পদ্মাপুরানে আমরা নারকেলের গল্প পাই। রামায়ণেও দেখা যায় নারকেলের গল্প। পৃথিবীর আদি ফলের মধ্যে একটি এই নারকেল। নারকেলকে ‘শ্রীফল’ বলা হয় কোন কোন দেশে। পদ্মাপুরানে লেখা আছে চাঁদ সওদাগর বানিজ্যে গিয়ে পৌঁছুলেন শ্রীলঙ্কায়। সেখানে তিনি সঙ্গে করে নিয়ে যান নারকেল। এই নারকেল দেখে মানুষ ভাবেন চাঁদ সওদাগর নিয়ে এসেছেন বিষ ফল। তখন চাঁদ সওদাগর নিজে নারকেল ফলের জল খেয়ে প্রমান করেন এই ফল অতীব সুস্বাদু। সেই থেকেই নারকেল ফল জনপ্রিয়। রামায়নে রাম- সীতা তখন বনবাসে। সীতাদেবী খবর পেলেন রাজা দশরথ পরলোকে গেছেন। এবার পরলৌকিক কাজ করতে সীতা দেবী ফল্গু নদীর তীরে বন থেকে নারকেল সংগ্রহ করেই দশরথের পরলৌকিক কাজ সম্পন্ন করেন। নারকেল, তুলসী, বট বৃক্ষ ছিল সীতাদেবীর এই পরলৌকিক কাজের সাক্ষী। ভারতবর্ষ, শ্রীলঙ্কা ইত্যাদি দেশে নারকেল ধর্ম, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার। সুপ্রাচীন এই ফলটি প্রসিদ্ধ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। শুধু তাই নয় একটি অর্থকরী ফসল হিসেবেও নারকেল সুপ্রসিদ্ধ সারা পৃথিবী জুড়েই। ওয়ার্ল্ড কোকোনাট ডে তাই প্রতিবছর ২রা সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে 'ওয়ার্ল্ড কোকোনাট ডে' বা ‘বিশ্ব নারকেল দিবস’ পালন করা হয়। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফলগুলির মধ্যে একটি হল নারকেল, পাশপাশি এই ফলের বহুমুখী প্রকৃতি এটিকে বাকি ফলের থেকে আলাদা করে তোলে। নারকেল বা ডাব আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য কতটা উপকারি, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। নারকেলের জল, দুধ এবং তেল আমাদের স্বাস্থ্য, ত্বক এবং চুলের জন্য অত্যন্ত উপকারি। ডাব বা নারকেল দিয়ে বিভিন্ন সুস্বাদু খাবারও তৈরি করা যায়। নারকেল এমন একটি ফল, যা পৃথিবীর সব প্রান্তের মানুষের কাছেই খুব জনপ্রিয়। এই গাছের কাঠ থেকে শুরু করে পাতা, নারিকেলের ছোবড়া, জল, দুধ, মালা সবটাই ব্যবহৃত হয় কোন না কোন কাজে। তাই অর্থনীতিতেও নারকেলের ভুমিকা অপরিসীম। ২রা ডিসেম্বর ২০০৯ সালে প্রথম, ‘বিশ্ব কোকোনাট ডে’ বা ‘বিশ্ব নারকেল দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। এই দিনটি পালনের আসল উদ্দেশ্য হল, নারকেলের উপকারিতা সম্পর্কে প্রচার করা। এবং তার পাশাপাশি কীভাবে নারকেল চাষ করা যায় এবং তা সংরক্ষণ করা যায় সেই সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। এশিয়া প্যাসিফিক কোকোনাট কমিউনিটি (APCC) প্রথম এই দিবসটি উদযাপন করে। তারপর থেকে UN-ESCAP বা United Nations Economic & Social Commission For Asia Pacific এবং APCC একসঙ্গে এই দিনটি উদযাপন শুরু করে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও এই দিনটি পালিত হয়। যেমন, কেরালা, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, গোয়া, পশ্চিমবঙ্গ, অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা রাজ্যে এই দিনটি বিশেষভাবে পালিত হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে। এই দিনটিতে নারকেলের স্বাস্থ্য উপকারিতা এবং এর অর্থকরী দিকটি নিয়েও আলোচনা, প্রদর্শনী সেমিনার ইত্যাদি করা হয়ে থাকে। গুরুত্ব দেয়া হয় নারকেলের গুণগত মান, ব্যাবহার, উপকারিতা কে। নারকেল সম্পর্কে আরও কিছু তথ্য একটি নারকেল গাছে প্রত্যেক বছর ৭০-১০০ টি নারকেল উৎপন্ন হয়। ভারতবর্ষে প্রায় ১.৫ কোটি গাছ শুধুমাত্র কেরলেই আছে। যার কারণে কেরল কে ‘কোকোনাট ল্যান্ড’ বলা হয়। সারা বিশ্বে প্রায় অনেকগুলো দেশেই নারকেলের চাষ হয়। তার মধ্যে, ফিজি, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড,ভারত,ব্রাজিল, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপিন্স অন্যতম। সর্বাধিক নারকেল উৎপাদন হয়, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, ফিলিপিন্স, শ্রীলঙ্কা, ও ব্রাজিলে। নারকেল চাষের উপর ভারতের প্রায় এক কোটি মানুষের জীবিকা নির্ভর করে। ভারতের কেরল, অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্ণাটক এবং তামিলনাড়ু তে সর্বাধিক নারকেলের চাষ দেখা যায়। দেশের প্রায় 90 শতাংশ নারকেল এখানেই চাষ হয়। সমুদ্রের পার্শবর্তী স্থানে, লবনাক্ত মাটিতেই নারকেলের চাষ ভালোভাবে হয়। নারকেল একটি সুস্বাদু পুষ্টিকর ফল। এই ফল কাঁচাও খাওয়া যায়, এবং এর থেকে বিভিন্ন ধরনের খাবার ও তৈরি হয়,যেমন কেক, লাড্ডু, বরফি ইত্যাদি। তাছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, পুজো তে, এবং রান্নাতেও ব্যাবহার করা হয়। নারকেলের উপকারিতা নারকেলের জল আমাদের শরীরের পক্ষে প্রচুর মাত্রায় উপযোগী। নারকেলের জলে রয়েছে গ্লুকোজ, ভিটামিন সি, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম যা আমাদের শরীরের ব্লাড প্রেসার কে নিয়ন্ত্রণে সহায়তা প্রদান করে। কোলেস্টরেল এবং ফ্যাট ফ্রী হবার দরুন এটি আমাদের হৃদয়ের পক্ষেও লাভদায়ক। এর মধ্যে থাকা আন্টি-অক্সিডেন্টের গুন শরীরের রক্ত সঞ্চালন কে সক্রিয় রাখে। এবং এটি শরীরের ওজন কমানোর ক্ষেত্রেও কার্যকর। থাইরয়েড হরমোন কে নিয়ন্ত্রণে রাখতে নারকেলের জল অব্যর্থ। নারকেলের জল আমাদের কিডনির পক্ষেও উপযোগী, যদি প্রতিদিন নারকেলের জল খাওয়া যায় তাহলে কিডনিতে পাথর হবার সম্ভাবনা থাকে না। তাছাড়া নারকেলের জল রূপচর্চার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হয়। নারকেল থেকে তৈরি হয় নারকেল তেল যা আমাদের চুলের জন্য উপযোগী। যার ব্যবহার ভারতে এবং অন্যান্য দেশেও রয়েছে। নারকেলের পাতা জ্বালানির কাজে ব্যবহার করা হয়,নারকেলের পাতা থেকে তৈরি হয় ঝাঁটা যা সর্বত্রই ব্যবহার করা হয়। নারকেলের ছোবা থেকে তৈরি হয় দড়ি,সোফা, পাদানি এবং বিভিন্ন ব্যাবহারিক জিনিস। নারকেল গাছ জ্বালানির কাজেও ব্যবহার করা হয় এবং নারকেল গাছ চেরাই করে ছোটখাটো আসবাবপত্র ও তৈরি করা যায়। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ কয়্যার বোর্ড অব ইন্ডিয়া