‘যুদ্ধ নয় শান্তি চাই’ আজ এটাই পৃথিবীর স্লোগান। ২০২১-২২ সালে আমরা দেখলাম দুটি দেশের যুদ্ধ। প্রথমে আফগানিস্থান চলে যাচ্ছে তালিবানের দখলে। এরপর রাশিয়া বনাম ইউক্রেন। এই ভয়াবহ যুদ্ধের পরিস্থিতিতেই আমরা এই প্রতিবেদনে দেখে নেবো পৃথিবীর যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। মানবতার মারাত্মক ক্রিয়াকলাপ এই যুদ্ধ। খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে পৃথিবীর ইতিহাসে কমপক্ষে ২০০০ টিরও বেশি যুদ্ধ হয়েছে। ঠিক কত মানুষ মারা গেছে, তার পরিসংখ্যান নেই পৃথিবীর কোন সংরক্ষণাগারে। নেই কোনও ডেটা। তবে বিংশ শতাব্দীতে, যুদ্ধে প্রায় ২৫৮ মিলিয়ন মানুষ মারা গেছে বলে ধারনা। সংখ্যাটা আরও বেশী হতে পারে। ডাব্লু ডব্লিউ আই আই (ওয়ার্ল্ড ওয়ারঃ ওয়ান/WW1) প্রথম বিশ্বযুদ্ধে কুড়ি (20) মিলিয়ন সৈন্য এবং ১৬৫ (165 মিলিয়ন) বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে বলেই ধারনা। আজকের যুদ্ধে, নিহতদের মধ্যে নিরীহ সাধারণ মানুষই বেশী। এরমধ্যে বেশিরভাগই মহিলা, শিশু, বৃদ্ধ এবং দরিদ্র অংশের মানুষ। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী যুদ্ধ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৭৭৬ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত মার্কিন সেনারা, ২৩৪ টি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। মার্কিন বাহিনী, আফগানিস্তান, অ্যাঙ্গোলা, আর্জেন্টিনা, বসনিয়া, কম্বোডিয়া, এল সালভাদর, গ্রেনাডা, হাইতি, ইরান, ইরাক, কসোভো, কুয়েত, লেবানন, লিবিয়া, নিকারাগুয়া, পাকিস্তান, পানামা, ফিলিপাইনকে লক্ষ্য করে বহুবার যুদ্ধ করেছে। সোমালিয়া, সুদান, সিরিয়া, ইউক্রেন, ইয়েমেন এবং প্রাক্তন যুগোস্লাভিয়াকেও ছাড়েনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে বলা হয় সভ্য যুগের সর্বপ্রথম অসভ্য যুদ্ধ। গত শতাব্দীর শুরুর দিকে ঘটে যাওয়া ভয়াবহতম এই যুদ্ধের স্থায়িত্ব ছিল প্রায় চার বছর। এটি ‘ইউরোপিয়ান-মহাযুদ্ধ’ নামেও পরিচিত ছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথম যুদ্ধ, যা পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাণ হারান প্রায় দেড় কোটি মানুষ। আহত হন, দুই কোটিরও বেশি মানুষ। এই যুদ্ধে তিনটি সাম্রাজ্যের পতন হয়। সেই সঙ্গে বিশ্ব মানচিত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন হয়। প্রথম যুদ্ধ শুরু হয় ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই। এবং শেষ হয় ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর। এই যুদ্ধ মূলত শুরু হয় অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় আর সার্ভিয়ার মধ্যে। পরে দুই দেশের পক্ষ হয়ে নানা দেশ এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সুত্রপাত ১৯১৪ সালের ২৮ জুন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী আর্চ ডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দের হত্যাকাণ্ড নিয়েই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত হয়। এই যুদ্ধের কারণ হিসেবে, ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দের, অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য, বসনিয়া-হার্জেগোভিনা দখল করা এবং আর্চ ডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দের হত্যাকাণ্ডকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। তবে কেন বিভিন্ন দেশ এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে তা বুঝতে হলে একটু ইতিহাস ঘেঁটে দেখতে হবে। ফ্রান্সের ঐতিহাসিক শত্রুতার কারণে ব্রিটেন প্রথমদিকে জার্মানির প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন ছিল। কিন্তু জার্মানি ব্রিটেনের সঙ্গে নৌ-প্রযুক্তিতে পাল্লা দিতে শুরু করায় সম্পর্ক বিগড়ে যায়। শুরু হয় যুদ্ধ জয়ের প্রতিযোগিতা। ফ্র্যাঙ্কো- প্রূশিয়ান যুদ্ধের পর থেকে জার্মান ও ফরাসিদের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। রাশিয়ার গৃহযুদ্ধ পৃথিবীতে অনেক জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যে যে যুদ্ধ হয়েছিল তার নাম রাশিয়ার গৃহযুদ্ধ। এই যুদ্ধটি ১৯১৭ সালের ২৫ অক্টোবর শুরু হয়। তৎকালীন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তি রাশিয়ান সাম্রাজ্য পতনের পর সংঘটিত হয়। যুদ্ধটি মূলত 'বলশেভিক রেড আর্মি' এবং 'হোয়াইট আর্মি'র মধ্যে সংঘটিত হলেও বহু বিদেশি আর্মি এই যুদ্ধে রেড আর্মির বিপক্ষে অংশগ্রহণ করেছিল। এই বৈদেশিক আর্মি গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল 'আলাইন্ড ফোর্স' এবং 'প্রো জার্মান আর্মি'। দক্ষিণ রাশিয়ার ইউক্রেনে রেড অ্যালেকজান্ডার শেষ পর্যন্ত কোলচ্যাক হোয়াইট আর্মিদের পরাজিত করে। এছাড়াও ১৯১৯ সালে সাইবেরিয়াতে রেড আর্মিরা হোয়াইট আর্মিদের পরাজিত করে। তা ছাড়াও এই অঞ্চলের বাইরে হোয়াইট আর্মিদের নেতৃত্বে থাকা পিওথর নিকোলাইভিচ র্যানেগেল, ‘ক্রিমাতে’ পরাজিত হন। পরবর্তীতে অনেক স্বাধীনতাকামী যোদ্ধারা এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। তাদের মধ্যে ফিনল্যান্ড, এস্তোনিয়া, লাটভিয়া লিথুয়ানিয়া এবং পোল্যান্ড মিলে সোভিয়েত স্টেট গঠন করেছিল। আর অন্যরা আগের রাশিয়ান সাম্রাজ্যের ধ্যান-ধারণা নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিল। ভয়াবহতম এই যুদ্ধটি ১৯১৭ থেকে শুরু করে ১৯২১ সাল পর্যন্ত চলছিল। এই যুদ্ধে আনুমানিক ৯০ লাখ মানুষ প্রাণ হারান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা বিশ্ব মানচিত্রকে এলোমেলো করে দিয়েছিল। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘতম যুদ্ধটির মাত্র ২৫-৩০ বছর না পেরোতেই আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের খড়গ নেমে এলো শান্তিপ্রিয় পৃথিবীবাসীর কপালে। গোটা পৃথিবী বিস্ময়ের চোখে তাকিয়ে দেখল আরও একটি ধ্বংসযজ্ঞ। দেখল আরও একটি বিশ্বযুদ্ধ। এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে সভ্য সমাজের সবচেয়ে বড় আর ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ বলা হয়। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত এই যুদ্ধে গোটা পৃাথবী লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে। ভয়াবহ এই যুদ্ধে আনুমানিক ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ মারা যান। যার মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন বা রাশিয়ার নাগরিক। নিহতের এই বিশাল সংখ্যার মূল কারণ ছিল গণহত্যা আর অস্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য পৃথিবীর ইতিহাসে একজন ব্যক্তিকে দায়ী করা হয়। তিনি অ্যাডলফ হিটলার। হিটলারের নাৎসি বাহিনীর পোল্যান্ড আক্রমণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। মিত্রপক্ষে ছিল যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, পোল্যান্ড, রাশিয়া ও গণ প্রজাতন্ত্রী চীন। জার্মানির সঙ্গে ছিল ইতালি ও জাপান। দ্বিতীয় কঙ্গোযুদ্ধ আধুনিক আফ্রিকার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহতম যুদ্ধের নাম দ্বিতীয় কঙ্গো যুদ্ধ। যুদ্ধ যে কতটা রক্তাক্ত, কতটা বিধ্বংসী হতে পারে তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত বয়ে বেড়াচ্ছে দ্বিতীয় কঙ্গো যুদ্ধ। এই ভয়াবহতম যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিল আফ্রিকার সাতটি জাতি এবং সঙ্গে সমরাস্ত্রে সজ্জিত ২৫টি আর্মড বাহিনী। এই যুদ্ধটিকে অনেকে ‘গ্রেট ওয়ার অব আফ্রিকা’ বলে অভিহিত করে থাকে। প্রথম কঙ্গো যুদ্ধ বন্ধের বছর ঘুরতে না ঘুরতেই প্রথম যুদ্ধের ভয়াবহতাকে হার মানিয়ে ২০০৮ সালে আবার যুদ্ধ শুরু হয়। প্রথম কঙ্গো যুদ্ধের ইস্যু গুলোকে সামনে রেখেই গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রতিষ্ঠা বা খনিজ সম্পদের ওপর প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ বাধে আবার। স্বার্থের জন্যে যুদ্ধ শুরু হয়। একজন আরেকজনের রক্তের জন্যে মরীয়া হয়ে ওঠে। এ এক নজিরবিহীন উদাহরণ। এই যুদ্ধে কমপক্ষে ৫৪ লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। আর লাখ লাখ মানুষ নিজেদের সম্পদ-ঘরবাড়ি ছেড়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় নেয়। লাখ লাখ গৃহহীন মানুষের এ যেন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই। খাদ্য আর অপুষ্টিতে যদিও ২০০৩ সালের জুলাই মাসে গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোয় অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে এই যুদ্ধ থেমে যায়। ভিয়েতনাম যুদ্ধ পৃথিবীর ইতিহাসে গণহত্যার জন্য সবচেয়ে কুখ্যাত যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করা হয় ভিয়েতনাম যুদ্ধকে। এই যুদ্ধ এখনো মানুষকে আন্দোলিত করে, শিহরিত করে আর শান্তির পথে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করে। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ও পরাশক্তি মানা হয় আমেরিকাকে। অধিকাংশ যুদ্ধেই আমেরিকানরা জয়ের স্বাদ পেয়েছিল। কিন্তু ভিয়েতনাম যুদ্ধ হচ্ছে প্রথম যুদ্ধ, যাতে আমেরিকা হেরে যায়। এই যুদ্ধকে ১৯৫৯ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সংঘটিত সবচেয়ে বড় সংঘাত হিসেবে দেখা হয়। প্রাথমিকভাবে যুদ্ধের শুরুটা হয়েছিল দক্ষিণ ভিয়েতনাম আর উত্তর ভিয়েতনামের মধ্যে। মাঝখান থেকে আমেরিকা যুক্ত হলে যুদ্ধ তার গতিপথ পরিবর্তন করে এবং ভয়াবহ রূপ নেয়। আমেরিকা দক্ষিণ ভিয়েতনামের পক্ষে ১৯৬৫ সালে সেখানে সৈন্য পাঠায়, কিন্তু এর ফলে যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সূত্রপাত হয়, তাতে শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হতে পারেনি। ১৯৭৫ সালে দুই ভিয়েতনাম একত্রিত হয়। যুদ্ধের এই ভয়াবহ ইতিহাস দেখলে শিহরিত হয়ে ওঠে মানব সভ্যতা। পাঁচ হাজার বছর আগেকার মহাভারতে যে যুদ্ধের সুচনা হয়েছিল, সেই যুদ্ধ যেন এখনও চলছে। পৃথিবীর শান্তিকামী মানুষ কিন্তু কোভীড মহামারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেও বেঁচে আছে। কারন মানুষ বিশ্বাস করে মানবতায়, ভালোবাসায়, প্রেমে। যুদ্ধ নয়, শান্তি চায় বিশ্ব মানব। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্য সুত্রঃ পৃথিবীর যুদ্ধের ইতিহাস, উইকিপিডিয়া।