পাহাড়ি অলিম্পিয়ান সাইখোম মীরাবাঈ চানু মণিপুরের রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা। মণিপুর রাজের ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে শিব বর দিয়েছিলেন যে তাঁর বংশে কেবল পুত্রই জন্মাবে। কিন্তু তা সত্বেও যখন রাজকূলে চিত্রাঙ্গদার জন্ম হল রাজা তাকে পুত্ররূপেই পালন করলেন। রাজকন্যা অভ্যাস করলেন ধনুর্বিদ্যা, শিক্ষা করলেন যুদ্ধবিদ্যা, রাজদণ্ডনীতি। পুরুষদের মতোই বড় হয়ে উঠছিলেন চিত্রাঙ্গদা। মণিপুররাজ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে তার কন্যা চিত্রাঙ্গদার সাথে শুধুমাত্র মহাবীর অর্জুনেরই বিয়ে দেবেন। উত্তরপূর্বের কন্যাদের মধ্যে যেন সেই মহাভারতের সময়কার চিত্রাঙ্গদার লড়াকু চরিত্রের উপস্থিতি আজও। এদিকে ইন্দ্রপ্রস্থে সহবাস রত যুধিষ্ঠির ও পাঞ্চালিকে দেখে ফেলেন অর্জুন। অভিশাপে বারো বছরের বনবাস হয় অর্জুনের। অর্জুন এই বারো বৎসর ধরে ব্রহ্মচর্য ব্রত পালনের সময় ভ্রমণ করতে করতে এলেন উত্তরপূর্বের মণিপুর রাজ্যে। আর সেই সময়েই অর্জুন, চিত্রাঙ্গদার প্রেমে পড়েন। বিয়ে হল অর্জুন চিত্রাঙ্গদার। মহাভারতের সময় থেকেই এই উত্তরপূর্বের মেয়েরা ছিল লড়াকু আর পরিশ্রমী। আজও উত্তরপূর্বের পাহাড়ি মেয়েরা দেশের নাম উজ্জ্বল করছে অনেক লড়াই সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে। এই চিত্রাঙ্গদার রাজ্যের আরেক পাহাড়ি কন্যা সাইখোম মীরাবাঈ চানু প্রায় দু’দিন যখন না খেয়েই অলিম্পিকে পদকের জন্যে লড়াই করছেন, তখন এই দেশের মানুষ খেয়ে দেয়ে শান্তিতে ঘুমোচ্ছে। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা মনিপুরের ওয়েট লিফটার সাইখোম মীরাবাঈ চানুর সম্পর্কে জানবো। ২০২১ সালে অলিম্পিক পদক জয়ী চানু আজ সারা পৃথিবীর মেয়েদের কাছে এক জেদি, লড়াকু মেয়ের উদাহরণ। ইয়ুথ আইকন। উত্তর-পূর্ব ভারতের ছোট্ট রাজ্য মণিপুর। এই মণিপুর রাজ্যের উল্লেখ রয়েছে মহাভারতে। মনিপুরের রাজধানী ইম্ফল শহর থেকে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার দূরে নঙ্গপক কাকচিং গ্রামে ১৯৯৪ সালের ৮ই আগস্ট এক মৈথেয়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জেদি এক পাহাড়ি কন্যা সাইখোম মীরাবাঈ চানু। বাবা সাইখোম কৃতী মৈইতি পাবলিক ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্টের একজন সামান্য সরকারি কর্মচারী। মা সাইখোম উংবি টম্বী লিমা। সংসারের হাল ধরতে তিনি নিজেই শুরু করলেন বাড়ীর মধ্যেই একটি ছোট দোকান। তিন বোন আর দুই ভাই নিয়ে আটজনের পরিবার। ছোটবেলা থেকেই চলছে দারিদ্র্যের সঙ্গে চরম লড়াই। এভাবেই বেড়ে ওঠা। চানুর বয়েস যখন বারো তখন একদিন চানুকে নিয়ে বড় দাদা গেলো জঙ্গল থেকে কাঠ কুড়িয়ে আনতে। জঙ্গল থেকে কাঠ কুড়িয়ে আনলেই উনান জ্বলবে। খাওয়ার জুটবে। জঙ্গল থেকে কাঠ তো কুড়ানো হল কিন্তু সেই কাঠের বোঝা কাঁধে তুলতেই কষ্ট হচ্ছিল ওর বড় ভাইয়ের। সেই কাঠের বোঝাকে নিয়ে অনায়াসে পাহাড়ি পথ বেয়ে বাড়ি ফিরে এলো চানু। অবশ্য এগারো বছর বয়সেই স্থানীয় ওয়েট লিফটিং কম্পিটিশানে সোনা জিতে সবার নজর কাড়েন চানু। সেই কিশোরী বয়েসেই শুরু হয় সাইখোম মীরাবাঈ চানুর প্রশিক্ষণ। ভর্তি হন মণিপুরের স্পোর্টস একাডেমীতে। বালি বহনকারী ট্রাক চালকদের সহায়তাতেই প্রতিদিন গ্রামের বাড়ি থেকে একাডেমীতে যাতায়াত করতেন চানু। ২০১৪ সালের গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমস। সেখানেই প্রথম বড় সাফল্য এলো। মহিলাদের ভারোত্তোলনে আটচল্লিশ কেজি বিভাগে রৌপ্য পদক জয় করে গর্বিত করেন ভারতবাসীকে বছর কুড়ির এই তরুণী। এর ঠিক দুই বছর পরেই, ২০১৬ সালে বাইশ বছর বয়সে রিও অলিম্পিকে মহিলাদের ৪৮ কেজি বিভাগে কোয়ালিফাই করেন চানু। কিন্তু ‘ক্লিন এন্ড জার্ক’ বিভাগে তার তিনটি প্রচেষ্টার কোনওটিতেই সফল লিফট না থাকায় চানু সেবার ইভেন্টটি শেষ করতে ব্যর্থ হন। সেদিন চানুর নামের পাশে তকমা বসল DNF অর্থাৎ ‘ডিড নট ফিনিশ’। এরপরেই মানসিক ভাবে প্রচণ্ড ভেঙ্গে পড়েন এই লড়াকু মেয়েটি। বাড়ির সবার পরামর্শে শেষ পর্যন্ত কথা বললেন সাই-এর (Sports Authority of India) সাইকোলজিস্টদের সঙ্গে। সাই’য়ের সাইকোলজিস্টরা তখন চানুকে বললেন যে, ‘এটা ছিল তোমার প্রথম অলিম্পিক। স্বাভাবিক ভাবেই তোমার মনের উপর চাপ ছিল অনেক বেশী। সঙ্গে প্রত্যাশাও ছিল অনেক বেশী। তাছাড়া তোমার আর্থ-সামাজিক পরিবেশ, অন্যদিকে অলিম্পিকের পরিস্থিতি আর পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা। এই বৈপরীত্যই তোমাকে সফল হতে দেয়নি। অলিম্পিকে পদক জেতার সম্ভাবনা তোমার মধ্যে প্রবল। তুমি সফল হবেই’। সাইকিয়াট্রিস্টদের এই কথাগুলিই ম্যাজিকের মতো কাজ করলো। এরপরেই এই মনিপুরী কন্যার উল্লেখযোগ্য প্রত্যাবর্তন হল। অদম্য জেদ, সাহস, আর মানসিক শক্তির জোরে তিনি ফিরে এলেন ২০১৭ সালে। ২০১৭ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার এনাহিমে ‘ওয়ার্ল্ড ওয়েটলিফটিং চ্যাম্পিয়ানশিপ’- এ মেয়েদের আটচল্লিশ কেজিতে স্বর্ণ পদক অর্জন করেন। ২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার ‘গোল্ড কোস্টে কমনওয়েলথ গেমস’-এ ১৯৬ কেজি ওজন তুলে ভারতে প্রথম স্বর্ণ পদক এনে দেন। ২০১৯ সালে চিনের নিংবোতে ‘এশিয়ান চ্যাম্পিয়ানশিপ’-এ ১৯৯ কেজি ওজন তুলে টোটাল ভারোত্তোলন করেও পদক হাতছাড়া হয়ে যায়। আবার ব্যর্থতা। কিন্তু দমে যাননি। ২০২০ সালে কলকাতায়, ‘জাতীয় প্রতিযোগিতায়’ ৪৯ কেজি বিভাগে ২০৩ কেজি ওজন তুলে সোনা জেতেন চানু। ২০২১ সালের ২৩ জুলাই, শুরু হল টোকিও অলিম্পিক। ঠিক পরেরদিন ২৪ জুলাই ২০২১ ভারতবাসীর জীবনে ঘটে গেলো এক অবিশ্বাস্য ঘটনা । ভারোত্তোলনে ১১৫ কেজি বারবেল তুলে প্রথম এবং একমাত্র রৌপ্য পদক জিতলেন সাইখোম মীরাবাঈ চানু। রৌপ্য পদক অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে ক্লিন এন্ড জার্ক- এ ১১৫ কেজি ভারোত্তোলন করে রেকর্ড গড়েন এই অদম্য জেদি পাহাড়ি মেয়েটি। ২০১৬ সালে রিও অলিম্পিকে ব্যর্থ হয়ে মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পরা এই পাহাড়ি কন্যাটি মাত্র চার বছর পরেই ইতিহাস গড়লেন পৃথিবীতে। আজ তিনি দেশের গর্ব এবং সফল একজন পাহাড়ি অলিম্পিয়ান। চিত্রাঙ্গদার মতোই সাইখোম মীরাবাঈ চানুর নাম আজ লেখা হচ্ছে দেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে। মেয়েদের কাছে আজ চানু অনুপ্রেরণা। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ Sports Authority of India/ Times of India/ Indian Express Picture Courtesy: Times of India