ভারতীয় কুস্তি বা মল্লযুদ্ধের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। স্বয়ং বিবেকানন্দ নিয়মিত কুস্তি করতেন। অবশ্য কলকাতার নরেন্দ্র নাথ দত্ত যদি বিবেকানন্দ না হতেন তাহলে হতে পারতেন একজন বিখ্যাত গায়ক বা শিক্ষক। হতে পারতেন কুস্তি জগতের একজন প্রবাদ পুরুষ। বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুও নিয়মিত কুস্তি করতেন, আখড়ায় যেতেন। আমরা জানি ভারতের বিখ্যাত গায়ক প্রয়াত মান্না দে’ও নিয়মিত কুস্তি করতেন কাকার আখড়ায়। যদিও পরবর্তী সময়ে উনারা কেউই কুস্তি চালিয়ে যেতে পারেন নি। কিন্তু একজন প্রবাদ প্রতিম কুস্তিবিদ ছিলেন আঠারো শতকের কলকাতায়। উনার নাম ছিল যতীন্দ্রচরণ গুহ কিন্তু তিনি অধিক পরিচিত ছিলেন গোবর গুহ নামেই। আজকের এই প্রতিবেদনে ভারতীয় কুস্তি বা মল্লক্রীড়া জগতের সেই প্রবাদ প্রতিম কুস্তীগিরকে নিয়ে আলোচনা করবো। সে সময় কলকাতার বাবুদের বিচিত্র সব শখের মধ্যে অন্যতম ছিল পায়রার পেছনে পয়সা ওড়ানো অথবা থিয়েটার দেখা। সময়টা ১৮৯২ সাল। সেই বছর ১৩ই মার্চ উত্তর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন গোবর গুহ। যিনি পরবর্তী কালে বিশ্বের ক্রীড়া জগতে বিশেষ করে মল্লক্রীড়া বা কুস্তিতে আলোড়ন তুলেছিলেন। যদিও উনাদের পূর্ব পুরুষের বসবাস ছিল অধুনা বাংলাদেশের ঢাকায়। কুস্তির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় আঠারো শতকের শুরুর দিকে ব্রজরাম গুহের নাম। ব্রজরাম গুহ ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের জমিদার ছিলেন। যদিও ব্রজরাম বেশিদিন বাঁচেননি, কিন্তু তাঁর ছেলে শিবচরণ গুহ জমিদারি ও সম্পদ সুরক্ষিত রেখেছিলেন। এই শিবচরণের নাতি অম্বিকাচরণের হাত ধরেই ডন-কুস্তির নেশা ঢোকে গুহ পরিবারে। অম্বিকাচরণ গুহ পরবর্তী সময়ে চলে আসেন কলকাতায়। কলকাতাতেই জন্ম যতীন্দ্রচরণ গুহ ওরফে গোবর গুহের। দাদু অম্বিকাচরণ, নাতি গোবর গুহের কুস্তির নতুন নেশা কুস্তিকে প্রত্যক্ষ প্রশ্রয় ও বিপুল অর্থব্যয় করে ডন-কুস্তিকে কালে কালে সম্ভ্রান্ত গুহ বাড়ির এক কালচারে পরিণত করে। সেই সময় বাঙালি কুস্তির আখড়া হিসেবে ভারতে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল ‘গুহদের আখড়া’। ছেলেবেলা ছেলেবেলা থেকেই গোবর গুহ ছিলেন বেশ মোটাসোটা, গোলগাল চেহারা। আট বছর বয়সেই উনার ওজন ছিল দুই মন। এই রকম মোটাসোটা চেহারা দেখেই দাদু অম্বিকাচরণ গুহ আদর করে নাতির নাম রাখেন, ‘গোবর’। যদিও পোশাকি নাম ছিল যতীন্দ্রচরণ গুহ। কিন্তু গোবর গুহ নামেই তিনি কলকাতা সহ সমগ্র বাংলাদেশে এমনকি সারা ভারত বর্ষে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ভারত বর্ষের বাইরেও কুস্তীগির হিসেবে উনার নাম ছড়িয়ে পরে। গোবরের পারিবারিক পরিবেশেই ছিল কুস্তি। দাদু অম্বিকাচরণ নিজে ভালো কুস্তি করতেন। এবং অবিভক্ত বাংলাদেশে কুস্তি প্রসারেও একজন পথিকৃৎ ছিলেন। গোবরের কুস্তীগির হয়ে ওঠার পেছনে দাদুর অবদান ছিল অসামান্য। আদর্শ, অনুশাসন এবং শৃঙ্খলায় বিশ্বাসী অম্বিকাগুহ সেই সময়ে কলকাতার বেশীরভাগ বাবুদের মতো পায়রা আর বাইজীর পেছনে পয়সা না উড়িয়ে নিজের উদ্যোগে কুস্তির আখড়া তৈরি করলেন। এই আখড়ায় নিয়মিত কুস্তি করতে আসতেন স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ। এখানে আসতেন দেশের সেরা সেরা পালোয়ানরা। ঐ আখড়ার অনুকরণেই পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে বিশেষ করে কলকাতায় গড়ে উঠেছিল আরও বেশ কয়েকটি কুস্তির আখড়া। এই আখড়া গুলির একটা বিশেষ অবদান ছিল দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে। এই কুস্তির আখড়া থেকে তালিম নিয়েই অনেক উজ্জ্বল তরুণ পরবর্তীকালে স্বদেশ মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে। কুস্তির মারপ্যাঁচ এই ঐতিহ্য আর পারিবারিক পরিবেশেই বড় হয়ে উঠছিলেন শিশু গোবর। ছোটবেলা থেকেই গোবর, কুস্তির মারপ্যাঁচ প্রায় রপ্ত করে ফেলেছিলেন। ছেলের কুস্তির প্রতি এই ভালোবাসা দেখে পিতা রামচরণ গুহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তের বাঘা বাঘা কুস্তীগিরদের সাদর আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে আসতেন নিজের আখড়ায়। আর তাদের কাছ থেকেই গোবর শেখেন ভারতের নানা প্রান্তের কুস্তির নানা প্যাঁচ আর কৌশল। গোবর গুহর ইউ এস পি ছিল বিভিন্ন প্যাঁচকে তিনি লুকিয়ে রাখতেন। আর সুযোগ বুঝে সেই লুকনো প্যাঁচ দিয়েই ঘায়েল করতেন প্রতিপক্ষকে। টিব্বি, গাধানেট, টাক, ট্যাং, কুল্লা ইত্যাদি বিখ্যাত সব কুস্তির প্যাঁচে উনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত আর চৌখশ। ভারতবর্ষের এবং পৃথিবীর নানা প্রান্তের বাঘা বাঘা কুস্তীগিরদের তিনি অনায়াসে হারিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি শুধু মল্লচর্চাই করতেন না। তিনি কুস্তিকে গ্রহণ করেছিলেন অনেক বড় লক্ষ্যকে সামনে রেখে। শক্তি চর্চা ছিল উনার কাছে এমন এক সাধনা, যাকে প্রকাশ করে তিনি জাতির দৃঢ়তা ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। বিদেশ সফর করে গোবর গুহ প্রভূত সুনাম অর্জন করেছিলেন। উল্লেখ্য সেই সময়ে বিদেশপাড়ি দেয়া মানে তিনি অচ্ছুৎ এবং গর্হিত কাজ। কালাপানি সাধারণত কেউ পার হতে চাইতেন না সেই কারনেই। অথচ তিনি ভেনিশ, সুইৎজারল্যান্ড, ইংল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গায় কুস্তি লড়ে পৃথিবীর সেরা সেরা কুস্তীগির দের হারিয়ে দিয়েছিলেন অনায়াসে। পৃথিবীর সেরা পালোয়ানদের হারিয়ে ‘সেরা কুস্তীগিরের’ শিরোপা পেয়েছিলেন এই বাঙালি কুস্তীগির। কুস্তির জগতে আজও গোবর গুহ কে বলা হয় ‘রুপকথার নায়ক’। যতীন্দ্রচরণ গুহ ওরফে গোবর গোহ (সাহেবদের উচ্চারণে 'গুহ' হয়ে গিয়েছিল 'গোহ') ছিলেন এক বিশ্ববিখ্যাত ভারতীয় কুস্তিগীর ও পালোয়ান। ১৯২১ সালে তিনি প্রথম এশীয় ব্যক্তি যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্ব লাইট হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নশিপ জেতেন। কুস্তিগির-এর খাওয়া দাওয়া সুদর্শন চেহারার গোবর গুহ’র খাওয়া-দাওয়া নিয়ে নানা গল্প কাহিনী সেই সময় বাংলাদেশের গ্রামে গঞ্জে লোকমুখে ঘুরত। উনার বড় ছেলে রতন গুহ, নিজের বাবার জন্মশতবর্ষের সময় জানিয়েছিলেন গোবর গুহর প্রাত্যহিক খাওয়ার তালিকা বা ডায়েট চার্ট। রতন গুহ জানান, উনার বাবা রাত আড়াইটায় ঘুম থেকে উঠে ব্যায়াম করার আগে দুটো সন্দেশ খেতেন। ব্যায়ামের পর চিনির সরবত খেতেন। বেলা দশটার সময়ে আবার মাসেজের পর মাছ, বিভিন্ন তরকারি দিয়ে দু’চামচ ঘি-ভাত খেতেন। বিকেল তিনটায় শরবৎ খেয়ে শুরু করতেন ডন বৈঠক। বিকেল পাঁচটায় রাজসিক খাওয়া দাওয়া করতেন। খেতেন দু’টো মুরগির রোস্ট, ১৫০ গ্রাম বাদামের শরবৎ এবং একসের ঘি। পালোয়ানি ভাষায় এই খাবারটিকে বলা হয় ‘আকনি’। এই খাবার এবং অনুশীলন করে গোবর গুহর দেহের ওজন হয়েছিল ২৯০ পাউন্ড, বুকের ছাতি ৪৮ ইঞ্চি, হাতের কবজির বেড় ছিল ৮ ইঞ্চি এবং গলার বেড় ছিল ১৮ ইঞ্চি। অসম্ভব সুদর্শন চেহারার এই যুবক আজীবন কুস্তির প্রসারে কাজ করে গেছেন। দেশের প্রতি ভালোবাসা ছিল অকুণ্ঠ। কত ইংরেজ কুস্তীগিরকে যে তিনি ধরাশায়ী করেছেন তা বলে শেষ করা যাবেনা। কিন্তু ক্ষোভ ছিল একটাই। বাঙালি ছেলেরা কুস্তিকে ভুলে যাচ্ছে। তারা পরিশ্রম বিমুখ আর অনুশীলনে উৎসাহী নয়। বাঙালি তাঁর কথার মর্যাদা না দিলেও ধীরে ধীরে কিন্তু কুস্তি ফিরে আসছে দেশের মেইনস্ট্রিম খেলাধুলোয়। আশি বছর বয়সে ২রা জানুয়ারি ১৯৭২ সালে উনি পরলোক গমন করেন। কিন্তু ভারতীয় কুস্তির ইতিহাসে তিনি এখনও অমর। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ ভারতের কুস্তির ইতিহাস আনন্দ বাজার পত্রিকা Picture Courtesy by: Wikipedia