অসমীয়া   বাংলা   बोड़ो   डोगरी   ગુજરાતી   ಕನ್ನಡ   كأشُر   कोंकणी   संथाली   মনিপুরি   नेपाली   ଓରିୟା   ਪੰਜਾਬੀ   संस्कृत   தமிழ்  తెలుగు   ردو

লোকবিদ্যা ও ভারতের অপ্রথাগত ক্ষেত্র

ভূমিকা

অপ্রথাগত ক্ষেত্র বলতেই চোখে ভেসে ওঠে অদক্ষ বা আধা-দক্ষ শ্রমিকদের আনাগোনা আর কর্মব্যস্ততা। অসংগঠিত ক্ষেত্রের সংস্থা সংক্রান্ত জাতীয় কমিশনের দৃষ্টিভঙ্গিও এ ছবির রকমফের মাত্র। কমিশনের কথায় এই ক্ষেত্রে অদক্ষ কর্মী সংখ্যায় বেজায় গরিষ্ঠ (সেনগুপ্ত ও অন্যান্য ২০০৯)। এ কথা মনগড়া নয়। অভিজ্ঞতালব্ধ দু’টি তথ্য থেকে এর সমর্থন মেলে। এক, অপ্রথাগত কর্মীদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক অর্থাৎ স্কুল-কলেজের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কম। দ্বিতীয়ত, এর ফলশ্রুতি অল্প মজুরি ও কম উত্পাদনশীলতা। এ নিবন্ধে দু’টি দিকই আমি খুঁটিয়ে দেখব।

এই ইস্যুটায় অধিকাংশের সঙ্গে আমার মত মেলে না। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই অপ্রথাগত ক্ষেত্রে আছে এক বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার। সেই জ্ঞান দেয়ানেয়া বা বিনিময় এবং দক্ষতা আর কুশলতা গড়ে তোলার চলও যথেষ্ট। ক্ষুদ্র শিল্প শুমারি, জাতীয় নমুনা সমীক্ষা (এনএসএসও), বারাণসীর তাঁতশিল্পী ও খাবার বিক্রেতা এবং মুম্বইয়ে রাস্তার হকারদের নিয়ে ক্ষেত্র সমীক্ষার তথ্য নিবন্ধে কাজে লাগানো হয়েছে। ঠাঁই পেয়েছ পত্রপত্রিকা এবং বইপত্তরের লেখালেখিও।

সনাতন ও লোকায়ত জ্ঞান

সনাতন ও লোকায়ত জ্ঞান (ট্র্যাডিশনাল অ্যান্ড ইনডিজিনাস নলেজ) নিয়ে ইদানীং বিশ্বব্যাংক এবং বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থা বেশ উত্সুক। সৃজন ও বিনিময়ের ক্ষেত্রে এ জ্ঞান আধুনিক জ্ঞান থেকে ভিন্ন গোত্রের। দেশবিদেশে শত শত বছর ধরে এই লোকায়ত জ্ঞান ভাণ্ডার পুষ্ট করেছে, কিষাণ, কারিগর, জনজাতির মানুষজন ও মেয়েমহল। জীববৈচিত্র, কৃষি-বনায়ন, শিল্পকলা, চিকিত্সা, বাস্তুসংস্থান ইত্যাদি বিষয়ের বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করে এদের এ জ্ঞান নিয়ে কত কিছু লেখাজোখা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে (বেসোল ২০১২)। এরাই খাটাখাটনি করে অপ্রথাগত ক্ষেত্রে।

সনাতন ও লোকায়ত জ্ঞান অবশ্য অপ্রথাগত ক্ষেত্র বিশ্লেষণ করতে তেমন কাজে লাগানো হয়নি। কারণ বোধহয়, শুধুমাত্র কৃষি ও হস্তশিল্প নয়, চিরায়ত শিল্পের তকমায় পড়ে না এবং আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহারকারী খাদ্য, বস্ত্র, প্লাস্টিক, ধাতু, যন্ত্রপাতি, নির্মাণ এবং পরিষেবার মতো বহু শিল্পে খোঁজ মিলবে অপ্রথাগত কর্মীর। অনেক ক্ষেত্রে এ সব কর্মী আবার জনজাতির নয়। সহস্রবুধী ও সহস্রবুধী (২০০১) এই জ্ঞানের নাম দিয়েছেন ‘লোকবিদ্যা’।

স্কুলকলেজের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ না পাওয়া লোকজনের দক্ষতা এর আওতায় পড়ে। লোকবিদ্যার সঙ্গে যোগ আছে মূল্য বা নীতিবোধের। জাতীয় জ্ঞান কমিশনের স্বপ্ন ভারতকে এক জ্ঞানভিত্তিক সমাজে রূপান্তর করা। সে স্বপ্ন হাসিল করতে হলে দেশের কোটি কোটি খেটে খাওয়া মানুষের সৃষ্ট ও ব্যবহৃত এই লোকবিদ্যাকে উপযুক্ত স্বীকৃতি দিয়ে কাজে লাগানো দরকার।

মজুরি, উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতার সম্পর্ক

অপ্রথাগত ক্ষেত্রে দক্ষতা কমসম। এখানে অল্প মজুরি ও কম উত্পাদনশীলতা এর প্রমাণ বলে হামেশা যুক্তি খাড়া করা হয়। সত্যি বলতে, দক্ষতা, উত্পাদনশীলতা আর মজুরির মধ্যে সম্পর্কটা জটিল। এই সম্পর্ক নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত কারণের ওপর। ভারতের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে এক প্রধান কাঠামোগত বাস্তবসত্য হল উদ্বৃত্ত বা বাড়তি শ্রমিক। সংখ্যায় তুমুল গরিষ্ঠ খেটে খাওয়া মানুষকে ঠাঁই দিতে প্রথাগত ক্ষেত্র অক্ষম। কাজ না মেলায় অনেকে নেমে পড়ে ক্ষুদ্র সংস্থা খুলতে। বাদবাকিরা ভিড় জমায় অপ্রথাগত শ্রম বাজারে। পণ্যের বাজারে এই দু’পক্ষের মধ্যে চলে গলাকাটা প্রতিযোগিতা। কী শুধুমাত্র দক্ষতার দরুন। প্রথাগত ও অপ্রথাগত কর্মীদের রোজগারের ফারাক না কী সংস্থার গড় আকৃতি, পণ্যের বাজারে প্রতিযোগিতার মাত্রা ও মূলধন-শ্রমিক অনুপাত ইত্যাদির মতো কাঠামোগত কারণও দায়ী। গবেষণার একটা দিক হবে এটা খতিয়ে দেখা। এ ছাড়া, শ্রমিকের উত্পাদনশীলতা নির্ভর করে বাজার দামের ওপর, পণ্যের বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার দরুন দাম পড়ে যায়। অর্থাৎ বেশি প্রতিযোগিতামূলক বাজারে উত্পাদনশীলতা কম। সে তুলনায় বাজারের একটা মোটা অংশের দখলদার সংস্থার উত্পাদনশীলতা বেশি।

বিভ্রান্তির দ্বিতীয় বিষয়

দ্বিতীয় বিভ্রান্তিকর ব্যাপার, শ্রমিক উদ্বৃত্ত হলে দক্ষ কর্মীদের মজুরিও কমতে পারে। শ্রমিকদের দর কষাকষির ক্ষমতা তেমন না থাকাটাই এর হেতু। এখানে শেষ নয়, উত্পাদনশীলতা বাড়লে তার সুফল ভোগ করবে শ্রমিক এমনটা ভাবা ঠিক নয়। উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির দরুন বাড়তি আয়টা সংস্থার মালিক মুনাফা হিসেবে পকেটে পোরে। আর প্রতিযোগিতামূলক বাজার হলে পোয়াবারো ক্রেতাদের। জিনিস মেলে কম দামে। এর নজির হিসেবে খাড়া করা যায় বারাণসীর তাঁতশিল্পকে। হস্তচালিত তাঁতের তুলনায় বিদ্যুৎচালিত তাঁতে উত্পাদন দশ গুণের বেশি। অথচ দু’ক্ষেত্রেই ঘণ্টা পিছু মজুরি তুল্যমূল্য।

জ্ঞান বলতে কী ধর্তব্য

অপ্রথাগত কর্মী অদক্ষ, এই ধ্যানধারণা কেবল অর্থনৈতিক কারণের ওপর নির্ভর করে না। সমাজতান্ত্রিক কারণ যেমন জ্ঞানের রকমভেদে তার সঙ্গে যুক্ত মর্যাদা বা মূল্য এবং দার্শনিক কারণ যথা জ্ঞান বলেত কী বোঝায়--এই দুইও গুরুত্বপূর্ণ।

নমুনা হিসেবে নারী ও নিচু জাতের কর্মীদের জ্ঞানের কথা উল্লেখ করা যায়। অপ্রথাগত কর্মীদের মধ্যে এদের সংখ্যা ঢের বেশি। আদ্যিকাল থেকে তাদের জ্ঞানের উচিত মূল্য জোটেনি। জাতীয় কমিশনের নজরে এসেছে নারীদের কাজে ‘কম দক্ষতা’-র তকমা দেগে দেওয়া হয় হামেশা। তা সে কাজ যতই অসাধারণ প্রতিভা এবং বেশ কিছু বছরের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ফসল হোক না কেন। বস্ত্র এবং চীনামাটি শিল্পে চিকন বা মাটি তৈরির কাজে যথেষ্ট মুনশিয়ানা দরকার। এতে তুখোড় মেয়ে কর্মীরা। অথচ মজুরি তাদের ছিটেফোঁটা। গোটা দিনের কাজের শেষে বারাণসীর নারী চিকন কর্মীদের প্রাপ্তি সাকুল্যে ২৫-৩০ টাকা মাত্র। ব্যবসায়ীরা ভাবে এটাই ঢের। চিকনের কাজে তো মেয়েরা দড় হয়ে যায় আপনা আপনি। এরা স্থায়ী কর্মী নয়, কাজ করে তো ফুরসত সময়ে। আশ্চর্য, বঞ্চনার অভিযোগ দূরের কথা, খোদ মেয়ে কর্মীরাও একই ভাবনাচিন্তার শরিক।

জ্ঞান যাচাইয়ে অপারগ সমীক্ষা

অপ্রথাগত অর্থনীতির জ্ঞান-ভিত্তি চিহ্নিত করার প্রচেষ্টায় সরকারি সমীক্ষা নেহাতই মামুলি। কারণ লোকবিদ্যাকে জ্ঞান হিসেবে ধরার কোনও ব্যবস্থা এতে নেই। তৃতীয় এবং চতুর্থ নিখিল ভারত ক্ষুদ্র শিল্প শুমারিতে সংস্থাগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তাদের কারিগরি জ্ঞানের উত্স জানাতে। এক নম্বর সারণি থেকে দেখা যায় প্রায় ৯০ শতাংশ অরেজিস্ট্রিকৃত (অর্থাত অপ্রথাগত) সংস্থা পড়ছে ‘কোনও উত্স নেই’ শ্রেণিতে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, যত ছোট হোক না কেন অধিকাংশ সংস্থা কিছু কারিগরি জ্ঞান ছাড়া কাজ চালায় কী করে। বাজারের চাহিদা বা অন্যান্য ক্ষেত্রে পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ছোটখাটো উদ্ভাবনার পথেও পা বাড়াতে হয় বই-কি। অপ্রথাগত ক্ষেত্রে জ্ঞান কী ভাবে কাজ করে তা বুঝতে সমীক্ষা অপারগ। ক্ষুদ্র সংস্থায় কারিগর ও কর্মীদের ‘অভ্যন্তরীণ’ বা নিজস্ব গণ্ডির আওতাধীন জ্ঞান, তাদের অপ্রথাগত আন্তর্জাল (নেটওয়ার্ক) এবং সংগঠিত ক্ষেত্রের জ্ঞান অনুকরণ বা নিজেদের প্রয়োজন মাফিক তা সাজিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাকে হিসেবে আনার কোনও ব্যবস্থা সরকারী সমীক্ষায় নেই।

 

সারণি-১ অরেজিস্ট্রিকৃত ক্ষুদ্র শিল্প সংস্থায় কারিগরি জ্ঞানের উত্স

উত্স

২০০১

২০০৭

বিদেশ

.৬৭

.৮০

দিশি সংস্থার সহযোগিতা

.৫৮

.১১

দেশে গবেষণা ও বিকাশ

.৮৪

.২২

কোনওটা নয়

৮৮.৯১

৯২.৮৩

ক্ষুদ্র শিল্পের তৃতীয় শুমারি, ২০০০-০১ ও অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র এবং মাঝারি উদ্যোগের চতু্র্থ শুমারি থেকে নেওয়া।

কাজ হল জ্ঞান যাচাইয়ের হাতিয়ার

জাতীয় নমুনা সর্বেক্ষণের কর্মসংস্থান বেকারি সমীক্ষায় (২০১১-১২) দেখা গেছে গ্রামাঞ্চলে ৭০ ও শহরের ৪৩ শতাংশ ১৫ বছেরর বেশি বয়সি ছেলে মাধ্যমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরোয়নি। মেয়েদের ক্ষেত্র এটা যথাক্রমে ৮৩ শতাংশ এবং ৫৫ শতাংশ। সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী ৮৯ শতাংশ কর্মী কোনও প্রথাগত ও প্রথা-বহির্ভূত কারিগরি বা বৃত্তিগত প্রশিক্ষণ পায়নি। এই সমীক্ষা ও জাতীয় নমুনা সর্বেক্ষণের অন্যান্য অনুরূপ তথ্য থেকে অসংগঠিত ক্ষেত্রের সংস্থা সংক্রান্ত জাতীয় কমিশেনর সিদ্ধান্ত ‘১৫ বছেরর বেশি বয়সিদের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষের কোনও দক্ষতা নেই।’

এই সিদ্ধান্তে সায় দেওয়া যায় কি। আমি মনে করি প্রচলিত সমীক্ষায় অপ্রথাগত ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন প্রক্রিয়া ও জ্ঞান সৃজনের ধরনধারণ ধরা মুশকিল। প্রচলিত সমীক্ষায় দেখা হয় ক’বছর ইস্কুলে পড়া, প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে হাজিরা, সার্টিফিকেট জোটানো ইত্যাদি। অপ্রথাগত ক্ষেত্রে এ সবের বালাই নেই বললে চলে। জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া বরং জীবিকা উপার্জনের সঙ্গে যুক্ত। স্কুলকলেজের শিক্ষাদীক্ষা অ্যাকাডেমিক জগৎ ও নীতি প্রণেতাদের নেকনজর পেয়ে আসছে বহু দিন যাবৎ।

এ ছাড়া, কিছু কিছু অপ্রথাগত কর্মী আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পথ পাড়ি দিয়ে এলেও ভাবে তাদের জ্ঞান সেই শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের ফল নয়। বরং তা ‘নিছক’ কাজ করতে করতে শেখা গেছে। মিষ্টান্ন শিল্পে কর্মীরা দক্ষতা অর্জন করে কী ভাবে। জবাবে বারাণসীর এক মিষ্টির দোকানদার আমাকে বলেছিলেন, ‘এ নিয়ে চর্চা করার কী আছে।’ শুধু সেই দোকানদার নয়, এটাই সাধারণ মনোভাব। আবার একই সঙ্গে মানুষ সচেতন যে দু’ধরনের শিক্ষার মধ্যে উঁচুনিচু ভেদাভেদ অন্যান্য। বারাণসীতে তাঁতিশল্পীদের হরবখত আক্ষেপ—শ্রমের বাজারে স্কুলকলেজের সার্টিফিকেটের কদর বেশি। বেশ ক’বছর অপ্রথাগত ক্ষেত্রে হাতেকলেম কাজ শেখার তেমন দাম নেই।

কর্মস্থলে সৃজিত জ্ঞান আনুষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে নিরেস নয়, এই মতবাদের চল বাড়ছে। বিজ্ঞানের ইতিহাস, শিক্ষার মনোবিদ্যা থেকে জ্ঞান ব্যবস্থাপনা, বহু মহল এতে সামিল। বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদরা বলেন, যে দর্শন, বিজ্ঞান এবং অঙ্কের উত্পত্তি কারিগর ও শ্রমজীবী মানুষের দ্বারা। এ সব শাস্ত্র বা বিদ্যা অকেজো, এহেন দোষারোপ ধোপে টেকে না। বরং ব্যবহারিক সমস্যাদি মেটানোর উপায় খুঁজতে খুঁজতে এ সব শাস্ত্রের বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। এক জন সাধারণ কারিগর তার রোজকার কাজে তখনকার বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত থাকে।

জ্ঞান ব্যবস্থাপনা নিয়ে বার্নেট (২০০০:১৭) বলেন যে জ্ঞান সৃজনের এক উত্স কাজ। তার দর্শন, কাজে লাগাতে পারলে তবে সে জ্ঞান খাঁটি। কাজ হচ্ছে জ্ঞানকে যাচাই করার এক হাতিয়ার। শুধুমাত্র কাজ কেন, খেলাধূলা থেকেও জ্ঞান অর্জন করা যায়। বাপ-দাদারা তাঁত চালানোর সময় তন্তুজীবী পরিবারের বাচ্চাকাচ্চারা মেতে ওঠে মাকু নিয়ে খেলায়? অনেক সময় তাঁতশালায় নিছক সময় কাটাতে বা গল্পগাছা করতে করতে করতে তারা কাজের শব্দ ও দৃশ্যের সঙ্গে সড়গড় হয়ে ওঠে (উড ২০০৮)। অপ্রথাগত ক্ষেত্রে জ্ঞান সৃজন ও প্রসারের বিষয়টি বুঝতে এই তাত্ত্বিক প্রেক্ষিতটি ব্যবহার করা যেতে পারে।

লোকবিদ্যা

আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থার চাইতে অপ্রথাগত ক্ষেত্রে শিক্ষানবিশি ও কাজ করতে করতে প্রশিক্ষণ (অন দ্য জব ট্রেনিং) ব্যবস্থা অনেক বেশি লোকের উপকারে আসে। কিন্তু শিক্ষানবিশি ও কাজ করতে করতে প্রশিক্ষণ এর অর্থনীতি সংক্রান্ত বইপত্তর অমিল বললেই চলে। কারিগরদের সংস্থাগুলি নিয়ে চালানো ইদানীংকার সমীক্ষায় দক্ষতা হস্তান্তরে শিক্ষানবিশি এবং বংশগত প্রথার গুরুত্ব জানা গেছে (পার্থসারথি ১৯৯৯)।

এ সত্ত্বেও উন্নয়ন অর্থনীতিবিদরা অপ্রথাগত শিল্প নিয়ে চর্চায় দক্ষতা অর্জনের দিকটি খতিয়ে দেখতে গা লাগাননি। দু’একটি ব্যতিক্রম নেই বললে অবশ্য সত্যের বেসাতি করা হবে (বিশ্বাস ও রাজ ১৯৯৬)। অগোছালো বা ছড়ানো ছেটানো বলে এ সব প্রথা নিয়ে চর্চায় হ্যাপা আছে বলাটা ঠিক নয়। আদতে আমাদের অপ্রথাগত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে খোঁজখবরে সব চেয়ে বড় বাগড়া এই যে তা সাধারণ জীবন ও কাজকর্মের সঙ্গে পুরোপুরি সেঁটে আছে। শিক্ষা অর্জন কোথায় এবং কখন হচ্ছে তা সব সময় ঠাহর করে ওঠা মুশকিল। প্রশিক্ষণ বা শিক্ষার পরিমাণ মাপাও যথেষ্ট আয়াসসাধ্য। এ ব্যাপারে প্রামাণ্য নথিপত্র, তথ্য অর্থাৎ ডকুমেন্টেশনের একান্ত অভাব। প্রশিক্ষণ বা শিক্ষা বাবদ কোনও ফি নেই। অথচ প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার্থী যে সময়টা দেয় তার একটা দাম তো আছে। প্রশিক্ষণ দেয়ানেয়ার ব্যাপারটি পরিবার, জাত, লিঙ্গ ও সম্প্রদায়গত সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত। এটা অ-অর্থনৈতিক বলে ধরা হয়। এ সবের জন্য দরকারি বিভিন্ন মানবজাতি বিবরণ সংক্রান্ত বিজ্ঞান বা এমন গ্রাফিক দৃষ্টিভঙ্গি। অর্থনীতিবিদরা তাতে গররাজি। তাই এ সব প্রথা নিয়ে আমাদের যেটুকু জ্ঞানগম্যি তার অধিকাংশটা অর্থনৈতিক নৃতত্ত্ববিদদের কাছ থেকে পাওয়া (বারবারা ২০০৪ এবং বেসোল ২০১২)।

লিংকিং রোড স্কুল বন যাতা হ্যায়

অপ্রথাগত ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন, উদ্ভাবনা, সংস্থাগুলির মধ্যে জ্ঞান ভাগ করে নেওয়া ইত্যাদি বিষয় বুঝতে গেলে স্পষ্ট হয়ে যায় অদক্ষ শ্রমিকদের জন্য এই ক্ষেত্র এক ছাঁচে ঢালা ভাবাটা ভুল। সাক্ষাত্কার নিয়ে দেখা গেছে অপ্রথাগত কর্মীদের প্রশিক্ষণে সময় লাগে স্কুল-কলেজের ডিগ্রি ও সার্টিফিকেটের মতো। অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি। পরিবারের মধ্যে বা পরিবার বহির্ভূত ক্ষেত্রে হামেশা শিক্ষানবিশি চলে কিছু মাস থেকে কয়েক বছর ইস্তক। স্কুল-কলেজের তুলনায় এখানে শিক্ষার ক্ষেত্রে আর্থিক দিকটা তেমন কোনও বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। তবে জাতপাত বা ছেলেমেয়ের ভেদাভেদটা অনেক সময় বড় উত্কট। প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার বেশ উন্নতি এবং তার একটা ভালো কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। ব্যক্তিগত শৃঙ্খলা ও শেখার প্রতি আকাঙ্ক্ষার গুরুত্ব শিক্ষার্থী ও প্রশিক্ষকের বুঝতে পারা দরকার। পাছে অন্যরা শিখে ফেলে তাই নিয়োগকর্তা বা সংস্থার মালিক অনেক সময় দক্ষ কর্মীদের আগলে রাখে। নতুন জিনিস শেখা যায় এমন কাজ খোঁজে শ্রমিকরা। শুধু উত্পাদনমুখী দক্ষতা অর্জনে তারা ক্ষান্ত নয়। চায় যোগাযোগের মতো ক্ষেত্রেও দক্ষতায় দড় হতে। ইংরাজি ভাষায় রপ্ত হওয়ার রকমসকম বুঝতে মুম্বইয়ে রাস্তার হকার, ট্যাক্সি চালক ও ভ্রমণ গাইডদের সাক্ষাত্কার নিয়েছিলেন বিড়লা ও বেসোল (২০১৩)।

সিনিয়রদের কাছ থেকে শেখা তো আছেই। ইংরাজিতে সড়গড় হতে বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড হোর্ডিং গ্রাহকদের সঙ্গে কথাবার্তা, নতুন মোবাইল ফোন এবং অন্যান্য প্রযুক্তি, সব কিছু তারা কাজে লাগায়। মুম্বইয়ে প্রসিদ্ধ লিংকিং রোডের এক দোকানির জবানিতে ‘লিংকিং রোড স্কুল বন যাতা হ্যায়’।

উদ্ভাবনার গুরুত্ব

এখানে বিশদ আলোচনা সম্ভব না হলেও, আমি অপ্রথাগত ক্ষেত্রে সংস্থা স্তরে উদ্ভাবনার দিকটি অনুসন্ধানের গুরুত্ব তুলে ধরতে চাই। রাস্তার ধারে টুকিটাকি খাবারদাবার এবং মিষ্টি বিক্রেতার মতো ছোটখাটো ব্যবসায়ীও তার পসরা নিয়ে বড়াই করে। তার খাবারের নামডাকে গর্বিত। খাবারের তালিকায় নতুন আইটেমের দেখা মেলে প্রায়ই। কারিগরদের শিল্প সংস্থার মতো এখানেও উদ্ভাবনা চলতেই থাকে। মেধাস্বত্ব অধিকারের বালাই নেই বলে ব্যবসায়িক গোপনীয়তা আগলে রাখতে তারা সদাসতর্ক। কারিগরদের শিল্প কিছু ক্ষেত্রে আধুনিক রূপ নেয়। যেমন তাঁতশিল্পে বসে পাওয়ারলুম। কারিগরি পরিবর্তনে চিরাচরিত সংস্থার সামর্থ্য এ থেকে ধরা যায় (হেইনস ২০১২)। ‘ভারতে উদ্ভাবনা’ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে জাতীয় জ্ঞান কমিশন এই ইস্যুতে গুটিকয়েক ক্ষুদ্র সংস্থার ইন্টারভিউ নিয়েছে। তবে এ ব্যাপারে আরও অনেক কাজ করা দরকার।

h3>মর্যাদা চাই লোকবিদ্যার

আগে এত সব যুক্তিতর্কের জাল বোনার মানে এই নয় স্কুল-কলেজের শিক্ষা খামোখা। ঠারেঠোরে ইঙ্গিত দেওয়া হয়নি যে অপ্রথাগত ক্ষেত্রে বর্তমান জ্ঞানের প্রথা পর্যাপ্ত। অপ্রথাগত ক্ষেত্রের সংস্থা সংক্রান্ত জাতীয় কমিশনের তোলা প্রশ্ন সনাতন পদ্ধতি মারফত অপ্রথাগত সংস্থায় কাজ করতে করতে দক্ষতা অর্জনের বর্তমান ব্যবস্থা কি যথেষ্ট (সেনগুপ্ত ও অন্যান্য ২০০৯)। এর সাফ উত্তর ‘না’ দক্ষতা উন্নয়ন, সনাতন বৃত্তিতে আধুনিক কৃতকৌশল প্রয়োগ ও আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে সুপরিকল্পিত নীতি মস্ত ফারাক গড়ে দিতে পারে। তবে কিনা জাতীয় কমিশনও বলেছে সরকারের বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অপ্রথাগত কর্মীকে কাজকর্ম জোটানোয় সাহায্য করতে বিফল মনোরথ। অপ্রথাগত ক্ষেত্রের কর্মী ও কারবারিদের থেকে এ সব শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের দূরত্ব বিলক্ষণ। এ ক্ষেত্রে উপায় কী। বিকল্প হিসেবে বর্তমান অপ্রথাগত প্রথাগুলি গড়েপিটে নিতে হবে। আর এ কাজে অংশ নিতে হবে খোদ অপ্রথাগত ক্ষেত্রকে। এ বিষয়ে নমুনা হিসেবে নাইজিরিয়ার জাতীয় মুক্ত শিক্ষানবিশি প্রকল্প (ন্যাশনাল ওপেন অ্যাপ্রেনটিসশিপ স্কিম) এবং অন্যান্য প্রকল্প নিয়ে জাতীয় কমিশন আলোচনা করেছে। এগুলি আমাদের দেশেও কাজে লাগতে পারে। এ জন্য জ্ঞান সৃজন, হস্তান্তর, উদ্ভাবনা ইত্যাদি খতিয়ে দেখতে আরও গবেষণা দরকার। তবে নীতি শেষ কথা নয়। স্কুল-কলেজের শিক্ষার সঙ্গে এক আসনে ঠাঁই দিতে হবে লোকবিদ্যাকে। লোকবিদ্যার জন্য সম মর্যাদার দাবিতে চাই রাজনৈতিক সক্রিয়তা।

email:abasole@gmail.com

সূত্র : যোজনা, অক্টোবর, ২০১৪।

সর্বশেষ সংশোধন করা : 11/14/2019



© C–DAC.All content appearing on the vikaspedia portal is through collaborative effort of vikaspedia and its partners.We encourage you to use and share the content in a respectful and fair manner. Please leave all source links intact and adhere to applicable copyright and intellectual property guidelines and laws.
English to Hindi Transliterate