ডট কমের যুগে অনেকেই বলেন ছাপা অক্ষরের বই জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে। পাঠক কমে যাচ্ছে বইয়ের। কিন্তু বাস্তবে কিন্তু তা মোটেই নয়। বরং বই পিপাসুদের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। তবে ইন্টারনেটের দৌলতে মানুষ হয়তো অন স্ক্রিনেই প্রিয় বইটি পড়ে নিচ্ছে কিন্তু দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বই মেলা এমনকি আন্তর্জাতিক বই মেলা গুলিতে উপচে পড়া পাঠক, লেখক, প্রকাশক এবং বুদ্ধিজীবীদের ভিড় দেখলে সহজেই বলা যায় বই পিপাসুর সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। বিশ্বের কিছু বিশেষ বইমেলার গল্প বিশ্বের প্রথম বইমেলা হয়েছিল ফ্রাঙ্কফুর্টে। এই বইমেলা এখনও তার হারানো ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। ১৯৪৯ সালে এ মেলাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয় জার্মান প্রকাশক সমিতি। আর ১৯৬৪ সাল থেকে এ মেলার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মেলে। পিটার ওয়েডহাস এই মেলার একজন পরিচালক ছিলেন ১৯৭৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত। তাঁর একটা বই আছে, ‘আ হিস্টি অব দ্য ফ্রাঙ্কফুর্ট বুকফেয়ার’ (ফাঙ্কফুর্ট বইমেলার ইতিহাস) নামে। সেখানে তিনি লিখেছেন, রাজা অষ্টম হেনরি নাকি স্যার টমাস বোডলিকে এই বইমেলায় পাঠিয়েছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন লাইব্রেরির জন্য বই কিনতে। অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের বইমেলাকে বলা হয় ‘রিডারস অ্যান্ড রাইটারস ফেস্টিভ্যাল’ (পাঠক ও লেখকের উৎসব) । এগুলো বিভিন্ন শহরে এবং বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। মেলবোর্নে সাধারণত আগস্ট-সেপ্টেম্বরে, অকল্যান্ড শহরে এপ্রিল-মে মাসে। সারা পৃথিবী থেকে অনেক লেখক আসেন এখানে অংশ নিতে। বিভিন্ন সেমিনার, সাক্ষাৎকার, চা ও পাবের আড্ডা ইত্যাদির মাধ্যমে লেখক–পাঠকদের যোগাযোগ ঘটে। ঐতিহ্য অনুসারে বার্সেলোনার পুরুষেরা তাঁদের স্ত্রী, প্রেমিকা, বান্ধবী অথবা নারী আত্মীয়কে ফুল কিনে দেন। আর বিনিময়ে নারীরা তাঁদের একটা বই উপহার দেন।’ বার্সেলোনার এই বই উৎসব অনেক নামে পরিচিত। যেমন, সেন্ট জর্ডির দিন, সেন্ট জর্জের উৎসব, গোলাপের দিন, প্রেমিকের দিন ইত্যাদি। ১৫০৭ সালে সেন্ট জর্জের স্মরণে তাঁর মৃত্যুদিবস ২৩ এপ্রিলে শুরু হয়েছিল এই মেলা। তাঁকে নিয়ে একটা কিংবদন্তি আছে যে এক রাজকন্যাকে বাঁচানোর জন্য তিনি একটা ড্রাগন মেরেছিলেন। সেই ড্রাগনের রক্ত যেখানেই প্রবাহিত হয়েছে, সেখানেই গোলাপ ফুটেছে। এদিন তাই প্রেমিকেরা, প্রেমিকাদের গোলাপ উপহার দেন। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রেমিকারাও পাল্টা উপহার হিসেবে বই দিতে শুরু করেছিলেন। এখনকার সময় অবশ্য ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে সবাই সবাইকে বই ও গোলাপ দেয়। এমনি নানা ইতিহাস আর গল্পে সমৃদ্ধ বই আর বইয়ের ইতিহাস। বইয়ের পাতার প্রতিটি বাক্যের ভেতরে লুকিয়ে থাকা জ্ঞানকে আর যাই হোক, টাকার অঙ্কে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। বিশ্বে বেশ কিছু বই রয়েছে, যেগুলোর নামের পেছনে রয়েছে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এছাড়া এ বইগুলো এখন বিরলও। তাই এগুলোর মালিকানা পেতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেন না বইপ্রেমীরা। এখনও বইকে নিয়ে হাজারো রহস্য, অনেক গল্প আর ইতিহাসের ছড়াছড়ি। পৃথিবীর এমনও প্রাচীন পুঁথি, বই বা পাণ্ডুলিপি আছে যার পাঠোদ্ধার করা এখনও সম্ভব হয়নি। মোনালিসা ছবির শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্ছি’র লেখা বইয়ের মুল্য এখন প্রায় পাঁচ কোটি ডলার। ভাবা যায়! ইতিহাসের বিরল পাঁচ বই সবচেয়ে দামি বই ১৯৯৪ সালে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির ‘কোডেক্স লেস্টার’ নামের নোট বইটি নিউইয়র্কের ক্রিস্টিজ নিলাম সংস্থায় নিলাম করা হয়। বইটি কেনেন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি বিল গেটস। এটির মূল্য তিন কোটি আট লাখ ডলার ছিল। বইটির বর্তমান বাজার মূল্য ৪ কোটি ৯৮ লাখ ডলার। বলা হয় এই বইটি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান থেকে শুরু করে ইতিহাস, শিল্প-সংস্কৃতি, মহাকাশ বিজ্ঞান এমনকি ভিনগ্রহী প্রাণীদের সম্পর্কেও বহু অজানা তথ্যে ভরপুর। দীর্ঘতম বই ব্রিটিশ টেলিভিশন সিরিজ আগাথা ক্রিস্টির মিস মার্পল কাহিনীসমগ্রের বইটি ৩২ সেন্টিমিটার পুরু এবং ওজনে আট কিলোগ্রাম। ৪ হাজার ৩২ পাতার বইটিতে মিস মার্পলের (নাটকের চরিত্র) সমাধান করা ৩২টি গোয়েন্দা কাহিনী একত্রিত করা হয়েছে। হার্পার কলিন্স বইটির ৫০০ কপিতে সীমিত একটি বিশেষ সংস্করণ প্রকাশ করে। প্রাচীন ছাপা গুটেনবার্গ বাইবেল ছাপার ছয় শতাব্দী আগেই আরেকটি মুদ্রণ পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছিল ৮৬৮ সালে। বৌদ্ধধর্মের মহাযান সূত্রের প্রখ্যাত ‘হীরক সূত্রের’ এই চীনা সংস্করণটিকে বিশ্বের প্রাচীনতম মুদ্রিত বই বলে গণ্য করা হয়। এর বিষয় হল, বুদ্ধ ও তার এক শিষ্যের মধ্যে কথোপকথন। বইটির হরফ আর ছবিগুলো কাঠের ওপর খোদাই করে তার ওপর রং লাগিয়ে পরে কাগজে ছাপা হয়েছিল। সবচেয়ে ক্ষুদ্রাকৃতির বই দেখতে সমস্যা হচ্ছে? এক মিলিমিটারের ১০০ ভাগের ৭৪ ভাগ বাই ৭৫ ভাগ। জাপানের এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বইটি বিশ্বের সবচেয়ে ছোট বইয়ের রেকর্ডধারী। বইটির নাম ‘শিকি নো কুসাবানা’ যার অর্থ ‘মৌসুমি ফুল’। পৃষ্ঠা সংখ্যা ২২। বইটিতে বিভিন্ন ফুলের নামসহ ছোট ছোট ছবি আছে। হরফের মাপ হল এক মিলিমিটারের ১০০ ভাগের এক ভাগ। প্রকাশক তোপ্পান প্রিন্টিং টাঁকশালে টাকা ছাপানোর প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই বইটি ছাপেন। রহস্যময় বই রহস্যময় এই পাণ্ডুলিপিটি লেখা হয়েছে এক অজ্ঞাত ভাষায় ও হরফে। অলঙ্করণের ছবিগুলোতে আছে নানা ধরনের নাম না জানা গাছপালা। এছাড়া অদ্ভুত সব দৃশ্য, যেমন চৌবাচ্চায় স্নানরত সব নগ্ন সুন্দরী। আধুনিক স্নানাগারের মতোই। আধারগুলো আবার নানা ধরনের পাইপ দিয়ে জোড়া। বইটি নাকি পঞ্চদশ শতাব্দীর এবং এককালে সম্রাট দ্বিতীয় রুডলফের সম্পত্তি ছিল এই বইটি। পরে কাগজে ছাপা হয়েছিল। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী বিক্রি হওয়া তিনটি বই শিরোনাম লেখক/লেখিকা ১ দ্য ভিঞ্চি কোড (The Vinci Code) ড্যান ব্রাউন ২ হ্যারি পটার এন্ড দ্য ডেথলি হ্যালোজ (Harry Potter and the Deathly Hallows) জে কে রাউলিং ৩ হ্যারি পটার এন্ড সরসেরাস স্টোন (Harry Potter and the Sorcerer’s Stone) জে কে রাউলিং এছাড়াও বিশ্বের সবচেয়ে বেশী পঠিত এবং বিক্রি হওয়া বইয়ের তালিকায় প্রথমেই রয়েছে বাইবেল। লেখক জেমস চ্যাপম্যান গত পঞ্চাশ বছরে বিক্রি হওয়া প্রতিটি বইয়ের কপির সংখ্যার উপর ভিত্তি করে বিশ্বের সবচেয়ে বেশী পড়া বইগুলির একটি তালিকা প্রস্তত করেছেন। এতে দেখা যায় বাইবেল সবচেয়ে বেশী বিক্রি হয়েছে এবং পঠিত হয়েছে। এরপরেই রয়েছে কোরান। ডিজিটাল বই মেলা কবি জিবনানন্দ দাশ বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর সব রং মুছে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন…’ তাই হয়েছিল মহামারীকালে। কোভিডে মহামারী কালে বহু বইমেলাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে হয়েছে এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোন টিকিট কাটতে হয়নি বই পিপাসুদের। দেশ–বিদেশের লেখকদের সঙ্গে যোগাযোগ, আবার তাঁদের ঘর, লাইফস্টাইল, লেখার জায়গা আরও কত কিছু যে এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সাধারণ পাঠক দেখতে পেল তা বলে শেষ করা যাবেনা। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের যেসব মেলায় কোনোদিন যাওয়া সম্ভব হতো না, সেখানেও হাজির হয়ে গিয়েছিল বই পিপাসুরা। ‘হে ফেস্টিভ্যাল’ থেকে শুরু করে ‘বুকার প্রাইজ’, ‘ডাবলিন বইমেলা’ সবই হল অনলাইনে। বইয়ের বিক্রিও কোন কোন দেশে অনেক বেড়েছে। মহামারীতে ঘরবন্দী মানুষ বইয়ের ভেতর হারিয়ে অ্যাডভেঞ্চার খুঁজেছে। যদিও নিউ নর্মালে এখন আবার শুরু হয়েছে বই মেলা তরতাজা বইয়ের মিষ্টি গন্ধ আর অসাধারন রুপ নিয়ে। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া