<h2 style="text-align: justify; ">ভাগীরথীর জল এতটাই কমেছে যে পানীয় জল সরবরাহ করাই কঠিন৷</h2> <p style="text-align: justify; "> </p> <p style="text-align: justify; "><strong><i>এই সময়, ২২/০৩/১৬ঃ কল্যাণ রুদ্র, <span style="text-align: justify; ">পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের সভাপতি৷(<span style="text-align: justify; ">মতামত ব্যক্তিগত)</span></span></i></strong></p> <p style="text-align: justify; ">মালদহ থেকে নদিয়া গঙ্গা -ভাগীরথীর জল এই সময় স্বাভাবিকের থেকে অনেকটা নীচ দিয়ে বইছে৷ মালদহের গঙ্গা পঞ্চানন্দপুরে গত এক সন্তাহে প্রায় ৫০ সেমি নীচে নেমে গেছে আর ভাগীরথীর জল এতটাই কমেছে যে পানীয় জল সরবরাহ করাই কঠিন৷</p> <p style="text-align: justify; ">কিন্তু নদী হঠাত্ একদিনে শুকিয়ে যায়নি৷ কয়েক সন্তাহ ধরে ফরাক্কা ব্যারেজের উজানে গঙ্গার জল কমছিল৷ ফেব্রুয়ারি মাসের তৃতীয় সন্তাহে নদীর জল এতটাই কমে যায় যে জলাভাবে এনটিপিপিসি -র একটি ইউনিট বন্ধ করে দেওয়া হয়৷ মার্চ মাসে জল আরও কমে যায় ; চুক্তি অনুসারে মার্চ মাসের ১১-২০ তারিখের মধ্যে বাংলাদেশকে ৩৫০০০ কিউসেক জল দেওয়ার ফলে ভাগীরথীর বরাদ্দে টান পড়ে৷ জঙ্গিপুর থেকে নবদ্বীপ পর্যন্ত নদীর দৈর্ঘ প্রায় ২২০ কিমি৷ মার্চ মাসের দ্বিতীয় সন্তাহের এক সকালে নদী পাড়ের মানুষ অবাক হয়ে দেখলেন এখানে ওখানে চর জেগে উঠেছে, ভাগীরথীতে জল অনেক কমে গেছে৷ জানা গেল ফরাক্কা ফিডার ক্যানেল দিয়ে আসছে না , জলাভাবে এনটিপিসি -র তাপবিদ্যুত্ উত্পাদন বন্ধ৷ অন্য যে সব উপনদী যেমন পাগলা , বাঁশলই , ময়ূরাক্ষী , অজয় ভাগীরথীকে জলের জোগান দেয় তারাও শুকিয়ে গেছে ; ফলে সঙ্কট গভীর৷</p> <p style="text-align: justify; "><img alt="ভাগীরথী ও উপনদীগুলির জল শুকিয়ে যাচ্ছে গত চার দশকে এত বড়ো সঙ্কটে পড়েনি গঙ্গা ।" title="ভাগীরথী ও উপনদীগুলির জল শুকিয়ে যাচ্ছে গত চার দশকে এত বড়ো সঙ্কটে পড়েনি গঙ্গা ।" id="__mce_tmp" src="https://static.vikaspedia.in/media_vikaspedia/bn/images/9ad9be9979c09b09a59c0-993-9899aa9a89a69c09979c19b29bf9b0-99c9b2-9b69c19959bf9c7-9af9be99a9cd99b9c7-9979a4-99a9be9b0-9a69b69959c7-98f9a4-9ac-9b89999cd99599f9c7-9aa9c79a89bf-9979999cd9979be-964" /></p> <p style="text-align: justify; ">এমন ঘটনা গত চার দশকে কখনও ঘটেনি৷ ১৯৭৫ সালে ফরাক্কা ব্যারেজ প্রকল্প চালু হওয়ার আগে এই সময় নদীতে জল থাকত না ; জঙ্গিপুর বা বহরমপুরে নদী হেঁটেই পার হওয়া যেত৷ ফিডার ক্যানেল দিয়ে জল আসার পর পরিস্থিতি বদলে যায়৷ বহমান ভাগীরথীকে দেখতে দেখতে মানুষ অতীতের সেই শীর্ণকায়া নদীর কথা ভুলেই গেছে৷ বলা দরকার ভাগীরথীর এই অংশটি আপেক্ষিক ভাবে দূষণমুক্ত বলেই এখানে আশ্রয় নিয়েছে কয়েকটি বিরল প্রজাতির গাঙ্গেয় ডলফিন৷ এ ছাড়া সবুজদ্বীপের কাছেই আছে ইলিশমাছের আঁতুড়ঘর এবং স্থায়ী আবাস৷ জল যে ভাবে কমছে তাতে নদীর বাস্ত্ততান্ত্রিক পরিষেবাও হারিয়ে যাচ্ছে৷ মাস তিনেক পর নদীতে জল বাড়লেও জীববৈচিত্রের ক্ষতিপূরণ হতে অনেক সময় লাগবে৷ এখন আমরা হুগলি নদীতে যে প্রবাহ দেখছি তা মূলত সাগর থেকে আসা জোয়ারের জল৷ উজানের সুপেয় জল কমলে মোহানায় লবণতা বাড়বে৷ সাগর থেকে ডায়মন্ডহারবারের মাঝে যে ২.৬৯ কোটি টন পলি ভাসমান থাকে তা জমে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটবে৷ ইতিমধ্যেই স্যান্ডহেড থেকে ফরাক্কা পর্যন্ত নদীপথে কয়লা পরিবহণ বন্ধ হয়ে গেছে৷</p> <p style="text-align: justify; ">প্রশ্ন হল কেন এই জলাভাব? একটি মত হল অববাহিকার উজানে বৃষ্টি কম হয়েছে বলেই এই সঙ্কট ; কিন্তু মূল কারণ লুকিয়ে আছে অন্যত্র৷ প্রথমেই আলোচনা করা যাক ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ভারত-বাংলাদেশ জলচুক্তি প্রসঙ্গে৷ ওই চুক্তি হয়েছিল ১৯৪৯-১৯৮৮ সালের মধ্যে ফরাক্কা দিয়ে প্রবাহিত জলস্রোতের গড়ের ভিত্তিতে৷ চুক্তির সময় প্রকাশিত সারণিতে দেখা যাচ্ছে মার্চ মাসের শেষ সন্তাহে ফরাক্কাতে ৬৪৬৮৮ কিউসেক জল প্রবাহিত হওয়ার কথা এবং এর ৩৫০০০ কিউসেক ভারত আর বাকি জল বাংলাদেশ পাবে৷ কিন্তু সমস্যা হল গত কয়েক বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে যে পরিমাণ জল গঙ্গায় পাওয়া যাবে ভাবা হয়েছিল অতটা জল নদীতে নেই৷ এমনই হওয়ার কথা ; ১৯৫০ বা ১৯৬০ -এর দশকে গঙ্গা দিয়ে যত জলবয়ে যেত এখন তা অনেক কমে গেছে৷ ওই চার দশকের(১৯৪৯ -১৯৮৮ ) জলস্রোতের গড় যে হিসেব দেয় বর্তমান প্রবাহের সাথে তার কোনও মিল নেই৷ ১৯৯৬ সালে ভারত -বাংলাদেশ চুক্তির সময় কেন শেষের আট বছরের জলের হিসেব বাদ দেওয়া হয়েছিল সেই প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা৷ পরবর্তী কালে সেচ ও জলবিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে গঙ্গা অববাহিকার উজানে অনেক জলাধার নির্মিত হয়েছে; বহমান জলস্রোত নিয়ে কোনও আন্তঃরাজ্য বিধিনিষেধ নেই বলে উত্তরাখণ্ড ও উত্তরপ্রদেশে গঙ্গার প্রচুর জল টেনে নেওয়া হয় ফলে নীচের দিকে জল কমে যায়৷ জলচুক্তির সময় এই সমস্যার কথা মনে রেখেই একটি শর্ত রাখা ছিল তা হল যদি কখনও গঙ্গার প্রবাহ ৫০০০০কিউসেকের নীচে নেমে যায় তা হলে উভয় দেশ সমানভাবে জল ভাগ করে নেবে৷ প্রয়োজনে দুই দেশ আবার আলোচনায় বসবে৷</p> <p style="text-align: justify; ">সারণিতে দেখা যাচ্ছে মে মাসের আগে গঙ্গার জল বাড়ার কোনও সম্ভাবনা নেই ; এপ্রিলের শেষের দিকে হিমালয়ের তুষার গলতে আরম্ভ করে এবং সেই জল গঙ্গায় আসে মে মাসে৷ শুখা মাসে গঙ্গায় প্রবাহিত জলের ৭০শতাংশই তুষার -গলা জল৷ আগে ভূগর্ভের জলস্তর থেকেএক অদৃশ্য প্রবাহ (বেসফ্লো) গঙ্গা ও তার উপনদীদের বাঁচিয়ে রাখত এখন সেই ধারাও নেই৷ প্লাবনভূমির কৃষিক্ষেত্রে অগভীর ও গভীর নলকূপের সাহায্যে এত জলটেনে তোলা হয় যে নদীর দিকে প্রবাহের জন্য আর কোনও জল অবশিষ্ট থাকে না৷</p> <p style="text-align: justify; ">এই সঙ্কটের ব্যান্তি সুদূরপ্রসারী ; কৃষি -শিল্প , নৌপরিবহণ ছাড়াও ব্যাহত হবে নদী থেকে গৃহস্থালিতে জল সরবরাহ৷ইতিমধ্যেই জনস্বার্থ ও কারিগরি দন্তরের জল সরবরাহ ব্যবস্থার ইনটেক পয়েন্ট-গুলিতে পলি জমতে শুরু করেছে৷এই সমস্যার কোনও চটজলদি সমাধান নেই৷ তবে এখনই ব্যবস্থা না নিলে সামনের বছরগুলিতেও এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে৷</p> <div class="visualClear" style="text-align: justify; "><span class="visualHighlight">তিনটি কাজ জরুরি ভিত্তিতে করতে হবে : </span></div> <p style="text-align: justify; ">(১) যে ১১টি রাজ্যে গঙ্গা অববাহিকা বিস্তৃত সেখানে গঙ্গা বা তার উপনদীর উপর জলাধার নির্মাণ ও সেচের প্রয়োজনে নদীথেকে জল টেনে নেওয়া এমন ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবেযাতে নদীর কোনও অংশ সম্পূর্ণ শুকিয়ে না যায়৷ ২০১৫সালে সাতটি আইআইটি -র অধ্যাপক ও অন্যান্য কয়েকজন বিজ্ঞানীকে নিয়ে গড়া কমিটি গঙ্গার প্রবাহকে অবিরল ওনির্মল রাখার পরামর্শ দিয়েছে৷</p> <p style="text-align: justify; ">(২) নদী পাড় থেকে ৫০০মিটার দূরত্ব পর্যন্ত গভীর ও অগভীর নলকূপের সাহায্যেসেচের জল তোলা নিষিদ্ধ করা দরকার যাতে ভূগর্ভের জলস্তর থেকে নদীর দিকে বেসফ্লো অক্ষুণ্ণ থাকে৷</p> <p style="text-align: justify; ">(৩) ১৯৯৬ সালে তিন দশকের জন্য ভারত -বাংলাদেশ গঙ্গা জলচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ; ইতিমধ্যে দুই দশকের বেশি সময় অতিক্রান্ত৷ বদলে গেছে গঙ্গা অববাহিকার ভূগোল , কমেছে বহমান জলের পরিমাণ৷ এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ওই চুক্তি অনুসারে জল পাওয়া কোনও দেশের পক্ষেই সম্ভবনয়৷ নতুন তথ্যের ভিত্তিতে চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার৷ এ সব কাজ করতে হবে পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থে, তবে রাজ্য সরকারের পক্ষে একা এ কাজ করা সম্ভব নয়৷ আশাকরব অন্তত এই একটা ব্যাপারে সব দলের সাংসদরা একমত হবেন৷ একসাথে রাজ্যের স্বার্থের কথা সংসদে বলবেন৷</p>