একজন অলঙ্কার শিল্পী থেকে কমিক্স শিল্পী। পঞ্চাশ বছর ধরে একজন শিল্পীর শিশু কিশোর সাহিত্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন উপন্যাস এবং কমিক স্ট্রিপ এ কাজ করে যাওয়া সত্যিই বিরল। আর এই বিরল কৃতিত্বের জন্যই ২০২১ সালে পেয়েছেন পদ্ম পুরস্কার। এই মহৎ শিল্পীর নাম নারায়ণ দেবনাথ। ১৯২৫ সালের ২৫ নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার শিবপুরে জন্ম গ্রহণ করেন নারায়ণ দেবনাথ। এই শিবপুরেই বেড়ে ওঠা, শৈশব কৈশোর। খুব অল্প বয়েস থেকেই শিল্পের প্রতি ঝোঁক ছিল তাঁর। উনাদের পারিবারিক পেশা ছিল স্বর্ণকারের। পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই বাড়িতে অলঙ্কার তৈরির প্রচলন ছিল। শৈশব এবং প্রথম কাজ স্কুলের পাঠ চুকিয়ে তিনি ভর্তি হন আর্ট কলেজে। কিন্তু এরই মধ্যে শুরু হয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধের কারনে আর্ট কলেজে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। শেষ বর্ষে এসে আর্ট কলেজ ছেড়ে দেন। এরপর বেশ কিছু বছর কয়েকটি বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করেন। কিন্তু কমিক্সের উপর বরাবরই অদম্য নেশা ছিল। একটি প্রখ্যাত প্রকাশনা ‘দেব সাহিত্য কুটির’ -এর সম্পাদক মণ্ডলীর চোখে পড়েন তিনি, এবং এই প্রকাশনা সংস্থার সম্পাদকমণ্ডলীর উতসাহেই বাংলা কমিক্স-এর জগতে প্রথম পথ চলা শুরু। জনপ্রিয় কমিক্স চরিত্র গুলি ১৯৬২ সালে তাঁর প্রথম কমিক্স ‘হাঁদা ভোঁদা’ প্রকাশিত হয়। হাঁদা ভোঁদা পাঠক মহলে ভীষণ জনপ্রিয়তা পায়। এরপর থেকেই ছোটদের পত্রিকা ‘শুকতারা’-য় হাঁদা ভোঁদা নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। নারায়ণ দেবনাথের চিত্রিত সমস্ত কার্টুন চরিত্র গুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয় এবং সিনিয়ার চরিত্র ‘হাঁদা ভোঁদা’। প্রথমদিকে তিনি নিজেই হাঁদা ভোঁদা কমিক্স-এ আঁকতেন এবং কালি বসানোর কাজটাও তিনিই করতেন। পরবর্তীকালে অবশ্য গ্রেস্কেলে হাঁদা ভোঁদা প্রিন্ট এবং প্রকাশ করা হয়। সারাজীবন হাফপ্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরা বাঁটুলের বয়স কত? সে যুবক না কিশোর? এই সব প্রশ্ন উনার পাঠককুল কখনও ভেবেও দেখেননি। ‘শুকতারা’ কাগজ হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম পাতায় ফ্যাকাশে লাল আর কালো রঙের আঁকা সেই জগতে নিমেষে মধ্যেই হারিয়ে যেত পাঠক। যেখানে দুই ওস্তাদের সঙ্গে ক্রমাগত লড়াই করছে ‘বাঁটুল দি গ্রেট’। ১৯৬৫ সাল থেকে এখনও তারা ওই হাফপ্যান্টেই আটকে রয়েছে। বাটুল দেশবাসীর সুপারহিরো ১৯৬০-এর দশক থেকে বাঙালি সংস্কৃতির একটা প্রত্যঙ্গই হয়ে গিয়েছে নামটি। ১৯৬২ সালে ‘হাঁদা-ভোঁদা’, ১৯৬৫-তে ‘বাঁটুল দি গ্রেট’, ১৯৬৯-এ ‘নন্টে-ফন্টে’ বাঙালির শৈশব এবং কৈশোরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কমিক স্ট্রিপ। বাঙালির কোনো সুপারহিরো ছিল না। কিন্তু বাঁটুল দি গ্রেট হয়ে উঠলো শৈশব, কৈশোর এমনকি যুবক-বৃদ্ধদেরও সুপারহিরো। ১৯৬২তে ঘটে গিয়েছে ভারত-চিন যুদ্ধ, ১৯৬৫-এও ভারত-পাকিস্তান মুখোমুখি। আর ঠিক সেই সময়েই ভারতবাসীর সামনে বাটুলের আবির্ভাব। ভারত-পাক সঙ্ঘাতের সময়ে পাক সেনাদের ‘প্যাটন পেটা’ করে বাটুল। পরে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধের সময়েও বাটুল পরাধীন মানুষগুলির মধ্যে একান্ত জাতীয়তাবাদকে তুলে ধরেছিল বাঁটুল। তুলনায় ‘নন্টে-ফন্টে’র দুনিয়া একেবারেই আলাদা। ছাত্রাবাসের ঘেরাটোপে সুপারিন্টেন্ডেন্ট পাতিরাম হাতি (নাকি হাতিরাম পাতি?) আর বেয়াদপ সিনিয়র কেল্টুর সঙ্গে নন্টে-ফন্টের অনিঃশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতা হস্টেল জীবন কাটিয়ে আসা প্রতিটি মানুষকেই নস্টালজিক করে তোলে। তবে এর পাশাপাশি আরও বেশ কিছু কমিক স্ট্রিপ রচনা করেছিলেন নারায়ণ দেবনাথ। ‘বাহাদুর বেড়াল’, ‘ডানপিটে খাঁদু আর তার কেমিক্যাল দাদু’, ‘ডিটেকটিভ কৌশিক রায়’ ইত্যাদি। তবে এ সবের মধ্যে উল্লেখের দাবি রাখে ‘ব্ল্যাক ডায়মন্ড ইন্দ্রজিৎ রায়’ সিরিজ। দুর্দান্ত অপরাধী ব্ল্যাক ডায়মন্ড আর গোয়েন্দা ইন্দ্রজিতের টক্করে কে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়, তা জানা যায় না কখনওই। ১৯৮০-১৯৯০-র দশকে সেই সব চিত্রকাহিনি গোগ্রাসে গিলেছে পাঠক। গ্রন্থচিত্রণের অন্যতম পথিকৃৎ বাংলা গ্রন্থচিত্রণের অন্যতম প্রধান মুখও ছিলেন নারায়ণ দেবনাথই। পুজোর ছুটির দুপুরে পূজাবার্ষিকীতে, হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ভূতের গল্প আর তার সঙ্গে নারায়ণ দেবনাথের কালি-কলমে আঁকা সাদা-কালোর নিশুতি ভয়ে মুখ গুঁজে থাকতো পাঠক। বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যে বর্তমানে অনেক আধুনিকতা এলেও এখনও বইমেলায় হ্যারি পটার কেনার পর বাঁটুলের জন্যে বুক স্টলে লাইন দেয় অগণিত খুদে পাঠক। আর তা সম্ভব হয়েছিল নারায়ণ দেবনাথের মতো একজন বহুমুখী চিত্রকাহিনিকার এই দেশে জন্মেছিলেন বলে। সাদা-কালোয় বা দুই রঙে আঁকা সেই সব অসংখ্য ছবি আর কমিক্স এখনও বাঙালির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। প্রয়াণ ১৮ জানুয়ারি ২০২২ বার্ধক্যজনিত অসুখের কারনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিখ্যাত ভারতীয় বাঙালি কমিক্স শিল্পী নারায়ণ দেবনাথ। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ সমসাময়িক সংবাদপত্র/ উইকিপিডিয়া/ সাক্ষাৎকার/ ছবি সৌজন্যেঃ আনন্দবাজার পত্রিকা।