অলিম্পিয়ান লাভলিনা বরগোঁহাই উত্তরপূর্বের সোনার মেয়ে অসমের এক প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়ে লাভলিনা যখন বক্সিং প্র্যাকটিস করে যাচ্ছে হাজারো প্রতিকূলতার মধ্যে, তখন সেই গ্রামের মানুষ টিটকিরি মেরে বলছে ‘বক্সিং কি মেয়েদের খেলা নাকি?’ আজ সেই অজ পাড়া গাঁয়ের লোকেরা এই মেয়ের সম্মানার্থে তৈরি, পাবলিক ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্টের পাকা রাস্তায় হাঁটছে আর এই মেয়েটির জন্যেই গর্বে মাথা উঁচু করে বলছে, ‘ধন্যি মেয়ে আমাদের লাভলিনা’। আরও অনেকেই রয়েছেন উত্তরপূর্বে। স্প্রিন্টার হিমা দাস, জিমনাস্ট দীপা কর্মকার, বক্সার মেরি কম। এই পাহাড়ি কন্যারাই আজ এই দেশ, ভারতবর্ষের সম্পদ। লাভলিনা বরগোঁহাইয়ের বয়েস এখন ২৫। আর ২৩ বছর বয়সেই তিনি ভারত তো বটেই সারা বিশ্বের হৃদয় জয় করে ফেলেছেন। তিনি একজন ভারতীয় অপেশাদার মহিলা বক্সার। লাভলিনা ২০১৮ সালে এআইবিএ (AIBA*) ‘মহিলা বিশ্ব বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপ’ এবং ২০১৯ এর এআইবিএ (AIBA*) ‘মহিলা বিশ্ব বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে’ ব্রোঞ্জ পদক জিতেছেন। টোকিও অলিম্পিকে একমাত্র ভারতীয় বক্সার হিসেবে লাভলিনা পদক জিতেছেন ২০২০ সালে। অলিম্পিকে ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে উত্তরপূর্বের আরেক পাহাড়ি কন্যা মেরি কম, লন্ডন অলম্পিকে ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন। মেরি কমের পর দ্বিতীয় বক্সার হিসেবে লাভলিনা জিতেছেন ‘২০২০ টোকিও অলিম্পিকে’ ব্রোঞ্জ। ঘরের মেয়ের জন্য গর্বিত অসম সহ সারা দেশের মানুষ। টোকিও অলিম্পিক ২০২০-এর তেরোতম দিন। দেশবাসীকে গর্বিত করলো আরেক পাহাড়ি কন্যা অসমের লাভলিনা বরগোঁহাই। অলিম্পিকের কোয়ার্টার ফাইনালে লাভলিনার বিপক্ষে ছিলেন প্রাক্তন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান তাইওয়ানের মহিলা বক্সার, নিয়েন চিন চেন। এর আগে ভারতীয় বক্সাররা চারবার হেরেছিল এই প্রাক্তন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ানের সাথে। তাই লাভলিনার জেদ চেপে গিয়েছিল এই প্রাক্তন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ানকে হারানোর। আর ঠিক তাই করেছিলেন লাভলিনা বরগোঁহাই। প্রথমবার অলিম্পিকের রিং-এ নেমেই প্রাক্তন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ান তাইওয়ানের, নিয়েন চিন চেনকে ‘ওয়েলটার ওয়েট’ বিভাগে ৪-১ পয়েন্টে হারিয়ে দেন। টোকিও অলিম্পিকে জিতলেন ব্রোঞ্জ। লাভলিনা হলেন তৃতীয় ভারতীয় বক্সার যিনি অলিম্পিকে মেডেল অর্জন করতে পারলেন। বিজেন্দর সিং এবং মেরি কমের পর লাভলিনার পদক জয় ছিল ঐতিহাসিক। কারন দীর্ঘ নয় বছরের খরার পর বক্সিং-এ ভারতের ঝুলিতে প্রথম মেডেল এলো লাভলিনার হাত ধরে। পৃথিবী মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখল বয়স তেইশের এক প্রত্যন্ত পাহাড়ি মেয়ের এক রুদ্ধশ্বাস লড়াই। উত্তরপূর্বের অসমের রাজধানী গুয়াহাটি থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দুরের গোলাঘাট জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম বড়োমুখিয়ায় ১৯৯৭ সালের ২রা অক্টোবর জন্ম লাভলিনার। বাবা টিকেন বরগোঁহাইয়ের একটি ক্ষুদ্র ব্যাবসা। মা গৃহিণী। সংসার চালাতে অনেক দুঃখ-কষ্ট আর আর্থিক অনটনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে লাভলিনার পরিবারকে। লাভলিনার বড় দুই বোন কিক বক্সিং-এ জাতীয় স্তরের প্রতিযোগিতায় সাফল্য লাভ করলেও আর্থিক অনটনের কারনে আর এগিয়ে যেতে পারেন নি। কিভাবে লাভলিনাকে আবিস্কার করলেন কোচ? সাই (স্পোর্টস অথারিটি অফ ইন্ডিয়া) ২০১২ সালে লাভলিনার স্কুল, বারপাথার উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে এসেছিল ট্রায়াল করতে। সেই ট্রায়ালে লাভলিনাও অংশ নেয়। আর এই ট্রায়ালেই প্রখ্যাত কোচ পদুম বোরো, লাভলিনার প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে উনাকে নির্বাচিত করেন। শুরু হয় কোচ পদুম বোরো’র তত্বাবধানে লাভলিনার প্রশিক্ষণ। সেই বছরেই কলকাতায় আয়োজিত আবদুল হাকিম মেমোরিয়াল বক্সিং ক্লাবের, ‘জাতীয় সাব জুনিয়ার’ প্রতিযোগিতায় সোনা জিতে চমক লাগান লাভলিনা। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এই লড়াকু মেয়েটিকে। ২০১৭ সালে ভিয়েতনামে ‘এশিয়ান বক্সিং চ্যাম্পিয়ানশিপে’ ব্রোঞ্জ জেতেন। একই বছরে কাজাখস্থানের রাজধানী আস্টানাতে অনুষ্ঠিত ‘প্রেসিডেন্ট কাপ টুর্নামেন্টে’ আবারও লাভলিনা জেতেন ব্রোঞ্জ। ২০১৮ সালে ভারতে ওয়েল্টার ওয়েট বিভাগে ‘ওপেন ইন্টারন্যাশানেল বক্সিং চ্যাম্প্যানশিপে’ স্বর্ণ পদক এবং পোলান্ডে ১৩-তম ‘ইন্টারন্যাশানেল সিলেসিয়ান চ্যাম্পিয়ানশিপে’ অর্জন করেন ব্রোঞ্জ পদক। একই বছরে মঙ্গোলিয়াতে, ‘আলঅ্যানবাটর কাপ’ প্রতিযোগিতায় জেতেন রুপা। এছাড়া নতুন দিল্লীতে অনুষ্ঠিত প্রথম ‘ভারত ওপেন ইন্টারন্যাশানেল বক্সিং টুর্নামেন্টে’ স্বর্ণপদক এবং দ্বিতীয় ‘‘ভারত ওপেন ইন্টারন্যাশানেল বক্সিং টুর্নামেন্টে’ পান রৌপ্য পদক। তবে ২০১৮ সাল ছিল লাভলিনার জন্যে উল্লেখযোগ্য। ২০১৮ সালে, লাভলিনা পেয়ে যান দুর্দান্ত সুযোগ। ২০১৮ সালের ‘কমনওয়েলথ গেমসের’ ওয়েলটার ওয়েট বক্সিং বিভাগে নির্বাচিত হন তিনি। যদিও এই টুর্নামেন্টে পদক অধরাই থেকে যায় লাভলিনার। কিন্তু এই টুর্নামেন্টই অলিম্পিকে পদক জয়ের সাফল্য এনে দিয়েছিল লাভলিনাকে। শিক্ষা নিয়েছেন কিভাবে প্রতিপক্ষ কে নিরস্ত্র করতে হয়। এই পরাজয়ের পরেই লাভলিনা পরেই অলিম্পিকে বাজিমাৎ। মাত্র আট বছরের প্রশিক্ষণেই লাভলিনা টোকিও অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ জেতেন। ‘অর্জুন পুরস্কারে’ ভূষিতা লাভলিনা এখানেই থেমে থাকার পাত্রী নন। ২০২৪ অলিম্পিকে দেশকে সোনা এনে দেয়াই লাভলিনার টার্গেট। আর এই লড়াকু পাহাড়ি মেয়েটির পরিশ্রম আর অনুশীলন এখনও চলছে। শুভেছা রইল সবার। অসম সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার এবং বিভিন্ন সংস্থা লাভলিনার এই সাফল্যে অর্থ, স্কলারশিপ, পুরস্কার, চাকরী ইত্যাদি দিয়ে আজ ভরিয়ে দিয়েছে এই পাহাড়ি কন্যাকে। পাবলিক ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্ট, লাভলিনার সম্মানে পাকা করে দিয়েছে গ্রামের রাস্তাটিও। লাভলিনা প্রমান করে দিয়েছে আজ, পরিশ্রম আর অধ্যাবসায়ের কাছে সব প্রতিবন্ধকতাই হার মানে। আজ দেশের ইয়ুথ আইকন লাভলিনা বরগোঁহাই। [Note: The International Boxing Association (IBA), previously known as the Association Internationale de Boxe Amateur (AIBA), is an independent sports organization that sanctions amateur (Olympic-style) boxing matches and awards world and subordinate championships.] লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ Sports Authority of India/ Times of India/ Indian Express/ India Today Picture Courtesy by: NDTV