ভারতবর্ষের কুস্তির ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এই মল্লক্রীড়ায় বাঙালিদের অবদান অনেক। অবিভক্ত ভারত বর্ষে শুধু কুস্তিগীররাই কুস্তি করতেন না। বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতা, দার্শনিক, কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, শিক্ষাবিদ প্রায় সবাই কুস্তি করতেন নিয়মিত। এমনকি সম্ভ্রান্ত ঠাকুর বাড়ীর মেয়েরাসহ আরও অনেক মেয়েরাই নিয়মিত কুস্তি করতেন সেই আঠারশ শতকেই। সেই সময়ে মেয়েরা ছিল পর্দানশিন এরমধ্যেও কুস্তির চর্চা চলতো বাংলাদেশের ঘরে ঘরে। বাংলার কুস্তির রাজপুত্র যতীন্দ্র নাহ গুহ যিনি গোবর গুহ নামেই বিখ্যাত, উনাদের ‘গুহদের কুস্তির আখড়ায়’ নিয়মিত কুস্তি করতে আসতেন ভারতের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। গোবর গুহের আড্ডাসঙ্গী ছিলেন বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। গোবর গুহ হলেন প্রথম এশীয় ব্যক্তি যিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্ব লাইট হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নশিপ জেতেন ১৯২১ সালে। বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর প্রিয় বন্ধু ছিলেন গোবর গুহ। প্রায়ই আসতেন আখড়ার বৈঠকখানায়। বিজ্ঞানী বন্ধুটি এলেই গোবরবাবু নিজের ছেলে রতনকে দেখিয়ে দিয়ে বলতেন, ‘ওর মগজে একটু অংক কষে দিন তো!’ হাভানা চুরুটের গন্ধে ম-ম করত আড্ডাঘর। আজীবন ওই একটিই বদভ্যাস ছিল সংযমী কুস্তিগীরের। গুহদের আখড়ায় একটা সময়ে শরীরচর্চা করতেন বিজ্ঞানী সত্যেন বসু ছাড়াও কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, মহাত্মা গান্ধীর প্রথম সেক্রেটারি নির্মল কুমার বসু, সঙ্গীত শিল্পী মান্না’দের মতো ব্যক্তিত্ব সহ আরও অনেকেই। এত সবের মধ্যেও রীতিমতো সাহিত্য ও সঙ্গীতচর্চা করতেন গোবর গোহ। ভারতীয় রাগসঙ্গীতের তালিম নিতেন তিনি, বাজাতেন সেতারও। তাঁর প্রিয় লেখকদের মধ্যে ছিলেন, জর্জ বার্নাড শ এবং অস্কার ওয়াইল্ড। সেই আঠারশ শতকে খাস কলকাতায় অন্তত আটটি আখড়ায় কুস্তির রেওয়াজ চলত ঘটা করে। রাজা দিগম্বর মিত্র ও রানি রাসমণির বাড়ি, শোভাবাজার রাজবাড়ি, জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি, সিমলা ব্যায়াম সমিতি, জোড়াবাগান পঞ্চানন ব্যায়াম সমিতি, বেনিয়াটোলায় আহিরীদের এবং উত্তর কলকাতায় গোহদের আখড়ায় নিয়মিত কুস্তিচর্চা চলত। এখন সেই সব অতীত। শোনা যায়, ঠাকুরবাড়ির বিশাল আখড়ায় রবীন্দ্রনাথ-সহ অনেকেই, এমনকি এই পরিবারের মহিলারাও কুস্তির অনুশীলন করতেন। সিমলা ব্যায়াম সমিতির কুস্তির আখড়ায় নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু যেতেন। এখন সেখানে জিমন্যাস্টিক্স হয়। শোনা যায়, বিবেকানন্দ, শরৎচন্দ্র, রামকৃষ্ণদেবও তাঁর শিষ্যদের নিয়ে কুস্তি লড়তেন নিয়মিত। সংস্কৃত কলেজে কুস্তি নিয়ে আলোচনায় যোগ দিতেন স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরও। বাংলার রাজা-মহারাজারা পালোয়ানদের পৃষ্ঠপোষকতা, আখড়ার রক্ষণাবেক্ষণ করতেন। এক রাজার পালোয়ান লড়তেন অন্য রাজার পালোয়ানের বিরুদ্ধে। উল্লেখ্য কুস্তির রাজপুত্র গোবর গুহ ১৯১০ সালে বিদ্যাসাগর স্কুল থেকে এনট্রান্স পাশ করার পর তিনি পা রাখেন পেশাদার কুস্তির জগতে। প্রথম পেশাদারি লড়াইটা করেন ত্রিপুরার মহারাজার পালোয়ান নভরং সিং-এর বিরুদ্ধে। যদিও এ লড়াই থেকে তিনি অর্থ উপার্জন করতে পারেননি। “কলকাতার অধিকাংশ আখড়ার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেলেও এখনও টিকে আছে বড়বাজার তারাসুন্দরী পার্ক, জোড়াবাগান, প্রসন্নকুমার ঘাটের মতো কয়েকটি আখড়া। মুর্শিদাবাদ, জলপাইগুড়ি-সহ উত্তরবঙ্গের কয়েকটি আখড়া বাংলার কুস্তিকে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে। এর পর পরই দেশ ও দেশের বাইরের নানা প্রতিষ্ঠিত মল্লবীরদের পরাস্ত ও পর্যুদস্ত করতে শুরু করেন। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই দেশীয় কুস্তির দিক ও মুখ পরিবর্তন করে দেশকে বসিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক মানচিত্রে। প্রথাগত ধরনের বাইরে গিয়ে নিজস্ব স্টাইলে ভারতীয় কুস্তিকে দেখিয়েছিলেন নতুন দিশা। স্বাধীনতার পরের বছরই লন্ডন অলিম্পিক্সে অংশ নিয়েছিলেন বাংলার তরুণ কুস্তিগির নির্মল বসু। পরের হেলসিঙ্কি অলিম্পিক্সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন নিরঞ্জন দাস। কুস্তিতে আজ অবধি সাতটা পদক এসেছে অলিম্পিক্স থেকে। ১৯৫২ সালে হেলসিঙ্কি থেকে ব্রোঞ্জ পদক পান কে ডি যাদব। এর পর ৫৬ বছর অপেক্ষা করতে হয়। ২০০৮ সালে বেজিং ও ২০১২ লন্ডন অলিম্পিক্সে সুশীল কুমারের হাত ধরে আসে দু’টি পদক। ২০২০ টোকিয়ো অলিম্পিক্সে পি ভি সিন্ধুর আগে পর্যন্ত সুশীল কুমারই ছিলেন একমাত্র ভারতীয় খেলোয়াড়, যিনি দু’টি অলিম্পিক্স থেকে পদক জিতেছেন। ২০১২ লন্ডন অলিম্পিক্সেই কুস্তি থেকে আরও একটি ব্রোঞ্জ পদক আসে যোগেশ্বর দত্তর হাত ধরে। গত রিয়ো অলিম্পিক্সে ভারতীয় কুস্তির মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে মহিলাদের ৫৮ কেজি বিভাগে ফ্রিস্টাইল থেকে ব্রোঞ্জ আনেন সাক্ষী মালিক। সদ্যসমাপ্ত ২০২০ টোকিয়ো অলিম্পিক্সে রবি কুমার দাহিয়ার রুপো ও বজরং পুনিয়ার ব্রোঞ্জ দেশের আখড়াগুলোকে আরও উৎসাহ জোগাবে। সাতটা অলিম্পিক্স পদক-সহ শতাধিক আন্তর্জাতিক মেডেল আজ এই দেশের ইতিহাসে। কুস্তিচর্চার পাশাপাশি আখড়াগুলো সে সময় হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের গোপন আস্তানাও। ইংরেজদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে শরীরচর্চা করতে আসতেন যুবকরা। ইংরেজদের বিভ্রান্ত করতেই অম্বিকাচরণ গুহ কুস্তিকে ক্রীড়ায় অন্তর্ভুক্তি ঘটান। দাবি করা হয়, এই গুহ পরিবারই বাংলায় কুস্তির প্রতিষ্ঠাতা।স্বদেশচেতনার প্রেরণা জোগাত এই কুস্তির আখড়া গুলি। জালিওয়ানালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন ‘নাইট’ উপাধি ত্যাগ করেন, তখন লন্ডনে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে রবীন্দ্রনাথকে সমর্থন জানিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে নিজের মত প্রকাশ করেছিলেন কুস্তীগির গোবর গুহ। ১৯২১ সালের ৩০ অগস্ট। এই তারিখে সান ফ্রানসিস্কোয় লাইট হেভিওয়েট ফ্রিস্টাইল বিভাগের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্যান্টেলকে হারিয়ে তার শিরোপা নিজের দখলে নিয়ে নেন গোবর গোহ। এক ঘণ্টা তিন মিনিটের সে লড়াই মন্ত্রমুগ্ধের মতো প্রত্যক্ষ করেছিল বিশ্ববাসী। সে লড়াই আজও লোকগাথার মতো ভারতীয়দের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। শুধু শক্তি নয়, উপস্থিত বুদ্ধি, ক্ষিপ্রতা এবং কৌশল— মল্লযুদ্ধের প্রতিটি বিভাগেই স্যান্টেলকে পরাস্ত করেছিলেন গোবর। এই লড়াইয়ের স্মরণে ভারত সরকার দুই মল্লবীরের ছবি দিয়ে বিশ্ব কুস্তি চ্যাম্পিয়নশিপের প্ল্যাটিনাম জুবিলি উপলক্ষে ১৯৯৬ সালে একটি বিশেষ ডাকটিকিট প্রকাশ করে। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ ভারতের কুস্তির ইতিহাস/ আনন্দ বাজার পত্রিকা/ সমসাময়িক পত্র পত্রিকা।