‘এক আনা, দুই আনা, তিন আনা নেবো না, নেবো ষোল আনা / ষোল আনা না দিলে যমুনা পাড় করিনা…’ বাংলার লোককাব্যে এবং লোকগানে এই গল্প এবং গানটি খুব জনপ্রিয়। শ্রীকৃষ্ণার প্রেমকে প্রত্যাখ্যান করে শ্রীরাধিকা যমুনা পাড় হয়ে হাটে চলে গেলেন দুধ, ননী, মাখন বিক্রি করতে সখীদের নিয়ে। হাট থেকে ফেরার সময় শ্রীকৃষ্ণা যমুনার তীরে পথ আটকে দাঁড়ালেন শ্রীরাধিকার। শ্রীকৃষ্ণা, শ্রীরাধিকাকে বললেন, ষোল আনা কর না দিলে যমুনা পাড় হওয়া যাবেনা। শেষে বাধ্য হয়ে শ্রী রাধিকা হার মানলেন শ্রী কৃষ্ণার কাছে। চলল দর কষাকষি। এই গল্পটি থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট মহাভারতের যুগেও মুদ্রা, অর্থ, কর ব্যাবস্থা, বাজার-হাট এবং অর্থনীতিতে মেয়েদের ভূমিকা যথেষ্টই শক্তিশালী ছিল। মহাভারতের এই গল্পকে যদি ইতিহাস প্রমান করার সুযোগ পায় তাহলে ভারতের কর ব্যবস্থা এবং অর্থ ব্যবস্থার এক নতুন দিক উন্মোচিত হতে পারে। অর্থ ছাড়া যেমন জীবন চলেনা তেমনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে অর্থই কাল হয়ে দাড়ায় এটাও সত্যি। যাই হোক আজ যে নোট আমরা দেখি সাধারণত এর প্রবর্তনে সময় লেগেছে কয়েক হাজার বছর। প্রাচীন সভ্যতায় বিনিময় প্রথা চালু ছিল। অর্থাৎ ধানের পরিবর্তে আখ বা তুলো বা অন্য কিছু। আর জানেন কি এই তুলোই কিন্তু অর্থ তৈরির নেপথ্যে। ভারতীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং রাজনীতির সঙ্গে জুড়ে আছে এই অর্থের বিবর্তন। জেনে নেয়া যাক টাকার বিবর্তনের ইতিহাস। প্রাচীনকালে বিনিময় প্রথা চালু ছিল, অর্থাৎ এক জিনিসের বিনিময়ে অন্য জিনিস ক্রয় বিক্রয় হতো। প্রাচীন সভ্যতায় বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে সিলমোহরের প্রচলনও দেখতে পাওয়া যায়। তবে মুদ্রা এসেছে প্রাচীন গ্রীসের লিডিয়ানদের হাত ধরে প্রথম। সময়টা ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। প্রায় কাছাকাছি সময়ে ভারতবর্ষেও মুদ্রার প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। আজকের ভারতীয় উপমহাদেশের এই মুদ্রার বিবর্তনে শেষবার পরিবর্তন এসেছে ২০১০ সালে। এরপরেই ভারতীয় মুদ্রাকে ‘রুপি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ২০১০ সালের ১৫ জুলাই ভারতের কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট রুপির একটি প্রতীক নির্বাচন করেন। এই নতুন প্রতীক ‘ ’ টি দেবনাগরী "र" (র) ও রোমান বড় হাতের "R" অক্ষরদুটির সংমিশ্রণে তৈরি করা হয়। পাঞ্চমার্কড মুদ্রা ভারতের প্রথম মুদ্রা হিসেবে ধরা হয় খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ এবং ৫ম শতকে আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেটের ভারত আক্রমণের আগের সময়ের মুদ্রাকে। এই উপমহাদেশের বিভিন্ন শহর এবং তার আশেপাশের গান্ধার, কুন্তলা, কুরু, শাক্য, সৌরসেনা, সৌরাষ্ট্র ইত্যাদি অঞ্চলে এই ধরনের মুদ্রার প্রচলন ছিল। মুদ্রাগুলোর বেশিরভাগই ছিল রূপার। তবে মুদ্রা তৈরিতে তামাও ব্যবহৃত হত। বড় রূপা কিংবা তামার পাত থেকে পাতলা করে কেটে, ভারী কোনো ধাতব পদার্থ দিয়ে তার ওপর বিভিন্ন চিহ্ন খোদাই করে সেই সময় মুদ্রাগুলো তৈরি হতো। এজন্য মুদ্রাগুলোকে পাঞ্চমার্কড মুদ্রা বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সৌরাষ্ট্রের মুদ্রাগুলোতে দেখা যেত কুঁজো ষাড়, মগধের মুদ্রাগুলোতে দেখা যেত বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক পশু পাখী ইত্যাদির চিহ্ন আঁকা। গান্ধারা জনপদ ও মৌর্য সাম্রাজ্যের মুদ্রা পরবর্তীতে মৌর্য যুগে এসে প্রথম রাজকীয় মুদ্রা দেখা যায়। বিভিন্ন জ্যামিতিক প্রতীক এবং প্রাকৃতিক নিদর্শন, যেমন, সূর্য, গাছ, প্রাণী ইত্যাদি আঁকা বা খোঁদাই করা ছিল মুদ্রাগুলোতে। চাণক্যের অর্থশাস্ত্রে এই মুদ্রার বিষয়ে বিশেষ উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি মুদ্রাকে ‘রূপা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। যেমন: রৌপ্যরূপা বা রৌপ্যমুদ্রা, সুবর্ণরূপা বা স্বর্ণমুদ্রা, তামারারূপা বা তাম্রমুদ্রা, শীষারূপা ইত্যাদি। ধারনা করা হয় চাণক্যের সময়ে অর্থনীতির আমূল পরিবর্তন হয়েছিল। মগধের মুদ্রা এগুলো ছিল বিভিন্ন আকৃতির, তবে ওজন ছিল নির্দিষ্ট। পাণিনির অষ্টাধ্যয়ী কিংবা বিভিন্ন বৌদ্ধ গ্রন্থ থেকে এ মুদ্রাগুলোর নাম পাওয়া যায় পণ, কর্ষপণ বা কাহাপণ, নিক্ষ বা নিষ্ক, ভীমশটিকা, তৃণশটিকা, সুবর্ণ ইত্যাদি। বেশিরভাগ মুদ্রাই ছিল আয়তাকার। তবে গোল কিংবা চতুষ্কোণ আকৃতির মুদ্রাও ছিল। মোটা দাগে চার ভাগে এগুলোকে ভাগ করা যায়। ট্যাক্সিলা-গান্ধারা টাইপ, কোষালা টাইপ, অবন্তী টাইপ এবং মগধান টাইপ। মুদ্রাগুলোতে বিভিন্ন চিহ্ন খোদিত থাকলেও এমন কিছু উৎকীর্ণ করা থাকত না যা দেখে সেই সময়ের রাজ্য কিংবা সমসাময়িক অন্য কোনো তথ্য পাওয়া যাবে। পাঞ্চমার্কড বা এই ধরনের খোদাই করা মুদ্রাগুলো প্রথম কয়েক শতাব্দী অবধি যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল। এই মুদ্রা দিয়েই চলতো লেনদেন। গুপ্ত যুগ বা স্বর্ণ যুগের মুদ্রা গুপ্ত যুগেই স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন শীর্ষে পৌঁছায় ভারতে। তাই এই গুপ্ত যুগকে বলা হয় স্বর্ণযুগ। ৩য় শতক থেকে ৬ষ্ঠ শতক পর্যন্ত সময়কালকে গুপ্ত যুগ হিসেবে অভিহিত করা হয়। গুপ্ত শাসক কর্তৃক যে স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন ঘটে তা অন্যান্য মুদ্রার তুলনায় ছিল অনেক সমৃদ্ধ। মুদ্রাগুলো সাধারণভাবে দিনার নামে পরিচিত ছিল। ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা এই মুদ্রাগুলোর একদিকে খোঁদাই করা থাকতো সংস্কৃত গল্প-গাথা, দেব-দেবী। বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হতো হিন্দুদের ধন সম্পদের দেবী শ্রীলক্ষ্মীর প্রতিকৃতি এবং অন্যদিকে থাকত সেই সময়কার শাসকের প্রতিকৃতি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যেখানে অন্যান্য সাম্রাজ্যের মুদ্রায় রাজার যুদ্ধংদেহী প্রতিকৃতি খোঁদাই করা হতো সেখানে এই মুদ্রাগুলো ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। আধুনিক মুদ্রা এরপর যুগে যুগে মুদ্রার বিবর্তন হয়েছে। ১৮ শতকে এসে কাগজের নোটের সাথে পরিচয় ঘটে ভারতবর্ষের ইউরোপীয় বাণিজ্য কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে। মুদ্রা থেকে নোট কিংবা আধুনিক অর্থব্যবস্থায় পৌঁছাতে লেগে গেছে কয়েকশ বছর। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতবর্ষের অর্থব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়। সেই সঙ্গে নোট এবং মুদ্রাতেও আসে অনেক পরিবর্তন। মুদ্রা যে শুধুমাত্র একটি দেশ কিংবা রাজ্যের অর্থনৈতিক পরিচায়ক তাই শুধু নয়। সেই সময়কার সাংস্কৃতিক, সামাজিক অবস্থা, রুপকথা, ধর্ম ইত্যাদি সম্পর্কেও একটা সম্যক ধারনা দেয়। বিভিন্ন সময়ের সাক্ষী এই মুদ্রাগুলো। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া, উইকিপিডিয়া