প্রথমে ছাপা হয়েছিল মাত্র ৫০০ কপি। এখন শুধুমাত্র পাণ্ডুলিপি বিক্রির জন্যেই নিলাম হয়। সেই নিলামে জমায়েত হয় তাবড় তাবড় প্রকাশকেরা। অথচ এই প্রকাশকরাই এক সময় হ্যারি পটারের লেখিকা জে কে রাউলিং কে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। ছোট্ট মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে দিনের পর দিন চলত লেখা। এডিনবরার ক্যাফেগুলো সাক্ষী থেকেছে সেই সব সময়ের। এই ভাবেই ১৯৯৫-এ প্রথম লেখার খসড়া তৈরি হয়। কিন্তু প্রকাশক? দু’বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর অবশেষে মিলল প্রকাশক। ব্লুমসবেরি থেকে প্রকাশিত হল ‘হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ফিলোজফারস স্টোন’ (কোনও কোনও দেশে বইটি প্রকাশ হয়েছিল ‘হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য সরসরাস স্টোন’ নামে)। এর আগে ইংরেজি শিশু সাহিত্যে ব্লাইটন সিরিজ জনপ্রিয় ছিল বটে, কিন্তু হ্যারি পটার বাজারে এসে জনপ্রিয়তার সংজ্ঞাটাই বদলে দিল। ’৯০ বা তার পরের দশকে বড় হয়ে ওঠা শিশুকিশোরদের ছোটবেলাটা হয়ে উঠল হগওয়ার্ডের সময়। হ্যারি পটারের আবাসিক স্কুলের নাম ছিল হগ ওয়ার্ডস। এবং সেটা কিন্তু গোটা পৃথিবী জুড়েই। অনেক হ্যারি অনুরাগী নাকি বাবা-মায়ের কাছে প্যাঁচা পোষারও আবদার জুড়েছিল এই বই পড়ে। প্রথম বই প্রকাশের কয়েক দিনের মধ্যেই হ্যারি ও তাঁর সহপাঠীদের মুখে ব্যবহৃত শব্দ জায়গা করে নিয়েছিল অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে। ‘মাগল্’। অর্থ, যে ব্যক্তি অতি সাধারণ। হগ ওয়ার্ডসে অবশ্য ‘ম্যাজিক’ না জানা যে কেউই মাগল্। হ্যারিম্যানিয়ায় আক্রান্ত খুদে পাঠকের দল তখন মজেছে নতুন খেলায়। ঝাড়ুর ওপর চেপে সাঁ করে উড়ে গিয়ে খেলতে হয় ‘কুইডিচ’। নিমেষে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এই খেলা। হ্যারি পটার বুক সিরিজ ১৯৯০ সালে ম্যানচেস্টার থেকে লন্ডন যাওয়ার সময় রেলস্টেশনে বসে এই বুক সিরিজের প্লটটি প্রথম রাউলিং মাথায় আসে। জাদুজগতের নানা কাহিনী নিয়ে লিখিত ‘হ্যারি পটার’ বুক সিরিজ রাউলিং এর এক যুগান্তকারী সৃষ্টি। রাউলিং ১৯৯৫ সালে ‘Harry Potter and the Philosophers Stone’ বইটির পান্ডুলিপি লেখা শেষ করেন। অর্থের অভাবে তাঁর পুরনো ম্যানুয়াল টাইপ রাইটার দিয়েই তিনি পান্ডুলিপিটি টাইপ করেন। ১২ টি প্রকাশনীর দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও কেউ তার লেখা ছাপতে রাজি হয়নি। অবশেষে লন্ডনের ব্লুমসবেরী প্রকাশনীর চেয়ারম্যান ক্যানিংহ্যাম তাঁর ছোট মেয়ের অনুরোধে পান্ডুলিপিটি ছাপতে রাজি হন। পাণ্ডুলিপিটি পরেই এই প্রকাশকের মনে হয়েছিল এক অনন্য সৃষ্টি এই হ্যারি পটার। ১৯৯০ এর ডিসেম্বরে রাউলিং এর মা মারা যান। যার ফলে রাউলিং কখনোই তার মাকে বইটি সম্পর্কে জানাতে পারেননি। মায়ের মৃত্যু রাউলিং এর মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তার নিজের অভিভাবক হারানোর যন্ত্রনা তিনি বইয়ের প্রধান চরিত্র অভিভাবকহীন হ্যারির মধ্য দিয়ে ফুটিয়ে তুলেন। মা মারা যাওয়ার পর রাউলিং পর্তুগালে গিয়ে লেখালেখি চালিয়ে যান। বিয়ে এবং ডিভোর্সের পর তিনি যখন তার সন্তানসহ এডিনবার্গে চলে আসেন, তাঁর স্যুটকেসে তখনো ছিল বইয়ের তিনটা চ্যাপ্টার। এডিনবার্গে এসে রাউলিং আবার তাঁর লেখা শুরু করেন। রাউলিং মূলত একটি ক্যাফেতে বসে লেখালেখি করতেন। পরবর্তীতে ধারণা করা হয়, ঠান্ডা থেকে বাঁচতে রাউলিং এমনটি করতেন। কারন তাঁর ফ্ল্যাটটি ছিল শীতাতপ অনিয়ন্ত্রিত। ২০০৭ সালের মধ্যে রাউলিং তার হ্যারি পটার বুক সিরিজের ৭টি বই এর লেখা সম্পন্ন করেন। এক বছরে সর্বোচ্চ আয় করা লেখিকা ২০০৭ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন রাউলিংকে এক বছরে সর্বোচ্চ আয় করা লেখিকা হিসেবে ঘোষণা করে! ১৯৯৭ সালে রাউলিং এর হ্যারি পটার সিরিজের প্রথম বই বের হয়। এর পাঁচ মাস পর তিনি লেখিকা হিসেবে তার প্রথম অ্যাওয়ার্ড জিতে নেন। পরের বছর ফেব্রুয়ারিতে এ বইয়ের জন্য জিতে নেন ‘ব্রিটিশ বুক অ্যাওয়ার্ড’। ১৯৯৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই বুক সিরিজ প্রকাশের স্বত্ত্ব পাওয়ার জন্য নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। স্কলাস্টিকা কর্পোরেশন এক মিলিয়ন ডলার দিয়ে বইয়ের স্বত্ত্ব কিনে নেয়। অক্টোবরে আমেরিকায় প্রথম হ্যারি পটার প্রকাশিত হয়। ১৯৯৮ এর জুলাইয়ে সিরিজের দ্বিতীয় বই ‘Harry Potter and The Chamber of Secrets’ প্রকাশিত হয়। রাউলিং আবার ‘স্মারটিয়েস প্রাইজ’ জিতেন। ১৯৯৯ এর ডিসেম্বরে তাঁরতৃতীয় বই ‘Harry Potter and The Prisoner of Azkaban’ বের হয়। এই বইটির জন্যও রাউলিং ‘স্মারটিয়েস প্রাইজ’ জিতে নেন। তিনিই ইতিহাসের প্রথম লেখিকা, যিনি টানা তিনবার এই পুরস্কার পাওয়ার রেকর্ড গড়েন। অন্য লেখকদের সুযোগ দেওয়ার জন্য রাউলিং আর এই পুরস্কারের জন্য কোনো বই জমা দেননি। ১৯৯৯-২০০০ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমসের সমীক্ষায় আমেরিকার বেস্ট সেলার ফিকশন বই হিসেবে হ্যারি পটার শীর্ষে থাকে। ২০০০ সালে রাউলিং ‘Author of the year’ হিসেবে ‘British Book Award’ পান। সিরিজের চতুর্থ বই ‘Harry Potter and The Goblet of Fire’ ২০০০ সালের ৮ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে একসাথে প্রকাশিত হলে তা দুই দেশেই সর্বোচ্চ বিক্রির রেকর্ড ভেঙ্গে দেয়। আমেরিকায় প্রথম ৪৮ ঘন্টায় ৩ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয় ও যুক্তরাজ্যে প্রথম দিনে প্রায় চার লক্ষ কপি বিক্রি হয় যা এর আগের বইয়ের পুরো বছরের বিক্রির সমান। ২০০৫ সালে ‘Harry Potter and The Half Blood Prince’ প্রকাশিত হলে এটি পূর্বের সমস্ত রেকর্ড ভেঙ্গে দেয়। প্রকাশের প্রথম দিনই ৯০ লক্ষ কপি বিক্রি হয় বইটির। রাউলিং আবার ‘Author of the Year’ পুরষ্কারে ভূষিত হন। ২০০৭ সালের ২১ শে জুলাই ‘Harry Potter and The Deathly Hallows’ প্রকাশিত হলে এটি সর্বকালের সর্বোচ্চ দ্রুততম বিক্রিত বই হিসেবে রেকর্ড গড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে ও যুক্তরাজ্যে প্রথমদিনে এর ১১ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়। ২০০১-২০১১ সাল পর্যন্ত হ্যারি পটার সিরিজ নিয়ে নিয়ে ৮টি সিনেমা নির্মাণ করা হয়। প্রতিটি সিনেমা বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত সফল হয়। দর্শকদের মাঝেও হয় জনপ্রিয়। সিনেমাগুলো ‘British Academy Award’ সহ আরো বহু অ্যাওয়ার্ড জিতে নেয়। এভাবে ২০০৪ সালের মধ্যে রাউলিং লেখক হিসেবে বিশ্বের প্রথম বিলিয়নারি হন। ফোর্বস ম্যাগাজিন তাকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ধনী মহিলা এন্টারটেইনার এবং পৃথিবীর ১০২৬’তম ধনী ব্যক্তি হিসাবে ঘোষণা করে। রাউলিং সমাজসেবার কাজের জন্যেও স্মরণীয়। তিনি দারিদ্র দূরীকরণে, শিশুদের কল্যাণে, সিংগেল প্যারেন্টদের সহায়তায়, ম্যাল্টিপল স্ক্লেরোসিস নির্মূলের লক্ষ্যে বিভিন্ন কাজ করে যাচ্ছেন। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার তিনি বিভিন্ন হাসপাতাল ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানে ব্যয় করেন। এডিনবার্গে মায়ের নামে তৈরী করেছেন ক্লিনিক। অসহায় শিশুদের জন্য ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘লুমাস’ (Lumos) নামের একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান চালু করেন। যা বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৮ মিলিয়নের বেশি শিশুকে সহযোগিতা করছে। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ উইকিপিডিয়া এবং আনন্দবাজার পত্রিকা।