শসা একটি খুব উপকারী এবং অর্থকরী ফসল। সারা বছরই পাওয়া যায় এবং এই শসা। শসার চাষ বাড়ির ছাদেই সম্ভব। খুব বেশি পরিশ্রমও করতে হয় না। কীভাবে সহজে শসা চাষ করা যায় তা জানবো। সারা বিশ্বে চাষ হওয়ার দিক থেকে ৪ নম্বরে রয়েছে যে সবজিটি, সেটি হলো শসা। এতেই স্পষ্ট যে শসার কদর বিশ্বব্যাপী। শসার রয়েছে হরেক গুণ। রূপচর্চা ও মেদ নিয়ন্ত্রণসহ নানা উপযোগিতা আছে এই সহজলভ্য সবজির। শসার বিজ্ঞানসম্মত নাম- Cucumis sativus. এটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ১০-১২ ইঞ্চি লম্বা হয়ে থাকে। বাইরে সবুজ এবং ভিতরে হালকা সবুজ রঙের হয়। এর ভিতরে প্রচুর বীজ থাকে। স্যালাডে এটি খুবই ব্যবহৃত হয়। সবজি হিসেবে অনেকে রান্নাও করেন। এছাড়া ত্বকের পরিচর্যায় এর রস ব্যবহার করা হয়। এটি গরম কালে বেশি পাওয়া গেলেও, বছরের অন্যান্য সময়েও এই ফল পাওয়া যায়। শসার পুষ্টিগুণ শসায় রয়েছে ভিটামিন বি, ভিটামিন সি, ভিটামিন কে, সোডিয়াম, জিঙ্ক, পটাশিয়াম, ফসফরাস, ম্যাঙ্গানিজ, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, আইরন বা লোহা, আঁশ, ফাইবার, প্রোটিন, শর্করা, চিনি, জল, স্নেহ পদার্থ প্রভৃতি। আর এইসব উপাদান শসাতে বিদ্যমান থাকায় শরীরকে বহু সমস্যার হাত থেকে এটি রক্ষা করে। উচ্চ রক্তচাপ কমাতে, হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে, হাড় মজবুত করতে, হজমশক্তি বাড়াতে, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে, কোলেস্টেরল এবং শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে শসা। মরশুমি শসা চাষ প্রধানত ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসে শসা চাষের সময় হলেও, সারা বছরই এর উৎপাদন সম্ভব। মূলত দোআঁশ মাটি শসা চাষের জন্য খুবই উপযোগী। নার্সারি থেকে উন্নত মানের বীজ সংগ্রহ করে তা একদিন জলে ভিজিয়ে রাখতে হবে। তারপর তা টবের মাটিতে রোপনের উপযুক্ত হবে। মাঝারি সাইজের একটি টবে বীজ বপন করলে তার সংখ্যা ৫-৬টি এবং চারা হলে ২-৩টি রোপন করা যেতে পারে। দোআঁশ মাটির সঙ্গে ইউরিয়া, কম্পোস্ট, জৈব সার মিশিয়ে নিতে হবে। মাটি ঝুরঝুরে হলে এতে চারা রোপন করতে হবে। এরপর প্রতিদিন পরিমিত জল দিতে থাকতে হবে। কারণ শসা গাছের জন্য জল, আলো-বাতাসের বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। টবের মাটি যেন চেপে না যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। মাঝে মাঝে মাটি খুঁড়ে দিতে হবে৷ সেই সঙ্গে শসা গাছ যাতে ঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারে তাই কিছুদিন পর মাচা তৈরি করে দিলে ভালো। গাছের গোঁড়ায় আগাছা হতে দেওয়া যাবে না। শসা গাছে জাব পোকা আক্রমণ করতে পারে। নিমবীজের দ্রবণ বা সাবানগোলা জল স্প্রে করা যেতে পারে। তিন থেকে চার মাস পরে শসা সংগ্রহের জন্য উপযুক্ত হয়ে ওঠে। শসার উপকারিতা এবং গুনাগুন ১) দেহের জল শূন্যতা দূর করে - ধরুন আপনি এমন কোথাও আছেন, যেখানে হাতের কাছে জল নেই, কিন্তু শসা আছে। বড়সড় একটা শসা চিবিয়ে খেয়ে নিন। পিপাসা মিটে যাবে। আপনি হয়ে উঠবেন চনমনে। কারণ, শসার ৯০ শতাংশই জল। ২) দেহের ভেতর-বাইরের তাপ শোষক - কখনো কখনো আপনি শরীরের ভেতর-বাইরে প্রচণ্ড উত্তাপ অনুভব করেন। দেহে জ্বালাপোড়া শুরু হয়। এ অবস্থায় একটি শসা খেয়ে নিন। এ ছাড়া সূর্যের তাপে ত্বকে জ্বালা অনুভব করলে শসা কেটে ত্বকে ঘষে নিন। নিশ্চিত ফল পাবেন। ৩) বিষাক্ততা দূর করে - শসার মধ্যে যে জল থাকে তা আমাদের দেহের বর্জ্য ও বিষাক্ত পদার্থ অপসারণে অনেকটা অদৃশ্য ঝাটার মতো কাজ করে। নিয়মিত শসা খাওয়ায় কিডনিতে সৃষ্ট পাথরও গলে যায়। ৪) প্রাত্যহিক ভিটামিনের শূন্যতা পূরণ করে - প্রতিদিন আমাদের দেহে যেসব ভিটামিনের দরকার হয়, তার বেশির ভাগই শসার মধ্যে বিদ্যমান। ভিটামিন এ, বি ও সি আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ও শক্তি বাড়ায়। সবুজ শাক ও গাজরের সঙ্গে শসা পিষে রস করে খেলে এই তিন ধরনের ভিটামিনের ঘাটতি পূরণ হবে। ৫) ত্বকবান্ধব খনিজের সরবরাহকারী - শসায় উচ্চমাত্রায় পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও সিলিকন আছে, যা ত্বকের পরিচর্যায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। এ জন্য ত্বকের পরিচর্যায় স্নানের সময় শসা ব্যবহার করা হয়। ৬) হজম ও ওজনহ্রাসে সহায়ক - শসায় উচ্চমাত্রায় জল ও নিম্নমাত্রার ক্যালরিযুক্ত উপাদান রয়েছে। ফলে যাঁরা দেহের ওজন কমাতে চান, তাঁদের জন্য শসা আদর্শ টনিক হিসেবে কাজ করবে। যাঁরা ওজন কমাতে চান, তাঁরা স্যুপ ও সালাডে বেশি বেশি শসা ব্যবহার করবেন। কাঁচা শসা চিবিয়ে খেলে তা হজমে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে। নিয়মিত শসা খেলে দীর্ঘমেয়াদি কোষ্ঠ-কাঠিন্য দূর হয়। ৭) চোখের জ্যোতি বাড়ায় - সৌন্দর্যচর্চার অংশ হিসেবে অনেকে শসা গোল করে কেটে চোখের পাতায় বসিয়ে রাখেন। এতে চোখের পাতায় জমে থাকা ময়লা যেমন অপসারিত হয়, তেমনি চোখের জ্যোতি বাড়াতেও কাজ করে। চোখের প্রদাহ প্রতিরোধক উপাদান প্রচুর পরিমাণে থাকায় ছানি পড়া ঠেকাতেও এটি কাজ করে। ৮) ক্যানসার প্রতিরোধে কাজ করে - শসায় সিকোইসোলারিসিরেসিনোল, ল্যারিসিরেসিনোল ও পিনোরেসিনোল এই তিনটি আয়ুর্বেদিক উপাদান আছে। জরায়ু, স্তন ও মূত্রগ্রন্থিসহ বিভিন্ন স্থানে ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি কমানোর সঙ্গে এই তিন উপাদানের জোরালো সম্পর্ক রয়েছে। ৯) ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে - ডায়াবেটিস থেকে মুক্তি দেয়, কোলস্টেরল কমায় ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। ১০) মুখ পরিষ্কার রাখে - দুর্গন্ধযুক্ত সংক্রমণে আক্রান্ত মাড়ির চিকিৎসায় শসা দারুণ কাজ করে। গোল করে কাটা এক স্লাইস শসা জিহ্বার ওপরে রেখে সেটি টাকরার সঙ্গে চাপ দিয়ে আধা মিনিট রাখুন। শসার সাইটোকেমিক্যাল এর মধ্যে বিশেষ বিক্রিয়া ঘটিয়ে আপনার মুখের জীবাণু ধ্বংস করবে। সজীব হয়ে উঠবে আপনার নিঃশ্বাস। ১১) চুল ও নখ সতেজ করে - শসার মধ্যে যে খনিজ সিলিকা থাকে তা আমাদের চুল ও নখকে সতেজ ও শক্তিশালী করে তোলে। এ ছাড়া শসার সালফার ও সিলিকা চুলের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। ১২) গেঁটেবাত থেকে মুক্তি - শসায় প্রচুর পরিমাণে সিলিকা আছে। গাজরের রসের সঙ্গে শসার রস মিশিয়ে খেলে দেহের ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা নেমে আসে। এতে গেঁটেবাতের ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। ১৩) মাথাধরা থেকে নিষ্কৃতি - ভোরে ঘুম থেকে ওঠার পর অনেকের মাথা ধরে। শরীর ম্যাজম্যাজ করে। শসায় প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি ও সুগার আছে। তাই ঘুমাতে যাওয়ার আগে কয়েক স্লাইস শসা খেয়ে নিলে ভোরে ঘুম থেকে ওঠার পর এই সমস্যা থাকবে না। ১৪) কিডনি সুস্থ রাখে - শরীরের ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা ঠিক রাখে শসা। এতে কিডনি থাকে সুস্থ ও সতেজ। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)।তথ্যসূত্রঃ আয়ুশ মন্ত্রণালয় এবং সমসাময়িক পত্র পত্রিকা।