একসময় সদ্য গিলোটিনে গর্দান যাওয়া যুদ্ধবন্দীর রক্তঝরা মুখের ছাঁচ তৈরি করতেন স্বয়ং মাদাম তুসো। এখন অবশ্য আধুনিক পদ্ধতিতে তৈরি করা হয় মূর্তি গুলি। মূর্তিগুলির শিল্পীদের প্রথম থেকেই একটা লক্ষ্য থাকে হুবুহু বা অবিকল মূর্তি তৈরি করা। তবে মোম সঙ্কুচিত হয়, তাই মূর্তি গুলি প্রকৃত মাপের চেয়ে একটু বড় করেই তৈরি করা হয়। সারা পৃথিবীর মানুষের কৌতূহল মাদাম তুসোর জাদুঘরের এই মূর্তিগুলি নিয়ে। একটি মজার গল্প আছে মূর্তিগুলির এই নিখুঁত রুপ নিয়ে। বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ও অভিনেতা আলফ্রেড হিচকক একটা ছবির স্যুটিং করছিলেন। তাঁর এক ভক্ত মহিলা একদৃষ্টে তাকিয়েছিলেন অভিনেতা আলফ্রেড হিচককের দিকে। তখন হিচকক উনার সেই মহিলা ভক্তকে বলেছিলেন, আমাকে ওভাবে দেখবেন না। যদি ভালো করে দেখতে চান তাহলে মাদাম তুসোজ-এ চলে যান, ওখানে আমার নিখুঁত মূর্তি আছে। শুরুর ইতিহাস বিখ্যাত জাদুঘরগুলোর কথা বলতে গিয়ে মাদাম তুসোর জাদুঘরের নাম চলে আসবে এমনটাই তো স্বাভাবিক। এই জাদুঘরে খ্যাতিমানদের মোমের মূর্তি তৈরি করে রেখে দেয়া হয় এবং এ কারণেই এই জাদুঘরটি বিখ্যাত। তবে এর শুরুটা কিন্তু ছিল অন্যরকম। ফরাসি বিপ্লবের সময় নিজেই জাদুঘরের জন্য সংগ্রহের সূচনা করেন মাদাম তুসো। কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলে তার কাটা মাথাটিকে দিয়ে মোমের প্রতিকৃতি তৈরি করতেন তুসো। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত নমুনাটি হচ্ছে প্রথম ফরাসি রাজার কাটা মাথার প্রতিকৃতি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত শহরগুলোতে আছে এই জাদুঘর। আমেরিকার হলিউড, লাসভেগাস, নিউইয়র্ক আর ওয়াশিংটনে আছে এই জাদুঘর। ইউরোপে আছে আমস্টারডাম, বার্লিন, ব্লাকপোল, লন্ডন আর ভিয়েনাতে। এশিয়ায় আছে ব্যাংকক, হংকং, টোকিও আর সাংহাই শহরে। অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতেও রয়েছে এই জাদুঘর। কীভাবে তৈরি হয় এই মূর্তি? মোমের মূর্তি বানাতে প্রায় আড়াইশ’বার শরীরের মাপ নিতে হয় এবং বিভিন্ন কোণ থেকে প্রায় ১৮০টি ছবি তুলতে হয়। এ ক্ষেত্রে যদি ওই ব্যক্তিত্ব অনুপস্থিত থাকেন, তবে জাদুঘরের স্টুডিয়োতে ভাস্কর তার কয়েকশ ছবি বা ভিডিও পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করে এরপর মূর্তি তৈরি করেন। সংগ্রহশালায় মূর্তি তৈরির আগে প্রথমেই বিশ্বের বিখ্যাত নরনারীর একটি তালিকা তৈরি করেন বিশেষজ্ঞরা। তারপর তাদের একে একে আমন্ত্রণ জানানো হয় আসার জন্যে। এরপর আমন্ত্রিত মানুষটি সময়-সুযোগমতো এসে হাজির হলে, সেলিব্রিটির একটি তৈলচিত্র এঁকে রাখা হয়। তখনই দর্জি যেমন গায়ের মাপ নেন, ঠিক সেইভাবে নেওয়া হয় তাঁর মুখ, মাথা এবং শরীরের অন্যান্য অংশের মাপজোক। তুসোর কর্মীরা তারপর বিভিন্ন দিক থেকে তুলে নেন প্রচুর ফটোগ্রাফ বা পোট্রেট। এখানেই শেষ নয়, চুল ও গায়ের রঙ সম্পর্কে খুঁটিনাটি বিবরণ লিখে রাখা হয়। সবশেষে এইসব দেখে নেবার পরে প্রথমে তৈরি হয় একটি মাটির মূর্তি। কয়েকদিন ধরে চলে তার রদবদল। তারপর চূড়ান্তভাবে সেই মূর্তিটি পছন্দ হলে তার থেকে তোলা হয় এক প্লাস্টারের ছাঁচ। সেই ছাঁচে রঙ-মেশানো মোম ঢেলে তৈরি করা হয় আসল মূর্তিটি। এরপর মানুষেরই চুল একটি একটি করে বসানো হয় মাথায়। ওই একইভাবে লাগাতে হয় দাড়ি, গোঁফ ও ভুরু। এরপর ঠিকমতো পোশাক পরিয়ে যথাযোগ্যভাবে সাজানো মঞ্চে স্থাপন করা হয় সেই মূর্তিটিকে। তখনই তা হয়ে ওঠে এক নান্দনিক শিল্পকীর্তি। একটি মূর্তির মাথায় চুল প্রতিস্থাপন করতে প্রায় পাঁচ সপ্তাহ সময় লাগে অর্থাৎ প্রায় মাসাধিক কাল। জাদুঘর খোলার আগে প্রতিদিন দুটি এক্সপার্টদের দল মূর্তিগুলো দেখভাল ও পরিপাটি করে। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ সেলিব্রেটিদের শরীরের মাপ প্রকাশ করে না। মোম ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়, তাই মোমের মূর্তি সত্যিকারের সেলিব্রেটি মানুষটির শরীর থেকে প্রায় দুই শতাংশ বড় করে বানানো হয়। লাল সিল্কের সুতা দিয়ে মূর্তিগুলোর অক্ষিগোলকের শিরা বানানো হয়। পরিচর্যার অংশ হিসেবে প্রায় নিয়মিত মূর্তিগুলোর চুল ধোয়া ও মেকআপ করা হয়। প্রতিটি মূর্তি বানাতে প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার ডলার খরচ হয়। অনন্য কীর্তি রাখা আছে মাদাম তুসোর জাদুঘরে টিকিট কেটে ভিতরে গেলেই টিকিট পরীক্ষার জন্যে যে-কর্মচারীটি দাঁড়িয়ে আছে তাকে টিকিট দেখাতে গেলেই আশ্চর্য হতে হবে কারণ সে ও এক মোমের পুতুল। কিছুটা এগিয়ে গেলেই চোখে পড়বে একপাশে সোফার উপর বসে ঢুলছেন এক মহিলা, তার কোলের উপর থেকে মেঝেতে খসে পড়েছে গাইড বুকটি। ওই মহিলাও মাদাম তুসোর আর-এক শিল্পকীর্তি। এরপর দোতলায় গেলে চমকের পর চমক। কোথাও সপারিষদ বসে আছেন রানী এলিজাবেথ, কোথাও মেরি কুইন অব স্কটসকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বধ্যভূমিতে, কোথাও ওয়েলিংটন বা নেপোলিয়ন দাড়িয়ে আছেন যুদ্ধক্ষেত্রে, কোথাও-বা দেখা যাচ্ছে স্বনামধন্য গ্রেসকে তাঁর ক্রিকেট খেলার প্রিয় ও পরিচিত পোশাকে। কয়েকজন প্রসিদ্ধ ভারতীয় ব্যক্তিত্বের মূর্তিও আছে এই সংগ্রহশালায়। মহাত্মা গান্ধী সহ প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরু, ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধী সহ আরও অনেকের প্রতিমূর্তি। তবে সব থেকে বেশি ভিড় হয় বিভীষিকাগৃহে বা ‘চেম্বার অব হররে’। সেখানে প্রায় একশোজন আততায়ীর মূর্তি সাজানো আছে নানা কায়দায়। দেখলেই হিম হয়ে যায় গায়ের রক্ত। মনে হবে এই বুঝি আক্রমণ করে বসবে। বহু বিখ্যাত মানুষ নিখুঁত শিল্পের জন্যে সময়ও দিয়েছেন শিল্পীদের সংগ্রহশালার শিল্পীদের কাজে সহায়তা করার জন্য অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিই যথেষ্ট সময় দিয়েছেন। উইনস্টন চার্চিল, এডিনবার্গের ডিউকের মতো বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব দুবার সিটিং দিয়েছেন শিল্পীদের সামনে। সময় দিয়েছেন বহুবার। নিজেদের মূর্তিকে নিখুঁত করার জন্য অনেকেই নিজেদের পোশাকও উপহার দিয়েছেন এই সংগ্রহশালাকে। মার্শাল টিটো, জেনারেল আইসেনহাওয়ার তাদের ইউনিফর্ম পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মাদাম তুসোজ-এ। তাই পৃথিবীর একমাত্র মোমের এই জাদুঘরের মাদাম তুসো সংগ্রহশালা পৃথিবীর এক আশ্চর্য কীর্তি। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ উইকিপিডিয়া এবং সমসাময়িক পত্রপত্রিকা