টাকা কি দিয়ে তৈরি হয়? যদি অনেক টাকা থাকতো অথবা একটা মেশিন যদি থাকতো টাকা ছাপানোর তাহলে ঠিক কি হতে পারতো? এক সময় পৃথিবীতে টাকা বলে কিছু ছিলনা। পৃথিবীর যাবতীয় সবকিছুর মালিকানা ছিল সাধারণ মানুষ। কিন্তু ধীরেধীরে মানুষের মধ্যে দখলদারীর একটা প্রবণতা দেখা দিল। যুদ্ধ বিগ্রহ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা অন্য কোন কারনে মানুষ অসহায়। আর তখনই শুরু হল দেয়া আর নেয়ার পালা। কোন জিনিষের বিনিময়ে আরেকটা জিনিষ। এইভাবেই একদিন মানুষ মুদ্রা বা টাকার উদ্ভাবন করলো। এখন তো ডিজিটাল টাকার যুগ। ক্রিপ্টো কারেন্সি, বিটকয়েন, কার্ড, নেট ব্যংকিং ইত্যাদি নিয়েই ব্যস্ত মানুষ। একদিন হয়তো সত্যিই উধাও হয়ে যাবে এই কাগজের নোট বা মুদ্রা। কিন্তু এই অর্থের জন্যই আজ মানুষ সারাদিন খাটছে। কিন্তু কি দিয়ে তৈরি এই নোটগুলি? টাকা কি দিয়ে তৈরি? টাকা কাগজ দিয়ে তৈরি এই উত্তরটাই স্বাভাবিক। কারণ আমাদের দেশে যে সব টাকার নোট দেখি, সেগুলি তো কাগজেরই তৈরি। কিন্তু আসলে তা নয়। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার দেয়া তথ্য কিন্তু অন্য কথা বলছে। আর সেই তথ্য জানলে সত্যিই অবাক হতে হয়। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তথ্য অনুযায়ী, টাকার নোট শুধু কাগজের তৈরি হলে সেগুলি বেশি টেকসই হবে না। কারন কাগজ টেকসই নয় যেকোনো সময় তা ছিরে যেতে পারে, নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এখন নিশ্চই প্রশ্ন জাগছে তা হলে ভারতে টাকার নোট কী দিয়ে তৈরি করা হয়? রিজার্ভ ব্যাঙ্ক বলছে, নোট তৈরির অন্যতম প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হল তুলা। টাকার নোট তৈরিতে ১০০ শতাংশ তুলা ব্যবহার করা হয়। শুধু ভারতই নয়, অনেক দেশেই নোট তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে তুলো ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তুলোর মধ্যে যে তন্তুগুলি থাকে তাকে লিনেন বলে। নোট তৈরির সময় তুলোকে ‘জিলেটিন অ্যাডেসিভ’ সলিউশনের সঙ্গে মেশানো হয় যাতে তা আরও টেকসই হয়। ফলে টাকার নোট সহজে ছেঁড়ে না বা নষ্টও হয়ে যায়না। এতোদিন ভারতীয় টাকার কোন নিজস্ব প্রতীক ছিলনা। কিন্তু ২০১০ সালে ভারত সরকার টাকার একটি নতুন প্রতীক নির্বাচন করেন। এর ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুদ্রা যেমন ডলার বা পাউন্ড, ইউরো, ইয়েনের মতো ভারতীয় টাকারও একটি নিজস্ব প্রতিকচিহ্ন হয়। ভারতীয় টাকার নতুন প্রতীক '₹' ২০১০ সালের ১৫ জুলাই ভারতের কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট রুপির একটি প্রতীক নির্বাচন করেন। এই নতুন প্রতীক হল ‘₹’। এই অক্ষরটি দেবনাগরী ‘र’ (র) এবং রোমান বড় হাতের "R" অক্ষরদুটির সংমিশ্রণে তৈরি হয়। এর আগে Rs. (একবচনে Re.) কথাটিকে রুপির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হত। ব্রিটিশ আমলের মুদ্রা প্রথমদিকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মোঘল রীতি অনুসারে মুদ্রাগুলি তৈরি করতো। ১৭১৭ সালে প্রথমবারের মতো মুম্বাই টাকশালে ইংরেজরা তাদের নিজস্ব ধাঁচের মুদ্রা তৈরি করতে শুরু করে। এই স্বর্ণমুদ্রার নাম দিয়েছিল ‘ক্যারোলিনা’। রৌপ্যমুদ্রার নাম ছিল ‘এঞ্জেলিনা’, এবং তামার মুদ্রার নাম ছিল ‘কাপেরুন’। ব্রিটিশরা টিন দিয়েও মুদ্রার প্রবর্তন করেছিল। টিনের মুদ্রাগুলিকে বলা হত ‘টিনি’। পরবর্তীতে ১৮৩৫ সালে মুদ্রা আইন (Coinage act 1835) জারি করে অভিন্ন মুদ্রার প্রচলন করে। নতুন মুদ্রার একপিথে রাজা চতুর্থ উইলিয়ামের প্রতিকৃতি আর অন্যপাশে ইংরেজি ও ফারসি ভাষায় মুদ্রার নাম মুদ্রিত করা হয়। ছবিঃ রানী ভিক্টোরিয়া মোহর। ১৮৪০ সাল থেকে মুদ্রায় রানী ভিক্টোরিয়ার প্রতিকৃতি দেখতে পাওয়া যায়। ভারতীয় মুদ্রা আইন ১৯০৬ (The Indian Coinage Act) জারি করে টাঁকশাল স্থাপন করা হয়। এই সময় তামার মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় তামার বদলে নিকেল ব্যবহার শুরু ব্রিটিশ। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রূপার দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। সেই সময় থেকেই রৌপ্যমুদ্রা সংরক্ষণ করে রাখার রীতি শুরু হয়। ফলে ক্রমেই রৌপ্যমুদ্রার ব্যবহার কমতে থাকে। এই সময়ে রূপার সাথে আরও তিন ধরনের ধাতু মিশিয়ে নতুন মুদ্রার প্রচলন হয়। ১৯৪৭ সালে এই মুদ্রার পরিবর্তে নিকেল মুদ্রার প্রবর্তন হয়। কাগজের নোট ১৮ শতকে ইউরোপীয় বাণিজ্য কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে কাগজের নোটের সাথে পরিচয় ঘটে ভারতবর্ষের মানুষের। এই সময় বাণিজ্যের প্রসারের সাথে সাথে টাকার বা নোটেরও প্রসারও ঘটতে থাকে। পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসন কালে ব্যাংক অফ হিন্দুস্থান, দ্য জেনারেল ব্যাংক অফ বেঙ্গল এন্ড বিহার, দ্য বেঙ্গল ব্যাংক প্রথম কাগজের মুদ্রা বাজারে নিয়ে আসে। তবে কিছুদিনের মধ্যেই এই ব্যাংক তিনটিই বন্ধ হয়ে যায়। ১৮০৬ সালে, ‘দ্য ব্যাংক অফ ক্যালকাট্টা’ প্রতিষ্ঠিত হয় । ১৮০৯ সালে এই নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘দ্য ব্যাংক অফ বেঙ্গল’। এখান থেকেই পরবর্তীতে কাগজের নোট জারি হতে শুরু করে। ১৮৬১-তে কাগুজে মুদ্রা আইন (The Paper Currency Act of 1861) জারি করা হয়। এতে করে বেসরকারি ব্যাংকগুলো তাদের নোট জারি করার ক্ষমতা হারায়। এই সময় নোট ছাপা হত দ্য ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড থেকে। নোটগুলো ছিল দুটি ভাষায় এবং রানী ভিক্টোরিয়ার ছবি সংবলিত। ১৯৩৫ সালে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া (RBI) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে পর্যন্ত ব্রিটিশ ভারত সরকার কর্তৃকই নোট ইস্যু হতে থাকে। ১৯৩৮ সালে রাজা ষষ্ঠ জর্জের ছবি সংবলিত প্রথম নোট জারি করে RBI বা রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া, উইকিপিডিয়া ছবিঃ দ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি