শিব ঠাকুরের প্রিয় খাবারই শুধু নয়, সিংহাসনও ফিরিয়ে দিয়েছিল খিচুড়ি চাল ডালের টলটলে খিচুড়ি সম্পর্কে আমাদের ধারনা খুব একটা ভালো নয়। কারণ আমরা দেখেছি বন্যার সময়, প্রাকৃতিক দুর্যোগে, শরণার্থী ক্যাম্পে টলটলে খিচুড়ির আখ্যান। আবার বর্ষার ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা রাতে খিচুড়ি খেতে কে না পছন্দ করে। শরীর খারাপেও খিচুড়ি আমাদের প্রিয়। শিব ঠাকুরের প্রিয় খাবার খিচুড়ি এই খিচুড়ির উপাখ্যান কিন্তু আমাদের বেদ পুরাণেও রয়েছে। পুরাণ ঘাটলে দেখা যায় সবচেয়ে সুস্বাদু খিচুড়ি রাঁধতেন স্বয়ং পার্বতী। দেবাদিদেব শিবের খুব পছন্দের ছিল খিচুড়ি। মনসামঙ্গল কাব্যে স্বয়ং শিবের খিচুড়ি খাওয়ার উল্লেখ রয়েছে। আমরা সবাই জানি শিব ঠাকুর আপনভোলা মানুষ। সংসারের কোন খোঁজ খবর রাখেন না। কৈলাসে পার্বতীর রান্না ঘরে কিচ্ছুটি নেই। সকাল থেকে একটাই চিন্তা ছেলেমেয়েদের মুখে কি দেবেন। গণাই ঘুম থেকে উঠেই খাওয়ার জন্যে কাঁদবে। এরমধ্যে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। স্বামীর কোনো হেলদোল নেই। নিজের চিন্তায় মগ্ন। শেষে রুদ্র মূর্তি ধারণ করে নিজেই গিয়ে হাজির হলেন শিবের সামনে। সটান প্রশ্ন, ঘরে কিছু নেই কি রান্না হবে? শিব ঠাকুরের জবাব, এই ঠাণ্ডায় ডাব-মুগের খিচুরি দারুন জমবে। লোকটার উপর রাগ উঠলেও কিছু বলতে পারেনা পার্বতী। কিন্তু এই সাত সকালে ডাব পেড়ে দেবে কে! তখনও কৈলাসে শিব ঠাকুরের সাঙ্গপাঙ্গদের ঘুম ভাঙেনি। এরই মধ্যে তুমুল হাঁকডাক শুরু। ধড়মড়িয়ে উঠে বসলেন শিবের চ্যালা নন্দী। দেখল মা পার্বতী ডাকছেন। এক ছুটে পার্বতীর কাছে পৌঁছুতেই পার্বতী আদেশ দিলেন- ডাব পেড়ে আনার। সাতসকালে কৈলাসের এই শীত ঠাণ্ডায় কে খাবে ডাব? নন্দী প্রশ্ন করতেই নথ নাড়িয়ে পার্বতী বললেন, তোদের বাবার হুকুম ডাবের জল দিয়ে মুগ ডালের খিচুড়ি খাবেন। যা জলদি যা সময় মতো খাওয়ার না পেলে তোদের বাবার মাথা গরম হয়ে যাবে। প্রলয় হয়ে যাবে। আদেশ পেয়ে ডাব পাড়তে ছুটলেন নন্দী। নন্দীর কাণ্ড কারখানা দেখে হেসে গড়িয়ে পড়লেন পার্বতী। সারা রাতের নেশা এখনও কাটেনি, কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে গেছে ছেলের। কোথায় না আবার হুমড়ি খেয়ে পড়ে। পার্বতী হাসতে হাসতে বললেন, আস্তে যা। মা তো সবই বোঝেন। নন্দী ডাব পেড়ে এনে দিলেন। সেই ডাবে মুগ আর চাল দিয়ে খিচুড়ি রাধলেন পার্বতী। খিচুড়ির গন্ধে কৈলাসে সবার খিদে যেন বেড়ে গেছে আরও। শিব ঠাকুর স্বয়ং পাত পেড়ে বসলেন সন্তানসন্ততি সব নিয়ে। পার্বতী কলা পাতায় দাব-মুগের খিচুড়ি খাইয়ে সবাইকে সন্তুষ্ট করলেন। ভাবুন খিচুড়ির খ্যাতি কৈলাসেও। শিবের প্রিয় খাবার খিচুড়ি। বাঙালিদের খিচুড়ি প্রীতি কিন্তু সেই শিবের সময় থেকেই। কৈলাসেও খিচুড়ি বিখ্যাত ভাবা যায়! সিংহাসন ফিরিয়ে দিয়েছিল সুস্বাদু খিচুড়ি পুরাণকাব্য থেকে এবার সটান চলে আসছি রাজ দরবারে। সেখানেও খিচুড়ির প্রবেশ ছিল অবাধ। রাজপুত রানারা খাবারদাবার নিয়ে যতই নাক উঁচু হন না কেন, যোধপুরের প্রতিষ্ঠাতা রাও যোধাকে সিংহাসন ফিরিয়ে দিয়েছিল এই খিচুড়িই। রানা কুম্ভের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে গিয়েছিলেন রাও যোধা। সিংহাসন, রাজত্ব সব হারিয়ে তিনি পথে পথে ঘুরছেন। বহুবার চেষ্টা করেও রাও যোধা রাজত্ব উদ্ধারে ব্যর্থ। এইভাবেই একদিন উদ্ভ্রান্ত রাও যোধা গিয়ে উঠলেন, এক জাঠ কৃষকের বাড়িতে। অভুক্ত, পরিশ্রান্ত, রাজা রাও-কে তো চিনতেই পারলেন না কৃষক বউ। তিনি অতিথিকে গরম গরম এক বাটি খিচুড়ি পরিবেশন করেন। পেটের জ্বালায় রাও যোধা গরম খিচুড়ির মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে দেন। সঙ্গে সঙ্গে হাতে ছ্যাকা আর ফোসকা। তখনই চাষি বউ বলে ওঠে আপনি তো দেখছি আমাদের রাজা যোধা রাওয়ের মতো। উনি যেমন বারবার রানা কুম্ভকে হারাবার জন্যে দুর্গের মাঝখানে আক্রমণ করেছেন আর পরাজিত হচ্ছেন। খিচুড়ি খেতে হয় ধার দিয়ে। কারণ, গরম খিচুড়ি ধারের দিকে আগে ঠাণ্ডা হয়। মাথায় বুদ্ধি খেল গেল রাও যোধার। এরপর তিনি চিতোর দুর্গ আক্রমণ করেন সীমান্ত এলাকা থেকে। পনেরো বছর পর ফিরে পান রাজত্ব। মুঘলদের খিচুরি প্রীতি মুঘলদের খিচুড়ি প্রীতিও কম ছিল না। আবুল ফজল তাঁর আইনি-ই-আকবরেই সাত রকমের খিচুড়ির রেসিপির কথা লিখে গেছেন। মুঘল বাদশাহদের খিচুরির প্রতি টান উত্তরাধিকার সুত্রে প্রাপ্ত। সম্রাট জাহাঙ্গীর একবার গুজরাটে ভুট্টার খিচুরি খেয়ে মোহিত হয়ে মুঘল হেঁশেলে জায়গা দেন খিচুড়িকে। খিচুড়ি এতোটাই পছন্দ ছিল উনার যে, নাম দিলেন ‘লাজিজান’। যার অর্থ বেশ সুস্বাদু। সম্রাট শাহজাহান, পর্তুগিজ পর্যটক সেবাস্তিয়ান মানরিখকে পেস্তা বাদাম আর গরম মশলা দিয়ে এমন এক খিচুরি খাইয়েছিলেন যা খেয়ে মানরিখের মনে হয়েছিল মণি মানিক্যের খিচুরি খেয়েছেন। ‘আলমগিরি খিচুরি’ আবার সম্রাট ঔরঙ্গজেবের কাছে লাজিজ খানা। এই খিচুড়িতে মাছ আর ডিম সেদ্ধ দেয়া হতো। এরপর ইংরেজরাও খিচুড়ির মায়ায় জড়িয়ে নিজেদের মতো করে রান্না করতে শুরু করলেন খিচুড়ি। ব্রিটিশ কিচেনে এই খিচুড়ির নাম পড়লো ‘কেডগিরি’। খিচুড়ির হরেক নাম খিচুড়ি আবার স্থান-কাল ভেদে নাম বদলে ফেলে। আলমগিরি খিচুড়ি, কেডগিরি, লাজিজান খিচুড়ি ইতিহাসে বিখ্যাত তো বটেই তবে আরও হরেক নাম রয়েছে খিচুড়ির। কাশ্মীরি পণ্ডিতেরা কুবের-কে খিচুড়ি ভোগ উৎসর্গ করেন, যার নাম ‘খেতসিমাভাস’। তামিলনাড়ুতে খিচুড়ি মানেই ‘পোঙ্গল’। রাজপুতানায় যে হালকা খিচুড়ির প্রচলন রয়েছে তাকে বলে ‘তেহরি’। মহারাষ্ট্রে খিচুরির সঙ্গে মেশানো হয় সর্ষে। উত্তর ভারতে পেটের সমস্যা হলেই মানুষের ভরসা অড়হর ডালের খিচুরি। বাঙালির খিচুড়ি বাঙালির সাথে খিচুড়ির মাখওমাখো সম্পর্ক থাকলেও এই খিচুড়ির উৎস কিন্তু বাংলা নয়। বাংলায় খিচুড়ির আবির্ভাব ১২০০-১৮০০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে। চৈতন্য দেবের খিচুড়ি প্রীতি ছিল। স্বামী বিবেকানন্দ আবার পছন্দ করতেন সবজি দেয়া খিচুড়ি। সবাই জানি খুব ভালো রাঁধতে পারতেন স্বামীজী। উনি যখন বিদেশে যেতেন সঙ্গে নিয়ে যেতেন নিজের হাতে তৈরি মশলা। সেই মশলা ব্যাবহার করেই তিনি রান্না করতেন সুস্বাদু খাওয়ার। স্বামীজী তখন ঋষিকেশে। গুরুভাইরা সেখানে ঝুপড়ি বেধে ঘোর তপস্যা শুরু করেছেন। এরই মধ্যে বিবেকানন্দের ধুম জ্বর এলো। মুখে রুচি নেই। খুব ইচ্ছে হলো খিচুরি খাওয়ার। চাল-ডাল ভিক্ষে করে এনে বসানো হল খিচুড়ি। স্বামীজীর মুখের স্বাদ ফেরাতে তাতে আচ্ছা করে লঙ্কা দেয়া হলো। ভিক্ষায় খানিকটা মিছরি পাওয়া গেলো। রাখাল মহারাজ ভাবলেন, এটা আর পড়ে থাকবে কেন! খিচুড়িতে দিয়ে বসলেন। ব্যাস মিষ্টি খিচুড়ি মুখে তুলতেই বিবেকানন্দের নাক সিটকে গেলো। জ্বর গায়েই রাখালকে আচ্ছা করে জ্বরের ঘোরে বকে দিলেন, ‘খিচুড়িতে কেউ মিছরি দেয়? আক্কেল নেই তোর রাখাল?’ শোনা যায় এই মিষ্টি খিচুড়ি খেয়েই নাকি সুস্থ হয়ে উঠলেন স্বামীজী। অনেকে আবার মিষ্টির সাথে আমের টুকরো, চালতার টুকরো, তেঁতুল ইত্যাদিও দিয়ে থাকেন। খিচুড়ি আসলে সার্বজনীন খাবার। ডাল-চাল-সবজি সব খিচুড়ির মধ্যে পড়লেও আলাদা করে তাদের চেনা যায়। ঠাকুর বাড়িতেও খিচুড়ি রান্না হতো বিশেষ ভাবে। এই দেশের যেমন হাজারো বৈচিত্রের মধ্যেও রয়েছে ঐক্য, তেমনি বিচিত্র এই খাবারেও রয়েছে দেশের আত্মা। আমাদের পুষ্টি। তাই শীত গ্রীষ্ম বারো মাস, খিচুড়িই ভরসা। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ সমসাময়িক পত্রপত্রিকা, ‘অবিশ্বাস্য বিবেকানন্দ’ লেখক শংকর।