লেপের রঙ কেন লাল হয়! শীত মানেই কিন্তু লেপ। সেই ইতিহাসে পরে আসছি। প্রথমেই জেনে নেই বধিরদের পিতা এক শিক্ষাবিদ সম্পর্কে। একটু অবাক হচ্ছেন তো! কিন্তু শার্ল-মিশেল দ্য লেপে ফ্রান্সের ভেরসাই শহরে ১৭১২ সালের ২৪ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ১৮শ শতকের ফ্রান্সের একজন পরহিতৈষী শিক্ষাবিদ ছিলেন তিনি। তিনি “বধিরদের পিতা” নামেই সর্বাধিক পরিচিত। লেপে- বধিরদের পিতা শার্ল-মিশেল দ্য লেপে-র কাজের আগে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ধারণা করা হত যে বধিরদেরকে ঠিক করে শিক্ষাদান সম্ভব নয়। বধিরদের শিক্ষাদানে নিয়োজিত যেসব শিক্ষক ছিলেন, তারা কেবল ধনী পরিবারের জন্যই কাজ করতেন। ১৮শ শতকের মধ্যভাগে শার্ল-মিশেল দ্য লেপে ফরাসি শব্দগুলিকে হাতের আঙ্গুলের ইশারার মাধ্যমে বর্ণ দিয়ে বানান করে করে দেখানোর একটি ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেন। এই ব্যবস্থাতে শুধু একক বর্ণ নয়, অনেক সামগ্রিক ধারণাও সহজ ইশারার মাধ্যমে দেখানো যেত। লেপে-র এই ব্যবস্থাটিই বিবর্তিত হয়ে পরবর্তীতে ফরাসি ইশারা ভাষার উদ্ভব হয়। যা এখনও ফ্রান্সে প্রচলিত। আবার এই ফরাসি ইশারা ভাষাকে অনুকরণ করেই অন্যান্য জাতীয় ভাষাসমূহের ইশারা ভাষাগুলি (যেমন মার্কিন ইংরেজি ইশারা ভাষা) তৈরি করা হয়। লেপে ১৭৬০-এর দশকের শুরুতে বধিরদের জন্য বিশ্বের সর্বপ্রথম বিনামূল্যের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যার নাম ছিল "আঁস্তিত্যু নাসিওনাল দ্য জ্যন সুর দ্য পারি" (ফরাসি ভাষায় Institut National de Jeunes Sourds de Paris), বাংলায় "প্যারিস জাতীয় তরুণ বধির ইন্সটিটিউট"। শিক্ষাক্ষেত্রে লেপের অবদান লেপের আগে অন্যান্য বিভিন্ন দেশের শিক্ষাবিদেরা বধিরদের শিক্ষাদানের জন্য তাদের নিজস্ব ব্যবস্থা প্রয়োগ করলেও লেপে-র প্রণীত এই ব্যবস্থাটি সবকিছু বদলে দেয়। তিনি বধিরদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে প্রচলিত ইশারার ভাষাকে একটি নিয়মাবদ্ধ ও রীতিসম্মত ভাষায় রূপান্তরিত করেন, যার মূলনীতিগুলি বিশ্বজনীনভাবে প্রয়োগ করা যায়। ২৩ শে ডিসেম্বর ১৭৮৯ সালে প্যারিসে উনার মৃত্যু হয়। কিন্তু সারা পৃথিবীর বধিরদের পিতা আর সারা জীবনে উষ্ণতা আর ভরসা কিন্তু এই মহান শিক্ষাবিদ লেপেই। বাংলাদেশের শীতের লেপের ইতিহাস এবার আসি এই দেশের শীতের ভরসা লেপের কথায়। শীতের পরশ লাগতেই লেপ-তোষক বানানোর ধুম পড়ে যায় আমাদের দেশে। লেপ তোষকের দোকানে ক্রেতাদের ভিড় থাকায় ব্যবসায়ীদেরও পোয়াবারো হয়। তারা মৌসুমী লাভের এই সুযোগটাকে হাতছাড়া করতে চায় না কোনোভাবেই। শীতের আসার আগেই লেপ ও তোষকের দোকান ছেয়ে যায় লাল আভায়! কারণ লেপ মানেই যেন তুলায় মোড়ানো লাল কাপড়! প্রশ্ন তো জাগতেই পারে, বেশিরভাগ লেপে কেন লাল কাপড় ব্যবহার করা হয়? লাল লেপের ইতিহাস এক সময় মুর্শিদাবাদের একেবারে নিজস্ব এই শিল্পের নাম ছিল সর্বত্র। লম্বা আঁশের কার্পাস তুলাকে বীজ ছাড়িয়ে লাল রঙ্গে চুবিয়ে শুকিয়ে ভরা হতো মোলায়েম সিল্ক এবং মখমলের কাপড়ের মাঝখানে। সেই মখমলের রঙ ছিল লাল। সুগন্ধের জন্যে দেওয়া হতো আতর। এখন অবশ্য উচ্চমূল্যের কারণে মখমলের কাপড় ব্যবহার হয় না। বাংলা, বিহার, ওড়িশাসহ অভিবক্ত বাংলার প্রথম নবাব, মুর্শিদ কুলি খানের আমল থেকেই রীতি অনুযায়ী লাল মখমলের কাপড় ব্যবহার করে লেপ সেলাই করা হতো। এরপর মুর্শিদ কুলি খানের মেয়ের জামাই, নবাব সুজাউদ্দিন মখমলের পরিবর্তে সিল্ক কাপড়ের ব্যবহার শুরু করেন। তবে রঙের কোনো পরিবর্তন আসেনি। তবে মখমল ও সিল্কের কাপড়ের মূল্য জনসাধারণের হাতের নাগালে না থাকার কারণে, পরবর্তীতে সাধারণ কাপড় ব্যবহারের চল শুরু হয়। তবে তখনও কাপড়ের রঙ লালই থেকে যায়। লেপে এই রীতি ও রঙের ব্যবহার নবাবরাও অনুসরণ করতেন। সেই থেকে লাল কাপড়ে লেপ বানানোর রীতি চলে আসছে। কেন লাল রঙ ব্যাবহার করা হয় লেপ তৈরিতে! আরো কিছু কারণ রয়েছে লাল রঙ ব্যাবহারের পেছনে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, লেপ কখনো ধোয়া যায় না। আর লাল কাপড় ব্যবহারের ফলে ময়লা কম দেখা যায়। তবে এ ক্ষেত্রেও মতান্তর রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, ইতিহাস বা ঐতিহ্যের রীতি মেনে নয়, ব্যবসার খাতিরে ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই লাল কাপড়ে মুড়ে রাখা হয় শীতের সাধের লেপ কে। ফলে দূর থেকেই তা ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। যদিও আজকাল বিভিন্ন রঙের সমাহার বা কাপড় দেখা যায় লেপের গায়ে। চলে এসেছে আধুনিক প্রজুক্তিতে তৈরি ব্ল্যাংকেট বা গরম চাদর ইত্যাদি। কিন্তু মাঘের ঠাণ্ডায় লেপের জুরি নেই। তাই লেপ কিন্তু এখনও স্বমহিমায় শীতকাতুরে মানুষের হৃদয়ে আছে। যেমন বধিরদের পিতা, ‘শার্ল-মিশেল দ্য লেপে’। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্য সুত্রঃ উইকিপিডিয়া, সমসাময়িক সংবাদপত্র।