একজন গরিব মানুষ ছাগল পালন করে কী কী সুবিধা পেতে পারেন ? অনেকেই মনে করেন ছাগল পোষা হয় কেবল মাংস পাওয়ার জন্য। কিন্তু মাংস ছাড়াও আরো অনেক কিছুর জন্য ছাগল পোষা হয়। যেমন -দুধ, নাদি, চামড়া, ক্ষুর। এর কোনো কিছুই বাদ যায় না। ছাগলের দুধ খুবই উপকারী এবং সহজপাচ্য, তাই গরুর দুধের তুলনায় শিশু, বয়স্ক ও রোগীদের জন্য ছাগলের দুধ বেশি উপযোগী। এছাড়াও, যদি কেউ ছাগল পোষেন, তবে এ থেকে তার পরিবারের নগদ আয় বাড়ানোও সম্ভব। কারণ, কম পয়সায়, অল্প জায়গায়, মাঠে চরিয়ে ছাগল পালন করা যায়। ছাগল বছরে ২বার ও প্রতি বারে গড়ে ২-৩ টা বাচ্চা দেয়। অর্থাৎ বছরে একটা ধাড়ি ছাগল থেকে ৪-৫ টা বাচ্চা পাওয়া যেতে পারে, যার দাম প্রায় ১৫০০ টাকার মতো। তবে ঐ বাচ্চাদের বড় করলে লাভ অনেক বেশি। ছাগল ১০ থেকে ১২ বছর পর্যন্ত বাচে। ৫/৬টা মাদি ছাগলের জন্য ১টা সুস্থ ও সবল পাঠা দরকার। ছাগলগুলির বয়স ৬-৮ মাস হলে সেগুলি বাজার-হাটে বিক্রি করার উপযুক্ত হয়। সাধারণত ১৯-২০ দিন পর পর মাদি ছাগল গরম হয় অর্থাৎ গর্ভসঞ্চারের জন্য উপযুক্ত সময়ে আসে। আর ছাগল বিক্রি করাও খুবই সহজ, খন্দেরের অভাব হয় না। এজন্য ছাগলকে গরিবের গরু বলা হয়। মাদি ছাগলকে ১২-১৫ মাস বয়সে পাল খাওয়ানো যেতে পারে। ছাগল সিকি লিটার থেকে ১ লিটার পর্যন্ত দুধ দেয়। ছাগলকে না চরালে বাড় বেশি হয় না। রাজ্যে কোন জাতের ছাগল পালন করা লাভজনক ? পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়ায় বাংলার ছাগল (ব্ল্যাক বেঙ্গল)-ই পালন করা ভালো। তবে দুধের জন্য যমুনাপ্যারি ও মাংসের জন্য শিরোহি, বিটাল জাতের ছাগল পোষা যেতে পারে। শিরোহি জাতের ছাগল কেনার জন্য নদীয়া জেলায় অবস্থিত পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ছাগল ও খরগোশ পালন কেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে। ছাগল রাখার জন্য ঘর কেমন হওয়া দরকার? গ্রামে এদের জন্য আলাদা ঘর থাকে না। বারান্দায়, খাটের নীচে অনেক সময় এদের রাখা হয়। তবে এরা একটু উচু জায়গায় বা তক্তাপোশের উপর থাকতে ভালোবাসে। খেয়াল রাখতে হবে গরম, শীত, বৃষ্টি থেকে এবং বিভিন্ন বুনো জন্তুর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ঘরটি নিরাপদ হওয়া দরকার। বেশি সংখ্যায় ছাগল রাখার জন্য আলাদা করে ঘর তৈরি করতে হলে, যেখানে জল জমে না, এমন জায়গায় করা ভালো। ঘরটির চারদিক খোলা রাখতে হবে, যাতে আলো ও বাতাস চলাচল করতে পারে। ঘরটির ছাউনি খড়ের, টালির বা টিনের হতে পারে। ঘরের মেঝে কাঠের হলে দুটি পাটাতনের মধ্যে একটু ফাক রাখতে হবে, যাতে মলমূত্র নীচে পড়ে যায়। সিমেন্টের মেঝে হলে এক দিকে ঢালু রাখতে হবে। শীতের সময় ঠাণ্ডা যাতে না লাগে এবং বর্ষার সময় ঘরের মেঝে যাতে না ভেজে সেদিকে নজর রাখতে হবে। এরা বৃষ্টি একদম সহ্য করতে পারে না।ঘরে খাবার জলের ব্যবস্থা রাখতে হবে। জলের পাত্র, মাটির মালসা হলে ভালো হয়। প্রতিটি ছাগলের জন্য দিনে সিকি লিটার থেকে ১ লিটার জল লাগে। ভালো পাঠি কী দেখে চেনা যাবে? ভালো পাঠি চেনার উপায়গুলি হল - পাঠিটির মাথা হবে লম্বা ও সরু, গলা হবে লম্বা, চামড়া আলগা মত, বুক হবে ভারি, নিতম্ব - লম্বা ও ঢালু, পালান হবে বড়ো (যা দুধ দোয়ানোর পর চুপসে থাকবে), আর, বাট হবে হাতের মুঠির মাপের। ছাগল বাচ্চার পরিচর্যা কেমন ভাবে করতে হবে? বাচ্চা জন্মাবার পর পরই তাদের ছাগলের পরিচর্যার ক্ষেত্রে কয়েকটি দরকারি কথা গায়ের, মুখের নালসা ভালো করে মুছে জন্মের এক ঘন্টার মধ্যে বাচ্চাকে অবশ্যই মায়ের দুধ খাওয়াতে পারষ্কার করতে হবে আর নাভতে লাল হবে ওষুধ (মারকিউরোক্রোম) লাগাতে হবে। একটি বাচ্চা জন্মাবার প্রায় ১ থেকে ২০ মিনিট বাদে পরের বাচ্চার নাড়ি কাটার দরকার হলে খুব পরিষ্কার জন্ম হয় ধারালো ছুরকে স্পিারটের দ্বারা শোধন ।প্রসবের পর মা-ছাগলকে ৩-৪ দিন কোনো শক্ত খাবার না দেওয়াই করে নিয়ে তার পর কাটতে হবে। প্রথম ভাল থেকেই বাচ্চাদের মায়ের বাটে মুখ | পালন ও বাট শক্ত মনে হলে গরম জলে নুন মিশিয়ে সেক দিতে লাগিয়ে খাওয়ানো অভ্যাস করাতে হবে। হবে তবে মায়ের দুধ কম হলে, বাটিতে বা | মাদি ছাগল ৮-১০ মাসের মধ্যে গর্ভধারণের জন্য প্রস্তুত হয় গামলায় দুধ নিয়ে খাওয়ানো যেতে | মাদি ছাগল গাভিন থাকে ৫ মাস পারে। একটু বড় হলে, মায়ের দুধ ছাড়াও রোজ কিছু সবুজ কচি ঘাস খাওয়াতে হবে, যেমন - দূর্বা, মুথা, শ্যামা, প্যারা ইত্যাদি। সঙ্গে সুবাবুল, আম, জাম, পেয়ারা ইত্যাদি গাছের কচি পাতাও খাওয়ানো যেতে পারে। এক থেকে দেড় মাস বয়স হলেই নর ছাগল বাচ্চাকে খাসি করতে হবে। গাভিন মাদি ছাগলের যত্ন কীভাবে নিতে হবে ? গাভিন ছাগলকে প্রতিদিন ৪০০-৫০০ গ্রাম দানা খাবার আর সঙ্গে ২-৩ কে.জি. সবুজ ঘাস দিতে হবে। বাচ্চা দেওয়ার আগে এদের আলাদা রাখতে পারলে ভালো হয়। পাল দেওয়া পাঠার লালন-পালন কীভাবে করতে হবে ? পাঠা যাতে সুস্থ ও সবল থাকে তার জন্য তাকে ভালো খাবার দিতে হবে, যেমন - দানা, পাতা ও সবুজ ঘাস। প্রতিদিন দানা লাগবে ২৫০ গ্রাম, সবুজ ঘাস পাতা লাগবে ৩-৪ কে.জি.। এদের চরার জন্য অন্তত ৩৪ হাত জায়গা লাগে। ছাগলকে কী খাবার খাওয়ানো যেতে পারে ? ছাগলকে দূর্বা, মুথা, প্যারা ইত্যাদি ঘাস খাওয়াতে হয়। এরা ঘাস ছাড়াও তুত, কাঠাল, সুবাবুল, বাশ, বাবলা পাতা খেয়ে থাকে। আলাদা করে ভুট্টা আর অন্যান্য দানাও খাওয়ানো যেতে পারে। ছাগল চরে চরে ঘাস বা গাছের পাতা খেতে ভালোবাসে। এদের না চরালে মাংসের বাড় বেশি হয় না। ছাগলের সাধারণত কী কী রোগ হয় ? ছাগলের সাধারণত যে রোগগুলি হয় সেগুলি হল - ক) পেট ফুলে খ) ম্যাসটাইসিস, ক্ত কিছু খেয়ে ফেলা বা পয়জনিং গ) ফুটরট বা খুরাই, ঘ) কৃমি, ঙ) এটুলি/উকুন, চ) ককসিডিওসিস, বিষ যাওয়া বা ব্রোট, । ছাগলের রোগ আটকাবার উপায় কী ? রোগ দেখা দিলে কী করতে হবে ? ছাগলের যাতে রোগ না হয় তার জন্য যত্ন নিতে হবে ও টিকার ব্যবস্থা করতে হবে। এদের থাকার জায়গাটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, শুকনো রাখলে, প সময় মতো ক্রিমির ওষুধ খাওয়ালে (বর্ষার আগে এক বার আর বর্ষার শু চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নিয়ম মতো টিকা দিলে, আর পরে এক বার), রোগ-জ্বালার প্রকোপ অনেকটাই এড়ানো যায়। ছাগলের রোগ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে পশু চিকিৎসক বা প্রাণীবন্ধুর পরামর্শ নিতে হবে। ছাগল পালন করতে গিয়ে যাতে আর্থিক ক্ষতি না হয়, তার জন্য কী ব্যবস্থা আছে ? রোগে বা অন্য কোনো কারণে ছাগল মারা গেলে, চুরি হয়ে গেলে, হরিয়ে গেলে ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। এই ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় হল ছাগলের বিমা করে রাখা। বিমা করা থাকলে ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়। বিমার টাকার পরিমাণ নির্ভর করে ছাগলের বাজার দরের উপর।বিমার টাকা (প্রিমিয়াম) জমা দিতে হবে। কোন কোন সংস্থায় বিমা করা যেতে পারে ? কয়েকটি বিমা সংস্থার নাম আগের প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে। বিমা করা বা ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য জেলা বা মহকুমা শহরে বিমা কোম্পানিগুলির কার্য্যালয়ে যোগাযোগ করতে হবে। সু্ত্র : পঞ্চায়েত এন্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট ডিপার্টমেন্টম গভর্নমেন্ট অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল