লিওনার্দো-দ্য-ভিঞ্চির আঁকা ‘মোনালিসা’ ছবিটি নিয়ে এখনও কত অজানা তথ্য বেড়িয়ে আসছে প্রতিদিন। এখনও এই ছবিটি নিয়ে বিশ্বের মানুষের হাজারো জিজ্ঞাসা আর কৌতূহল। এখনও পর্যন্ত ‘মোনালিসা’ ছবিটি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম গুলির মধ্যে একটি। ঠিক তেমনি প্রসিদ্ধ র্যাফাইল, পিকাসো, সেজান, এঁদের প্রত্যেকের আঁকা প্রতিকৃতি গুলি। এই প্রতিকৃতি গুলিতে আলো-ছায়ার এক অপরূপ মায়াজাল সৃষ্টি করেছেন শিল্পীরা। তাই এই ছবি গুলির এতো কদর। ভারতবর্ষে প্রতিকৃতি অঙ্কন বিদেশী শিল্পে তো বটেই ভারতীয় শিল্পেও রয়েছে বিশ্ব বিখ্যাত কিছু শিল্পকর্ম। ভারতবর্ষে প্রতিকৃতি অঙ্কন শুরু হয় মোঘল সম্রাটদের আমল থেকে। আধুনিক রবিবর্মা, অতুল বোসের মতো শিল্পীরা পাশ্চাত্য রীতিতে প্রতিকৃতি আঁকতেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যামিনী রায় প্রভৃতি শিল্পীরাও প্রতিকৃতি আঁকতেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথের যে প্রতিকৃতি এঁকেছিলেন সেটি প্যাস্টেলের মাধ্যমে এঁকেছিলেন। এইসব কয়টি শিল্পই বিখ্যাত প্রতিকৃতি হিসেবে সারা বিশ্বে সমাদৃত। ভারতীয় শিল্পে প্রতিকৃতি অঙ্কন শুরু হয় মোগল সম্রাটদের সময় থেকে। সম্রাট জাহাঙ্গীর চিত্র শিল্পের একজন উঁচু দরের সমঝদার ছিলেন। তিনি নিয়ম করে প্রতি সপ্তাহে শিল্পীদের বাড়িতে গিয়ে প্রতিটি ছবির কাজ লক্ষ্য করতেন। ছবির গুনাগুণ সম্পর্কে মতামত দিতেন এবং শিল্পীদের খোঁজ খবর করতেন। জাহাঙ্গিরের সময়ে আঁকা ভারতীয় ছবিগুলি সেই সময় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আঁকা শিল্পকর্ম গুলির সঙ্গে সমানভাবে পাল্লা দিতে পারত। ছোট ছোট প্রতিকৃতি হলেও রঙ, রেখা, অঙ্কনশৈলীতে এইসময়ে আঁকা ছবিগুলি ছিল যথেষ্ট উৎকৃষ্ঠ। সেই সময়ে বেগমদের প্রতিকৃতি আঁকা হতো। বেগমদের ওপরে বসিয়ে নীচে একটা বড় গামলায় জল রেখে সেই জলেতে বেগমের প্রতিবিম্ব দেখে শিল্পীরা ছবি আঁকতেন। বেগমদের প্রতিকৃতি প্রায় একই রকম হতো পোশাক পরিচ্ছদ এবং গয়না অলঙ্কারে। নূরজাহান ছিলেন খুব আধুনিকা। তিনি মাঝে মাঝেই শিল্পীদের সামনে এসেই নিজের প্রতিকৃতি অঙ্কন করাতেন। জাহাঙ্গিরের সময় হাতীর দাঁতের উপর টেম্পারা পদ্ধতিতে প্রতিকৃতি আকার প্রচলন ছিল। ছোট ছোট প্রতিকৃতিগুলি উজ্জ্বল ও পরিচ্ছন্ন হয়ায় শিল্পীদের কাজের বেশ প্রশংসা ছিল। তেল রঙের অঙ্কন পদ্ধতি কখন এবং কোথায় আবিষ্কৃত হয়েছিল? ১৪০০ সালে ফ্রেমিশ শিল্পী হুবাট ভ্যান-আইক এবং জন ভ্যান-আইক দুজনেই কলোগেনির দূরবর্তী ম্যাইচট্রিক-এ জন্মগ্রহণ করেন। এই দুই ভাই প্রথম রেনেসাঁসের যুগে এসেছিলেন। চিত্রশিল্পে এই আইক ভ্রাতৃদ্বয় তৈলচিত্র আবিষ্কর্তা হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। তেল রঙের আবিস্কারক দুই ভাই প্রাচীনকালে শিল্পীরা টেম্পারা রঙে চিত্রাঙ্কনে নানাহ অসুবিধায় পড়তেন। এই অসুবিধা দূর করার জন্য পরীক্ষানিরীক্ষা করে দেখলেন যে রঙের সঙ্গে আঠা বা ডিম, জলের মিশ্রণের পরিবর্তে যদি তেল মিশ্রিত করেন তাহলে সেই রঙ দীর্ঘস্থায়ী হয়। তাই এই দুই ভাই নানা রঙের সঙ্গে তেল মেশাতে শুরু করেন। তিসির তেল, অলিভ তেল বা বাদাম তেল মিশিয়ে প্রথমে এক্সপেরিমেন্ট চলে। শেষপর্যন্ত দেখা যায় তৈল চিত্রের জন্য উপযুক্ত হচ্ছে তিসির তেল। আইক ভ্রাতৃদ্বয়ের এই আবিস্কার চিত্রশিল্পের জগতে নতুন যুগের সৃষ্টি করে। তারা তৈল চিত্রের আবিস্কারের এই কৌশল গোপন করে যায়। অন্য শিল্পীরা টেম্পেরা পদ্ধতিতে তখন কাজ করতেন। তাতে তাঁরা নানা অসুবিধার সম্মুখীন হতেন। বিশ্বের প্রাচীন ছবি দুই ভাইয়ের তেল রঙের আবিস্কারের ফলে নতুন যুগের সুচনা হল। তেল রঙে আঁকা প্রথম ছবিটির নাম, ‘অ্যাডোরেশান অফ-দ্য-ল্যাম’ বা মেষ শাবকের পুজা। দুই ভাই মিলিত ভাবে এই ছবিটি আঁকেন ১৪২০ সালে। এটিই বিশ্বের প্রাচীন তৈল চিত্র। শিল্প জগতে বিখ্যাত এই ছবিটি সেন্ট বেভদ গির্জায় রাখা আছে। ভারতীয় চিত্রকলায় হিন্দু ধর্মের প্রভাব ভারতীয় চিত্রকলায় হিন্দু ধর্মের প্রভাব অনেকটাই। রাধাকৃষ্ণের পবিত্র প্রেম, শ্রীরামচরিত, হরপার্বতী, এই সব বিষয়ে শিল্পীরা বেশ পরিণত মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। রাজা ইন্দ্রজিত সাঁয়ের সভাপণ্ডিত কবি কেশব দাস ‘রসিকপ্রিয়া’ কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। এই বইয়ে ৪৪টি ছবি আঁকা রয়েছে। এই ছবিগুলি পারস্য রীতিতে আঁকা বলে মনে করা হয়। পাল রাজবংশের সময়ে কৃষ্ণলীলা নিয়ে আঁকা ছবি গুলিও বেশ সুন্দর। এই ছবিগুলিতে লাল, নীল, হলুদ ও সবুজ রঙের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো। কাংড়া শিল্পকলায় শ্রীরাধার অর্ধনায়িকার ভাব অপূর্ব দক্ষতায় শিল্পীরা তুলে ধরেছেন। ভারতীয় চিত্রকলায় হিন্দু ধর্মের চিত্রাবলী বিভিন্ন সময়ে সাবলীল ভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ভারতীয় চিত্রকলায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবঃ শুভ্রতার প্রতীক বৌদ্ধধর্ম। বৌদ্ধ ধর্মের আদর্শ ও শিক্ষার প্রসারে ভারত তীর্থভূমি। অজন্তার গুহাচিত্র বৌদ্ধ ধর্মের ভাবাদর্শে অঙ্কিত। ছবির মধ্যে বোধিবৃক্ষের পুজা, ছদন্ত জাতক, শ্যামা জাতক অপূর্ব সৃষ্টি। দে পদ্ধতি বুদ্ধদেবের জন্মের বহুদিন পরেও চিত্রশিল্পীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। যক্ষ পদ্ধতিতে আঁকা ছবি গুলি ছিল খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় দশকে। দে পদ্ধতির সঙ্গে সাদৃশ্য চিত্রশিল্পী বিম্বিসারের ছবি বৌদ্ধ যুগে চিত্রিত হয়েছিল। শিল্পীদের অলঙ্করণ লালিত্য ও বিন্যাসে ছিল রমণীয়। শিল্পরা গোলাপি বা পিঙ্ক, গ্রে এবং সবুজ রঙ বেশী ব্যাবহার করতেন। শিল্পীদের দর্শন ও মননে ছবিগুলি জীবন্ত হয়ে উঠত। ইসলামিক চিত্রকলার বৈশিষ্ট ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মহম্মদ। তাঁর আগে আরবের বাসিন্দারা ছিলেন যাযাবর। তাঁরা অস্থায়ী তাঁবুতেই থাকতেন। ৬১০ খৃস্টাব্দের সময় থেকে তাঁরা সংস্কৃতির প্রয়োজনীয়তার কথা উপলব্ধি করেন। এই ধর্মের দর্শন একেশ্বরবাদ ও বাইজ্যান্টাইন-এর সঙ্গে একাত্ম হয়ে আছে। ইসলাম ধর্মে বন্ধন ছিল। এজন্যে শিল্প যেভাবে বিকশিত হওয়ার কথা ছিল ততটা হয়নি। তাঁরা একের প্রতি আসক্ত। সেখানেই তাঁরা উজ্জ্বল। তাঁদের মসজিদ নির্মাণ কৌশল এবং স্থাপত্য সত্যিই বিস্ময়ের। আরবের কাবা মসজিদ মহান কীর্তির কথা ঘোষণা করেছে। কাবার মাঝখানে গামলার মতো হারেম। হারেমের চারদিকে রয়েছে সমান দূরত্বে স্তম্ভের মতো ছোট ছোট গম্বুজ যা সত্যিই আকর্ষণীয়। মক্কা শরিফের দিকে সারি সারি প্রার্থনাগৃহ। দক্ষিণে ধর্ম প্রচার মঞ্চ আর উত্তরে বেষ্টনিবদ্ধ মঞ্চ। এখানে মাকসের রাখা থাকে। এতে খলিফা বসেন। এখানকার দেয়াল এবং মঞ্চগুলিতে দারুন সব চিত্র আঁকা রয়েছে। কোরাণের বানীও লেখা থাকে মসজিদ গুলিতে। এছাড়াও শিল্পকলার বিভিন্ন নিদর্শন পাওয়া যায়। মুসলমান শিল্পে মিনিয়েচার পদ্ধতির প্রয়োগ দেখা যায়। শিল্পের জগতে এর মুল্য অসাধারন এবং গৌরবের। বাইজ্যান্টাইন চিত্রকলা ইউরোপের পূর্ব দিকে তুরস্ককে কেন্দ্র করে বাইজ্যান্টাইন চিত্রকলার সৃষ্টি। এই চিত্রকলা এশিয়ার প্রায় সর্বত্রই গৃহীত এবং স্মাদ্রিত। রোমান সম্রাট উনার রাজধানী গ্রীক থেকে বাইজ্যান্টাইনে স্থানান্তরিত করেন। এই রাজধানীর নাম দেয়া হয় কনস্ট্যান্টিনোপল। রোম সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন-এর আমল থেকে তুর্কি সাম্রাজ্য চালু হওয়া পর্যন্ত বাইজ্যান্টাইন চিত্রশিল্প বিশ্ববন্দিত ছিল। সম্রাট খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন এবং বহু গীর্জার প্রতিষ্ঠা করেন। মোজাইকের মাধ্যমে বাইবেলের কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে সেই সব গীর্জায়। ভেনিসের সেন্টমার্ক গীর্জা, সেন্ট সোফিয়া গীর্জা, বাইজ্যান্টাইন চিত্রকলার অপূর্ব নিদর্শন। বাইজ্যান্টাইন সম্রাটের সঙ্গে বহু ব্যবসায়ী বাড়ি ও গীর্জা তৈরি করেন। তাতে এই ক্যটাকম পদ্ধতিতে বহু চিত্রকলা অঙ্কিত করা হয়। ইউরোপিয় চিত্র রীতিতে বহুদিন বাইজ্যান্টাইন-এর প্রভাব ছিল। এই চিত্র শিল্পীরা প্রাকৃতিক চিত্রের মধ্যে জীবিত মানুষ ও পশুপাখি, ফুল-ফল দিয়ে ছবিগুলিকে আকর্ষণীয় করে তুলতেন। এছাড়াও রঙিন কাঁচকে কেটে সীসার মতো ফিতে দিয়ে কাচের পর কাচ সাজিয়ে স্টেনগ্লাসের কাজ করা হতো। অপরূপ ছিল সেই চিত্রকর্ম। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ ভারতের শিল্পকলার ইতিহাস।