সারা পৃথিবীতে বিশেষ করে এশিয়া মহাদেশে ক্রিকেট এখন দারুন জনপ্রিয়। ছোটবেলায় ক্রিকেট খেলেনি এমন ভারতীয়কে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তাই হাতে হাতে থাকা ক্রিকেট ব্যাট এখন সবার চেনা। কিন্তু কীভাবে এল এই ক্রিকেট ব্যাট? ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন হয়েছে ক্রিকেট ব্যাটের ধরন। প্রথমদিকের ব্যাট মোটেও এখনকার মতো দেখতে ছিল না।ক্রিকেট ব্যাট ব্যবহারের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১৬২৪ সালে। সবচেয়ে পুরোনো বলে স্বীকৃত ব্যাটটি প্রদর্শিত হচ্ছে এখন লন্ডনের ওভালের একটি সংগ্রহশালায়। এটি ১৭২৯ সালে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। সে সময় সাধারণত উইলো কাঠ দিয়ে তৈরি হতো ক্রিকেট ব্যাট। ১৮০০ শতকের আগেও ক্রিকেট ব্যাটের আকার ছিল অনেকটা এখনকার হকি স্টিকের মতো। ১৮৩০ সালেও ব্যাটের হাতল ছিল না। পরে ব্যবহারের সুবিধার্থে হাতলসহ ব্যাট তৈরির প্রচলন শুরু হয়। শুরুতে ব্যাটের দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ নিয়েও নানা মজার কাণ্ডকারখানা ঘটেছে। সেসব বন্ধ করতেই ১৮৩৫ সালে ক্রিকেট ব্যাটের সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ঠিক করা হয় ৩৮ ইঞ্চি। এখন আর হাতে নয়, পেশাদার ক্রিকেট ব্যাট তৈরি হয় মূলত যন্ত্রের সহায়তায়। তবে খুব অল্প কিছু সুদক্ষ কারিগর এখনো হাতেই তৈরি করেন ব্যাট। ব্যাটের বিবর্তন এমসিসি কমিটির চেয়ারম্যান মাইক ব্রিয়ারলি, ব্যাটের আকারের প্রসঙ্গে বলেছিলেন, "১৯০৫ সাল নাগাদ ব্যাটগুলি ছিল প্রায় ১৬ মিলিমিটার চওড়া। ১৯৮০ সালে এসে ব্যাটের চওড়া হয়ে গেল, ১৮ মিলিমিটার। আর এখন একটি পেশাদার ক্রিকেট ব্যাট গড়ে ৩৫-৪০ মিলিমিটার হয়ে থাকে। কখনও কখনও তো এটি ৬০ মিলিমিটারও দেখা যাচ্ছে। আর এটাই প্রমাণ করে, পরিবর্তনগুলি কত দ্রুত ঘটে যাচ্ছে।" এরপর নিয়ম করা হলো, ব্যাটের প্রান্ত ৪০ মিলিমিটারের বেশি চওড়া হতে পারবে না, আর ব্যাটের প্রস্থ কোনোভাবেই ৬৭ মিলিমিটারকে অতিক্রম করতে পারবে না। ব্যাটের বলবিদ্যা বুঝতে হলে অবশ্য আমাদের আগে তাকাতে হবে ব্যাটের আকারের দিকে। দিনের পর দিন ব্যাটের আকার শুধু বড়ই হয়নি, বরং বাঁকাও হয়েছে বেশ। ১৯৯০ এর দিকের ব্যাটগুলি যেখানে সোজাসাপ্টা লম্বাকৃতির ছিল, এখনকার ব্যাটগুলি সেখানে কিছুটা বাঁকা করেই তৈরি করা হচ্ছে। তার অর্থ কিন্তু পরিষ্কার - ব্যাট তৈরিতে এখন আগের চাইতে বেশি কাঠের দরকার হচ্ছে। তবে ব্যাট প্রস্তুতকারকদের মতে এই বাঁকা আকৃতির ব্যাটের পেছনে যুক্তি অবশ্য একটু ভিন্ন। তারা মনে করেন, এটা শুধু শট খেলার জন্যেই নয়, বরং ব্যাটটাকে ব্যবহার করতে ও তুলতেও ব্যাটসম্যানকে সাহায্য করে। ব্যারি রিচার্ডসের হাটে দুই প্রজন্মের দুই ব্যাট। ১৯৭০ সালে বানানো ‘ওয়াকা’ ডান হাতে এবং বাম হাতে ওয়ার্নারের ‘কাবুম’, ২০১৫ সালে তৈরি। ছবি সৌজন্যেঃ Getty Images সুইট স্পট তবে ব্যাটের যে জায়গাটা কোনোরকম নিয়মের বেড়াজালে আটকে যায়নি, সেটা হলো ‘সুইট স্পট’। সুইট স্পটের সবচেয়ে সহজ সংজ্ঞা দিতে হলে বলতে হবে, ব্যাটের যে জায়গাটাতে বল লাগলে সবচেয়ে বেশি জোরে আঘাত করে আর ব্যাটসম্যানের হাতেও সবচেয়ে কম কম্পন অনুভূত হয়, সেটাই সুইট স্পট। ব্যাটের সুইট স্পট আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। আর তাই কোনো একটা শট খেলার পর সেটা মিসশট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও কমে যাচ্ছে। কিন্তু এরপরও আমাদের এটাও মানতে হবে, ব্যাটের এই বড় সুইট স্পটের মধ্যেও মাত্র একটা অংশই থাকে যেটাকে আমরা ইংরেজিতে ‘Best Part’ বলতে পারি! "সুইট স্পটটাই হলো ব্যাট-বলের সংঘর্ষের জন্য সুষ্ঠু জায়গা, যেটা সাধারণত গোড়া থেকে ১৫০-১৬০ মিলিমিটার উপরে রাখা হয়।" অনেকে মনে করে থাকেন, ব্যাটে কাঠের পরিমাণ বৃদ্ধি করলেই বুঝি ব্যাটটা একটা ভাল ব্যাট হয়ে যাবে। কিংবা ব্যাটের বলে আঘাত করার ক্ষমতা বাড়বে। ব্যাপারটা কিন্তু আসলে মোটেও সত্যি নয়। কিংবদন্তী ক্রিকেটার স্যার ভিভ রিচার্ডসের ব্যাটের ভর ছিল মাত্র ১,১০০ গ্রাম। এমনকি ওয়ার্নারের যে ব্যাট নিয়ে এতসব কাণ্ড ঘটে গেল, চওড়া হওয়া সত্ত্বেও ওয়ার্নারের সেই গদা আকৃতির ব্যাটের ভর ছিল মাত্র ১,১৯০ গ্রাম। তাই এটা বলাই যেতে পারে ক্রিকেটের দুই প্রজন্মের দুই মারকুটে ব্যাটসম্যান ভিন্ন ভিন্ন আকৃতির ব্যাট নিয়ে মাঠে মারকাটারি ইনিংস দেখালেও দু'জনের ব্যাটের ভরে আসলে খুব একটা পার্থক্য ছিল না। কিন্তু সবচাইতে বড় সত্যিটা হল, বাউন্ডারি মারার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে ব্যাটস ম্যানের বিগ-হিটিংয়ের ক্ষমতার ওপর এবং এই সংক্রান্ত অনুশীলনের ওপর। সেখানে পুরোপুরিভাবে ব্যাটের ওপর নির্ভর করা কিংবা ব্যাটকেই সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব দেওয়াটা আসলে বাহুল্যই হয়ে যায়। ক্রিকেটারদের জন্যে কাস্টমাইজড ব্যাট তৈরি প্রস্ততকারক সংস্থা ‘কোকাবুরা’ প্রতিষ্ঠাতা শ্যানন ইয়ং এবং ‘ব্যাট-ও ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড মুরাবিন’-এর প্রতিষ্ঠাতা ক্রিস হল উনারা দুজনেই একসাথে কাজ করেন। ইয়ং আর হল দু'জনে মিলে আবার মেলবোর্নে প্রতিষ্ঠা করেছেন, ক্রিকেট পারফরম্যান্স ল্যাব। আর এই ল্যাবেই ব্যাট-ফিটিং এর জন্যে একটা মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করেছেন তারা, যার নাম, ‘ব্যালেন্স পয়েন্ট ইন্ডেক্স’ (বিপিআই)। ব্যাটের নিচের অংশ যত বেশি চওড়া হবে, ব্যাটের বিপিআই হবে তত বেশি। তবে এই বিপিআই বেশি হওয়ার ব্যাপারটা যদি সাদামাটাভাবে বোঝাতে হয়, তাহলে বলতে হবে - যে ব্যাটের বিপিআই যত বেশি হবে, সেই ব্যাটের বলকে আঘাত করতে শুরুতে বেশি বল (Force) লাগবে। প্রাসঙ্গিক উদাহরণেই জানিয়ে রাখি, গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের ব্যাটের বিপিআই ৮৭, যেটা কি না বিপিআই স্কেলে সবচেয়ে উপরের রেঞ্জ আর তর্কাতীতভাবে এটাই হার্ড-হিটিং ব্যাটের বিপিআই। তবে ল্যাবে পরীক্ষার সময় ক্রিস হল কিন্তু একটু ভিন্ন ফলাফলই পেয়েছিলেন। ল্যাবে পরীক্ষামূলক অনুসন্ধানে হল দেখেছিলেন, একটা ব্যাটের বিপিআই যত বেশি হবে, ব্যাটসম্যানের পারফরম্যান্স তত খারাপের দিকে যাবে। তিনি এটাও পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানতে পেরেছিলেন, ব্যাটসম্যানের ব্যাটের আকারের ওপর পারফরম্যান্সের খুব একটা হাত নেই। আর তাই বড় ব্যাট বলতে ব্যাটস ম্যানদের যদি কিছু সুবিধা দেয়, সেটা একমাত্র মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ বর্তমান, ক্রিকেট ব্যাটের ইতিহাস