১৮০০ শতকে মেয়েদের ঘর থেকে বাইরে বের হওয়াই ছিল নিষিদ্ধ। তাতে কি! নারী হয়ে পুরুষ সেজে সমুদ্র জয়ের উদ্দেশে বেড়িয়ে পড়লেন। আর এক নারী না চোখে কিছু দেখতে পায়, না কানে শুনতে পায় কিছু। কিন্তু যার চোখে থাকে পৃথিবী জয় করার স্বপ্ন তাঁকে আটকায় কে? ইতিহাস এভাবেই হয়। এই প্রতিবেদনে এমনই দুই নারীর গল্প শুনবো আমরা। পৃথিবীর প্রথম সমুদ্রজয়ী নারী উদ্ভিদবিজ্ঞানের প্রতি সব সময়েই বিশেষ টান অনুভব করতেন জোন ব্যারে। আর সমুদ্র দেখে হারিয়ে যেতেন নীল সবুজ জলরাশিতে। কিন্তু কে নিয়ে যাবে সমুদ্রে! মেয়েদের জন্যে তখনও বাইরে বেরোনোই নিষেধ। তাই একসময় জেদ ধরলেন, তিনি সমুদ্র জয় করেই ছাড়বেন। নারী হয়ে নাই বা হল। পুরুষ হয়েই জয় করবেন সমুদ্র। তাই করলেন। রূপকথার গল্পকেও হারায় মানায় জোন ব্যারের গল্প। জোন ব্যার জোন ব্যারের জন্ম অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে, ফ্রান্সের “ল্যা কোমেল” নামে এক গ্রামে। সেকালে নারীদের জন্য ঘরের বাইরে বের হওয়াই ছিল দুষ্কর, আর সমুদ্র পাড়ি দেওয়া তো আকাশ কুসুম কল্পনা। কিন্তু ব্যারের চঞ্চল মন তো এত কিছু মানে না। সাগরের বিশালতা আর ফুঁসে ওঠা ঢেউ তাকে বড্ড টানে। ডাঙ্গায় এই সাদামাটা জীবনে হাঁপিয়ে উঠেছেন জোন। তাই একদিন দারুণ এক বুদ্ধি আঁটলেন ব্যারে। ইতিমধ্যেই খবর পেলেন এক উদ্ভিদ বিজ্ঞানী নতুন দ্বীপের সন্ধানে সমুদ্রযাত্রায় যাচ্ছেন। মুখে নকল গোঁফ লাগিয়ে, মাথায় টুপি পরে পুরুষ সেজে চাকরি নিলেন সেই উদ্ভিদ বিজ্ঞানীর সহকারী হিসেবে। বিজ্ঞানী মশাই সমুদ্র সফরে যাওয়ার জন্যে একজন সহকারীও খোঁজছিলেন। অজানা দ্বীপের সন্ধানে সমুদ্রপথে ঠিক কতদিন লাগবে কেউই জানেনা। এমন চটপটে একটি সহকারী পেয়ে দারুণ খুশি হলেন তিনি। গবেষণার যন্ত্রপাতি, এলাহি লস্কর বাহিনী নিয়ে জাহাজে চেপে বসলেন তিনি একদিন সদলবলে। ঘুণাক্ষরেও টের পেলেন না জলজ্যান্ত একজন নারীও রয়েছেন তাদের সাথে, একই জাহাজে। দিব্যি সবার চোখের ডগায় সানন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছেন ছদ্মবেশী ব্যারে। প্রতিদিন নতুন কিছু আবিষ্কারের উত্তেজনায় আর জীবনে প্রথমবারের মতো সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার আনন্দে বিভোর তিনি। জান-প্রাণ দিয়ে খাটছেন গবেষণার কাজে বিজ্ঞানীর সাথে। পৃথিবীর এপার ওপার চষা হয়ে গেল তাদের, অজস্র নাম না জানা উদ্ভিদের নমুনা দিয়ে বোঝাই তাদের জাহাজ, এবার ঘরে ফেরার পালা। কিন্তু মাঝ দরিয়ায় আচমকা আকাশ-পাতাল একাকার করে দেওয়া সমুদ্র ঝড় উঠলো মাঝ সমুদ্রে। ঝড়ো ঢেউয়ের তীব্রতায় জাহাজ থেকে প্রায় সবাই ছিটকে পড়লো। কে যে কোথায় ছিটকে গেল তার আর হদিস পাওয়া গেল না। জোন ব্যারে অতিকষ্টে প্রাণ বাঁচিয়ে ফিরলেন প্যারিসে, সাথে সেই অজানা বিচিত্র সব উদ্ভিদের নমুনা। প্রকৃতি বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় জাদুঘরের কাছে গেলেন তিনি সেই সব নমুনা নিয়ে, গুণে দেখা গেল প্রায় তিন হাজার অচেনা সব নমুনা নিয়ে এসেছেন ব্যারে, যেগুলো এর আগে কেউ কোনদিন দেখেনি। নতুন দিগন্ত খুলে যাবে উদ্ভিদবিদ্যার জগতে। বিজ্ঞানীরা সবাই তো অবাক। ধন্য ধন্য পড়ে গেল এই দুঃসাহসী বীর যুবার নামে। এমন সময় সবার সামনে একটানে মুখের নকল গোঁফ তুলে ফেললেন জোন ব্যারে। ছুঁড়ে ফেললেন মাথার টুপি, সবার চোখ কপালে তুলে দিয়ে নেমে এলো ব্যারের কোমর পর্যন্ত গড়িয়ে পড়া সোনালী চুল আর সুন্দর মুখখানি। উপবিষ্ট দর্শকরা তখন স্তম্ভিত ব্যারের কান্ড কারখানা দেখে। উপস্থিত জনতার সামনে ব্যারে দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, মেয়েরাও সমুদ্র জয় করতে পারে’। একে একে বললেন উনার সমুদ্র জয়ের গল্প। সমবেত অতিথিবৃন্দ শ্রদ্ধায় আর করতালিতে ভরিয়ে দিলেন এই সাহসী নারীকে। রাজকীয় সম্মানে এবং পুরষ্কারে ভূষিত হলেন জোন ব্যারে। পৃথিবীর বুকে রেখে গেলেন অদ্বিতীয় এক সাহসিকতার দৃষ্টান্ত। উদ্ভিদবিদ্যার জগতে খুলে গেলো নতুন দিগন্ত। এখনও সারা পৃথিবী শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে প্রথম সমুদ্রজয়ী জোন ব্যারিকে। অন্ধ এবং বধির কন্যা হেলেন কেলার ১৮৮০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামায় কেলার দম্পতির কোল আলো করে এলো একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তান, নাম রাখা হলো হেলেন। ছোট্ট হেলেন স্বভাবসুলভ চপলতায় মাতিয়ে রাখে সবাইকে। ছোট্ট থেকেই দারুন চটপটে হেলেন। ঘর আলো করে রাখে শিশু হেলেন। একদিন হঠাৎ ভীষণ জ্বরে পড়লো শিশু হেলেন। অনেকদিন লাগল সেই জ্বর সারতে। হেলেনের পরিবার হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। কিন্তু, মা একদিন খেয়াল করলেন, হেলেন দরজার ঘণ্টার আওয়াজ বা অন্য কোন শব্দে হেলেনের কোন প্রতিক্রিয়া নেই। আগে তো আওয়াজ শুনলেই সবার আগে দৌড়ে যেত শিশু হেলেন। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন মেয়েকে। বিভিন্ন পরীক্ষার পর ডাক্তার বলে দিলেন হেলেন কানে শুনতে পাবেন না। সর্বনাশা জ্বর হেলেনের শ্রবণশক্তি কেড়ে নিয়েছে। শুধু তাই না, এই অসুখ হেলেনকে চিরদিনের মত অন্ধ করে দিয়েছে। আকাশ ভেঙে পড়লো কেলার দম্পতির মাথায়। এক লহমায় পাল্টে গেলো হেলেনের পৃথিবী। এই নিদারুণ অসহায়ত্ব হেলেনকে উন্মাদ করে তুললো। হেলেন যেন মুহূর্তেই পাল্টে গেল আরও দুরন্ত হয়ে উঠলেন। ঘরের আসবাব ভাঙচুর করে সামনে যাকে পায় তাকেই কামড়ে দেয়। উপায় না দেখে হেলেনকে নিয়ে তার বাবা-মা পাড়ি জমালেন বাল্টিমোরে। সেখানে পরিচয় হয় এক তরুণী ডাক্তার এন সুলিভানের সাথে। শুরু হলো শিশু হেলেনের জীবনের এক নতুন অধ্যায়। এদিকে হেলেনকে শেখাতে এসে সুলিভান পড়লেন মহা সমস্যায়। এমন দুরন্ত শিশু তিনি আর দেখেননি! শান্ত করে তাকে বসানোই দায়। বহুকষ্টে হেলেনকে তিনি নিয়ে গেলেন এক পুকুর পাড়ে। হেলেনের ছোট্ট হাতে ছোঁয়ালেন পুকুরের জল। আরেক হাতে হাত ধরে লিখলেন ‘w-a-t-e-r’ জলের ইংরেজি শব্দ। এতদিনে যেন কিছুটা শান্ত হলো হেলেন, এক রাতেই তার শেখা হয়ে গেল পরপর ৩০টি শব্দ। সেই যে শেখার যাত্রা শুরু, তা আর থামেনি হেলেনের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। সুদীর্ঘ পঁচিশ বছর সাধনা করে তিনি শিখলেন মানুষের সাথে আলাপচারিতা করার উপায়। পড়ালেখা করতে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হেলেন ভর্তি হলেন কেমব্রিজে। ইতোমধ্যে তার এই সংগ্রামের কথা ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। এই সময়ে মার্ক টোয়েনের মতো বিভিন্ন গুণী ব্যক্তির সাথে পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয় তাঁর। তাদের সংস্পর্শে হেলেন স্বপ্ন দেখলেন পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার, নিজের জীবনে অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখলেন অনন্য এক জীবনকাহিনী “The Story of My Life”। পরবর্তী জীবনে হেলেন প্রতিবন্ধীদের অধিকার এবং দাবী আদায় নিয়ে অসামান্য অবদান রাখেন। বিভিন্ন দেশে বক্তব্য রাখেন এই মানুষটি শিক্ষা, অধিকার ও মানবতার উপর। বিভিন্ন জনহিতৈষী কার্যক্রমে, সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন তিনি। জীবনসায়াহ্নে এসে হেলেন উপলব্ধি করলেন পৃথিবীকে আরো কিছু দেবার আছে। তাই বেরিয়ে পড়লেন জীবনের সবচেয়ে কঠিন অভিযানে। পাঁচ মাস ব্যাপী ভ্রমণ করলেন এশিয়াজুড়ে চল্লিশ হাজার মাইল। বক্তব্য রাখলেন দেশে দেশে, অনুপ্রাণিত করলেন শত কোটি মানুষকে। সেই ছোট শ্রবণ আর দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেলা মেয়েটি আলোর পথ দেখালেন লাখ লাখ মানুষকে। ৮৭ বছর বয়সে ঘুমের মধ্যেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হেলেন কেলার। এখনও মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন এই দুঃসাহসী নারীকে। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ উইকিপিডিয়া ছবি সৌজন্যে: seekapor.com/ alabamanewscenter.com