণ ও চিকিৎসাব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। বাঙলাদেশ সরকার এই বিষয়ে কী করছে, কিংবা এই ব্যাপারে অভিহিত আছে কিনা সেটি দেখার বিষয়। আমাদের দেশে অনেক ডাক্তার বাড়তি আয়ের জন্য কিংবা ওষুধ কোম্পানিগুলোর বিক্রেতার পরামর্শে অনেক অপ্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রে দেন, একজন সচেতন রোগী হিসেবে আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে। এছাড়া অনেক লোকই রোগ হলে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে ওষুধ দোকানগুলোতে গিয়ে দোকানদার, ক্ষেত্র বিশেষে ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ ও এন্টিবায়োটিক নেন, কিন্তু মনে রাখা দরকার যে এইসব দোকানদারের প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসা প্রশিক্ষণ নেই বা ফার্মাসিস্টরা-ও সনদপ্রাপ্ত ডাক্তার নন। তাই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করুন, এবং একজন সচেতন রোগী হিসেবে নিজের ওষুধপত্র সম্পর্কে ধারণা রাখুন।

সূত্র: বিজ্ঞানপত্রিকা



© 2006–2019 C–DAC.All content appearing on the vikaspedia portal is through collaborative effort of vikaspedia and its partners.We encourage you to use and share the content in a respectful and fair manner. Please leave all source links intact and adhere to applicable copyright and intellectual property guidelines and laws.
English to Hindi Transliterate