বিবাহ বিচ্ছেদ, মায়ের মৃত্যু, সিঙ্গেল প্যারেন্টিং, বেকারত্ব সবমিলিয়ে একটা সময়ে ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশানে ভুগছিলেন হ্যারি পটারের লেখিকা। এক সময় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আত্মহত্যার। এরপরই ঘুরে দাঁড়ালেন নিজের চিকিৎসা করে। আজ তিনিই পৃথিবীর সবচেয়ে দামী লেখিকা। সবচেয়ে বেশী কর দিয়ে থাকেন। শুধু তাই নয় ছাপার আগেই এই লেখিকার বইয়ের স্বত্ব বিক্রি হয় মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারে। ছাপা হওয়ার প্রথম দিনেই ১১ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয় রাউলিং এর এক একটি বই। আজকের প্রতিবেদনে আমরা জেনে নেবো এই বিখ্যাত লেখিকার জীবনের ওঠাপড়ার গল্প। শৈশব এবং পড়াশোনা শৈশবটা উইন্টারবোর্ন গ্রামে কাটালেও, জোয়ান রাউলিং এর জন্ম ইংল্যান্ডের গ্লোস্টাশায়ারের ইয়ট শহরে। তিনি ১৯৬৫ সালের ৩১ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। জোয়ানের বাবা ইঞ্জিনিয়ার জেমস রাউলিং ও মা টেকনিশিয়ান অ্যান রাউলিং। মায়ের অসুস্থতা এবং বাবার সাথে সম্পর্কটা ভালো ছিলনা বলেই রাউলিং পরিবারের গল্পটা ধীরে ধীরে মলিন হতে থাকে। রাউলিং সাথে তাঁর বাবার সম্পর্কও খুব একটা ভালো ছিল না। পারিবারিক সমস্যা থেকে দূরে থাকতে ও কিছুটা শান্তি খুঁজে পাওয়ার জন্য মাঝেমধ্যেই রাউলিং বেছে নিতেন বই পড়া ও ফ্যান্টাসি গল্প তৈরি করার মত কাজ। পরবর্তী জীবনে রাউলিং বলেছিলেন যে, তাঁর শৈশব এবং কৈশোর মোটেও সুখের ছিল না। অন্যান্য কিশোর কিশোরীরা যতটা সচ্ছল জীবনযাপন করে রাউলিং-এর তা মোটেই ছিলনা। রাউলিং এর শিক্ষার হাতেখড়ি হয় সেন্ট মাইকেল প্রাইমারি স্কুলে। মাধ্যমিক স্কুল শেষ করেন উইডেন স্কুল এন্ড কলেজ থেকে। একাধারে ইংরেজি, ফরাসি এবং জার্মান ভাষা নিয়ে পড়াশুনা করেছেন। ১৯৮২ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদন করলেও সেখানে সুযোগ পাননি তিনি। শেষে ভর্তি হন এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকেই স্নাতক হন রাউলিং। কর্মজীবন, প্রেম এবং বিবাহ ১৯৮৬ সালে স্নাতক শেষ করে এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালেই কিছুদিন লেখালেখির করেন রাউলিং। এরপর লন্ডনের অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালে গবেষক ও দোভাষী হিসেবে চাকরি নেন। ১৯৯১ সালের দিকে রাউলিং শিক্ষকতা করতে পর্তুগালের পোর্তোতে চলে যান। তিনি তখন রাতে পড়াতেন আর দিনে ভায়োলিন কনসার্ট শুনতে শুনতে লেখালেখি করে সময় পার করতেন। পোর্তোতে আসার ১৮ মাস পরে রাউলিং জর্জ আরান্তেস নামক একজন পর্তুগীজ টেলিভিশন সাংবাদিক এর সাথে পরিচিত হন। এরপর পরিচয় থেকে প্রেম। ১৯৯২ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই সেই সম্পর্ক ভেঙ্গে যায়। এরই মধ্যে রাউলিং এর প্রথম সন্তান জেসিকা ইসাবেল রাউলিং এর জন্ম হয়। প্রথম বিয়ে ভেঙ্গে যাওয়ার পর সিঙ্গেল মাদার হিসেবে দীর্ঘদিন কাটান রাউলিং। এরপর ২০০১ সালে তিনি নিল মুরে নামে একজন স্কটিশ চিকিৎসককে বিয়ে করেন। রাউলিং এর জীবনে ঘটে যাওয়া দূর্ঘটনা রাউলিং যখন খুব ছোট তখন তাঁর মা স্নায়ুতন্ত্রের জটিল রোগে আক্রান্ত হন। এছাড়া বাবার সাথেও রাউলিংয়ের এবং তাঁর মায়ের সম্পর্ক খুব একটা ভালো ছিল না। ছোটবেলা থেকেই এসব কারণেই রাউলিংয়ের জীবন ছিল দুঃখময়। পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না পাওয়ায় একটা সময়ে খুব ভেঙ্গে পড়েছিলেন তিনি। এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলেও, সাত বছরের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে নিজেকে তিনি একজন ব্যর্থ মানুষ হিসেবেই মনে করতেন। জোড়াতালি দিয়েই জীবন চলছিল। ছিল না ভালো ভাবে চলার মতো কোনো চাকরি বা অর্থোপার্জনের জন্য কোন পথ। এরইমধ্যে ১৯৯০ সালে রাউলিং এর জীবনে ঘটে যায় আরও একটি দূর্ঘটনা। তাঁর মা দশ বছর অসুস্থ থেকে শেষে মৃত্যুবরণ করেন। রাউলিং এ ঘটনায় একেবারেই ভেঙ্গে পড়েন। একেই তো বিবাহ বিচ্ছেদ এরমধ্যে মায়ের মৃত্যু। স্বামী প্রচণ্ড নির্যাতন করতেন তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই রাউলিং বিবাহ বিচ্ছেদ করেন। এর মধ্যেই চাকরিটাও হারান। দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালোভাবে গ্র্যাজুয়েশনের পরও বেকারত্বের কারণে রাউলিং হতাশ হয়ে পড়েন। বেকার অবস্থায় সিঙ্গেল মাদার হিসেবে সন্তান নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন তিনি। মা হারানো, বিবাহ বিচ্ছেদ, নির্যাতন, চরম বেকারত্ব, সিঙ্গেল প্যারেন্টিং সব মিলিয়ে তিনি জীবনের সবচেয়ে প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন। ঐ সময়ে রাউলিং ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনে পড়ে যান এবং আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন। যাই হোক, এরপরে বিভিন্ন থেরাপি ও চিকিৎসার পরে তিনি এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। নিজেই সিদ্ধান্ত নেন এবার কিছু একটা করতে হবে। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)।