কৃত্রিম ফলে সবজিতে বাজার ছেয়ে গেছে। সার দেয়া সবজি খেতে খেতে মানুষ অজান্তেই নিজের ক্ষতি করছে। কিন্তু উপায়ও নেই। তাই যদি বাড়িতে থাকে একটু ছাদ তাহলে কিন্তু করাই যেতে পারে সবজি চাষ। আর নিজের হাতে লাগানো গাছের টাটকা সবজি খাওয়ার অনুভুতিটাই আলাদা। যারা শহরে বাস করেন তাঁদের অনেকের সবজি চাষের শখ থাকলেও বিভিন্ন সমস্যার কারণে তা করতে পারেন না। আবার অনেকের এই বিষয়ে পুরোপুরি ধারনাও হাকেনা। কিন্তু একটু চেষ্টা করলেই নিজের বাড়ীর ছাদে সুন্দর সবজি চাষ করতে পারেন। প্রকৃত টব নির্বাচন ছাদে বিভিন্ন সাইজের টব, ড্রামের কাটা অংশ বা হাফড্রাম ইত্যাদিতে পছন্দের সবজি করা যেতে পারে। সাধারণত ভিন্ন ধরনের শাক সবজির জন্য বিভিন্ন সাইজের টবের প্রয়োজন হয়। লতানো সবজি যেমন লাউ, কুমড়া ঝিঙ্গা ইত্যাদির জন্য বড় ধরনের টব দরকার। ১০০ কেজির মতো মাটি ধরে এই ধরনের হাফড্রাম এই সবজিগুলির জন্যে বেশী উপযুক্ত। প্রতিটি হাফড্রামে সাধারণত এক থেকে দুইটি চারা রোপণ করা যায়। চিচিঙ্গা, করলা, শিম, শসা ইত্যাদির জন্যে মাঝারি ধরনের টব প্রয়োজন। সাধারণত ২৫-৩০ কেজি মাটি ধরে এমন টব হলে ভালো হয়। বেগুন, মরিচ, ট্মেটো, বরবটি ইত্যাদির জন্যেও মাঝারি ধরনের টব উপযুক্ত যেগুলিতে ২৫-৩০ কেজি মাটি ধরবে। পুঁইশাক, ঢেঁড়স ইত্যাদি চাষের জন্যে ছোট সাইজের টব হলেই চলে। তবে ৫-৮ কেজি মাটি ধরে এমন টব হলে ভালো হয়। বিভিন্ন শাক যেমন লাল শাক, কলমিশাক ইত্যাদি চাষের জন্যে ছোট থেকে মাঝারি ধরনের টব হলেই চলবে এবং এর গভীরতা খুব বেশী প্রয়োজন হয়না। মাটি কিভাবে মেশাবেন তাই যে টবগুলির উপরিভাগের জায়গা বেশী থাকে সেগুলি শাক চাষের জন্যে ভালো। টবের মাটি তৈরি করা ছাদে সবজি চাষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। টবের মাটি ভালো না হলে শাক সবজি চাষে ভালো ফলন পাওয়া যায়না। এই মাটি হতে হবে ঝরঝরে হালকা এবং যাতে জল ধরে রাখতে পারে এমন। দোআঁশ মাটি সবচেয়ে উপযুক্ত, এটেল মাটি হলে এর সাথে কিছু পরিমাণ বালি মিশিয়ে মাটি হালকা করে নিতে হবে। মাটি চালুনি দিয়ে ঢেলে নিতে পারলে সবচেয়ে ভালো। টব মাটি ভর্তি করার আগে মাটির সঙ্গে কিছুটা জৈব সার মিশিয়ে নিতে হবে। এতে মাটির উর্বরতা শক্তি বাড়াবে। পাশাপাশি দানাদার জাতীয় কিছু কীটনাশক পাওয়া যায়, এগুলি মাটির সাথে মেশালে বিভিন্ন ক্ষতিকারক পোকা থেকে গাছের গোড়া রক্ষা পায়। চারা রোপণ বিভিন্ন নার্সারি থেকে চারা সংগ্রহ করা যেতে পারে। অথবা নিজেই বীজ থেকে চারা উৎপাদন করা যায়। নির্বাচিত চারা গুলিকেহতে হবে সুস্থ-সবল, রগ-বালাই এবং পোকামাকড় মুক্ত। দুর্বল এবং লিকলিকে ধরনের চারাগুলি রোপণ না করাই ভালো। ছাদে সবজি চাষ পদ্ধতিতে যেহেতু খুব বেশী চারার প্রয়োজন হয়না, তাই বেছে বেছে ভালো চারা গুলিই রোপণ করা দরকার। চারা রোপণ করার সময় যে পট থেকে চারা মূল টবে স্থানান্তর করার সময় লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে পটের মাটি যেন কোনভাবেই ভেঙ্গে না যায়। পটের মাটি ভেঙ্গে গিয়ে চারার গোঁড়া আলগা হয়ে গেলে গাছ মরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। চারা রোপণ করার সময় মূল টবের মাটির গভীরতা এবং চারার গোড়ার মাটি উচ্চতা সমান থাকতে হবে। রোপণের সময় খুব বেশী চাপ দেওয়া উচিৎ নয়। হাল্কাভাবে চেপে মাটি সমান করে দিলেই হবে। চারা রোপণ হয়ে গেলে গাছের পাতায় ও গোঁড়ায় সামান্য জল স্প্রে করে দিতে হবে। বেশী জল দিলে শেকড় পচে গিয়ে গাছ মরে যেতে পারে। গাছের পরিচর্যা একটি গাছ থেকে ভালো ফল পেতে হলে গাছের পরিচর্যা সঠিকভাবে করা দরকার। নিয়মিত গাছে জল স্প্রে করতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে যাতে টবে জল জমে না থাকে। সাধারণত টবে মাটি ভর্তি করার সময় টবের নীচে কিছু ছিদ্র রাখা হয়। যাতে জল বেড়িয়ে যেতে পারে। তারপরেও জল জমলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া জরুরী। অনেক সময় টবের মাটি শুকিয়ে শক্ত হয়ে যায়। এমন হলে মাটি আলগা করে দিতে হবে। বিভিন্ন আগাছা গাছের গোঁড়ায় জন্ম নেবে এটাই স্বাভাবিক। তাই নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। এই আগাছা পরিষ্কার করার সময়েই গাছের গোঁড়া আলগা করে দিতে হবে। প্রয়োজনে গাছের সাপোর্টের জন্যে খুঁটি লাগানো যেতে পারে। পোকার আক্রমণ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিভিন্ন পোকার আক্রমণ সবজি চাষে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। লক্ষ্য রাখতে হবে গাছে কোন পোকামাকড়ের আক্রমণ হয়েছে কিনা। পোকামাকড় বা রগ-বালাই দেখা দিলেই প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সবজি সংগ্রহ খাবার উপযুক্ত হলেই সবজি সংগ্রহ করে ফেলা উচিৎ। অনেকদিন সবজি গাছে রেখে পোক্ত করার কোন প্রয়োজন নেই। ঘনঘন সবজি সংগ্রহ করলে ফলন ভালো পাওয়া যায়। পাশাপাশি সবজির গুনগত মান ভালো থাকে। বাড়ীর ছাদে সবজি চাষ কোন জটিল বিষয় নয়। তবে প্রয়োজন নিয়মিত পরিচর্যা। ছাদে সবজি চাষের জন্যে প্রয়োজনীয় কিছু টিপস লম্বা গাছকে ছোট গাছের পেছনে রাখতে হবে। টবে বা ফ্রেমে খৈল দেওয়া উচিৎ নয়। বাজার থেকে কিনে আনা কম্পোস্ট সার ব্যাবহারে ভালো ফল পাওয়া যায়। বছরে একবার নতুন মাটি দিয়ে পুরনো মাটি বদলে নেয়া ভালো। মাটি বদলে নেয়ার কাজটা সাধারণত অক্টোবর মাসে করলেই ভালো। ছাদে বাগানের জন্য মিশ্র সার, গুঁটি ইউরিয়া, খৈল, হাড়ের গুড়া পচিয়ে ব্যবহার করা ভালো। অবস্থা বুঝে গাছের গোঁড়ায় চুনের জল সপ্তাহে একবার ব্যাবহার করা যেতে পারে। তাপমাত্রার কথা মাথায় রেখে মৌসুমি সবজি লাগানো হলে ভালো ফসল পাওয়া যায়। কোন সময়ে কি সবজি লাগানো ভালো ১) মটরশুঁটিঃ স্যালাড বা যেকোনো খাবারেই ব্যবহার হয় এই সবজি। খাবারের স্বাদই বদলে দেয় মটরশুঁটি। জুন-জুলাই মাস প্রকৃত সময় মটরশুঁটি চাষের জন্যে। তাই কম জায়গায় মটরশুঁটি চাষ করা লাভদায়ক। ২) শসাঃ সবজি এবং ফল, দুভাবেই সবার পছন্দ শসা। এর জন্যে গরম আবহাওয়া খুব উপযুক্ত। বাড়ীর ছাদে শসা লাগালে ভিটামিনের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়ীর সৌন্দর্যও বৃদ্ধি পায়। ৩) টমেটোঃ ট্মেটো শীতকালের সবজি। গরমেও এর চাষ করা যায়। টমেটো খুব সহজে পোকামাকড় দ্বারা আক্রান্ত হয়। তাই কীটনাশক ব্যবহার করা জরুরী। ৪) বেগুনঃ টমেটোর মতো বেগুনও শীতকালীন সবজি। তবে বেগুন গরমেও চাষ করা যায়। দুটি বেগুনের চারা পাশাপাশি না লাগিয়ে কিছুটা দূরত্বে লাগাতে হবে। বেগুন গাছ লাগানোর প্রকৃত সময় জুন-জুলাই মাস। ৫) লঙ্কা বা মরিচঃ মরিচ চাষের জন্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো রোদের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা, সামঞ্জস্যপূর্ণ আর্দ্রতা, এবং সুষম মাটি। গাছে ফুল আসা মাত্রই জৈব সার ব্যবহার করা দরকার। ৬) ভুট্টাঃ ভুট্টা আরেকটি পুষ্টিকর খাবার যা সাধারণত গরমকালেই চাষ করা হয়। ভুট্টার পরাগায়নের জন্যে গ্রীষ্মকালের বাতাস খুব জরুরী। বিভিন্ন খাবারে ভুট্টা ব্যাবহার করা যায়। এছাড়া গরম করে আগুনে সেঁকে নিয়েও ভুট্টা খেতে কিন্তু দারুন। বাড়ীর ছাদে চাষ করলে কিন্তু মনও ভালো থাকে এবং একাকীত্বও কেটে যায়। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ ডিপার্টম্যান্ট অফ এগ্রিকালচার এন্ড ফার্মার্স ওয়েলফেয়ার