একবার ভাবুন আমরা টাইম মেশিনে পাড়ি দিয়ে চলে গেছি আজ থেকে লক্ষ লক্ষ বছর আগে। কিন্তু আমাদের কাছে কোন ক্যালেন্ডার নেই। ঘড়ি নেই। ম্যাপ নেই! কি হতে পারে! কি করে দিনের হিসেব রাখবো! সময়ের হিসেবই বা কি করে করবো! একমাত্র উপায় আকাশের চাঁদ, সূর্য আর অমাবস্যা এবং পূর্ণিমা। একদম ঠিক ধরেছেন, প্রাচীন মানুষ চাঁদ সূর্য আর গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান দেখেই সময় নিরূপণ করতেন। আর এভাবেই দিনে দিনে ক্যালেন্ডারের সুত্রপাত। ক্যালেন্ডার শব্দটির বুৎপত্তি ক্যালেন্ডার " শব্দটি "ক্যালেন্ড" থেকে নেওয়া হয়েছে। রোমান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মাসের প্রথম দিনের জন্য শব্দটি ব্যবহার করা হয়। ‘ক্যালারে’ যার অর্থ আহ্বান করা। অমাবস্যার চাঁদ যখন প্রথম দেখা যায় তখনই ক্যালারে শব্দটি ব্যবহৃত হত । ল্যাটিন ক্যালেন্ডারিয়াম শব্দের অর্থ ‘হিসাবের খাতা’। প্রতি মাসের ক্যালেন্ডে হিসাবনিকাশগুলির নিষ্পত্তি করা হত এবং ঋণগুলি আদায় করা হত। ক্যালেন্ডার শব্দের বানান আদি আধুনিক ইংরাজির বলেই ধারনা। কোন কোন ঐতিহাসিকদের মতে ক্যালেন্ডার শব্দটি খৃস্টানদের ক্রিসমাসের সাথে সংযুক্ত। কোলো মানে বৃত্ত বা চক্র এবং দার এর অর্থ হলো একটি উপহার। ভারতে 'কালগনক' শব্দের অর্থ ক্যালেন্ডার। ভারতীয় গণিতশাস্ত্র এবং জ্যোতিষশাস্ত্রে সঠিকভাবে 'অমাবস্যা' এবং 'পূর্ণিমার' এবং গ্রহণের পূর্বাভাস দেয়। ভারতএ খ্রিস্টপূর্ব ৫৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু হওয়া 'বিক্রমাব্দ' এর উপর ভিত্তি করে তাদের উৎসবগুলির দিন নির্ধারণ করে। ক্যালেন্ডারের ইতিহাস সৃষ্টির আদিকালে মানুষ দেখত সকালে সূর্য উঠলে সকাল হয় এবং সূর্যাস্ত যেতেই রাত নেমে আসে পৃথিবীতে। এরপর থেকেই শুরু হয় একটি দিনের গণনা। এর বহুযুগ পরে মানুষের কাছে মাসের ধারনা দেখা দিল। যখন মানুষ লক্ষ্য করল চাঁদের পরিবর্তন। পূর্ণিমা আর অমাবস্যা দেখে মানুষ বুঝতে পারলো একটি মাস বা একটি নির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে। সম্ভবত ঋতুর পরিবর্তন তাকে জানাল বছরের হিসাব। মানুষ ধীরে ধীরে পেল বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এবং মানুষের ধারণা হল, পৃথিবী তার কক্ষপথে পরিক্রমা করতে যে সময় নেয় তাকে এক বছর বলে। জানল, যে পৃথিবীকে চাঁদের পরিক্রমা করতে এক মাস সময় লাগে। নিজের অক্ষের ওপর পৃথিবীকে পূর্ণ আবর্তন করতে একটা আস্ত দিন সময় লাগে। আধুনিক ক্যালেন্ডারের যাত্রাপথ আধুনিক ক্যালেন্ডারের যাত্রা শুরু হয় প্রাচীন মিশরে। প্রাচীন মিশর তাদের ক্যালেন্ডার বানিয়েছিল ১২ মাসের। আর প্রতি মাসে হত ৩০ দিন। বছর শেষহলে বাড়তি দিন জুড়ে বছরের হিসাব হত ৩৬৫ দিনের। সেকালের গ্রিসে হিসাব হত চান্দ্রমাসে। তারা প্রতি ৮ বছর অন্তর ৩ মাস যোগ করে দিত। গ্রিস জ্যোতির্বিদ মাতন, ৪৩২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে হিসাব করে দেখলেন যে চান্দ্রমাসে পুরো ১৯ বছর হয়। রোম সম্রাট জুলিয়াস সিজার ৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ক্যালেন্ডার সংস্কারের কাজে প্রথম হাত দেন। তাঁকে সাহায্য করেন আলেকজান্দ্রিয়র জ্যোতির্বিদ সোসিজিনিস। এই ক্যালেন্ডার বা পাঁজি তৈরি হল সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর পুরো একটা পরিক্রমার ওপর নির্ভর করে। নাম দেয়া হল সৌরবছর। কিন্তু এতেও সমস্যা মিটল না। লিপ ইয়ার এবং প্রতি মাসের ধারণা সিজারের জ্যোতির্বিদরা তাই ঠিক করলেন যে, ১ বছরে থাকবে ৩৬৫ দিন আর প্রতি চারবছর অন্তর বছর হবে ৩৬৬ দিনের। কেননা প্রতি বছর যে একদিনের যে চার ভাগের একভাগ বাদ যাচ্ছে, চতুর্থ বছরে গিয়ে সেই ১ দিনের হিসেব সম্পূর্ণ হবে। চতুর্থ বছরের নাম দেয়া হল লিপইয়ার (leapyear)। সুতরাং এঁদের হিসাবে যেবছরকে ৪ দিয়ে ভাগকরা চলে সেইবছরই হবে লিপইয়ার। ৩৬৫ দিনকে ভাগ করা হল ১২ মাসে। ১২ মাসের মধ্যে ৩১দিন করে পেল জানুয়ারি, মার্চ, মে, জুলাই, অগাস্ট, অক্টোবর আর ডিসেম্বর মাস। ৩০ দিন করে পেল এপ্রিল, জুন, সেপ্টেম্বর আর নভেম্বর। ফেব্রুয়ারিকে দেয়া হয় ২৮ দিন আর লিপইয়ারে ফেব্রুয়ারি মাস হবে ২৯ দিনের। কিন্তু এতেও সমস্যা মিটল না। ১৬০০ বছর এই ক্যালেন্ডার দিয়ে কাজ চলল। কিন্তু তখন দেখা গেল যে, ১০ দিনের হিসাবে গরমিল হয়ে গেছে। কারণ হল যে পৃথিবীর সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে লাগে ৩৬৫.২৪২২ দিন। তার মানে হল যে ১ বছরে ৭.৮ দিন বাড়তি ধরা হয়েছে। এই হিসাবে সংশোধন করার জন্য খ্রিস্টানদের ধর্মগুরু ত্রয়োদশ পোপ গ্রেগরি ১৫৮২ সনে ঠিক করলেন, শতাব্দীর যে বছরকে ৪০০ দিয়ে ভাগ করা যাবে না, সেই বছরকে লিপইয়ার বলে গণ্য করা হবে না। তার মানে সেই বছর ফেব্রুয়ারি মাস হবে ২৮ দিনের। এরফলে ১৭০০, ১৮০০ এবং ১৯০০ এই বছরগুলি লিপ-ইয়ার হবেনা। কিন্তু ২০০০ সাল হবে লিপ-ইয়ার। এই ক্যালেন্ডারের নাম হবে ‘গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার’। পৃথিবীর সর্বত্রই আজ এই গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার সমধিক পরিচিত। ভারতে ক্যালেন্ডারের প্রচলনঃ ভারত সরকার ২২ মার্চ ১৯৫৭ সালে ঠিক করলেন শকাব্দের পুনরায় প্রচলন করবেন। শকাব্দ মেনে চলে চান্দ্রমাস। শকাব্দ শব্দটি চালু হয়েছিল ৭৮ খৃষ্টাব্দে সম্রাট কনিস্কের সিংহাসনে আরোহণের তারিখ থেকে। ফলে শকাব্দ, খৃস্টাব্দের চেয়ে ৭৮ বছর পিছিয়ে রয়েছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও খ্রিস্টাব্দ ছাড়া তাদের নিজের নিজের আলাদা বর্ষপঞ্জি রয়েছে। প্রধানত এইসব পাজি বা ক্যালেন্ডারের উপযোগিতা তাদের ধর্মানুষ্ঠানের পালনের জন্যই তৈরি। ক্যালেন্ডার তৈরি বা সংশোধন করে ৩৬৫ দিনে ১২ মাস পাওয়া গেলো। মাসগুলি হল, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ এপ্রিল, মে, জুন, জুলাই, অগাস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর, এবং ডিসেম্বর। মাসের নামের উৎপত্তি জানুয়ারি হল বছরের প্রথম মাস। নামটি এসেছে রোমানদের দেবতা 'ইয়ানুস' বা 'জেনাস' থেকে। ফেব্রুয়ারি নামটি রোমানদের ফেব্রুয়াম (Februam) উৎসব থেকে এসেছে। মার্চ মাসের নামকরণ হল, রোমানদের যুদ্ধ-দেবতা মার্জ (Mars) থেকে। এপ্রিল মাসের নাম লাতিন শব্দ আপেরিরে (aperire) থেকে এসেছে, যার মানে হল খুলে-ধরা। সম্ভবত এই সময় ফুলের সৌন্দর্য দেখা দেয়, রবিশস্য কাটা হয় সেইজন্য এই নাম। এ্যাংলো-স্যাক্সনরা এই মাসের নাম রেখেছিল ঈস্টার-মাস। মে মাসের নাম এল রোমানদের দেবী মাইয়া (Maia) থেকে। জুন মাস সম্ভবত তার নাম পেয়েছিল স্বর্গের দেবী জুনিয়ুস (Junius) থেকে। জুলাই তার নাম পেল রোম-সম্রাট জুলিয়াস সিজার থেকে। ক্যালেন্ডার সংশোধনের কাজে বিরাট ভূমিকা ছিল এই জুলিয়াস সিজারের। অগাস্ট মাস রোমান সম্রাট আগাস্টাস থেকে আসে। সেপ্টেম্বর মাসের নাম হয়েছে লাতিন শব্দ সেপ্তেম (septem) থেকে। যার অর্থ সপ্তম। অক্টোবর লাতিন শব্দ ‘অক্তা’ থেকে আসছে, যার মানে হল অষ্টম। নভেম্বর হল ‘নোভেম’ থেকে। যার মানে নবম। ডিসেম্বর মাস হল লাতিন শব্দ ‘দেসেম’ থেকে। যার মানে দশম। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ ক্যালেন্ডারের ইতিহাস, উইকিপিডিয়া।