বাংলা গানের ব্যন্ড ফসিল সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। কিন্তু আজকে সেই ব্যন্ড নয় সত্যিকারের ফসিলসের কথাই বলবো। প্রকৃতির রোষে, পরিবেশ দূষণ বা সংরক্ষণের অভাবে কত উদ্ভিদ আর প্রাণী যে এই প্রকৃতি থেকে হারিয়ে গেছে তার হিসেবও নেই আমাদের। কিন্তু এই হারিয়ে যাওয়া উদ্ভিদ বা প্রাণীর জীবাশ্ম থেকেই পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞানীরা আবিস্কার করেছে অনেক তথ্য। কোটি কোটি বছর আগে হারিয়ে গিয়েছিল ডাইনোসর। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানীরা এই ভারতবর্ষ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় খনন চালিয়ে উদ্ধার করেছে ডাইনোসর এর ইতিহাস। তাই বিজ্ঞানী থেকে শুরু করে আমাদের সবার অসীম কৌতূহল এই ফসিল বা জীবাশ্ম সম্পর্কে। কি এই ফসিল বা জীবাশ্ম! আজকের প্রতিবেদনে এই নিয়েই আমরা আলোচনা করবো। ফসিল বলতে মৃত প্রাণী বা উদ্ভিদের অংশবিশেষ পাথরে পরিণত হয়ে যাওয়া এমন ধরনের বস্তুকে বোঝায়। লাতিন শব্দ ‘ফসাস’ থেকে ‘ফসিল’ শব্দটি এসেছে। ফসাস-এর অর্থ উত্তোলন করা। ফসিলকে বাংলায় বলে জীবাশ্ম। ফসিল কে বাংলায় বলে জীবাশ্ম = জীব+অশ্ম। জীব হচ্ছে তারা, যাদের জীবন আছে। আর ‘অশ্ম’ অর্থ ‘পাথর’। জীবের যে অংশ নষ্ট না হয়ে শক্ত ও প্রস্তরীভূত হয়ে হাজার হাজার, এমনকি লাখ বা কোটি বছর পর্যন্ত টিকে থাকে, সেই অংশটাই হলো ফসিল। কিভাবে ফসিল রুপ পায়? প্রাগৈতিহাসিক যুগের উদ্ভিদ ও প্রাণীর ধ্বংসাবশেষ তথা মৃতদেহের চিহ্ন পাওয়া যায় ভূগর্ভ কিংবা ভূপৃষ্ঠের কঠিন স্তরে সংরক্ষিত পাললিক শিলা অথবা যৌগিক পদার্থে মিশ্রিত ও রূপান্তরিত অবস্থায়। সব প্রাণীর শরীরের কিছু অংশ নরম ও কিছু অংশ শক্ত থাকে। যেমন-মানবদেহের হাড়, মাথার খুলি, করোটি, দাঁতসহ দেহের পুরো কঙ্কালই শক্ত অংশ। অন্যদিকে দেহের মাংস, চামড়া, মস্তিস্ক-এসব অংশ নরম এবং সহজেই পচনশীল। দেহের শক্ত অংশই প্রকৃতিতে পড়ে থাকতে থাকতে একসময় ফসিলে রূপ নেয়। যেমন-একটি সামুদ্রিক মাছ জলে মারা গেল। সেই মাছের মৃতদেহ জলের নিচে একসময় তলিয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে তার দেহের নরম অংশ পচে জলের সঙ্গে মিলে যায়। পড়ে থাকে মাছটির হাড়। সেই হাড়ের ওপর একসময় পলিমাটি জমতে শুরু করে। এভাবে আস্তে আস্তে হাড়ের ওপর পাতলা করে জমতে থাকা পলি একসময় হাড়ের সঙ্গে মিশে গিয়ে একে পাথরের রূপ দেয়। এভাবে সৃষ্টি হয় ফসিল। ফসিল কিভাবে চিহ্নিত করা হয়? ঊনবিংশ শতকে শীর্ষস্থানীয় ভূতাত্ত্বিকরা ভৌগলিক সময়ের মানদণ্ডে ৩৪০ কোটি থেকে ১০ হাজার বছর বয়সের মধ্যে সংগৃহীত প্রাণী বা উদ্ভিদের পাথরে পরিণত হওয়া অংশ বিশেষকে ফসিল নামে অভিহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিংশ শতকের শুরুতে ‘রেডিওম্যাট্রিক ডেটিংয়ের’ প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ফসিলের সময়সীমা চিহ্নিত করতে বেশ সহায়ক হয়েছে। এর ফলে বিজ্ঞানীরা প্রাণিজগতের অনেক ইতিহাসই বের করতে সক্ষম হয়েছেন। বিবর্তন প্রত্নতত্ত্ববিদরা মাটি খুঁড়ে বিভিন্ন প্রাণীর যেসব জীবাশ্ম আবিষ্কার করেছেন। সেগুলো পর্যালোচনা করে নিঃসন্দেহে বলা যায় সরলতম আদি জীব হতে বিবর্তনের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের জটিল জীবের উদ্ভব হয়েছে। জীবাশ্ম থেকে বিবর্তনের সম্পূর্ণ ও অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায় ঘোড়ার উদ্ভাবনে। আজ থেকে প্রায় ৬ কোটি বছর আগে ঘোড়ার আদি পূর্বপুরুষ “ইয়োহিপ্পিয়াস” প্রায় ১১ ইঞ্চি উঁচু ছিলো। এর সামনের পায়ে চারটি এবং পিছনের পায়ে তিনটি নখযুক্ত আঙুল ছিল। “ইয়োহিপ্পিয়াস”এর পরবর্তি ধারা “মেসোহিপ্পাস”এর উচ্চতা ছিলো ২ ফুট এবং পায়ে তিনটি করে নখযুক্ত আঙুল ছিল। পরবর্তী স্তরে ৪০ ইঞ্চি উঁচু “মেরিচিপ্পাস”এর তিনটি আঙুলের মধ্যে একটি মাত্র কর্মক্ষম ছিল। এর পরে আগমন ঘটে ৫০ ইঞ্চি উঁচু “প্লিওহিপ্পাস” জাতীয় ঘোড়ার। এর সামনে ও পিছনের পায়ে একটি মাত্র আঙুল দেখতে পাওয়া যায়। আধুনিক কালের ৬০ ইঞ্চি ঘোড়া “ইকুয়াস” এই প্লিওহিপ্পাসের বংশধর। জীবাশ্ম অনেক সময় দুটি ভিন্ন শ্রেণীর জীবের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের ইঙ্গিত বহন করে। এধরনের জীবাশ্মকে সংযোগকারী জীবাশ্ম বলে। এমনই এক জীবাশ্ম Archaeopteryx. Archaeopteryx এর কিছু বৈশিষ্ট্য সরীসৃপের মতো ও কিছু পাখির মতো। Archaeopteryx সরীসৃপের বৈশিষ্ট্য দাঁতযুক্ত চোয়াল। লম্বা লেজ। অস্থি পুরু ও ভারী। ডানা নখরযুক্ত। বুকের হাড়ে কিল (keel) নেই। Archaeopteryx পাখির বৈশিষ্ট্য লেজ ও ডানায় পালক বিদ্যমান। ঠোঁট চঞ্চুতে রূপান্তরিত। উপরের বৈশিষ্ট্যগুলো নিরীক্ষা করে বিবর্তনবিদগণ এই মত দিয়েছেন যে, সরীসৃপ হতে পাখি জাতীয় প্রাণীর উদ্ভব হয়েছে। সুতরাং, Archaeopteryx-এর জীবাশ্ম বিবর্তনের স্বপক্ষে জোরালো দলিল বিশেষ। এছাড়া আরেকটা ব্যপার লক্ষণীয়, জীবন্ত জীবাশ্ম। যেসব প্রাণী সুদূর অতীতে উৎপত্তি লাভ করে আজও অঙ্গসংস্থানিক ও শারীরবৃত্তীয় কাজের অপরিবর্তিত রূপ নিয়ে পৃথিবীতে বেঁচে আছে অথচ এদের সমসাময়িক ও সমগোত্রীয় সকলেরই বিলুপ্তি ঘটেছে এবং যারা পর্ব থেকে পর্ব ও শ্রেণী থেকে শ্রেণির উদ্ভবের নিদর্শন বহন করে চলেছে, তাদেরকে জীবন্ত জীবাশ্ম (Living fossil) বলে। প্লাটিপাস (Platypus) এ ধরনের একটি জীবাশ্ম! এর কিছু বৈশিষ্ট্য (ডিম, রেচন-জননতন্ত্র) সরীসৃপ শ্রেণীর মতো, আবার কিছু বৈশিষ্ট্য (স্তনগ্রন্থি, লোম) স্তন্যপায়ীর মতো। এছাড়া Limulus, Peripatus, Sphenodon, Lamtimaria ও জীবন্ত জীবাশ্ম। পৃথিবীতে অসংখ্য প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। এককোষী অত্যন্ত সরল জীব থেকে শুরু করে নানা রকম জটিল জীবও দেখা যায়। এছাড়াও বহু রকমের জীব বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এসব জীবের মাঝে বৈসাদৃশ্য থাকলেও প্রাথমিক গঠনের সামঞ্জস্য চোখে পড়ার মতো! এই বৈচিত্রপূর্ণ জীবনের উদ্ভব যে বহু যুগ ধরে জৈব বিবর্তনের মাধ্যমে হয়েছে তার স্বপক্ষে বিভিন্ন শাখা থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়। শ্রেণীবিন্যাসগত প্রমাণ (Evidences of Taxonomy) পারস্পরিক সম্বন্ধতার ভিত্তিতে জীবজগতের আধুনিক শ্রেণীবিন্যাস গড়ে উঠেছে। একই ধরনের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ নতুন প্রজাতি (species) একটি গণে (genus), কতকগুলো সম্পর্কযুক্ত গণ-কে একটি বর্গে (order), কতকগুলো সাদৃশ্যপূর্ণ বর্গকে একটি শ্রেণীতে (class), এবং কতকগুলো শ্রেণীকে একটি পর্বে (phylum) বিন্যাস করার যে কাঠামো তা বিবর্তনের স্বপক্ষে যথেষ্ট যুক্তি বহন করে। একই গণের বিভিন্ন প্রজাতিতে সামঞ্জস্য সর্বাপেক্ষা বেশি। ভার্টিব্রাটা উপপর্বের বিভিন্ন প্রাণী মাছ, উভচর, সরীসৃপ,পাখি, ও স্তন্যপায়ী শ্রেণীতে বিভক্ত হলেও এরা একই ছাঁচে গড়া! এদের হৃৎপিণ্ড, চোখ, কান, ইত্যাদি অঙ্গের মৌলিক গঠন একই রকম। কারণ, এরা একই পূর্বপুরুষ হতে এসেছে। জীবভৌগোলিক প্রমাণ (Evidences from Biogeography) আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস ১৮৭০ সালে জীবজন্তু ও গাছপালার বিস্তারের উপর ভিত্তি করে সমগ্র পৃথিবীকে ছয়টি ভৌগোলিক অঞ্চলে ভাগ করেন। ছয়টি অঞ্চলের জীবের মধ্যে মিল ও অমিল উভয়ই বিদ্যমান। উত্তর গোলার্ধের প্রাণীদের মধ্যে সাদৃশ্য বেশি। দক্ষিণ গোলার্ধের প্রাণীদের মধ্যে সেই তুলনায় বৈচিত্র্য বেশি। সুদূর অতীতে পৃথিবীর অধিকাংশ স্থলভাগ একসঙ্গে যুক্ত ছিলো। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একারণে বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডের প্রাণীদের মধ্যে সাদৃশ্য দেখা যায়। অতীতে গ্যালাপাগোস (Galapagos) দ্বীপপুঞ্জ আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলো। পরে আকস্মিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে দ্বীপপুঞ্জটি তার জীবজন্তু নিয়ে মূল ভূখণ্ড হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে প্রাণীসমূহ অন্তরিত হয়ে পড়ে। এই অন্তরিত (Isolated) প্রাণীরা পরিবেশের প্রভাবে নিজস্ব ধারায় বিবর্তিত হয়ে নতুন প্রজাতি সৃষ্টি করে। দ্বীপপুঞ্জটিতে ১৩ প্রজাতির ফিঞ্চ পাখি (finches) পাওয়া যায়। এদের সকলের ঠোঁট একরকম না। বিবর্তনের ফলেই এমন বৈষম্য ঘটে। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ Fossils by P.R. Yadav এবং সমসাময়িক সংবাদ পত্র।