সকল শক্তির উত্স সূর্য। তার প্রত্যক্ষ শক্তি, পরোক্ষ অন্যান্য প্রাকৃতিক সুযোগ যথাসম্ভব ব্যবহার করে নিজের খামারে উত্পন্ন উৎসের ফলকে চক্রাকারে কাজে লাগিয়ে যথাসম্ভব পাওয়ার চেষ্টা করা হয় সংহত চাষে। যৌথ ভাবে চাষ একে অন্যের পরিপূরক হিসাবে কাজ করে। খাদ্যসামগ্রীর চাহিদা প্রতিনিয়ত বেড়ে চলেছে। অন্য দিকে চাষযোগ্য জমি বা উত্পাদক জলাশয়ের ক্ষেত্র বাড়ছে না, বরং সঙ্কুচিতই হচ্ছে। তাই সংহত চাষ আজকের দিনে জরুরি হয়ে পড়ছে। এই প্রথা অনেক পুরাতন প্রথা, অধিকাংশ ক্ষুদ্র, প্রান্তিক বা উন্নত চাষিদের মধ্যে এই প্রথা চালু আছে। কিন্তু সেটা স্বল্প পরিসরে এবং অসংগঠিত ভাবে। সংহত চাষ বলতে বোঝায় বিভিন্ন প্রকার প্রাণী ও উদ্ভিদের চাষের মধ্যে সমন্বয়সাধন, যার ফলে একটি প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট অপ্রয়োজনীয় পদার্থ অন্য প্রক্রিয়ায় মূল্যবান উপাদান হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে অপ্রয়োজনীয় পদার্থের চক্রাকার আবর্তন ঘটায়। কেন সংহত চাষ ? আমাদের দেশে গ্রামের লোকেদের প্রোটিনের চাহিদা বেশি। সেই সঙ্গে অভাব আরও প্রকট। অর্থনৈতিক দুর্বলতা। প্রাণীসম্পদের বিশাল আধার। গ্রামের লোকেরা বেশির ভাগ কোনও না কোনও প্রাণীসম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ করেন, যেমন গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি ইত্যাদি। বেশির ভাগ লোকেরই কমপেক্ষ একটা ছোট পুকুর আছে। বিভিন্ন প্রাণীসম্পদ, মাছ চাষ ও কৃষিকাজের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। বিভিন্ন প্রকার সংহত চাষ নানা ধরনের সংহত চাষ রয়েছে। সেগুলো নিম্নরূপ মাছের সঙ্গে হাঁস চাষ মাছের সঙ্গে মুরগি চাষ মাছের সঙ্গে শুকর চাষ মাছের সঙ্গে ধান চাষ মাছের সঙ্গে হাঁসের সংহত চাষ হাঁসের মল পুকুরে মাছের জন্য খাদ্যকণা উত্পন্ন করে ও মাছের ফলন ভালো হয়। পুকুরের তলদেশে মল জমে উর্বর পাঁক তৈরি করে যা চাষের কাজে ব্যবহার করা যায়। হাঁস পালনের জন্য আলাদা কোনও জমির দরকার হয় না। খাবারের জন্য বাজারজাত খাদ্যের উপর নির্ভর করতে হয় না। একটি চাষে যে ঝুঁকি থাকে সংহত চাষে সে ঝুঁকি থাকে না। ধানের সঙ্গে মাছ চাষ বর্ষার সময় ধানজমিতে জল জমলে স্বাভাবিক ভাবে পুঁটি, ট্যাংরা, ল্যাটা, কৈ, মাগুর, শিঙি, কুচো চিংড়ি জাতীয় মাছ জন্মায়। যদি বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে ধানের সঙ্গে মাছ চাষ করা যায় তা হলে মাছের ফলন ভালো পাওয়া যায়। মাছ চাষের জন্য ধানের জমির প্রস্তুতি কেমন হবে? জমিটি কম পক্ষে ৫ – ৬ বিঘা হওয়া উচিত। মোটামুটি এক হেক্টর জমির চার দিকে ৪ – ৫ ফুট চওড়া এবং ২ – ৩ ফুট গভীর খাল কেটে ওই মাটি দিয়ে ধানক্ষেতে মাছ ধরে রাখার জন্য চার দিকে উঁচু আল দিতে হবে। ধানক্ষেতের সঙ্গে পুকুরের বা অন্য বড় জলাশয়ের যোগ থাকলে ভালো হয়। এবং ধানজমিতে জল ঢোকা এবং বেরনোর ব্যবস্থা রাখতে হবে। জল ঢোকা বা বেরনোর পথে জালের ব্যবস্থা রাখতে হবে। ধানক্ষেত প্রয়োজনে জলে ডুবিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ধানক্ষেতে মাছ চাষের জন্য গভীর জলে উত্পাদনশীল ধানের জাত বাছতে হবে। ধানক্ষেতে মাছ চাষের পদ্ধতি মূলত পদ্ধতি দু’ রকম — আহরণ পদ্ধতি ও পালন পদ্ধতি আহরণ পদ্ধতি ধানক্ষেত সংলগ্ন নালাতে জলের উচ্চতা ধানক্ষেত থেকে ৩০ সেমি নীচে রাখা হয়। জ্যৈষ্ঠ – আষাঢ় মাসে ধানক্ষেতে সার দিয়ে ধানের চারা রোপন করা হয়। শ্রাবণ মাসে বর্ষার জলে নালার জলের উচ্চতা বাড়ে। ওই সময় ধানক্ষেতের চার পাশের বাঁধের কিছু জায়গা কেটে দিলে নালার মাছ ধানক্ষেতে ঢুকে পড়ে। একই সঙ্গে ধান গাছ ও মাছের বৃদ্ধি ঘটে। ধান কাটার আগেই মাছ তুলে ফেলা হয়। এই পদ্ধতিতে ধানক্ষেতে মাছ চাষ করে প্রতি বছরে প্রতি হেক্টরে ৪০০ – ৫০০ কেজি মাছ পাওয়া সম্ভব। পালন পদ্ধতি এই পদ্ধতিতে আবার দু’ ভাবে মাছ চাষ করা যায় -- ধান ও মাছ চাষ এক সঙ্গে। আগে ধান ও পরে মাছ চাষ। এক সঙ্গে ধান ও মাছ চাষ হলে একই সময়ে ধানের চারা রোপন করে ধানক্ষেতে মাছের চারা ছাড়তে অতিরিক্ত খরচ হয় না এবং ধানের উত্পাদনও ৫ – ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। আবার আগে ধান পরে মাছ চাষ হল ধান পাকলে জমি থেকে ধান কাটার পর চার পাশে বাঁধ দিয়ে ধানক্ষেতটিকে একটি অস্থায়ী পুকুরে পরিণত করা। ধানক্ষেতে ধানি পোনা হেক্টর প্রতি ১৫ – ২০০০০ সংখ্যায় ছাড়া হয়। একটু বড় পোনা প্রতি হেক্টরে ৫০০০ – ৭০০০ ছাড়া হয়। ধান চাষ ও মাছ চাষের রীতি নীতি অনুসরণ করে এক সঙ্গে চাষ করলে বিঘা প্রতি ৫৫০ – ৬০০ কিলো ধান এবং দশ মাসে বিঘা প্রতি গড়ে প্রায় সব রকম মিলিয়ে ১০০ কেজি মাছ পাওয়া যায়। ধানক্ষেতে সাধারণত মাছের জন্য আলাদা করে কৃত্রিম খাবারের দরকার হয় না। তবে জিওল মাছ চাষের জন্য কিছু প্রোটিন জাতীয় পূরক খাদ্য দেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনমতো ঘুনি বসিয়ে এবং শীতকালে টানাজালের সাহায্যে ধানক্ষেত থেকে মাছ ধরা যায়। সূত্র : মৎস্য বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার