আজ আধুনিক এই তৃতীয় বিশ্বে আমাদের সবচেয়ে বেশী দরকারি কিছু যদি হয় তাহলে সেটি হল টেলিফোন। এখন অবশ্য টেলিফোনের ব্যাবহারও অনেকটাই কমে গেছে। আধুনিক মানুষের হাতে হাতে এখন মোবাইল ফোন বা মুঠোফোন। আর সবাই কিন্তু রিং টোনটা বেজে উঠলেই বলি, ‘হ্যালো’। এই হ্যালো শব্দের মানে কি জানেন? ভালোবাসার সঙ্গে মিলেমিশে আছে এই হ্যালো শব্দটি। এই প্রতিবেদনে আজ আমরা ফোনের ইতিহাস, সৃষ্টি এবং হ্যালো শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে আলোচনা করবো। ফোনে কথা বলা শুরু করার সময় আমরা প্রায় সবাই বলে থাকি হ্যালো। শুধু আমি আপনি না, বিশ্বের ৯৮ শতাংশ মানুষ ফোনে এই হ্যালো শব্দটি উচ্চারন করেন। এই হ্যালো শব্দটির আবিস্কার নিয়েও রয়েছে অনেক ভ্রান্ত ধারণা। চলুন জেনে নেই কিভাবে এই হ্যালো শব্দের প্রচলন শুরু হোল। টেলিফোনের আবিষ্কর্তা প্রেমিক গ্রাহাম বেল প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবক অ্যালেক্সান্ডার গ্রাহাম বেল ৩ মার্চ ১৮৪৭ সালে স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গে জন্মগ্রহণ করেরেছিলেন। উনাকে ‘বোবাদের পিতা’ বা ‘দ্য ফাদার অফ দ্য ডিফ’ নামেও ডাকা হতো। বেল-এর মা ও স্ত্রী দুজনেই ছিলেন বোবা। এ কারণেই বোবাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে তিনি অনেক গবেষণা করেছেন। টেলিফোন উদ্ভাবনের আগে থেকেই তিনি শ্রবণ ও কথন সংশ্লিষ্ট গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৮৭৬ সালে তাকেই টেলিফোনের প্রথম মার্কিন পেটেন্টের সম্মানে ভূষিত করা হয়। পরবর্তী জীবনে বেল আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন যার মধ্যে রয়েছে ‘বিমানচালনবিদ্যা’। ১৮৭৩ সালে মাত্র ২৬ বছর বয়সেই তিনি প্রেমে পড়েন। মেয়েটির নাম মেবল। বয়েস মাত্র ষোল। এবং গ্রাহাম বেলের ছাত্রী তিনি। পাঁচ বছর বয়েস থেকেই সম্পূর্ণ বধির তিনি। আলাপ হয় স্পিচ থেরাপির ক্লাশে। আলাপের চার বছরের মধ্যেই মেবলকে বিয়ে করেন বেল। আবিস্কারকরা তাঁদের নিজেদের আবিস্কারের ভবিষ্যৎ দেখতে পান। আর গ্রাহাম বেলও নিজের এই যন্ত্রটির ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিলেন প্রায় দুইশ বছর আগেই। তাই তিনি তাঁর অফিসেও কোনদিন এই যন্ত্রটিকে রাখতেন না। কারন বিনা কারনেই অনেকে ফোন করেন এবং এতে উনার মনঃসংযোগ নষ্ট হয়ে যেত। গবেষণায় ক্ষতি হতো। তাই এই যন্ত্রটি থেকে দুরেই থাকতেন তিনি। ১৮৭৬ সালে বেল-এর হাত ধরেই তথ্য ও যোগাযোগ ব্যাবস্থায় বিপ্লব আসে। ১৮৮৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন আমেরিকান টেলিফোন অ্যান্ড টেলিগ্রাফ কোম্পানি। সেই টেলিফোনই আজ না পরিবর্ধন এবং পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে আমাদের হাতে। এবং বেশ কিছু ক্ষেত্রে আজ এই যন্ত্রটিই কিন্তু অনেকেরই যন্ত্রণার কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেবল-এর শারীরিক পরিস্থিতির জন্য গ্রাহাম নিজের আবিষ্কার ব্যবহার করে উঠতে পারেননি ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়। কিন্তু নিজের অজান্তেই মায়াজাল বুনেছিলেন ওই যন্ত্রে। ২ আগস্ট ১৯২২ সালে মৃত্যু হয় এই বিশ্ব বিখ্যাত বিজ্ঞানীর। কীভাবে যাত্রা শুরু হল এই হ্যালো শব্দের? এই বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণা এবং রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্বের প্রায় ৯৮ শতাংশ মানুষ ফোনে এই 'হ্যালো' শব্দটি উচ্চারণ করেন। কখনও ভেবে দেখেছেন, কেন আমরা এই শব্দটি বলেই কথোপকথন শুরু করি! অন্য কোনও কথাও তো হতে পারতো শুধু 'হ্যালো' শব্দটিই কেন? এই বিষয়ে জানতে হলে আমাদের একটু ইতিহাসের পাতায় উঁকি দিতে হবে। গ্রাহাম বেল-যে সর্বপ্রথম টেলিফোন আবিষ্কার করেছিলেন এ কথা আমরা সকলেই জানি। তবে এই হ্যালো শব্দটি আবিষ্কার নিয়ে রয়েছে অনেক ভ্রান্ত ধারণা। অনেকেই মনে করেন বা বলে থাকেন গ্রাহাম বেল-এর প্রেমিকার নাম ছিল হ্যালো। প্রেমিকার প্রতি নিজের ভালবাসা প্রকাশের নিদর্শন স্বরূপ টেলিফোন কলের উত্তর দেওয়ার জন্য এই শব্দ ব্যবহার করতে গিয়ে বেল উনার প্রেমিকার নামই ব্যবহার করেছিলেন। যাকে পরবর্তীকালে তিনি বিয়েও করেছিলেন। গ্রাহাম বেল’-এর প্রেমিকার নাম ছিল, ম্যাবেল গার্ডিয়ান হুবার। ভ্রান্ত ধারণা প্রেমিকাকে ভালোবেসে বেল টেলিফোনে প্রথম হ্যালো শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন এটি একটি ভ্রান্ত ধারনা। এবং প্রচলিত গল্প বলেই মনে করেন গবেষকরা। তাহলে কীভাবে শুরু হল এই হ্যালো-র যাত্রা! মানুষের বলা টেলিফোনে বলা সর্বপ্রথম কথা ‘হ্যালো’ আসলে ছিলই না। টেলিফোন আবিষ্কার হয়েছিল ১৮৭৬ সালে। আর এর ঠিক এক বছর পর ১৮৭৬ সালের ১০ মার্চ আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল সর্বপ্রথম তার সহকারীকে ফোন করেছিলেন। কিন্তু সেই কথায় তিনি হ্যালো বলেন নি। সেই সময় তিনি সম্ভাষণের জন্য 'আহয়ই' শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। এই শব্দটি বেশকিছু দিন ব্যবহার হয়েছিল টেলিফোনে সম্ভাষণের জন্য। গ্রাহাম বেল টেলিফোন আবিষ্কার করলেও হ্যালো বলার প্রচলন তৈরি করেছিলেন অন্য এক ব্যক্তি। আর তিনি হলেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী এডিসন। বৈদ্যুতিক আলোর আবিষ্কারক থমাস আলভা এডিসন। টেলিফোন আবিষ্কার হওয়ার শুরুর দিকে কোনও রিং-এর ব্যবস্থা ছিল না। একপাশের টেলিফোন লাইনের সঙ্গে অপর পাশের লাইন প্রায় সব সময়েই যুক্ত থাকতো। অর্থাৎ কল ডিসকানেক্টের কোনও ব্যবস্থা ছিল না। সব সময়ই একটি লাইন কানেক্ট করা থাকতো, প্রয়োজনের সময় কথা বলা হত দুই পাশ থেকেই। সেই সময় এক প্রান্তের ব্যক্তির সঙ্গে অন্যপ্রান্তের ব্যক্তির কথা বলার সময় কথোপকথন শুরু করার জন্য সম্ভাষণের প্রয়োজন দেখা দিল। এরপর ১৮৭৭ সালের ১৮ জুলাই থমাস আলভা এডিসন 'প্রিন্সিপাল অব রেকর্ডেড সাউন্ড' আবিষ্কারের পরীক্ষানিরীক্ষার কাজে তিনি যে শব্দটি বারবার উচ্চস্বরে ব্যবহার করেছিলেন তা এই ‘হ্যালো’ শব্দটি। আর এই শব্দটিই তিনি প্রথম তার উদ্ভাবিত 'পেপার সিলিন্ডার ফনোগ্রাফ' যন্ত্রে রেকর্ড করেছিলেন।অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি অনুযায়ী, সর্বপ্রথম হ্যালো শব্দটির ব্যবহার লিপিবদ্ধ হয় ১৮২৭ সালে যা প্রায় ২০০ বছর আগে। পুরনো অনেক নিয়ম বদলে গেলেও সবকিছুর বাধা পেরিয়ে আজও সারা বিশ্বে ফোনে সম্ভাষণের প্রচলিত শব্দ হয়ে থেকে গিয়েছে এই 'হ্যালো'। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যা আজও অপরিবর্তিত হয়ে থেকে গিয়েছে। টেলিফোন আবিস্কারের প্রায় একশো বছর পরেও আমাদের বাসা বাড়িতে এখনও মাঝে মধ্যেই বেজে উঠে কিরিং কিরিং শব্দে টেলিফোন। আজকের দিনে জরুরী পরিষেবা থেকে শুরু করে, প্রেম, ব্যর্থতা, শুখ-অসুখ, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, লেনদেন-ব্যবসা, রাজনীতি সবই চলছে মুঠোফোনে। বেল সাহেব কি দেখতে পেয়েছিলেন ফোনের এই ভবিষ্যৎ! লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য এবং ছবিঃ উইকিপিডিয়া।