ডায়াবেটিসের চিকিৎসার ক্ষেত্রে রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ বা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রাখাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। তবে একই মঙ্গে এরই মধ্যে ডায়াবেটিসজনিত কোনো জটিলতা দেখা দিয়ে থাকলে তার যথোপযুক্ত চিকিৎসা করা এবং যে অঙ্গ-প্রতঙ্গ ডায়াবেটিসের কারণে ঝুঁকিতে পড়তে পারে তার দিকে বিশেষ নজর রাখা জরুরী। একেকজন ডায়াবেটিস রোগীর জন্য চিকিৎসা পদ্ধতির একটু তারতম্য হতে পারে। কিন্তু সকল ডায়াবেটিস রোগীর জন্য মূলনীতি একই। সেগুলো হলো– জীবনযাপন ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা শারীরিক শ্রম ও ব্যায়াম ডায়াবেটিস রোগীদের অবশ্যই নিয়মিত শারীরিক শ্রম বা ব্যায়াম করতে হবে। যদি কারো শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ হয় অথবা হাঁটার বা অন্য কোনো শারীরিক শ্রম/ব্যায়াম করার মতো অবস্থা না থাকে তবে হয়তো রেহাই নিতে পারেন। শারীরিক শ্রম ও ব্যায়াম বিভিন্নভাবেই হতে পারে। সেটা ব্যায়ামাগারে গিয়ে সুশৃঙ্খল ব্যায়ামও হতে পারে; বাসায় ব্যায়াম হতে পারে অথবা অন্য কোনো শ্রম করার কাজ হতে পারে। যাদের পক্ষে এরূপ সুশৃঙ্খল ব্যায়াম করা সম্ভব, তাদের জন্য সেটাই উত্তম। আর যাদের পক্ষে তা করা সম্ভব নয়, তাদের জন্য হাঁটা হল সবচেয়ে ভাল। হাঁটা নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি রয়েছে। কখন হাঁটবেন সেটা ঠিক করে নিতে হবে ডায়াবেটিস রোগীকেই। সকাল-বিকেল, সন্ধ্যা বা রাতে যে কোনো সময়ই হাঁটতে পারবেন। আপনার প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে হাঁটার সময়টি ঠিক করে নিন। প্রতি সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন হাঁটতে হবে। প্রতিবার হাঁটার গতি এমন হবে যেন তিনি ৪০ মিনিটে ৩ মাইল যেতে পারেন। আরেকটি হিসেব আছে। হাঁটার মাঝপথে হৃদস্পন্দন দেখা যেতে পারে। এ সময় হৃদস্পন্দন হতে পারে (২২০ রোগীর বয়স)/ মিনিট। সাধারণ হাঁটাহাঁটির তালে হেঁটে কেউ যদি ধরে নেন যে, তার হাঁটার কাজ সম্পন্ন হয়েছে তবে তা হবে না। সাঁতার বা জগিং ধরনের জটিল ব্যায়ামও উপকারী। ব্যায়াম সম্পর্কে লক্ষণীয় রক্তের গ্লুকোজ খুব বেশী থাকা অবস্থায় (৩০০ মিলিগ্রাম/ডিএল) ব্যায়াম করা উচিত নয়। গ্লুকোজ কমে গেলে (১০০ মিলিগ্রাম/ডিএল) কিছু নাস্তা খেয়ে এর কিছুক্ষণ পর ব্যায়াম করতে যাওয়া উচিত। যে কোনো জরুরী শারীরিক অবস্থায় (হার্ট এ্যাটাক, হার্ট ফেইলর, ইনফেকশন ইত্যাদি) ব্যায়াম করা যাবে না। রক্তচাপ অতিরিক্ত বেশী থাকলে তখনো ব্যায়াম করা উচিত নয়। ডায়াবেটিসের যে কোনো ধরনের জটিলতা থাকলে অবশ্যই চিচিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যায়াম নির্ধারণ করা উচিত। বিভিন্ন ধরনের ব্যায়াম ও শক্তি খরচ ব্যায়াম ক্যালরি খরচ/মিনিট হাঁটা ৫-৭ দৌড়ানো ১০-১২ সাঁতার কাটা ৮-১০ সাইকেল চালানো ৫-১০ দড়ি লাফানো ৭-১০ স্কোয়াশ ৮-১১ এ্যারোবিক/ক্লাসিক্যাল নাচ ৫-৮ ডিসকো/রক নাচ ৪-৬ টেনিস একক দ্বৈত ৭-১০ ৫-৭ আপনার পরিশ্রমের মাত্রা কী ধরনের? * খুব মৃদু -দিনের বেশীরভাগ সময় বসে কাটান -ব্যায়াম করেন-ই না * মৃদু -অফিসে কাজ করলেও দিনে কিছু সময় হাঁটা, সাইকেল চালানো, সিঁড়ি বেয়ে ওঠা ইত্যাদিতে খরচ হয় অথবা -সপ্তাহে অন্তত ১ দিন ২০-৪৫ মিনিট ব্যায়াম করেন * মাঝারি -দিনের বেশীরভাগ সময় হেঁটে বা দাঁড়িয়ে কাজ করেন অথবা -সপ্তাহে অন্তত ৩ দিন অন্তত ২০-৪৫ মিনিট করে ব্যায়াম করেন * ভারি -কর্মক্ষেত্রে আপনি সারাদিনই হাঁটতে থাকেন এবং কখনো দৌড়ানো বা সাঁতার কাটেন অথবা -প্রতিদিন কমপক্ষে ২০-৪৫ মিনিট ব্যায়াম করেন * ব্যতিক্রমী -এ্যাথলেটিক্সে যে কোনো ইভেন্টের জন্য প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন অথবা -পেশাগত নৃত্যশিল্পী অথবা এ্যাথলেট, যার পরিশ্রমী সিডিউল মানতে হয়। ওষুধ সেবন খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন আর শারীরিক শ্রম ও ব্যায়াম দিয়ে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রক্তের গ্লুকোজ পাওয়া যাচ্ছে না; যারা কোনো স্ট্রেসের মধ্যে আছেন বা জরুরী অবস্থায় ওষুধ ব্যবহার করা হয়। ওষুধ দু’ধরনের আছে- খাবার ওষুধ ও ইনসুলিন। কার জন্য কোনটা প্রযোজ্য সেটা ডাক্তার ঠিক করে দেবেন। তিনি ওষুধের পরিমাণ, সেবনের সময় ও অন্যান্য উপদেশও দেবেন। আবার এ ব্যাপারে একটি কথা দয়া করে মনে রাখবেন, নিজের মতো করে ডায়াবেটিসের কোনো ওষুধ খাবেন না বা ইনসুলিন কমাবেন না বা বাড়াবেন না। এতে যে কোনো সময় বড় ধরনের কোনো বিপদে পড়তে পারেন। সমস্যা হলে আপনার ডাক্তারকে জানান। তিনিই এটির ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। শুধুমাত্র খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে বেশকিছু ডায়াবেটিস রোগী একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। এর সঙ্গে শারীরিক শ্রম ও ব্যায়াম করতে হবে। আর এতে কাজ না হলে মুখে খাবার ওষুধ বা ইনসুলিন নিতে হবে। কারও কারও জন্য সবকটি উপায়ই প্রয়োজন হয়। শৃঙ্খলা শৃঙ্খলা ডায়াবেটিস রোগীর জীবনকাঠি। রোগীকে জীবনের সকল ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা মেনে চলতে হবে। তবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে। যেমন- ১) নিয়মিত ও পরিমাণমতো সুষম খাবার খেতে হবে,২) নিয়মিত ও পরিমাণমতো ব্যায়াম বা দৈহিক পরিশ্রম করতে হবে,৩) চিকিৎসকের পরামর্শ ও ব্যবস্থাপত্র সুষ্ঠভাবে মেনে চলতে হবে,৪) শরীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে,৫) পায়ের বিশেষ যত্ন নিতে হবে,৬) নিয়মিত প্রস্রাব পরীক্ষা করতে হবে এবং ফলাফল প্রস্রাব পরীক্ষার বইতে লিখে রাখতে হবে,৭) চিনি, মিষ্টি, গুড়, মধুযুক্ত খাবার যতটা সম্ভব ছাড়তে হবে,৮) শারীরিক কোনো অসুবিধা দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে,৯) চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো কারণেই ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসা বন্ধ রাখা যাবে না,১০) তাৎক্ষণিক রক্তে শর্করা পরিমাপক যন্ত্র দিয়ে নিজে নিজেই রক্তের শর্করা পরিমাপ করে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে সবচেয়ে ভাল,১১) রক্তে শর্করা পরিমাপক বিশেষ কাঠি দিয়েও তাৎক্ষণিকভাবে রক্তের শর্করা পরিমাপ করা যায়। রক্তে তাৎক্ষণিক শর্করা পরিমাপক যন্ত্র এখন দেশেই পাওয়া যাচ্ছে। শিক্ষা ডায়াবেটিস আজীবনের রোগ। সঠিক ব্যবস্থা নিলে এই রোগকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। ব্যবস্থাগুলো রোগীকে নিজ দায়িত্বেই মেনে চলতে হবে এবং রোগীর পরিবারের নিকট সদস্যদের সহযোগিতা এ ব্যাপারে অনেক সাহায্য করতে পারে। তাই এ রোগের সুচিকিৎসার জন্য ডায়াবেটিস সম্পর্কে রোগীর যেমন শিক্ষা প্রয়োজন, তেমনি রোগীর নিকটাত্মীয়দেরও এই রোগ সম্পর্কে কিছু জ্ঞান থাকা দরকার। কারণ শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। সূত্র: বিকাশপিডিয়া টীম