হাইব্রিড ধান এখানে হাইব্রিড ধান ও তা চাষের পদ্ধতি নিয়ে সবিস্তার আলোচনা করা হয়েছে। জন্মকথা ধানের দু’টি দূর সম্পর্কীয় জাতের পরাগমিলনে উদ্ভুত প্রজনিত প্রথম পুরষটির নাম হাইব্রিড ধান। সহজ কথায় হাইব্রিড ধান দু’টি জাতের প্রথম অপত্য বংশধর। উচ্চফলনশীল বা হাই ইল্ডিং ধানগুলিও দু’টি জাতের সংকরীকরণের মাধ্যমে উদ্ভুত। তবে এই জাতগুলি পিতৃপুরুষের ষষ্ঠ/সপ্তম/অষ্টম অপত্য বংশধর। ১৯২৬ সালে বিজ্ঞানী জোনস দেখেছিলেন দু’টি মানানসই ধানের যৌন মিলনে উদ্ভুত প্রথম অপত্য বংশধরটির ফলনক্ষমতা পরবর্তী বংশধরদের ফলনক্ষমতা অপেক্ষা বহু গুণ বেশি হয়। সারা বিশ্বের কৃষি প্রজননবিদরা এই তত্ত্বের যথার্থতা অনুধাবন করলেও ধানের ফলন উন্নয়ন কর্মসূচিতে এই কৌশল প্রয়োগের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রথম অপত্য বংশের বীজ উত্পাদনের সীমাবদ্ধতা। কেননা ধানের ফুল দ্বি-লিঙ্গ। অর্থাৎ ধানের একটি ফুলের মধ্যে পুং স্তবক এবং স্ত্রী স্তবক উভয়ই বিদ্যমান। তাই ধানের বীজ উত্পাদনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া স্ব-পরাগ সংযোগ। সংকরীকরণের সময় প্রথমে দু’টি জাতের একটির ফুলের ভিতর থেকে পুং স্তবকগুলিকে তুলে ফেলা হয়। অতঃপর অন্য জাতটির পরাগধানী থেকে পরাগ সংগ্রহ করে পুংস্তবক মুণ্ডিত প্রথম জাতটির গর্ভমুণ্ডের ওপর নিক্ষেপ করে নিষেক সম্পন্ন করা হয়। এই জাতীয় দুর্বহ পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিমাণে বীজ উত্পাদন বাস্তবসম্মত নয় বলেই হাইব্রিড ধান গবেষণা থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিলেন বিশ্বের অধিকাংশ বিজ্ঞানীরা। মুখ ফেরাননি শুধু গণপ্রজাতন্ত্রী চিন দেশের বিজ্ঞানীরা। ১৯৬৪ সাল থেকে বিজ্ঞানী যুয়ান লঙ পিঙের নেতৃত্বে হাইব্রিড ধানের ওপর নিবিড় গবেষণা চলেছে চিন দেশে। ১৯৭০ সালে লঙ পিঙের সহকারী লি বিহু হাইনান দ্বীপে প্রকৃতির কোলে গজিয়ে ওঠা ধানের বন্যপ্রজাতির মধ্যে হঠাৎই খুঁজে পেলেন পরাগ-বন্ধ্যা ধানের গাছ। হুনান চাঙসায় হাইব্রিড গবেষণা কেন্দ্রে ওই পরাগ-বন্ধ্যা গাছটির ওপর গভীর অনুসন্ধানের পর জানা গেল গাছটির পরাগ-বন্ধ্যাতের হোতা তার কোষের সাইটোপ্লাজম। বন্য প্রজাতির কোষজাত পরাগ বিনষ্টকারী এই বিশেষ প্রকৃতির সাইটোপ্লাজমের নাম দেওয়া হল ‘ডবলুএ (ওয়াইল্ড অ্যাবরটিভ) সাইটোপ্লাজম’। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই ‘ডবলুএ সাইটোপ্লাজম’-সমৃদ্ধ কোষে ব্যবহারিক ধানের নিউক্লিয়াস প্রতিস্থাপন করে উদ্ভাবিত হল অভিনব ঘরানার ব্যবহারিক ধান। যে ধানের চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য সাধারণ ধানের মতো কিন্তু পুং স্তবকটি অকেজো। বিজ্ঞানীরা এই ধানটির নাম দিলেন স্ত্রী ধান বা ‘এ’ লাইন। এই ধানটির পুং স্তবক অকেজো হওয়ার ফলে ধানটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়ল পরাগ প্রদানকারী এমন প্রকৃতির ধান যা এই ধানের পুরুষত্বহীনতা-সহ সর্ব প্রকার চারিত্রিক বিশুদ্ধতা বজায় রেখে ধানটির বংশ বৃদ্ধি করে যেতে পারবে। ধানের যে ব্যবহারিক জাতটির নিউক্লিয়াস প্রতিস্থাপন করে স্ত্রী ধানটি উদ্ভাবিত হয়েছিল দেখা গেল সেই ধানটির পরাগ থেকে সংগৃহীত পরাগ এই কাজটা সুষ্ঠ ভাবে করতে পারছে। বিজ্ঞানীরা স্ত্রী ধানের প্রতিপালনের জন্য পরাগ প্রদানকারী এই ধানটির নাম রাখলেন প্রতিপালক পিতা অর্থাৎ মেনটেনার অথবা ‘বি’ লাইন। এ বার খোঁজা শুরু আরও এক বিশেষ প্রকৃতির ধান -- মৃদুমন্দ বাতাস যার পরাগ বয়ে এনে স্ত্রী ধানের গর্ভমুণ্ডে নিক্ষেপ করে সৃষ্টি করবে অতি উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড ধানের জাত। কাজটা কিন্তু সহজ ছিল না। কেননা যৌন জননে জাত ভ্রূণের কোষের সাইটোপ্লাজমের সবটুকু আসে মায়ের দিক থেকে। এ ক্ষেত্রে স্ত্রী ধানের অর্থাৎ মায়ের সাইটোপ্লাজম পুরুষত্ব বিনাশকারী হওয়ার সুবাদে নিষেকের পর ভ্রূণে থেকে বেড়ে ওঠা গাছটি বন্ধ্যা হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। বাণিজ্যিক হাইব্রিড ধান উদ্ভাবনের উদ্দেশ্যে গর্ভাধানের জন্য প্রয়োজন সেই পরাগ পিতা যার বংশগতিদত্ত শক্তি পরাগ-বন্ধ্যা স্ত্রী ধানের পুরুষকার পুনরুদ্ধার করে ভ্রূণটিকে করে তুলতে পারে অতি উচ্চ ফলনশীল। নিবিড় অন্বেষণে অবশেষে পাওয়া গেল এ জাতীয় এক গুচ্ছ ব্যবহারিক ধানের জাত। বিজ্ঞানীরা এই বিশেষ ধানগুলির নাম দিলেন পুনরুদ্ধারক পিতা অর্থাৎ রেসটোরার অথবা ‘আর’ লাইন। ১৯৭৩ সাল নাগাদ ধান-বিজ্ঞানের তথ্যকোষে স্বর্ণাক্ষরে মুদ্রিত হল চৈনিক বিজ্ঞানীদের আবিষ্কৃত ভিন গোষ্ঠীর তিনটি ব্যবহারিক ধান — ‘এ’, ‘বি’ ও ‘আর’ লাইন। এই তিনটি ধানের যোগসূত্রে ১৯৭৪ সালে চিন দেশে উদ্ভাবিত হল বিশ্বের প্রথম হাইব্রিড ধান। ১৯৭৫ সালে সারা দেশে মোট ৩৭৩ হেক্টর জমিতে প্রাথমিক মূল্যায়নের পর বিশ্বের প্রথম হাইব্রিড ধানটি বাণিজ্যিক আকারে চাষের জন্য সরকারি ছাড়পত্র পেল ১৯৭৬ সালে। উচ্চফলনশীল ধানের পাশাপাশি শুরু হল অতি উচ্চফলনশীল হাইব্রিড ধানের চাষ। দুই দশকের কম সময়ের মধ্যেই চিনে ৫০% ধানী জমিতে পৌঁছে গেছে হাইব্রিড ধান। এই বিস্তীর্ণ এলাকায় কৃষকেরা হাইব্রিড ধান প্রবর্তনের মাধ্যমে বর্তমানে হেক্টর পিছু গড়পড়তা ১.৭ টন অধিক ফলন ঘরে তুলতে পারছে। ভারতবর্ষে হাইব্রিড ধান মজার কথা হল বন্ধ্যা সাইটোপ্লাজমসমৃদ্ধ হাইব্রিড প্রযুক্তি উদ্ভাবনের স্বীকৃতি চিন দেশের ঝুলিতে গেলেও ধানে অনুরূপ সাইটোপ্লাজমের অস্তিতের কথা চিন দেশে কাজ শুরুর বহু আগেই ঘোষণা করেছিলেন ভারতের দুই বিজ্ঞানী — সম্পত এবং মহান্তি। ভারতীয় বিজ্ঞানীদ্বয়ের উক্ত তত্ত্বসম্বলিত গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় ১৯৫৪ সালে। ওই তত্ত্বের ব্যবহারিক প্রয়োগের দিকে ভারতীয় বিজ্ঞানীদের বহু কাল নজর পড়েনি। নজর পড়ল অনেক পরে। মূলত চিনের সাফল্যে আপ্লুত হয়েই আমাদের দেশে অনুসন্ধান পরিষদের ছত্রছায়ায় ফাও এবং ইউ এন ডি পি-র আর্থিক সহায়তায় হাইব্রিড ধানের ওপর নিবিড় গবেষণা প্রকল্প চালু হল ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বর মাসে। প্রযুক্তিগত সাহায্যের হাত বাড়ালেন হাইব্রিড প্রযুক্তির জনক চৈনিক বিজ্ঞানী লঙ পিঙ ও তাঁর সহকারীবৃন্দ। এগিয়ে এলেন ফিলিপাইনসের আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীগণ। কাজ শুরু হল বিভিন্ন রাজ্যের মোট ১২টি গবেষণা কেন্দ্রে। ভারতীয় কৃষি অনুসন্ধান পরিষদের তরফ থেকে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সমন্বয়ের দায়িত্ব পেল হায়দরাবাদের ধান গবেষণা অধিকার। সেই থেকে এই প্রকল্পে কাজ চলেছে যুদ্ধকালীন তত্পরতায়। ভারতের জলহাওয়া উপযোগী ‘এ’ লাইন উদ্ভাবন/নির্বাচন, নির্বাচিত ‘এ’ লাইনের উপযুক্ত ‘আর’ লাইন চিহ্নিতকরণ, হাইব্রিড ধান উদ্ভাবন, উদ্ভাবিত হাইব্রিডের ফলনের নিরীক্ষা ইত্যাদি এক যোগে চলেছে। সমন্বিত নিবিড় গবেষণায় ২০১২-১২ সাল পর্যন্ত উদ্ভাবিত জাতগুলির মধ্যে ৬৫টি হাইব্রিড ধানের জাত ভারতবর্ষে বাণিজ্যিক চাষের ছাড়পত্র পেয়েছে। অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার ও বিভিন্ন রাজ্য সরকার। এর মধ্যে ৩৫টি হাইব্রিড ধানের উদ্ভাবক দেশের বিভিন্ন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি ধান গবেষণা কেন্দ্র। বাকি ৩০টির মধ্যে ১৫টির উদ্ভাবক ব্যক্তিগত মালিকাধীন বীজ কোম্পানি। ১৫টির মধ্যে দেশি কোম্পানির অবদান ১০টি, বহুজাতিক সংস্থার ৫টি। ১৯৯৪ সালে অন্ধ্রপ্রদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত মারাতেরা কেন্দ্রে উদ্ভাবন হয় খরিফ মরশুমে চাষের উপযোগী দেশের প্রথম হাইব্রিড ধানের জাত। ভারতবর্ষে রবি মরশুমে বাণিজ্যিক চাষের উপযোগী প্রথম জাতটি উদ্ভাবিত হয় পশ্চিমবঙ্গের চুঁচুড়া ধান গবেষণা কেন্দ্রে, ১৯৯৫ সালে। বর্তমানে চিন দেশ ছাড়াও ভারত, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনস, মায়ানমার, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মিশর, কলোম্বিয়া, শ্রীলঙ্কা ইত্যাদি দেশে হাইব্রিড ধানের চাষ ছড়িয়েছে। এই দেশগুলিতে সম্মিলিত ভাবে বর্তমানে মোট ৩০,০০০ হেক্টর জমিতে হাইব্রিড ধানের চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে ভারতবর্ষেই হাইব্রিড ধানের চাষ ১৪,০০,০০০ হেক্টরে। অর্থাৎ দেশের ২.৬ শতাংশ ধানের এলাকা বর্তমানে হাইব্রিড চাষের আওতায়। উত্তরপ্রদেশ, পজ্ঞাব, হরিয়ানা, অন্ধ্রপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে হাইব্রিড চাষ ইতিমধ্যেই কৃষকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গে হাইব্রিড ধান ভারতীয় কৃষি অনুসন্ধান পরিষদের মূল প্রকল্পের অংশীদার হয়ে পশ্চিমবঙ্গে হাইব্রিড ধানের ওপর গবেষণার কাজ শুরু হয় ১৯৯২ সালের মে মাসে রাজ্য সরকারের চুঁচুড়া ধান গবেষণা কেন্দ্রে। মূলত বোরো মরশুমের উপযোগী হাইব্রিড উদ্ভাবনই এই কেন্দ্রের মুখ্য উদ্দেশ্য। নিরলস গবেষণায় এই কেন্দ্রে উদ্ভাবিত হয়েছে শতাধিক পরীক্ষামূলক হাইব্রিড ধানের। প্রাথমিক স্তরে পরীক্ষানিরীক্ষার সংক্ষিপ্ত খতিয়ান ও পশ্চিমবঙ্গের জলহাওয়ায় প্রচলিত, উচ্চফলনশীল ধানের ফলনসীমার নিরিখে হাইব্রিড ধানের উচ্চতর ফলন ক্ষমতার চিত্র নীচে তুলে ধরা হল। পরিসংখ্যান মরশুম বোরো খরিফ মোট পরীক্ষিত হাইব্রিডের সংখ্যা : ১৪৫ ১৪০ ২৮৫ জনপ্রিয় উচ্চ ফলনশীল জাত অপেক্ষা হেক্টর টনের অধিক ফলন ক্ষমতাসম্পন্ন হাইব্রিডের সংখ্যা ৪২ ৩২ ৭৪ গবেষণা খামারে প্রাপ্ত সর্বোচ্চ ফলন (টন / C2) ক ) হাইব্রিড ৯.০ ৭.৫ - খ) উচ্চফলনশীল ৬.৬ ৫.৪ - পরবর্তী কালে হাইব্রিড ধানের নিরীক্ষা কেবলমাত্র গবেষণা খামারে সীমাবদ্ধ না রেখে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় কৃষকের খামারে সম্ভাবনাময় হাইব্রিডগুলির ফলনক্ষমতা ও অন্য গুণাবলির বিস্তারিত মূল্যায়ন করা হয়েছে। ২০১২ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে কৃষকের খামারে ভারত সরকারের সুপারিশকৃত মোট ৫টি হাইব্রিড জাত নিয়ে ৭১০টি ফ্রন্টলাইন প্রদর্শন ক্ষেত্র তৈরি করা হয়। প্রতিটি প্রদর্শনক্ষেত্রের আয়তন ছিল ১ হেক্টর। প্রদর্শন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হাইব্রিড ধানের জাতগুলি ছিল : পি এ - ৬৪৪৪, কে আর এইচ - ২, সি এন আর এইচ - ৩, পি এ - ৬২০১, পি এইচ বি - ৭১, পি এ সি - ৮৩৫ এবং পি এ সি - ৮৩৭। প্রদর্শনক্ষেত্রের এই নিরীক্ষাগুলি ভারতীয় কৃষি অনুসন্ধান পরিষদের তত্ত্বাবধানে চুঁচুড়া ধান গবেষণা কেন্দ্রের সহায়তায় অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি প্রদর্শনক্ষেত্রে হাইব্রিড ধানের পাশাপাশি ফলনের তুলনামূলক উত্কর্ষ যাচাই করার জন্য চাষ করা হয়েছিল সমমেয়াদি উচ্চফলনশীল জাত যেমন ক্ষিতীশ, শতাব্দী, ললাট ইত্যাদি। ফলনের তুলনামূলক বিচারে দেখা গেছে সমমেয়াদী উচ্চফলনশীল জাতের পরিবর্তে এই হাইব্রিড জাতগুলি চাষ করলে হেক্টর পিছু ১০২০ থেকে ১৬৭০ কেজি অধিক ধান কৃষকের ঘরে উঠবে। বিধানচন্দ্র কৃষি বিদ্যালয়ের তরফ থেকে বাঁকুড়া জেলার কৃষকের খামারে ২০১১ সাল থেকে ২০১৩ সালে উচ্চ ফলনশীল ধানের পাশাপাশি খরিফ মরশুমে হাইব্রিড ধানের ফলনের তুলনামূলক নিরীক্ষা চালানো হয় একটি বিশেষ গবেষণা প্রকল্পের মাধ্যমে। নিরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে সমমেয়াদি উচ্চফলনশীল জাত অপেক্ষা হাইব্রিড ধানের ফলনক্ষমতা লক্ষণীয় ভাবে বেশি। তাই ভারতীয় কৃষি অনুসন্ধান পরিষদ ও রাজ্য ধান গবেষণা কেন্দ্র যৌথ ভাবে রাজ্যে বাণিজ্যিক চাষের জন্য বিভিন্ন সমেয় যে হাইব্রিড ধানের জাতগুলো সুপারিশ করেছে তা হল — সি এন এইচ আর – ৩, কে আর এইচ – ২, পি এ – ৬২০১ ও ৬৪৪৪, ডি আর আর এইচ- ২, জে কে আর এইচ – ৭৫৫, ইউ এস – ৩১২, পি এইচ বি – ৭১, পি এস সি – ৮৩৫ ও ৮৩৭ এবং শেহাদ্রি – ৪। বর্তমানে এই জাতগুলির মধ্যে কয়েকটিকে নির্বাচন করে রাজ্য জুড়ে সবুজ বিপ্লব প্রকল্পের আর্থিক সহায়তায় প্রতি ব্লকে ১০০ হেক্টর এলাকা নিয়ে ঘন বিন্যস্ত প্রদর্শনক্ষেত্র গড়ে তুলে রাজ্যে হাইব্রিড ধানকে জনপ্রিয় করে তোলার চেষ্টা চলছে। খরিফ মরশুমে বিশেষ করে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর ও উত্তরবঙ্গের বৃষ্টি নির্ভর উঁচু জমিতে উচ্চফলনশীল হাইব্রিড ধানের উত্কর্ষ কৃষকদের নজর কাড়তে শুরু করেছে। হাইব্রিড ধানের চাষ চারা ও জমি তৈরি শুরু হয়েছে উচ্চফলনশীল (উফশী) ধানের পাশাপাশি আরও অধিক ফলনশীল হাইব্রিড ধানের চাষ। উফশী ধান ও হাইব্রিড ধানের গঠনশৈলীর মধ্যে বিস্তর বৈষম্য বিদ্যমান। চারা অবস্থা থেকেই এই পার্থক্য নজরে পড়তে শুরু করে। হাইব্রিড ধানের প্রাথমিক বাড়বৃদ্ধির হার, পাশকাঠি ছাড়ার ক্ষমতা এবং রোপণের প্রাথমিক অবস্থায় নাইট্রোজেন সার গ্রহণক্ষমতা উফশী ধান অপেক্ষা অনেক বেশি। সর্বোচ্চ ফলনের জন্য বর্গমিটার পিছু প্রয়োজনীয় শিষের সংখ্যা উফশী ধানের বেলায় যতটা চারার সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল হাইব্রিড ধানের ক্ষেত্রে ঠিক ততটাই পাশকাঠি মুখাপেক্ষী। এ জাতীয় ধানের ফলনের ৮০ শতাংশই পাশকাঠির অবদান। ধানের দুই গোষ্ঠীর এই চরিত্রগত বৈষম্যের সুবাদে বোরো চাষের পরিচিত উফশী চাষবিধি হাইব্রিড ধান চাষে পরিপূর্ণ ভাবে প্রযোজ্য হবে না। প্রাথমিক পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের ভিত্তিতে হাইব্রিড ধানের বোরো চাষবিধির পরিমার্জিত নির্যাস বর্তমান নিবন্ধে তুলে ধরা হল। বীজের হার চাষের জন্য হাইব্রিড ধান বীজ উফশী ধান অপেক্ষা ৬৫ – ৭০ শতাংশ কম লাগে। একর প্রতি ৬ – ৮ কেজি বীজই যথেষ্ট। চারা তৈরি হাইব্রিড ধানের চারার বাড়বৃদ্ধি উফশী ধানের দ্বিগুণ। তাই বীজতলায় বীজ পাতলা করে ছড়ানো দরকার যাতে বীজতলা থেকেই পাশকাঠি ছাড়া শুরু হয়ে যায়। এক একর জমির চারা তৈরি করার জন্য ২০০ বর্গমিটার জমিতে বীজতলা গড়ে তুলতে হবে। ওই পরিমাণ জমিতে এক একর জমির জন্য প্রয়োজনীয় শোধিত বীজ কলা করে সর্বত্র সমান ভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে। বীজশোধনের নিয়মাবলী প্রচলিত উফশী ধানের অনুরূপ। উপরোক্ত পরিমাণ বীজতলায় উল্লেখযোগ্য করণীয় : জমি তৈরির সময় ৪০০ কেজি জৈব সার ও এন পি কে খাদ্যপ্রাণের প্রতিটি ১ কেজি হারে ব্যবহার করা। বীজ বোনার ১৫ – ২০ দিনের মধ্যে ৫০০ গ্রাম নাইট্রোজেন চাপান হিসাবে প্রয়োগ করা। বোনার সময় ৩০ – ৩৫ দিনের মাথায় পুনরায় ৫০০ গ্রাম নাইট্রোজেন চাপান দেওয়া দরকার। সেই সঙ্গে দানাদার ওষুধ (১.৫ কেজি এ আই/হে ) যেমন ফোরেট – ১০জি (বীজতলায় ৩০০ গ্রাম) অথবা কার্বোফিউরান ৩ (বীজতলায় ১ কেজি)। দানাদার ওষুধ প্রয়োগের পর থেকে অন্তত ৭ দিন বীজতলায় জল বেঁধে রাখতে হবে। বীজতলার অন্যান্য পরিচর্যা যথা আগাছা দমন, সেচ ও অন্যান্য রোগ নিয়ন্ত্রণবিধি উফশী ধানের অনুরূপ। চারার বয়স খরিফ মরশুমে ২০ – ২৫ দিন ও বোরো মরশুমে ৪০ – ৪৫ দিনের মধ্যে এসে গেলেই রোয়ার কাজে সর্বোত্কৃষ্ট বলে বিবেচিত হবে। জমি তৈরি উফশী ধান ও হাইব্রিড ধানের জমি তৈরির কোনও গুণগত প্রভেদ নেই। পার্থক্য যা আছে তা মূল সার ব্যবহারবিধিতে। উফশী ধানের বেলায় প্রদেয় রাসায়নিক সারের ফসফেট ও পটাশের সবটুকু এবং নাইট্রোজেনের এক চতুর্থাংশ শেষ চাষের আগে মূল সার হিসাবে জমিতে দেওয়া হয়। হাইব্রিড ধানের ক্ষেত্রে প্রদেয় ফসফেট ও পটাশের ব্যবহার অনুরূপ ভাবে করে নাইট্রোজেনের প্রদেয় মাত্র এক চতুর্থাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩৩ শতাংশ করা হয়। নাইট্রোজেন ব্যবহারবিধির এই বৈষম্যের মূল কারণ দু’ ধরনের ধানের সারবস্তু উত্পাদন করার বিপরীত ধর্মী রীতি। হাইব্রিড ধানের সিংহ ভাগ সারবস্তু উত্পাদিত হয় বাড়ন্ত কালের প্রাথমিক অবস্থায়। এই সারবস্তুই পরবর্তী কালে দানা উত্পাদনের কাজে ব্যয়িত হয়। উফশী ধানের বেলায় এই কাজটা গতি পায় বাড়ন্ত কালের প্রান্তে এসে। উদ্ভিদ শরীরবিদরা দেখেছেন হাইব্রিড ধান জীবনকালে যতটুকু নাইট্রোজেন আহরণ করে তার ৩০ – ৩৫ শতাংশ সংগৃহীত হয় রোয়ার পর থেকে পাশকাঠি ছাড়ার প্রাথমিক অবস্থার অন্তবর্তী সময়ে, আর ৩০ – ৩৫ শতাংশ এর পর থেকে শিষের সূচনাকালের মধ্যবর্তী সময়ে। তাই জমি তৈরির জন্য মূল সারের ব্যবহারবিধি বিশেষ ভাবে উল্লেখ করা হল : জৈবসার : ৩ – ৫ টন/একর নাইট্রোজেন : ১৪ – ১৬ কেজি/একর ফসফেট : ২০ – ২৪ কেজি/একর পটাশ : ২০ – ২৪ কেজি/একর রোয়া করা উফশী ধান অপেক্ষা হাইব্রিড ধান কম ঘনত্বে রোয়া করা দরকার। কেননা হাইব্রিড ধানের পাশকাঠি ছাড়ার ক্ষমতা অনেক বেশি এবং এই ধানের ফলন মূলত পাশকাঠি-নির্ভর। পাশকাঠির অবদান উফশী ধানের ফলনে যেখানে ৩৫ – ৪০ শতাংশ সেখানে হাইব্রিড ধানে ৭০ – ৭৫ শতাংশ। তাই রোয়ার ঘনত্ব এমন হওয়া দরকার যাতে গুছির চার পাশের পরিবেশ পাশকাঠি বেড়ে ওঠার অনুকূল হয়। সেই সুবাদে উল্লেখযোগ্য হল — জানুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের ১ম সপ্তাহ ও খরিফ খন্দে আগস্ট মাসের মধ্যে রোয়া করা। অধিক বয়সি চারা রোয়া না করা। বোরোর বেলায় ৪০ – ৪৫ দিন, খরিফে ২০ – ২৫ দিনের চারা। প্রতিটি গুছিতে ১টি মাত্র চারা লাগানো। সারি থেকে সারি ১৫ সেমি এবং সারিতে ১৫ সেমি অন্তর গুছি লাগানো অর্থাৎ রোয়ার ঘনত্ব হবে ১৫ সেমি x ১৫ সেমি (৬ ইঞ্চি x ৬ ইঞ্চি)। পরিচর্যা পরিচর্যার প্রথম পাঠ গুছি পূরণ ও আগাছা দমন। গুছি পূরণের কাজটা বিশেষ যত্ন সহকারে রোয়ার ৭ – ৮ দিনের মাথায় করে ফেলা দরকার, কেননা হাইব্রিড ধানে গুছি প্রতি একটি মাত্র চারা লাগানো হয়। পাশকাঠি সর্বোচ্চ সংখ্যায় উন্নীত হওয়া পর্যন্ত জমি আগাছামুক্ত রাখাই রীতি। আগাছা নিয়ন্ত্রণের কাজটা বুটাক্লোর জাতীয় দানাদার আগাছানাশক (১৩ কেজি/একর) প্রয়োগ করেও করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে রোয়ার ৭ দিনের মধ্যে জমিতে দানাদার আগাছানাশক ছিটিয়ে জমির জল ৭ – ১০ দিন বেঁধে রাখতে হবে। সেচের ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি উফশী ধানের অনুরূপ। তবে হাইব্রিড ধানে দিন প্রতি বর্গমিটার পিছু পাশকাঠি উত্পাদনের হার ৩০ ছাড়িয়ে গেলে জমি থেকে জল বার করে সেচ বন্ধ রেখে মাটি শুকিয়ে ফেলতে হবে। নতুবা অত্যাধিক পাশকাঠি ফলনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। উফশী ধানের মতোই হাইব্রিড ধানের চাপান সার দু’বারে দেওয়া দরকার। তবে সারের মাত্রা হবে : প্রথম চাপান সার : রোয়ার ১৫ – ২০ দিনের মাথায় একর পিছু ১৪ – ১৬ কেজি নাইট্রোজেন। দ্বিতীয় চাপান : পাশকাঠির উত্পাদন শীর্ষে উন্নীত হওয়ার পর থেকে শিষের সূচনাকালের অন্তবর্তী সময়ে একর পিছু ১৪ – ১৬ কেজি নাইট্রোজেন। চাপান সার ছড়ানোর কাজটা একটু বেলার দিকে তাপমাত্রা বাড়ার পর করাই বাঞ্ছনীয়। সার ব্যবহারের পর জমিতে কমপক্ষে ৪৮ ঘণ্টা জল বেঁধে রাখা দরকার। প্রথম চাপানের পর মাটি ঘেঁটে জল ঢোকানোর চলতি অভ্যাস দ্বিতীয় চাপানোর বেলায় করা উচিত নয়। রোগ পোকা নিয়ন্ত্রণ হাইব্রিড ধানের ফলনের অন্যতম অন্তরায় ‘মাজরা’ পোকা। কেন না অনুমোদিত হাইব্রিড ধানগুলির অধিকাংশই জলদিমেয়াদি। তাই মাজরা পোকার গতিবিধির ওপর সবিশেষ নজর রেখে নিয়ন্ত্রণের বিশেষ সুপারিশবিধি মেনে চলাই শ্রেয়। রোয়ার পর থেকে প্রাত:কালে নিয়মিত (সপ্তাহে ৩ – ৪) দিন জমির কোনার দিকে আঁকাবাঁকা চলাফেরা করে ধানের গুছিগুলো খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা। রোয়ার পর থেকে শিষের সূচনাকাল পূর্ববর্তী সময়সীমার মধ্যে বর্গমিটারে মাজরার একটি পূর্ণাঙ্গ পোকা অথবা একটি ডিমের পোকা দেখামাত্র দানাদার ওষুধ যেমন ফোরেট ১০জি (৪ কেজি/একর) কুইনলফস ৫জি (৮ কেজি/একর), কার্বোফিউরান ৩জি (১২ কেজি/একর) ছিটোনো। মাজরা পোকা ছাড়াও বাদামি শোষক পোকার উত্পাত ফলনের ক্ষতি করতে পারে। প্রায়শই এদের আক্রমণ শস্যের ফলনের পক্ষে ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। তাই ধানে শিষের সূচনাকাল থেকে কাঁচথোড় আসা পর্যন্ত গুছিপ্রতি ১৫/২০টি পোকা অথবা ফুল আসার পর গুছিপ্রতি ২৫/৩০টি পোকা দেখা দিলে গাছের গোড়ার দিকে একর প্রতি ১০ কেজি গুঁড়ো জাতীয় রাসায়নিক ওষুধ যেমন এন্ডোসালফান ৪%, কুইনালফস ১.৫%, লিনডে ১.৪%, কার্বারিল ডি পি ছড়াতে হবে। জলে গোলা ওষুধ যেমন বি এইচ সি ৫০ ডব্লুবিপি, কার্বারিল ৫০ ইত্যাদি উফশী ধানের জন্য সুপারিশকৃত মাত্রায় ছেটানো যেতে পারে। রোগের ক্ষেত্রে পাশকাঠি ছাড়ার পর থেকে দানা পৃষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত নজর রেখে উফশী ধানের জন্য চলতি নিয়ন্ত্রণবিধি মেনে চলতে হবে। জাত কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি গবেষণাকেন্দ্র উদ্ভাবিত জাত পশ্চিমবঙ্গের যে সমস্ত বৃষ্টিনির্ভর উঁচু ও মাঝারি জমিতে খরিফ খন্দে উচ্চফলনশীল (উফশী) জাতের ধান চাষ সত্ত্বেও ফলন বেশ কম, সেই সমস্ত অঞ্চলেই হাইব্রিড ধানের চাষ কৃষক-প্রিয় হচ্ছে। কেন না এই ধানের জমিতে উফশী ধানের পরিবর্তে হাইব্রিড জাতের ধান চাষ করলে ২৫ – ৩০ শতাংশ অধিক ফলন পাওয়া যাচ্ছে। এই সব অঞ্চলের উপযোগী হাইব্রিড ধানের জাত উদ্ভাবিত হয়েছে দু’ ভাবে। উদ্ভাবনের অন্যতম প্রধান স্থল হল দেশের বিভিন্ন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি গবেষণাকেন্দ্র। বেসরকারি বীজ সিড কোম্পানিগুলিও বেশ কিছু জাতের উদ্ভাবন করেছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি গবেষণাকেন্দ্র উদ্ভাবিত জাত : সি এন আর এইচ – ৩ এই জাতটির উদ্ভাবক পশ্চিমবঙ্গ সরকারের চুঁচুড়া ধান গবেষণা কেন্দ্র। জাতটি ১৯৯৫ সালে পশ্চিমবঙ্গে চাষের জন্য রাজ্য সরকারের অনুমোদন পায়। সি এন আর এইচ - ৩, আই আর ৬২৮২৯ – এ এবং অজয়া – আর নামের দু’টি উফশী ধানের মিলনে উদ্ভুত প্রথম অপত্য পুরুষ। পাকতে সময় লাগে ১০০ – ১০৫ দিন। ধান মাঝারি সরু। চালের অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৬ ২৭ শতাংশ, অ্যালকালি স্প্রেডিং ভ্যালু – ৩। তবে ১০০ কেজি ধান ভাঙালে ৭০ কেজি মোট চাল এবং ৫২ কেজি গোটা চাল পাওয়া যায়। গাছের উচ্চতা ৮০ – ৮৫ সেমি। হেক্টর প্রতি ফলন ক্ষমতা ৭.৫ টন, ক্ষিতিশের চেয়ে ৩৭ শতাংশ বেশি। ডি আর আর এইচ -২ জাতটির উদ্ভাবক কেন্দ্রীয় সরকারের হায়দরাবাদ ধান গবেষণা কেন্দ্র। কেন্দ্রীয় জাত অনুমোদন সংস্থা ২০০৫ সালে জাতটি পশ্চিমবঙ্গ সহ কয়েকটি রাজ্যে চাষের জন্য অনুমোদন করে। জাতটি আই আর – ৬৮৮৯৭-এ এবং ডি আর ৭১৪ – ১ -২ আর নামের দু’টি উফশী ধানের প্রথম অপত্য পুরুষ। পাকতে সময় লাগে ১১২ – ১১৬ দিন। ধান লম্বা লম্বা সরু। চালে অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৫%। তবে অ্যালকালি স্প্রেডিং ভ্যালু ৬৩%। মোট চাল ধানের ৭৩% এবং গোটা চাল ৬৩%। গাছের উচ্চতা ৮৫ – ৯০ সেমি। ফলন ক্ষমতা হেক্টর প্রতি ৫.৫ টন। কে আর এই -২ উদ্ভাবক কর্ণাটকের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ক্ষেত্রীয় কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, মান্ড্য। কেন্দ্রীয় জাত অনুমোদন সংস্থা ১৯৯৬ সালে জাতটিকে পশ্চিমবঙ্গ সহ কয়েকটি রাজ্যে বাণিজ্যিক চাষের জন্য অনুমোদিত করে। জাতটি আই আর ৫৮০২৫-এ এবং কে এম আর -৩ আর, এই দু’টি উফশী ধানের প্রথম অপত্য বংশ। পাকতে লাগে ১২৫ -১৩০ দিন। লম্বা মোটা ধান। চালে অ্যামাইলোজের ভাগ ২৭%। অ্যালকালি স্প্রেডিং ভ্যালু কম ২.২%। ধানের ৭৩% মোট চাল ও ৫৭% গোটা চাল। ফলন ক্ষমতা হেক্টর পিছু ৭.৫ টন, লম্বা খড়, গাছের উচ্চতা ১১০ – ১১৫ সে মি। সেহাদ্রী – ২ মহারাষ্ট্রের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত কারজাটের আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে উদ্ভাবিত। জাতটি কেন্দ্রীয় জাত অনুমোদন সংস্থার ছাড়পত্র পায় ২০০৬ সালে। আই আর ৫৮০২৫-এ এবং কেজিটি আর - ২ – আর, এই দু’টি উফশী ধানের সংকরায়নে জাত প্রথম অপত্য পুরুষ। পাকতে সময় লাগে ১১৫ – ১২০ দিন। লম্বা সরু ধান। চালে অ্যামাইলোজের পরিমাণ মাঝারি (২৩%)। কিন্তু অ্যালকালি স্প্রেডিং ভ্যালু ৬। মোট চাল ধানের ৭০% , গোটা চাল ৫৬%। জাতটি ঝলসা, ব্যাকটেরিয়াজনিত ধসা ও ভুসো রোগ সহনশীল। এ ছাড়াও বাদামি শোষক পোকা ও মাজরা পোকায় মাঝারি সহনশীল। বেসরকারি বীজ কোম্পানি উদ্ভাবিত জাত পি এইচ বি – ৭১ সত্ত্বাধিকারী পায়োনিয়ার ওভারসিস কর্পোরেশন হায়দরাবাদে অবস্থিত ভারতীয় গবেষণা কেন্দ্র। ১৯৯৭ সালে কেন্দ্রীয় জাত অনুমোদন সংস্থার কাছ থেকে জাতটি ভারতে চাষের ছাড়পত্র পায়। জাতটির বংশপরিচয় গোপন রাখা আছে। পাকতে সময় লাগে ১৩০ – ১৩৫ দিন। ধান লম্বা সরু। চালের অ্যামাইলেজ ২৩%, অ্যালকালি স্প্রেডিং ভ্যালু – ২.৪। মোট চাল ধানের ৭১%, গোটা চাল ৫৯%, ফলন ক্ষমতা ৭.৮৬ টন। জাতটি ব্যাকটেরিয়াজনিত ধসা ও ঝলসা রোগ এবং বাদামি শোষক পোকা ও চুঙ্গি পোকা সহনশীল। গাছ আংশিক লম্বা (১৩০ সে মি)। পি এ – ৬২০১ সত্ত্বাধিকারী বেয়ার বায়োসায়েন্স কোম্পানির হায়দরাবাদ শাখা। ভারতবর্ষে চাষের ছাড়পত্র মেলে কেন্দ্রীয় জাত অনুমোদন সংস্থার কাছ থেকে ২০০০ সালে। জাতটির বংশপরিচয় গোপন কোডে ৬ সিও – ২ এবং ৬ এমও -১ সংকরায়নে উদ্ভুত প্রথম অপত্য পুরুষ। পাকতে সময় লাগে ১২৫ – ১৩০ দিন। সরু লম্বা ধান। চালের অ্যামাইলোজ – ২৪%, অ্যালকালি স্প্রেডিং ভ্যালু – ২.০। ধানের ৬৮% মোট চাল ও ৬১% গোটা চাল। জাতটি ঝলসা, বাদামি শোষক পোকা ও পাতা মোড়া পোকা সহনশীল। গাছ আংশিক লম্বা (১১৫ সে মি)। ফলন ক্ষমতা ৬.২ টন প্রতি হেক্টর। এই জাতটি পশ্চিমবঙ্গের চাষে সুপারিশ ভারতীয় কৃষি অনুসন্ধান পরিষদের। পি এ – ৬৪৪৪ এই জাতটির ও সত্ত্বাধিকারী বেয়ার বায়োসায়েন্স হায়দরাবাদ। কেন্দ্রীয় জাত অনুমোদন সংস্থার অনুমোদন মেলে ২০০১ সালে। বংশপরিচয়ের কোড ৬ সিও-২ এবং ৬ এমও -৫। জাত দু’টির সংকরায়নের ফলে উদ্ভুত প্রথম অপত্য পুরুষ। পাকতে সময় লাগে ১৩০ – ১৩৫ দিন। মাঝারি সরু ধান। ধানে মোট চালের ভাগ ৭৪%। গোটা চালের ভাগ ৬৪%। চালের অ্যালকালি স্প্রেডিং ভ্যালু ৪.৫। ফলন ক্ষমতা হেক্টর পিছু ৬.১ টন। গাছ আংশিক লম্বা (১১০ সে মি)। জাতটি খোসা পচা, ব্যাকটেরিয়াল পাতা ধসা রোগ ও বাদামি শোষক পোকা সহনশীল। জে কে আর এইচ ৪০১ সত্ত্বাধিকারী জে কে এগ্রি জেনেটিক্স লিমিটেড, হায়দরাবাদ। বংশ পরিচয়ের কোড আরভি – ২ এ এবং আরভি -৪৪ আর, এই দু’টি জাতের সংকরায়নে উদ্ভুত প্রথম অপত্য পুরুষ। পাকতে সময় লাগে ১৪০ দিন। লম্বা মোটা ধান। ধানে গোটা চালের ভাগ ৫৯%, মোট চালের ভাগ ৭৪%। চালের অ্যামাইলোজ ২৪.৫%, অ্যালকালি স্প্রেডিং ভ্যালু ৫.২। ফলন হেক্টর পিছু ৬.২২ টন। গাছ আংশিক লম্বা। ১১৫ সে মি। পশ্চিমবঙ্গে চাষের সুপারিশ ভারতীয় কৃষি অনুসন্ধান পরিষেদর। পি এ সি – ৮৩৫ সত্ত্বাধিকারী অ্যাডভান্টা ইন্ডিয়া লিমিটেড (বর্তমানে ইউ পি এল)। জাতটি চষের জন্য ২০০৯ সালে কেন্দ্রীয় জাত অনুমোদন সংস্থার ছাড়পত্র পায়। বংশ পরিচয়ের কোড ৮৩৫ এ ও ৮৩৫ আর, এই দু’টি জাতের সংকরায়নে উদ্ভুত প্রথম অপত্য পুরুষ। ধান মাঝারি সরু। পাকতে লাগে ১২৫ – ১৩০ দিন। ধানে মোট চাল ৭২%, গোটা চাল ৫৯.০%. গাছ আংশিক লম্বা ১০৫ – ১১০ সে মি। ফলন ক্ষমতা হেক্টর পিছু ৫.৬ টন। পি এ সি – ৮৩৭ এই জাতটিরও সত্ত্বাধিকারী অ্যাডভান্টা ইন্ডিয়া লিমিটেড (বর্তমানে ইউ পি এল)। ২০০৯ সালে জাতটি ভারতে চাষের ছাড়পত্র পায়। ছাড়পত্র দেয় কেন্দ্রীয় জাত অনুমোদন সংস্থা। বংশপরিচয়ের কোড ৮৩৭ এ এবং ৮৩৭ আর, এই দু’টি জাতের সংকরায়নে জাত প্রথম অপত্য বংশ। পাকতে সময় লাগে ১৩০ দিন। ধান ছোট মোটা। ধানে মোট চালের ভাগ ৭১%, গোটা চাল ৫০%। চালের অ্যামাইলোজ ২৬%। ফলন হেক্টর পিছু ৬.০ টন। জাতটি ঝলসা সহনশীল। টুংরো ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত ধসা রোগেও মাঝারি সহনশীল। উত্পাদক বীজ ধানের দু’টি দূর সম্পর্কীয় জাতের যৌন জননে প্রজনিত প্রথম পুরুষটির নাম হাইব্রিড ধান। অন্য কথায়, হাইব্রিড ধানের দু’টি জাতের মধ্যে সংকরীকরণের ফলে উদ্ভুত প্রথম অপত্য বংশধর। দু’টি জাতের মধ্যে সফল সংকরীকরণ সম্পন্ন করতে গেলে একটি জাতের ফুলের পরাগ অন্য জাতের গর্ভমুণ্ডে নিক্ষেপ করে নিষেক নিশ্চিত করা দরকার। হাইব্রিড ধানবীজ এই দু’টি উত্পাদক বীজের সমন্বয়ে উত্পাদিত। একটি জাতের কাজ শুধু পরাগ প্রদান করা। অন্য জাতটি অর্পিত পরাগরেণু নিজ গর্ভমুণ্ডে ধারণ করে জন্ম দেয় হাইব্রিড ধানবীজ। স্ত্রী ধান ধানের একটি বিশেষ জাত যা কোষের অভ্যন্তরে বন্ধ্যা সাইটোপ্লাসমের উপস্থিতির জন্য কার্যকর পরাগ উত্পাদনে অক্ষম। বীজমাতা / এ-লাইন নামেও অভিহিত। শিষ ধানের খোলা থেকে সম্পূর্ণ নির্গত হয় না। পরাগদানি ফ্যাকাসে হলুদ/সাদা এবং কুঞ্চিত। গাছে ফুল ধরার স্থিতিকাল ৬ – ৮ দিন। গর্ভমুণ্ডের পরাগ গ্রাহীতা দীর্ঘস্থায়ী। পরাগদানি পরাগ বর্ষণে অক্ষম। স্ত্রী ধানের উপরোক্ত চরিত্র জাত নিরপেক্ষ। স্ত্রী ধান মাত্রেই ওই গুণগুলো থাকবে। কিন্তু একটি আদর্শ স্ত্রী ধানের নিন্মোক্ত অতিরিক্ত গুণ থাকে --- ১) অনুর্বর পরাগ উত্পাদনের স্থিতিশীল ক্ষমতা। অর্থাৎ পরিবেশের ভিন্নতায় অনুর্বর পরাগ উত্পাদনের শক্তি প্রভাবিত না হওয়া। ২) ধানের ভিন্ন জাতের বাতাসবাহিত পরাগরেণু ধরে নিষেক সম্পন্ন করে অধিক পরিমাণে বীজ উত্পাদন করা। ৩) ফুল ফোটার সময় গর্ভদণ্ড যেন লম্বা হয়ে গর্ভমুণ্ডকে ধানের খোসার মুখ খুলে বাইরে এনে উন্মুক্ত করে রাখে যাতে বাতাসে ভেসে ভিন জাতের পরাগরেণু সহজে ধরা পড়ে। ৪) গাছ রোগ-পোকা সহনশীল শক্ত সমর্থ হতে হবে। পুরুষ ধান বিশেষ বংশানুসমৃদ্ধ ব্যবহৃত জাত যা বন্ধ্যা সাইটোপ্লাসম সমন্বিত স্ত্রী ধানের গর্ভমুণ্ডে পরাগ বর্ষণ করে উর্বর বংশধর উত্পাদনে সক্ষম। পরাগ পিতা/পুনরুদ্ধারক পিতা/আর-লাইন নামেও অভিহিত। শিষ ধানের খোলা থেকে সম্পূর্ণ নির্গত হয়। পরাগদানি গাঢ় হলুদ এবং পরাগরেণু গোল গোল। পরাগদানি পরাগ বর্ষণে সক্ষম। গাছে ফুল ধরার স্থিতিকাল ৫ দিন। গর্ভমুন্ডের পরাগ গ্রাহীতা স্বল্পমেয়াদি। পুরুষ ধানের পূর্বোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলি জাত-নিরপেক্ষ সব ধরনের হাইব্রিড ধানের জন্য প্রযোজ্য সাধারণ চরিত্র। তবে এই সাধারণ গুণাবলি ছাড়াও আদর্শ পুরুষ ধানের নিম্নোক্ত অতিরিক্ত গুণ থাকা দরকার। আদর্শ পুরুষ ধানের প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত গুণ --- স্ত্রী ধানের গর্ভমুণ্ডে ঠিকমতো পরাগরেণু সরবরাহ করতে গেলে পুরুষ ধানকে স্ত্রী ধানের চেয়ে ২০ – ২৪ সেমি লম্বা হতে হবে। নিষেকের সময় পুরুষ ধানের কাঙ্খিত গুণাবলি উত্তর পুরুষকে উদার ভাবে দান করার ক্ষমতা থাকতে হবে। ধানের খোসার মুখ ফাঁক করে পরাগদানি ওপরের দিকে বেরিয়ে আসার সময় পরাগদানি ফেটে পরাগরেণু ওই ফুলেরই গর্ভমুণ্ডের ওপর ঝরে পড়ে। কিন্তু তার পরেও কিছু পরাগরেণু পরাগদানিতে থেকে যায়। আদর্শ পুরুষ ধানের পরাগদানি এই অবশিষ্ট রেণুর প্রাচুর্যে ভরা হতে হবে। রোগ পোকা সহনশীল হতে হবে। বীজবপন বিরামকাল হাইব্রিড ধানের বীজ উত্পাদনের সাফল্য বীজমাতা ও পরাগপিতার যুগপৎ ফুল ফোটার ওপর নির্ভরশীল। বীজমাতা ও পরাগপিতার জীবনকালের মেয়াদ ভিন্ন ভিন্ন। দু’টি ভিন্ন মেয়াদি জাতে এক সঙ্গে ফুল ফোটাতে গেলে বীজতলায় দু’টি জাতের বাড়ন্ত কালের পার্থক্য মাথায় রেখে আগুপিছু বীজ ফেলা একান্ত প্রয়োজনীয়। স্বভাবতই বীজবপনের আগে বীজমাতা ও পরাগপিতার বীজবপনের সঠিক বিরামকাল নিরূপণ জরুরি। বিরামকাল নিরূপণের তিনটি পদ্ধতির মধ্যে দু’টি পদ্ধতি সহজগ্রাহ্য। বিরামকাল নিরূপণ বিরামকাল দু’ ভাবে নিরূপণ করা যায়। প্রথমত, স্ত্রী ও পুরুষ ধানের বাড়বৃদ্ধির স্থিতিকালজনিত পার্থক্য নির্ধারণ করে। অর্থাৎ স্ত্রী ও পুরুষ ধানের বীজ অঙ্কুরিত হওয়ার পর ফুল আসতে কত দিন লাগে তা নথিভুক্ত করে। দ্বিতীয়ত, এই দুটি ধানের পত্রসংখ্যাজনিত পার্থক্য নির্ধারণ করে। অর্থাৎ স্ত্রী ও পুরুষ ধানে কত পাতায় ফুল ধরে তা নিরূপণ করে। বাড়বৃদ্ধির স্থিতিকালজনিত পার্থক্য নির্ধারণ উভয় মরশুমে কয়েক দফায় স্ত্রী ও পুরুষ ধানের বীজবপন। প্রতি দফার বীজতলা থেকে স্ত্রী ও পুরুষ ধানের সমবয়সি চারা রোপন। স্ত্রী ও পুরুষ ধানের প্রতি দফায় রোয়া চারার মূল কাণ্ডে ফুল আসার তারিখ নথিভুক্ত করা। উভয় ধানের মরশুমভিত্তিক অঙ্কুরোদ্গমের কাল থেকে ফুল ধরার গড় সময়কাল পৃথক ভাবে নির্ধারণ। স্ত্রী ও পুরুষ ধানে মরশুমভিত্তিক ফুল ধরার গড় সময়কালজনিত পার্থক্যই বীজবপনের মরশুমভিত্তিক বিরামকাল। উপরোক্ত পদ্ধতিতে নির্ধারিত বিরামকাল খরিফ মরশুমে বিশেষ ভাবে কার্যকর। ধানের চারার বাড়ন্ত কাল নিম্ন তাপমাত্রার প্রভাবে দীর্ঘায়িত হয়। দু’টি ভিন্ন জাতের ধানের চারার ওপর নিম্ন তাপমাত্রার প্রভাব প্রায়শই বিষম হয়। বোরো মরশুমে বীজবপনের সময়ের সঙ্গে নিম্নতাপের স্থায়িত্ব ও তীব্রতার বাৎসরিক তারতম্য বিদ্যমান। সুতরাং বোরো মরশুমে কোনও বিশেষ বৎসরে বিশেষ সময়ে বীজ বপন করে বিরামকাল নিরূপণ করে পরবর্তী বৎসরে এমনকী সেই বৎসরে আগুপিছু বীজ ফেললে কার্যকর না হওয়ার সম্ভাবনাই প্রবল। তাপমাত্রা ছাড়াও ধানের মাঠ পরিচর্যার বিধিব্যবস্থাও ধানের ফুল আসাকে প্রভাবিত করে। মাঠে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জল দাঁড়িয়ে গেলে বা মাটিতে রসের টান থাকলে আগুপিছু ফুল আসে। এই প্রথাজাতীয় অসুবিধা অবশ্য খরিফ বা রবি দুই মরশুমের জন্যই প্রযোজ্য। পত্রসংখ্যাজনিত পার্থক্য নির্ধারণ বিরামকাল নিরূপণের এই দ্বিতীয় পদ্ধতিটি অপেক্ষাকৃত সঠিক এবং ভিন্ন ভিন্ন মরশুম ও বত্সরে সমান ভাবে কার্যকর। ধানের ফুল ফোটার সঙ্গে পত্রসংখ্যার নিবিড় যোগসূত্র আছে। প্রতিটি জাতেই নির্দিষ্ট পত্রসংখ্যায় ফুল আসে। পত্রসংখ্যার সঙ্গে ফুল ফোটার এই বন্ধনটি অপরিবর্তনীয়। তাপমাত্রা, জল-হাওয়া বা উচ্চতা পত্রসংখ্যার সঙ্গে ফুল ফোটার সম্পর্ককে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত করতে পারে না। সুতরাং সঠিক বিরামকাল নিরূপণের জন্য পরাগপিতা ও বীজমাতার ফুল ফোটার জন্য প্রয়োজনীয় পত্রসংখ্যা নিরূপণ করা দরকার। স্ত্রী ও পুরুষ ধান বীজতলায় বপন। উভয় বীজতলায় এলোপাথাড়ি ১০ – ১৫টি চারা বেছে নিয়ে লেবেল লাগানো। লেবেল লাগানো চারাগুলির প্রথম পাতাটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হলে জলাভেদ্য রঙিন কালি দিয়ে চিহ্নিত করা। চারার মূল কাণ্ডের উপর পর পর গজিয়ে ওঠা পাতাগুলি একই ভাবে চিহ্নিত করা ও গোনা। লেবেল লাগানো চারাগুলি সঠিক বয়সে সঠিক ঘনত্বে রোয়া ও অনুরূপ ভাবে মূল কাণ্ডের পত্র সংখ্যা গোনা। পতাকা পাতা সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হওয়া পর্যন্ত পাতা গোনা চলবে। বীজ অঙ্কুরিত হওয়ার পর থেকে পতাকা পাতা উন্মুক্ত হওয়া পর্যন্ত সময়সীমায় উভয় জাতের মূল কাণ্ডের গড় পত্রসংখ্যা পৃথক ভাবে নির্ধারণ। ধরা যাক নির্ধারিত গড় পত্রসংখ্যা পরাগপিতার ক্ষেত্রে ১৮টি এবং বীজমাতার ক্ষেত্রে ১৬টি। সে ক্ষেত্রে দু’টি জাতের যুগপৎ ফুল ফোটানোর জন্য বীজবপনের বিরামকাল পরাগপিতার চারা বীজতলায় ২ পাতায় আসলে বীজমাতার অঙ্কুরিত বীজ বপন। পত্রসংখ্যা হিসাব পদ্ধতি পাতার চরিত্র হিসাব সম্পূর্ণ উন্মুক্ত পাতা ১.০ প্রায় মুক্ত পাতা ০.৮ অর্ধ মুক্ত পাতা ০.৫ সদ্য গজানো পাতা ০.২ এই প্রথা অনুসরণ করে যদি দেখা যায় পুরুষ ধানে ফুল আসছে ১৫ পাতায় আর স্ত্রী ধানে ১৮ পাতায় তা হলে বীজতলায় স্ত্রী ধানের চারায় ৩ পাতা আসলে পুরুষ ধানের বীজ বীজতলায় বাড়বে। এ ছাড়া পুঞ্জিভূত তাপমাত্রার পার্থক্য নির্ধারণ করেও স্ত্রী ও পুরুষ ধানের বোনার সময় নিরূপণ করা যেতে পারে। চিন দেশের বিজ্ঞানীরা এই তৃতীয় পদ্ধতিটিকে অধিক গুরুত্ব দিলেও ভারতবর্ষে এই পদ্ধতি এখনও গ্রহণযোগ্য হয়নি। অনুক্রমিক বীজবপন পরাগপিতা -- ৩ – ৫ দিন অন্তর ২/৩ বারে বীজ মাতা – একবারে বীজবপন বীজমাতা ও পরাগপিতার মধ্যে বাড়ন্তকালের পার্থক্য যত দিনের পরাগপিতার ২য় দফা (বীজ ৩ বারে বপন করলে) অথবা ১ম দফার (বীজ ২ বারে বপন করলে) বীজ বোনা থেকে বীজমাতার বীজ বোনার পার্থক্য হবে ঠিক তত দিনের। (১) বীজমাতার বাড়ন্তকাল কম হলে পরাগপিতার ২য় /১ম দফার বীজ বীজমাতার আগে পড়বে। (২) অনুরূপ ভাবে পরাগপিতার বাড়ন্তকাল কম হলে পরাগপিতার ২য়/১ম দফার বীজ বীজমাতার পরে পড়বে। (৩) উভয়ের বাড়ন্ত কাল সমান হলে বীজমাতার বীজ পরাগপিতার ২য়/১ম দফার সঙ্গেই বাড়বে। পরাগপিতার বীজ ৩ বারে বপন করলে প্রথম দফার বীজ ২য় দফার ৩-৫ দিন আগে এবং তৃতীয় দফার বীজ ২য় দফার ৩ – ৫ দিন পরে বুনতে হবে। পরাগপিতার বীজ ২ বারে বপন করলে ২য় দফার বীজ প্রথম দফার ৩ – ৫ দিন পরে পড়বে। পরাগপিতা ও বীজমাতার বীজবপনের জন্য পৃথক বীজতলা তৈরি করতে হবে। এমনকী পরাগপিতার ভিন্ন ভিন্ন খেপের বীজ পৃথক বীজতলায় পড়বে। প্রতি একর জমি হাইব্রিড ধানের বীজ উত্পাদনের আওতায় আনতে গেলে বীজমাতার ৬ কেজি ও পরাগপিতার ৪ কেজি বীজ বীজতলায় বোনা দরকার। বীজতলায় প্রতি কেজি বীজের জন্য ২০ বর্গমিটার বীজতলা তৈরি করতে হবে। বীজতলার অন্যান্য পরিচর্যা উচ্চ ফলনশল (উফশী) ধানের মতো। উদাহরণ ক) পরাগপিতার বাড়ন্তকাল বীজমাতার বাড়ন্তকাল অপেক্ষা ৭ দিন বেশি। ১. পরাগপিতার বীজ ৩ খেপে বুনলে বীজ বোনার অনুক্রম শুরু হবে প্রথম দিনে পরাগপিতার বীজ বুনে (মোট বীজের ১/৩ অংশ। প্রথম দফার বীজ বোনার ৩ – ৫ দিন পরে পড়বে পরাগপিতার ২য় দফার বীজ (মোট বীজের ১/৩ অংশ)। দ্বিতীয় দফার ৩ – ৫ দিন পর ৩য় দফায় পড়বে পরাগপিতার বাকি বীজ। পরাগপিতার ২য় দফার বীজ বোনার ৭ দিন পর বীজমাতার বীজ পড়বে। ১ ২ ৩ ৪ ৫ ৬ ৭ ৮ ৯ ১০ ১১ ১২ ১৩ ১৪ ১৫ * * * * পরাগ পিতার ১ম দফার বীজবপন পরাগ পিতার ২য় দফার বীজ বপন পরাগ পিতার ৩য় দফার বীজ বপন বীজ মাতার বীজ বপন ২. পরাগপিতার বীজ ২ খেপে বুনলে বীজ বোনার অনুক্রম শুরু হবে প্রথম দিনে পরাগপিতার বীজ ফেলে (মোট বীজের ১/২ অংশ) পরাগপিতার বাকি বীজ পড়বে ১ম দফার ৩ – ৫ দিন পর। পরাগপিতার ১ম দফার বীজ বোনার ৭ দিন পর পড়বে বীজমাতার বীজ। ১ ২ ৩ ৪ ৫ ৬ ৭ ৮ ৯ ১০ ১১ ১২ ১৩ ১৪ * * * * পরাগ পিতার ১ম দফার বীজ বপন পরাগ পিতার ২য় দফার বীজ বপন বীজ মাতার বীজ বপন খ) বীজমাতার বাড়ন্তকাল পরাগপিতার বাড়ন্তকাল অপেক্ষা ১০ দিন বেশি। ১. পরাগপিতার বীজ ৩ খেপে বুনলে বীজ বোনার অনুক্রম শুরু হবে প্রথম দিনে বীজমাতার বীজ ফেলে। বীজমাতার বীজ বোনার ১০ দিন পর পড়বে পরাগপিতার ২য় দফার বীজ। পরাগপিতার প্রথম দফার বীজ পড়বে ২য় দফার ৩ – ৫ দিন আগে এবং তৃতীয় দফার বীজ পড়বে ২য় দফার ৩-৫ দিন পরে। ১ ২ ৩ ৪ ৫ ৬ ৭ ৮ ৯ ১০ ১১ ১২ ১৩ ১৪ ১৫ * * * * বীজ মাতার বীজ বপন পরাগ পিতার ১ম দফার বীজ বপন পরাগ পিতার ২য় দফার বীজ বপন পরাগ পিতার ৩য় দফার বীজ বপন ২. পরাগপিতার বীজ ২ খেপে বুনলে। বীজ বোনার অনুক্রম শুরু হবে প্রথম দিনে বীজমাতার বীজ বুনে। বীজমাতার বীজ বোনার ১০ দিন পর পড়বে পরাগপিতার প্রথম দফার বীজ। পরাগপিতার ১ম দফার বীজ বোনার ৩ – ৫ দিন পর পড়বে ২য় দফার বীজ। ১ ৫ ১১ ১৫ * * * বীজ মাতার বীজ বপন পরাগ পিতার ১ ম দফার বীজ বপন পরাগ পিতার ২য় দফার বীজ বপন চারারোপণ অন্তরণ দূরত্ব বীজের বিশুদ্ধতা বজায় রাখার জন্য হাইব্রিড ধানের বীজ উত্পাদনের ক্ষেত ধানের মাঠ থেকে যথেষ্ট দূরে থাকা দরকার। ধানের পরাগরেণু খুব ছোট ওবং হালকা। জীবনকালের স্থায়িত্ব মাত্র ৩ – ৫ মিনিট। কিন্তু এই স্বল্প জীবনকালের মধ্যেই পরাগরেণুগুলি বাতাসের ডানায় চেপে ১০০ মিটার পথ পাড়ি দিতে পারে। তাই অন্য ধানের মাঠ থেকে হাইব্রিড ধানের বীজ উত্পাদনের মাঠের অন্তরণ কম হলে অবাঞ্ছিত পরাগের প্রকোপে বীজমাতা দূষিত হয়ে পড়বে। আর দূষিত বীজমাতার গর্ভে উত্পাদিত হবে অশুদ্ধ/ভেজাল হাইব্রিড বীজ। হাইব্রিড ধানের বীজ উত্পাদনের মাঠ থেকে অন্য ধানের মাঠের সঠিক ব্যবধান তিন ভাগে বজায় রাখা যায়। ক : স্থান পরাগপিতা ব্যতীত অন্য কোনও ধান হাইব্রিড ধানের বীজ উৎপাদনক্ষেত্রের ১০০ মিটার চৌহদ্দির মধ্যে চাষ করা চলবে না। অন্য ধানের মাঠ থেকে হাইব্রিড ধানের বীজ উৎপাদনমাঠের এই অন্তরণ দূরত্ব কমিয়ে ৫০ মিটার করা চলবে যদি শেষোক্ত ধানের মাঠের চতুর্দিকে ২০ মিটার প্রশস্ত পরাগপিতার বেষ্টনী থাকে। খ : কাল হাইব্রিড ধানের বীজ উৎপাদন খামারের ১০০ মিটার চৌহদ্দির মধ্যে রোয়া অন্য ধানের ফুল বীজমাতার ২০ দিন আগে অথবা পরে আনতে হবে। খরিফ খন্দে আলোকসংবেদনশী জাত নির্বাচন করে অথবা আগু-পিছু বীজ ফেলে ফুল ফোটার এই ব্যবধান সন্তোষজনক ভাবে বজায় রেখে গেলও বোরো মরসুমে এই পরিকল্পনা কাজে আসে না। গ : প্রতিবন্ধক হাইব্রিড ধানের বীজ উৎপাদনের মাঠ ও অন্য ধানের মাঠের মধ্যে ২.৫ মিটার উঁচু কোনও প্রাকৃতিক কৃত্রিম প্রতিবন্ধক থাকলে অবাঞ্ছিত পরাগ উড়ে এসে বীজমাতাকে কলুষিত করতে পারে না। হাইব্রিড ধানের বীজ উৎপাদন খামারের চার পাশে ৫ মিটার চওড়া করে ভুট্টা, ধনচে, জোয়ার, বাজরা ইত্যাদি চাষ করলে বীজমাতার কলুষিত হওয়ার ভয় থাকে না। রোপন পরিকল্পনা বীজ উৎপাদন ক্ষেতে ধানের সারি ফুল ফোটার সময় হাওয়া যে দিকে চলবে তার উল্টো দিকে অর্থাৎ হাওয়ার গতিপথের সঙ্গে সমকোণে সারি রোয়া করতে হবে। পর্যায়ক্রমে রোয়া সারিতে ধানের গুছিগুলি এমন ভাবে প্রতিস্থাপন করতে হবে যাতে সামনের সারির গুছি পিছনের সারি গুছির পরাগ দেওয়া-নেওয়ায় বাধা সৃষ্টি না করে। চারার এ জাতীয় বিন্যাসের জন্য পাশাপাশি সারির গুছিগুলি ক্রসাকারে রোপণ বাঞ্ছনীয়। চারার বয়স খরিফ মরশুমে ২১ – ২৫ দিনের চারা এবং বোরো মরশুমে ৪৫ – ৫০ দিনের চারা রোয়া করলে সঠিক সময় ফুল আসে। চারার বয়স কম-বেশি হলে আগু-পিছু ফুল ধরবে। খরিফ মরশুমে চারার বয়স ২১ দিনের ওপর প্রতি ২ দিন বেশি হলে ফুল আসতে ১ দিন বেশি সময় লাগবে। ২১ দিনের কমবয়সি চারাতে সমানুপাতে আগে ফুল ধরবে। প্রতি খেপে পরাগপিতা এবং বীজমাতার সমবয়সি চারা রোয়া করা প্রয়োজন। রোয়ার সময় পরাগপিতার চারার বয়স অনুমোদিত বয়স অপেক্ষা বেশি হয়ে গেলে বীজমাতার চারার বয়স সমানুপাতে বাড়িয়ে নিয়ে রোয়া করতে হবে। পরাগপিতার বীজ বীজতলায় যত দিন অন্তর যত বার পড়বে মূল জমিতে ঠিক তত দিন অন্তর তত বার রোয়া করতে হবে। রোপণের নকশা বীজতলায় অনুক্রমিক বপন অনুযায়ী মূল জমিতে পরাগপিতা ও বীজমাতার চারা এমন পর্যায়ে রোপণ করা প্রয়োজন যাতে রোপণকালে ভিন্ন ভিন্ন খেপে বোনা উভয় ধানের চারার বয়স সমান থাকে এবং মাঠের সর্বত্র পরাগপিতা ও বীজমাতার সারি সমানুপাতে বিন্যস্ত থাকে। পরাগপিতা ও বীজমাতার সারির সঠিক অনুপাত মাটি, জল পরিচর্যা, জাত ইত্যাদি ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। বর্তমানে প্রচলিত হাইব্রিড ধানগুলির জন্য আমাদের দেশে প্রতি ২ সারি পরাগপিতা অন্তর ৮ সারি বীজমাতা রোপন সর্বাধিক প্রচলিত ও কার্যকর হিসাবে বিবেচিত। ক : পরাগপিতার চারা রোপণ প্রতি গুছিতে দু’টি চারা রোপণ পর্যায়ের প্রথম দিনে প্রথম খেপে বোনা বীজতলা থেকে চারা তুলে ১৫ সেমি ফাঁকবিশিষ্ট সারিতে ৪৫ সেমি অন্তর গুছি বসাতে হবে। পরাগপিতার বীজ ২ খেপে বুনলে গুছি ৩০ সেমি অন্তর লাগাতে হবে। প্রথম খেপের চারা রোয়ার ৩ দিন ( তিন দিন অন্তর বীজ বুনলে) অথবা ৫ দিন (পাঁচ দিন অন্তর বীজ বুনলে) পর ২য় খেপের বীজতলা থেকে চারা তুলে পরাগপিতার সারিতে প্রথম দিনের রোয়া গুছি থেকে ১৫ সেমি দূরে দূরে লাগানো। পরাগপিতার বীজ ৩ খেপে বুনলে দ্বিতীয় বারের রোয়ার ৩ দিন (তিন দিন অন্তর বীজ বুনলে) অথবা ৫ দিন (পাঁচ দিন অন্তর বীজ বুনলে) পর তৃতীয় খেপের বীজতলা থেকে চারা তুলে পরাগপিতার সারিতে ২য় বারের রোয়া গুছি থেকে ১৫ সেমি দূরে দূরে বসাতে হবে। পরাগপিতার দু’টি জোড়া সারির মাঝে বীজমাতার চারা রোপণের জন্য ১৬৫ সেমি ফাঁক রাখতে হবে। খ : বীজমাতার চারা রোপণ পরাগপিতার দু’টি জোড়া সারির মধ্যবর্তী ১৬৫ সেমি জমিতে ৮ সারি বীজমাতা রোয়া হবে। পরাগপিতার বীজ তিন খেপে পড়লে দ্বিতীয় খেপের বীজ বোনা থেকে বীজমাতার বীজ যত দিন পর বীজতলায় পড়েছে মূল জমিতেও বীজমাতার চারা পরাগপিতার দ্বিতীয় বারের রোয়ার ঠিক তত দিন পর রোয়া হবে। পরাগপিতার বীজ দু’ খেপে পড়লে প্রথম খেপের বীজ বোনা থেকে বীজমাতার বীজ বীজতলায় যত দিন পর পড়েছে মূল জমিতেও বীজমাতার চারা পরাগপিতার ১ম বারের রোয়ার ঠিক তত দিন পর রোয়া হবে। নিকটবর্তী পরাগপিতার সারি থেকে বীজমাতার প্রথম সারিটি ৩০ সেমি তফাত থাকবে। বীজমাতা রোয়ার ক্ষেত্রে সারি থেকে সারি এবং প্রতি সারিতে গুছি থেকে গুছি ১৫ সেমি দূরত্বে থাকবে। সারির উপরোক্ত অনুপাত, সারি থেকে সারি অথবা সারিতে গুছির বর্ণিত দূরত্ব পরিবেশ ভেদে পাল্টানো যেতে পারে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যাতে করে মাঠে বীজমাতার প্রতি ৩টি শিষের জন্য পরাগপিতার একটি শিষ পাওয়া যায়। বাতাসের গতি পথ রোপণ নকশা : পরাগপিতার বীজ ২ খেপে বুনলে পরিচর্যা গুছিপূরণ রোয়ার পর থেকে চারা ধরে যাওয়া পর্যন্ত ৪ – ৫ দিন জমির মাটি সংপৃক্ত রাখা। এর পর জল অল্প বাড়িয়ে জমিতে ১ – ২ ইঞ্চি জল রাখতে হবে। রোয়ার ৭ দিনের মধ্যে মরে / উঠে যাওয়া চারার শূন্য স্থানে সমবয়সি নতুন চারা রোয়া। আগাছা দমন আগাছা সম্পূর্ণ ভাবে নির্মূল করা। স্ত্রী ধান রোয়ার পর থেকে ১২ – ১৫ দিন অন্তর দু’বার হাত দিয়ে মাটি ঘেঁটে আগাছা তুলে দিতে হবে। নিড়ান যন্ত্রের সাহায্যেও কাজটি করা যেতে পারে। স্ত্রী ধান রোয়ার ৭ দিনের মধ্যে বুটাক্লোর জাতীয় আগাছানাশক (১২ কেজি /একর) ব্যবহার করে মাঠে ৬ – ৭ দিন জল দাঁড় করিয়ে রাখলে শস্যের জীবনকালব্যাপী আগাছার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রিত থাকে। শস্যরক্ষা রোগ পোকা নিয়ন্ত্রণে উফশী ধানের সুপারিশ সঠিক ভাবে মেনে চলা। মাজরা পোকা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ যত্নবান হতে হবে। পাশকাঠি ছাড়ার সময় লক্ষ রাখতে হবে ধানের শতকরা ১০টি চারার মাঝের পাতা গোল হয়ে শুকিয়ে উঠছে কি না অথবা কাছ থোড় আসার সময় বর্গমিটার পিছু মাজরা পোকার একটি মথ দেখা যাচ্ছে কি না। এ জাতীয় পরিস্থিতির উদ্ভব হলে একর পিছু ৪ কেজি ফোরেট ১০ জি অথবা ৮ কেজি কুইনালফস ৫ জি অথবা ১২ কেজি কার্বোফিউরান ৩ জি ছিটোতে হবে। ওষুধ ছিটিয়ে জমিতে ৫ – ৬ দিন জল দাঁড় করিয়ে রাখতে হবে। সার প্রয়োগ খরিফ খন্দে একর পিছু ২৪ কেজি নাইট্রোজেন, ১২ কেজি ফসফেট ও ১২ কেজি পটাশ এবং বোরো মরশুমে একর পিছু ৪০ কেজি নাইট্রোজেন, ২০ কেজি ফসফেট ও ২০ কেজি পটাশ ব্যবহার করতে হবে। ডি এ পি জাতীয় যৌগিক সারের মাধ্যমে উপরোক্ত খাদ্যপ্রাণগুলি সরবরাহ না করে একক সার ব্যবহার বাঞ্ছনীয়। কেন না নাইট্রোজেন সার ফসফেট এবং পটাশ সার ব্যবহারের পর পৃথক ভাবে ছিটোনো হবে। ফসফেট ও পটাশ সারের সবটাই জমি তৈরির সময় মূল সার হিসাবে প্রদেয়। নাইট্রোজেন সার ব্যবহার হবে তিন বারে — প্রথম বার : পরাগপিতার বীজ তিন খেপে বুনলে ২য় খেপের চারা রোয়ার ৬ – ৭ দিনের মাথায় পুরুষ ধানের সারির মাঝে খরিফ খন্দে একর পিছু ২ কেজি নাইট্রোজেন অর্থাৎ ৪.৪ কেজি ইউরিয়া এবং বোরো মরশুমে একর পিছু ৩.২ কেজি নাইট্রোজেন অর্থাৎ ৭ কেজি ইউরিয়া ছিটোতে হবে। পরাগপিতার বীজ ২ খেপে বুনলে ১ম খেপের চারা রোয়ার ৬-৭ দিনের মাথায় মরশুমভিত্তিক নির্ধারিত হারে নাইট্রোজেন সার পুরুষ ধানের সারির মাঝে ছিটোতে হবে। দ্বিতীয় বার : স্ত্রী ধান রোয়ার ৬ – ৭ দিনের মাথায় স্ত্রী ধানের সারির মাঝে খরিফ খন্দে একর পিছু ৮ কেজি নাইট্রোজেন অর্থাৎ ১৭.৬ কেজি ইউরিয়া এবং বোরো মরশুমে একর পিছু ১২.৮ কেজি নাইট্রোজেন অর্থাৎ ২৮.২ কেজি ইউরিয়া ছিটোতে হবে। তৃতীয় বার : স্ত্রী ধানের সারিতে সার ছেটানোর ১৫ – ২০ দিনের মাথায় সমস্ত জমিতে খরিফ খন্দে একর পিছু ১৪ কেজি নাইট্রোজেন (৩০.৮ কেজি ইউরিয়া) এবং বোরো মরশুমে একর পিছু ২৪ কেজি নাইট্রোজেন (৫২.৮ কেজি ইউরিয়া) সমান ভাবে ছিটোতে হবে। বীজ উৎপাদনের বিশেষ প্রযুক্তি পতাকা পাতা কর্তন ধান গাছে পতাকা পাতার একটি বিশেষ ভূমিকা আছে যা অন্যান্য পাতার চেয়ে ভিন্ন। পতকা পাতা সংশ্লেষিত শর্করা ও তৎসহ অন্য পদার্থ পরিবহন করে। দুধে দানাকে পরিপুষ্ট দানায় রূপান্তরিত করার মূল ভূমিকা এই পতাকা পাতার। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে পতাকা পাতা যখন দানা উৎপাদনের সঙ্গে এমন গভীর ভাবে যুক্ত, তখন এটা কেটে ফেলার কথা কেন বলা হচ্ছে ? দু’টো কারণে এই পাতা কাটার সুপারিশ করা হয়। প্রথমত, ধানের শিষে ফুল ফোটার সময় পতাকা পাতার উপস্থিতি, হাওয়ার মাধ্যমে পরাগরেণু চলাচলে বিঘ্ন ঘটায়। দ্বিতীয়ত, পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা গেছে পতাকা পাতার আংশিক ছেদনে তার নীচের পাতাগুলির সংশ্লেষিত শর্করা সহ অন্যান্য খাদ্য পরিবহনের ক্ষমতা বেড়ে যায়। ফলে দানার পুষ্টি ও মোট উৎপাদন ব্যাহত হয় না। আর পাতার সবটুকু অংশ তো কাটার কথা বলা হয় না। আংশিক মাত্র। কখন কতটা কাটতে হবে পতাকা পাতার ডগা থেকে ১/২ — ২/৩ অংশ কেটে ফেলতে হবে যখন গাছে থোড় আসতে আরম্ভ হয়। পরবর্তী লক্ষণীয় বিষয় পাতা কাটার ফলে গাছের যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়, সেখান দিয়ে নানান রোগ জীবাণুর সংক্রমণ হতে পারে। এই কারণে পাতা কাটার পর ফসলে ম্যাঙ্কোজেব বা কার্বান্ডাজিম প্রয়োগ করতে হবে। বিশেষ লক্ষণীয় বিষয় ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতা ধসা (বি এল বি) বা পাতায় ছোপ ধরা (বি এস এল) অথবা ছত্রাকঘটিত খোলা ধসা (এস এইচ বি) রোগে আক্রান্ত ফসলে পতাকা পাতা কাটা চলবে না। জিব্বারেলিক অ্যাসিডের ব্যবহার সংকর ধান বীজ উৎপাদনে বিভিন্ন উন্নত প্রযুক্তির মধ্যে সময়মতো জিব্বারেলিক অ্যাসিডের প্রয়োগ একটি অন্যতম প্রযুক্তি। জিব্বারেলিক অ্যাসিড একটি রাসায়নিক যৌগ যা জিব্বারেলা ফুজিকুরোই নামে একটি ছত্রাক থেকে উদ্ভুত। দেখা গেছে এই যৌগের প্রয়োগে গাছের বিভিন্ন উপকার সাধিত হয়। সাধারণ ভাবে এই যৌগটি জি এ – ৩ নামে পরিচিত। কখন ? ১) বীজ উৎপাদন কারী স্ত্রী ধানের সারিতে এই রাসায়নিক যৌগটি দু’বার প্রয়োগ করতে হয়। প্রথম বার : যখন বীজ উৎপাদক স্ত্রী ধানের শতকরা ৫ – ১০টি গুছির মূলকাটিতে শিষের প্রকাশ দেখা যাবে। দ্বিতীয় বার : এর এক দিন পর। ২ ) যৌগটি অর্থাৎ জি এ - ৩ বিকেলে প্রয়োগ করা বাঞ্ছনীয়। উজ্জ্বল সূর্যালোক আছে এমন দিন বেছে নিতে হবে। ৩ ) জোর হাওয়া থাকলে জি এ – ৩ প্রয়োগ করা চলবে না। অল্প হাওয়া সমন্বিত দিনই সব চেয়ে বেশি উপযুক্ত। ৪ ) আগামী ২৪ – ৩০ ঘণ্টার মধ্যে বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকলে জি এ – ৩ প্রয়োগ নিরথর্ক হবে। কেন ? ১ ) যাতে বীজ উৎপাদক গাছগুলিতে শিষের পূর্ণ নির্গমন হয়। এ লাইন-এর গাছে শিষ নির্গমনের কিছু অসুবিধা আছে। ২) এই যৌগ প্রয়োগে স্ত্রী কেশরের বহিঃপ্রকাশ সম্পূর্ণ হয়। ৩) যাতে পাশাপাশি বেড়ে ওঠা সব গাছেরই বৃদ্ধির মধ্যে একটা সমতা থাকে। সমহারে বর্ধিত গাছে পরাগ সংযোগে বাধার সৃষ্টি হয় না। ৪) জি এ ৩ প্রয়োগে ছোট মাপের পাশকাঠিগুলির দ্রুত বৃদ্ধি হয় ও প্রথম থেকেই বড় মাপের পাশকাঠিগুলোর সমতুল্য হয়। কী ভাবে ? বাজারে জি এ - ৩ চুর্ণ হিসাবে পাওয়া যায়। সাধারণত দু’ রকম চুর্ণ পাওয়া যায়। এক রকমের যাতে শতকরা ১০০ ভাগ ও অন্য রকমের যাতে শতকরা ৯০ ভাগ জি এ - ৩ থাকে। এর ওপরই কতটা দ্রবণ ব্যবহার করতে হবে তা নির্ভরশীল। দ্রবণে জি এ - ৩ কতটা থাকবে তা প্রতি দশ লক্ষ ভাগে রাসায়নিকটি কতটা থাকবে অর্থাৎ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) হিসাবে প্রকাশ করা হয়। মোটামুটি এক একর জমিতে সাধারণ স্প্রেয়ারের সাহায্যে প্রয়োগের জন্য ২০০ লিটার জল লাগবে, আর আল্ট্রা লো ভল্যুম (ইউ এল ভি) স্প্রেয়ারের সাহায্যে প্রয়োগের জন্য ৮০ লিটার জল লাগবে। ১ ) জি এ - ৩ চুর্ণ জলে গোলা যায় না। তাই প্রথমে সামান্য অ্যালকোহলে যতটা জি এ - ৩ লাগবে ততটা গুলে নিয়ে পরিমাণমতো জল মেশাতে হবে। ২ ) দ্রবণে খানিকটা কাপড় কাচার গুঁড়ো সাবান বা তরল সাবান মিশিয়ে নিলে যৌগটি পাতায় ভালো ভাবে লেগে থাকবে। ৩ ) কতটা জি এ - ৩ জলে গুলতে হবে তা নির্ভর করবে কোন স্প্রেয়ার ব্যবহার করা হচ্ছে, যৌগটি প্রথম বার না দ্বিতীয় বার প্রয়োগ করা হচ্ছে তার ওপর। জি এ ৩ প্রয়োগের মাত্রা প্রতি দশ লক্ষ ভাগে সাধারণ স্প্রেয়ার আল্ট্রা লো ভল্যুম স্প্রেয়ার প্রথমবার ৬০ ৫০০ দ্বিতীয়বার ৩০ ২৫০ আরও বিশদ ব্যাখার জন্য পরের সারণিতে প্রকৃতপক্ষে কতটা জি এ ৩ লাগবে তার নির্দেশ দেওয়া হল। জমির এলাকা (বর্গমি) জলের পরিমাণ (লিটার) জি এ – ৩-এর পরিমাণ (গ্রাম) ১০ লক্ষে ৬০ ভাগ ১০ লক্ষে ৩০ ভাগ ১০০% ৯০% ১০০% ৯০% সাধারণ স্প্রেয়ার ১০০০ (২৫ শতক) ৫০ ৩.০ ৩.৩ ১.৫ ১.৭ ৪০০০ (এক একর) ২০০ ১২.০ ১৩.২ ৬.০ ৬.৮ ১০০০০ ( এক হেক্টর) ৫০০ ৩০.০ ৩৩.০ ১৫.০ ১৭.০ আল্ট্রা লো ভল্যুম স্প্রেয়ার (ইউ এল ভি) ১০০০ (২৫ শতক) ২ ১.০ ১.১ ০.৫ ০.৬ ৪০০০ (এক একর) ৮ ৪.০ ৪.০ ২.০ ২.৪ ১০০০০( এক হেক্টর) ২০ ১১.০ ১১.০ ৫.০ ৬.০ সম্পূরক পরাগ সংযোজন স্বাভাবিক ভাবে ধানে হাওয়ার মাধ্যমেই পরাগরেণু সংযোজিত হয়। হাইব্রিড ধান বীজ উৎপাদনে শুধু মাত্র হাওয়ার ওপর নির্ভরশীল না থেকে কৃত্রিম উপায়ে সম্পূরক পরাগ সংযোজনের ব্যবস্থা নিলে ফল ভালো পাওয়া যায়। উদ্দেশ্য পরাগথলি ফেটে অধিক পরিমাণে পরাগরেণু যাতে স্ত্রী কেশরের চারি পাশের বাতাসে ভেসে বেড়িয়ে বন্ধ্যা পরাগ সমন্বিত স্ত্রী ধানের গর্ভদান নিশ্চিত করতে পারে। সম্পূরক পরাগ সংযোজন দু’ ভাবে ঘটানো যেতে পারে : ১ ) একটা নরম দড়ি পরাগ সরবরাহকারী আর লাইন/ পরাগপিতার সারির ওপর দিয়ে টেনে নিলে থলি ফেটে রাশি রাশি পরাগরেণু সহজেই বাতাসে ছড়িয়ে পড়বে। ২ ) লম্বা কাঠি দিয়ে যদি পরাগপিতার গাছগুলোকে নাড়া অর্থাৎ ঝাঁকি দেওয়া যায় তা হলেও পরাগরেণু চতুর্দ্দিকে ছড়িয়ে পড়বে। পরাগরেণু সরবরাহকারী দু’ সারি পুরুষ ধানের মাঝে দু’ হাতে দু’টো কাঠি নিয়ে ধীর পায়ে চলতে চলতে ডাউনে বাঁয়ে সারির গাছগুলো কাঠি দিয়ে ঝাঁকিয়ে দিতে হবে। কয়েকটি লক্ষণীয় বিষয় : ১ ) দড়ি টানা বা কাঠি দিয়ে গাছ ঝাঁকানোর কাজ এমন দিনে করতে হবে যে দিন জোরে হাওয়া বইবে না। হালকা হাওয়া থাকবে। ২ ) কাজটা অবশ্যই সকালে করতে হবে, কেন না ওই সময় এ লাইন অর্থাৎ বীজমাতার গাছে ফুল ফোটার সময়। পরাগরেণু সরবরাহকারী গাছেরও (আর লাইন) সকালবেলা ফুল ফোটার সময়। ৩) দড়ি টানা বা গাছ ঝাঁকানোর আগে দেখে নিতে হবে বীজমাতা ও পরাগপিতার গাছে ফুল ফোটা শুরু হয়েছে কি না। অনেক সময়ই বিভিন্ন কারণে ফুল ফুটতে দেরি হয়, যেমন সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা থাকলে। পরাগপিতা ও বীজমাতার ফুল এক সঙ্গে না ফুটলে সম্পূরক পরাগ সংযোজনের জন্য উভয় জাতের ফুল ফোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করা দরকার। অর্থাৎ বীজ উৎপাদন খামারে দু’টি জাতের ফুল এক সঙ্গে ফোটা শুরু হওয়া মাত্র দড়ি টানা অথবা গাছ ঝাঁকানোর কাজ আরম্ভ হবে। ৪) যদি ৩০ মিনিট ব্যবধানে দড়ি টানা বা গাছ ঝাঁকানোর কাজ বার কয়েক করা হয় তবে পরাগ সংযোজন সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া যায়। ৫) যদি দেখা যায় যে এ লাইন অর্থাৎ বীজমাতার ফুল ফুটে আবার বন্ধ হয়ে গেছে, তা হলেও দড়ি টানা বা গাছ ঝাঁকানোর কাজ চালিয়ে যাওয়া যেতে হতে পারে। কেন না এ লাইন-এর ফুল বন্ধ হলেও অনেক ক্ষেত্রেই স্ত্রী কেশর বাইরে বেরিয়ে থাকে। ফলে পরাগ সংযোজন হতে কোনও বাধা থাকে না। ৬) পরাগ সংযোজনের কাজ পুরুষ ধানের পরাগদানিতে যতক্ষণ পাওয়া যাবে ততক্ষণ চালানো যেতে পারে। অবাঞ্ছিত গাছের অপসারণ ধানের জমিতে অবাঞ্ছিত গাছ মানে শুধু আগাছাই নয়। এ লাইন (স্ত্রী ধান) বা আর লাইন (পুরুষ ধান)-এর সারিতে যে সব গাছ সঠিক প্রকৃতির নয় সে সবই অপসারণ করতে হবে। অবাঞ্ছিত গাছের প্রকাশ, বিশেষ ভাবে স্ত্রী ধানের সারিতে বেশি দেখা যেতে পারে। পুরুষ ধানের সারিতেও অবশ্য মিশেল গাছ পাওয়া যেতে পারে। গাছের জীবনকালের তিন অবস্থায় অবাঞ্ছিত গাছ অপসারণের কাজ করতে হবে। যথা : যখন পাশকাঠির সংখ্যা সর্বাধিক সারির বাইরের সব গাছ তুলে ফেলতে হবে। আর লাইন পুরুষ ধানের সারিতে যে সব গাছ সাধারণ দৃষ্টিতে ওই সারির অধিকাংশ গাছের চেয়ে লম্বা বা খাটো বা একই উচ্চতার হয়েও পাতার রঙ বা আকার ভিন্ন, সে সব গাছ তুলে ফেলতে হবে। এ লাইন স্ত্রী ধানের সারিতে থেকেও অনুরূপ ভাবে অবাঞ্ছিত গাছ তুলতে হবে। যখন শিষের নির্গমন হচ্ছে পরাগপিতার / বীজমাতার সারিতে যে সব গাছ একই সারির অধিকাংশ গাছের তুলনায় বেশি তাড়াতাড়ি বা বেশি দেরিতে শিষ বের হচ্ছে সেগুলো তুলে ফেলতে হবে। যে সব বীজমাতার গাছের ফুলের পরাগথলি পুষ্ট, হলুদ রঙের ও পরাগরেণু সমন্বিত সেগুলোও তুলে ফেলতে হবে। বীজমাতার যে সব গাছের শিষ পরাগপিতার গাছের মতো খোলা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসবে সেগুলোও অপসারণ করতে হবে। বলাই বাহুল্য রোগগ্রস্ত গাছ তুলে ফেলতে হবে। ফসল কাটার আগে বীজমাতার যে সব গাছে স্বাভাবিক সংখ্যায় দানা ধরবে (৫০ শতাংশের অধিক) যে সব গাছ তুলে ফেলতে হবে। বীজমাতার সারিতে সেই সব গাছ যাতে দানার রঙ, আকার, গঠন ইত্যাদি সারির অন্যান্য গাছ অপেক্ষা ভিন্ন সে সবই মূল ফসল থেকে বাদ দিতে হবে। প্রথম দু’ দফায় অবাঞ্ছিত গাছ গোড়া শুদ্ধ তুলে পা দিয়ে কাদায় চেপে দিতে হবে। ফসল কাটার সময় অবাঞ্ছিত গাছ গোড়া থেকে তুলে আলাদা করে বীজ উৎপাদন ক্ষেতের বাইরে জড়ো করে রাখতে হবে / ফেলে দিতে হবে। স্ত্রী ও পুরুষ ধানের যুগপৎ প্রস্ফুটন শিষের বাড়বৃদ্ধি হাইব্রিড ধানের আদর্শ বীজ উৎপাদন মূলত স্ত্রী ও পুরুষ ধানের যুগপৎ প্রস্ফুটনের ওপর নির্ভরশীল। সঠিক বিরামকাল নিরূপণ করে উভয় ধানের বীজ বপন করলেই মূল জমিতে দু’টি ধানের এক সঙ্গে ফুল ধরবে এমন কথা বলা যায় না। পরবর্তী পর্যায়ের পরিচর্যা দু’টি ধানের ক্ষেত্রে দু’ রকম হয়ে পড়লে যুগপৎ প্রস্ফুটন বিঘ্নিত হতে পারে। এমনকী শস্যের জীবনকালে আবহাওয়ার পরিবর্তন এক সঙ্গে ফুল ধরার অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। এমতাবস্থায় যুগপৎ প্রস্ফুটন সুনিশ্চিত করতে গেলে উভয় ধানের খোলের ভেতর শিষের অগ্রগতি অনুসরণ করে বাড়বৃদ্ধির গতিপ্রকৃতি প্রয়োজনমতো নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। পাশকাঠি সর্বোচ্চ সংখ্যায় উন্নীত হওয়ার পরপরই ধানের খোলে শিষের জন্ম সূচিত হয়। জন্মের পর থেকে ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে শিষের পূর্ণাঙ্গ দশা প্রাপ্ত হতে প্রায় ৩০ দিন সময় লাগে। ক্রমবিবর্তনের এই সুদীর্ঘ পর্যায় ১০টি দফায় বিভক্ত। দু’টি ধানে (স্ত্রী ও পুরুষ) এক সঙ্গে ফুল ধরতে গেলে ক্রমবিবর্তনের এই পর্যায়গুলি উভয় ধানে সমান তালে চলা দরকার। সেই জন্যই শিষের জন্ম সূচিত হওয়া শুরু থেক উভয় ধানের নমুনা সংগ্রহ করে খোলের ভেতর বাড়ন্ত শিষের অগ্রগতির হার নিরুপণ করা আবশ্যিক। নমুনা সংগ্রহ করে শিষের বাড়বৃদ্ধির গতিপ্রকৃতি নিরীক্ষা করতে গেলে ধানের খোলের ভেতর বাড়ন্ত শিষটি ঠিক কখন থেকে দৃষ্টিগোচর হবে তার সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা দরকার। বীজ অঙ্কুরোদগমের পর শিষের জন্ম মূলত জাতের মেয়াদের ওপর নির্ভরশীল। শীষের জন্মবার্তা নির্দেশিকা জাতের মেয়াদ ( দিনের হিসাবে ) শিষের সূচনা ( বোনার পর থেকে দিনের হিসাবে ) ৯৫ - ১০০ ৪০ – ৪৫ ১০৫ – ১১০ ৫০ – ৫২ ১১৫ – ১২০ ৬০ – ৬২ ১২৫ – ১৩০ ৬৫ – ৭০ খরিফ মরশুম ভিত্তিক তথ্য উপরোক্ত সময়সূচি মোতাবেক মাঠের বিভিন্ন জায়গা থেকে কয়েক দফায় স্ত্রী ও পুরুষ ধানের নমুনা সংগ্রহ করে খোলার ভেতর শিষের বাড়বৃদ্ধির গতিপ্রকৃতি নথিভুক্ত করতে হবে। শিষের বাড়বৃদ্ধির বিভিন্ন দশা দশা কাল (ফুল ফোটার প্রায়) পিরণতি (শীষের দৈর্ঘ্য মিমি ) এক : শিষের সূচনা ৩০ দিন আগে ০.২ দুই : শিষের শাখার সূচনা ২৭ দিন আগে ০.৪ তিন : শিষের প্রশাখার সূচনা ২৪ দিন আগে ১.৫ চার : পুংকেশর এবং গর্ভ কেশরের সূচনা ২০ দিন আগে ২.০ পাঁচ : পরাগ মাতৃকোষের আত্মপ্রকাশ ১৭ দিন আগে ১০ – ২৫ ছয় : পরাগ মাতৃকোষের বিভাজন ১২ দিন আগে ৮০ সাত : পরিপূর্ণ পরাগ ৬ দিন আগে ১৯০ – ২৫০ আট : পরিণত পরাগ ৪ দিন আগে ২৬০ নয় : স্পাইকলেট উত্পাদনের সমাপ্তি ২-১ দিন আগে ২৭০ দশ : ফুল ফোটা ধানের খোলার ভিতর শিষের বাড়বৃদ্ধি নিরীক্ষা পদ্ধতি গুছি থেকে মূল কাটিটি বেছে নিন। সর্বাধিক দীর্ঘ কাটিটিই মূল কাটি। মূল কাটিটি শিকড়ের কাছ থেকে কেটে তুলে আনুন। এ বার মূল কাটিটির তলা থেকে ওপর বরাবর ধারালো ব্লেড চালিয়ে হাল্কা চিড় দিন। গাঁটের ঠিক ওপরে চিড় বরাবর ফাঁক করলেই ধরা পড়বে বাড়ন্ত শিষ। আতসকাচের তলায় বাড়ন্ত শিষের সঠিক দশা নির্ধারণ করুন। আতসকাচের তলায় দৃশ্যমান ধানের শিশু শিষ ধীরে ধীরে বেড়ে উঠে পরিণত হয়ে যখন ধানের খোলার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করে তখনই ধানে ফুল ধরে। ধানের শিষের এই ক্রমবিবর্তন ১০টি স্বতন্ত্র দশায় বিভক্ত। মোট ১০টি দশার মধ্যে যুগপৎ প্রস্ফুটনের স্বার্থে প্রাথমিক পর্যায়ের চারটি দশায় শিষের বাড়বৃদ্ধির গতি প্রকৃতি নিবিড় ভাবে অনুসরণ করা একান্ত প্রয়োজনীয়। ধানের শিষের এই বিভিন্ন স্বতন্ত্র দশার অনন্যপরতা নীচে দেওয়া হল। এই বৈশিষ্ট্যগুলো ঠিক ঠিক নিরীক্ষণ করলে স্ত্রী ও পুরুষ ধানের কোনটিতে কখন ফুল ধরবে তা সঠিক ভাবে বলা যাবে। ১) শিষের সূচনা ২) শিষের শাখার সূচনা ৩) প্রশাখার সূচনা ৪) পুংকেশর ও গর্ভকেশরের সূচনা ৫) পরাগ মাতৃকোষের আত্মপ্রকাশ ৬) পরাগ মাতৃকোষের বিভাজন ৭) পরিপূর্ণ পরাগ ৮) পরিণত পরাগ ৯) স্পাইকলেট উৎপাদনের সমাপ্তি ১০) ফুলফোটা শিষের বাড়বৃদ্ধির দশা প্রস্ফুটন নিয়ন্ত্রণ স্ত্রী ও পুরুষ ধানের খোলার ভেতর বাড়ন্ত শিষের অগ্রগতি পর্যালোচনা করলে উভয় ধানে ফুল আসার দিনক্ষণ সম্পর্কে আগাম ধারণা করা যাবে। উভয় ধানের শিষের বাড়বৃদ্ধি পর্যালোচনা করে পুরুষ ও স্ত্রী ধানের মধ্যে ফুল ফুটতে ৩ দিনের বেশি তফাৎ হতে পারে বলে মনে হলে যুগপৎ ফুল ফোটানোর জন্য বিশেষ নিয়ন্ত্রণ বিধি মানা দরকার। স্ত্রী ও পুরুষ শিষের বিষম বাড়বৃদ্ধিজনিত পরিস্থিতির মোকাবিলায় কী জাতীয় নিয়ন্ত্রণবিধি অনুসরণ করা প্রয়োজন হতে পারে তা কয়েকটি উদাহরণের মাধ্যমে উপস্থাপিত করা হল। সমস্যা : ১ পুং ধান * শিষের বাড়বৃদ্ধির দশা -১ স্ত্রী ধান * শিষের বাড়বৃদ্ধির দশা – ৪ প্রত্যাশা স্ত্রী ধানে ৬ – ৭ দিন আগে ফুল আসার সম্ভাবনা। যুগপৎ ফুল ধরাতে গেলে স্ত্রী ধানের শিষের বাড়বৃদ্ধির হার কমিয়ে আনা। পুরুষ ধানের শিষের বাড়বৃদ্ধির হার বাড়ানো। করণীয় স্ত্রী ধানের সারিতে ইউরিয়া সারের শতকরা ২ ভাগ জলীয় দ্রবণ ছেটানো। পুরুষ ধানের সারিতে ফসফেট সারের শতকরা ১ ভাগ জলীয় দ্রবণ ছেটানো। মাঠে বেশি করে জল ঢুকিয়ে জমিতে দাঁড়ানো জলের উচ্চতা বাড়িয়ে দেওয়া। সমস্যা : ২ পুং ধান * শিষের বাড়বৃদ্ধির দশা – ৪ স্ত্রী ধান * শিষের বাড়বৃদ্ধির দশা -১ প্রত্যাশা পুরুষ ধানে ৬ – ৭ দিন আগে ফুল আসার সম্ভাবনা। যুগপৎ ফুল ধরাতে গেলে পুরুষ ধানের শিষের বাড়বৃদ্ধির হার কমানো। স্ত্রী ধানের শিষের বাড়বৃদ্ধির হার বাড়ানো। করণীয় মাঠের সমস্ত জল বের করে দিয়ে মাটিতে চুলের মতো ফাটল ধরিয়ে দেওয়া। স্ত্রী ধানের সারিতে ফসফেট সারের শতকরা ১ % দ্রবণ ছেটানো। সমস্যা : বিশেষ পুং ধান * শিষের বাড়বৃদ্ধির দশা ৫ ও ৬ – এর মাঝামাঝি স্ত্রী ধান * শিষের বাড়বৃদ্ধির দশা -১ প্রত্যাশা পুরুষ ধানে ১৫ দিন আগে ফুল আসার সম্ভাবনা। করণীয় জমি থেকে সব জল বের করে দিয়ে জমিতে একেবারে চুলের মতো ফাটল ধরিয়ে ফেলতে হবে। পুরুষ ধানের ২ সারিতে ইউরিয়া ২% দ্রবণ ছেটানো। অথবা পুরুষ ধানের ২ সারির মাঝের জমিতে বিঘা পিছু ৪ – ৬ কেজি নাইট্রোজেন চাপান হিসাবে ব্যবহার করা। পুরুষ ধানের মূলকাটির ভেতর থেকে আগুয়ান অপরিণত শিষ তুলে ফেলে দিতে হবে। স্ত্রী ধানের সারিতে ফসফেট সারের ১% দ্রবণ ছেটানো। আদর্শ প্রস্ফুটন সর্বোত্তম পরাগ সংযোগের জন্য স্ত্রী ধানে পুরুষ ধান অপেক্ষা ১ – ২ দিন আগে ফুল আসা দরকার। দু’টি ধানের বাড়ন্তকালের মেয়াদ সমান হলে বাড়বৃদ্ধি প্রতি দশায় স্ত্রী ধানের শিষের বৃদ্ধি পুরুষ ধানের শিষ অপেক্ষা ১ – ২ দিন এগিয়ে থাকবে। স্ত্রী ধানের বাড়ন্তকাল পুরুষ ধানের থেকে কম হলে বাড়বৃদ্ধির প্রথম তিনটি দশা পর্যন্ত পুরুষ ধানের শিষের বৃদ্ধি স্ত্রী ধানের শিষ অপেক্ষা এক ধাপ এগিয়ে থাকা দরকার। বাড়বৃদ্ধির ষষ্ঠ দশায় পুরুষ ও স্ত্রী ধানের শিষ সমপর্যায়ে আসবে। স্ত্রী ধানের বাড়ন্তকাল পুরুষ ধান অপেক্ষা বেশি হলে বাড়বৃদ্ধির প্রথম তিনটি দশা পর্যন্ত স্ত্রী ধানের শিষের বৃদ্ধি পুরুষ ধানের শিষ অপেক্ষা ১ – ২ দিন এগিয়ে থাকা দরকার। ষষ্ঠ দশায় এসে স্ত্রী ধানের শিষের বৃদ্ধি পুরুষ ধান অপেক্ষা ৩ – ৪ দিন এগিয়ে থাকবে। পরিশেষে স্ত্রী ধানে পুরুষ ধানের ১ – ২ দিন আগে ফুল ধরবে। উদাহরণ পুরুষ ধানে ফুল আসতে স্ত্রী ধানের চেয়ে ৬ – ৭ দিন সময় বেশি লাগলে পরাগপিতা ও বীজমাতার যুগপৎ প্রস্ফুটনের জন্য উভয় শিষের বাড়বৃদ্ধির আদর্শ চিত্র হবে নিম্নরূপ : শিষের বাড়বৃদ্ধির প্রথম তিনটি দশা পর্যন্ত পরাগপিতার শিষের বৃদ্ধি বীজমাতার শিষ অপেক্ষা এক ধাপ এগিয়ে থাকবে। অর্থাৎ পরাগপিতার শিষে প্রশাখার সূচনা দৃষ্টিগোচর হলে বীজমাতার শিষে শাখার সূচনা হবে। বাড়বৃদ্ধির ষষ্ঠ দশায় উভয় শিষ সমপর্যায় উন্নীত হবে। অর্থাৎ উভয় শীষের পরাগ মাতৃকোষের বিভাজন এক সঙ্গে শুরু হবে। খরিফ মরশুমে বীজ অঙ্কুরোদ্গমের পর থেকে ধান পাকার যে সময়সীমা তার ৬০ দিন আগে বীজমাতার এবং পরাগপিতার খোলে শিষের জন্ম সূচিত হয়। বীজতলায় বাড়ন্তকালের পার্থক্য মাথায় রেখে আগু-পিছু বীজ ফেলা হলে স্ত্রী ও দ্বিতীয় (পরাগপিতার বীজ ৩ খেপে পড়লে) অথবা প্রথম (পরাগপিতার বীজ ২ খেপে পড়লে) দফায় ফেলা পুরুষ ধানের খোলে শিষের জন্ম এক সঙ্গেই হবে। তাই নমুনা সংগ্রহ করে উভয় ধানের শিষের বাড়বৃদ্ধির গতিপ্রকৃতি অনুসরণ করতে হবে সংশ্লিষ্ট ধান পাকার ঠিক ৬০ দিন আগে থেকে। তিন দিন অন্তর ৩ / ৪ বার নমুনা সংগ্রহ করে উভয় ধানের শিষের তুলনামূলক অগ্রগতি বিচার বিবেচনা ও প্রয়োজনমতো প্রস্ফুটনের কৃত্রিম নিয়ন্ত্রণই যুগপৎ ফুল ফোটা নিশ্চিত করবে। ধান কাটা কাটার সময় বীজমাতার মাঝের কাটির শিষের ওপর বেড়ে ওঠা ৯০ শতাংশ ধান শক্তপোক্ত পুষ্ট হয়ে খড়ের রঙ ধারণ করলেই ফসল কেটে ফেলা দরকার। গুছির অন্য ধানগুলো হয়ত তখন সবে মাত্র দুধে দশা পেরিয়েছে। বীজমাতার সারির ধান কাটার অবস্থায় উন্নতি হওয়া মাত্র প্রথমে পরাগপিতার সারি কেটে মাঠ থেকে তুলে নিতে হবে। পরাগপিতার সারি মাঠ থেকে কেটে তুলে নেওয়ার কাজ সম্পূর্ণ হলে বীজমাতার সারি কাটার উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ বিধি হিসেবমতো বীজমাতার পরিপক্কতার জন্য ধার্য সময়ের ৭ দিন আগে মাঠের জল বের করে দিয়ে মাটি শুকিয়ে ফেলতে হবে। যাতে মাঠের ধান দ্রুত এক সঙ্গে পেকে যাবে। বীজমাতার সারি কাটার আগে মাঠ শেষ বারের মতো পরিদর্শন করে সারি থেকে অবাঞ্ছিত শেষ গাছটিও তুলে ফেলতে হবে। শেষ পর্বে অবাঞ্ছিত গাছ বাছই করার জন্য নজর কেন্দ্রীভূত করতে হবে বীজমাতার সারির ধানের শিষের ওপর। বীজমাতার সারির কোনও গাছের শিষের পুষ্ট ধানের গঠন বীজমাতার বিশুদ্ধ বীজের সম আকৃতির না হলে ওই গাছটি অবাঞ্ছিত বলে বিবেচিত হবে। আবার বীজমাতার সারির কোনও গাছের শিষে ৫০ – ৬০ শতাংশের বেশি পুষ্ট ধান ধরলে ওই গাছটিও অবাঞ্ছিত বলে বিবেচিত হবে। বীজমাতার সারি কাটার আগে শেষ পর্বে চিহ্নিত অবাঞ্ছিত গাছ কেটে মাঠ থেকে সরিয়ে নিতে হবে। এর পর বীজমাতার সারি কেটে মাঠ থেকে তুলে নিয়ে এসে বীজ মাড়াই করার চাতালে পাতলা করে মেলে দিতে হবে ধান শুকোনোর জন্য। ধান ঠিকমতো শুকিয়ে গেলে ঝাড়াই করে পুনরায় ছায়ায় মেলে রাখতে হবে। ধান ঠিকমতো শুকনো হলে ধানের আর্দ্রতা ১২ শতাংশে নেমে আসবে। আর্দ্রতা ১২ শতাংসে নেমে এলে বীজ সংরক্ষণের উপযুক্ত বলে বিবেচিত হবে। বীজ সংরক্ষণ করতে হবে বায়ু নিরোধক পাত্রে। ট্রান্সজেনিক ধান পরিচয় ট্রান্সজেনিক বীজ জেনেটিক মডিফায়েড বীজ বলেই সমধিক পরিচিত। জেনেটিক মডিফায়েড বীজ বলতে সেই বীজকেই বোঝায় যার বংশানুগত মৌলিক উপাদানের কৃত্রিম পরিবর্তনের ফলে এক বা একাধিক চরিত্রের উন্নয়ন সাধিত হয়েছে অথবা কোনও নির্দিষ্ট কর্ম সম্পাদনের নিমিত্ত অভিনব গুণ অর্জন করেছে। জীবকোষে নিহিত এই মৌলিক উপাদান রাসায়নিক পরিভাষায় ডি অক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড অর্থাৎ ডি এন এ। এই ডি এন এ-র ওপর থরে থরে সজ্জিত থাকে নির্দিষ্ট প্রোটিন উৎপাদনের সংকেতবাহী বংশানু বা জিন। জীবের প্রতিটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পিছনে থাকে নির্দিষ্ট প্রোটিনের হাত। সহজ কথায় জেনেটিক মডিফেকশন হল বংশগতির রূপান্তরসাধন, যা সাধিত হয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সংকেতবাহী জিন স্থানান্তর বা অদলবদলের ফলে। যুগ যুগ ধরে বংশগতির রূপান্তর ঘটে চলেছে। জেনিটিক মডিফিকেশন প্রকৃতির নিয়ম। বিবর্তনের কাণ্ডারি। জেনেটিক মডিফিকেশনের হাত ধরেই কোটি কোটি বছর আগে সৃষ্ট জেলির মতো আকৃতিবিহীন থলথলে প্রাণ থেকে আজকে উন্নত জীব জগতে উত্তরণ। আজকের ভারতে ধানের যে সমস্ত উচ্চফলনশীল (উফশী) অথবা হাইব্রিড জাতের চাষ চলছে একশো বছর আগেও তার কোনও অস্তিত্ব ছিল না। দেশি জাতের বংশগতির রূপান্তরের হাত ধরে এসেছে এই জাতগুলো। ট্রান্সজেনিক ধানও জেনেটিক মডিফায়েড ধানের জাত। কিন্তু এই জাত উদ্ভাবনের পদ্ধতি এ তাবৎ চালু পদ্ধতি অপেক্ষা ভিন্ন। এত দিন পর্যন্ত জিন স্থানান্তর বা অদলবদলের কাজটা সম্পাদিত হয়েছে পরাগমিলনের মাধ্যমে। যে মিলনের ঘটক কখনও প্রকৃতি, কখনও মানুষ। এই চিরায়ত প্রথায় জিনের বিচরণ আবদ্ধ ছিল একই প্রজাতির নিকট আত্মীয়দের মধ্যে। যেমন ধানের জিন ধানে এবং গমের জিন কেবলমাত্র গমেই স্থানান্তর করা যেত। জিন বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে এই বাধা সরে গেছে। বর্তমানে যে কোনও জীবিত কোষ থেকে জিন তুলে নিয়ে যে কোনও জীবিত কোষে স্থানান্তর করার প্রযু্ক্তি এখন মানুষের হাতে। এই বিশেষ পদ্ধতিতে জিন স্থানান্তরকরণ প্রক্রিয়া পরাগবাহিত নয়। এই পদ্ধতি অনুসরণ করে বিভিন্ন উৎস থেকে জিন তুলে নিয়ে ধানের প্রচলিত জাতের মধ্যে অনুপ্রবেশ করিয়ে উদ্ভাবিত হচ্ছে ধানের রোগ পোকা প্রতিরোধক জাত, উন্নতপুষ্টি সমৃদ্ধ ধান। যে জিনের মাধ্যমে প্রচলিত জাতটি সমৃদ্ধ হচ্ছে সেই কাঙ্খিত জিন কখনও আসছে অনাত্মীয় উদ্ভিদ থেকে, কখনও বা ব্যাকটেরিয়ার কোষ থেকে। মাটির জীবাণু ব্যাসিলাস থুরিনজিয়েনসিস থেকে জিন তুলে তৈরি হয়েছে ধানের মাজরা পোকা প্রতিরোধক জাত, ড্যাফোডিল ফুলের গাছ ও এরুনিয়া ব্যাকটেরিয়া থেকে জিন তুলে তৈরি হয়েছে ভিটামিন সমৃদ্ধ ধান। আবার ‘সয়াবিন’ থেকে জিন তুলে ধানে প্রতিস্থাপন করে তৈরি হয়েছে এমন ধানের জাত যার অন্ত:ত্বকে লৌহের মাত্রা সাধারণ ধানের ৫ – ৬ গুণ। এই সবক’টি ধানই বাণিজ্যিক ছাড়পত্রের দিন গুনছে। পরাগরেণুর ওপর ভর না করে এই বিশেষ প্রযুক্তির গর্ভজাত রূপান্তরিত বংশগতির ধানই ট্রান্সজেনিক ধান। বর্তমানে যে তিনটি ট্রান্সজেনিক ধানের ছাড়পত্রের কথা বিভিন্ন দেশ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে তারা হল : ভিটামিন এ ধান বিটি ধান লৌহ সমৃদ্ধ ধান এর মধ্যে চিন দেশে ইতিমধ্যেই বিটি ধানের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়েছে। রকমফের ভিটামিন এ সমৃদ্ধ ধান জুরিখের সুইস ফেডারেল ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির বিজ্ঞানী ড. ইংগো পট্রিকিউস ও জার্মানির ফ্রাইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ড. পিটার বেয়ারের যৌথ প্রচেষ্টায় ধানের শাঁসে (অ্যান্ডোসপার্ম) প্রতিস্থাপিত হল অনাত্মীয় উৎসের বিটাক্যারোটিন উৎপাদিত তিনটি জিন। তিনটি জিনের মধ্যে দু’টি জিন (পি এস ওয়াই এবং লি ওয়াই সি) আনা হল ড্যাফোডিল ফুল গাছের ক্রমোজোম থেকে। তৃতীয়টি এল এরুনিয়া জীবাণুর ক্রমোজোম থেকে। ধানের ক্রোমোজমে এই তিনটি জিন প্রতিস্থাপনের ফলে শাঁসে সংশ্লেষিত হল বিটাক্যারোটিন। শাঁসের সাদা রঙ বদলে হল হলুদ। বিটাক্যারোটিন যুক্ত খাবার থেকেই মানুষের শরীরে ভিটামিন-এ সংশ্লেষিত হয়। তাই বিটাক্যারোটিনে প্রোভিটামিন – এ নামে পরিচিত। ধানের এই বিস্ময়কর পরিবর্তনের জন্য বিজ্ঞানীদ্বয় বেছে নিয়েছিলেন জাপানি ধানের জাত টি ৩০৯। সোনা রঙের শাঁসের জন্যই জাতটির নতুন নামকরণ হল স্বর্ণালি ধান বা গোল্ডেন রাইস। ধানের কোনও প্রজাতিই তার শাঁসে বিটাক্যারোটিন উৎপাদন করতে পারে না। তবে ধানের সব প্রজাতির কাঁচা শাঁসে একটি রাসায়নিক যৌগ উৎপাদিত হয়। তার নাম জেরানিল জেরানিল ডাইফসফেট (জি জি ডি পি)। এই জি জি ডি পি ভেঙে বিটাক্যারোটিন তৈরি হতে লাগে তিনটি উৎসেচক। এই তিনটি উৎসেচক উৎপাদনের পিছনে আছে ৩টি জিন। বিজ্ঞানীদ্বয় যা তুলে আনলেন অনাত্মীয় ড্যাফোডিল ফুল ও এরুনিয়া জীবাণুর ক্রমোজোম থেকে। পট্রিকিউস ও বেয়ার উদ্ভাবিত ভিটামিন –এ সমৃদ্ধ এই ধানটির নাম এস জি আর – ১। পরীক্ষাগারে রাসায়নিক পরীক্ষায় এই ধানের প্রতি গ্রাম চালে ১.৬ মিউগ্রাম ক্যারোটিনয়েডস পাওয়া গেল। ২০০৫ সালে প্রতি গ্রাম চালে ক্যারোটিনয়েডের পরিমাণ বাড়িয়ে ৩৭ মিউ গ্রাম উন্নীত করে সিনজেনটা কোম্পানি উদ্ভাবন করল দ্বিতীয় গোল্ডেন রাইস, এস জি আর -২। এই ৩৭ মিউগ্রাম ক্যারোটিনয়েডের মধ্যে ৩১ মিউগ্রামই বিটাক্যারোটিন। দ্বিতীয় গোল্ডন রাইস জাতটিতে বিটাক্যারোটিনের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য সিনজেন্টার বিজ্ঞানীরা তুলে আনলেন ভুট্টার ক্রমোজোম থেকে ফাইটোন সংশ্লেষকারী জিন ও বিটাক্যারোটিন উৎপাদিত আদি ধানের জাত, এস জি আর – ১ থেকে সি আর টি- ১ জিন। মানুষের শরীরে ভিটামিন এ ঘাটতি ( ভি এ ডি ) হলে দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভি এ ডির প্রভাবে ভারতবর্ষে প্রতি বছর ২৫০ – ৫০০টি শিশু অন্ধ হয়ে যায়। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব নিউট্রিশনের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় ধরা পড়ছে ভারতবর্ষের ৬২ শতাংশ শিশুর রক্তে ভিটামিন –এর পরিমাণ প্রতি ডিসিলিটারে ২০ মিউগ্রামের তলায়। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের মতে রক্তে ভিটামিন-এ-র এই মাত্রা দৃষ্টিশক্তির পক্ষে চূড়ান্ত ক্ষতিকারক। কেবলমাত্র ভারতবর্ষেই নয়, উন্নয়নশীল বা অনুন্নত সব দেশই ভি এ ডি –র প্রতাপ আশঙ্কাজনক। কারণ যে সমস্ত সবজি, ফল অথবা মাছ-মাংসে প্রচুর পরিমাণ ক্যারোটিনয়েড পাওয়া যায় তা এই সমস্ত দেশের অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে। অথচ দু’ বেলা দু’ মুঠো ভাত এই সমস্ত দেশের অধিকাংশের করায়ত্ত। প্রতি দিন সিনজেন্টা উদ্ভাবিত এই গোল্ডেন রাইস – ২-র ১৪৪ গ্রাম চালের ভাত খেলেই শরীরের ভিটামিন এ চাহিদা মিটবে। বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন এই জাতটিকে সমগ্র মানব জাতির কল্যাণে ব্যবহারের জন্য পেটেন্টমুক্ত করেছন। বিশ্বের অনেক দেশই বর্তমানে এই জাতটির বাণিজ্যিক চাষের ছাড়পত্র দেওয়ার কথা চিন্তা করতে শুরু করেছেন। বি টি ধান ভারতবর্ষে যে গুটিকয়েক পোকার আক্রমণে প্রতি বছর ধানের ফলনের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয় তার মধ্যে অন্যতম হলুদ মাজরা পোকা। মাজরা পোকার আক্রমণে স্থান, কাল ও মরশুম ভেদে ধানের ফলনে নথিভুক্ত ক্ষতির পরিমাণ ৩ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশ (সূত্র : বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়)। এই পোকার আক্রমণ প্রতিহত করা বেশ শক্ত। কেননা শুককীট ডিম ফুটে বেরিয়ে সিঁদ কেটে ধান গাছের মূল কাণ্ড বা পাশকাঠির মধ্যে ঢুকে বসে নরম কলা খাওয়া শুরু করে। ফলে ধানের বয়স ভেদে কাণ্ডের ডগা শুকিয়ে কিংবা কাণ্ড ভেঙে নতুবা চিটে যুক্ত সাদা শিষ হয়ে ফলের ক্ষতি করে। দৃশ্যত ক্ষতি না হওয়া পর্যন্ত পোকার অস্তিত্ব বোধগম্য হয় না। পোকাটি কাণ্ডের ভিতরে থাকার ফলে স্পর্শবিষে কাজ হয় না। আবার অন্তর্বাহী বিষ ব্যবহার করেও সিংহ ভাগ ক্ষতি আটকানো যায় না। কেননা অন্তর্বাহী বিষ শিকড়ের পথ ধরে কোষের রসে পৌঁছতে যে সময় লাগে তা ধানের ফলনের লক্ষণীয় ক্ষতির জন্য যথেষ্ট। ফিলিপাইনসের আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা কেন্দ্র ব্যবহৃত ধানের ৩৯০০০ জাত পরীক্ষা করেও মাজরা পোকা প্রতিরোধক কোনও জাত চিহ্নিত করতে পারেনি। দেশের বিভিন্ন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও ধান গবেষণা কেন্দ্রেও সহস্রাধিক ধানের জাত পরীক্ষা করা হয়েছে। পাওয়া যায়নি মাজরা প্রতিরোধক জাত। তাই প্রচলিত প্রথায় উদ্ভাবন করা যায়নি মাজরা প্রতিরোধক জাত। জৈববিজ্ঞানীরা মাজরা পোকা প্রতিরোধক কাঙ্খিত জিনের খোঁজ পেলেন মাটি জীবাণু ব্যাসিলাস থুরিনজিয়েনসিসের ক্রেমোজোমে। এই জীবাণুটির অনুপম বৈশিষ্ট্য হল শরীরের অভ্যন্তরে ১৭০টির বেশি স্ফটিকাকৃতির প্রোটিন উৎপাদন। এই প্রোটিনগুলোর কীটনাশক ধর্ম বর্তমান। স্ফটিকাকৃতি প্রোটিনের ইংরাজি নাম ক্রিসটাল প্রোটিন। তাই এই প্রোটিন উৎপাদী জিনের নামের শুরুতে ক্রাই শব্দ ব্যবহার করা হয়। যেমন ক্রাই-এসি জিন, ক্রাই-৯ সি জিন ইত্যাদি। ব্যাসিলাস থুরিনজিয়েনসিসের ডাক নাম বি টি — ব্যাসিলাসের বি এবং থুরিনজিয়েনসিসের টি। অধিকাংশ বিটি বিষই কীট নির্দিষ্ট। জৈববিজ্ঞানীরা দেখলেন বিটি জীবাণুর ক্রোমোজোম যে শতাধিক ক্রিসটাল প্রোটিন উৎপাদী জিন আছে তার মধ্যে ক্রাই- এবি, ক্রাই- এএ, ক্রাই- এসি ও ক্রাই- ২ এবি জিনগুলো ধানের মাজরা পোকা দমনে সক্ষম। বিজ্ঞানীরা এই জিনগুলো বিটি জীবাণুর ক্রোমোজোম থেকে ছিঁড়ে নিয়ে এসে জুড়ে দিলেন ধানের ক্রোমোজোমে। তৈরি হল মাজরা পোকা প্রতিরোধক ধান। ভারতবর্ষে যে সব গবেষণা সংস্থার পরীক্ষাগারে এই ধানগুলো উদ্ভাবিত হয়েছে তাদের নাম ও তাদের তৈরি ধানের জাতে প্রতিস্থাপিত বিটি জিনের নাম নীচে দেওয়া হল গবেষণা সংস্থা প্রতিস্থাপিত বিটি জিন ১ ) ডি আর আর, হায়দরাবাদ ক্রাই – এবি ২ ) মাহিকো, মুম্বই ক্রাই – এসি ও ক্রাই – ২ এবি ৩ ) মেটা হেলিক্স ক্রাই – এসি ৪ ) আই আর আই, নিউ দিল্লি (ফিউশন জিন) বিট বিষ জিন প্রতিস্থাপিত ধানটি পাতা মোড়া পোকার আক্রমণও প্রতিরোধ করতে পারে। লৌহ সমৃদ্ধ ধান অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের এক মারাত্মক ব্যাধি রক্তাল্পতা। শিশু ও মেয়েদের মধ্যে এই রোগের ব্যাপকতা ক্রমশই বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলেছে উন্নয়নশীল দেশের ৪১ শতাংশ মেয়ে রক্তাল্পতা ব্যাধির শিকার। আবার ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব নিউট্রিশনের (এন আই এন) সমীক্ষায় ধরা পড়েছে ভারতবর্ষে ৫ বছেরর নীচে শিশুদের মধ্যে ৭০ শতাংশ শিশু রক্তাল্পতায় ভুগছে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ৬১ শতাংশ শিশু এই রোগের শিকার। রক্তাল্পতা রোগের কারণ রক্তে আয়রনযুক্ত প্রোটিনের অভাব। প্রতি ডেসিলিটার রক্তে এই প্রোটিনের পরিমাণ ১৩ গ্রামের তলায় চলে গেলে রক্তাল্পতার উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে। যার অবশ্যম্ভাবী ফল মনসংযোগ ও স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া। শরীর দুর্বল হয়ে পড়া। স্কুলপড়ুয়াদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ কমানোর জন্য দিল্লির সরকারি স্কুলে ১০ - ১৯ বছরের ছাত্রদের মধ্যে বিনামূল্যে আয়রন ট্যাবলেট বিতরণ করা হচ্ছে। চালনির্ভর দৈনিক খাদ্য তালিকায় যে সমস্ত মহার্ঘ আহারের উপস্থিতি শরীরে আয়রন চাহিদা মেটাতে পারে তা আমাদের মতো গরীব মানুষের দেশে অধিকাংশের নাগালের বাইরে। জৈববিজ্ঞানীরা তাই ট্রান্সজেনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে এই সমস্ত দেশের প্রধান খাদ্য চালের মধ্যে আয়রনের মাত্রা বাড়ানোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন সাধারণ চালে প্রতি কেজিতে ১২ – ১৩ মিগ্রা আয়রন থাকে। অধিকাংশ আয়রন আবার থাকে চালে বহি:ত্বকে। মিলে পালিশ করার সময় যার ৫০ – ৬০ শতাংশ বেরিয়ে যায়। পালিশ করা প্রতি কেজি চাল তাই সাধারণ ভাবে ৫ – ৬ মিগ্রার বেশি আয়রন থাকে না। প্রয়োজন চালের অন্ত:ত্বকে আয়নরের মাত্রা বাড়ানো। আর তা করতে হলে চালের অন্ত:ত্বকে এমনই এক জিন প্রতিস্থাপন করা দরকার যা চালের আয়রনকে অন্ত:ত্বকে বেঁধে রাখবে। এই ধরনের জিনের খোঁজ পাওয়া গেছে সয়াবিন, মটর ও ভুট্টার মধ্যে। বিজ্ঞানীরা এই জিনের নামকরণ করেছন ‘ফেরিটিন’ জিন কেননা এই জিনটি ফেরিটিন নামক প্রোটিনের উৎপাদক। ফেরিটিন প্রোটিনের কাজই হল আয়রন বেঁধে রাখা। জৈববিজ্ঞানীরা দেখলেন আয়রনকে শুধুমাত্র অন্ত:ত্বকে বেঁধে রাখলেই চলবে না, ভাতের মাধ্যমে শরীরের দৈনিক আয়রন চাহিদা মেটাতে গেলে ধানের পাতা থেকে শাঁসে (অ্যান্ডোস্পার্ম) আরও অধিক পরিমাণে আয়রন পাঠাতে হবে। সুতরাং দরকার একটি আয়রনবাহক জিন। ফিলিপাইনসের আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা ২০০৩ সালে এই দু’টি অনাত্মীয় জিনকে ধানের প্রচলিত জাত আই আর ৬৪-এর মধ্যে প্রতিস্থাপন করে উদ্ভাবন করলেন এমন ধানের জাত যার অন্ত:ত্বকে আয়রনের মাত্রা সাধারণ ধান অপেক্ষা ৫ – ৬ গুণ বেশি। উদ্ভাবিত এই নতুন ট্রান্সজেনিক চালের প্রতি কেজি চালের অন্ত:ত্বকে আয়রনের পরিমাণ ৩৪ মিগ্রা। ভারতীয় মেডিক্যাল গবেষণা পর্ষদের সুপারিশ অনুযায়ী মেয়েদের দৈনিক ৩২ মিগ্রা আয়রন আহরণ করা দরকার। শিশুদের ক্ষেত্রে একটু কম। আয়রন সমৃদ্ধ ট্রান্সজেনিক ধান আমাদের দেশেও উদ্ভাবিত হয়েছে। জাতটি আপাতত দেশের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাপ্রুভাল কমিটির নিয়ন্ত্রণে মাঠ পরীক্ষার অপেক্ষায়। সূত্র ডি আর আর, হায়দরাবাদ নবান্ন ধান গবেষণা কেন্দ্র, চুঁচুড়া রাজ্য বীজ নিগম রাইস হাইব্রিডস রিলিসড ইন ইন্ডিয়া, ডি আর আর, হায়দরাবাদ হাইব্রিড রাইস ইন ইন্ডিয়া, ডি আর আর, হায়দরাবাদ জেনেটিক মডিফায়েড বীজের অ–আ–ক–খ সার সমাচার মেটা হেলিক্স ইন্ডিয়ান জার্নাল অব কমিউনিটি মেডিসিন, ২০১০ আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা কেন্দ্র, ফিলিপাইনস